রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


একেনবাবু

সুজন দাশগুপ্তের
গোয়েন্দা একেনবাবুর
রহস্য কাহিনী


গোয়েন্দা একেনবাবুর
অ্যামাজন-এর লিঙ্ক


দাশগুপ্ত এণ্ড কোং
কলেজ স্ট্রীট


সুপ্রীম পাবলিশার্স
কলেজ স্ট্রীট


দাশগুপ্ত এণ্ড কোং
কলেজ স্ট্রীট


এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড

দাশগুপ্ত এণ্ড কোং
কলেজ স্ট্রীট

 

 

 

 


 

পুরস্কার পাঁচ হাজার ডলার

সকালে আড্ডা দিতে নীচে প্রমথর অ্যাপার্টমেণ্টে যেতেই একেনবাবু একগাল হেসে বললেন, “ভালোই হল স্যার, আপনি এসেছেcন। মিস্টার রাজ সিং একটু আগে ফোন করেছিলেন, উনিও আসছেন।”
“রাজ সিং, মানে দ্য গ্রেট ডিটেকঠিভ রাজ সিং?” আমি একটু ঠাট্টা করেই প্রশ্নটা করলাম।”
“হ্যাঁ স্যার। ওঁর হাতে নাকি একটা কমপ্লিকেটেড কেস এসেছে। আমাদের কাছে একটু পরমর্শ চান।”
‘আমাদের’ কথাটা অবশ্য একেনবাবু ব্যবহার করলেন সম্মনার্থে বহুবচন হিসেবে। কারণ, আমি এবং প্রমথ একেনবাবু অ্যাসেট না লায়েবিলিটি, সে সম্পর্কে আমি এখনও খুব একটা শিওর নই! যাই হোক, এই ফাঁকে রাজ সিং সম্পর্কে একটু বলে নিই। উনি হলেন ম্যানহ্যাটানের সবেধন নীলমণি ভারতীয় প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। সবেধন নীলমণি বলছি এইজন্য যে, যদিও একেনবাবু পেশায় একজন ডিটেকটিভ, এঁবং আপাতত প্রমথর সঙ্গে ম্যানহ্যাটানেই থাকেন, কিন্তু উনি কলকাতায় পুলিশের লোক। ছুটি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ক্রিমিনোলজি নিয়ে রিসার্চ করতে। নিউ ইয়র্ক পুলিশ মাঝে মধ্যে ওঁর সাহায্য নিলেও, ডিটেকটিভ এজেন্সি চালাবার লাইসেন্স ওঁর নেই। ম্যানহ্যাটানে লাইসেন্সধারী ডিটেকঠিভ বলতে একমাত্র রাজ সিং-ই।
পেশা এক হলেও, চেহারা ও হাবেভাবে রাজ সিং হচ্ছেন একেনবাবুর কনট্রাস্ট। একেনবাবু হলেন পাতলা টিংটিং-এ, বেঁটে দি গ্রেট। শুধু চেহারা নয়, ওঁর কথাবার্তা, পোশাক পরিচ্ছদ সব কিছুই অত্যন্ত আন-ইম্প্রেসিভ! আর রাজ সিং স্যুট-বুট পরা ছ’ফুট লম্বা, চওড়া কাঁধ, ফুরফুরে চুল – চোখে কালো চশমা । দেখলেই মনে হয়, হ্যাঁ, এ না হলে আর নিউ ইয়র্কের গোয়েন্দা! তবে এই রাজ সিং-এর আবার একেনবাবুর ওপর অগাধ ভক্তি! গোলমেলে কোনও সমস্যা এলেই উপদেশ নিতে ছুটে আসেন। আমি আর প্রমথ মাঝ মাঝে একেনবাবুকে বোঝাবার চেষ্টা করি, অ্যাডভাইস শুড নট বি ফ্রি, ফেলো কড়ি মাখো তেল! কিন্তু কে কাকে বোঝায়! খুব চাপাচাপি করলে একেনবাবু বলেন, “কী করি স্যার, ইণ্ডিয়ান ব্রাদার যে!”
আসলে রাজ সিংয়ের চেহারা আর বোলচালই সব। বাইরের গ্ল্যামারটা কেটে যেতেই ধরা পড়ে যে, হি ইজ নট ওভার-বার্ডনড উইথ ব্রেন – মস্তিষ্কে ঘিলুটা একটু কমই আছে। তবে করে তো খাচ্ছে! আর বোকাসোকা বলেই আমার ধারণা, একেনবাবু ওঁকে খানিকটা স্নেহ করেন।

রাজ সিংয়ের অফিস যদিও ম্যানহ্যাটনে, উনি থাকেন নিউ ইয়র্কের পূর্ব প্রান্তে, লং আইল্যাণ্ডে। তাই এলেন প্রায় এক ঘন্টা বাদে। মুখ দেখে বুঝলাম ভারি চিন্তিত। সঙ্গে একটা ভিডিও টেপ এনেছিলেন। সেটা টেবিলের ওপর রেখে ঘোষণা করলেন, “লাইফ ইজ টাফ!”
প্রমথ যথারীতি ইয়ার্কি করল। বলল, “কী সিংজি, মনে হচ্ছে আপনি একটা গ্রেট ভিডিও মিস্ট্রি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন?”
রাজ সিং প্রাইভেট ই্নভেস্টিগেটর হলেও বড় কোনও ব্যাপারে ওঁর ডাকে পড়ে না। নর্মালি উনি যে সব কেস পান, সেগুলো নিতান্তই সাদামাঠা। যেমন, কাউকে ফলো করে - সে কী করছে না করছে তার রিপোর্ট দেওয়া, ডিভোর্স কেসে স্বামী বা স্ত্রীর কোনও পরকীয়া ব্যাপার আছে কিনা খোঁজখবর নেওয়া, ইন্সিওরেন্সের দাবিদাওয়া নিযে তদন্ত করা, এইসব। প্রমথর ‘গ্রেট ভিডিও মিস্ট্রি’ কথাটার মধ্যে যে একটা খোঁচা ছিল, সেটা বলাই বাহুল্য। রাজ সিং কিন্তু কথাটা গায়ে মাখলেন না। একেনবাবুকে বললেন, “মিস্টার সেন, আই অ্যাম ইন ট্র্যাবল, মাই রেপুটেশন ইজ অ্যাট স্টেক।”
প্রমথ ফিসফিসিয়ে বাংলায় আমাকে বলল, “শুনছিস, রেপুটেশন ইজ অ্যাট স্টেক! করিস তো দারোয়ানগিরি!”
“চুপ কর, ছোটলোক!” আমি চাপা স্বরে প্রমথকে ধমক লাগালাম।
একেনবাবু এদিকে অমায়িকভাবে বললেন, “কী যে বলেন স্যার, কে আপনার রেপুটেশন কেড়ে নেবে।”
“না, মিস্টার সেন। ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস। আই গট দ্য বিগেস্ট ব্রেক অব মাই কেরিযার অ্যাণ্ড আই অ্যাম সিমপ্লি রুইনিং ইট! সিটি সেণ্ট্রা্ল ব্যাঙ্ক আমাকে বিরাট একটা ক্রাইম সলভ করতে ডেকেছে। ইট ইজ এ টু-উইক কনট্রাক্ট - আউট অব উইচ ওয়ান উইক ইজ অলরেডি গন, অ্যাণ্ড আই অ্যাম নো হোয়ের নিয়ার দ্য সলিউশন। দ্য ওয়ার্স্ট অব অল, প্রত্যেকদিন আমার চোখের সামনে দ্য ক্রাইম ইজ গেটিং কমিটেড।”
“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান। আগে এককাপ চা খান।” টি পট থেকে চা ঢালতে ঢালতে একেনবাবু বললেন, “তারপর একটু গুছিয়ে সহজ করে ব্যাপারটা বলুন।”
রাজ সিংয়ের কাছ থেকে যেটা উদ্ধার করা গেল, সেটা হচ্ছে -

গত সপ্তাহে রাজ সিং হঠাৎ একটা ফোন কল পান সিটি সেণ্ট্রাল ব্যাঙ্কের ফর্টি সেকেণ্ড স্ট্রিট ব্র্যাঞ্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিস্টার ক্লিফোর্ড জনসনের কাছ থেকে। মিস্টার জনসন ওঁকে বলেন যে, উনি সন্দেহ করছেন ওঁর অফিসের এক টেলার কোনও একটা লোকাল ক্রাইম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর এ-ব্যাপারে উনি রাজ সিংয়ের সাহায্য চান। মিস্টার জনসন এর বেশি ফোনে কিছু বলতে চাননি। ঠিক হয় যে, পরদিন ন’টার সময় রাজ সিং, মিস্টার জনসনের অফিসে গিয়ে দেখা করবেন।
পরদিন ন’টায় যখন রাজ সিং জনসনের অফিসে গিয়ে পৌঁছোন, তখন দেখেন মিস্টার জনসন ছাড়াও ব্যাঙ্কের সিকিউরিটির হেড জ্যাক সাইপ্রাস ওঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। অফিসের দরজাটা বন্ধ করে মিস্টার জনসন বললেন, “ব্যাপারটা একটু সেন্সিটিভ। তাই ফোনে আপনাকে বিশেষ কিছু বলতে চাইনি। জ্যাক এটা নিয়ে প্রায় এক মাস হল ইনভেস্টিগেট করছে। কিন্তু ওর ওপর সিটি সেণ্ট্রালের সবকটা ব্রাঞ্চের সিকিউরিটির দায়িত্ব। ওর পক্ষে ফুল টাইম এসে দেওয়া সম্ভব নয়। ফর দিস রিজন, আই ওয়াণ্ট ইউ টু কমপ্লিট দ্য ইনভেস্টিগেশন।”
রাজ সিং জিজ্ঞেস করলেন, “প্রবলেমটা কি?”
“প্রব্লেমটা হল, প্রায় মাসখানেক ধরে এই অঞ্চলে মাগিংটা খুব বেড়ে গেছে।” উত্তরটা দিলেন জ্যাক সাইপ্রাস।”
এ দেশের ‘মাগিং’ হচ্ছে আমাদের দেশেরন ‘ছিনতাই’। আচমকা আক্রমণ করে বা ভয় দেখিয়ে পয়সা ও দামি জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়া। যাই হোক, জ্যাক সাইপ্রাসের কথাটার তাত্‍‌পর্য রাজ সিং ঠিক ধরতে পারলেন না। বললেন, “নিউ ইয়র্কের সব জায়গাতেই তো মাগিং বেড়েছে।”
“দ্যাটস ট্রু। কিন্তু এখানে সমস্যাটা একটু অন্য। মাগিং-এর যেসব রিপোর্ট লোকাল পুলিশ পাচ্ছে – তার অনেকগুলোই আসছে আমাদের কাস্টমারদের কাছে থেকে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে বেরোবার একটু পরেই তারা রাস্তায় মাগড হচ্ছে।”
এটা শুনেও রাজ সিং বিস্মিত হন নি, কারণ মাগাররা ব্যাঙ্কের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেই দেখতে পাবে কারা ব্যাঙ্ক থেকে বেরোচ্ছে। যারা বেরোচ্ছে, তাদের সবার কাছে টাকা থাকার সম্ভাবনা, নইলে তারা ব্যাঙ্কে আসবে কেন! কিন্তু জ্যাকের পরের কথাটা শুনে উনি বুঝতে পারলেন সমস্যাটা কোথায়।
আমরা যখন তদন্ত শুরু করলাম, জ্যাক সাইপ্রাস বললেন, “তখন দেখলাম শুধু তারাই মাগড হচ্ছে যারা সেদিন অনেক টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলেছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটি ভিক্টিমই টাকা তুলেছে মিস সিলভিয়া জোনস বলে একজন টেলারের কাছ থেকে। কিন্তু প্রব্লেম হল, আমাদের কোনও ধরণাই নেই কেন এটা ঘটছে! আই পার্সোনালি অবজার্ভড হার বেশ কয়েক দিন ধরে, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই লক্ষ করিনি।”
মিস্টার জনসন বললেন, “বাট উই আর শিওর যে সামহাউ সিলভিয়া গুণ্ডাগুলোকে জানাচ্ছে কে মোটা রকমের ক্যাশ উইথড্র করছে। দ্যাটস দ্য ওনলি এক্সপ্ল্যানেশন। এখন আপনাকে মিস্টার সিং খুঁজে বের করতে হবে যে কী করে সিলভিয়া গুণ্ডাদের ইনফরমেশনগুলো দিচ্ছে। হাউ ইজ শি কম্যুনিকেটিং উইথ দেম? বাট ইউ মাস্ট হারি। কারন একবার যদি খবরের কাগজের লোকেরা জানতে পারে যে আমাদের কাস্টমাররা মাগারদের টার্গেট, তা হলে আমাদের বিজনেসের কি অবস্থা হবে - সেটা তো বুঝতেই পারছেন।”
“তা পারছি,” রাজ সিং উত্তর দিলেন, “কিন্তু কাজটা নেওয়ার আগে আমার একটা প্রশ্ন আছে।”
“কি প্রশ্ন?”
“নিউ ইয়র্কে এত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর থাকা সত্ত্বেও আমাকে আপনি সিলেক্ট করলেন কেন?”
“ভেরি সিম্পল। যেহেতু আপনি একজন ইণ্ডিয়ান, সিলভিয়া বা ওর গুণ্ডা বন্ধুরা কল্পনাও করবে না যে আপনি ডিটেকটিভ। বিকজ ইট ইজ র্যানদার অ্যান আনইউুয়াল প্রোফেশন ফর অ্যান ইণ্ডিয়ান। দ্যাট, আই বিলিভ, উইল মেক ইয়োর জব সিম্পলার। তাই না?”
“মে বি,” রাজ সিং বললেন, “তবে আমার চার্জ কিন্তু দিনে পাঁচশো ডলার, প্লাস এক্সপেন্স। আর কাজটা করতে পুরো দু-সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।”
রাজ সিং নর্মালি এত চার্জ করেন না। কিন্তু শাঁসালো মক্কেল, ট্রাই করতে দোষ কি!
“দ্যাটস ফাইন উইথ আস।” ক্লিফোর্ড জনসন উত্তর দিলেন।
এই হল মোটামুটি ঘটনা।

রাজ সিং একেনবাবুকে বললেন, “এবার বুঝতে পারছেন তো আমার সমস্যাটা?”
“হ্যাঁ স্যার, মনে হচ্ছে বুঝেছি। অর্থাৎ গত পাঁচদিনে ইউ হ্যাভ ফাউণ্ড নো ক্লু।”
“এগজ্যাক্টলি। আমি সিলভিয়াকে খুব ক্লোজলি ওয়াচ করেছি। ইন ফ্যাক্ট, যদি কখনও অন্যমনস্ক হয়ে কোনও কিছু মিস করে থাকি সেইজন্য জ্যাক সাইপ্রাসের কাছ থেকে ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি ক্যামেরায় তোলা ভিডিওগুলোও স্টাডি করেছি।”
“সেটা কি স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
“কিসের কথা বলছেন, সিকিউরিটি ভিডিও?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“আপনি জানেন না বুঝি!” রাজ সিং একটু অবাক হলেন। নিউ ইয়র্কে সব ব্যাঙ্কে ভিডিও ক্যামেরা লাগানো থাকে। যারা টেলারদের কাছে গিয়ে টাকা নিচ্ছে, তাদের সবার ছবি ক্যামেরাতে ওঠে। এইজন্যেই ব্যাঙ্ক ডাকাতি আজকাল অনেক কমে গেছে।”
(এখানে বলে রাখি, যে সময়ের কথা লিখছি সেটা ২০০০ সাল – আমাদের দেশে তখনও ভিডিও ক্যামরা তেমন চালু হয় নি।)
“অ্যামেজিং কানট্রি স্যার, ট্রুলি অ্যামেজিং!” একেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন।
“এনি ওয়ে,” রাজ সিং পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে এলেন। “নাউ আই ডোণ্ট নো হোয়াট টু ডু নেকস্ট।
প্রমথ বলল, “এটাই বুঝি আপনার সেই সিকিউরিটি ভিডিও?”
“রাইট। দেখবেন?” রাজ সিং একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন।
“কি জানি স্যার,” একেনবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “ভিডিও দেখে কি আর মিস্ট্রি সলভ করতে পারব!”
“তা বলে দেখতে ক্ষতি কী,” বলে প্রমথ টেবিল থেকে টেপটা তুলে ভিডিও প্লেয়ারে ঢোকাল।
ছবির কোয়ালিটি বিশেষ ভালো নয়। তবে মোটামুটি চেহারাগুলো বোঝা যাচ্ছে। রাজ সিং এক্সপ্লেন করে বললেন, “অরিজিনালি অন্য ফোর্ম্যাটে তোলা। ভি এইচেস-এ কনভার্ট করতে গিয়ে ডেফিনেশনটা একটু লুজ করেছে।
একেনবাবু আবার এসব টেকনিকাল টার্মগুলো বোঝেন না। বললেন, “হোক না ডিফরমেশন, তবু দিব্যি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সিচুয়েশনটা আমায় একটু বুঝিয়ে দিন স্যার।”
“শিওরলি,” রাজ সিং বললেন। “টেলারদের দেখতে পাচ্ছেন তো, ঐ যে চারজন, যারা কাউণ্টারের উলটো দিকে পাশাপাশি বসে আছে?”
“হ্যাঁ স্যার, দেখতে পাচ্ছি।”
“বাঁ দিক থেকে কাউণ্ট করে থার্ড পার্সন হল সিলভিয়া জোনস।“
“আই সি স্যার,” টিভি স্ক্রিনের দিকে খুব মন দিয়ে তাকিয়ে একেনবাবু বললেন, “যার চুলগুলো লাল মতো?”
“ইয়েস।”
“জায়গাটা এত ফাঁকা কেন স্যার, প্রত্যেক টেলারের সামনে মাত্র একজন করে কাস্টমার?”
“ফাঁকা নয়, প্রচণ্ডই ভিড়, কিন্তু ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের জন্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না,” রাজ সিং উত্তর দিলেন। “নর্মালি, ভিড় হলে কাস্টমাররা কাউণ্টার থেকে একটু দূরে লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকে। টেলারদের সঙ্গে একজন কাস্টারের কাজ শেষ হলে লাইনের প্রথমে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার জায়গায় যায়। ফলে টেলারদের সামনে ধাক্কাধাক্কি হয় না। কাস্টমারদের ঐ লাইনটা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলের বাইরে পড়ে গেছে।”
“আপনি কোথায় ছিলেন স্যার?”
“কাস্টমারদের লাইনের অন্য সাইডে একটা পাটাতনের মতো আছে। সেখানে সিকিউরিটি গার্ড ও কয়েকজন কর্মচারি বসে। প্রথম দু’দিন সেখানে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছিলাম। শেষ তিন দিন মিস জোনসের ঠিক পেছনে বুক কিপারদের একটা টেবিল আছে, সেখানে ছিলাম।”
তার মানে স্যার, আপনি চারজন টেলারকেই ভালো করে দেখতে পারছিলেন।”
অ্যাবসোলুটলি! শুধু দেখা নয়, সবার কথাও শুনতে পারছিলাম।”
একেনবাবু বোধহয় আর একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু প্রমথ বলে উঠল, “আরে, ওটা কী হল?।”
আমিও ব্যাপারটা লক্ষ করছিলাম। একজন কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সিলভিয়া হঠাৎ‌ কানে হাত দিলেন।
রাজ সিং বললেন, “কানে হাত দেওয়াটা তো? ওটা ওঁর মুদ্রাদোষ। আমারও প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু প্রতিদিন কতবার যে উনি কানে হাত দিয়ে দুল ঠিক করেন, তার ইয়ত্তা নেই ।”
“দাঁড়ান, দাঁড়ান, অত সহজে ব্যাপারটা নাকচ করবেন না,” প্রমথ বলল। “দেয়ার মে বি সাম সিক্রেট কোড। ধরুন, গুণ্ডাদের সঙ্গে ওঁর একটা আণ্ডারস্ট্যাণ্ডিং আছে যে প্রত্যেকবার নয়, শুধু তিন বারের বার কানে হাত দেওয়াই হল আসল সিগন্যাল। সে ক্ষেত্রে যেই উনি থার্ড টাইম কানে হাত দেবেন, গুণ্ডারা সঙ্গে সঙ্গে সেই কাস্টমারকে ফলো করবে।”
রাজ সিং এ নিয়ে বোধ হয় খুব একটা চিন্তা করেননি। তাই একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “না, না, জ্যাক সাইপ্রাসও বলেছিলেন যে দুল ঠিক করার সঙ্গে মাগিং ভিকটিমের কোনও সম্পর্ক নেই।”
একেনবাবু বললেন, “স্যার, মিস জোনস কি শুধু বাঁ হাত দিয়েই কানের দুল ঠিক করেন, না মাঝে মাঝে ডান হাতও ব্যবহার করেন?”
রাজ সিং কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললেন, “ইয়েস, দুটো হাতই ব্যবহার করতে দেখেছি।”
“দেন দেয়ার আর মোর কোডিং পসিবিলিটিস,” প্রমথ বলল।“যেমন ধরুন, যে মুহূর্তে উনি হাত চেঞ্জ করবেন, সেটাই হবে ইণ্ডিকেশন। ফর এগজাম্পল, উনি বারবার বাঁ হাত দিয়ে দুল ঠিক করছেন। একবার হঠাৎ ডান হাত দিয়ে করলেন, সেটাই হবে গুণ্ডাদের ক্লু।”
আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে এই পসিবিলিটিগুলো রাজ সিংয়ের মাথায় খেলেনি। কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে বলে সেগুলো ঠিক স্বীকার করে নিতে পারছেন না! হাজার হোক, প্রথর কি ক্রেডেনশিয়াল? এদিকে উনি হচ্ছেন একজন লাইসেন্সধারী ইনভেস্টিগেটর!
এমন সময় একজন মোটাসোটা কাস্টমার সিলভিয়া জোনসে কাছে এসে দাঁড়াতেই রাজ সিং বলে উঠলেন, “এই যে লোকটাকে দেখছেন মিস্টার সেন, এ হচ্ছে একজন মাগিং ভিক্টিম।”
শোনামাত্র আমরা সবাই নিঃশব্দে মিস জোনসের মুভমেণ্ট স্টাডি করতে শুরু করলাম। লেনদেন শেষ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই কাস্টমার চলে গেলেন। দেয়ার ইজ নাথিং, অ্যাবসলিউটলি নাথিং, যেটা আমার মনে হল সাসপিশাস! সিলভিয়া কানের দুল ঠিক করলেন না, কোনও স্পেশাল মুভ লক্ষ করলাম না, এভরিথিং ইজ কম্প্লিটলি নর্মাল!”
“দেয়ার গোজ ইয়োর কোডিং থিয়োরি,” আমি প্রমথকে খোঁচা দিলাম।
“নট সো ফাস্ট,” প্রমথ বলল, “হয়তো কানে হাত না দেওয়াটাই হল আসল সিগন্যাল।”
“কিন্তু সেটাও সত্যি নয়। কারণ, ঠিক পরের জনের বেলাতেও সিলভিয়া ওয়াজ অ্যাজ নর্মাল অ্যাজ বিফোর!”
“নাউ মাই থিয়োরি ইজ গন,” প্রমথ স্বীকার করল। “আনলেস দ্য কোড ইজ ভেরি কম্পিকেটেড।”
“আমি তো আগেই বলেছিলাম,” রাজ সিং বললেন।
“মুশ্কিল হল স্যার, ভিডিওটা টকি নয়, মনে নো সাউণ্ড,” একেনবাবু বললেন।
“দ্যাটস ট্রু। কিন্তু বিশ্বাস করুন মিস্টার সেন, আই ডিড নট ফাইণ্ড এনিথিং ইন হার ভয়েস হুইচ ইজ সাসপিশাস।”
“উনি কি স্যার নর্মাল ভাবেই সবার সঙ্গে কথা বলছিলেন?”
“ইয়েস। ইন ফ্যাক্ট শি সাউণ্ডেড মোর নর্মাল দ্যান আদার্স।”
একেনবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “মোর নর্মাল মনে কি স্যার?”
“হোয়াট আই মিন, অন্যান্য টেলারের মতো উনিও কাস্টমার সামনে এসে দাঁড়ালে বলছিলেন, মে আই হেল্প ইউ, এবং কাজ শেষ হওয়ার পর, থ্যাঙ্ক ইউ অ্যাণ্ড হ্যাভ অ্যা নাইস ডে। কিন্তু সেটা মোটেই আর সবার মতো যান্ত্রিক ভাবে নয়। ওঁর কথার মধ্যে একটা ফ্রেণ্ডলিনেস ছিল। এমন কি কাজের ফাঁকে ফাঁকে উনি হাসিমুখে কাস্টমারদের সঙ্গে গল্পও করছিলেন।”
একটু ভাবুন স্যার, উনি কি কথার ফাঁকে এমন কিছু কাউকে বলেছিলেন যেটা অন্য কাউকে বলেননি? অনেক সময় যেগুলো আমাদের খেয়ালও হয় না স্যার, যেমন, সবাইকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে শুধু একজনকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ বলা? বা ঐ জাতীয় কিছু?”
“নো। আই অ্যাম শিওর। আমি খুব মন দিয়ে ওঁর প্রত্যেকটা কথা শুনেছি। দেয়ার ইউ সি অ্যানাদার ওয়ান,” রাজ সিং বলে উঠলেন, “আর একজন মাগিং ভিকটিম!”
নাঃ, রাজ সিং অ্যাবসলিউটলি রাইট, এটাতেও কোনও ক্লু নেই! আর তখনই আমার মাথায় সম্ভাবনাটা ঝিলিক দিল, হোয়াট অ্যাবাউট এ ট্রান্সমিটার? মেয়েটা যদি একটা সিম্পল রেডিও ট্রান্সমিটার কোমরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে, আর তাতে একটা পুশ বাটন থাকে যেটা অতি সহজে টাকা গুনতে গুনতে কনুই দিয়ে প্রেস করা যায়! দ্যাটস অল হোয়াট ইজ নিডেড। গুণ্ডাদের একজনের কাছে নিশ্চয়ই একটা হ্যাণ্ড হেল্ড রিসিভার আছে! মেয়েটা পুশ বাটন টিপলেই রিসিভারের ইণ্ডিকেটর লাইটটা ব্লিঙ্ক করবে আর সঙ্গে সঙ্গে গুণ্ডাটা দেখতে পাবে, কে বড় অঙ্কের ক্যাশ উইথড্র করছে!
আমি আমার থিয়োরিটা বলতেই রাজ সিং বললেন, “সেটাই জ্যাক সাইপ্রাস প্রথমে ভেবেছিলেন। তাই উনি একটা ছুতো করে বেরোবার আগে টেলারদের একটা সারপ্রাইজ সিকিউরিটি সার্চ করেন। কিন্তু কারও কাছে কিছু পাওয়া যায়নি!”
প্রমথ আমায় খোঁচা দিল, “দেয়ার গোজ ইয়োর থিয়োরি, ডাউন দ্য ড্রেন!”
“মিস জোনস কতদিন হল কাজ করছেন স্যার?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
“মাস তিনেক। চারজনের মধ্যে মিস জোনস আর একজন হলেন নতুন। বাকি দু’জন দু’বছর ধরে কাজ করছে।”
“হাউ অ্যাবাউট দ্য ফোর্থ ওয়ান স্যার?”
“আই অ্যাম নট শিওর,” রাজ সিং উত্তর দিলেন।
একেনবাবু দেখলাম ঘন ঘন পা নাচাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী, কিছু বুঝলেন?”
“আই হ্যাভ এ সাসপিশান স্যার।”
“হোয়াট ইজ দ্যাট?” রাজ সিং খুব আগ্রহবরে জিজ্ঞেস করলেন।
“আই সাসপেক্ট দ্যাট উই আর লুকিং অ্যাট দ্য রং পার্সন।”
“তার মানে?” আমি আর রাজ সিং প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করলাম।
“ধরুন স্যার, একজন নয়, এই কনস্পিরেসিতে দু’জন টেলার জড়িত। একজন হচ্ছেন মিস জোনস, আর দ্বিতীয়জন হলেন মিস জোনসের পাশে যে দুজন বসেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন। যখনই কেউ এসে অনেক টাকা তুলছে, মিস জোনস ওঁর পার্টনারকে হয় কাগজ পাস করে, নয় পায়ে একটা খোঁচা দিয়ে সেটা জানাচ্ছেন। দ্যাটস নট ডিফিকাল্ট, কারণ সবাই একেবারে পাশাপাশি বসে আছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন স্যার, কি দারুণ স্ট্র্যাটেজি! আমরা সন্দেহবশত শুধু মিস জোনসকেই দেখছি। আর সেই ফাঁকে আর একজন নিশ্চিন্তমনে সিগন্যাল দিয়ে যাচ্ছেন।”
“মাই গড!” রাজ সিং ক্ষুব্ধ হয় মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, “হোয়াট এ ক্লেভার প্ল্যান! তার মনে, উই শুড লুক অ্যাট অদার্স ফর শোইং সিগন্যালস!”
“আই থিঙ্ক সো, স্যার।”
“এক্সেলেণ্ট, আই অ্যাম গোইং টু ডু দ্যাট।” রাজ সিং দারুণ খুশি হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। “আমি জানতাম আপনার কাছে এলে একটা হদিস হয়ে যাবে! ভালো কথা মিস্টার সেন, আপনাদের সকলকে একদিন লাঞ্চে নিযে যেতে চাই। ইউ আর অলওয়েজ সো কাইণ্ড অ্যাণ্ড হেল্পফুল!”
একেনবাবু অ্যাজ ইউজুয়াল, “আরে, ছি ছি, না,” বলতে যাচ্ছিলেন। প্রমথ বলল, “ফাইন, হাউ অ্যাবাউট দিস মানডে।”
“বেশ তো, আসুন না। ফর্টি সেকেণ্ড স্ট্রিটে কয়েকটা ভালো খাবার জায়গা আছে, তার একটাতে যাওয়া যাবেখন।” এই বলে রাজ সিং বিদায় নিলেন। চলে যাওয়ার পর খেয়াল হল, উনি ভিডিওটা ফেলে গেছেন। যাক, সোমবার নিযে গেলেই চলবে!

সোমবার দিন সকালে আমার ক্লাস ছিল। ক্লাসের পর অনেক সময়েই ছাত্রদের অনেক প্রশ্ন থাকে। সেটা শেষ করে সময় মতো আমি লাঞ্চে পৌঁছোতে পারব কি না বুঝতে পারছিলাম না। তাই স্কুলে যাওয়ার আগে একেনবাবুকে বলে গেলাম, আমার জন্য সাড়ে এগরোটা থেকে এগরোটা পঁত্রিশ পর্যন্ত পোর্ট অথরিটি টার্মিনালের সামনে অপেক্ষা করতে। তার মধ্যে যদি না যাই তা হলে যেন আমাকে ছাড়াই ওঁরা লাঞ্চে যান। একেনবাবু অবশ্য একটু ঘ্যানঘ্যান করলেন, কিন্তু শেষমেশ মেনে নিলেন। আগে থেকে ব্যাপারটা ঠিক করে রেখে ভালোই হযেছিল, কারণ সেদিনি পিলপিল করে ছেলেমেয়েগুলো ঘরে এল। সকলের হাজারগণ্ডা প্রশ্ন। ফ্রি লাঞ্চতো মিস করলামই, সব কিছু চুকোতে চুকোতে প্রায় একটা। আমি বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পরে প্রমথের কাছে শুনলাম রাজ সিং নাকি ভীষণ আপসেট, কারণ একেনবাবুর থিয়োরি টোটালি ফেল মেরেছে! পরে অবশ যোগ করল, রাজ সিংয়ের যা বিদ্যেবুদ্ধি ও অবজারভেশন পাওয়ার - সেটা সত্যি নাও হতে পারে। যাই হোক, একেনবাবু আসেন নি। রাজ সিংকে অত্যন্ত বিচলিত ও আশাহত দেখে মরাল সাপোর্ট দিতে সিটি সেণ্ট্রাল ব্যাঙ্কে গেছেন।

একেনবাবু সন্ধ্যেবেলা যখন ফিরলেন, তখন আমি আর প্রমথ নিউজ শুনতে বসেছি। সিকিউরিটি ভিডিওটা টেবিল থেকে তুলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনার ভিডিও প্লেয়ারটা একটু চালাব?”
“শিওর। কিন্তু কি ব্যাপার, নিউজ শুনবেন না?”
“শুনব স্যার, একটা জিনিস চেক করে এক্ষুণি আসছি” বলে ওপরের তলায় আমার অ্যাপার্টমেণ্টে চলে গেলেন। যখন নেমে এলেন, তখন লোক্যাল, ন্যাশনাল দুটো নিউজই শেষ, মনে, প্রায় এক ঘন্টা পরে!
প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কি মশাই, কি করছিলেন এতক্ষণ ধরে!”
“কিছু না স্যার, আসলে মিস্টার সিং এত ঝামেলায় পড়েছেন! তাই ভিডিওটা আবার একটু দেখছিলাম স্যার, যদি কোনও ক্লু বেরিয়ে যায়!”
“ধন্য আপনার বন্ধুপ্রীতি!” প্রমথ ধমকের সুরে বলল, “জানেন, আপনার এই রাজ সিং গত সপ্তাহে কম সে কম দু’হাজার ডলার পকেটে পুরেছে! ফর গডস সেক, লেট হিম আর্ন হিজ ওন মানি।”
“তা তো বটেই স্যার,” একেনবাবু অপরাধী মুখ করে বললেন।
আমি প্রমথকে বললাম, “কেন ওঁকে জ্বালাচ্ছিস? উনি হচ্ছেন কর্মযোগী! নিজের কাজ উনি কর যাবেন, অর্থপ্রাপ্তি হোক বা না হোক। কি বলেন একেনবাবু, ঠিক কিনা?”
“কি যে বলেন স্যার। সামান্য একটু সাহায্য...”
“যাক, ওসব কথা,” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মিস্ট্রি সলভ হযেছে? শুনলাম আপনার থিয়োরিও নাকি ফেল?”
“হ্যাঁ স্যার, কালকেরটা ফেল তবে এবার আর এটা থিয়োরি ট্রাই করছি।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রাজ সিংয়ের ফোন। একেনবাবুর খোঁজ করছেন। একেনবাবু ফোন ধরবার জন্য উঠতেই খেয়াল করলাম যে ওঁর চেয়ারে একটা কাগজ, আর তাতে ২০, ১০০, ৫৫, ১২০, ৪০, ১১০, ৫৩, ১৩০, ইত্যাদি অনেক সংখ্যা লেখা। তার মধ্যে আবার ৫৫ আর ৫৩-র চারদিকে একটা করে গোল আঁকা। কি হাবিজাবি লিখেছেন কে জানে! একেনবাবু ওদিকে ফোন তুলে বললেন, “আই গট দ্য টাইম স্যার ফ্রম ফিফ্টি সেকেণ্ডস টু ওয়ান মিনিট। তবে সাউণ্ড নেই বলে কিছুটা স্যার গেস ওয়ার্ক করেছি।”
রাজ সিং কি বললেন শুনতে পেলাম না, কিন্তু একেনবাবু উত্তরে বললেন, “দ্যাটস ইট স্যার, উই গট ইট! সিম্পল, বাট এ ক্লেভার প্ল্যান।”
রাজ সিং বোধ হয় আবার কিছু একটা বললেন। উত্তরে একেনবাবু বললেন, “ইউ শুড থ্যাঙ্ক বপিবাবু। উনি কথাটা না তুললে আমার ব্যাপারটা স্ট্রাইক করত না। ঠিক আছে স্যার, কাল বিকেলে তা হলে দেখা হবে। বাই স্যার।”
একেনবাবু ফোন নামিয়ে রাখতেই প্রমথ প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপার বলুন তো? বাপিটা এত থ্যাঙ্ক ইউ পাচ্ছে কেন, হোয়াটস গোইং অন?”
“আমাদের থিয়োরিটা কনফার্মড হযে গেল স্যার!”
“ওয়েট এ মিনিট, আমাদের থিয়োরি বলতে কোনটা? কালকের থিয়োরিগুলো তো সব ফেল মেরেছে বললেন!” আমি বলে উঠলাম।
“বলছি স্যার, বলছি, একটু সবুর করুন। আপনিও একেবারে প্রমথবাবুর মতো অবুঝ হয়ে পড়ছেন।“
“খামকা আমার নিন্দা করবেন না!“ প্রমথ ধমক দিল।
“তুই চুপ কর তো! বলুন, একেনবাবু, কি বলছিলেন।“
“মনে আছে স্যার, সকালে আপনি বলেছিলেন সাড়ে এগরোটা থেকে এগরোটা পঁয়ত্রিশের মধ্যে যদি আপনি না আসেন, তা হলে আমরা যেন চলে যাই।”
“তা বলেছিলাম।”
“সেটা শোনামাত্রই আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এখানে কোডিং হল টাইম স্যার, টাইম হচ্ছে সিমপ্লেস্ট ওয়ে টু পাস ইনফরমেশন। ওই যে আপনি বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে না এলে আমি আর আসব না। ইট ইস এ পারফেক্ট মোড অব কমিউনিকেশন, বিকজ উই অল হ্যাভ আওয়ার ওয়াচ। বুঝতে পারছেন তো স্যার?”
সত্যি কথা বলতে কী, এর সঙ্গে মাগিং-এর কী সম্পর্ক আমার কাছে তখনও ক্লিয়ার নয়।
একেনবাবু বলে চললেন, “এবার খেয়াল করুন স্যার, কাস্টমার এলে মিস জোনস বলছেন, মে আই হেল্প ইউ। তারপর কাজকর্ম শেষ হয়ে যাওয়ার পর বলছেন থ্যাঙ্ক ইউ অ্যাণ্ড হ্যাভ এ নাইস ডে। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘মে আই হেল্প ইউ’ আর ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ এর মধ্যে যে সময়টা, কুড দ্যাট বি ইউজড টু সেন্ড এ মেসেজ? আই ফাউণ্ড দ্যাটস হোয়াট প্রিসাইসলি ওয়াজ দান। টাইম গ্যাপটা যদি পঞ্চাশ সেকেণ্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যে হয়, তা হলে কাস্টমার অনেক টাকা তুলেছে। সেটা না হলে জাস্ট ইগনোর দ্য কাস্টমার। বুঝতে পারছেন স্যার?”
“ও বুঝুক না বুঝুক, আমি বুঝেছি,” প্রমথ বলল।
“জলবৎ তরলম!” কাগজের নম্বরগুলো দেখিযে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি সেটাই ভিডিও থেকে চেক করছিলেন নাকি?”
“ইয়েস স্যার, যে দুটো কেস মিস্টার সিং বলেছিলেন, সে দূটোই এক মিনিটের খুব কাছাকাছি। তবে শব্দ ছিল না বলে এগজ্যাক্ট টাইমটা বের করা অসম্ভব। কিন্তু অন্য কাস্টমারদের ক্ষেত্রে সমযগুলো বেশি বা কম। মিস্টার সিং বলেছিলেন না যে মিস জোনস কাস্টমারদের সঙ্গে মাঝেমাঝে গল্প গুজব করতেন? আমার ধারণা স্যার গল্পগুজব করেই উনি টাইমিংগুলো ঠিক ঠাক রাখতেন। এনিওয়ে স্যার, আজকের মাগিং রিপোর্ট থেকে মিস্টার সিংও থিয়োরিটা কনফার্ম করলেন। পরদিন রাজ সিং এসে পুরো রিপোর্ট দিলেন। ছদ্মবেশী পুলিশ রাজ সিংয়ের কাছ থেকে ক্লু নিয়ে প্রসপেকটিভ মাগিং ভিকটিমদের ফলো করে দুজন মাগারকে গ্রেফতার করছে। তাদের স্বীকারোক্তি থেকে মিস জোনসকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজ সিং আমাদের না বললেও পরে শুনেছি, ম্যানহ্যাটানের মাগিং মিস্ট্রি সলভ করার জন্যে ক্লিফোর্ড জনসন নাকি রাজ সিংকে ওঁর প্রাপ্য টাকা ছাড়াও আরও পাঁচ হাজার ডলার পুরষ্কার হিসেবে দিয়েছেন।

সুজন দাশগুপ্ত


এক সময়ে ছোটদের জন্যে ধাঁধা ও রহস্যকাহিনী লিখেছেন আনন্দমেলা ও কিশোরমন পত্রিকায়। গোয়েন্দা একেনবাবু প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, আনন্দমেলা পত্রিকায়। একেনবাবু সেই একই আছেন, শুধু গল্পগুলো এখন আর ঠিক ছোটদের জন্যে নয়। এই গল্পটি অরুণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সেরা গোয়েন্দা সেরা রহস্য’ (প্রকাশক পুনশ্চ, কলকাতা) থেকে নেওয়া।