রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী – সাহিত্য না অন্য কিছু ?

এক ধরনের উচ্চাঙ্গ বা ক্লাসিকাল সাহিত্য আছে যা কেবলমাত্র উচ্চস্তরের সাহিত্যরসিকেরাই প্রাণভরে উপভোগ করে থাকেন । তাঁদের সংখ্যা কিন্তু শতকরা কুড়ি জনের বেশি নয় । বাকি শতকরা আশি জন যে ধরনের বই পড়ে আনন্দ পান, তাকে উচ্চস্তরের সেই সাহিত্যরসিকেরা কদাচিৎ উচ্চাঙ্গ সাহিত্য বলে মূল্য দিতে চান । উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও আর্থার কোনান ডোয়েলের জনপ্রিয়তার তুলনা মূলক বিশ্লেষণ করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায় । বাংলায় শরৎচন্দ্র আর শরদিন্দু ব্যাপারেও সেই একই কথা বলা যায় । সাহিত্যের মাপকাঠিতে কে কতটা ওপরে বা নিচে তার নিরপেক্ষ সমালোচনাও হয়ত করা হয়েছে বহুবার । আপাতদৃষ্টিতে রহস্য ও রোমাঞ্চ এর প্রধান উদ্দেশ্যই হল সাধারণ মানুষকে তাঁদের দৈনন্দিন ঘটনাচক্র থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি দেওয়া । যদিও তাঁদের নিজেদের জীবনের ধারা অতি সাধারণ কিন্তু একটা আশ্চর্য আর অসাধারণের ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় তাঁরা সর্বদা আপ্লুত হয়ে থাকেন । সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকেই যে এই রোমাঞ্চকর সাহিত্যের জন্ম সে ব্যাপারে দ্বিমত থাকার কথা নয় । একটি ভাল রোমাঞ্চকর বইয়ের মাধ্যমে এই তীব্র আকুলতা অনায়াসে পূরণ হয়ে যায় । এই বইয়ের ভিতরে থাকে না মামুলি ঘটনার বিবরণ । এই গল্পের ইন্ধন নীরস আর একঘেয়ে নয় । সব কিছু অভাবনীয়, চাঞ্চল্যকর, মনোময় ও রোমাঞ্চকর । পাতায় পাতায় থাকে মাকড়শার জাল দিয়ে ঘেরা রহস্যের বেড়াজাল । সেই রকম বই হলে খুব অল্প খরচে এক অভূতপূর্ব জগতে নিমেষের মধ্যে চলে যাওয়া যায় ।

রহস্যের প্রতি যে কোন মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার । কিছুটা হয়ত জন্মগত । শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত আমজনতার মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই আছেন যিনি রহস্য কাহিনীতে কৌতূহলী নন, কিংবা রহস্য কাহিনীতে মগ্ন হয়ে যাননি । গোয়েন্দা গল্পের সর্ব প্রথম স্রষ্টা কে বলা শক্ত, তবে এটা হলফ করে বলা যায় যে হাজার হাজার বছর আগে যখন মানুষের জন্ম হয়েছিল অপরাধ বোধের সূচনাও হয়েছিল একই সাথে । আর মানুষের মধ্যে যখন প্রথম অপরাধ বোধ জাগল সমাজে ঠিক তখনই নির্ঘাত ভাবে আবির্ভাব হয়েছিল একাধিক গোয়েন্দার । আর সেই গোয়েন্দাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছিল আর এক দল লোক । এনারাই হলেন গোয়েন্দা গল্পের লেখক ।

সমাজের সব মানুষই গোয়েন্দা গল্পের পাঠক কিন্তু সাহিত্যের সব সেবক এর লেখক নন । গোয়েন্দা কাহিনীর রূপরেখা অনুগমন করলে দেখা যাবে যে এই ধরনের গল্পের নিজস্ব এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ছক আছে এবং সেই ছকটি অন্য সব গল্প আর উপন্যাসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । ক্লাসিকাল সাহিত্যের সেবকরা ঘোরাফেরা করেন মানুষের মনের সদর রাস্তা দিয়ে। যদি বা কখন ভুল করে সরু কোন গলিতে ঢুকেও পড়েন তা হলেও সেই গলি থাকে আলো দিয়ে সাজানো । গোয়েন্দা কাহিনীর লেখকদের ঘোরাফেরা মানুষের মনের সঙ্কীর্ণ গুপ্ত গলিতে যেখানে থাকে শুধু অন্ধকার । কদর্যতা, নোংরা, বিপজ্জনক এবং কুৎসিত এর আবরণে ঢাকা এই গলির ভিতরে যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে তাকে অন্ধকার থেকে আলোয় টেনে বের করে আনার অসাধ্য সাধন করাই হল গোয়েন্দা কাহিনীর লেখকের মূলমন্ত্র । এই মূলমন্ত্রে পৌছনোর আগে পশ্চাৎ-পটভূমিতে লেখক আর পাঠকের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতামূলক এক বুদ্ধির লড়াই । এই প্রতিযোগিতায় জিৎ এর ওপরেই নির্ভর করে লেখকের সার্থকতা ।

এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও তাঁর মন্তব্যের নজির টানা খুবই দরকার । তিনি বলেছিলেন রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্য হিসেবে স্থান নিশ্চয়ই পেতে পারে । গল্পের বুনিয়াদ তো একই – মনুষ্য চরিত্র আর মানব ধর্ম । শুধু একটু রহস্যের গন্ধ আছে বলে সেটা নিম্ন মানের হবে কেন । নোবেল পুরস্কার পাওয়া অনেক লেখকও এই ধরনের গল্প লিখেছেন । ভাষা হল গল্পের মিডিয়াম, সেই মিডিয়াম যদি ভালো না হয় তবে গল্প বলাও ভালো হবে না । গোয়েন্দা গল্প হলেও সেটাও একটা গল্প বই তো নয় । সুতরাং গল্পকে মনোজ্ঞ করে বলতে হবে ।

সাহিত্য মানুষের রুচি পাল্টায় না মানুষের রুচির বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে সাহিত্য বদলায় ? প্রশ্নটি যেমন শক্ত এর উত্তরটিও তেমনই । স্থান, কাল আর পাত্র ভেদে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও অজানা ।

সুব্রত মজুমদার

লেখক সাউথ ক্যারোলিনার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এইকেন শহরের বাসিন্দা।