রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

তৃতীয় খণ্ড 


একাদশ পরিচ্ছেদ
মুখ বন্ধ

মজিদ খাঁ হাজতে ।
      হরিপ্রসন্ন তাঁহার সহিত দেখা করিয়া অনেক রকমে বুঝাইতে লাগিলেন । তাঁহার মাথার উপরে অতি সূক্ষসূত্রে যে একখানা ভয়ানক বিপদের খড়গ ঝুলিতেছে, তাহাও নির্দ্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিলেন ।
মজিদ খাঁ বলিলেন, "যাহা বলিবার, তাহা আমি পূর্ব্বেই আপনাকে বলিয়াছি । তবে ছুরিখানির সম্বন্ধে আমি আপনার নিকটে কোন কথা গোপন করিতে চাহি না । আমি বিগত বুধবারে অপরাহ্ণে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে গিয়াছিলাম । সেইখানে দিলজানের সহিত আমার দেখা হয় । দিলজান মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিতে আসিয়াছিল । তাহার অবস্থা তখন ভাল নহে; সে ক্ষোভে, রোষে যেন উন্মত্তা হইয়া উঠিয়াছিল । আমি তাহাকে অনেক করিয়া বুঝাইতে লাগিলাম. কিছুতেই তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিতে পারিলাম না । একবার সে রোষভরে সেই ছুরিখানা বাহির করিয়া বলিল, "আগে সে মনিরুদ্দীনকে খুন করিবে, তাহার পর সৃজানকে; নতুবা সে কিছুতেই ক্ষান্ত হইবে না । আমি তাহার নিকট হইতে জোর করিয়া ছুরিখানা কাড়িয়া লইতে গেলাম; সে তখন ছুরিখানি দ্বারের বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল । আমি যেমন ছুটিয়া গিয়া ছুরিখানি কুড়াইয়া লইতে যাইব-দেখিতে না পাইয়া ছুরিখানি মাড়াইয়া ফেলিলাম, তাহাতেই ছুরির বাঁট ভাঙ্গিয়া যায় । আমি ছুরিখানি তুলিয়া পকেটে রাখিয়া দিলাম । ছুরিখানি যে বিষাক্ত, তাহা আমরা কেহই তখন জানিতাম না । দিলজানের যদি জানা থাকিত, তাহা হইলে আমি যখন ছুরিখানা লইয়া কাড়াকাড়ি করি, অবশ্যই সে আমাকে সাবধান করিয়া দিত, আর সে নিজেও সাবধান হইত । যাহা হউক, তাহাকে বিদায় করিয়া দিয়া আমি নিজের বাসায় চলিয়া আসি; ইহার পর দিলজানের সহিত আর আমার দেখা হয় নাই । বাসায় আসিয়া ছুরিখানা পকেট হইতে বাহির করিয়া আমি টেবিলের উপরেই ফেলিয়া রাখিয়া দিই । আমি চাবির পাশে ছুরি রাখি নাই-আর কেহ সেখানে রাখিয়া থাকিবে ।"
হরিপ্রসন্ন বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, "তবে সেইদিন মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে রাত এগারটার পর যে স্ত্রীলোকটির সহিত তোমার দেখা হইয়াছিল, সে কে?"
     মজিদ খাঁ অবনতমস্তকে কহিলেন, "সে কথা আমি কিছুতেই বলিতে পারিব না-বাধা আছে । আমি যতক্ষণ না সেই স্ত্রীলোকের সহিত আর একবার দেখা করিতে পারিতেছি ততক্ষণ আমি তাহার নাম প্রকাশ করিতে পারিব না, আমি তাহার নিকটে এইরূপ প্রতিশ্রুত আছি । তাহার সম্মতি ব্যতীত এখন আর উপায় নাই ।"
     হরি । তাহার সম্মতি কতদিনে পাইবে?
     মজিদ । তা' আমি এখন কিরূপে বলিব? তবে এ সময়ে মনিরুদ্দীনের সঙ্গে একবার দেখা হইলে আমি যাহা হয়, একটা স্থির করিয়া হয় ত সেই স্ত্রীলোকের নাম প্রকাশ করিতে পারিতাম ।
     হরি । তোমার কথার ভাবে বুঝিতে পারা যাইতেছে, সেই স্ত্রীলোক নিশ্চয়ই সৃজান ।
     মজিদ । কই, আমি ত আপনাকে কিছু বলি নাই ।
     হরি । স্পষ্টতঃ না বলিলেও, তোমার কথার ভাবে বুঝাইতেছে, সেই স্ত্রীলোক আর কেহ নহে-সৃজানই সম্ভব ।সম্ভব কেন-নিশ্চয়ই । আর আমাকে গোপন করিতে চেষ্টা করিয়ো না । ঠিক করিয়া বল দেখি, সে সৃজান কি না?
     মজিদ । আমার অপরাধ ক্ষমা করুন, আপনি কোন ক্রমেই এখন আমার কছে আপনার এ প্রশ্নের উত্তর পাইবেন না ।
     হরিপ্রসন্ন বাবু আরও অনেক চেষ্টা করিলেন, কিছুতেই মজিদ খাঁর মত্ পরিবর্ত্তন করিতে পারিলেন না । বলিলেন, "তুমি যদি বাপু, তোমার নিজের বিপদের কতটা গুরুত্ব না বুঝিতে পার, তোমার মত নির্ব্বোধ আর কেহই নাই । যদি তুমি এখনও আমার কাছে সত্য গোপন করিতে চাও-আমি তোমাকে উদ্ধার করিবার কোন সুবিধাই করিতে পারিব না ।"
     তথাপি মজিদ খাঁ নিরুত্তর রহিল ।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
মুখবন্ধের কারণ কি?

     হরিপ্রসন্ন বাবু হাজত হইতে বাহির হইয়া নিজের বাড়ীর দিকে চলিলেন । বাটীসম্মুখে আসিয়া দেখিলেন বহির্দ্বারের নিকটে একখানি গাড়ী দাঁড়াইয়া রহিয়াছে । দেখিয়াই চিনিতে পারিলেন, সে গাড়ী জোহেরার । বুঝিতে পারিলেন, তাঁহার যাইতে বিলম্ব হওয়ায় জোহেরা নিজে আসিয়াছে । গাড়ীর ভিতরে জোহেরা বসিয়া ছিল । হরিপ্রসন্ন বাবু তাহাকে সস্নেহ-সম্ভাষণ করিয়া আপনার বাটীর ভিতরে লইয়া গেলেন । দ্বিতলে একটি প্রকোষ্ঠে লইয়া গিয়া তাহাকে বসিতে বলিলেন; এবং একটা স্বতন্ত্র আসনে তাহার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া বসিলেন । বসিয়া বলিলেন, "আমি এখনই তোমার ওখানে যাইব বলিয়া মনে করিতেছিলাম । একটা বিশেষ কাজ থাকায়-খবর পাইয়াই যাইতে পারি নাই । তা' তুমি আসিয়াছ, ভালই হইয়াছে । যে জন্য তুমি আমাকে তোমার সহিত দেখা করিতে বলিয়াছিলে, তাহা আমি অনুভবে তখনই এক প্রকার বুঝিতে পারিয়াছিলাম । আমি এই মাত্র মজিদের নিকট হইতে ফিরিতেছি । মজিদ নিশ্চয়ই নির্দ্দোষী-তাহাতে আমার কোন সন্দেহ নাই ।"
     জোহেরা বলিল, "নির্দ্দোষী -তিনি যে নির্দ্দোষী, তাহা আমিও জানি । তাঁহার দ্বারা কখনই এই ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সম্ভবপর নয়; কিন্তু কিরূপে তাঁহার নির্দ্দোষতা সপ্রমাণ হইবে, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না ।"
চিন্তিতমুখে হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "তাই ত, যেরূপ দেখিতেছি, তাহাতে এখন মজিদের নির্দ্দোষতা সপ্রমাণ করা বড় শক্ত ব্যাপার! এমন কি সে আমার কাছেও কিছুতেই কোন কথা প্রকাশ করিতে চাহে না । কেবল সকলই গোপন করিবার চেষ্টা করিতেছে ।"
     জোহেরা ব্যাকুলভাবে কহিল, "কি মুস্কিল! তিনি আবার এ সময়ে - এই ভয়ানক বিপদের মাঝখানে দাঁড়াইয়া এমন করিতেছেন কেন? কি কথা তিনি আপনার কাছে প্রকাশ করেন নাই?"
     উকীলবাবু বলিলেন, "সেই খুনের রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যে স্ত্রীলোকের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম । কিছুতেই মজিদ তাহার নাম বলিল না । আমার বোধ হয়, সেই স্ত্রীলোক আর কেহই নহে-সৃজান বিবি ।"
     "সৃজান বিবি!" যেন প্রতিধ্বনি করিয়া জোহেরা বলিল, "কি সর্ব্বনাশ! তিনি সেখানে-তেমন সময়ে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে কেন যাইবেন? আপনার অনুমানই ঠিক নহে ।"
     উকীল বাবু বলিলেন, "আমার অনুমানই ঠিক-সৃজান বিবি মনিরুদ্দীনের সহিত গোপনে দেখা করিতে গিয়াছিল, কিন্তু মনিরুদ্দীনের সহিত তাহার দেখা না হইয়া ঘটনাক্রমে মজিদের সহিতই তাহার দেখা হইয়া যায় । সৃজান বিবি-যাহাতে মজিদ তাহার নাম প্রকাশ না করে, সেজন্য তাহাকে প্রতিশ্রুত করাইয়া থাকিবে । এইরূপ একটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ায় মজিদ সেই স্ত্রীলোকের নাম প্রকাশ করিতে পারিতেছে না । মজিদ এখন বলিতেছে, সেই স্ত্রীলোকের নাম প্রকাশ করুতে হইলে, অন্ততঃ মনিরুদ্দীনের সহিত একবার দেখা করা দরকার; কিন্তু এ সময়ে কি মনিরুদ্দীনের সহজে দেখা পাওয়া যাইবে? সে এখন একেবারে নিরুদ্দেশ ।
     জোহেরা কহিল, "নিজে এমন বিপদাপন্ন; এ সময়ে সৃজান বিবির নাম প্রকাশ করিতে হইলে কি ক্ষতি আছে? কি আশ্চর্য্য! সামান্য প্রতিজ্ঞার জন্য বিবির যে সম্ভ্রমহানি হইবে, এখন আর এমন সম্ভবনা নাই-সে ত নিজের মান-সম্ভ্রম নিজেই জলাজ্ঞলি দিয়া গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছে; তবে তাহার জন্য কেন আত্মোৎসর্গ?"
     উকীল বাবু বলিলেন, "আরও একটা কারণ আছে । সৃজান বিবি যে মনিরুদ্দীনের সহিত গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছে, ইহা লোকে শুনিলেও সত্য-মিথ্যা সম্বন্ধে এখন সকলেরই সন্দেহ আছে । কিন্তু এখন যদি মজিদ প্রকাশ করে যে, সৃজান বিবিকেই সেদিন রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে দেখিয়াছে, তাহা হইলে মনিরুদ্দীন যে, সৃজান বিবিকে লইয়া সরিয়া পড়িয়াছে, সে সম্বন্ধে ত আর কাহারও সন্দেহের কোন কারণই থাকিবে না । যাহা তাহারা শুনিয়াছে, তাহাতেই সকলে কৃতনিশ্চয় হইতে পারিবে । ইহাতে মনিরুদ্দীন দোষী হইলেও মজিদ তাহাকে আপনার ভ্রাতার ন্যায় স্নেহ করে-কিছুতেই সে তাহার বিরুদ্ধে কোন কথা প্রকাশ করিবে না । সেইজন্যই মজিদ কোন কথা প্রকাশ করিবার পূর্ব্বে একবার মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিতে চাহে বোধ হয় ।"
     দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া জোহেরা বলিল, "কিন্তু এখন মনিরুদ্দীনকে কোথায় পাওয়া যাইবে- তাঁহার ত কোন সন্ধান নাই । তবে কি হবে?"
উকীল বাবু বলিলেন, "তাই ত, কিছুতেই বুঝিতে পারিতেছি না । মজিদের বিরুদ্ধে কয়েকটা প্রমাণ বলবৎ রহিয়াছে ।"
     সোৎসুক জোহেরা জিজ্ঞাসা করিল, "তাহার অনুকূলে কি কোন প্রমাণই নাই? তিনি কি নিজের উদ্ধারের জন্য আপনার নিকটে কোন কথাই প্রকাশ করেন নাই? আত্মরক্ষায় তিনি কি এমনই উদাসীন?"
     উকীল বাবু বলিলেন, "তাঁহার অনুকূলে একটা প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে-এখন তাহা সপ্রমাণ করা চাই । মজিদের মুখে শুনিলাম, যে ছুরিখানি তাহার বাসায় পাওয়া গিয়াছে, তাহা সে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে দিলজানের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছিল । তাহার পর নিজের বাসায় আনিয়া টেবিলের উপরে সেই ছুরিখানা ফেলিয়া রাখে; কিন্তু ছবির পাশে কে তাহা তুলিয়া রাখিয়াছিল, তাহা মজিদ নিজে জানে না । তাহার অনুমান, বাড়ীওয়ালীই ঘর পরিষ্কার করিতে আসিবার সময় ছুরিখানি ছবির পাশে তুলিয়া রাখিয়া থাকিবে ।"
     জোহেরা বলিল, "তাহা হইলে এখন একবার তাহা আপনাকে সন্ধান করিয়া দেখিতে হইবে । আপনি হামিদার সহিত একবার দেখা করুন ।"
উকীল বাবু বলিলেন, দেখা ত করিবই; কিন্তু কাজে কতদূর হইবে, বুঝিতে পারিতেছি না ।
     জোহেরা ব্যগ্রভাবে কহিল "হতাশ হইবেন না-নিশ্চয়ই আপনি কৃতকার্য্য হইবেন ।"

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
কারণ - দুর্জ্ঞেয়

       হরিপ্রসন্ন বাবু আর কালবিলম্ব না করিয়া মজিদ খাঁর বাসাতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন । হামিদা তখন বাড়ীতেই ছিল । হরিপ্রসন্ন বাবু হামিদাকে ডাকিয়া বলিলেন, "আমাকে একবার মজিদ খাঁর ঘরে লইয়া চল । বিশেষ আবশ্যক আছে ।"
     হামিদা বৃদ্ধ উকীল হরিপ্রসন্ন বাবুকে চিনিত । খুব খাতির করিয়া তাঁহাকে মজিদ খাঁর ঘরে লইয়া গিয়া বসাইল ।
     বসিয়া হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "আমি তোমাকে দুই-একটি কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই । যাহা জান, সত্য বলিবে ।"
     হামিদা বলিল, "আপনার সঙ্গে মিথ্যাকথা কি, মশাই? আমি মিথ্যাকথা কখনও কহি না-আমাকে এখানকার সকলেই জানে ।"
     হরিপ্রসন্ন বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, "মজিদ খাঁর ঘর কে পরিষ্কার করে?"
     হামিদা বলিল, "আমি-আর কে কর্বে?"
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "মনে পড়ে, তুমি এ ঘরে কখনও একখানা বাঁটভাঙ্গা ছুরি টেবিলের উপরে প'ড়ে থাক্তে দেখেছ?"
     হামিদা অঙ্গুলীতে অঞ্চল জড়াইতে জড়াইতে চিন্তা করিতে লাগিল । অনেকক্ষণ পরে বলিল, "হাঁ, একখানা বাঁটভাঙ্গা ছুরি দেখেছি বটে ।"
     হরি । কতদিন পূর্ব্বে?
     হামি । বেশি দিন না-এই সেদিন হবে । কোন্ দিন তা, ঠিক আমার মনে হচ্ছে না । একদিন সন্ধ্যার সময়ে খাঁ সাহেব বাড়ীতে এলেন । এসেই পকেট থেকে একখানা ভাঙ্গা ছুরি বের ক'রে এই টেবিলের উপরে রাখ্লেন- আমি তখন এই ঘরটা পরিষ্কার করছিলেম । তার পর তিনি গা ধুতে নীচে চ'লে গেলেন; তখনই তাড়াতাড়ি গা ধুয়ে উপরে উঠে এলেন, আবার কাপড়-চোপড় প'রে বেরিয়ে গেলেন । যাবার সময়ে আমাকে খানা তৈয়ারী রাখ্তে মানা ক'রে দিলেন । বল্লেন, "ফির্তে অনেক রাত হবে, হোটেলেই খাবেন," আমার তা' বেশ মনে আছে ।
     হরি । ছুরিখানা কি তখনও টেবিলের উপরেই প'ড়ে ছিল?
     হামি । সেই ছুরিখানা? হাঁ, টেবিলের উপরেই পড়েছিল বৈকি । তা' আমি সেখানা একখানা ছবির পাশে তুলে রেখে দিই । কেন-কি হয়েছে?
     হরি । রাত্রে মজিদ খাঁ ফিরে এসেছিল?
     হামি । হাঁ, অনেকরাত্রে । রাত তখন শেষ হ'য়ে এসেছে ।
     হরি । তখন মজিদের মেজাজ্ কেমন ছিল?
     হামি । বড় ভাল নয়-মুখ চোখের ভাবে আমি তা' বেশ বুঝ্তে পারলেম । বাড়ীর ভিতরে এসে সরাসর উপরে উঠে গেলেন । এমন কি আমাকে সাম্নে দেখ্তে পেয়েও আমার সঙ্গে একটী কথা কহিলেন না ।
হামিদার নিকটে আর বিশেষ কিছু সংবাদ পাওয়া গেল না । হরিপ্রসন্ন বাবু হামিদার বাটী ত্যাগ করিয়া পুনরায় জোহেরার সহিত দেখা করিতে তাহাদিগের বাড়ীর দিকে চলিলেন ।
     অনন্তর জোহেরার সহিত দেখা করিয়া তিনি হামিদার প্রমুখাৎ যাহা কিছু শুনিয়াছিলেন সমুদয় তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন । তাহার পর বলিলেন, এখন বুঝিতে পারিতেছ, মজিদ খাঁর অনুকূলে একটা খুবই প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে । মজিদ খাঁ এই ছুরি দ্বারা দিলজানকে খুন করে নাই, তাহা এখন আমি হামিদাকে দিয়া সপ্রমাণ করিতে পারিব ।"
     জোহেরা বলিল, "তাহাতে এখন আমাদের এমন বিশেষ কি কাজ হইবে? ঐ ছুরিতে খুন না করিলেও, তিনি অপর ছুরি দ্বারা দিলজানকে খুন করিয়াছেন, এই কথাই এখন তাঁহার বিপক্ষেরা বলিলেন ।"
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "তাহা হইলেও ত মোকদ্দমা অনেকখানি হালকা হইয়া গেল । দেবেন্দ্রবিজয়ের দৃঢ় ধারণা, ঐ ছুরি দ্বারা দিলজান খুন হইয়াছে । মজিদ যে এই খুন করিয়াছে, তিনি এ পর্য্যন্ত তাহার আর এমন কোন কারণ দেখিতে পান নাই । কেবল ওই ছুরিখানা মজিদের ঘরে পাওয়ায় তিনি সন্দেহের বশেই তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়াছেন ।"
     জো । তবে এখন উপায়?
     হ । উপায় আমি করিতেছি । মুন্সী সাহেব এখন বাড়ীতে আছেন কি?
     জো । আছেন । সৃজান বিবি গৃহত্যাগ করার পর তিনি আর বাহিরে যান না, কাহারও সহিত দেখাও করেন না -দিনরাত উপরের বৈঠকখানায় একা ব'সে থাকেন ।
     হ । তাঁহার সহিত একবার দেখা করিতে হইবে ।
     জো । কেন?
     হ । সৃজান বিবির সম্বন্ধে দুই - একটি কথা তাঁহাকে জিজ্ঞাস্য আছে । সৃজান বিবি কখন গৃহত্যাগ করিয়াছিল, কখন তিনি তাহা প্রথম জানিতে পারিলেন-
     জো । (বাধা দিয়া) তাহাতে কি উপকার হইবে? সে সম্বন্ধে বোধ হয়, তিনি আপনাকে বিশেষ কিছু বলিতে পারিবেন না । হয় ত রাগও করিতে পারেন । আপনি জনিতে চাহেন, সৃজান বিবি গৃহত্যাগের পর মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে গিয়াছিল কি না-যদিই সেখানে গিয়া থাকে, তাহাতে আমাদের এমন কি উপকার হইবে?
     হ । তোমার বয়স কম, বুদ্ধিও সেরূপ অপরিপক্ক-কি উপকার হইবে কি না, তুমি তাহার কি বুঝিবে? ইহাতে হয়তো পরে কেস্টা এমন হইয়া যাইতে পারে যে, তখন মজিদ খাঁকে নির্দ্দোষ প্রতিপন্ন করিতে আর আমাদিগকে বিশেষ কষ্ট স্বীকার করিতে হইবে না ।

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
স্বপক্ষে

      জোহেরা হরিপ্রসন্ন বাবুকে সঙ্গে লইয়া মুন্সী জোহিরুদ্দীনের কক্ষে প্রবেশ করিলেন । ধুমপানরত মুন্সী সাহেব মুখ হইতে শট্কার নল নামাইয়া হরিপ্রসন্ন বাবুর মুখের দিকে বিস্মিতভাবে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "কি মনে ক'রে, উকীল বাবু?"
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার নিকটে আসিয়াছি । বোধ করি, আপনি শুনিয়া থাকিবেন, পুলিস দিলজানের হত্যাপরাধে মজিদ খাঁকে গ্রেপ্তার করিয়া হাজতে রাখিয়াছে ।"
     মুন্সী । কই, আমি ত ইহার কিছুই শুনি নাই ।
     হরি । ডিটেক্টিভ-ইন্স্পেক্টর দেবেন্দ্রবিজয় তাহার বিপক্ষে । মজিদ এখন বড় সঙ্কটাপন্ন, তাহার প্রণরক্ষা করা দরকার ।
     মুন্সী । খুনীর প্রাণরক্ষা! কিরূপে তাহা হইবে?
     জোহেরা । মজিদ খুনী নহেন-নির্দ্দোষী হইয়াও এখন তাঁহাকে দোষী হইতে হইয়াছে ।
     মুন্সী সাহেব শট্কার ফরসীর উপর দৃষ্টি স্থির রাখিয়া, ধীরে ধীরে মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন "মজিদ খাঁর উপরে এখনও তোমার সেই অন্ধ অনুরাগ সমভাবে আছে দেখিতেছি ।" কথাটা জোহেরাকে বলিলেন কি ফর্সীটাকে বলিলেন, তাহা ঠিক বুঝিতে পারা গেল না ।
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "মজিদ খাঁ যে দোষী নহে, আমিও তাহা জানি । অন্যায় ভাবে এই হত্যাপরাধটা তাহার স্কন্ধে চাপিলেও, সে এখন কোন একটা অনির্দ্দেশ্য কারণে মুখ ফুটিয়া কিছু প্রকাশ করিতে পারিতেছে না! এখন যদি আমরা তাহাকে এই বিপদ্ হইতে রক্ষা করিবার চেষ্টা না করি, তাহা হইলে তাহাকে বিনা দোষেই ফাঁসী যাইতে হয় ।"
     মুন্সী । তা' আমার দ্বারা আপনার কি সাহায্য হইতে পারে?
     হরি । অনেক সাহায্য হইতে পারে । আমার বিশ্বাস, খুবই সম্ভব-আপনার স্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন ।
     মুন্সী সাহেব বিরক্তভাবে বিবর্ণমুখে বলিলেন, "কি সর্ব্বনাশ! কিরূপে তাহা হইবে? আপনি একান্ত অবিবেচক-তাই এই সকল কথা আমার কাছে উত্থাপন করিতে আসিয়াছেন । আমি আপনাকে সাবধান করিয়া দিতেছি, আপনি ভদ্রলোক, ভদ্রলোকের সম্ভ্রম রাখিয়া অবশ্য আপনার কথা কহা উচিত ।"
     হরি । দায়ে পড়িয়াই আমাকে আপনার পতিতা স্ত্রীর কথা আপনারই সমক্ষে উত্থাপন করিতে হইতেছে; নতুবা একজন নির্দ্দোষীর জীবন রক্ষা হয় না । আপনার স্ত্রীর দ্বারা যে, এই হত্যাকাণ্ড সমাধা হইয়াছে, এমন কথা আমি বলিতেছি না । আমার অনুমান, খুনের রাত্রে এগারটার পর মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে মজিদ খাঁর সহিত আপনার স্ত্রীর একবার দেখা হইয়াছিল ।
     মুন্সী । মজিদ এখন তাহাই বলিতেছে না কি?
     হরি । না, মজিদ কোন কথাই প্রকাশ করিতে চাহে না-সে একেবারে মুখ বন্ধ করিয়াছে । একজন স্ত্রীলোকের সহিত যে, সেদিন রাত্রিকালে তেমন সময়ে তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তাহা নিশ্চয়; কিন্তু কে সে স্ত্রীলোক, এ পর্য্যন্ত তাহা আবিষ্কার করিতে পারা যায় নাই । আমার অনুমান, সেই স্ত্রীলোক আপনার পতিতা স্ত্রী ব্যতীত আর কেহই নহে । আমার এই অনুমানটা কতদূর সত্য জানিতে হইলে, আপনারই সহায়তার প্রয়োজন । আপনার স্ত্রী কখন গৃহত্যাগ করিয়াছিলেন, জানিতে পারিলে আমি এক-রকম সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হইতে পারি; একমাত্র আপনার কাছেই সে সংবাদ পাওয়া যাইতে পারে ।
     মুন্সী । সে সংবাদ আমার কাছে কিরূপে পাইবেন? আমি জানিতে পারিলে কখনই এমন দুর্ঘটনা ঘটিতে না ।
     হরি । না, আমি সে কথা বলিতেছি না । আপনার স্ত্রী গৃহত্যাগের কথা কখ্ন আপনি প্রথমে জানিতে পারিলেন? তখন রাত কত-রাত বারটার পূর্ব্বে কি?
     মুন্সী । না, রাত তখন শেষ হইয়া আসিয়াছে ।
     হরি । রাত বারটার সময়ে আপনার স্ত্রী বাড়ীতে ছিলেন কি না, তাহা জানেন?
     মুন্সি । না, তাহাও আমি ঠিক বলিতে পারিলাম না । আমি কোন কাজে বাহির হইয়াছিলাম; রাত এগারটার পর আমি বাড়ীতে ফিরিয়া আসি । তখন বাড়ীর সকলেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে । আমি নিজের শয়ন-কক্ষে শয়ন করিতে গেলাম; দেখিলাম, ভিতর হইতে দ্বার রুদ্ধ । অনেকবার ডাকিলাম, আমার স্ত্রীর কোন উত্তর পাইলাম না । ঘুরিয়া আসিয়া অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, আর অপেক্ষা করিতে না পারিয়া, তখনই এই বৈঠকখানায় আসিয়া শয়ন করিলাম । তাহার পর শেষ-রাত্রিতে উঠিয়া আমি এই দুর্ঘটনার কথা জানিতে পারিলাম । আমি ত পূর্ব্বেই আপনাকে বলিয়াছি, আমার নিকটে আপনি বিশেষ কোন সংবাদ পাইবেন না ।
     হরিপ্রসন্ন বাবু কি বলিতে যাইতেছিলেন-এমন সময়ে একজন ভৃত্য আসিয়া মুন্সী সাহেবের হাতে একখানি কার্ড দিলেন । মুন্সী সাহেব কার্ডখানি একবার চক্ষুর নিকটে লইয়া, তৎক্ষণাৎ হরিপ্রসন্ন বাবুর হাতে দিয়া বলিলেন, "আপনার সেই দেবেন্দ্রবিজয় বাবু আসিয়া উপস্থিত ।আপনি ইচ্ছা করিলে এখন তাঁহার কাছে অনেক সংবাদ পাইতে পারেন । ঠিক সময়েই তিনি আসিয়াছেন, দেখিতেছি । তাহার পর ভৃত্যকে বলিলেন, "তাহাকে এখানে আসিতে বল ।"
     ভৃত্য চলিয়া গেলে হরিপ্রসন্নবাবু বলিলেন, "দেবেন্দ্রবিজয় বাবু লোকটা বড় সহজ নহেন । অবশ্যই একটা কোন গুরুতর মত্লব মাথায় করিয়া এখানে আসিয়া উপস্থিত । যে অভিপ্রায়ে আসিয়াছেন, আমি তাহা বুঝিতে পারিয়াছি । তিনি মজিদ খাঁকে গ্রপ্তার করিয়াছেন, এখন মজিদ খাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করিবার প্রমাণ সংগ্রহ করিয়া বেড়াইতেছেন ।"
     এমন সময়ে সেই প্রকোষ্ঠ মধ্যে ধীরে ধীরে দেবেন্দ্রবিজয় প্রবেশ করিলেন । সম্মুখদিকে একটু মাথা নাড়িয়া আগে জোহেরার, তাহার পর মুন্সী সাহেবের সম্মান রক্ষা করিলেন । তাঁহারাও সেইরূপ ভাবে সম্মান জানাইয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে বসিতে বলিলেন ।

 

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
সন্দেহ-বৈষম্য

      আসন পরিগ্রহ করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় সংযতস্বরে হরিপ্রসন্ন বাবুকে বলিলেন, "কেমন আছেন, মহাশয়? অনেকদিন আপনাকে দেখি নাই; এখানে আজ কি মনে করিয়া? বোধ করি, এক অভিপ্রায়েই আমাদের উভয়েরই এখানে আগমন হইয়াছে ।"
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "ঠিক তাহা নহে-মহাশয়, বরং বিপরীত-আপনি মজিদ খাঁকে ফাঁসীর দড়ীতে লট্কাইয়া দিবার জন্য ব্যস্ত; কিন্তু আমি সেই নির্দ্দোষী বেচারার প্রাণরক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেছি ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হরিপ্রসন্ন বাবু, এইখানেই আপনি একটা মস্ত ভুল করিয়া ফেলিয়াছেন । আমিও সেই নির্দ্দোষী বেচারার প্রাণরক্ষার জন্য সচেষ্ট ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হাঁ, ইহাতে বিস্ময়ের কিছুই নাই; আমারও বিশ্বাস, মজিদ খাঁ নির্দ্দোষী ।"
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "তবে আপনি তহাকে গ্রেপ্তার করিলেন কেন?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তাঁহার বিরুদ্ধে যে বলবৎ প্রমণ পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে তাঁহকে গ্রেপ্তার করা অন্যায় হয় নাই । সম্প্রতি দেখিতেছি, কয়েকটা বিষয়ে আমি বেশ বুঝিতেও পারিয়াছি, মজিদ খাঁ প্রকৃত পক্ষে দোষী ব্যক্তি নহেন ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় এমনভাবে কথাগুলি বলিলেন, "হরিপ্রসন্ন বাবু ও জোহেরা তাহাতে অবিশ্বাসের কিছুই দেখিতে পাইলেন না দেখিয়া অনেকটা আশ্বস্ত হইলেন ।
     হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "তাহা হইলে আপনিও আমাদের দলে আসিতেছেন, দেখিতেছি ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আমিই আপনার দলে যাই-আর আপনিই আমার দলে আসুন, এখন তাহা একই কথা । মজিদ খাঁর নির্দ্দোষতা সপ্রমাণ করা এখন হইতে আমাদের উভয়ের প্রধান উদ্দেশ্য রহিল । এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইলে, প্রকৃত হ্ত্যাকারী গ্রেপ্তার করা ঘটনাক্রমে অনেকটা পরিমাণে সহজ হইয়া আসিতে পারে ।"
     মুন্সী সাহেব বলিলেন, "সকলই ত বুঝিলাম-আপনারা উভয়েই মজিদ খাঁর প্রাণরক্ষার জন্য সচেষ্ট; আপনাদের উদ্দেশ্য সফল হউক; কিন্তু দেবেন্দ্রবিজয় বাবু, আপনি আজ কি অভিপ্রায়ে আমার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন, সে সম্বন্ধে ত কোন কথাই বলিলেন না?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এইবার বলিতেছি-কাজের কথা আমি কখনও ভুলি না । যে কথাটা উঠিয়াছে, তাহা শেষ করিয়া অন্য কথা আরম্ভ করাই ঠিক । আমি আপনার স্ত্রীর সম্বন্ধে দুই-একটি কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই । বোধ করি, আপনি কোন ত্রুটি লইবেন না!"
     হরিপ্রসন্ন বাবু ও জোহেরা সবিস্ময়ে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে চাহিলেন । বুঝিলেন, তিনি মিথ্যা বলেন নাই-তাঁহারা যে উদ্দেশ্যে আসিয়াছেন, তিনিও ঠিক সেই সেই উদ্দেশ্যে মুন্সী সাহেবের সহিত দেখা করিতে উপস্থিত ।
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আপনার স্ত্রী সেদিন রাত বারটার পূর্ব্বে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে গিয়াছিলেন কি?"
     মুন্সী । এ কথা আপনাকে কে বলিল?
     দেবেন্দ্র । কেহ বলে নাই । গিয়াছিলেন কি?
     "আমি কিছুই জানি না ।" বলিয়া মুন্সী সাহেব যাহা জানিতেন, দেবেন্দ্রবিজয়কে বলিলেন । ইতিপূর্ব্বে হরিপ্রসন্ন বাবুকে যাহা বলিয়াছিলেন, তাহারই পুনরাবৃত্তিমাত্র-সুতরাং তাহার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন ।
     দেবেন্দ্রবিজয় তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মুন্সী সাহেবের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, "তাহা হইলে আপনি সেদিন রাত এগারটার পরই বাড়ীতে ফিরিয়াছিলেন । তাহার পর আর বাড়ী হইতে বাহির হন্ নাই?"
     দেবেন্দ্রবিজয়ের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মুন্সী সাহেব যেন একটু বিব্রত হইয়া উঠিলেন । বলিলেন, "না ।"
     দেবেন্দ্র । (হরিপ্রসন্নের প্রতি) আপনার কি বোধ হয়, হরিপ্রসন্ন বাবু? সেদিন রাত্রিতে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যে স্ত্রীলোকের সহিত মজিদ খাঁর দেখা হয়, কে সে? কখনই সে মুন্সী সাহেবের স্ত্রী নহেন । আমার অনুমানই ঠিক- সে দিলজান না হইয়া যায় না-সেদিন রাত বারটার পূর্ব্বে মুন্সী সাহেবের স্ত্রী বাড়ীতেই ছিলেন ।
     মুন্সী । কিরূপে আপনি তাহা জানিতে পারিলেন?
     দেবে । সাখিয়া বাঁদীর মুখে শুনিয়াছি ।
     জোহে । হাঁ, আমাকেও সে ইহা বলিয়াছে । তাহা হইলে-তাহা হইলে-
সহসা মধ্যপথে থামিয়া গিয়া জোহেরা সকলের মুখের দিকে একান্ত ব্যাকুলভাবে বারংবার চাহিতে লাগিল ।
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তাহা হইলে কে সে স্ত্রীলোক, কিরূপে এখন ঠিক হইতে পারে? যখন মজিদ খাঁ নিজে কোন কথা প্রকাশ করিবেন না, তখন আমাদিগকে অন্য উপায় অবলম্বন করিতে হইবে । এখন মুন্সী সাহেবের পলাতক স্ত্রীর সন্ধান লইতে হইবে; তাঁহার সহিত একবার দেখা করিতে পারিলে, এই খুন-রহস্যটা অনেক পরিষ্কার হইয়া যাইবে ।"
     মুন্সী সাহেব বলিলেন, "সে দিলজানের খুন সম্বন্ধে কি জানে?"
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "বেশী কিছু না জানিলেও তাঁহার ভগিনীর খুনের কারণটা হয় ত তিনি কিছু কিছু জানেন-"
     সকলে । (সবিস্ময়ে) তাঁহার ভগিনী!
     মুন্সী । কে তাহার ভগিনী ।
     দেবেন্দ্র । দিলজান-যে মেহেদী-বাগানে খুন হইয়াছে-
     মুন্সী । (বাধা দিয়া-বিরক্তভাবে) আপনি পাগল না কি! কে আমার স্ত্রী, তাহা কি আপনি জানেন?
     দেবেন্দ্র । খুব জানি-খিদিরপুরের মুন্সী মোজাম হোসেনের দুহিতা । তাঁহার দুই যমজ কন্যা-একজনের নাম মৃজান-মৃজান মনিরুদ্দীনের সহিত পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করিয়া দিলজান নাম গ্রহণ করে; অপর কন্যার নাম সৃজান-আপনার সহিতই পরে তাঁহার বিবাহ হইয়াছিল ।
     মুন্সী সাহেব অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া ঘৃণাভরে বলিলেন, "ইহাও কি সম্ভব! আমার স্ত্রীর যে মৃজান নামে এক যমজ ভগিনী ছিল, তাহা আমি ইতিপূর্ব্বে শুনিয়াছিলাম, কিন্তু আমার বিবাহের পূর্ব্বেই তাহার মৃত্যু হইয়াছিল ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "মৃজান নামে মরিয়া দিলজান নামে সে এতদিন বাঁচিয়া ছিল । এখন সে একেবারেই মরিয়াছে । যখন দেখা যাইতেছে, সৃজানের গৃহত্যাগ এবং মৃজানের হত্যা এক রাত্রিরই ঘটনা, তখন খুবই সম্ভব, সৃজান বিবি এই হত্যাকাণ্ডে কিছু জড়িত আছেন ।"
     হরিপ্রসন্ন বাবু দেখিলেন, আবার এক নুতন গোলযোগ উপস্থিত । সন্দিগ্ধভাবে দেবেন্দ্রবিজয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "সৃজান বিবি নিজের ভগিনী দিলজানকে খুন করিতে যাইবেন কেন, ইহাতে তাঁহার স্বার্থ কি?"
দেবেন্দ্রবিজয় মৃদুহাস্যে বলিলেন, "ওকালতী অর ডিটেক্টিভগিরি একই জিনিষ নহে, হরিপ্রসন্ন বাবু ।"
     মুন্সী সাহেব বলিলেন, "তাহা হইলে আপনি কি এখন সৃজানকেই খুনী মনে করিতেছেন? ইহাতে তাঁহার কি স্বার্থ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এখনও কি আপনারা বুঝিতে পারেন নাই-স্বার্থ কি? উভয় ভগিনী এক ব্যক্তিরই প্রেমাকাঙ্ক্ষিণী । এরূপ স্থলে একজন অপরকে খুন করিবার যে কি স্বার্থ, তাহা পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে ।"
     মুন্সী সাহেব বলিলেন, "সৃজানের স্বভাব-চরিত্র কলঙ্কিত হইলেও আমার বিশ্বাস হয় না, স্ত্রীলোক হইয়া সে সহসা এতটা সাহস করিতে পারে ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "পুরুষের অপেক্ষা স্ত্রীলোকের সাহস অনেক বেশী; প্রেম-প্রতিযোগীতায় ঈর্ষায় যখন তাহারা মরিয়া হইয়া উঠে, তখন তাহারা সকলই করিতে পারে-একটা খুন ত অতি সামান্য কথা! "
     এমন সময়ে একজন ভৃত্য আসিয়া মুন্সী সাহেবের হাতে একখানি পত্র দিল । তিনি তখনই পত্রখানি খুলিয়া পাঠ করিলেন । পাঠান্তে বলিলেন, "ঠিক হইয়াছে-এইবার প্রকৃত ঘটনা বুঝিতে পারা যাইবে ।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "কি হইয়াছে-ব্যাপার কি?"
রুক্ষস্বরে মুন্সী সাহেব বলিলেন, "সয়তান আর সয়তানী উভয়ই মিলিয়া ফরিদপুরের বাগানে বাস করিতেছে ।"
     ব্যগ্রভাবে জোহেরা জিজ্ঞাসা করিল, "কে-বিবি সাহেবা আর মনিরুদ্দীন?"
     মুন্সী । হাঁ, আমি যাহাকে তাহাদের সন্ধানে নিযুক্ত করিয়াছিলাম, সেই ব্যক্তি তাহাদের সন্ধান করিয়া আমাকে এই পত্র লিখিয়াছে ।
     দে । ভালই হইয়াছে-সেখানে গেলে প্রকৃত ঘটনা যাহা ঘটিয়াছে, বুঝিতে পারা যাইবে । আপনি সেখানে যাইবেন কি?
     মু । এখন আমি সে কথা বলিতে পারি না; কাল যাহা হয় ঠিক করিয়া বলিব ।
     দে । আমরা তিনজনেই কাল একসঙ্গে ফরিদপুরে যাইব । আপনারও সেখানে যাওয়া দরকার ।
     মু । কাল সে যাহা হয়, করা যাইবে ।

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।