রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

"শী"-তে শী-র রহস্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজি বিভাগ। ডিগোল,  অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। তাই ওর পরীক্ষা নিয়ে বেশি টেনশন করতে হয়না। দেখুন না কেমন দিব্বি গল্পের বই পড়ে চলেছে। আর সত্যি বলতে কি, আমার ব্রেন ওর মত নয়, তাই পরীক্ষা আসার আগেই মনোযোগ দিয়ে শুরু করেছি পড়া-লেখা।
.......
কিন্তু ডিগোলের মত রুমমেট থাকলে কি পড়ালেখায় সহজে মনোযোগ দেয়া যায়? টেবিলে বসে পড়ছি, এমন সময় ধাম করে উড়ে এসে টেবিলের উপর পড়ল একটা গল্পের বই। আমি বললাম, এ সবের মানে কি?
"উপন্যাসের শেষ পাতাটা পড়।" ও হেসে বললো।
"দেখ উপন্যাসের শেষ পাতা তো দূরে থাক প্রথম পাতা পড়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই।" রাগের সাথেই কথাটা বললাম।
"একটু দেখনা ভাই, প্লিজ।"
বইটি হাতে নিলাম, দেখলাম হেনরী রাইডার হ্যাগার্ডের লেখা উপন্যাস: "শী"। বইটি ডিগোলের দিকে ছুড়ে দিলাম, বললাম, এই বই অনেক আগেই আমার পড়া আছে।
ও আবার আমার দিকে বইটি ছুড়ে দিয়ে বললো, "পড়তে বলিনি, উপন্যাসের শেষ পাতায় একটি মেয়ে কি লিখেছে তাই দেখতে বলছি তোকে।"
"শী"-র রহস্যময় নায়িকার মতই মেয়েটা রহস্য করে কি লিখেছে তাই দেখ।"
অগত্যা বইটি আবার হাতে নিলাম, শেষের পাতাটি উল্টাতেই চোখে পড়লো গোটা গোটা অক্ষরের লেখাটা। কালো কালির কলম দিয়ে লেখা। পড়ে বুঝতে একটু সময় লাগলো আমার। আর লাগবে না কেন বলুন? এমন লেখা কি কখনো পড়েছেন? আপনাদের সুবিধার্থে শেষ পৃষ্ঠায় মেয়েটির লেখাটি হুবহু তুলে দিলাম নিচে :
....................................
এই যে, আপনি যদি ছেলে হন তাহলে "আয়েশা"-কে (শী উপন্যাসের দুই হাজার বছরের অপেক্ষারত নায়িকা) নিশ্চয় পছন্দ করে ফেলেছেন? আর আয়েশা-কে পছন্দ না করে থাকতে পারবে না কেউ, পছন্দ না করা মুশকিল। কিন্তু পারবেন কি শতকষ্ট করে আয়েশার কাছে যেতে? পারবেন হতে "ক্যালিক্রেটিস" (উপন্যাসের নায়ক), হবে নাকি একটা পরীক্ষা? এই আমাকে, আয়েশা মনে করে খুঁজে বের করুন না দেখি? পেলে আমরা না হয় বন্ধু হবো। পারবেন খুঁজে বের করতে? বাড়ির ঠিকানা দিলাম নিচে:
১) ধরুন, একটি জেলায় ১০০০ গ্রাম ফুল আছে, সেখান থেকে সবাই কে ২০ গ্রাম করে ফুল দিলে, কতজন লোক পাবে?
২) জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, ঠিক ডান পাশে আপনার জন্য করছি আমি ওয়েট।
......রিনটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
.............................................
দেখো কাণ্ড? রিনটি, যেমন নাম তেমন কাজ। আরে বাবা, তুমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, এই জায়গার ঠিকানা দেবে। না, উনি দিয়েছেন উনার বাড়ির ঠিকানা, আর ঠিকানা তো নয়, যেন গুপ্তধনের ঠিকানা! করো, ভেদ করো রহস্য।
আচ্ছা তোমরাই বলো? খেয়েদেয়ে কাজ নেই কে ওর লেখার রহস্য ভেদ করে ওকে খুঁজতে যাবে? হাহ্, যত সব ফালতু ব্যাপার-স্যাপার।
পরক্ষণেই ভাবলাম, আমার কাছে ফালতু হতে পারে। কিন্তু কোন গাধার কাছে হয়তো ফালতু নাও হতে পারে। এমন গাধাও কি আছে?
হা আছে, আছে এই ঘরেই! ডিগোল।
..............
আড় চোখে দেখলাম ডিগোল সুর সুর করে আমার পাশে এসে বসলো। বুঝলাম মতলব ভালো না।
সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, মতলব কি?
"ইয়ে মানে, মেয়েটির সাথে মনে করছি দেখা করবো।" দাঁত বের করে বললো ডিগোল।
..."তো ভালো তো, যানা।"ভেংচি কেটে বললাম।"খুঁজে বের কর গিয়ে যা, আমাকে পড়তে দে।"
..."ইয়ে, অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঠিকানা বুঝতে পারলাম না, তুই দেখনা, বের করে দেনা, তুই এগুলো ভাল বুঝিস, প্লিজ।"
বোঝো ঠেলা? এটা ঠিক, পড়াশোনা বাদে অন্যান্য  ব্যাপারে ডিগোলের চেয়ে আমি বুঝি একটু বেশী। কিন্তু তাই বলে পড়া বাদ দিয়ে এসব, উহু, নো নো।
..."ইয়ে মানে শুধু ঠিকানা টা বের করে দে," আবার অনুনয় শুরু করলো ডিগোল, "আর কিছু করতে হবে না, আমি আর জ্বালাবো না তোকে, দে না প্লিজ, সত্যি বলছি"।
"আচ্ছা, আমি বুঝতে পারছি না, তুই কি করে ভাবছিস আমি ঠিকানা টা বের করতে পারবো?"একটু ঝাঁঝের সাথেই বললাম।"ব্যাপারটা হয়তো ভুয়া।"
"কিন্তু আমার ভুয়া মনে হচ্ছে না, পারবি তুই পারবি ঠিকানা বলতে, দেখনা চেষ্টা করে।"
.............
অগত্যা কি আর করা? "শী"-র ভেতর শী-র ঠিকানা বের করতে বসলাম। উপন্যাসের শেষ পাতায় কলমের কালিতে লেখা টা নিয়ে বেশ কয়েক বার পড়লাম। এটুকু মাথায় ঢুকলও মেয়েটি ঠিকানার জন্য দুটি ধাপ দিয়েছে। পুনরায় ১ম ধাপটি পড়লাম। ১) ধরুন, একটি জেলায় ১০০০ গ্রাম ফুল আছে, সেখান থেকে সবাই কে ২০ গ্রাম করে ফুল দিলে, কতজন লোক পাবে?
....কতজন? আচ্ছা,  ১০০০ গ্রাম কে ২০ গ্রাম দিয়ে ভাগ দিলে উত্তর হয় ৫০০ জন, উহু ৫০ জন। ৫০ জন দিয়ে কি বোঝাচ্ছে মেয়েটা ?
প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ৫০ জন নিয়ে আমি আর ডিগোল ৫০ বার ভাবলাম। কিন্তু নাহ্ কিছুই ধারণা করতে পারলাম না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই ১ নম্বর ধাপে কোথাও জেলার নাম লেখা আছে। কিন্তু কোথায়? দেখি আবার ১) ধরুন, একটি জেলায় ১০০০ গ্রাম ফুল আছে, সেখান থেকে সবাই কে ২০ গ্রাম করে ফুল দিলে, কতজন লোক পাবে? কত আবার, ৫০ । ধ্যাৎতেরই। নাহ্ এখানে আবার কোথায় জেলার নাম লেখা?
..............
........
....
২ ঘণ্টা পার। কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
ডিগোল কে দেখলাম শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে, এক মনে আউড়ে যাচ্ছে।"এক হাজার গ্রাম ফুল আছে....কুড়ি গ্রাম করে দিতে হবে....এক হাজার গ্রাম ফুল আছে....কুড়ি গ্রাম করে দিতে হবে....এক হাজার গ্রাম ফুল আছে....কুড়ি গ্রাম করে দিতে হবে....
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ধরে ফেললাম, রহস্য টা, পেয়েছি!!, ধরতে পেরেছি মেয়েটি কোন জেলার!! ডিগোল কে বললাম পেয়ে গেছি জেলার নাম! ও তাড়াক করে উঠে বললো, কোন জেলা???
"কুড়িগ্রাম"
.................
শুরু হল ধাঁধাঁ সমাধানের ২য় ধাপ। প্রথমেই বেশ ভালো করে কয়েক বার পড়ে নিলাম। ২) জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, ঠিক ডান পাশে আপনার জন্য করছি আমি ওয়েট।
......রিনটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বুঝতে পারছি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল "জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট" কথাটি। জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, মানে কি? তাহলে কি জেলার ভেতর আরেক জেলা রয়েছে? নাকি কোন জায়গার নাম বুঝিয়েছে? একটি জিনিস পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের জেলার নাম আমরা জানি,তাই ধাঁধাঁর ১ম অংশ থেকে জেলার নাম বের করতে পেরেছি। কিন্তু কুড়িগ্রাম এর কোনো জায়গার নাম তো আমরা জানিনা। ফলে ২য় অংশে যদিও বা জায়গার নাম থাকে, আমরা তা ধরতে পারবো না। তাহলে উপায়? ধরবে কে ? হুম, উপায় অবশ্য আছে, আমরা ধরতে না পারলেও, কুড়িগ্রামের কেউ হয়তো সহজেই ধরতে পারবে।
তো? ডিগোল কে বললাম।"তুই তৈরি হয়ে যা, ঢাকা টু কুড়িগ্রাম। ওখানে কাউকে এই ধাঁধাঁটা দেখালেই বলে দিতে পারবে মনে হচ্ছে।"
"হুম,তাহলে তুইয়ো ব্যাগ গুছিয়ে নে, কালই যাওয়া যাক, কি বলিস?" ডিগোল হাসছে।
কিন্তু আমার মোটেও হাসি পাচ্ছে না। "দাঁত বের করে হাসা বন্ধ কর।"বললাম আমি।"ঐ রিনটি না নিমকি মেয়েটিকে খুঁজতে যাওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই, যতসব পাগলামি, সামনে পরীক্ষা, আমাকে পড়তে দে।"
............
............
পরদিন বাসের টিকিট কাটা হল, ঢাকা টু কুড়িগ্রাম। টিকিট কাটা হল দুটো। হা ঠিকই শুনেছেন, ডিগোলের হাজারো পীড়াপীড়িতে অবশেষে আমাকে রাজি হতে হয়েছে। তবে শর্ত একটাই, এই অভিযানের পর নিশ্চিন্তে আমাকে পড়তে দেবে। যথারীতি বাসের প্রায় সামনের দিকেই বসেছি। দ্রুত বাস এগিয়ে চলেছে, সব পেছনে ফেলে সামনে।
...........
বাসের মধ্যে ডিগোল একবার আমাকে বললো, আশেপাশে কুড়িগ্রামের কেউ আছে কিনা জিজ্ঞেস করবো নাকি?
"কেন?"
"না মানে ২য় অংশে কুড়িগ্রামের কোন জায়গার কথা বলা হয়েছে, তা চিনতে পারে কিনা জানতে চাইতাম।"
"যাচ্ছি তো কুড়িগ্রামই, নাকি?" ধমক দিয়েই ওকে বললাম।"ওখানে বহু কুড়িগ্রামের লোক পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করার জন্য।"
..............
এক দুই করে ঘণ্টাগুলো পার হয়ে যাচ্ছে। বাস একসময় দিনাজপুরের ফুলবাড়ি ঢুকল। ফুলবাড়ির ঢাকা মোড় পার হয়ে বাস চলল রংপুরের উদ্দেশ্যে।
প্রায় ঘণ্টা খানেক পর বাস রংপুরের বিখ্যাত কারমাইকেল কলেজ (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) ছেড়ে চলল আমাদের গন্তব্যস্থল কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে। বাস থেকে বহুলোক নামলো বহুলোক উঠল। তবে এখন যারা আছে তাদের অধিকাংশই যে কুড়িগ্রাম যাবে, তা বোঝায় যাচ্ছে।
.........
দীর্ঘ জার্নিতে চোখ ঢুলু ঢুলু করছে। কখন যে কুড়িগ্রাম পৌঁছে গিয়েছি, বুঝতেই পারিনি। সজাগ হলাম সুপারভাইজারের কথায়, "ভাই নামেন, কুড়িগ্রাম বাসস্ট্যান্ড ।"
........
বাস থেকে নেমে দেখলাম, চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। হঠাৎ মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল, কোথাকার রিনটি না ফিনটি, তার জন্য এখন আমি এই অচেনা জায়গায়। গল্পের বই পড়বে ভালো কথা, পেছনে আবার এরকম রহস্য করে ঠিকানা লেখার কি দরকারটা ছিল? যতসব।
ড্রাইভার ভায়ের কাছে একটি ভালো হোটেলের নাম শুনে নিয়ে রিক্সায় উঠলাম। মনে মনে ঠিক করেছি, রাতটা হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে সকালে যা করার করবো।
...............
কুড়িগ্রাম শহরটা ছোট। ছোট ছোট কিছু মার্কেট লক্ষ্য করলাম, বড় বড় বিল্ডিং খুব একটা চোখে পড়ছে না। একটি ছোট হোটেলে নাস্তা করলাম। নাস্তা করে হাঁটছি, উদ্দেশ্য এখানকার কোনো শিক্ষিত লোক ধরা। হঠাৎ চোখে পড়লো সাদা দাড়ি ওলা এক লোকের উপর। কি মনে করে তার সাথে কথা বলে তাকেই ধরিয়ে দিলাম কাগজটি। কাগজটি হাতে নিয়ে সে জোরে জোরে পড়লো: "২) জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, ঠিক ডান পাশে আপনার জন্য করছি আমি ওয়েট।"
বললাম, কোন জায়গা এটা আপনি কি বুঝতে পারছেন? লোকটি আমতা আমতা করে বললো, "এটা মনে হয় জেলখানার কথা বলা হয়েছে, আর জেলখানায় তো জেলার থাকে, ঐ জেলারের বাড়ির গেট হতে পারে।"
লোকটির হাত থেকে কাগজটি নিয়ে বললাম, ধন্যবাদ। হাটতে শুরু করলাম সামনে, জেলখানা, আ? বলে কিনা জেলারের বাড়ির গেট, ধ্যাৎতেরি।
........
পর পর বেশ কয়েকজনকে কাগজটি দেখালাম, কিন্তু কেউই ধরতে পারলনা, ঠিক কোন জায়গা।
একবার ভাবলাম, আসলেই কি জায়গার নাম লেখা আছে? না আমরা শুধু শুধু ধারণা করছি মাত্র। হঠাৎ ডিগোল একটি মধ্য বয়সী মহিলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাকে বললো, "উনাকে জিজ্ঞেস করে দেখ, মেয়েদের লেখা মেয়েরাই ভালো বুঝবে।"
মহিলার কাছে সাহায্য চাইলাম, বললাম, আমরা একটি জায়গা খুঁজছি, সেটি রহস্য করে এই কাগজে লেখা রয়েছে, আপনি যদি দয়া করে একটু দেখেন। কাগজটি মহিলার হাতে দিলাম। মহিলা বেশ কয়েক বার লেখাটি পড়লেন: "২) জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, ঠিক ডান পাশে আপনার জন্য করছি আমি ওয়েট।"
কিছুক্ষণ চুপ করে ভেবে নিয়ে মহিলা বললেন, "এই কুড়িগ্রামে "উপজেলার গেট" বলে একটা জায়গা আছে, সেটার কথায় বোঝাচ্ছে নাকি, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা।"
মহিলা বুঝতে না পারলেও আমি ঠিকই বুঝে নিয়েছি, জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট বলতে, কুড়িগ্রাম জেলাতে ঐ "উপজেলার গেটই" তাহলে বুঝিয়েছে মেয়েটা, রিনটি কৌশলে উপজেলার গেটকে ছোট জেলার গেট লিখেছে মনে হচ্ছে।
মহিলাকে বললাম জায়গাটি কত দুরে। মহিলা বললেন, রিক্সা ওলাকে উপজেলার গেট যাব বললে, আপনাকে ঠিক নিয়ে চলে যাবে, ১০ টাকা ভাড়া নেবে, দেখবেন রাস্তায় একটি বড় গেট আছে, আর কিছু নেই।
মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে বসলাম রিক্সায়।
.........
উপজেলার গেটে গিয়ে দেখলাম, মহিলার কথাই ঠিক। একেবারে রাস্তার ধারে এপার থেকে ওপারে একটি গেট দাড়িয়ে আছে। কোন বিল্ডিং নেই। কিন্তু এই ফাঁকা গেটে ঐ রিনটিকে পাই কি করে? ধাঁধাঁর অংশটা আরেক বার দেখলাম: "২) জেলার ভেতর ছোট জেলার গেট, ঠিক ডান পাশে আপনার জন্য করছি আমি ওয়েট।" কিন্তু এখানে কোন দিকে ডান পাশ ধরবো? মহা মুশকিল তো দেখছি।
মাথায় একটি বুদ্ধি এলো, যেহেতু এইখানের মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, সেহেতু তাকে অনেকেই চিনবে। আমাদের দরকার এখানে কাউকে রিনটির কথা জিজ্ঞেস করা।
.......
দেখলাম তিনজন লোক দাড়িয়ে গল্প করছে। তাদের কাছে গিয়ে রিনটির কথা বলতেই খুব সহজেই পাওয়া গেল রিনটিকে।
কুড়িগ্রাম যেতে যে জায়গাটির নাম উপজেলার গেট, ঠিক তার ডান দিকের কয়েকটি বাসার পরেই রিনটিদের বাসা। সত্যি, একেবারে সত্যি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রিনটি আছে বাস্তবে!!! আর আমরা এখন তার বাসার দিকেই যাচ্ছি।
..........
কিন্তু এতো কিছু করে লাভ কি হল? রিনটিকে তো বাসায় পাওয়া গেল না। ও নেই।
ও নেই মানে বাসায় নেই। এই ধাঁধাঁর খেলা খেলে চলছে সে অন্যখান থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
....
রিনটির আম্মুকে সব খুলে বলেছি। উনি আমাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে বসালেন। বললেন, আমার মেয়েটা না একেবারে পাগলী। আমি বললাম, উহু, ভুল বললেন, বরং ভীষণ চালাক, দেখুন না ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের পাঠিয়েছে ওর বাড়ী।
......
নাস্তা করার পর মেয়েকে ফোন দিলেন আন্টি, মেয়েকে ফোনে শুধু বললেন, "কথা বল, তোর সাথে দেখা করতে এসেছে।" আন্টি আমার কথা মতো আমাদের কথা না বলে আমার হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দিলেন।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে বললাম, হ্যালো।
"কে??" ওপাশ থেকে বললো রিনটি।
"আমি, আমি ক্যালিক্রেটিস।"
"ক্যালিক্রেটিস? এ নামে তো চিনিনা কাউকে?"
"সত্যি কি তাই আয়েশা, তুমি চিনতে পারছো না আমাকে?"
"কি বলছেন, আমি আয়েশা নাতো, রিনটি?"
"হা কিন্তু আয়েশার মতোই হতে চান তো, তাইনা?"
"নাহ্ আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না?"
........
বেশ কিছুক্ষণ পর সব খুলে বললাম রিনটিকে। শুনে ও ভীষণ আশ্চর্য হলো, বললো," ও মাই গড সত্যি??? আমার ভীষণ ভালো লাগছে, আমি ভাবতেই পারিনি কেউ আমার লেখা দেখে আমাকে খুঁজবে। আপনি ঢাকায় চলে আসুন, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি ক্যাম্পাসে।"
.......
রিনটির ঘরটি দেখে খুব ভালো লাগলো। সাজানো গোছানো পরিপাটি, একটি বুক সেলফ দেখলাম। তাতে বিভিন্ন বই। বেশির ভাগই বিদেশি গল্পের বইয়ের অনুবাদ। ডিগোলকে একটি বই টেনে নিতে দেখে বললাম, করছিস কি?
ও মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, চুরি।
"রাখ।"মেজাজ গরম হয়ে গেল।"এখানে তুই চুরি করবি? তোর কাণ্ড জ্ঞান কি হবে না? খবরদার কারো জিনিস নিবি না।"
ও সুবোধ বালকের মতো বইটি রেখে দিল যথাস্থানে।
.....
রিনটির আম্মু থেকে যেতে বললো, কিন্তু আমরা উনাকে বুঝিয়ে বিদায় নিলাম। কালকে সকালেই রওনা দেব ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে, আমার প্রিয় ক্যাম্পাসে।
.......
....
পরদিন বিকেল।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। আমার আর ডিগোলের সামনে এসে দাড়ালো একটি হাসি হাসি মুখ। রিনটি। যার খোঁজে ছুটে গিয়েছিলাম কুড়িগ্রাম।
একটি গাছের নিচে বসলাম আমরা তিনজন।
রিনটি বিভিন্ন খাবার নিয়ে এসেছে। আমাকে আর ডিগোলকে তার প্রিয় দুটি গল্পের বই উপহার দিল।
তারপর শুরু হলো তিন বন্ধুর মতো কথা।
হা, অনেক কথাই হলো রিনটির সাথে। অনেক হাসি হলো।
....
হঠাৎ রিনটি হাসতে হাসতে বললো,"আচ্ছা, আপনারা তো আমাকে খুঁজে বের করলেন, কিন্তু আমি বইটিতে লিখেছিলাম, যে আমাকে খুঁজে বের করবে আমি তাকে বন্ধু বানাবো। তা আপনারা তো দুজনে খুজেছেন। কাকে বন্ধু বানাবো বলুন তো? উ?" রিনটি হাসছে।
বুঝতে পারছি কথাটা রিনটি ইয়ার্কি করেই বলেছে। তারপরও কেন যেন ওখান থেকে উঠে যাওয়ার একটা তাগিদ অনুভব করলাম।
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালাম, হাসতে হাসতেই বললাম, আপনারা গল্প করুন, আমি একটি জরুরী কাজ সেরে আসছি।
"আরে আরে বসুন না?"বললো রিনটি।"আরও অনেক গল্প আছে, প্লিজ।"
"অসুবিধা নেই।" বললাম আমি। "একই জায়গায় যখন আমরা পড়ি, তখন অবশ্যই কথা হবে, আর গল্প তো হবেই। পরে দেখা হবে কেমন?"
ডিগোল আর রিনটিকে রেখে আসার সময় হঠাৎই কেন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে একটা ধমক দিলাম। উহু, ঠিক না,এটাতো আমার স্বভাব নয়। পেছনে ফিরে ওদেরকে একবার দেখতে ইচ্ছে হলো, পরক্ষণেই সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দিয়ে জোরে জোরে পা বাড়ালাম।
.......
...(সমাপ্ত।)
....…
(বি:দ্র: বহুবছর আগে একবার কুড়িগ্রাম গিয়েছিলাম। ওখানে "উপজেলার গেট"-বলে সত্যি একটা জায়গা রয়েছে। আর রিনটি........)

অদ্ভুত রাতের প্রকৃতির গল্প

লেখক পরিচিতি - ক্ষুদ্র গল্পকার, ফেসবুকে "অদ্ভুত রাতের প্রকৃতির গল্প"-নামে লেখালেখি করা হয়। বাংলাদেশ।