রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

ব্যোমকেশের স্যাঙ্গাৎ

      সকাল থেকেই বাড়িতে যে একটা হৈ-চৈ লেগে গেছে, তা বুঝতে পারলেও তার কারণটা আঁচ করতে পারছিলাম না। বাবা, কাকু, দাদু, মা-কাকিমারা সকলে মিলে চেঁচাচ্ছে কেন? বাড়িতে কি ডাকাত পড়ল নাকি! বিছানা ছেড়ে উঠে চোখ-মুখ ধুয়ে বাইরের বারান্দায় আসতেই খুড়তুতো বোনটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল, “সব শেষ!” আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে বললাম “মানে?”

-      “নীচে দাদুর ঘরে গেলেই বুঝতে পারবি।”
-      বেশ! দাদুর ঘরেই গেলাম, সেখানে ঢুকতে গিয়েও আরেক ঝামেলা। দাদু আমায় দেখেই হাউমাউ করে উঠলেন, “তুই এসেছিস ? দ্যাখ কি হয়ে গেল!”
-      “মানেটা কি?” বলে উঠলাম আমি, “সকাল থেকে এত হৈ-চৈ কেন? ছুটিতে দেশের বাড়িতে এসেও চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে হবে?”
-      “ওরে ব্যাপারটা শোন তো আগে!” দাদু বোধহয় আরেকটু হলে কেঁদেই ফেলতেন।
-      “তো বল না……”
-      “আমার সেই ঘড়িটার কথা মনে আছে তো, সেই যেটা সুবেদার খান সাহেব স্বয়ং আমার দাদুর বাবার কাকাকে……”
-      ওইরে! আবার ইতিহাসচর্চা শুরু হয়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “হ্যাঁ আছে। সেটা কি ভেঙে গেছে?”
-      “তা হলেও তো ঠিক ছিল”, দাদু হাহাকার করে উঠলেন, “সেটা চুরি গেছে!”
-      “চুরি!” চমকে উঠলাম। এ বাড়ি থেকে চুরি!

কাকু এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার বললেন, “ইয়ে বাবা, তুমি চুরি হয়েছেই ধরে নিচ্ছ কেন? মানে……” 
-      “তুমি চুপ করো কুলাঙ্গার।” দাদু ধমকে উঠলেন।
…… ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখলাম কাকু মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

       পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এসেছিলাম দেশের বাড়ি মুর্শিদাবাদে, বাবা-মার সঙ্গে। এখানে কাকু-কাকিমা-খুড়তুতো বোন আর দাদু ছাড়াও থাকে দুটো টিয়াপাখি, এক অ্যাকোরিয়াম ভর্তি মাছ, বাগানে নানান গাছ আর দাদুর সেই ‘ঐতিহাসিক’ ঘড়ি যেটা মুর্শিদাবাদের কোন এক খাঁ সাহেব আমাদের ঊর্দ্ধতন কোন এক পুরুষকে উপহার দিয়েছিলেন। এক অতি সাধারণ ট্যাঁকঘড়ি ও তার চেন, কিন্তু সেটা এ বাড়িতে গৃহদেবতার মতোই পূজ্য ও পবিত্র। সেই ঘড়ি নাকি চুরি গেছে।
ব্যোমকেশের গল্পে পড়েছি যে কোন রহস্য সমাধান করতে হলে নাকি associated বিভিন্ন চরিত্রদের একটু পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কাজেই এবার আমাদের পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের সঙ্গে আপনাদের একটু পরিচয় করিয়ে দিই। আমি হলাম দীপায়ন, ওরফে দীপু। কলকাতার একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। আমার বাবা শিক্ষক আর মা একটা NGOতে চাকুরিরতা। আমার খুড়তুতো বোন দিয়া এখানে একটা স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে। দাদু হলেন আমাদের পরিবারের মাথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রফেসর। এঁদের সবার মধ্যে আমার কাকুই একটু বেমানান। কাকু নাকি পড়াশুনায় বিশেষ ভালো ছিলেন না, টেনেটুনে গ্র্যাজুয়েট। তারপর থেকে কাকুর জীবনটা অনেকটা সেই সত্যজিৎ রায়ের ‘অপদার্থ’ গল্পটার মতো হয়ে গেছে। সমস্ত কাজেই উনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই কারণে দাদুর কাছে তাঁকে অনেক কথাও শুনতে হয়েছে, এখনো হয়। আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কাকুর খুব ন্যাওটা ছিলাম। তাঁর হাত ধরেই আমার শরদিন্দু-সুকুমার-সত্যজিৎ পড়া আর বাগান করতে শেখা। তাই দাদু যখন কারণে-অকারণে কাকুকে বকাবকি করেন, তখন আমার ভারী খারাপ লাগে।

       -      “ধুস! ওই ঘড়িটার জন্য বাড়ির সবাই কেমন থমথমে হয়ে আছে”, বাগানে ঘুরতে ঘুরতে দিয়া বলল, “একদম ভালো লাগছে না।”
-      “হুম্‌ম”, জবাব দিলাম, “আচ্ছা দিয়া, তুই তো অনেক সকালে উঠিস। কখন জানা গেল ঘড়িটা চুরি হয়েছে?”
-      “ওই তো, বাবা সবে বাগান থেকে একগাদা মাটি মেখে ঘরে ঢুকেছে, তখনই তো দাদু চেঁচামেচি জুড়লেন! তখন পৌনে আটটা-আটটা বেজেছে।”
-      “কাকু এখনো রোজ বাগান করেন?”
-      “না, রোজ না। মাঝে মধ্যে।”
হাঁটতে হাঁটতে একটা মস্ত টবে বসানো একটা পামগাছের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। মনে আছে, এই গাছটা আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট। বাহারি গাছ ভালবাসতেন না দাদু। তাও কাকু এই গাছটা এনে বসিয়েছিলেন। কাকু আমায় বলতেন, “গাছদের ভালবাসবি, নিজের ভাইবোনের মতো……”
……পামগাছের গোড়াটায় শুকনো পাতা জমে নোংরা হয়ে আছে। মালি একটা আছে বোধহয়, কিন্তু গাছের যত্ন বড় একটা নেয় বলে মনে হয় না। দিয়াকে একটা খুরপি আনতে বললাম। তারপর পাতাগুলো পরিষ্কার করে খুরপিটা দিয়ে আস্তে আস্তে গোড়ার মাটি কোপাতে লাগলাম। মাটিগুলো ঝুরঝুরে হয়ে আছে দেখছি। যাকগে, তাহলে মালি ব্যাটা বোধহয় মাঝে-মধ্যে গোড়া-টোড়াগুলো কোপায়।
দিয়া জিজ্ঞেস করলো, “কী করছিস রে?” উত্তর না দিয়ে কাকুর মতো গম্ভীরভাবে বললাম, “গাছদের নিজের ভাইবোনের মতো ভালবাসবি”।
……টং!
খুরপিটা কিসে ঠেকল না! দিয়া বোধহয় শুনতে পায়নি, কীসব বকবক করছে। আমি হাতটা মাটির মধ্যে ডুবিয়ে একটু হাতড়াতেই জিনিসটা হাতে ঠেকল। এটাই না! হ্যাঁ, ভুল হতেই পারে না। এ জিনিস আমি বহুবার হাতে নিয়েছি। কিন্তু এটা এখানে এলো কী করে? হঠাৎ মাথার মধ্যে কয়েকটা ইক্যুয়েশন যেন মিলে গেলো। কাকু সকালে বাগানে এসেছিল …… কাকুর ঘরের পাশেই দাদুর ঘর ……  ঘড়িটাও আবার থাকতো ……  চাবি দেওয়া ড্রয়ারের মধ্যে ……  তাহলে কী ……

       -      “কাকু, একটু কথা ছিল।” কাকুর ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বললাম আমি।
-      “হ্যাঁ, আয় না।” বললেন কাকু।
আমি ঘরে ঢুকে কোনরকম ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলাম, “কাকু, দাদুর ঘড়িটা তুমিই নিয়েছিলে, তাই না?”
-      “মানে?!” কাকুর গলার আওয়াজ থেকে প্রাথমিক বিস্ময় মুছে গিয়ে তার জায়গায় এল একটা কাঠিন্য, “তুই জানিস কাকে কী বলছিস?”
-      “জানি কাকু”, আমি বললাম, “তোমার এই ঘরটার ঠিক পাশেই দাদুর ঘর। আমি যদি বলি তুমি কাল রাত্তিরে উঠে দাদুর ঘরে ঢুকে ড্রয়ারটা খুলে ঘড়িটা নিয়ে নিজের কাছে রেখে দাও, আর আজ সকালবেলা বাগান করার সময়ে পামগাছের গোড়ায় ঘড়িটাকে মাটির তলায় রেখে দাও, তাহলে কি খুব ভুল বলব?
-      “এর মানে কী?” কাকুর গলার স্বরটা এবার একটু নড়বড়ে শোনালো, “আ……আমি বাবার ঘরে ঢুকে ড্রয়ার খুলে ঘড়ি বার করলাম, অথচ বাবার ঘুম ভাঙল না?”
-      “দাদুর যে insomnia আছে কাকু। ঘুমের ওষুধ না খেলে তো ওনার ঘুম হয় না। তাহলে ড্রয়ার খোলার আওয়াজে দাদুর ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটে কি?”
-      “হ্যাঁ, মানে না … কিন্তু …” গলার স্বরটা একরকম নড়বড়ে লাগছে না?
-      “আর এই কাজের কারণটাও বোধহয় আমি ধরতে পেরেছি কাকু।“
-      “কী কারণ?” কাকু একটু চমকে উঠলেন কি?
-      “তুমি কোন অর্থনৈতিক কারণে ওই ঘড়ি চুরি করনি, এ বিশ্বাস আমার আছে। আর ওই ঘড়ির দাম বাজারে মেরেকেটে হাজার টাকা। কিন্তু ওটা দাদুর প্রাণাধিক প্রিয়, এটা আমরা জানি। তাহলে কি দাদুকে কোনোভাবে………”
কাকু এবার একেবারে ভেঙে পড়লেন। কাঁপা গলায় বললেন, “ঠিকই ধরেছিস তুই। সেই ছোটবেলা থেকে বাবা প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা কাজে আমায় অপমান করেছেন, ছোটো করেছেন। এখনো তোর বোনের সামনে যখন-তখন ‘কুলাঙ্গার’ বলেন, অপদার্থ বলেন, কি না আমি সব কাজে একটু ভুল করে ফেলি। তাই আমি আর থাকতে না পেরে কাল ঘড়িটা সরিয়ে ফেলি। ভেবেছিলাম দু-চারদিন বাদে ওটা ফেরৎ দিয়ে দেব। ততদিন বাবা একটু উৎকণ্ঠায় থাকতো। বিশ্বাস কর, অন্য কোন intention আমার ছিল না।” কাকুর গলাটা কাঁদো-কাঁদো ঠেকল।
-      “হুম্‌ম।”
-      “কিন্তু তুই এত কথা বুঝলি কী করে?”
-      “সেই তোমারই বলা কথা, গাছকে ভালবাসতে হয়।”
-      “মা……মানে?”
-      “বাদ দাও। যাই হোক, ওই ঘড়িটা আমি দাদুর বালিশের পাশে রেখে এসেছি। রাতে যখন ঘড়িটা খুঁজে পাবেন, তখন তুমি বোলো যে এসব ঘুমের ওষুধের after effect, বুঝলে?”           
-      “হ্যাঁ, কিন্তু……”
-      “কোন ভয় নেই কাকু। ছোটবেলা থেকে তোমার কোলে চড়েই বড়ো হয়েছি। আর তুমি তো কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটা করনি। তাই আমি বাড়ির কাউকে কিচ্ছু বলব না।”
-      “তুই……” কাকু এগিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলেন ঠিক ছোটবেলার মতো করে। সেই চেনা গন্ধটা নাকে এলো – আর কাকুর চোখের এক ফোঁটা জল এসে পড়ল আমার মাথার চুলের মধ্যে।   

কাকুর ঘর থেকে বেরোতেই দিয়া ধরল, ‘এই দাদাভাই, এতক্ষণ কি কথা হচ্ছিল রে?’ তার জবাব না দিয়ে মনে মনে ভাবলাম, হুঁ হুঁ বাবা! আমি হলাম ব্যোমকেশ বক্সীর স্যাঙাৎ। অপরাধীর মনস্তত্ত্বের চুলচেরা বিচারের প্রথম পাঠ যে তাঁরই হাত ধরে। সামান্য এই রহস্যের সমাধান করতে পারবো না, তা হয়? আপনারাই বলুন!          

সাগ্নিক মুখার্জী

লেখক পরিচিতি - সাগ্নিক এ.কে. ঘোষ মেমোরিয়াল স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। বালীগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের প্রাক্তনীদের আয়োজিত 'গোয়েন্দা গল্প' লেখার আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় সাগ্নিকের লেখা এই গল্পটি প্রথম স্থান পায়।