রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

অপহরণ সিরিজ

প্রখ্যাত শিল্পপতি গজেন্দ্রনাথ শীল নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবরটা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল।এই ঘটনায় শহরের লোক আর নতুন করে আঁতকে উঠল না, কিন্তু দম প্রায় বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল পরের খবরটার জন্যে। পরের খবরটাও জানা গেল যথাসময়ে, আর সেটা জানার পরেও লোকে নতুন করে উত্তেজিত হল না। যেন এটাই স্বাভাবিক। পাঁচজনের বিস্ময়ের কারণ শুধু টাকার অঙ্কটা। পঞ্চাশ লাখ টাকা। অপহরণ করা একটা লোককে ফিরিয়ে আনার জন্যে গুনে গুনে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিতে হল!

কিন্তু উত্তেজিত হলেন স্বয়ং গজেন্দ্রনাথ শীল। খবরের কাগজে তাঁর বিবৃতি বার হল। উদ্যোগী সাংবাদিকরা শীল পরিবারের প্রতিক্রিয়াও ফলাও করে ছাপল। গজেনবাবু জানিয়েছেন, তাঁর প্রাণ বাঁচাবার জন্যে ছিনতাই পার্টির হাতে পঞ্চাশ লাখ টাকা তুলে দিয়ে তাঁর পরিবারের লোকরা চূড়ান্ত বোকামির পরিচয়ে দিয়েছে। না হয় তাঁর প্রাণ যেত, কিন্তু তাই বলে গুণ্ডা বদমাইশদের সঙ্গে আপোষ। প্রশাসন এবং পুলিশকেও গজেনবাবু একহাত নিয়েছেন। যা বলেছেন তা সরল করলে বোঝায়, পুলিশ এবং প্রশাসন অপদার্থ। কোনও একটা অপরাধের কিনারা করার ক্ষমতা নেই তাদের।

পুলিশদের গালাগালি দেওয়াটা শহরের লোকরা এক কথায় মেনে নিয়েছে, তবে তাদের মতে গজেনবাবুর পরিবারের লোকদের বোকা বলা যায় না কোনও মতেই। মুক্তিপণের টাকা না দিলে হয় তো পরদিনই গজেনবাবুর লাশ পড়ে থাকত শহরের মধ্যিখানে। যেমন হয়েছিল অরবিন্দ হালদারের বেলায়। মৃতদেহ পড়ে ছিল চৌরঙ্গীর মোড়ে। মাত্র পনেরো দিন আগেকার ঘটনা, এই ঘটনার পরে আর কোনও পরিবারের লোক ঝুঁকি নিতে পরে না। বিশেষ করে গজেন্দ্রনাথ শীল যখন কোটি কোটি টাকার মালিক। অরবিন্দ হালদারের আগে আরও তিনজন বড় ব্যবসায়ী অপহৃত হয়েছিল। কিডন্যাপারদের হাতে টাকা তুলে দিয়ে খালাস পেয়েছে তারাও। কিন্তু চোরা খুন, অপহরণ এখন আর শুধু বড়লোকদের মধ্যেই আটকে নেই, এই তো ক’দিন আগেই গরিব ঘরের আস্ত একটা পরিবারকে কে বা কারা নৃশংসভাবে খুন করে রেখে গেছে। শহরের সর্বত্র এখন চাপা আতঙ্ক। সন্ধেরাত্তির হতে না হতেই ব্যস্ত রাস্তা ঘাটগুলো ফাঁকা হয়ে যায়।

গজেন্দ্রনাথ শীল পুলিশ এবং প্রশাসনকে গালাগালি দিয়েই থামলেন না, বেশ নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ অপহরণকারীদের ধরবেনই। তার জন্যে যত টাকা খরচ হয় হোক, সব টাকা তিনিই দেবেন। এই নাটকীয় ঘোষণাটা খবরের কাগজওয়ালারা আরও নাটকীয়ভাবে ছাপল।

সেই সকালেই গজেনবাবুর মেরুন রঙের বিলিতি গাড়িটা গিয়ে থামল বিখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর তিলক চৌধুরীর বাড়ির সামনে। ডোরবেল বাজতেই দরজা খুললেন তিলক চৌধুরী। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “সুন মিস্টার শীল, আমি আপনাকেই আশা করছিলাম।”
তাই শুনে একটু হকচকিয়ে গিয়ে গজেনবাবু বললেন, “মানে?”
“মানেটা তো আজ সকালের খবরের কাগজগুলোই বলে দিয়েছে। কিন্তু আমি বলব স্টেটমেন্টটা কাগজে ছাপতে দিয়ে আপনি মস্ত ভুল করেছেন।
সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও বাড়িতে পা দেবর সঙ্গে সঙ্গেই কেউ যদি আসার উদ্দেশ্যটা ধরে ফেলে যে কেউই একটু চমকে যাবে। গজেনবাবুও চমকে গিয়েছিলেন, কিন্তু চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললেন, “যাক আমি তাহলে ঠিক লোকের কাছই এসেছি। আপনিই এ কাজটা করতে পারবেন। কিডন্যাপারদের এই দলটাকে ধরুন তো। টাকা পয়সার কথা ভাববেন না। আপনি যা চান তাই দেব।”
সামনের সোফায় গজেন বাবুকে বসে বলে আগের কথার জের টানলেন গোয়েন্দা। “আপনি কিন্তু সত্যিই ভুল করছেন। খবরের কাগজে আপনার ঐ বিবৃতিটা চাপতে দেওয়া উচিত হয় নি।”
“কেন?”
“কেন আপনি বুঝতে পারছেন না? আপনি বুদ্ধিমান লোক। কিডন্যাপাররা আপনার মতো একজন শত্রুকে কিছুতেই ছেড়ে দিতে চাইবে না। আপনার সঙ্গে গার্ড আছে?”
গজেনবাবু মাথা কাত করলেন এক পাশে।
“আর্মড না আনঅর্মড? জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা।
“আর্মড। পিস্তল আছে।”
“ক’জন গার্ড?”
“একজন।”
গোয়েন্দা দ্রুতগতিতে দু দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “একজনে হবে না। দু’জন নেবেন। ওরা গাড়ির পেছনের সিতে বসে দুই জানলায় চোখ রাখবে। আর আপনি বসবেন শোফারের পাশে।”
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে বাধ্য ছেলের মতো একদিকে মাথা নাড়লেন গজেনবাবু। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “পুরো ঘটনাটা এবার আপনাকে বলি।”
“ঘটনা মনে আপনার কিডন্যাপিং-এর?”
“হ্যাঁ।”
“না, তার এখন দরকার হবে না। সবকটা অপহরণের রিপোর্টই আমার ফাইলে আছে।” কথাটা বলতে বলতে ওদিকের একটা ফাইলের দিকে আঙুল তুললেন গোয়েন্দা।
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থাকার পরে গজেনবাবু হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে হাতের ছোট্ট অ্যাটাচিটা খুলে বললেন, “আপনাকে এখন তা হলে হাজার দশেক টাকা দিচ্ছি, কাজ শুরু করুন আপনি।”
তিলক চৌধুরী শক্ত মুখে দু দিকে মাথা নেড়ে বললেন, “না, এখন টাকা লাগবে না। আপনি বরং আমাকে কিছুদিনের জন্যে একটা ভালো জিপ দিন। ড্রাইভার লাগবে না।”
“নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই, এ আর কী এমন কথা। আজকেই আপনার বাড়িতে আমি জিপ পাঠিয়ে দেব। কিন্তু আপনার ফী-জের অ্যাডভান্স -।”
গোয়েন্দা তিলক চৌধুরী গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, “কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি টাকা নিই না।”
“আচ্ছা, এখন তাহলে আমি চলি। কোনও প্রয়োজন হলেই আমাকে কন্ট্যাক্ট করবেন। নমস্কার।”
“নমস্কার” বাড়ির সামনের ছোট্ট লনের গেট পর্যন্ত মিস্টার শীলকে এগিয়ে দিলেন তিলক চৌধুরী।

ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে নতুন একটা জিপ এসে দাঁড়াল গোয়েন্দার বাড়ির সামনে। পেছনে একটা সাদা অ্যামব্যাসাডর। অ্যামব্যাসাডর থেকে বেরিয়ে এলেন মিস্টার শীলের প্রাইভেট সেক্রেটারি রাকেশ গুপ্ত। গুপ্ত তিলক চৌধুরীর হাতে চাবি তুলে দিয়ে বললেন, “মিস্টার শীল, এই জিপটা আপনার ব্যবহারের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে একটা অনুরোধ, আপনি নিজের পয়সায় তেল কিনবেন না। আপনার বাড়ির সামনে ফিলিং স্টেশনে বলা আছে। যা তেল দরকার আপনি নেবেন, বিল যাবে আমাদের কোম্পানিতে। পেমেন্ট আমরা করব।”
একটু ইতস্তত করে তিলক চৌধুরী বললেন, “আচ্ছা, ধন্যবাদ।”

দিন পাঁচেক বাদে খবরের কাগজে আর একটি অপহরণ ও মুক্তির খবর বার হল একসঙ্গে। মুক্তি অবশ্য মুক্তিপণের বিনিময়ে।
এবার অপহৃত হয়েছিলেন বিখ্যাত মিল-মালিক মনোময় বেরা। অপহরণকারীরা তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করার পরে মনোময়বাবুকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

সকালের কাগজে খবরটা দেখার পরেই গজেন্দ্রনাথ শীল ফোন করলেন গোয়েন্দা তিলক চৌধুরীকে। ফোনে গোয়েন্দার গল পেতেই গজেনবাবু ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, “কী সাংঘাতিক ব্যাপার মশাই, আবার সেই কিডন্যাপিং! কোনও ক্লু পেলেন না কি?”
অস্বাভাবিক রকমের শান্ত গলায় জবাব দিলেন তিলক চৌধুরী, “না, এখনও পাই নি।”
“আপনি একটু জোর চেষ্টা চালিয়ে যান মশাই। অ্যাঁ, এটা মগের মুল্লুক নাকি? ব্যাটারা যা খুশি তাই চালিয়ে যাবে দিনের পর দিন। আপনি একটু উঠে পড়ে লাগুন।”
এত সব উত্তেজিত কথাবার্তা শোনার পরেও আবার সেই অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলেন গোয়েন্দা, “আচ্ছা ছাড়ি এখন।”
ডিন গড়াতে লাগল। শহরের মানুষজনের আতঙ্ক এখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় সবারই ধারণা, যে কোন ঘটনা যে কোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে।

কয়েকদিন বাদে অভাবিত একটা ঘটনা ঘটে গেল। এবার আতঙ্কের বদলে উত্তেজনা। পথে ঘাটে বাসে ট্রামে চায়ের দোকানে সখের গোয়েন্দা তিলক চৌধুরীর জয়জয়কার।প্রখ্যাত লোহার ব্যবসায়ী পরিমল কুণ্ডু তাঁর ফ্যাক্টরি থেকে বাড়ি ফেরার পথে অপহৃত হন। একটা বড় বাস ঘোরাবার ভান করে রাস্তা আটকাবার সঙ্গে সঙ্গে দুটো কালো রঙের গাড়ি পরিমল কুণ্ডুর গাড়ির দুদিকে এসে দাঁড়াল।তার পরের ব্যাপারটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের. ঐ দুটো কালো গাড়ি থেকে মুখোশ পরা চারজন লোক পিস্তল হাতে লাফিয়ে পড়ে। পিস্তলের নল পরিমলবাবুর মাথায় ঠেকিয়ে ঐ দুটো গাড়ির একটাতে তোলা হয় তাঁকে। ইতিমধ্যে সামনের বাসটা রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়ে সরে গেছে। অপহরণকারীরা পরিমলবাবুকে নিয়ে পালাবার সময় গুলি করে ভদ্রলোকের গাড়ির টায়ার ফাঁসিয়ে দেয়। এই পর্যন্ত নিখুঁত। কিন্তু অপহরণকারীরা চম্পট দেবর সময় কোত্থেকে একটা জিপ চুতে আসে। তারপরেই জিপের সঙ্গে গাড়ি দুটোর বন্দুকের লড়াই শুরু হয়ে যায়। সারা এলাকা কাঁপিয়ে ঝাঁক ঝাঁক গুলি ছোটে। একটা কালো গাড়ি পালিয়ে যায়, আর একটা পরে না। গোয়েন্দা তিলক চৌধুরী পরিমলবাবুকেই শুধু উদ্ধার করেন না, দু’জন অপহরণকারীকে ধরেও ফেলেছেন। এই দু’জনের একজনের কাঁধে গুলি লেগেছে।

আহত অপহরণকারী পুলিশ হাসপাতালে, অপরজন লক আপে। শহরের লোকেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দুটো যখন ধরা পড়েছে পুরো দলটাই ধরা পড়ে যাবে আস্তে আস্তে। কিন্তু আরও বড় একটা ঘটনা ঘটল পরদিনই। পুলিশ কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময় কোর্ট কম্পাউণ্ডে কে বা কারা ঐ অপহরণকারীকে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে পালিয়ে গেছে। আর পরদিন আরও একটা খবর ⤒ আহত অপহরণকারীকে বাঁচানো যায় নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই নাকি মৃত্যুর কারণ।

শহরের মানুষজন নতুন করে হতাশার মধ্যে ডুবে গেল। গুণ্ডার দলটা দারুণ শক্তিশালী। পুলিশের জেরার মুখে দলের কথা যাতে ফাঁস না হয়ে যায় সেই জন্যেই নিজেদের লোককে গুলে করে মেরে ফেলেছে। হাসপাতালের ঐ মৃত্যুটাও অনেকের কাছে স্বাভাবিক ঠেকল না। এর পেছনেও নির্ঘাত কোনও ষড়যন্ত্র আছে। ওদিকে আবার তিলক চৌধুরীও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বেচারা! ডাক্তারের নির্দেশ তাঁকে অন্তত মাসখানেকের জন্য শয্যাশায়ী থাকতে হবে। বলা যায় না, এই সুযোগে গুণ্ডারা অসুস্থ গোয়েন্দাকেও শেষ করে দিতে পারে। অদ্ভুত একটা আতঙ্ক চেপে ধরল শহরের মানুষদের।

কিন্তু দিন পনেরো বাদে শহরের প্রায় সব মানুষ একসঙ্গে চমকে উঠল। অপহরণকারী দলের পাণ্ডা ধরা পড়েছে। পাণ্ডার নাম প্রখ্যাত ব্যবসায়ী এবং বিশিষ্ট সমাজসেবী গজেন্দ্রনাথ শীল। এটা কী করে সম্ভব?
তবে এক্ষেত্রে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। কেননা গজেন্দ্রনাথ নিজের মুখে তাঁর অপরাধ স্বীকার করেছেন। অপরাধীকে ধরেছেন বিখ্যাত গোয়েন্দা তিলক চৌধুরী। ⤗পূর্বাঞ্চল⤘ পত্রিকায় এগারোই সেপ্টেম্বর এই ঘটনাটির সম্পূর্ণ রিপোর্ট বেরিয়েছে। সেই সঙ্গে বেরিয়েছে গোয়েন্দা তিলক চৌধুরীর একটি তদন্ত সাক্ষাৎকার। এই গল্পের পাঠকদের অবগতির জন্যে সেই সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে দেওয়া হল।
প্র: গজেন্দ্রনাথ শীলকে আপনি সন্দেহ করলেন কেন তিলকবাবু?
উ: গজেনবাবু এ দেশের বড় ব্যবসায়ীদের একজন। অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ, তাঁর পক্ষে খবরের কাগজে ঐ ধরনের একটা বিবৃতি ছাপানো খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। সন্দেহ করার প্রথম কারণ সেটাই।
প্র: আপনি কোন বিবৃতির কথা বলছেন?
উ: ঐ যে তিনি বলেছিলেন না, অপরাধীদের ধরতেই হবে, তার জন্য যত টাকা খরচ হয় তিনি দেবেন। তাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষের বোঝা উচিত ছিল, এই বিবৃতি তাঁর বিপদ ডেকে আনতে পরে। বিবৃতিটা পড়ে আমার বেশ খটকা লেগেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে সব কাগজে ঐ বিবৃতিটা ছেপেছেন। এই ধরণের কাজের পেছনে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্যটা কি? অপরাধীরা নিজেদের সাধু প্রমাণ করবার জন্যে অনেক সময় উঠে পড়ে লাগে। মনে হল, এটা কি সেরকম কোনও ব্যাপার?
প্র: তারপর?
উ: অপরাধীদের ধরার জন্যে একতা জিপ চেয়েছিলাম গজেনবাবুর কাছে। তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই জিপ নিয়ে পথে বেরোলেই দেখেছি, অন্য গড়ি আমাকে অনুসরণ করে। একবার একটা বড় গ্যারেজে ঢুকে কায়দা করে জিপের নাম্বারপ্লেট পাল্টে ফেললাম। সেদিন বাকি রাস্তা আর কোনও গড়ি আমাকে অনুসরণ করেনি। গজেনবাবুকে সন্দেহ করার এটা হল দ্বিতীয় কারণ।
প্র: পরিমল কুণ্ডুকে অপহরণ করা হবে, এ খবর কি আপনি আগে থেকে জানতেন?
উ: না, জানতাম না, তবে আন্দাজ করেছিলাম।
প্র: কী ভাবে?
উ: অপহরণ করার ধরন দেখে। অর্থাৎ কেমন যেন অর্ডার মেনে বড়লোকদের কিডন্যাপ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রথমে দশ কোটি টাকার মালিককে, তারপর পাঁচকোটি টাকার মালিককে। তার মনে ডিগ্রি নামছে একটু একটু করে। সেই হিসেবে আন্দাজ করেছিলাম, এবার বোধ হয় পরিমল কুণ্ডুর পালা। আমার অনুমানটা মিলে গেল।
প্র: আহত অপহরণকারীকে সরিয়ে ফেলে মৃত বলে ঘোষণা করলেন কেন?
উ: ঐ কৌশলটা না নিলে দলের লোকরা হাসপাতালে ঢুকে তাকেও মেরে ফেলত। কোর্টকম্পাউণ্ডে পুলিশ অ্যালার্ট থাকা সত্যেও যারা একজনকে মেরে ফেলতে পরে তাদের পক্ষে সব সম্ভব। আহত লোকটাকে সরিয়ে ফেলে নিজে অসুস্থ হওয়ার ভান করে তদন্ত চালিয়েছিলাম।
প্র: আহত অপহরণকারীর স্বীকারোক্তি আদায় করলেন কী ভাবে?
উ: আদায় করতে খুব কষ্ট হয়েছিল। কারণ আমি খবর পেয়েছিলাম, দলের কথা যারা ফাঁস করে কিংবা করতে চায়, দলের লোকেরা তার বাড়ির প্রত্যেককে খুন করে ফেলে নৃশংসভাবে। এই রকম দু একটা ঘটনা ঘটেছে এ শহরে। লোকটা সুস্থ হবার পরে আমি ওকে বোঝালাম, দলের সবাই জানে তুমি মৃত। সুতরাং তুমি সবকিছু আমাকে স্বচ্ছন্দে বলে দিতে পারো। দলটা ধরা পড়লে তুমি আর তোমার বাড়ির লোকদের সব বিপদ কেটে যাবে।
প্র: আপনার বোঝানোতে কোনও কাজ হয়েছিল?
উ: না, পুরোপুরি হয় নি।
প্র: আপনি কী করলেন তখন?
উ: অন্য পথে গেলাম। লোকটা ওষুধের নেশা করত। আমি ওকে পরপর বেশ কয়েকদিন সেই নেশার ওষুধ যোগান দিলাম। নেশার সময় নেশা করতে পেরে লোকটা তো খুব খুশি। তারপর ঝপ করে একদিন নেশার ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলাম। বন্ধ করতেই ছটফট করে লাগল লোকটা। তখন আমি বললাম, নেশার ওষুধ দেব যদি তুমি আমাকে সত্যি কথা বলো।
প্র: কাজ হল তাতে?
উ: হ্যাঁ হল, লোকটা তখন গড়গড় করে দলের সব নামধাম আর কাণ্ডকারখানা বলে দিল।
প্র: তারপর?
উ: তারপর আর কী, পরেরটা তো জানেন। প্রমাণসমেত ধরে ফেললাম গজেন্দ্রনাথ শীলকে।
প্র: কিন্তু গজেনবাবু তো কোটি কোটি টাকার মালিক। তিনি কে এই রকম জঘন্য কাজ করতেন?
উ: গজেনবাবুর ব্যবসার অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক খারাপ। তবে শুধুমাত্র এই করণেই তিনি খারাপ পথে নামেননি। কুখ্যাত একটা লোকের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই লোকটা তাঁর কিছু দুর্বলতার কথা জানত। সে সব ফাঁস করে দেবার ভয় দেখিয়ে এই লোকটাই গজেনবাবুকে দিয়ে কিডন্যাপারদের দল তৈরি করায়। এই দলের কীর্তিকলাপ তো সবার জানা। পুরো দলটাই ধরা পড়ে গেছে। আশা করা যায়, কিডন্যাপিং-এর ঘটনা এখন আর এখানে ঘটবে না।

গোয়েন্দা তিলক চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি বার হওয়ার পরে প্রায় চার মাস কেটে গেছে। অপহরণ বা চোরা খুনের ঘটনা আর একটাও ঘটেনি। শহর এখন আবার আগের মতোই জমজমাট। ব্যস্ত রাস্তাঘাট আর চট করে ফাঁকা হয় না। রাতের শেষ বাস ট্রামেও বেশ লোকজন থাকে। সেই সব যাত্রীর কেউ কেউ মাঝে মধ্যে গলা ছেড়ে অপহরণ সিরিজের গল্প করে মজা করে এখন।

শেখর বসু

শেখর বসু (http://sekharbasu.com/) – প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ছোটগল্পকার। কর্মজীবনে আনন্দবাজার পত্রিকার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বহু বছর। এখন পুরো সময়টাই লেখালেখির কাজ করছেন। গত চল্লিশ বছরে উনি বহু গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গোয়েন্দাকাহিনী লিখেছেন। এযুগের যুবক সম্প্রদায়ের অনেকেই বড় হয়েছেন ওঁর লেখা ছোটদের বই পড়ে ।