রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

দীর্ঘকেশী

কলিকাতার মারকুইস স্কোয়ার নামক স্থানটি কলিকাতার পাঠকবর্গের নিকট উত্তম রূপে পরিচিত। মেছুয়াবাজার স্ট্রীটের পার্শ্বে ঐ বৃহত্ স্কোয়ার স্কুল ও কলেজের বালকদের ক্রীড়াস্থল। ঐ স্থানটির এখনও নাম আছে দীঘিপাড়। আমি যে সময়ের কথা বলিতেছি, সেই সময়ে ঐস্থনে একটি প্রকাণ্ড পুষ্করিণী ছিল, ঐ পুষ্করিণীর নাম ছিল দীঘি। ঐ দীঘিকে এখন স্কোয়ারে পরিণত করা হইয়াছে। ঐ দিঘীর চতুস্পার্শবর্তী স্থান সকল দীঘির পাড় বা দীঘির পাড়া নামে অভিহিত হইত। ঐ স্থানে যেসকল লোক বাস করিত, তাহারা সমস্তই প্রায় নিম্নশ্রেণীর মুসলমান ও চোর বদমায়েস। ঐ স্থানে কোন ভদ্র মুসলমানকে বাস করিতে আমি দেখি নাই।

ঐ পুষ্করিণীর জল অতিশয় গভীর ছিল ও উহার উত্তর-পশ্চিম অংশে একটি বৃহত্ অশ্বত্থ বৃক্ষ অর্দ্ধশায়িত অবস্থায় ঐ পুষ্করিণীর জলে আপনার প্রতিবিম্বকে প্রতিভাত করিত, এবং বর্ষাকালে অর্থাত্ যে সময়ে পুষ্করিণীর জল বর্দ্ধিত হইত সেই সময়ে ঐ বৃক্ষের দুই একটি শাখাও ঐ জলের মধ্যে অর্দ্ধনিমগ্ন অবস্থায় অবস্থিতি করিত।
এক দিবস প্রত্যুষে সংবাদ আসিল যে, ঐ দীঘির জলের মধ্যে একটি মনুষ্যমস্তক দৃষ্টিগোচর হইতেছে।
এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া আমি সেই স্থানে গমন করিলাম। দেখিলাম, আলুলায়িত কেশযুক্ত একটি মনুষ্যমস্তক, পূর্ব্বকথিত বটবৃক্ষের একটি অঙ্গের নিমগ্ন শাখায় সংলগ্ন হইয়া জলের মধ্যে ভাসিতেছে।
ঐ মৃতদেহ উপরে উঠাইবার বন্দোবস্ত করিলাম। ডোম ডাকাইয়া ঐ মৃতদেহ ধীরে ধীরে তীরে আনিতে কহিলাম। উহারা আদেশ প্রতিপালন করিতে সেই অশ্বত্থ বৃক্ষের সাহায্যে সেই স্থানে গমন করিল।

ডোম ঐ মস্তক পুষ্করিণীর তীরে উঠাইয়া আনিল। দেখিলাম, উহা প্রকৃতই একটি স্ত্রীলোকের মস্তক, কোন তীক্ষ্ণধার অস্ত্রের দ্বারা উহাকে উহার দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করা হইয়াছে। ও উহার নাক মুখ প্রভৃতি স্থানে এরূপ ভাবে আঘাত করা হইয়াছে যে ইহার মুখ দেখিয়া সহসা কেহই চিনিতে পারিবে না যে উহা কাহার মস্তক। তথাপি ঐ মস্তকটি দেখিয়া অনুমান হয় যে, ঐ স্ত্রীলোকটি কোন দরিদ্রঘরের কন্যা বা বনিতা ছিল না, ও বিশেষ রূপবতীই ছিল বলিয়া বিবেচনা হয়। মস্তকের কেশরাশি অতিশয় ঘন নিবিড় কৃষ্ণবর্ণ ও দীর্ঘ।

মস্তকটি পুষ্করিণীর ভিতর প্রাপ্ত হওয়ায় স্বভাবতই মনে হইল যে, মৃতদেহটিও নিশ্চয়ই ঐরূপে পুষ্করিণীর মধ্যে নিক্ষেপ করা হইয়াছে। কতগুলি জেলিয়াকে ধরিয়া বৃহত্ জাল সমেত ঐ পুষ্করিণীর ভিতর নামাইয়া দিলাম। পুষ্করিণীটি বহু পুরাতন ছিল, সুতরাং উহার জল নানারূপ জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। বহু বত্সরের মধ্যে ঐ পুষ্করিণীর কোনরূপ পঙ্কোদ্ধার হইয়াছিল বলে অনুমান হয় না। জেলিয়াগণ তাহাদের সাধ্যমত ঐ পুষ্করিণীতে জাল ফেলিয়া বিশেষরূপে অনুসন্ধান করিল, কিন্তু মৃতদেহের কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারিল না।

আমরা যে স্ত্রীর মুণ্ড প্রাপ্ত হইয়াছিলাম তাহা দেখিয়া কাহারও সাধ্য ছিল না যে, চিনিতে পারে উহা কাহার মস্তক। উহা যে কাহার মস্তক তাহা জানিবার উপায়ের মধ্যে কেবল একমাত্র তাহার দীর্ঘ কেশরাশি। এখন আমাদের ভরসার মধ্যে এই রহিল যে, যদি কেহ বলে - কোন দীর্ঘকেশী সুন্দরীকে পাওয়া যাইতেছে না, তাহা হইলে আমাদের কার্য্য অস্ম্পূর্ণভাবে সিদ্ধ হউক বা না হউক, অনুসন্ধান করিবার কতকটা রাস্তা হইবে।

ইহার এক ঘণ্টার পরেই ঐ মস্তক ও তাহার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ সুদীর্ঘ কেশরাশ্র বর্ণনযুক্ত বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হইয়া সহর ও সহরতলীর প্রত্যেক থানায় প্রেরিত হইল। উহাতে এরূপ আদেশ ছিল যে, ঢোল মোহরতের দ্বারা এই সংবাদ প্রত্যেক রাস্তায় ও প্রত্যেক গলিতে গলিতে এরূপভাবে প্রচারিত করা হউক, যেন এই বিষয় জানিতে কাহারও বাকি না থাকে।

এই সংবাদ যে দিবসে প্রচারিত হইল, সেই দিবস কোন স্ত্রীলোকেরই অনুপস্থিতি সংবাদ প্রাপ্ত হইলাম না; কিন্তু পর দিবস এক এক করিয়া তিনটি ও তত্পর দিবস দুইটি নিরুদ্দেশের সংবাদ প্রাপ্ত হইলাম।

এই পাঁচটি দীর্ঘকেশী স্ত্রীলোকের নিরুদ্দেশের সংবাদ যাহারা প্রদান করিয়াছিল, সর্বপ্রথম তাহাদিগকে আনাইয়া সেই দীর্ঘকেশযুক্ত ছিন্ন মস্তক দেখাইলাম, কেহই সবিশেষ চিনিতে পারিল না। মৃত স্ত্রীলোকের কোনরূপ সন্ধান পাওয়া যাউক বা না যাউক অপরাপর স্ত্রীলোকদের অনুসন্ধানে যখন হস্তক্ষেপ করা হইয়াছিল, তখন তাহা শেষ করিতে হইবে।

যে দিবস ঐ মস্তক পাওয়া গিয়াছিল, সেই দিবস ও তাহার পর তিন দিবস ঐরূপ গোলযোগের মধ্যে কাটিয়া গেল; পঞ্চম দিবস প্রত্যুষে খবর পাইলাম পুষ্করিণীর মধ্যে কি একটা ভাসিতেছে।

এই কলকাতা সহরের গতি, পাঠকগণ বিশেষরূপে অবগত আছেন, কোন পুলিশ কর্মচারী কোন কার্য্য উপলক্ষে কোন স্থানে দণ্ডয়মান হইলে বিনা উদ্দেশ্যে শত শত লোক তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়ায়। বলা বাহুল্য, আমি সেই পুষ্করিণীর ধারে গমন করিলে শত শত লোক আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। জলের মধ্যে ঐ পদার্থটি দেখিয়া তাহাদের মধ্যে কেহ স্থির করিতে পারিল নাযে উহা কি, কিন্তু সকলের বিশ্বাস হইল যে, কোন পদার্থ ঐ স্থানে রহিয়াছে। এই অবস্থা দেখিয় আমি সেই সমস্ত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করিয়া কহিলাম, তোমাদের মধ্যে এরূপ কোন সাহসী ব্যক্তি আছে, যে সাঁতার দিয়া ঐ স্থানে গিয়া দেখিয়া আসিতে পারে পদার্থটি কি?

(দুইজন) সন্তরণ দিয়া ক্রমে সেই দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল, কিন্তু উহার সন্নিকটবর্তী না হইয়া প্রায় দশ ফিট ব্যবধান হইতে উভয়েই প্রত্যাগমন করিল ও কহিল আমরা উহার নিকট যাইতে পারিলাম না ও বুঝিতে পারিলাম না যে, উহা কি? দুইজন ডুবারিকে আনিবার নিমিত্ত একটি লোক পাঠাইয়া দিলাম।

প্রায় পাঁচ মিনিট পরে উহারা আমাদিগের অতি নিকটবর্তী স্থানে আসিয়া জল উত্থিত হইল। উহারা উত্থিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে জল কর্দ্দমময় হওয়া গেল, সুতরাং ঐ স্থানে যে কি আছে তাহার কিছুই দেখিতে পাইলাম না। উহাদিগকে জল হইতে উঠিতে দেখিয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, যে পদার্থটি আমি তোমাদিগকে দেখাইয়া দিয়াছিলাম, তাহা তোমরা দেখিতে পাইয়াছ কি?
ডুবারি: হ্যাঁ, পাইযাছি।
আমি: ইহা কি পদার্থ অনুমান হয়?
ডুবারি: বোধ হইতেছে উহা মৃতদেহ। 

(পরের অংশের জন্যে এখানে ক্লিক করুন)

প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়

প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯৪৭) বহু বছর পুলিশে কাজ করেছিলেন। নিজের পুলিশী অভিজ্ঞতা থেকে উনি ওঁর দারোগার দপ্তর শুরু করেন। মাসে মাসে পত্রিকাটি বার হত। সেখানেই ১৩১৩ সালে দীর্ঘকেশী কাহিনীটি প্রকাশিত হয়।