রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 



 

সাদা শাড়ির মেয়েটি

১)
মাল জংশন স্টেশনে নেমেছি ঘড়িতে তখন আটটা দশ। এত রাতে বিন্নাগুড়ি যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে না। শীতের রাত, স্টেশন চত্বর খাঁ খাঁ করছে। ট্রেকার জীপ কোনটাই নেই। না থাকারই কথা। ট্রেন প্রায় বারো ঘন্টা লেট। মাল জংশনে যাদের নামার ছিল বেশীরভাগ শিলিগুড়িতে নেমে গেছে। অমিও নামতে পারতাম কিন্তু মানিব্যাগে সর্বসাকুল্যে দুশোটি টাকা পড়ে। শিলিগুড়ির কোন হোটেলে ঢালার মত রেস্ত নেই। লাটাগুড়িতে এক বন্ধু থাকত বছর পাঁচেক আগে। ওদের পারিবারিক হোটেল ব্যবসা। আশা করি পাঁচ বছরে সেটি লাটে ওঠেনি। মুশকিল হচ্ছে লাটাগুড়ির বাস মোটামুটি ঘন্টাখানেক আগে শেষ ট্রিপের যাত্রীদের তুলে নিয়ে গেছে। স্টেশনে আমার সাথে জনাছয়েকের একটা দল নেমেছে। উড়িয়া, চেহারা দেখে প্রথমটায় বাঙালী ভেবেছিলাম। পরিবারটিতে দুজন অন্তত ষাট পেরোনো বুড়োবুড়ি। এত রাতে শুনশান স্টেশনে বুড়োবুড়ি সাথে নিয়ে ওদের উদ্বিগ্ন মনে হল না। দিব্যি দাঁড়িয়ে গল্প করছে। বাচ্চাগুলো ফটাফট চিপ্‌সের প্যাকেট ফাটাচ্ছে। এসব সময় পরাগজ্যোতির ট্রেনিং বেশ কাজে লেগে যায়। বুঝলুম ওদের বাহন আছে আর শিগগিরি সেটা এসে পড়বে। ব্যস ঝুলে পড়েছি। এরা ময়নাগুড়ি যাবে। লাটাগুড়ি বাজারের কাছে আমায় বমাল সমেত নামিয়ে ওদের সুমো গাড়ি হুস্‌ করে বেরিয়ে গেল। বন্ধুর রিসোর্ট একটু ভেতরের দিকে। পায়ে হেঁটে মিনিট পনেরো থেকে বিশ লাগে। তবে পথের একপাশে গরুমারা জঙ্গল।চাঁদের আলো গাছপালার ফাঁকফোঁকোর গলে এখানে ওখানে যা পড়ার পড়ছে। বাকি জায়গাগুলোয় কিম্ভুত কিমাকার সব ছায়া তৈরী হয়েছে। শুকনো শালপাতা ঝরে পড়ে, শব্দ হয় মচ্‌মচ যেন কেউ পা ফেলে এগিয়ে আসছে। জঙ্গলের ভেতর ময়ুরী ডেকে উঠে, ক্রাঁ-আ, ক্রাঁ-আ। শব্দগুলোর সাথে আমি আগেও পরিচিত। একটি পরিত্যাক্ত মিটার গেজ লেভেল ক্রসিং পেরোনোর মুখে কেউ যেন ডাকল, "এই যে শুনছেন।" এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করি। জঙ্গলের ভিতর থেকে আওয়াজ ভাসে, "আপনাকে বলছি। একমিনিট দাঁড়াবেন।" মহিলার গল, নির্ঘাত বিপদে পড়েছে। একহাত দূরে জঙ্গল ফুঁড়ে যে সামনে এসে দাঁড়াল তাকে দেখে রীতিমত ঘাবড়ে গেছি। মাথায় ঘোমটা দিয়ে সম্পূর্ণ সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। কনক আমার বন্ধু ভুরিভুরি ভূতের গল্প লেখে। কচিকাঁচাদের গল্পের ভূতগুলো আলখাল্লা পরা তুলনায় বুড়োপাকাদের ভূত একটু খোলামেলা বেশ ইয়ে মার্কা। তবে ভূতের ইউনিফর্ম মোটামুটি সব গল্পেই সাদা। আমার জায়গায় আজ সে থাকলে বেশ হত। মহিলার হাতে গাঢ় রঙের একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। রঙ বোঝার উপায় নেই।
"কি ব্যপার বলুন তো। বিপদে পড়েছেন?"
"আসলে ময়নাগুড়ি যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না।"
"রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু এত রাত্রে কি গাড়ি পাওয়া যাবে?"
"ওঃ।" মহিলার গলার স্বরে একরাশ দুঃখ ঝরে পড়ে। "কিন্তু আমায় তো যেতেই হবে।"
"আপনাকে বরঞ্চ লাটাগুড়ি বাজারের রাস্তায় তুলে দিয়ে আসি। ভাগ্যে থাকলে কিছু পেয়েও যেতে পারেন।"
"থ্যাঙ্কস আ লট। সেটাই বেস্ট অপশন।"
আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরছে। ইংরাজী বলা এমন স্মার্ট মেয়ে হঠাৎ মাথায় কাপড় ঢেকে ঘুরছে কেন? কোন বদ উদ্দেশ্য নেই তো।
"আপনি বোধহয় আমায় খারাপ ভাবছেন।"
"কই না তো।"
"আসলে সিচুয়েশনটাই এমন অকওয়ার্ড। অনেকক্ষণ ধরে রাস্তা খুঁজছি। নয়ত এমন জায়গায় অজানা অচেনা কাউকে বিরক্ত করা..." বলতে বলতে সে আঙুল উঁচিয়ে সামনের দিকে দেখায়, "ওই দেখুন।"
রাস্তার ঠিক মোড়ে একটা জিপসী গাড়ি প্যাসেঞ্জার নামাচ্ছে। আমায় ফেলে সে হন্‌হন্‌ করে এগিয়ে যায়। যতক্ষণে জিপসীর কাছে পৌঁছাই ততক্ষণে চালকের পাশে বসে পড়েছে। জানলার কাঁচ অল্প নামিয়ে বলে, "এটা ময়নাগুড়ির উপর দিয়ে যাবে। থ্যাঙ্কস আ লট।" কাঁচটা তুলতে তুলতে গাড়ি ছেড়ে দিল। হালকা হাওয়ায় তাঁর মাথার কাপড় খানিক সরে যায়। মুখের একপাশটা দেখে আমি পাগলের মত চেঁচিয়ে উঠি, "দাঁড়াও দাঁড়াও।" গাড়ি ততক্ষণে কয়েকশ মিটার এগিয়ে গেছে।

২)
"কি যা তা বলছিস অনি?" কানে রিসিভার চেপে স্পষ্ট বুঝতে পারি পরাগজ্যোতির মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেছে।
"বিশ্বাস কর পরাগ। মেয়েটি রীতাভরি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।"
"দুবছর আগে প্যাভলভ হাসপাতালে রীতাভরির মৃত্যুর খবরটা তুইই আমাকে দিয়েছিলি।"
"হঁযা দিয়েছিলাম। হাসপাতালের রেজিস্টারে আমি নিজে নামটা যাচাই করেছি।"
" গতকাল সেই রীতাভরি তোর নাকের উপর দিয়ে গাড়ি চেপে বেরিয়ে গেল। তোকে চিনতেও পারল না। এবার বল দুটোর মধ্যে কোনটা ধরব।"
"জানিনা পরাগ। আমারও সব গুলিয়ে যাচ্ছে।"
"অনেকদিন হল অনি। এখন এসব ছাড়। তোকে পাঠালাম বিন্নাগুড়ি। তুই লাটাগুড়ি বসে আছিস। আঁকার স্কুল থেকে আমায় ফোন করেছিল। আজ দুপুরের মধ্যে ওখানে চলে যা।"
"না রে। আজ যাওয়া হবে না। রীতা এই ময়নাগুড়ির আশেপাশে কোথাও আছে। মিস্ট্রিটা সল্ভ না হওয়া পর্যন্ত আমি রাকেশদের রিসর্টে থাকব। তুই আয় না দুদিনের জন্য। একটু হেল্প কর।"
"আর ইউ ক্রেজি। আমার দম ফেলার সময়......."
পরাগকে মাঝপথে থামিয়ে দিই," দেখ না যদি ম্যানেজ করতে পারিস। ট্যুর ফুর কিছু একটা নিয়ে চলে আয়।"
"ড্যাম! তুই একটা যাতা।" পরাগজ্যোতি ফোন কেটে দেয়। সেদিন বিকাল বেলা আবার ফোন করে। জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট থানায় ওর একটা কেস অনেকদিন ধরে ঝুলে আছে। চারদিনের ট্যুরে আসছে। বলল, "ঠিক দুদিন তোকে টাইম দেব।" যাক বাঁচা গেল, আমার একার পক্ষে রীতাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

বছর ছয়েক আগে শিলিগুড়িতে রীতাভরির সাথে আলাপ হয়। ওর বাবা সুধাংশু দত্ত কয়েকটি বিখ্যাত টি এষ্টেটের শেয়ার হোল্ডার। ওদের নিজেদেরও বড় একটা চা বাগান আছে। আমি তখন আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে স্বাধীনভাবে কিছু করার চেষ্টায় এ দোর সে দোর করে বেড়াচ্ছি। এগজিবিশন করার পয়সা নেই। ইতালিতে যাওয়ার একটা স্কলারশিপ পাওয়ার আশায় অনেকদিন গুঁতোগুঁতি করে লাভ হয়নি। পরাগ শিলিগুড়ি থানায় নতুন ঢুকেছে। ল্যাংটো বয়সের এই একটি বন্ধুর সাথে আমার সম্পর্ক অটুট। চিঠি পাঠাল চার পাঁচদিনের মধ্যে শিলিগুড়ি যেতে হবে। এখানকার টি এস্টেটের মালিক নাকি আঁকার স্কুলের মাস্টার খুঁজছে। তখন আমায় নিয়ে বাড়িতে সবসময় একটা গুমোট আবহাওয়া। বাবা বন্ধ কারখানা খোলার আশায় দিন গুনতে গুনতে ধৈর্য হারাচ্ছেন। দিদি দুএকটা টিউশানি করে। সংসার কিভাবে চলে ভয়ে জানার চেষ্টা করি না। পরাগ লিখেছিল মাসে চারহাজার বেতন। থাকা খাওয়া ফ্রি। আহামরি না হলেও অফারটা মন্দ নয়। মাসে হাজার দুয়েক অন্তত কলকাতায় পাঠানো যাবে। চলে এলাম শিলিগুড়ি। নামেই স্কুল। ছাত্রসংখ্যা হাতে গুনে মোট সাতজন। ম্যানেজার সুপারভাইজার মিলিয়ে ডাট্টা টি কোম্পানির উপরতলার কর্মচারীর কতিপয় সন্তান সপ্তাহে দুদিন এসে হাত পাকিয়ে যায়। এতসব শিল্পকলা থাকতে
এরা হঠাৎ আঁকার স্কুলের ব্যাপারে এত উৎসাহী কেন। প্রথমদিন জলখাবার দিতে এসে সুপ্তি হাসতে হাসতে আমার এই বোকাটে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছিল। সুধাংশু দত্ত মারা যাওয়ার পর ওঁর পিসতুতো ভাই স্নেহাংশু কোম্পানি দেখছেন। যদিও খাতায় কলমে সুধাংশু দত্তের মেয়ে রীতাভরি সম্পত্তির মালিক। স্নেহাংশু দত্ত লোকটা একটু খ্যাপাটে ধরণের। কতগুলো দুষ্প্রাপ্য ছবি যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছেন। মাঝে মাঝে নিজেও ছবি আঁকেন। ব্যবসা দেখার দায়িত্ব সব ম্যানেজারদের হাতে। ওঁকে খুশি করতে ম্যানেজারদের মধ্যে শিল্প প্রচেষ্ঠার এত হুড়োহুড়ি। সুপ্তি, রীতাভরির বোন। তাকে দূর থেকে দেখে যতটা ভাল লাগে কাছে এলে ততটাই নিরাশ হতে হয়। ঘোর কৃষ্ণবর্ণা কোন মেয়ের কপাল আর দাঁত মুখ ঠেলে বেরিয়ে এলে মুখের বাকি অংশ স্বাতন্ত্র্যতা হারায়। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তবে মেয়েটি বেশ খোলামেলা স্বভাবের। তার প্রতিটি চলনবলনে দ্রূততার ছোঁয়া। প্রথম যেদিন সুপ্তি ওর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেয় মনে হয়েছিল সে যেন মধ্যযুগীয় ব্রিটিশ ক্যাস্‌ল থেকে উঠে আসা কোন রাজকণ্যা। সকালের রোদ আর হালকা হলুদ রঙের শাড়ি ওর শরীরের সাথে মিশে এক হয়ে গেছে। সপ্তাহে দুদিন শনি আর বুধ দুই বোন আলাদাভাবে আঁকা শিখত। বাকি দিনগুলো দূর থেকে ওকে দেখতাম। সুপ্তি ওর পাশে সবসময় ছায়ার মত লেগে থাকে। ছাত্রী হিসেবে সুপ্তি একদম ভাল নয়। ক্লাসের শুরুতেই সে মনযোগ হারিয়ে ফেলে। এটা সেটা প্রশ্ন করে আমায় ব্যতিবস্ত করে তোলে। রীতাভরি মাঝে মাঝে মুখ টিপে হাসে। কখনও তারও মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। একদিন আর থাকতে না পেরে সুপ্তিকে বলে ফেলি, "আঁকতে যখন ভালো লাগে না তখন শুধু শুধু বসো কেন? রঙ নষ্ট, কাগজ নষ্ট।"
আমার কথায় সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয় না। দুপুরে খাবার টেবিলে একান্তে বলে, "ঠিক ধরেছেন। আমার আঁকতে ভালো লাগে না। কিন্তু আমি না বসলে কাকাবাবু ওকে শিখতে দেবেন না। ওর ভীষণ আঁকার শখ।"
আমি আলটপকা অন্য প্রশ্ন করি, "রীতা তোমার নিজের বোন?"
সে ম্লান হাসে, "সৎ বোন। ওকে আর আমাকে দেখলে সহোদরা না ভাবাটাই স্বাভাবিক।" সেদিন অনেকক্ষণ গল্প হল। প্রত্যেক পুরোনো বনেদী পরিবারের মত দত্ত পরিবারেরও ইতিহাস আছে। এই টি এস্টেটটা আসলে রীতার দাদুর। তিনি রীতার মা সুপর্ণা দেবীকে দিয়ে যান। রীতা যখন খুব ছোট, সুপর্ণা দেবী মারা যান। এরপর সুধাংশু দত্ত তাঁর এস্টেটের ম্যানেজারের বিধবাকে দিয়ে করেন। সুপ্তি, রীতার নতুন মায়ের আগের পক্ষের সন্তান। বয়সে ওর চেয়ে কয়েকবছরের বড়।
সুপ্তি আর ড্রয়িং ক্লাসে বসত না। আঁকার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে বসে গল্পের বই পড়ত। একদিন রীতা নিঃশব্দে একটি ছোট্ট চিরকুট এগিয়ে দিল। লিখেছে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় দেখা হলে ভীষণ ভাল লাগবে। প্রস্তাবটা প্রেম নিবেদনের পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু চিঠিতে লিখে দেওয়ার মধ্যে গভীর অর্থ আছে।

৩)
আজ সকালে পরাগ এসেছে। রাকেশ কলকাতায়। ওর শত অনুরোধ সত্ত্বেও পরাগ বনজ্যোৎস্নায় থাকল না। সকালটা বিন্নাগুড়ির পুলিশ আবাসনে ওর পুরোনো ফ্ল্যাটে কাটিয়ে বিকেল নাগাদ আমায় নিয়ে স্পট দেখতে গেল, যেখানে রীতার সাথে আমার দেখা হয়েছে।
"আচ্ছা অনি, তুই চলে আসার কদিন বাদে রীতার বিয়ে হয়?"
"শুনেছিলাম মাস দুয়েক বাদে।"
"বিয়ের কথাটা কি ও নিজে তোকে জানিয়েছিল?"
"খবরটা শুনি সুপ্তির মুখে। একবছর আগে থেকে নাকি ওদের বিয়েটা ঠিক হয়ে আছে।"
"খবরটা রীতার কাছে যাচাই করেছিলি?"
"হঁযা। ও স্বীকার করেছিল।"
"তার পর?"
"আর কি? জিনিসপত্র গুছিয়ে কলকাতায় রওনা দিলাম।"
"ইফ ইউ ডোন্ট মাইণ্ড, তোদের মধ্যে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ট ছিল? আই মিন শারীরীক।"
"হ্যাঁ।"
"অনি, সেদিন বোধহয় রীতার সাথে আরও কিছুক্ষণ কাটালে ভাল করতি। হয়ত ওর কিছু বলার ছিল। যাক রীতার হাজব্যাণ্ডের সম্পর্কে কিছু বলতে পারবি?
কোথায় বিয়ে হয়েছিল?"
"ডি চৌধুরী অzাণ্ড সনসের এক মালিকের সাথে বিয়ে হয়েছে। লোকটা নাকি রীতার চেয়ে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের বড়।"
"ডি চৌধুরী মানে যাদের অzালুমিনিয়াম ইউটেন্সিল্স তৈরীর কারখানা আছে? একসময় বিশাল কারখানা ছিল। রত্নেশ্বর চৌধুরী প্রায় চল্লিশের দশকে কারখানা শুরু করেন। ফ্যাকট্রিটা ছিল বেলঘরিয়ায়। উনি মারা যাওয়ার পর ছেলেরা সব আলাদা ভাগে চৌধুরী অzাণ্ড সনস নামে ব্যবসা চালাত। যদ্দুর জানি দু একজন ছাড়া কেউ বিশেষ উন্নতি করতে পারেনি।"
আমি ব্যাজার মুখে বলি, "হবে হয়ত।"
পরাগ উঠে দাঁড়ায়, "চল শিলিগুড়ি ঘুরে আসি।"

দত্ত টি এস্টেটের আর আগের মত রমরমা ব্যবসা নেই। শ্রমিক মালিক অসন্তোষের জেরে প্রোডাকশন ইউনিট প্রায় বন্ধ। এক নামী গ্রীন টি প্রোডিউশিং ফ্যাকট্রিকে নাকি পাতা তোলার বরাত দেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকরা তাদের বাগানে ঢুকতে দেয়নি। স্নেহাংশু দত্ত নিজেও খুব অসুস্থ। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। ওঁর স্ত্রী যতটা পারেন সামলান। একসময় এই মহিলার দাপটে সুপ্তির মত মেয়ে পর্যন্ত ভয়ে কুঁকড়ে থাকত। মাত্র পাঁচ ছ বছরে কত কি বদলায়। তবে সুখের কথা মহিলা আমায় দেখে চিনতে পারলেন।
"সুপ্তি কোথায় মাসিমা?"
"সে রীতুর সাথে কলকাতায় গিয়েছিল। দু একবার চিঠি দিয়েছে বটে, তবে রীতু মারা যাওয়ার পর আর যোগাযোগ নেই। তার সাথে তোমার কি দরকার?"
এবার আমাকে খানিকটা মিথ্যার আশ্রয় নিতেই হয়, "মাসিমা, সুপ্তিদের ঘরে আমার কয়েকটা পেন্টিং পড়ে আছে। সামনের মাসে একটা এগজিবিশন করছি, ভাবলাম যদি সেগুলো পাই।"
"ওদের ঘরগুলো বিশেষ নাড়া ঘাঁটা হয়নি। লোকজন নেই কে অত করবে বল। থাকবে হয়ত।"
"আচ্ছা মেসোমশাইয়ের আঁকা কিছু ছবি ছিল না? যদি কিছু মনে না করেন সেগুলো নিয়ে যেতে পারি? আজকাল ভাল ছবির অনেক দাম পাওয়া যায়।"
এইবার বৃদ্ধা উৎসাহ দেখান, "বেশতো তুমি বরং বাড়ির চাবিটা নিয়ে যাও। ওদের ঘরগুলোর চাবিও আছে। আমি দেখি যদি তোমার মেসোর ঘর থেকে কয়েকটা আনতে পারি। ওর নিজের আঁকা ছবিগুলো হয়ত দেবে। বাকিগুলো তো সব সিন্দুকে। এখনো বালিশের তলায় চাবি রেখে ঘুমায়। কিছুতেই বিক্রি করতে দেবে না। কত সুরাহা হত বলতো।"
আমি নীরবে সম্মতি জানাই। এদের অবস্থা খুব সঙ্গীন। চাবি খুলে রীতাভরির ঘরে ঢুকি। পরাগ গেছে সুপ্তির ঘরে। দোতলা বাড়ি, সুপ্তি আর রীতা ছাড়া কয়েকজন চাকরবাকর থাকত। এখন খাঁ খাঁ করছে। রীতার ঘরে আমার একটা ছবি ওর খাটের গদির তলায় খুঁজে পেয়েছি। নুড স্কেচ। প্রথম যেদিন ওকে সম্পূর্ণভাবে পেয়েছিলাম সেদিন ভোর পর্যন্ত ছবিটা এঁকেছিলাম। মুখে এত পরিতৃপ্তি বাস্তবে হয়ত এর চেয়েও বেশী ছিল। ছবিতে ততটা ধরা যায়নি। ছবিটা বুকে চেপে চুপচাপ বসে আছি। পরাগ হনহনিয়ে ঘরে ঢোকে, "জানতাম তুই এরকম একটা কিছু করবি। দেখি কি আগলে বসে আছিস।" ছবিটা দেখাই।
"ওঃ ফাটাফাটি এঁকেছিস। এটা আমার কাছে থাক।"
"পরাগ!" পরাগ আমার মাথার চুল ঘেঁটে দেয়। "দুর পাগলা! কাউকে দেখাব না, কাজ শেষ হলে ফেরত দেব।"
আমি লজ্জিত হই, "ন্‌না, তুই এটা রাখ। সুপ্তির ঘরে কিছু খুঁজে পেলি?"
"কিছু তো পেয়েছি, আসল কাজে নাও লাগতে পারে। দেখি এখানে কিছু পাওয়া যায় কিনা।" পরাগ কয়েকমিনিটের মধ্যে ড্রয়ার আলমারি খুঁজে কয়েকটা জিনিস প্লাস্টিকের ফাইলে পুরে ফেলে। বলে, "অনি, দুএকটা পেন্টিং সঙ্গে নিয়ে নে। বুড়ি সন্দেহ করলে মুস্কিল।" রীতার মাসী তাঁর স্বামীর আঁকা পাঁচটা পোর্ট্রেট সিলেন। বিদায় নেওয়ার আগে তাঁর কাছে রীতার স্বামীর ঠিকানাটা নিলাম।
পরদিন সকালে পরাগকে ফোন করি। সে ভীষণ ব্যস্ত। জুরান্তির কাছে একটা প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার মশাই এক ছাত্রকে নাকি বেধড়ক মেরেছে। ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি। আমি জিঞ্জাসা করি, "কেন মেরেছে জানতে পারলি?"
"সব স্যাডিস্ট মেন্টালিটির লোক, বাচ্চাটা নাকি ক্লাসের বন্ধুদের ভূতের গল্প বলছিল।"
"আচ্ছা করে পিটিয়ে দে না, শয়তানি বেরিয়ে যাবে।"
"সে হবে খন।" পরাগ হালকা মেজাজে বলে। "আজ বিকেলে আমি কলকাতায় যাচ্ছি।"
"আমার কেসটা?"
"ওঃ! কেস কেস করে হেদিয়ে মরল। তোর জন্যই তো যাচ্ছি। অনি তোর আঁকার হাতটা কিন্তু বেড়ে, যা নামিয়েছিস না স্কেচটা। আমি যদি অমন আঁকতে পারতাম রে।"
আমি কেমন রগরগে গন্ধ পাই। "আছে নাকি পরাগ এমন কেউ? বলিস নি তো।"
"ধুর শালা, ক্রাইম ব্র্যাঞ্চে কাজ করি। একটা মহিলা সেক্রেটারী পর্যন্ত নেই। সরকার সবদিক থেকে মেরে রেখেছে।"
গত সাতদিনে পরাগজ্যোতি মাত্র একবার ফোন করেছিল। জিঞ্জাসা করল, "রুণা নামে কোন মেয়েকে চিনিস?"
আমি বললাম, "চিনি তো, আমার ছোট মাসীর মেয়ের ডাকনাম রুণা।"
"না সে না। আমি শিলিগুড়ির কথা বলছি, ওখানে এই নামটা শুনেছিস?"
"না। কেন বলত?"
"পরে বলব। আরেকটা প্রশ্ন চটপট ভেবে বল দেখি। তোর চলে আসার আগে ও বাড়িতে কোন ঘটনা ঘটেছিল? এমন কিছু যা রোজকার ব্যাপার থেকে আলাদা।"
"কই তেমন কিছু তো.....ইয়েস মনে পড়েছে। সুপ্তিকে কেউ উড়ো চিঠি পাঠিয়েছিল। যার সাথে রীতার বিয়ে হচ্ছে সে নাকি ভাল নয়। সুপ্তি সন্দেহ করেছিল চিঠিটা আমি লিখেছি, তাই সে আমায় চলে যেতে বলে।"
"সে কি! চলে যেতে বলেছিল।"
"সরাসরি বলেনি। বলল বিয়ের পর রীতার স্বামী কোম্পানি দেখাশোনার ভার নিতে পারেন। তিনি নাকি আঁকা নাচ গান জাতীয় শিল্পশিক্ষা পছন্দ করেন না।"
"ব্যাস ব্যাস বুঝেছি। আচ্ছা রীতার আসল মা সুপর্ণা দেবীর কোন ছবি ওই বাড়িতে দেখেছিস?"
"দেখেছিলাম একবার, ওর সাথে ওর মায়ের মুখের খুব মিল।"
"ছবিতে ভদ্রমহিলা কি রঙের শাড়ি পরেছিলেন?"
"ওরে বাবা কতবছর আগেকার ব্যাপার। একটু চিন্তা করতে দে। ছবিটা তো ব্ল্যাক অzাণ্ড হোয়াইটে ছিল। খুব সম্ভব সাদা কিংবা হালকা রঙের শাড়ি পরে থাকবেন।"
"ওকে অনি, এখন রাখছি।"
"প্লিজ পরাগ একটু বল কদ্দূর এগোলি।"
"তেমন কিছু নয়। কেসটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হোপ ফোর দা বেস্ট।"
তারপর চারদিন কেটে গেছে। সোমবার সকালে খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে পাঁচের পাতায় একটা খবরে আটকে গেলাম। চৌধুরী অzাণ্ড সনস এর অন্যতম কর্ণধার সৌরীন চৌধুরীকে পরিচারিকা নিগ্রহ এবং আত্মহত্যার প্ররোচোনার অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আমার স্মৃতি যদি ঠিকঠাক কাজ করে তবে যদ্দূর মনে হচ্ছে এই ভদ্রলোক রীতাভরির স্বামী। তাড়াতাড়ি পরাগকে ফোন করি।
সে বলে, "জানতাম তুই ফোন করবি। তবে আজ সকালে ভদ্রলোক মারা গেছেন। ম্যাসিভ হার্ট অzাটাক। শরীরের উপর যা অত্যাচার চালিয়েছে, এটা হওয়ার ছিল। ভালই হয়েছে এটা আগে হয়নি। ব্যটার কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে গেল।"
"আর রীতার ব্যাপারটা?"
"সলভ হয়ে গেছে বন্ধু। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে জুরান্তি চলে আয়। টি এস্টেটে ঢোকার আগে পুলিশের জীপ দেখতে পাবি। আমার নাম করলে পথ চিনিয়ে নিয়ে আসবে।"
"তুই কি জুরান্তিতে আছিস?"
"না বাগডোগরায়। সেইজন্যই ঘন্টাদুয়েক সময় চাইলাম।"

পৌনে এগারোটা নাগাদ রাকেশকে নিয়ে জুরান্তি পৌঁছালাম। পরাগজ্যোতির কথামত পুলিশের এক কন্সটেবল আমাদের গ্রামের ভিতর একটি কাঠের বাড়ির সামনে দাঁড় করাল। "স্যার উঁহা হ্যয়।" দেখি ঘরের সামনে পাহাড়ের ঠিক ধারে ফাঁকা জায়গায় পরাগ বসে চা খাচ্ছে। তার পাশে বসা ভদ্রমহিলা খুব চেনাচেনা মনে হল। পরাগ আমার দোনোমোনো অবস্থা বুঝতে পেরে হেসে ডাকল, "আয় বোস, একে চিনতে পারিস?"
ভদ্রমহিলা হেসে উঠতে চিনে ফেললাম। "সুপ্তি না! একদম পাল্টে গেছ, চেনাই যায় না।" সুপ্তি মুখ নামিয়ে ফেলে। ওর একঢাল চুল এখন ঘাড়ে এসে ঠেকেছে। মাথার সামনে রুপালী রেখা, চোখের কোল বসা। ওর বয়স বড়জোর তিরিশ হবে। মনে হয় যেন পঞ্চাশবছরের প্রৌঢ়া। পরাগজ্যোতি বলল, "তোর জন্য কিন্তু আরো একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। সে অবশ্য এখন আলিপুরদুয়ারে আছে।"
আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠি, "রীতাভরি!"
"ও ইয়েস। শি ইজ নাও ইন আলিপুরদুয়ার হসপিটাল। ঘাবড়াস না, মেন্টাল ট্রমার মধ্যে আছে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
রাকেশ বলে ফেলে, "কুছ সমঝ মে নহে আ রহা। ইয়ে মিস্ট্রি ক্যায়সে সলভ হুয়া?"
"বলছি ব্রাদার। তার আগে সুপ্তি এক রাউণ্ড চা দেবে প্লিজ।" সুপ্তি উঠে পড়ে। পরাগ বলে "গোটা ব্যাপারটার মধ্যে দুই ফ্যামিলির একটা ইতিহাস জড়িয়ে আছে। রত্নেশ্বর চৌধুরী আর সুপর্ণা দত্ত ভীষণ ভাল বন্ধু ছিলেন। বিয়ের আগে সুপর্ণা দেবীর সাথে এই চা বাগানের এক শ্রমিকের ছেলের প্রেম হয়। ওনার বাবা এটা মেনে নেননি। একদিন ছেলেটি রহস্যজনকভাবে খুন হয়। কে খুন করল তা জানাটা আমাদের আওতার বাইরে। এই ঘটনার কমাস বাদে সুপর্ণা দেবী একটি কণ্যাসন্তানের জন্ম দেন। তাঁর অনুরোধে রত্নেশ্বর মেয়েটিকে নিজের বাড়ি নিয়ে যান। মেয়েটির নাম ছিল রুণা। রীতাভরি আর রুণা দুজনের মুখের সাথে তাদের মায়ের মুখের মিল আছে। এই যে বাড়িটা দেখছিস এটা রুণার ঠাকুমার। সুপর্ণা এখানে মাঝেমাঝে আসতেন। এই গ্রামের অনেকে তাঁকে চেনে। মাঝেমধ্যে রত্নেশ্বর আর সুপর্ণার মধ্যে রুণাকে নিয়ে চিঠির আদানপ্রদান হত। চিঠিগুলো সুপর্ণার একটি বাঁধানো ফটোর ফ্রেমের মধ্যে লুকানো ছিল। বিয়ের কয়েকবছরের মাথায় সুপর্ণা মারা গেলেন। রত্নেশ্বর চেয়েছিলেন রুণাকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করতে, কিন্তু তা হল না। তাঁর মৃত্যুর পর মেয়েটিকে পরিচারিকার মত কাজ করানো হত। শুধু তাই নয় রত্নেশ্বরের বড় ছেলে উৎশৃঙ্খল চরিত্রহীণ সৌরীন মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোগ করত। রুণা একবার তার হাত থেকে বাঁচতে জুরান্তিতে তার ঠাকুমার বাড়িতে ওঠে। সুপর্ণা তার আসল মা জানতে না পারলেও সে ভদ্রমহিলাকে খুবই শ্রদ্ধা করত। সৌরীনের সাথে রীতভরির বিয়ে ঠিক হয়েছে জেনে সে বেনামে চিঠি লেখে। চিঠিটা সুপ্তির হাতে পৌঁছায় এবং সে ভাবে অনিকেত লিখেছে। বোনের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয় সে অনিকে তাড়ায়। বিয়ের পর সুপ্তি বোনের সাথে বেলঘরিয়ায় চলে এল। ওখানে গিয়ে বুঝতে পারে সৌরীন চৌধুরীর ব্যবসার অবস্থা খুব সঙ্গীন, শুধুমাত্র রীতার সম্পত্তির জন্য তাকে বিয়ে করেছেন। রীতা মানসিকভাবে তখন বিপর্যস্ত। এই সময় শিলিগুড়িতে দত্ত টি এস্টেট দেখতে এসে সৌরীন রুণার খোঁজ পান। এদিকে সৌরীনের শিলিগুড়ি যাওয়ার সুযোগে সুপ্তি আর রীতাভরি বেলঘরিয়া থেকে পালিয়ে যায়, কেননা তার আশঙ্কা হয়েছিল যে সে নিজে থেকে সম্পত্তি লিখে না দিলে সৌরীন তাকে খুন করবেন। সুপ্তির এক মাসী থকে গোরোখপুরে। ওরা দুজন সেখানে গিয়ে প্রায় দেড় বছরের উপর ছিল। সৌরীন শিলিগুড়িতে বসে রীতার পালিয়ে যাওয়ার খবরটা পান। তিনি গোপনে রীতার খোঁজখবর চালান, আর রুণাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বেলঘরিয়ায় নিয়ে আসেন। রুণার মুখের আদল অনেকটা রীতাভরির মত। তাকে বেলঘরিয়ায় ফিরিয়ে এনে সৌরীন মানসিক অত্যাচার চালিয়ে যান। একসময় তাকে প্যাভলভ হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। ওখানে কয়েকবছরের মধ্যে রুণা মারা যায়।
"অনি তোর মনে আছে রীতার একটা স্কেচ নিয়েছিলাম?"
পরাগ কোন স্কেচটার কথা বলছে বুঝতে পেরে আমি মাথা নামাই। সে বোধহয় এসব খেয়াল করেনি। "কলকাতায় এসে সবার আগে প্যাভলভ হাসপাতালে যোগাযোগ করি। ওদের রেজিস্টারে রুণার একটা আইডেন্টিটি মার্ক ছিল, নাকের নীচে কালো জরুল। তোর আঁকা ছবিতে কিন্তু ওই মার্ক নেই। ভাবলাম তুই যা পার্টিকুলার অমন একটা স্পষ্ট মার্ক তুই মিস করতে পারিস না। আরো শিওর হই যখন পনেরোই আগস্টে হাসপাতালের আবাসিকদের নিয়ে তোলা একটা গ্রুপ ফটোতে রুণার ছবি দেখলাম। ছবিটা এনলার্জ করিয়ে এনেছি। রীতাভরির স্কেচে তার কপালের কাছে ত্যারছা কাটা দাগ ছিল, কুমকুম ধেবড়ে গেলে যেমন হয় অনেকটা তেমন। রুণার কপালে তেমনটা ছিল না। এরপর সৌরীন চৌধুরীর ইন্টারোগেশন পারমিট বার করতে অসুবিধা হয়নি। মজার ব্যাপার কি জানিস, যে সম্পত্তির জন্য ভদ্রলোক এ নোংরামিটা করলেন, সেটা কিন্তু তাঁর ভোগে লাগল না। আজ একবছরের উপর হল টি এস্টেটে ধর্মঘট চলছে।"
রাকেশ জিঞ্জাসা করে, "লেকিন রীতা অউর উনকি বহন আপকো মিলি ক্যায়সে?"
"কিছুদিন আগে খবরের কাগজে এক প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারের বিরুদ্ধে ছাত্রকে নৃশংসভাবে মারার খবর বেরিয়েছিল তোরা পড়েছিস?"
আমার মনে পড়ে যায়, "তুই ফোনে বলেছিলি। এই জুরান্তিতেই তো হয়েছিল।"
"ইয়েস। বাচ্চাটি বন্ধুদের কাছে গল্প করেছিল সাদা শাড়ি পরা এক ভূত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যেতে দেখেছে। সেদিন রাতে ওই বাচ্চাটির সাথে তার বাবাও ছিল। লোকটি একসময় সুপর্ণাদের বাড়িতে কাজ করত। সে তার ছেলেকে বলে ওটা মৃত মেমসাহেবের ভূত। ছেলেটি বন্ধুদের কাছে সে গল্প করে ফেলে আর নির্মমভাবে শাস্তি পায়।"
"রীতাভরির মা আবার এর মধ্যে এল কোত্থেকে?" আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে প্রশ্ন করি।
পরাগ হাত তুলে আমায় থামায়, "তিনি অনেককাল আগেই মারা গেছেন। মাসছয়েক আগে সুপ্তি তার বোনের ফলস মৃত্যুর কথা জানতে পেয়ে খোঁজখবর নিয়ে রুণার বাড়ির সন্ধান পায়। দুজনে জুরান্তি চলে আসে। সে ভেবেছিল এখানে থেকে সৌরীনের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করবে। জুরান্তি আসার অনেক আগে থেকেই রীতা মানসিকভাবে অসুস্থ। রুণার ঠাকুমার কাছে সে তার মায়ের গল্প শুনত। সুপর্ণাদেবী সবসময় সাদা শাড়ি পরতেন। রীতা মাঝেমাঝে ওরকম শাড়ি পরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। গরুমারা জঙ্গলে যখন অনির সাথে তার দেখা হয় তখন সে অনিকে চিনতে পারেনি, কারণ সুস্থ ছিল না। ছত্রটির বাবার সাথে কথা বলে আমি এই এলাকায় তল্লাশি শুরু করলাম। সুপ্তিকে নিয়ে থানায় যাই আর রুণার ঠাকুমার বয়ান নিয়ে সৌরীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেস ফাইল করি। এর পরের কথা তোরা সবাই জানিস।"
আমি এসে পরাগের হাত ধরি, "রীতা সুস্থ হবে তো পরাগ?"
"সেটা তোর ওপর নির্ভর করছে অনি। ওকে আরো ভালবাস। আর নিজেকে শক্ত কর, দত্ত টি এস্টেট চালাতে হবে তো।"


বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে

মৈত্রী রায় মৌলিক

মৈত্রী রায় মৌলিক পেশায় জিওলজিস্ট, কিন্তু নেশা সাহিত্যে। ওঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনী সানন্দা, সুখী গৃহকোণ, আনন্দবাজার ইত্যাদি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।