রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 



 

দ্য ফিল্ড বাজার (The Field Bazar)

' এটা আমি নিশ্চয় করব' - বলল শার্লক হোমস।
হঠাত্ বাধা পড়ায় আমি চমকে উঠলাম। কারণ, আমার সঙ্গীটি কফি-পটের পাশে মেলে রাখা খবরের কাগজের উপরে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে প্রাতঃরাশ সারছিল। এবার আমি সোজাসুজি তার দিকে তাকালাম আর দেখলাম - তার চোখ আমার ওপরেই আটকে রয়েছে আধা কৌতুক আর আধা প্রশ্নময় দৃষ্টি নিয়ে। কোন বুদ্ধির ধাঁধা ভাঙতে পেরেছে বুঝলে সচরাচর ঐ ভাবেই সে তাকাত।
'কী করবে?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
সে একটু হেসে ফায়ার প্লেসের তাক থেকে চটিটা নিয়ে তার ভেতর থেকে যথেষ্ট পরিমাণ মোটা তামাক বার করে তার পুরনো ক্লে-পাইপটা ভর্তি করে নিল। অবধারিতভাবে এই ছিল তার ব্রেকফাস্ট শেষ করার রীতি।
' একেবারে পুরোপুরি তোমার ধাঁচের প্রশ্ন, ওয়াটসন', বলল সে। 'তুমি নিশ্চয়ই কিছু মনে করবে না যদি আমি বলি যে বুদ্ধিমত্তার যা কিছু খ্যাতি আমি পেয়েছি তা আগাগোড়া গড়ে উঠেছে আমার জন্য মেলে ধরা তোমার শ্রদ্ধেয় মূর্খতার উপর ভিত্তি করে। উঠতি বয়সে হাই-সোসাইটির মেয়েরা পার্টিতে যাবার সময়ে তাদের বয়স্কা সঙ্গীকে সাদামাটা পোষাক পরতে বলে - শুনেছ তো! দুয়ের মধ্যে একটা তুলনা হতে পারে। '
বেকার স্ট্রীটের ঘরে আমাদের দীর্ঘ মেলামেশা আমাদের এমন স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছিল অসম্মান বাঁচিয়েও অনেক কথাই বলা যেতে পারত। কিন্তু, তবু আমি বললাম যে তার মন্তব্যে আমি খুশী হই নি।
'হতে পারে আমার বুদ্ধির ঘাটতি' - আমি বললাম, 'কিন্তু, স্বীকার করছি আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কী ভাবে তুমি টের পেলে যে আমি --- আমাকে ---'
'এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে টাকা তোলার কাজে সাহায্য করতে বলা হয়েছে।'
'একদম ঠিক। চিঠিটা আমার হাতে এসেছে, আর তারপর থেকে তোমার সঙ্গে কোন কথা হয় নি।'
হোমস তার আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে আঙুলের ডগাগুলো একত্র করে বলল, 'কিন্তু, তবু আমি এমনকি এও বলতে সাহস করি যে টাকা তোলার উদ্দেশ্য হল ক্রিকেট মাঠটা বড় করা।'
এমন হতভম্ব হয়ে আমি তার দিকে তাকালাম যে সে নিঃশব্দ হাসিতে দুলে উঠল।
'ওহে ওয়াটসন, ব্যাপারটা হল এই যে তুমি একটা অতি চমৎকার আধার' - বলল সে। 'তোমার অনুভূতি কখনও শ্রান্ত হয় না। বাইরে থেকে আসা প্রত্যেকটি প্ররোচনায় তুমি মুহূর্তে সাড়া দাও। তোমার মননক্রিয়া মন্থর হতে পারে; কিন্তু, তা কখনও আচ্ছন্ন নয়। ব্রেকফাস্টের সময় দেখছিলাম - আমার সামনে রাখা 'টাইমস'-এর হেড্লাইনের চেয়ে তোমাকে পড়া বেশী সোজা।'
'কী ভাবে তুমি সিদ্ধান্তে পৌঁছলে জানতে পারলে খুশী হব।' আমি বললাম।
'ব্যাখ্যা দেবার সরলতা দেখাই বলে আমার দস্তুরমতো ক্ষতি হয় - এই আমার আশঙ্কা', হোমস জবাব দিল। 'কিন্তু, এই ক্ষেত্রে যুক্তিধারা এমনই প্রকট সত্যে ভর করে আছে যে এর জন্যে কোন কৃতিত্ব দাবী করা যেতে পারে না। তুমি ঘরে ঢুকলে চিন্তাগ্রস্ত মুখে; সে মুখ এমন এক মানুষের মুখ যে মানুষ নিজের মনে তর্ক করে চলেছে। তোমার হাতে ধরা ছিল একটি মাত্র চিঠি। গত রাত্রে তুমি খোস মেজাজেই ঘুমোতে গিয়েছিলে। সুতরাং, তোমার ভাব পরিবর্তনের কারণ যে এই চিঠিটাই - সেটা পরিষ্কার হল।'
' এটা সোজা ব্যাপার।'
'বুঝিয়ে দেবার পরে সব ব্যাপারই এমন সোজা। স্বভাবতই আমি নিজেকে প্রশ্ন করি - তোমার উপরে ক্রিয়া করবার মতন কী থাকতে পারে ঐ চিঠিতে। যখন তুমি হাঁটছিলে, খামের মুখটা আমার দিকে ফেরানো ছিল। তার ওপরে আমি দেখলাম সেই শিল্ডের আকারে মুদ্রা - যা আমি তোমার কলেজের পুরানো ক্রিকেট-ক্যাপের উপরেও দেখছি। অতএব পরিষ্কার হল যে অনুরোধটা এসেছে এডিনবরা বিশবিদ্যালয়ের থেকে, অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত কোন ক্লাব থেকে। তুমি যখন টেবিলের কাছে পৌঁছলে, তখন তোমার প্লেটের পাশে চিঠিটা তুমি রাখলে ঠিকানাটা উপরের দিকে রেখে। তারপর তুমি হেঁটে গেলে ফায়ারপ্লেসের বক্সের উপরে বাঁ দিকে টাঙানো ফটোটার সামনে।
কী নিখুঁতভাবে আমার চলাফেরা সে লক্ষ করছে দেখে আমি তাজ্জব হলাম।'তারপর ?' প্রশ্ন করলাম তাকে।
'ঠিকানাটা আমি দেখতে শুরু করলম, আর ছ'ফুট দূরত্ব থেকেও বলা যেত যে ওটি কোনো 'অফিশিয়াল' চিঠি নয়। এটা বুঝেছিলাম ঠিকানার ওপরে 'ডক্টর' শব্দটা থেকে - যে উপাধির উপর 'ব্যাচেলর অফ মেডিসিন ' হিসেবে তোমার আইনত কোন দাবী নেই। আমি জানি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপাধির সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে কেতাদুরস্ত; আর এ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব যে চিঠিটা 'অফিশিয়াল' নয়। টেবিলে ফিরে এসে যখন চিঠিটা তুমি ফিরিয়ে ধরলে, আর আমায় বুঝতে দিলে যে ওটা টাইপ করা, তখনই তহবিল গঠনের চিন্তাটা আমার মাথায় আসে। রাজনৈতিক বার্তার সম্ভাবনাটা ইতিমধ্যেই আমি বিবেচনা করেছিলাম; কিন্তু রাজনীতির বর্তমান নিস্তরঙ্গ অবস্থায় সেটা সম্ভব মনে হল না।
'টেবিলে যখন তুমি ফিরে এলে, তোমার মুখে তখনও একই ভাব। স্পষ্ট বোঝা গেল - ফটোটা পরীক্ষা করেও তোমার চিন্তার ধারা বদলায় নি। সেক্ষেত্রে ঐ ফটোটা নিশ্চয়ই তোমার চিন্তার বিষয়বস্তু বহন করবে। আমি তাই ফটোটার দিকে মনোযোগ দিলাম, আর তত্ক্ষণাত্ দেখলাম দেখলাম ওটা এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় একাদশ-এর একজন সদস্য হিসেবে তোমার ছবি - যার পটভূমিতে দেখা যাচ্ছে প্যাভেলিয়ন ও ক্রিকেট মাঠ। ক্রিকেট ক্লাবগুলো সম্পর্কে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে জানা আছে যে গীর্জা এবং ধ্বজাবাহী অশ্বারোহী বহিনীর পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত বস্তু হল ক্রিকেট ক্লাবগুলো। যখন তুমি টেবিলে ফিরে এলে, দেখলাম তুমি পেনসিল তুলে নিয়ে খামের উপরে লাইন টানলে। আমার বিশ্বাস জন্মাল - তুমি কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছ, যার জন্য টাকা তুলতে হবে কোন কিছু বিক্রী করে। তোমার মুখে তখনই ছিল সিদ্ধান্তহীনতার ছায়া, যার ফলে আমি মাথা গলালাম তোমার সমস্য্যায় আমার এই পরামর্শ নিয়ে যে এরকম ভালো কাজে তোমায় সাহায্য করা উচিত।'
তার ব্যাখ্যার চরম সরলাতায় না-হেসে পারলাম না।
'বাস্তবিক, এর চেয়ে বোধহয় সোজা কিছু হয় না'। - বললাম আমি।
আমার মন্তব্যে বোধহয় কিছু খোঁচা খেল।
এবং আরও জানাচ্ছি' হোমস বলল, 'যে বিশেষ সাহায্যটি তোমার কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে তা হল - ওদের অ্যালবামে তুমি লেখা যাতে লেখ, এবং তুমি ইতিমধ্যেই মনস্থির করে নিয়েছ যে বর্তমান ঘটনাটাই হবে তোমার লেখার বিষয়বস্তু।'
কিন্তু তা কি করে ' আমি তীব্রে স্বরে বলে উঠলাম।
'এর চেয়ে সোজা কিছু হয় না' বলল সে, 'এর সমাধান আমি তোমার উদ্ভাবনী শক্তির উপরে ছেড়ে দিচ্ছি। ইতিমধ্যে '- কাগজটা তুলে ধরে সে বলল, 'তোমার অনুমতি নিয়ে ক্রেমোনা-র গাছের উপরে এই অতি চিত্তাকর্ষক লেখাটায় ফিরে যেতে চাই, কেন ঐ কাঠ বেহালা তৈরীর জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছে - সেই বিষয়ে। এটা একটা ছোট, অপ্রাসঙ্গিক সমস্যা, যে ধরণের সমস্যায় অনেক সময়ে আমি আগ্রহ দেখাতে ভালোবাসি।'

আর্থার কোনাম ডয়েল
অনুবাদক প্রসাদ সেনগুপ্ত

১৮৯৬ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাদের ক্রিকেট মাঠটির উন্নয়ন কাজে সাহায্য করার জন্যে আর্থার কোনা ডয়েলকে অনুরোধ করে। তিনি তখন এই ক্ষুদ্র রচনাটি বিশ্বিদ্যালয়ের পত্রিকা 'দ্য স্টুডেন্ট'-এর জন্য লেখেন। প্রসাদ সেনগুপ্ত রচিত প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী থেকে প্রকাশিত আর্থার কোন্যান ডয়েল - জীবন ও সাহিত্য গ্রন্থ থেকে লেখকের অনুমতি নিয়ে এটি এখানে প্রকাশ করা হল।