রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 



 

দীর্ঘকেশী

আমার কথা শুনিয়া ডুবুরিদ্বয় বহু কষ্টে ঐ মৃতদেহটি জল হইতে তীরে উঠাইয়া দিল। দেখিলাম, উহা একটি স্ত্রীলোকের মৃতদেহ, কিন্তু বিবর্জিত মস্তক। আরও দেখিলাম, ঐ মস্তকহীন মৃতদেহের সহিত তিনটি জলপূর্ণ বৃহত্ কলসি রজ্জুদ্বারা তিন স্থানে বাঁধা আছে, কিন্তু মৃতদেহটি এরূপ ভাবে পচিয়া গিয়াছে তাহার যে স্থানে হস্ত স্পর্শিত হইতেছে, সেই স্থানে মাংস গলিয়া পড়িতেছে, ও উহা হইতে এরূপ দুর্গন্ধ বাহির হইতেছে যে, সেই স্থানে ক্ষণকালের জন্য অবস্থান করিতে পারে কাহার সাধ্য।

পূর্বেই আমরা এই পুষ্করিণীতে দেহবিহীন স্ত্রীমুণ্ড প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, এখন মস্তকবিহীন স্ত্রীদেহ প্রাপ্ত হইয়া বুঝিতে পারিলাম, এ তাহারই দেহ।

কলিকাতার ক্যানিং স্ট্রীট পাঠকদের মধ্যে কাহারও অপরিচিত নহে। ঐ স্থান বাণিজ্য কার্যের নিমিত্ত প্রসিদ্ধ। ঐ রাস্তার দুই ধারে সারি সারি দোকান, সূর্য্যোদয়ের পর হইতে রাত্রি নয়টা দশটা পর্য্যন্ত ঐ সকল দোকানে যেমন কেনা-বেচার বিরাম নাই, সেইরূপ লোক যাতায়াতের কিছুমাত্র কমবেশী নাই। দোকানগুলি দেখিয়া নিতান্ত সামান্য দোকান বলিয়া অনুমান হয়, কিন্তু যাঁহারা উহাদিগের ভিতরের অবস্থা জানেন, তাঁহারা বলিয়া থাকেন, ঐ সকল দোকানের মূলধন কম নহে, ও উহাদিগের নিকট হইতে যে কোন দ্রব্য পরিমাণ মত চাহিবে, তত্ক্ষণাত্ তাহা প্রাপ্ত হইবে। দোকানের সুদূরবর্তী স্থানে গলির ভিতরে প্রত্যেক দোকানদারের দুই চারিটি করিয়া গুদাম আছে। ঐ সকল গুদাম দোকানের বিক্রয়দ্রব্য দ্বারা পরিপূর্ণ, যেমন কোন একটি দ্রব্য কম পড়িতেছে, অমনি ঐ সকল গুদাম হইতে ঐ সকল দ্রব্য আনাইয়া ঐ সকল স্থান পূর্ণ করিয়া রাখা হইতেছে।

ঐ স্থানের একজন ব্রাহ্মণ দোকানদারের সহিত আমার পরিচয় ছিল, পরিচয়ই বা বলি কেন, তাহার সহিত আমার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। সময় সময় আমি তাহার দোকানে গিয়া বসিতাম ও দোকানের বেচাকেনার অবস্থা দেখিতে দেখিতে দু এক ঘণ্টা অতিবাহিত করিতাম। যে দিবস মস্তক-বিবর্জ্জিত স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পুষ্করিণীর মধ্য হইতে আমরা প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, তাহার তিন চারি দিবস পরে আমি আমার সেই বন্ধুর দোকানে গমন করিলাম। তখন বেলা প্রায় শেষ হইয়া গিয়াছে, অতি অল্প মাত্রই আছে। সেই সময়ে ঐ দোকান হইতে রাস্তার অপর পার্শ্বস্থিত একটি দ্বিতল বাড়ীর ছাদের উপর হঠাত্ আমার নয়ন আকৃষ্ট হইল। দেখিলাম, ছাদের উপর দুইটি স্ত্রীলোক পদচারণ করিতেছে। একটিকে দেখিয়া অনুমান হয় যে, তাহার বয়স হইয়াছে। বোধহয়, তাহার বয়ঃক্রম ৫৫ বত্সরের কম নহে। অপরটি অল্পবয়স্কা, দেখিয়া অনুমান হয়, তাহার বয়ঃক্রম ১৬/১৭ বত্সরের অধিক হইবে না। উভয়েই আলুলায়িত কেশা। যে দীর্ঘকেশী স্ত্রীলোকের অনুসন্ধানে আমরা প্রবৃত্ত ছিলাম, ইহাদের কেশের দৈর্ঘ্যতা তাহা অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন নহে, দেখিতেও প্রায় সেই রূপ। উভয়েই ছাদের উপর বেড়াইতেছে, কিন্তু দূর হইতে দেখিয়া অনুমান হইতেছে, ঐ কেশরাশি তাহাদিগকে পদ স্পৃষ্ট করিয়া আছে। উভয় স্ত্রীলোকের কেশের সাদৃশ্য দেখিয়া আমার মনে হইল , যে দীর্ঘকেশীর মৃতদেহ আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি ও যাহার অনুসন্ধানে অনর্থক কয়েক দিবস অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে, সেই স্ত্রীলোকের সহিত এই দীর্ঘকেশী স্ত্রীলোকদ্বয়ের কোনরূপ সংশ্রব আছে কি? স্ত্রীলোকটি যে কে ছিল তাহার কোনরূপ সন্ধান কি ইহাদের নিকট হইতে কিছুমাত্র প্রাপ্ত হইব না? এরূপ হইতে পারে, সেও স্ত্রীলোক ইহাদিগের কেহ না কেহ হইবে। দুইটি স্ত্রীলোকের চুলের ভাব যখন একই রূপ দেখিতেছি, তখন বোধ হইতেছে , ইহাদিগের বংশই এইরূপ দীর্ঘকেশী ও মৃতা স্ত্রীলোকটিও হয়তো ইহাদিগের কেহ না কেহ হইবে। এরূপ স্ত্রীলোকদ্বয় যখন আমার নয়নগোচর হইল, তখন বিশেষরূপ অনুসন্ধান না করিয়া নিশ্চিন্ত থাকা আদৌ কর্ত্তব্য নহে। এইরূপ ভাবিয়া আমি আমার সেই দোকানদার বন্ধুকে কহিলাম, দেখ দেখি, স্ত্রীলোকের ঐরূপ কেশ আর কখন দেখিয়াছ কি?
বন্ধু: দেখিব না কেন? আমি ত প্রত্যহই দেখিয়া থাকি। কেন তুমি কি ইতিপূর্ব্বে ইহাদিগকে দেখ নাই?
অমি: না, দেখিলে আর তোমাকে বলিব কেন?
বন্ধু: তুমি ত প্রায়েই আমার দোকানে আসিয় থাক, আর উহারাও প্রায়েই ছাদের উপর বেড়াইতে থাকে, এ পর্য্যন্ত কি কি উহারা তোমার নয়নপথে কখন পতিত হয় নাই?
আমি: না, আজই আমি উহাদিগকে প্রথম দেখিলাম। উহারা কাহারা তুমি কিছু অবগত আছ কি?
বন্ধু: আছি। যে বাড়ীতে দুইটি দীর্ঘকেশী স্ত্রীলোক দেখিয়া তুমি হতজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছ, ঐ বাড়িটা আমার একটি গুদাম। উহারা দোতালায় বাস করিয়া থাকে, নীচের তলার সহিত উহাদিগের কোনরূপ সংশ্রব নাই|
আমি: তাহা হইলে ঐ বাড়ীতে তুমি সর্ব্বদাই গিয়া থাক? উহাদিগের সহিত নিশ্চয়ই তোমার আলাপ-পরিচয় আছে?
বন্ধু: বন্ধুত্ব আছে।
আমি: উহারা কি লোক?
বন্ধু: ইহুদি।
আমি: এই বাড়িতে উহারা কতদিন হইতে আছে?
বন্ধু: বহুকাল আছে, বোধহয় বিশ বৎসরের কম হবে না।
আমি: উহারা কাহারা বা কি কার্য্য করিয়া থাকে?
বন্ধু: উহারা একরূপ হাফ্-বেশ্যা, গৃহস্থের ধরণে বাস করে বটে, কিন্তু বেশ্যাবৃত্তি করিতেও সঙ্কুচিত হয় না।
আমি: উহারা কয়জন এ বাড়িতে বাস করিয়া থাকে?
বন্ধু: পুরুষের মধ্যে একজন বৃদ্ধ ইহুদি। ঐ যে প্রবীণা স্ত্রীলোকটি দেখিতেছ, সে ইহাকেই আপনার স্ত্রী বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়া থাকে, কিন্তু উহাকে ঐ বৃদ্ধের স্ত্রী বলিয়া আমার বোধ হয় না, করণ অপর পুরুষদিগের সহিত উহার সম্মুখে আমোদ আহ্লাদ করিতেও আমি দেখিয়াছি।
আমি: অপর স্ত্রীলোকটি কে?
বন্ধু: ঐ প্রবীণার কন্যা।
আমি: উহারা কয় সহোদরা?
বন্ধু: আমি উহাদের দুই ভগ্নীকে দেখিয়াছি।
আমি: দুই ভগ্নীই কি এই বাড়িতে থাকে?
বন্ধু: যেটিকে দেখিতে পাইতেছ, সে এই বাড়ীতেই মাতার সহিত বাস করে।
আমি: উহার অপর ভগ্নী কি এখানে থাকে না?
বন্ধু: শুনিয়াছি সে কলুটোলায় থাকে। কলুটোলায় এক চামড়ার মহাজন তাহাকে রাখিয়াছে, তাহারই সহিত সে সেই স্থানে বাস করিয়া থাকে।
আমি: বৃদ্ধ ইহুদি তোমার নিকট পরিচিত?
বন্ধু: খুব পরিচিত। সে উহার ভাড়া আমাকেই প্রদান করিয়া থাকে; এরূপ অবস্থায় বোধহয় আমি বলিতে পারি যে উহারা আমার প্রজা।
আমি: ঐ বৃদ্ধকে যদি তুমি কোনরূপ উপরোধ কর, তাহলে বোধহয় সে অনায়াসে শুনিতে পারে?
বন্ধু: পারে বলিয়া তো আমার বিশ্বাস।
আমি: আমি তাহাকে একটি সামান্য উপরোধ করিতে চাই।
বন্ধু: কি উপরোধ?
আমি: সে একবার কলুটোলায় গিয়া দেখিয়া আসে যে তাহার কন্যা সেই স্থানে আছে কিনা, আর যদি না থাকে তাহা হইলে এখন সে কোথায় তাহা যদি জানিতে পারে।
বন্ধু: ইহা জানিবার প্রয়োজন কি?
আমি: বিশেষ প্রয়োজন না থাকিলে আর আমি বলিব কেন, সে যদি ঐ স্থানে না থাকে, তাহা হইলে আমার যে কি প্রয়োজন তাহার সমস্ত কথা তোমার নিকট বলিব।
বন্ধু: আর সে যদি ঐ স্থানে থাকে।
আমি: তাহা হইলেও যদি জানিতে চাও তবে বলিব|

বন্ধুর কথা শুনিয়া তাহার কর্মচারী ঐ বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল ও দেখিতে দেখিতে সেই বৃদ্ধকে সঙ্গে করিয়া সেই দোকানে আমার বন্ধুর নিকট আনিয়া উপস্থিত হইল। বৃদ্ধ ইহুদি সে স্থানে আসিয়াই আমার সেই বন্ধুকে কহিল, আপনি আমায় ডাকিয়াছেন?
বন্ধু: হ্যাঁ। আপনার বড় কন্যাটিকে অনেক দিবস দেখি নাই| তিনি এখন কোথায়?
বৃদ্ধ: কলুটোলায় আছে।
বন্ধু: আপনি তাকে কত দিবস দেখেন নাই?
বৃদ্ধ: প্রায় ১৫ দিবস হইল সে আমার এখানে আসিয়াছিল, সেই সময় আমি তাহাকে দেখিয়াছিলাম। তাহার পর তাহাকে আর দেখি নাই|
বন্ধু: তাহার সহিত আমার একবার সাক্ষাত্ করার বিশেষ প্রয়োজন হইয়াছে, আপনি একবার সেই স্থানে গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাত্ করুন ও জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন, কোন সময় আমি সেই স্থানে গমন করিলে তাহার সহিত সাক্ষাত্ হইতে পারিবে।
বৃদ্ধ: এ অতি সামান্য কথা, যে স্থানে আমার কন্যা থাকে সেই স্থান এখান হইতে বহু দূরবর্তী নহে, বোধহয় অর্দ্ধ ঘণ্টার মধ্যেই আমি সেই স্থান হইতে ফিরিয়া আসিতে পারিব।
বন্ধু: আর যদি তার সাক্ষাত্ না পান?
বৃদ্ধ: তাহা হইলেও আমি সেই সংবাদ আপনাকে প্রদান করিব।
এই বলিয়া বৃদ্ধ সেই দোকান হইতেই কলুটোলা অভিমুখে গমন করিল। মুরগিহাটা হইতে কলুটোলা বহুদূর ব্যবধান নহে, তাহা কলিকাতার পাঠকগণ অবহিত আছেন। সুতরাং তাহার প্রত্যাগমনের প্রত্যাশায় আমি সেই স্থানেই অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। সেই সময়ে আমার বন্ধু পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ঐ ইহুদি স্ত্রীলোকটির জন্য এত অনুসন্ধান করিতেছ কেন?
আমি: দীঘির পাড়ায় একটি স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, এ কথা তুমি শুন নাই কি?
বন্ধু: শুনিযাছি।
আমি: যে দুইটি স্ত্রীলোক ছাদের উপর বেড়াইতেছে, তাহাদিগের মস্তকের চুলের সহিত সাদৃশে মৃত স্ত্রীলোকটির অনুসন্ধান করিতেছি।
বন্ধু: তোমার উদ্দেশ্য এখন বুঝিতে পারিলাম।     
 

(পরের অংশের জন্যে এখানে ক্লিক করুন) (আগের অংশ)


প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯৪৭) বহু বছর পুলিশে কাজ করেছিলেন। নিজের পুলিশী অভিজ্ঞতা থেকে উনি ওঁর দারোগার দপ্তর শুরু করেন। মাসে মাসে পত্রিকাটি বার হত। সেখানেই ১৩১৩ সালে দীর্ঘকেশী কাহিনীটি প্রকাশিত হয়।