রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

শরদিন্দুর ব্যোমকেশ

গোয়েন্দা গল্প পড়া আমার নেশা, যার ফলে আমি এখন law of diminishing return-এর চক্রে পড়েছি। নতুন গল্প পড়তে পড়তে মাঝে মধ্যে তাতে পুরনো গল্পের ছায়া দেখি, ফলে আগের মত গল্প পড়ে সেরকম ভাবে মুগ্ধ হই না। গোয়েন্দা গল্পের বিখ্যাত রচয়িতা ডরোথি এল সেয়ার্স গোয়েন্দা গল্পের একটি সংকলনের মুখবন্ধে একটা আশঙ্কা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন, কত দিন লোকে এ ধরণের গল্প লিখবে বা পড়বে! কত ভাবে চুরি করা, ধোঁকা দেওয়া বা মানুষকে হত্যা করা সম্ভব! তাই বহুবছর বাদে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৯ - ১৯৭০) ব্যোমকেশের গল্পগুলি নতুন করে পড়তে শুরু করার আগে ভাবছিলাম – কিছু কিছু ভুলে গেলেও রহস্যগুলো মোটামুটি মনে আছে; গল্পগুলো ধৈর্য ধরে শেষ করতে পারব কিনা। কিন্তু দুটো খণ্ডে মোট তেত্রিশটি গল্পই শেষ করতে পারলাম। শুধু পারলাম তাই নয় দুটো খণ্ড শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কিছুতে মনও দিতে পারলাম না।

শরদিন্দুর আগেও অনেকে বাংলায় গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন এবং পরেও লিখেছেন।  কিন্তু তাঁদের কারোর গোয়েন্দাই ব্যোমকেশের মত কালজয়ী জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে উঠতে পারে নি।  আমি এখানে শুধু বড়দের গোয়েন্দাকাহিনীর কথাই বলছি। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার খ্যাতি কিছুমাত্র কম নয়,  কিন্তু তাঁর গল্পগুলি কিশোরদের জন্যে।  নীহারঞ্জন গুপ্ত অবশ্য বড়দের ও ছোটদের উপযোগী - দুই শ্রেণীর গোয়েন্দাকাহিনীই লিখেছেন। সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ও হিন্দিতে  বেশ কিছু চলচ্চিত্রও হয়েছে। এক সময়ে ওঁর গোয়েন্দা কিরীটি রায়ের ব্যাপক পরিচিতি ছিল - এখন আর অতটা নেই।  বড়দের গল্পের অন্যান্য গোয়েন্দারা - যেমন, নারায়ণ সান্যালের পি.কে. বাসু, বার-অ্যাট-ল, বা প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরাশর বর্মা - এঁদের অনেকেই এখন প্রায় বিস্মৃত। দীনেন্দ্র কুমার রায়ের  গোয়েন্দা  রবার্ট ব্লেক এককালে অসামান্য জনপ্রিয় ছিলেন - ছোট বড় সবার কাছেই।।  'রহস্য লহরী' সিরিজের রবার্ট ব্লেকের বেশ কিছু কাহিনী ছিল কৈশোরোত্তীর্ণ পাঠকদের জন্যে। ব্লেক-এর গল্পগুলো অবশ্য মৌলিক ছিল না - বিলিতি পাক্ষিকে প্রকাশিত স্যাক্সটন ব্লেক-এর গল্প থেকে নেওয়া।  সেই ব্লেককে এখন ক'জন চিনবেন!

বড়দের জন্যে প্রাক-শরদিন্দু যুগে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন পাঁচকড়ি দে। ডিটেকটিভ গল্পের মৌতাতী ভক্ত অধ্যাপক সুকুমার সেনের মতে পাঁচকড়ি দে তাঁর লেখায় প্রধানত: উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও,পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ।  তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। (অনুসন্ধিৎসু পাঠকরা গল্পের নামের ওপর ক্লিক করে ওঁর ‘নীলবসনাসুন্দরী’‘হত্যাকারী কে?’ পড়ে নিতে পারেন।)  শরদিন্দু নিজে প্রচুর বিদেশী বই পড়ার পর ব্যোমকেশের কাহিনী রচনায় হাত দিয়েছিলেন। পাঁচকড়ি দের লেখাও নিশ্চয় পড়েছিলেন, নইলে রহস্য করে ‘চিত্রচোর’ গল্পে  অজিতের ‘হত্যাকারী কে?’ প্রশ্নের উত্তরে  ব্যোমকেশকে দিয়ে ‘পাঁচকড়ি দে’ বলাতেন না। আবার  সেই মজা করেই প্রতুল চন্দ্র গুপ্তের একটা চিঠির উত্তরে লিখেছিলেন...’ আপনি স্বনামধন্য দেবেন্দ্রবিজয় বসু মহাশয়ের (পাঁচকড়ি দে-র গোয়েন্দা) সাক্ষাৎ পেয়েছেন। আপনি ধন্য ..... ব্যোমকেশের নাম শোনেন নি তিনি এ আর বিচিত্র কি। ঈগল পাখি কি আর টুনটুনির নাম জানে!’ প্রসঙ্গত দেবেন্দ্রবিজয়বাবুর পদবী বসু ছিল না, ছিল মিত্র। তাঁর দাদাশ্বশুর ছিলেন super-sleuth অরিন্দম বসু! 

শরদিন্দু বেশীর ভাগ ব্যোমকেশের কাহিনী লিখিয়েছেন অজিতকে দিয়ে। অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যোমকেশ বক্সীর প্রথম পরিচয় হয় ১৩৩১ বঙ্গাব্দে । কলকাতার চীনাবাজার অঞ্চলে কয়েকটা খুনের কিনারা করতে ছদ্মনাম নিয়ে ব্যোমকেশ ঐ অঞ্চলেরই একটি মেসে অজিতের রুমমেট হিসেবে কিছুদিন ছিলেন - সেই থেকেই ওঁদের দুজনের বন্ধুত্বের শুরু। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের (ব্যোমকেশ ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দা কথাগুলো পছন্দ করতেন না, নিজেকে সত্যান্বেষী বলে পরিচয় দিতেন) প্রকৃত পরিচয় অজিত পেয়েছিলেন রহস্য উদঘাটনের পরে। সেই সময়ে ব্যোমকেশ তাঁর পরিচারক পুঁটিরামকে নিয়ে হ্যারিসন রোডে একটি বাড়ির তিন তলায় ভাড়া থাকতেন। ব্যোমকেশের অনুরোধে মেস বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সেখানেই অজিত এসে ওঠেন। ব্যোমকেশের বিয়ের পরেও বহুদিন অজিত সেখানেই ছিলেন। ফলে ব্যোমকেশের নানান কীর্তিকাহিনী অজিতকে দিয়ে লেখানোটা শরদিন্দুর পক্ষে কঠিন হয় নি।

গল্প পরিবেশন করার এই স্টাইল গোয়েন্দাকাহিনীর বহু লেখকই ব্যবহার করেছেন। আধুনিক ডিটেকটিভ গল্পের জনক হিসেবে যাঁকে অনেকে সম্মান দেন, সেই এডগার অ্যালেন পো ঠিক এই ভাবেই তাঁর প্রথম রহস্যকাহিনী ‘মার্ডার ইন দ্য রু মার্গ’ লিখেছিলেন। পো-র ফর্মুলা ছিল 'গোয়েন্দা' ডুপিনের একজন মোটামাথা ভক্ত বন্ধু (সেই লেখকের নাম  অবশ্য আমরা কেউ জানি না) তার কীর্তিকাহিনী লিখবে। পো যখন গল্পটা লিখেছিলেন, তখন অবশ্য গোয়েন্দা বা 'ডিটেকটিভ' শব্দটা ডিকশানারিতে ছিল না। কিন্তু ফর্মুলাটা কালজয়ী হয়েছে। এরই দৌলতে শার্লক হোমস ও ওয়াটসন, মার্টিন হিউইট ও ব্রেট,  এরক্যুল পয়রো ও ক্যাপ্টেন হেস্টিংস, ফিলো ভান্স ও ভ্যান ডাইন, নিরো উলফ ও আর্চি গুডউইন-এর মত জনপ্রিয় জুটিদের পাওয়া গেছে।

কেন সবাই এই ফর্মুলা ব্যবহার করেছেন? কারণ এক্ষেত্রে ‘আসল লেখক’ গল্পের পেছনে লুকিয়ে থেকে চমৎকার ভাবে এই চরিত্রগুলোকে পরিচালনা করার সুযোগ পান। অপেক্ষাকৃত স্বল্পবুদ্ধি কাহিনীকারদের দিয়ে এদিক ওদিক থেকে কিছু কিছু সূত্র  পাঠকদের ধরিয়ে দিয়ে তিনি পাঠকদের আস্থা অর্জন করেন।  কিন্তু  সূত্রগুলো জোড়া লাগানোর পদ্ধতিটা সযত্নে গোপন রাখেন শেষে গোয়েন্দার মুখ দিয়ে বলানোর জন্যে।  আরেকটা বাড়তি সুবিধাও এই format-এ আছে। রহস্য উদঘাটনের পরে  গোয়েন্দাদের এই গুণমুগ্ধ কাহিনীকারদের দিয়ে গোয়েন্দার বুদ্ধিমত্তার ভুরি ভুরি প্রশংসা  সহজেই করানো যায়, লেখক নিজে সেই কাহিনীকার হলে প্রকারান্তরে নিজের বুদ্ধিরই প্রশংসা করা হবে! মন্তব্যটি লেখিকা ডরোথি সেয়ার্সের – হুবহু ঠিক এইভাবেই অবশ্য বলেন নি।

এবার দেখা যাক, কারা এই কাহিনীকার? কোনান ডয়েল কাহিনীকার ওয়াটসনকে করেছেন একজন ডাক্তার,  আগাথা ক্রিস্টি আর্থার হেস্টিংসকে করেছেন অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি ক্যাপ্টেন,  রেক্স স্টাউট আর্চি গুডউইনকে করেছেন বেতনভুক অ্যাসিস্ট্যান্ট। অর্থাৎ এঁদের কেউই লেখক নন। সেগুলো কি ইচ্ছাকৃত? গোয়েন্দাকাহিনীকে সে যুগে – এমন কি এযুগেও - সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত করা হয় না। তাই এসব কাহিনীকারদের লেখায় সাহিত্যরস না থাকলে সমস্যা নেই - গল্পের রহস্যটা ঠিক ঠাক লিখতে পারলেই যথেষ্ট! অন্যপক্ষে   শরদিন্দু অজিতকে করেছেন লেখক। সুতরাং ব্যোমকেশের কাহিনীতে যে সাহিত্যের উপাদান থাকবে - শরদিন্দু সেটা বোধহয় প্রথমেই ঠিকই করেছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা গল্পের কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যে কি সাহিত্যসৃষ্টি করা সম্ভব? গোয়েন্দা গল্পের ধারা মোটামুটি ভাবে তিনটে ভাগে বিভক্ত।  প্রথমে ভাগে থাকে  সমস্যাটা কি , দ্বিতীয় ভাগে খোঁজ চলে সমস্যার সমাধান সূত্রের, শেষ পর্বে সমাধান (দোষীকে খুঁজে বার করা , হারানো রত্ন  পুনরুদ্ধার, ইত্যাদি) এবং কী ভাবে সেটা করা হল তার বর্ণনা।   অর্থাৎ একটা পরিণতির দিকে গল্পকে এগোতেই হবে – কল্পনা লাগামছাড়া হলে চলবে না।  একদিক থেকে এটাকে ছোটদের রূপকথার সঙ্গে তুলনা করা যায়... অচিন দেশের রাজপুত্র ও রাজকন্যা।  ওদের বিয়ে হোক সবাই চায়,  অথচ কত সমস্যা!  শেষে সব সমস্যা জয় করে রাজপুত্রর রাজকন্যাকে পাওয়া – তারপর তারা  happily live everafter! 

অন্য গোয়েন্দা লেখকরা যাই ভাবুন না কেন,  শরদিন্দু নাকি  এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন

‘রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্য হিসেবে স্থান নিশ্চয়ই পেতে পারে । গল্পের বুনিয়াদ তো একই – মনুষ্য চরিত্র আর মানব ধর্ম । শুধু একটু রহস্যের গন্ধ আছে বলে সেটা নিম্ন মানের হবে কেন । নোবেল পুরস্কার পাওয়া অনেক লেখকও এই ধরনের গল্প লিখেছেন । ভাষা হল গল্পের মিডিয়াম, সেই মিডিয়াম যদি ভালো না হয় তবে গল্প বলাও ভালো হবে না । গোয়েন্দা গল্প হলেও সেটাও একটা গল্প বই তো নয় । সুতরাং গল্পকে মনোজ্ঞ করে বলতে হবে ।‘

'ব্যোমকেশের ডাইরী' বইয়ের ভূমিকায় শরদিন্দু গোয়েন্দা গল্প সম্পর্কে নিজের এই মনোভাব আবার লিখিত ভাবে স্পষ্ট করেছিলেন।
'ডিটেক্টিভ গল্প সম্বন্ধে অনেকের মনে একটা অবজ্ঞার ভাব আছে - যেন উহা অন্ত্যজ শ্রেণীর সাহিত্য, আমি তাহা মনে করি না। Edgar Allen Poe, Conan Doyle, G.K. Chesterton যাহা লিখিতে পারেন, তাহা লিখিতে অন্তত আমার লজ্জা নাই।‘

বেশ কিছু গল্প অজিতকে দিয়ে লেখানো পর শরদিন্দু নিজেই ব্যোমকেশের কাহিনী লেখার ভার নিয়েছিলেন। 'রুম নম্বর দুই' থেকে চলিত ভাষায় এই পর্বের শুরু। মনে হয় শরদিন্দু কাহিনী নিবেদনে একটু স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। গল্পের চরিত্রের মধ্যে না থেকে লেখক হওয়ার একটা সুবিধা তো আছে - চরিত্ররা কে কি ভাবছে – স্বচ্ছন্দে গল্পকার হিসেবে সেগুলো ঢোকানো যায় - ‘মনে হয়’ ‘বোধ হয়’ এগুলো আর লাগাতে হয় না। শরদিন্দুর বহু-আলোচিত কাহিনী 'শজারুর কাঁটা' এই পর্বের লেখা।  কিন্তু শোনা যায়, অজিতকে তাড়িয়ে দেওয়ায় অনেক পাঠক ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

ব্যোমকেশ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা যেতে পারে। পুরনো দিনের গোয়েন্দারা কেউই  ঠিক সাধারণ ‘স্বাভাবিক’ মানুষ ছিলেন না। সৃষ্টিকাররা এঁদের তৈরি করতেন একটু অন্য ধাঁচে। এডগার অ্যালেন পো-র ডুপিন ছিলেন খ্যাপা।  দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতর মোমবাতি জ্বালিয়ে থাকতেন, মুখে থাকত মিয়েরশাম পাইপ। রাস্তায় ওঁকে বেরোতে দেখি রাত্রে। লোকের কথা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। সেই শক্তি ব্যবহার করে চেনা জানারা মনে মনে কে কি ভাবছে, সেটা বলে দিয়ে সবাইকে তাজ্জব বানাতেন! শার্লক হোমসও ডুপিনের আদলেই তৈরি। উৎকেন্দ্রিক প্রকৃতির লোক, আসক্তি কোকেন-এ, নেশা বেহালা বাজানো। ওঁরও আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে তাঁর সম্পর্কে নানান তথ্য দিয়ে তাক লাগিয়ে দেবার প্রবণতা ছিল। অন্যরা হিমসিম খেলেও নিজের বুদ্ধি নিয়ে অসাধারণ গর্ব – সবকিছুই ওঁর কাছে ‘এলিমেন্টারি’! শার্লক হোমসকেও কোনও মতেই সাধারণ স্বাভাবিক একটি মানুষ বলা চলে না।   এঁদের কথা ভেবেই আগাথা ক্রিস্টি এ্যরকুল পয়রোকে বানিয়েছিলেন আত্মম্ভরি, ও অহংকারী  অসহ্য চরিত্রের একটা  লোক যিনি সব সময়ে নিজেকে ফিটফাট করে রাখতে ব্যস্ত, সযত্নে গোঁফে মোম লাগিয়ে নিজের মস্তিষ্কের গ্রে-সেল নিয়ে গর্ব করা যাঁর স্বভাব!

এই ডিটেকটিভরা শুধু অতিমানব ছিলেন তা নয়, এঁদের কারো কারো বয়সও বাড়ে নি!  ডুপিনের জীবন অবশ্য ৪ বছরে তিনটি গল্পেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৪৫ বছর ধরে পয়রোকে নিয়ে লিখেও আগাথা ক্রিস্টি পয়রোর বয়স সে ভাবে বাড়িয়েছেন বলে মনে পড়ছে না। একই কথা সত্য নিউ ইয়র্কবাসী নিরো উলফের ক্ষেত্রেও। অসম্ভব মোটা নিরো উলফ উৎকৃষ্ট খাওয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, আর নেশা ছিল বাড়ির দশ হাজার রকমের অর্কিড গাছের তদারকি। এর মধ্যে পৃথিবী পালটালেও ৪১ বছর ধরে তিনি ৫৬ বছর বয়সেই আটকেছিলেন।

অন্যপক্ষে ‘সত্যান্বেষী’ গল্পে শরদিন্দু অজিতকে দিয়ে ব্যোমকেশের বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে ... ..‘তাহার বয়স বোধকরি তেইশ-চব্বিশ হইবে, দেখিলে শিক্ষিত ভদ্রলোক বলিয়া মনে হয়। গায়ের রঙ ফরসা, বেশ সুশ্রী সুগঠিত চেহারা-মুখে চোখে বুদ্ধির একটা ছাপ আছে।’ ব্যোমকেশ একজন আপাদমস্তক মধ্যবিত্ত বাঙালী ভদ্রলোক – শিক্ষিত, মেধাবী, সহৃদয়। কথাবার্তা কম বলেন,  একটু আধটু সিগারেট খাওয়া ছাড়া যাঁর অন্য কোনও নেশা নেই। আর দশটা ভদ্রলোকের থেকে ব্যোমকেশকে আলাদা করে দেখানোর কোনও চেষ্টা শরদিন্দু করেন নি। ব্যোমকেশের অসাধারণত্ব শুধু প্রকাশ পেয়েছে সত্য-উদ্ঘাটনের ক্ষমতায় এবং নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাসে। দ্বিতীয়টা বোধহয় এসেছে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ‘আদিম রিপু‘ গল্পে আমরা জেনেছি, ব্যোমকেশের বাবা ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক। মাত্র সাতেরো বছর বয়সে ব্যোমকেশ পিতৃহীন হন। মাও মারা যান তার কিছু পরেই। স্কলারশিপের টাকায় পড়াশুনো করে বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পাশ করেন। অর্থাৎ নিজের পায়েই নিজেকে দাঁড়াতে হয়েছে। এটুকু চারিত্রিক বিশেষত্ব ছাড়া ব্যোমকেশ একজন সামাজিক বঙ্গ সন্তান – রাস্তায় দেখলে আর দশ জন থেকে আলাদা করা যাবে না। স্বাভাবিকত্ব সম্পূর্ণ করতে সময়ের সঙ্গে তাল রেখে শরদিন্দু ব্যোমকেশের বয়স বাড়িয়েছেন । ‘অর্থমনর্থম্‌’ গল্পে ২৯ বছর বয়সে ব্যোমকেশকে প্রেমে পড়িয়েছেন, পরে বিয়ে করিয়েছেন এবং ‘দুর্গরহস্য’-এর শেষে সন্তানের পিতাও করেছেন। ব্যোমকেশের বিবাহ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, ইদানীং ব্যোমকেশকে নিয়ে নতুন করে সিনেমা টিভি সিরিজ ইত্যাদি হচ্ছে। পত্রিকায় দেখলাম  'ব্যোমকেশ ফিরে এল' সিনেমার পরিচালক অঞ্জন দত্ত ‘বর্তমান’ পত্রিকার এক সাংবাদিককে বলেছেন, 'পৃথিবীর একমাত্র বিবাহিত গোয়েন্দা ব্যোমকেশ।' ধরে নিচ্ছি সাংবাদিক ভুল শুনেছিলেন, কারণ গল্পের বহু  বিখ্যাত  গোয়েন্দাই বিবাহিত ছিলেন। নায়ও মার্শের গোয়েন্দা রডরিক এলেইন-এর স্ত্রী ছিলেন চিত্রশিল্পী আগাথা ট্রয়, ডরোথি সেয়ার্সের  লর্ড পিটার উইম্‌সির স্ত্রী ছিলেন হ্যারিয়েট ভাইন...। অতদূরে যাবার দরকার কি, নীহাররঞ্জন গুপ্তের খ্যাতনামা গোয়েন্দা বঙ্গসন্তান কিরীটী রায় বিবাহিত ছিলেন। স্ত্রী কৃষ্ণাকে নিয়ে টালিগঞ্জের বাড়িতে থাকতেন।

ব্যোমকেশকে নিয়ে শরদিন্দু  মোট ৩৩টি কাহিনী লিখেছেন।  শরদিন্দু অমনিবাসে ব্যোমকেশ কাহিনীর গল্পগুলির মধ্যে  প্রথম  দেখানো হয়েছে সত্যান্বেষী গল্পটিকে। সময়পঞ্জী অনুসারে পথের কাঁটা (৭ আষাঢ়, ১৩৩৯) ও সীমন্ত-হীরা (৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯) সত্যান্বেষীর (২৪ মাঘ, ১৩৩৯) আগে লেখা। এ বিষয়ে শরদিন্দু বলেছেন,

'এ দু’টি গল্প (পথের কাঁটা ও সীমন্ত-হীরা) ব্যোমকেশকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার কথা মনে হয়। তখন সত্যান্বেষী গল্পে ব্যোমকেশ চরিত্রটিকে এস্টাব্লিশ করি। পাঠকদের সুবিধার জন্যে অবশ্য সত্যান্বেষীকেই ব্যোমকেশের প্রথম গল্প ধরা হয়।'

ব্যোমকেশকে নিয়ে শরদিন্দুর প্রথম বই, 'ব্যোমকেশের ডায়রী' প্রকাশিত হয় ১৩৪০ সনে। প্রকাশক ছিলেন পি সি সরকার এন্ড সন্স। তাতে মোট চারটি গল্প ছিল। ওপরের তিনটি আর 'মাকড়সার রস' (১৫ বৈশাখ, ১৩৪০)। এই চারটি ছাড়া ব্যোমকেশকে নিয়ে গল্প-তালিকায় আছে - অর্থমনর্থম্‌ , চোরাবালি, অগ্নিবাণ, উপসংহার, রক্তমুখী নীলা, ব্যোমকেশ ও বরদা, চিত্রচোর, দুর্গরহস্য, চিড়িয়াখানা, আদিম রিপু, বহ্নি-পতঙ্গ, রক্তের দাগ, মণিমন্ডল, অমৃতের মৃত্যু, শৈলরহস্য, অচিন পাখি, কহেন কবি কালিদাস, অদৃশ্য ত্রিকোণ, খুঁজি খুঁজি নারি , অদ্বিতীয়, মগ্ন-মৈনাক, দুষ্টচক্র, হেঁয়ালির ছন্দ, রুম নম্বর দুই, ছলনার ছন্দ, শজারুর কাঁটা, বেণীসংহার, লোহার বিস্কুট ও বিশুপাল বধ (অসমাপ্ত)। শেষের গল্পটি শরদিন্দু শেষ করে যেতে পারেন নি।  ব্যোমকেশের অমনিবাসের দ্বিতীয় খণ্ডে শোভন বসু লিখেছেন –

"১৩৩৯ সন থেকে ১৩৪৩ সন পর্যন্ত ব্যোমকেশকে নিয়ে দশটি গল্প লেখার পর দীর্ঘকাল শরদিন্দুবাবু সত্যান্বেষীর কথা ভাবেন নি পাঠকদের আর হয়ত ব্যোমকেশকে ভাল লাগবে না, এই ভেবে ব্যোমকেশকে গোয়েন্দাগিরি থেকে অব্যাহতি দেন। এর পর প্রায় পনেরো বছর কেটে গেছে। এও সময় একবার তিনি বোম্বাই থেকে কলকাতায় আসেন। পরিমল গোস্বামীর বাড়ির ছেলেমেয়েরা  তাঁর কাছে অভিযোগ করেন – কেন আপনি ব্যোমকেশকে নিয়ে আর লিখছেন না? এ কথা শুনে তাঁর মনে হয় এখনকার ছেলেমেয়েরা তাহলে ব্যোমকেশকে চায়। প্রধানত এই তরুণ পাঠকদের অনুরোধেই শরদিন্দুবাবু আবার ডিটেকটিভ গল্পে হাত দেন; দীর্ঘ বিরতির পর ১৩৫৮ সনের ৮ই পৌষ ‘চিত্রচোর’ গল্পটি লেখেন।"

বাঙালী পাঠকদের গোস্বামী পরিবারের সেই ছেলেমেয়েদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

সময়পঞ্জীর হিসেবে যেটা ব্যোমকেশের প্রথম গল্প, সেই ‘পথের কাঁটা’  গল্পে হত্যা করার অস্ত্রটি নিঃসন্দেহে অভিনব। রাস্তায় কোনও লোককে গ্রামোফোনের পিন দিয়ে হত্যা করা কী করে সম্ভব সেটা নিয়ে একাধিক জায়গায় আলোচনা হয়েছে। এমন কি ইন্টারনেটে একজন অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন এটা সম্ভব। সেই অঙ্ক ভুল না ঠিক সে বিচারে না গিয়ে এটুকু বলা যায় এটা শরদিন্দুর অলীক কল্পনা ছিল না। তিনি নিজে হয়ত অঙ্ক কষেন নি। যদ্দুর জানি তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না, বি. এ পড়ে আইন পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে নিশ্চয় ওঁর ঔৎসুক্য ছিল এবং দায়িত্বশীল লেখক হিসেবে যে খোঁজখবর করা উচিত নিঃসন্দেহে সেটা তিনি করেছেন।  ‘অগ্নিবাণ’ গল্পে হত্যা করার যে  অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে – আপাতদৃষ্টিতে সেটাও বিজ্ঞানের আওতার বাইরে নয়। এ বিষয় নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা এ ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারবেন। ‘শজারুর কাঁটা’-তে – কাঁটাটাকে তিনি খুনের অস্ত্র করেছেন। শজারু নিজে আত্মরক্ষার্থে এই কাঁটা দিয়ে জন্তু জানোয়ারদের কাবু করলেও, আগে কোনও গল্পে মানুষের ‘অস্ত্র’ হিসেবে এর ব্যবহার দেখি নি। শজারু কাঁটার বৈশিষ্ট্য সহজে চামড়া ভেদ করে; কিন্তু ভেদ করার পর সেটাকে বার করাটা সহজ নয়। এর বাকলিং স্ট্রেংথ আছে, অর্থাৎ লম্বালম্বি বেশ খানিকটা চাপ বেঁকে না গিয়েও নিতে পারে।  ইদানীং দেখছি চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণা চলছে কী ভাবে  এর এই বৈশিষ্ট্যকে ইঞ্জেকশনের সূচ এবং টিস্যু আটকানোর কাজে ব্যবহার করা যায়। গ্রামাফোনের পিন বা শজারুর কাঁটার ব্যবহার সেন্সেশানাল ঠিকই, কিন্তু শরদিন্দু কল্পনার ফানুস ওড়ান নি।

শরদিন্দু  কি বিদেশী লেখকের প্লট ব্যবহার করেছেন বা কোনও লেখকের ধারা অনুসরণ করে লিখেছেন?  এর উত্তর দিতে  ডরোথি সেয়ার্সের কথাতেই ফিরে আসতে হয় – কত ভাবে একজনকে খুন করা যায়, ধোঁকা দেওয়া যায় বা চুরি করা যায়? শরদিন্দু গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেছেন পত্রপত্রিকা এবং নানান প্লট  থেকে। কিন্তু শরদিন্দু শরদিন্দুই।  ওঁকে কোনও ধারা অনুসরণ করতে হয় না। শরদিন্দুর অসামান্য ক্ষমতা ছিল দেশী ছাঁচে বিষয়বস্তুকে ঢেলে সাজানো, যার জন্যে ‘ঝিন্দের বন্দী’ পড়লে মনে হয় ওটা একেবারেই দেশজ। ব্যোমকেশ প্রসঙ্গে বলা যায়, যাঁরা গোয়েন্দা গল্পের অভিজ্ঞ পাঠক এবং কোনান ডয়েলের ‘অ্যাডভেঞ্চার অফ সিক্স নেপোলিয়ান পড়েছেন’ - ‘সীমান্তহীরা’  রহস্যটা তাঁরা কিছুটা অনুমান করতে পারবেন। মনে হয়  তাঁদের কথা ভেবেই শরদিন্দু এতে একটা টুইস্ট দিয়েছেন।   ‘ক্লোজড ডোর মিস্ট্রি’ পর্যায়ের গল্প ‘মাকড়সার রস’-এ পাহারা থাকা সত্ত্বেও নন্দদুলালবাবু তাঁর নেশার খোরাক পাচ্ছেন কোত্থেকে? একজন অদৃশ্য কেউ নিশ্চয় এই খোরাকটা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কে এই অদৃশ্য মানুষ? এখানে জি কে চেস্টারটনের ‘ইনভিজিবল ম্যান’-এর ছায়া চোখে পড়বে। 'শৈল রহস্যে' পাঠকদের একটু অবাক করে দিয়েই শরদিন্দু প্রেতের আমদানি করেছেন - যে প্রেত কিছুটা অন্তত সাহায্য করেছে অনুসন্ধানে!   এক কালে মিসেস হেনরি উড আর কোনও উপায় খুঁজে না পেয়ে রহস্য সমাধানে এরকম আধিভৌতিক ব্যাপার আমদানি করতেন, কিন্তু তা বলে ব্যোমকেশ! কেউ কেউ ব্যোমকেশের ‘চোরাবালি’ ও ‘অর্থমনর্থম’-এর সঙ্গে শার্লক হোমসের ‘দ্য অ্যাবি গ্রাঞ্জ’ বা ব্যোমকেশের ‘সত্যান্বেষী'র সঙ্গে হোমসের ‘দ্য এম্পটি হাউস’-এর কিছু কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পান। গল্পে এ ধরনের ছোটখাটো সাদৃশ্য না পাওয়াটাই আশ্চর্য। গল্পের নিজস্ব প্রয়োজনেই অনেক কিছু গল্পধারায় যোগ হয়, তার উৎস নিয়ে সবসময়ে সচেতন থাকা যায় না।

ব্যোমকেশের কাহিনী পড়ে একটা জিনিস মনে হয়, শরদিন্দু এই কাহিনীগুলো সব শ্রেণীর পাঠকের জন্যে লেখেন নি। তিনি ব্যোমকেশকে করতে চেয়েছেন ইনট্যালেকচুয়াল ডিটেকটিভ।  গল্পগুলিতে রহস্য সমাধানের জন্য ব্যোমকেশ মূলত পর্যবেক্ষণ ও নিজের ক্ষুরধার বুদ্ধির সাহায্য নিয়েছে। যাকে বলে যুক্তিসঙ্গত অনুমান, সেটিই ব্যোমকেশের মূল অস্ত্র। তাই ব্যোমকেশের গল্পগুলো হচ্ছে বুদ্ধি-উদ্রেককারী – রোমহর্ষক নয়।  বন্দুক চালাতে জানলেও ব্যোমকেশকে শরদিন্দু পকেটে রিভলভার নিয়ে ঘোরান নি, গুলিবৃষ্টি উপেক্ষা করে আততায়ীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কাবু করানোর চেষ্টা করেন নি।  অথচ বিভীষিকাময় বা রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করার পূর্ণ ক্ষমতা শরদিন্দুর ছিল। দুয়েকটা গল্পে তার কিছু কিছু উদাহরণও আমরা পেয়েছি। কিন্তু সেটা এসেছে গল্পের নিজস্ব দাবীতে। গল্প উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও নির্ভেজাল সাহিত্যমঞ্চ থেকে নিজেকে তিনি সরান নি। বহু চিত্রনাট্য নিজে লিখলেও ব্যোমকেশের কাহিনী লেখার সময়ে সেই ধাঁচে তিনি গল্পকে সাজান নি। তাই পড়ার সময়ে ছবির পর ছবি চোখে ভেসে ওঠে না। সেগুলো পাঠককে সৃষ্টি করে সাজাতে হয় মগজের ভেতরে। এই কারণেই ব্যোমকেশের অনুরাগী পাঠক হতে হলে, তাঁকে কিছুটা চিন্তাশীল হতে হয়। 

আরও একটা কথা, এই ধরণের বুদ্ধি উদ্রেককারী গল্প পর পর লেখা এবং প্রত্যেকটি  গল্পে পাঠকদের আকর্ষণ ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। ব্যোমকেশের কোনও গল্পই দীর্ঘ নয় - অমনিবাসে সবচেয়ে দীর্ঘ গল্প ‘চিড়িয়াখানা’ও মাত্র ৮৭ পাতার। এই স্বল্প পরিসরে প্লটের জটিলতা সৃষ্টি করা, মাঝে মধ্যে red herring ঢোকানো এবং পরিশেষে চমকপ্রদ সমাপ্তি উপহার দেওয়া সাধারণ লেখকের পক্ষে সম্ভব নয়।  তবে ওঁর গল্পের স্বাদ শুধু প্লটের জটিলতা থেকে আসে আসে নি। এসেছে চিত্তাকর্ষক করে ওঁর গল্প বলার ক্ষমতা, চরিত্রচিত্রণে  নিপুণতা এবং সব ছাপিয়ে ওঁর ভাষার মাধুর্য থেকে - যা সুকুমার সেনের কথায় ‘স্বচ্ছ, পরিমিত, অনায়াসসুন্দর’।  প্লটের বৈচিত্র্য বা রহস্যজালের সূক্ষ্মতা ব্যোমকেশ কাহিনির নিশ্চয় একটা সম্পদ। কিন্তু গল্পগুলির আর একটা আকর্ষণ হল এগুলি গড়ে উঠেছে সমকালীন বাঙালী সমাজের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে। তাই মনে হয় ওগুলি সব আমাদেরই গল্প – বিশ্বাসযোগ্য। পরিস্থিতির মধ্যে যদি কিছু অস্বাভাবিকতাও থাকে – সেটাও গ্রহণযোগ্যতা হারায় না।  উদাহরণ হল, আবার সেই চিড়িয়াখানা গল্পটি।  একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিচিত্র ধরণের লোকেদের তাঁর কলোনীতে আশ্রয় দিয়েছেন – যে সব লোকদের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে জীবিকা অর্জন সম্ভব নয়! এদের কেউ প্রতিবন্ধী, কারোর অতীতের জীবনে দাগ আছে। তাঁরা এই আশ্রয় ও অল্প কিছু হাতখরচের বিনিময়ে কলোনীর ফুলের চাষ ও অন্যান্য কাজকর্মে সাহায্য করে।  এক দিক থেকে এই কলোনী চিড়িয়াখানা - আজব জায়গা, আজব মানুষ। আবার তারা আজবও নয় - আমাদের সমাজেই বিভিন্ন জায়গায় এদের খুঁজে পাওয়া যাবে। এই চিড়িয়াখানাতে  এক উৎপাত শুরু হয়েছে –রাত্রিবেলা  কেউ মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ ছুঁড়ছে বা রেখে যাচ্ছে ।  অবসরপ্রাপ্ত জজসাহেব ব্যোমকেশের সাহায্য চান জানতে  কে সেটা করছে?  সেই সঙ্গে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই সন্ধান চান সিনেমার অভিনেত্রী একটি স্ত্রীলোকের যে দুয়েকটা বাজে সিনেমায় অভিনয় করে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে! শুরু হয় রহস্যের ঘনঘটা। গল্পটির আঙ্গিকে অভিনবত্ব ও আধুনিকত্ব - দুটোই পাঠকদের চোখে পড়বে। সত্যজিৎ রায় এই গল্পের ওপরই ভিত্তি করে 'চিড়িয়াখানা' সিনেমাটি করেন। উত্তমকুমার ব্যোমকেশের ভূমিকায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ১৯৬৭ সালে জাতীয় পুরস্কার পান, সত্যজিৎ পান শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান। সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য সিনেমা নিয়ে যত আলোচনা হতে দেখা যায় - এটি নিয়ে সেরকম চোখে পড়ে না। ব্যোমকেশ থাকলে কারণটা জেনে নেওয়া যেত।

ব্যোমকেশের কাহিনীগুলির  মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই যেটা  এসেছে সেটা হল ব্যোমকেশের ‘বাঙালীয়ানা’। ব্যোমকেশের ব্যবহার ও আচরণের মধ্যে  অনেক বাঙালী পাঠক নিজেকে খুঁজে পাবেন। যেমন, বছরের পর বছর স্ত্রীর দুষ্টচরিত্রের জারজ সন্তানের হাতে বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর জীবন যখন একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তখন বৃদ্ধ তাকে হত্যা করলেন। ব্যোমকেশের কাছে ধরা পরের সেই বৃদ্ধ যখন স্ত্রীকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ চাইছেন, দেখা যাচ্ছে ব্যোমকেশের সেটা দিতে কোনও  আপত্তি নেই। ‘কাজটা হয়ত আইনসঙ্গত হচ্ছে না। কিন্তু আইনের চেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে ন্যায়ধর্ম।‘ স্ত্রী সত্যবতী ও অজিত তাতে সায় দিচ্ছে। বহু পাঠকও সায় দেবেন।

অন্য আরেকটি গল্পে এক দুশ্চরিত্র বৃদ্ধকে তার পোষ্যপুত্র খুন করে। সেই পোষ্যপুত্র ব্যোমকেশের হাতে ধরা পড়ার পর বলল, যে দণ্ড ব্যোমকেশ দেবেন তা নিতেই সে প্রস্তুত। ব্যোমকেশের লোকটিকে মুক্তি দিতে আপত্তি নেই, কিন্তু শর্ত হল লোকটিকে তার নিজের পিতৃপরিচয় জানতে হবে। এই বলে ব্যোমকেশ লোকটিকে জানাল যিনি পুষ্যি নিয়েছিলেন তিনিই লোকটির আসল পিতা। এই সত্যটা জেনে লোকটি -

মড়ার মত মুখ করিয়া উঠিয়া বসিল, ভগ্নস্বরে বলিল, 'ব্যোমকেশবাবু, এর চেয়ে আমার ফাঁসি দিলেন না কেন? রক্তের এ কলঙ্কের চেয়ে সে যে ঢের ভাল ছিল।'
ব্যোমকেশ তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া দৃঢ় স্বরে বলিল, 'সাহস, আনুন...। রক্তের কলঙ্ক কার নেই? ভুলে যাবেন না যে, মানুষ জাতটার দেহে পশুর রক্ত রয়েছে। মানুষ দীর্ঘ তপস্যার ফলে রক্তের বাঁদরামি কতকটা কাটিয়ে উঠেছে, সভ্য হয়েছে, ভদ্র হয়েছে, মানুষ হয়েছে। চেষ্টা করলে রক্তের প্রভাব জয় করা অসাধ্য নয়। অতীত ভুলে যান, অতীতের বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। আজ নতুন ভারতবর্ষের নতুন মানুষ আপনি, অন্তরে বাহিরে আপনি স্বাধীন।'

খুনিকে এই ভাবে ছেড়ে দেওয়াটা বে-আইনি হলেও এই নাটকীয় পরিসমাপ্তি বাঙালী সেন্টিমেন্টের সঙ্গে দিব্বি খাপ খেয়ে যায়।  

আবার অনেক সামাজিক লঘু মুহূর্তও আছে (গোয়েন্দা গল্পে রোমান্সের ঠিক স্থান নেই, পূর্বসূরীদের এই অবস্থান শরদিন্দু মানেন নি)। 'দুর্গরহস্য' গল্পের শেষে শেষে ব্যোমকেশ একটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করছে,

'....তোমার মাস্টার কেমন?'
মাস্টারের দিকে কপট-কুটিল কটাক্ষপাত করে মেয়েটি বলিল, 'বিচ্ছিরি।'
ব্যোমকেশ বলিল, 'হুঁ, একদিন তো আমার কোলে বসে মাস্টারের জন্যে কেঁদেছিলে মনে আছে?'
এবার মেয়েটির লজ্জা হইল। মুখে আঁচল চাপা দিয়া সে বলিল, 'ধেৎ!'

'বেণীসংহার' গল্পে হত্যাকান্ডের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্যোমকেশ ধরে ফেলল কে সেই বাড়ির এক যুবককে উড়ো প্রেমপত্র লিখছে। পত্রলেখিকা আবার যুবকের অতি পরিচিত। খুনের রহস্য সমাধান হয়ে যাবার পর চিঠি রহস্য ফাঁস করে ঘটানো হল পাত্রপাত্রীর মিলন ।
রোমাঞ্চ কাহিনীর মধ্যেও রোমান্সের এই উঁকি মারা বাঙালী পাঠকের বড়োই চিত্তাকর্ষক।

শরদিন্দু নিজের রচনা সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেছিলেন,

‘আমার সাহিত্যজীবনে একটা জিনিস লক্ষ্য করিয়াছি, তাহা বোধহয় সকল সাহিত্যিকের জীবনে ঘটে না। আমার লেখার একটা immediate appeal আছে যাহাকে শ্রীমোহিতলাল মজুমদার কৌতুকচ্ছলে ‘ত্বরিতানন্দ’ বলিয়াছেন; তাছাড়া একটি delayed action’ আবেদন আছে যাহা অনুভূত হইতে সময় লাগে। যেগুলি আমার সত্যকার ভাল রচনা সেগুলি গুণীসমাজে আদর পাইয়াছে রচিত হইবার ১০/১২ বছর পরে।
‘আমি যত্ন করিয়া লিখি, লেখাকে চিত্তাকর্ষক করিবার চেষ্টা করি। তাই প্রথম পাঠে বোধহয় লেখার বাহ্য চাকচিক্যটাই চোখে পড়ে, চাকচিক্য ছাড়া তাহাতে যে আর কিছু আছে তাহা কেহ লক্ষ্য করেন না। অনেক পরে আবার লেখাটি পড়িলে তাহার অন্তর্নিহিত বস্তুটি চোখে পড়ে। একই কালে রস ও পল্লব গ্রহণ করিতে বড় কাহাকেও দেখা যায় না।‘

আগে ব্যোমকেশের কাহিনীতে  শুধু প্লটের মারপ্যাঁচ আর ব্যোমকেশের রহস্য সমাধানের ক্ষমতা দেখেই ‘ত্বরিতান্দিত’ হতাম।  আজ প্রায় চল্লিশ বছর বাদে ব্যোমকেশের গল্পগুলি আরও একটু সূক্ষ্ম ভাবে পড়ছি, কিন্তু আনন্দ তো বেশি বই কম হচ্ছে না। অর্থাৎ প্রতিটি গল্পেই immediate appeal-এর সঙ্গে একটা delayed action element-ও লাগানো আছে। কিছু একটা রয়েছে ব্যোমকেশ কাহিনীতে যা শুধু কালোত্তীর্ণ তাই নয়, একাধিক বার পড়েও আনন্দ পাওয়া যায়!  

  লেখাটি অবসর.নেট-এর শরদিন্দু স্মারক সংখ্যায় পূর্ব প্রকাশিত

  সুজন দাশগুপ্ত

The Omnibus of Crime by Dorothy L. Slayers (Payson & Clark, 1929, NY)
রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী – সাহিত্য না অন্য কিছু - সুব্রত মজুমদার
শরদিন্দু অমনিবাস (দ্বিতীয় খন্ড - ব্যোমকেশ) - আনন্দ পাবলিশার্স।
 আগের একটা গল্পে (‘ব্যোমকেশ ও বরদা’) এই ব্যোমকেশই ভূত-বিশেষজ্ঞ বরদাবাবুর ভূতকে তাড়িয়েছিল!
তবে এ ধরণের আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে গোয়েন্দাদের দোষীকে ছেড়ে দেওয়া বিদেশী গোয়েন্দাদেরও (যেমন, শার্লক হোমস, এ্যরকুল পয়রো) করতে দেখা গেছে।

[সুজন দাশগুপ্ত এককালে অনেক ধাঁধার বই লিখেছেন। এখন গোয়েন্দাকাহিনী লেখেন। ]