রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

ভূতুড়ে জাহাজে ভূত দর্শন

ছেলেবেলায় কত রকমের ভূতুরে জাহাজের গল্প শুনেছি।  কোনও এক্ক ঘর ছাড়া, সমুদ্দুরে হারিয়ে যাওয়া কাপ্তেন ও তাঁর নাবিকের দলের গল্প। যারা নাকি যুগ যুগ ধরে সীমাহীন সমুদ্দুরে দিকহীন ভাবে ঘুরে বেড়ায়। গল্পটির নাম ফ্লাইং ডাচম্যান। সব নাবিকেরই স্থির বিশ্বাস দরিয়ায় জাহাজ পেলে এই ভূতুরে জাহাজের কাপ্তান তাদের দিগভ্রান্ত করে ডুবিয়ে ছাড়বে। ঠিক সেই রকমই এক জলদস্যুর ভৌতিক জাহাজ দরিয়ায় ঘুরে বেড়ায় একা জাহাজকে জলের তলায় টেনে নিয়ে যেতে। সেই জাহাজের নাম ব্ল্যাক বিয়ার্ড।

যারা সমুদ্দুরকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেয় তারা বোঝে সমুদ্রের বিপুল জলরাশির কাছে মানুষ কতটা অসহায়। তারা বোঝে প্রকৃতির কাছে তারা কত ক্ষুদ্র। পাড়ে দাঁড়িয়ে মানুষ যতই লম্ফ ঝম্প করুক না কেন, একবার সমুদ্দুরে ভেসে পড়লে তার সব জারিজুরি ডাঙাতেই রয়ে যায়। সমুদ্রে জলের পরাক্রম তার সঙ্গে প্রকৃতির তেজ যখন দেখে, অনুভব করে, তখন সব নাবিকই এই শক্তিকে সমীহ আর সম্মান করতে শেখে। সেই জন্যেই বোধহয় নাবিকেরা অসম্ভব রকমের আধিভৌতিক ব্যাপারে বিশ্বাসী হয়। তারা ভীষণ রকমের কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়। আমার মনে হয় প্রকৃতি ও জলের সংহার মূর্তি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে ওয়াকিবহাল হওয়া এর একটি প্রধান কারণ।

এবারে আমার নিজের দেখা ভূতের জাহাজের গল্প বলি। ভারতের সর্বপ্রথম বানিজ্যিক জাহাজ কোম্পানিতে ১৯৭০ সালে আমার চাকরি জীবনের শুরু। প্রায় প্রতিটি জাহাজ কম করে ১৫ বছরের পুরোনো। কিন্তু প্রতিটিকে এত যত্নে রাখা হত যে দেখলে বয়স বোঝা যেত না। অনেক পুরোনো জাহাজ বলে প্রায় প্রতিটি সম্পর্কেই কিছু না কিছু গল্প-গাথা লোকের মুখে মুখের ফিরত। তবে এগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ জাহাজের নামে সব নাবিকই চমকে উঠত। সেই জাহাজে বদলি হলে অফিসার, ইঞ্জিনীয়ার, সাধারণ খালাসী যেন তেন প্রকারেণ নানান অজুহাত দিয়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করত।

সেই জাহাজেই পদোন্নতি দিয়ে আমাকে বদলী করা হল। বন্ধু বান্ধবেরা যারাই সে কথা জানতে পারল  দেখা করে শুভ কামনা জানিয়ে গেল। সকলেরই ভয় এই জাহাজে যাত্রা করলে আমার সঙ্গে আর কোনদিন বোধহয় দেখা হবে না। আমি অবশ্য নিজের বীরত্ব ফলাতে ওদের উপদেশ নস্যাৎ করে বুক ফুলিয়ে বলে বেড়ালাম সমস্ত ব্যাপারটা ধাপ্পা  আর বুজরুকি; কোন জাহাজ ভয় বা আতঙ্কের হতে পারে না। সবই ভীতু মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের অলীক কল্পনা। এই জাহাজে বদলীর সময় আমি 'তিন সাহেব,' মানে থার্ড ইঞ্জিনীয়ার। সেই সময়ে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে তিন সাহেবের ডিউটি পড়ত রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে অবধি; আবার দিন বারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত। জাহাজী ভাষায় এই ডিউটির নাম 'কবর পাহরা' বা গ্রেভ ইয়ার্ড ওয়াচ। যখন সমস্ত জাহাজ ঘুমে অচেতন, তখন তিন সাহেব ও তার সহায়ক তেলওয়ালা বা ওয়েলম্যান পেঁচার মতন জেগে থেকে চলমান যন্তরের দেখভাল করে সত্যি বলতে কি সেই সময়ে মনে হত মস্ত জাহাজটা একটা বিশাল কবরখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। জীবিত প্রাণ বলত ব্রিজে সেকেণ্ড অফিসার ও সাথ সুখানী (হেল্মস ম্যান বা সীম্যান), নিচে, জাহাজের পেটের মধ্যে, ইঞ্জিন ঘরে তিন সাহেব ও তার তেলওয়ালা।

বম্বে থেকে বেরোবার আগে জাহাজের সবাইকে নিয়ে একটা আলোচনা সভা ডাকলেন ক্যাপ্টেন ও চিফ ইঞ্জিনীয়ার। সমুদ্রে কে, কি ভাবে, কি কাজের ভার প্রাপ্ত হবে তাই নিয়ে আলোচনা। কবর ডিউটিতে যারা থাকবে তাদের জন্যে বিশেষ নির্দেশ এল। ইঞ্জিন ঘরের একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে একটা শাফ্ট ইঞ্জিনের সঙ্গে জাহাজের প্রপেলারের সংযোগ ঘটায়। চলমান ইঞ্জিন শাফ্টটা ঘুরিয়ে জাহাজকে সামনে বা পেছনে চলতে সাহায্য করে। সুড়ঙ্গটা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ফুট লম্বা হওয়ায় সমদূরত্বে বেয়ারিং লাগিয়ে শাফ্টটাকে সোজা রাখতে হয়। প্রতিটি বেয়ারিং-এর ভেতর দিয়ে শাফ্টটা যায় ও ঘোরে। জাহাজ চলাকালীন এই বেয়ারিংগুলোর ওপর ইঞ্জিনীয়ার নজর রাখে।

সুড়ঙ্গটা ঢাকা থাকে একটা ওয়াটার টাইট দরজা দিয়ে। ক্যাপ্টেন আমাদের নির্দেশ দিলেন এই দরজাটি রাত বারোটা থেকে ভোর ছ'টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। তারই সঙ্গে ব্রিজের দুপাশে উইংসে যাওয়ার দুদিকের দরজাও বন্ধ থাকবে। শাফ্ট সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে, যেখানে এমার্জেন্সি এস্কেপের একটা সিঁড়ি আছে, সেখানে নাকি ইঞ্জিনের এক সারেঙ গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে গেছিল। তার আত্মা রাতের ঐ সময়ে চলমান শাফ্ট ও বেয়ারিংগুলোর দেখভাল করে, তাই জীবন্ত মানুষের সেখানে ঢোকা বারণ। প্রায় একই গল্প ব্রিজের দরজার ব্যাপারেও। বান্ধবী তাকে ছেড়ে অন্যের সঙ্গে চলে গিয়েছিল বলে ওপরের ব্রিজ উইং থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল সেকেন্ড অফিসার। সেও নাকি প্রতি রাতে ডিউটি দিতে আসে। তাই সেখানেও কোন জ্যান্ত মানুষের যাওয়া নিষেধ। সব গল্পই বাধ্য ছেলের মত শুনলাম। কোন আদেশই মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। ভূত, প্রেত, আত্মা, কোন কিছুতেই আমার বিশ্বাস নেই। ভাবলাম যা শুনলাম তার সত্যতা আদৌ আছে কি!

বম্বে থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজ ভোর রাতে ভেসে পড়ল জার্মানী ও বেলজিয়ামের পথে। দুপুরের ডিউটিটা ভালভাবেই কাটল। এবার অপেক্ষায় রইলাম রাতের ডিউটির জন্যে। মনে একটু ভয়, একটু ভাবনা, একটু চিন্তা - সত্যি কি ভূত দেখতে পাব? তার বিচরণ ভূমিতে দেখতে পেলে সে কি আমার কান পেঁচিয়ে চড় মারবে, না ঘাড় মটকাবে? মনে মনে বেশ রোমাঞ্চ লাগছিল। আমার মনের ভাবনা চিন্তা নিয়ে অন্য কারোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারছিলাম না। যাকেই বলি না কেন, সে ব্যাপারটা হয় ক্যাপ্টেন বা বড় সাহেবকে (চিফ ইঞ্জিনীয়ার) জানাবে। এই জানানোর ব্যাপারটা কিন্তু চুকলি বা কোন ভাবেই অন্যায় নয়। আমাকে যাতে ভূতের হাত থেকে বাঁচানো যায় সেই তাগিদেই এই নালিশ করবে। নিজের ভাবনা নিজের মধ্যে চেপে রেখে সন্ধ্যা ছ'টায় রাতের ডিনার সেরে রাত এগারোটা পর্য্যন্ত বিশ্রাম নেবার জন্যে নিজের কেবিনে গেলাম।

রাত সাড়ে এগারোটার সময়ে ধরাচূড়া পরে তৈরী হয়ে ইঞ্জিন রুমে নামলাম। ইঞ্জিন রুম পাহারার ভার নেওয়ার আগে প্রতিটি চলন্ত মেশিন ভাল ভাবে পরীক্ষা করে নেওয়াই নিয়ম। এই সময়ে সেই লম্বা সুড়ঙ্গে (শাফ্ট টানেল) ঘুরন্ত প্রপেলার শাফ্ট ও তার ১৪ থেকে ১৬টা বেয়ারিং পরিক্ষা করে দেখতে হয়। কিন্তু ইঞ্জিন রুমের সর্বনিম্ন তলায় নেমে দেখি সুড়ঙ্গের লোহার ঢাকা বন্ধ। আইন মোতাবিক এটা দণ্ডণীয় অপরাধ। যে ইঞ্জিনীয়ারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছিলাম, তাকে জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর দিল রাত ১২টা থেকে ভোর ছ'টা পর্যন্ত সুড়ঙ্গের ওয়াটার টাইট দরজা বন্ধ থাকবে সেটাই এই জাহাজের অলিখিত নিয়ম। যে চার ঘণ্টা আমি ইঞ্জিনের সব যন্ত্রের দেখভাল করার দায়িত্ব নিচ্ছি, সে সময়ে সুড়ঙ্গের দরজা বন্ধ থাকলে বেয়ারিংগুলো কেমন করে দেখব তা জানতে চাইলাম। ইঞ্জিনের সারেঙ উত্তর দিল এতদিন পর্যন্ত সঠিক সময়ে দরজা বন্ধ রেখেও কোন বেয়ারিং নষ্ট হয় নি। অতএব কোনও চিন্তা নেই।

তখনকার মতন চুপ করে থাকলেও ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল না দেখে না বুঝে এই সারেঙ্গের ভূতের গল্প মেনে নিতে হবে? কিছুক্ষণ ইঞ্জিন রুমে ঘোরাগুরি করে ধীরেধীরে সেই সুড়ঙ্গের দরজার সামনে গিয়ে হাইড্রলিক পাম্প ঘুরিয়ে লোহার দরজাটা খুলে ফেললাম। জাহাজের সব ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে একটা তিন ব্যাটারীর টর্চ থাকে। সেটা ডান হাতে চেপে ধরে সুড়ঙ্গের ভেতরে কিছুটা ঢুকে গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলাম যদি কিছু বা কাউকে দেখা যায়। অনেক চেষ্টা করেও কিছু চোখে পড়ল না। শুধু যেন ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগল ঘাড়ে মুখে । একেবারে যে কিছুই উপলব্ধি হচ্ছিল না তা বললে মিথ্যে বলা হবে। কেমন একটা শিরশিরানী ভাব, একটু ভয়, একটু উত্তেজনায় ঘাড়ের রোঁয়া সব খাড়া হয়ে উঠেছিল। তবুও বারবার মনে হচ্ছিল ভূত না দেখেও কি করে মনে করি উনি আমার জাহাজে আছেন?

এর মধ্যে দেখি আমার ইঞ্জিন ঘরের সাথী তেলওয়ালা চা তৈরী করে আমাকে খুঁজছে। সে আমাকে সুড়ঙ্গ থেকে বেরোতে দেখে কিছুক্ষণের জন্যে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর শুরু করল বকাঝকা। কেন আমি সুড়ঙ্গের দরজা খুলেছি আর কোন সাহসে কসুড়ঙ্গের ভেতরে পা দিয়েছিলাম? তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম ভূত বা আত্মা বলে কিছুই নেই, সবই মানুষের কল্পনা প্রসূত। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কথা। কোন ভাবেই তেলওয়ালা মহম্মদকে আমার কথা বোঝাতে পারলাম না। কি আর করা। নিজের ভাবনা নিজের মধ্যে রেখে দিয়ে চার ঘণ্টা পরে ভোর চারটার সময় পরবর্তী ইঞ্জিনীয়ারকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমি ও আমার তেলওয়ালা ছুটি নিলাম। ক্যাবিনে ফিরে এসে বারবার মনে হতে লাগল অন্যের কথায় জাহাজী ভূতের অবস্থান মেনে নেব? মোটামুটি ঠিক করলাম যা থাকে কপালে, পরের রাতে কাজের সময়ে ইঞ্জিন রুমের সুড়ঙ্গে ঢুকে দেখবো কি আছে সেখানে!

সেই মতনই নিজেকে মানসিক ভাবে তৈরী করে রাত সাড়ে এগারোটার সময়ে ইঞ্জিন ঘরে নামলাম, সব চলমান যন্ত্রপাতি দেখে বুঝে নিলাম। কিছুক্ষণ পরে ছুটি প্রাপ্ত ইঞ্জিনীয়ার ও তার সাথী তেলওয়ালা ওপরে উঠে যাওয়ার পরে ইঞ্জিন ঘরে এলাম আমি ও আমার তেলওয়ালা মহম্মদ। তার তৈরী চা খেতে খেতে নানান আলোচনার মাঝে সুড়ঙ্গের কথা পাড়লাম। অনেক ধানাই পানাইয়ের পরে আমার প্রস্তাব রাখলাম ওর কাছে। আমি সুড়ঙ্গের অল্প কিছুটা ঢুকে বেয়ারি^nগুলোর অবস্থা দেখে ঝপ করে বেরিয়ে আসব। সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত কিছুতেই যাব না।

প্রথমে তো সে কিছুতেই আমার কথা শুনবে না। কোন বছরে, কোন সময়ে, কাকে ইঞ্জিনী সারেঙের আত্মা সুড়ঙ্গে মেরে রেখে গেছিল সে সব গল্প শুনতে হল। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা, সুড়ঙ্গের ভেতরে ভূতের খোঁজে ঢুকবই। অনেক সাধার পরে মহম্মদ নিমরাজী হল। আমার সঙ্গে চুক্তি হল সে ভেতরে ঢুকবে না, সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়াবে। যদি দরকার হয়, আমাকে বাঁচাবে। আমি সানন্দে তাতেই রাজী হয়ে গেলাম। তবে ওকে হলফ করিয়ে নিলাম আমাদের এই ব্যাপারটা সে তৃতীয কান হতে দেবে না।

প্রপেলার শাফ্ট টানেলের ওয়াটার টাইট ঢাকা হাইড্রলিক পাম্প চালিয়ে খোলা হল। ঢাকাটা সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় রাখা হল যাতে আমি ভেতরে ঢোকার পরে অসাবধানতা বশতঃ সেটা বন্ধ না হয়ে যায়। মহম্মদ তখনও বলে যাচ্ছে, "মত ঘুসো তিন সাব, বন্ধ করদুঁ দরওয়াজা।" একবার যখন ওকে রাজী করাতে পেরেছি, আমি পেছোতে নারাজ। এ সুযোগ আমি খোয়াতে পারব না। একবার যদি পেছিয়ে আসি তবে জীবনে আর মহম্মদকে রাজী করানো যাবে না। কাজেই হয় আজ রাতেই নয়ত আর কখনই হবে না।

হাতে তিন ব্যাটারীর টর্চ নিয়ে সুড়ঙ্গের ছোট্ট দরজাটা দিয়ে মাথা সামলে ঢুকে পড়লাম। সমস্ত ইঞ্জিন ঘরের মধ্যে শুধু এই জায়গাটাতে ইঞ্জিনের চলমান যন্ত্রের শব্দ ঢোকে না। সত্যি মনে হবে কোন কবরখানায় রাত্রিবেলায় এসেছি। এত শান্ত, এত নিস্তব্ধ এই সুড়ঙ্গ আর ইঞ্জিন ঘরের চেয়ে অনেক অনেক বেশী ঠাণ্ডা। বাইরের সমুদ্রের ঢেউ যখন জাহাজের খোলে ধাক্কা মারে সে শব্দ পর্যন্ত এখানে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।

ডান হাতের টর্চের আলোয় প্রথম বেয়ারিঙে হাত রেখে দেখলাম গরম হচ্ছে কিনা। পরীক্ষা করলাম ভেতরের লুব্রিকেটিং তেলের মাত্রা ঠিক আছে কিনা। গরম হয়ে যাতে আশেপাশের যন্ত্রগুলো গলিয়ে না দেয় প্রপেলার শাফ্টকে এই তেলে চুবিয়ে রাখতে হয়। এই ভাবে ধীরে ধীরে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বেয়ারিং পর্যন্ত পৌঁছেছি, এমন সময় দরজার সামনে থেকে মহম্মদের চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। সে ভয়ঙ্কর চেঁচিয়ে আমাকে fire যেতে বলছে। হাত নেড়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম কিছুক্ষণের মধ্যে আর দুটো বেয়ারিং দেখেই ফিরে যাব। সুড়ঙ্গের মধ্যে এগোতে থাকলাম আস্তে আস্তে। গা ছমছম করছিল ঠিকই, কিন্তু অদম্য কৌতুহলে এগিয়ে যচ্ছি। খেয়াল করলাম যত গভীরে এগোচ্ছি, ততই চারধার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে ঠাণ্ডাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

আর একটু এগোবার পর মনে হোল মুখে হাতে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া লাগছে। গল্পে পড়েছি অশরীরীদের আবির্ভাব হলে ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত বয়। ঘাড়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে উঠছিল। ভাবলাম আর ভেতরে গিয়ে লাভ নেই। ভূত থাকুক ভূতের মত, আমি ফিরে যাই আমার জায়গায়। তারপরই মনে হল যাকে চোখে দেখা যায় না, তার কাছে হেরে যাব? কাজেই ফেরৎ যাওয়া বাতিল করে ঠিক করলাম সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত যেতেই হবে। সারেং ভূতের সঙ্গে দেখা হলে হোক।

মাঝে মাঝে কানে আসছে দূর থেকে মহম্মদের চিৎকার। এদিকে গায়ে মুখে মাথায় বেশ ভাল মত ঠাণ্ডা হাওয়া অনুভব করছি। বুঝতে পারছি ঠাণ্ডা হাওয়াটা আমার মনের ভ্রম নয়। দাঁত চিপে হাতের টর্চটা বাগিয়ে এগিয়ে চলেছি। চারপাশের আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে বইছে ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঝাপটা - মাঝে মাঝে বাড়ছে, আবার কমেও যাচ্ছে। এত শীতেও বেশ ঘাম হচ্ছে বুঝতে পারছি। এবার কানে এল অদভুৎ ধরণের আওয়াজ - থমকে থমকে। মনে হচ্ছে ক্যাঁচ ক্যোঁচ আওয়াজ করে কেউ যেন দরজা খুলছে আর বন্ধ করছে। আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম। কান দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছি কিসের আওয়াজ, কোত্থেকে আসছে এই ঠাণ্ডা হাওয়া?
সুড়ঙ্গের শেষের বেয়ারিঙটা হল ১৬ নম্বর। এক পা এক পা করে সেটার সামনে এসে দঁড়ালাম। ঠিক সেখান থেকে লোহার একটা খাড়া সিঁড়ি ওপরের ডেকে উঠেছে। আপৎকালে এই সিঁড়ি দিয়ে ইঞ্জিনঘর থেকে পালানো যায়। ইঞ্জিনের সারেং এই সিঁড়িরই কোণে একটা লোহার ধাপ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে গেছিল।

যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানে ওপর থেকে ঝোড়ো ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে aasachhe। দরজা খোলার ক্যাঁচ ক্যোঁচ শব্দটাও  আসছে ওপর থেকে। মনে হল যেন সিঁড়ি দিয়ে কেউ নেমে আসছে। যে নেমে আসছে তার জন্যে বেশ কিছুক্ষণ নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করলাম। ভয়ে ওপরে চোখ তুলতে পারছি না, কি জানি কাকে দেখব!  কিছুক্ষণ পরেও কেউ যখন আমার ঘাড়ে এসে পড়ল না, তখন সাহস করে ওপরের দিকে তাকালাম। সিঁড়ির স্বল্প আলো আর টর্চের আলোয় বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। ভাবলাম কোন অজ্ঞাত কারণে সারেঙের ভূত আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। মনে সাহস এল। ঠিক করলাম সিঁড়ি দিয়ে ডেকে উঠে দেখব|

ওপরে উঠছি। বুঝতে পারছি ঠাণ্ডা হাওয়ার তেজ বাড়ছে; ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দটাও। সিঁড়িটা খোলা ডেকে শেষ হয়েছে বলে একটা টাইট ঢাকা দিয়ে মুখটা বন্ধ থাকে যাতে ঝড় জলের সময়ে সমুদ্রের জল ইঞ্জিনের সুড়ঙ্গে ঢুকে না যায়। শেষ ধাপে পৌঁছে চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা ওপর দিকে ঠেলে খুলতে হয়।

ঢাকাটা খুলতে গিয়ে দেখি কেউ ভুল করে লোহার ঢাকাটা খোলা অবস্থায় রেখে গেছে। জাহাজের দোলার সাথে ঢাকাটা অল্প খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। একটু উঠে ফাঁক হলে সেই পথে বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে আসছে সুড়ঙ্গে, আবার ঢাকা বন্ধ হলে বাতাস চলাচল থমকে যাচ্ছে। ক্যাঁচ ক্যোঁচ আওয়াজটা হচ্ছে দোদুল্যমান দরজার কব্জা থেকে। কব্জার তেল শুকিয়ে নড়াচড়ার সময় এই শব্দ করছে।

খোলা ডেকে উঠে এসে ভয়ের ঘাম শুকোলাম। বুঝলাম সারেঙের ভূত আমাকে সদয় চোখে দেখেছে। আমার কোন ক্ষতি করবে না। ডেক থেকে ইঞ্জিন ঘরে নেমে দেখি সুড়ঙ্গের মুখে মহম্মদ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে প্রথমে পিঠে মারল বিরাশী সিক্কার এক থাপ্পড়। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে তার সে কী কান্না। তাকে যতই শান্ত করতে চেষ্টা করি, ততই তার কান্না বাড়ে। কোন রকমে বললাম আমি কাউকে দেখিনি, কেউ আমার অনিষ্ট করে নি। সারেঙ ভূতের সুড়ঙ্গ থেকে বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মহম্মদ আমাকে শাসালো আর যদি কোন রাতে ডিউটির সময়ে সুড়ঙের মধ্যে ঢুকতে চাই, তবে চিফ ইঞ্জিনীয়ার আর ক্যাপ্টেনকে বলে সে কখনো আর আমার সঙ্গে ডিউটি করবে না। ফলে সেই জাহাজে যে ছ'মাস ছিলাম, আর কোন রাতে ডিউটির সময়ে সুড়ঙের মধ্যে ঢোকা হয় নি। পরে শুনলাম মহম্মদ তার সতীর্থদের বলেছে আমি বাঙালী, মা কালীর ভক্ত, তাই সারেঙের আত্মা আমাকে ছুঁতে ভয় পেয়েছে।

সুবীণ দাশ

লেখক একজন মেরিন ইঞ্জিনয়ার। বহু বছর চিফ ইঞ্জিনিয়ার-এর কাজ করে কিছুদিন হল অবসর নিয়েছেন। সখ লেখালেখি করা, ছবি তোলা ইত্যাদি।