রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

তৃতীয় খণ্ড 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
রহস্য ক্রমেই গভীর হইতেছে

    দেবেন্দ্রবিজয় অনেক বলিয়া-কহিয়া, বুঝাইয়া সাখিয়াকে একটু ঠাণ্ডা করিলেন। বুঝাইয়া দিলেন, যাহাতে তাহার বিবি সাহেবার উপরে এই খুনের অপরাধটা না পড়ে, সেই চেষ্টাই তিনি করিতেছেন, তখন সাখিয়া যাহা জানে বলিতে সম্মত হইল। এবং তাহার এজাহার লিখিয়া লইবার জন্য দেবেন্দ্রবিজয় পকেট হইতে নোটবুকখানি বাহির করিয়া ঠিক হইয়া বসিলেন।
     দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, " যেদিন রাত্রে তোমার বিবি সাহেবা পলাইয়া যায়, সেদিনকার সমুদয় কথা তোমার এখন বেশ মনে আছে?"
সাখিয়া বলিল, "তা, আর মনে নাই? এই ত সেদিনকার কথা! খুব মনে আছে।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "কি মনে আছে, বল? সেদিনকার কি জান তুমি?"
     সাখিয়া। (চিন্তিতভাবে) সেদিন রাজাব-আলির বাড়ীতে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল।
     দেবেন্দ্র। কে নিমন্ত্রণ রাখিতে গিয়াছিল?
     সাখি। দুজনেই।
     দে। দুইজন আবার কে?
     সাখি। বিবি সাহেবা আর জোহেরা বিবি-দুজনেই নিমন্ত্রণে গেছ্লেন।        দে। সেখান হ'তে তাঁরা কখন ফিরলেন?
     সাখি। রাত তখন দশটা-কি সাড়ে দশটা হবে! সেদিন বিবি সাহেবার তবিয়ৎ আচ্ছা ছিল না- বড় মাথা ধরিয়াছিল।
     দে। আর কিছু ধরিয়াছিল?
     লতি। (সহসা মাঝখান হইতে হাসিয়া বলিয়া উঠিল) আর ভূতে ধরিয়াছিল!
     দে। আপনি চুপ করুন। (সাখিয়ার প্রতি) মাথা ধরায় তোমার বিবি সাহেবা বড়ই কাবু হইয়া পড়িয়াছিলেন; তাহাতে বোধ হয়, বাড়ীতে আসিয়াই শয়ন করিতে গিয়াছিলেন?
     সাখি। না-তা' ঠিক নয়। আর একজন কে তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্য এসে ব'সে ছিল, তারই সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।
     দে। কে সে?
     সাখি। তা' আমি জানি না।
     দে। কোন স্ত্রীলোক না কি?
     সাখি। তা' নয় ত আর কি-রাত এগারটার সময়ে পুরুষ মানুষের সঙ্গে কি-
     লতি। (বাধা দিয়া) তোমার বিবি সাহেবার পক্ষে সেটা বড় আশ্চর্য্য নয়।
     দে। কে সে স্ত্রীলোক? তাহাকে তুমি দেখিয়াছ?
     সাখি। দেখিয়াছি।
     দে। কি রকম দেখ্তে? বয়স কত?
     সাখি। তা' আমি কি ক'রে জানব? আমি তার মুখ দেখ্তে পাইনি-ঘোম্টায় মুখখানা একেবারে ঢাকা ছিল! বয়সও কিছু ঠাহর কর্তে পারিনি।
     দে। তাহার কাপড়-চোপড় কি রকম?
     সাখিয়া কি উত্তর করে শুনিবার জন্য কৌতূহলপূর্ণহৃদয়ে লতিমন সোৎসুকে তাহার মুখের দিকে চাহিল।
     সাখি। সবই নীলরঙের-রেশমী কাপড়জামা সব। যে ওড়নাতে মুখখানা ডাহা ছিল, তাও নীলরঙের; তাতে আবার যে রেশমের চমৎকার ফুল-লতার কাজ, তেমন আমি-
     লতিমন বাইজীকে আর শুনিতে হইল না। আকুলভবে বলিয়া উঠিল, "তবেই হয়েছে-সে আমাদেরই দিলজান।"
     সাখিয়া প্রতিধ্বনি করিয়া বলিয়া উঠিল, "দিলজান! তা' কেমন ক'রে হবে-আমাদের বাড়ীতে দিলজান-ফিলজানের পা বাড়াতে সাহস হবে না। সে নিশ্চয় কোন বড়লোকের মেয়ে-দিলজান কখনই নয়।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "দিলজান বটে, সেই নীলবসনা সুন্দরী-দিলজান ছাড়া আর কেহই নহে।"
     "কখনই নয়," বলিয়া সাখিয়া লাফাইয়া উঠিল। বলিল, "কখনই সে দিলজান নয়।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তা' না হউক, সে কথা যাক্-"
     সাখিয়া বলিল, "সে কথা যাবে কেন-সে যদি দিলজানই হয়-তাতে দোষই বা হয়েছে কি?"
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, সাখিয়া বড় ঝগ্ড়াটে। তাহাকে রাগান ঠিক নহে। বলিলেন, "সে কথা যাক, সে দিলজানই হবে-তাতে আর হয়েছে কি? তাহার পর তুমি আর কি দেখিয়াছ, বল? সেই স্ত্রীলোকটি কখন গেল?
     সাখি। স্ত্রীলোকটি আবার কেন? দিলজান।
     দে। ভাল আপদ! সেই দিলজান কখন গেল? তোমার বিবি সাহেবার কাছে সে কি জন্যে গিয়াছিল?
     সাখি। তা' আমি কেমন ক'রে জানব্? আমার তাতে কি দরকার?
দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, সাখিয়াকে রোগে ধরিয়াছে-এখন কোন প্রশ্ন করিতে গেলেই সে ফোঁস করিয়া উঠিবে। বলিলেন, "তোমার তা' জেনে দরকার নাই। তুমি যা' জান তুমি যা' দেখেছ, তাই বল? আমি কোন কথা জিজ্ঞাসা কর্তে চাহি না।"
     সাখিয়া বলিতে লাগিল, " সে দিলজান কি-কে, জানি না বাবু, তার সঙ্গে বিবি সাহেবা দেখা কর্তে গেলেন। জোহেরা বিবি আপনার মহলে গিয়ে শুয়ে পড়্লেন। আমি শুতে যেতে পারলেম না-কি জানি-কি হুকুম হবে-জেগে ব'সে থাক্লেম। তা' আর কোন হুকুম হয় নি। অনেকক্ষণ তাদের কথাবার্ত্তা হ'ল, তা আমি জানি না; প্রায় একঘন্টা পরে সে চ'লে গেল।"
     দে। কে? দিলজান?
     সাখি। দিলজান কি-কে জানি না, সেই নীলরঙের কাপড় পরা মেয়েটি। তারপর আমি বিবি সাহেবার শোবার ঘরের দিকে গেলাম। দেখি, তিনি কবাট বন্ধ ক'রে শুয়ে পড়েছেন। আমি নীচে নেমে এসে যে দু-একটা কাজ বাকী ছিল, শেষ ক'রে ফেল্লেম। প্রায় রাত বারটা বেজে গেল। কাজ-কর্ম্ম সেরে যখন উপরে আসি, তখনও দেখি, আমাদের বিবি সাহেবার কবাট বন্ধ। আমিও নিজের ঘরে গিয়ে কবাট বন্ধ ক'রে শুয়ে পড়্লেম। তার পর বিবি সাহেবা কখন উঠে গিয়েছেন, তা' বিবি সাহেবাই জানেন।
     দে। তাহা হইলে তোমার বিবি সাহেবা রাত বারটা পর্য্যন্ত নিশ্চয়ই বাড়ীতে ছিলেন?
     সাখি। রাত বারটার মধ্যে কি ক'রে বাড়ী থেকে যাবেন? তখন সকলেই জেগে-চারিদিকে লোকজন, চাকর-বাকর-তা' হলে ত তখনই ধরা পড়তেন। সকলে ঘুমুলে কখন চুপি চুপি উঠে গেছেন। আমার বোধ হয়, শেষরাত্রে উঠে গেছেন।
     দে। রাত বারটার মধ্যে যে তিনি বাড়ী ছাড়েন নাই, তা' তুমি বেশ জান?
     সাখি। আমি কি মিথ্যাকথা বল্ছি? আমি তেমন মেয়ে নই। যা' বল্ব-তা' স্পষ্ট মুখের উপরেই বল্ব।
     দেবেন্দ্রবিজয় আপন-মনে বলিলেন, "সাখিয়ার মুখে এখন যেরূপ শুনিতেছি, তাহাতে রাত বারটার পর সেদিন মজিদের সঙ্গে যে স্ত্রীলোকের দেখা হইয়াছিল, সে সৃজান বিবি নয়। আমারই অনুমান ঠিক, মজিদের আর অস্বীকার করিলে চলিবে না-সে নিশ্চয় দিলজান ভিন্ন আর কেহই নহে।"
     সাখি। আর কি মশাই-যা' আমি জানি সবই ব'লে দেয়েছি-আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবার আছে?
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আছে বৈ কি-তোমার বিবি সাহেবা কেমন দেখ্তে ছিলেন, বল দেখি?"
     সাখিয়া বলিল, "তুমি কি রকম ভদ্রলোক, মশাই! ভদ্রঘরের মেয়ের রূপের খোঁজে তোমার কি দরকার? সে সব কথা আমি কিছুই জানি না। এ সব-"
     সাখিয়া আরও কিছু বলিতে যাইতেছিল, এমন সময়ে দিলজানের ফোটোগ্রাফ্খানি তাহার চঞ্চল দৃষ্টিপথে পড়িল। সুর বদ্লাইয়া বলিল, " এই যে, আপনি আমাদের বিবি সাহেবের একখানি তস্বীরও যোগাড় করেছেন!"
দেবেন্দ্রবিজয় তাড়াতাড়ি দিলজানের ফোটোগ্রাফ্খানি সাখিয়ার হাতে দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "এখানি তোমার বিবি সাহেবার তস্বীর না কি?"
     সাখিয়া তস্বীর দেখিতে দেখিতে বলিল, "হাঁ, এ আমাদের বিবি সাহেবারই তস্বীর। মুন্সী সাহেব বুঝি, বিবি সাহেবার সন্ধান কররার জন্য আপনাকে একখানা তস্বীর দিয়েছেন?"
     লতিমন বলিল, "আরে পোড়ার-মুখী সাখি, তুই কি আজকাল চোখেও কম দেখিস্ নাকি? এ যে আমাদের দিলজানের তস্বীর।"
     সাখিয়া বলিল, "আমি চোখে কম দেখ্তে যাব কেন? যে আমাকে 'কম দেখে' বলে, সে নিজে দু'চোখ কাণা। কে জানে কে তোমার দিলজান-তার মুখে আগুন, এ তস্বীর তার হ'তে যাবে কেন? এ ত আমাদের বিবি সাহেবার তস্বীর।"
     লতিমন ছাড়িয়া কথা কহিবার পাত্রী নহে। বলিল, " কে জানে, কে তোমার বিবি সাহেবা-মুখে আগুন তার! এ আমাদের দিলজানের তস্বীর।"
দেখিয়া-শুনিয়া দেবেন্দ্রবিজয় অবাক্! এবার তিনি ইহার মুখের দিকে চাহেন, একবার উহার মুখের দিকে চাহেন-কেহেই কম নহেন, উভয়েরই মুখের স্রোত সমান। গতিক বড় ভাল নয় দেখিয়া, ফটো দুইখানি ও সেই পত্রের তাড়াটি নিজের পকেটের ভিতরে পুরিয়া ফেলিলেন। অমনি সেই সঙ্গে দুইটি টাকা পকেট হইতে বাহির করিয়া সাখিয়ার হাতে দিতে-যেন জ্বলন্ত আগুনে জল পড়িল; ঝগ্ড়া ভুলিয়া সাখিয়া পরমানন্দে সেই টাকা দুটি বাজাইয়া আঁচলের খুঁটে বাঁধিতে লাগিল। তাহার সুর এবার একেবারে বদ্লাইয়া গেল-কতমতে সে দেবেন্দ্রবিজয়ের ভদ্রলোকত্ব সপ্রমাণ করিতে লাগিল।
     দেবেন্দ্রবিজয় তাহাতে কর্ণপাত করিলেন না। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, রহস্য ক্রমেই গভীর হইতেছে-সৃজান ও মৃজান উভয়েরই আকৃতি এরূপ সৌসাদৃশ্য থাকিবার কারণ কি? নিশ্চয়ই তাহারা উভয়ে একরকম দেখিতে; নতুবা একজনের ফটোগ্রাফ লইয়া লতিমন ও সাখিয়ার এরূপ গোলযোগ বাধিবে কেন? দিলজান সৃজানের সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিল, এবং উভয়ের নামেও অনেকটা মিল আছে। বোধ হয়, সৃজান দিলজানের কোন নিকট-আত্মীয়া হইবে। উভয়ের মধ্যে একটা কিছু সম্পর্ক থাকা খুবই সম্ভব; নতুবা বারনারী হইয়া দিলজান সৃজানের সহিত দেখা করিতে সেজন্য আপাততঃ খিদিরপুরে গিয়া মুন্সী মোজাম হোসেনের সহিত একবার সাক্ষাৎ করা বিশেষ প্রয়োজন হইতেছে। যে ব্যক্তি এই ফটোগ্রাফ তুলিয়াছে ইতোমধ্যে একবার তাহারও সহিত দেখা করিতে হইবে।
 

      
সপ্তম পরিচ্ছেদ
তিতুরাম

      দেবেন্দ্রবিজয় সহজে ছাড়িবার পাত্র নহেন। তখনই খিদিরপুর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। মোজাম হোসেনের সহিত দেখা করিবার পূর্ব্বে তিনি সেই ফটোগ্রাফ ছবি প্রস্তুতকারীর সহিত দেখা করিলেন। তাঁহার নাম কবিরুদ্দীন! ফটোগ্রাফ ছবিতেই তাঁহার নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে দেবেন্দ্রবিজয়ের বিশেষ কোন কষ্ট স্বীকার করিতে হইল না। কবিরুদ্দীনের নিকটে গিয়া যাহা তিনি শুনিলেন, তাহাতে তাঁহাকে আরও আশ্চর্য্যান্বিত হইতে হইল। কবিরুদ্দীন বলিলেন, সেই ফটো দুইখানির একখানি মুন্সী মোজাম হোসেনের এবং অপরখানি তাহার কন্যা সৃজানের। তিনি দিলজান বা মৃজান সম্বন্ধে কিছু জানেন না। দেবেন্দ্রবিজয়ের বিস্ময় সীমাতিক্রম করিয়া উঠিল; তিনি ভাবিতে লাগিলেন, সৃজন বিবির ফটো দিলজানের দেরাজের মধ্যে কেন? অথচ লতিমন বাইজী সৃজান বিবির ফটোকে দিলজানের প্রতিকৃতি বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে চাহে। অবশ্যই লতিমনের এরূপ করিবার একটা গুপ্ত-উদ্দেশ্য আছে; কিন্তু সে উদ্দেশ্য কি? হয়তো লতিমনও এই খুনের মামলায় জড়ীভূত আছে; নতুবা তাহার ভ্রম হইয়াছে। এ যে বিষম ভ্রম! আগে একবার মুন্সী মোজাম হোসেনের সহিত দেখা করি তাহার পর দেখিতে হইবে, দিলজানের খুনের সহিত লতিমন বাইজীর কতটুকু সংশ্রব আছে। মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় তথা হইতে বাহির হইলেন।
     দেবেন্দ্রবিজয় একেবারে মুন্সী মোজাম হোসেনের সহিত সাক্ষাৎ করা যুক্তি-যুক্ত বোধ করিলেন না। আগে বাহির হইতে তাহার বিষয়টা যতটা জানিতে পারা যায়, সেই চেষ্টা করিতে হইবে স্থির করিয়া, দেবেন্দ্রবিজয় সেখানকার একটি পল্লীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। পল্লীতে মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যাই বেশি। দক্ষিণাংশে কয়েকজন দরিদ্র হিন্দুর বসতি।         দেবেন্দ্রবিজয় সেখান দিয়া যাইবার সময়ে দেখিলেন, একখানি খোলার ঘরে বাহিরের দাবায় বসিয়া একজন পক্ককেশ বৃদ্ধ ক্রোড়স্থিত একটি পঞ্চমবর্ষীয় শিশুর সহাস্যে অনেক কটূক্তি বর্ষণ করিতেছেন। তাহাকে "ভাই-দাদা' বলিয়া সম্বোধন করিতেছেন, তখনই আবার তাহাকে শ্যালক পদাভিষিক্ত করিয়া নিজে নিজে খুব একটা আনন্দানুভাব করিতেছেন; সেই আনন্দাতিশয্যে সেই বালকের ভাবী-পত্নীর উপরে (হয় ত এখনও সে জন্মগ্রহণ করে নাই) একটা অযথা দাবী দিয়া রাখিতেছেন! মুখর বৃদ্ধের মুখের বিশ্রাম নাই-অনবরত বকিতেছেন। শিশু কখনও 'হাঁ'-কখনও 'না'-কখনও বা 'আচ্ছা' বলিয়া ঘাড় নাড়িতেছে। বালকটি তাঁহার পৌত্র।
     দেবেন্দ্রবিজয় সেই মুখর বৃদ্ধের সম্মুখীন হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "মহাশয়, বলিতে পারেন, এখানে মুন্সী মোজাম হোসেন সাহেব কোথায় থাকেন?"
     বৃদ্ধ কহিলেন "আরও আপনাকে অনেকটা যাইতে হইবে-গ্রামের বাহিরে গঙ্গার ধারে তিনি থাকেন। মহাশয়ের নাম?"
     দে। দেবেন্দ্রবিজয় মিত্র। আপনার নাম?
     বৃ। আমার নাম শ্রীতিতুরাম পরামাণিক।
     দে। মহাশয়ের কি করা হয়?
     বৃ। নিজের জাতীয় ব্যবসা-আমরা জতিতে নাপিত। তবে আমি নিজের হাতে আর পারি না, এ বুড়োবয়সে চোখে ঠাহর হয় না; আমার ছেলেই সব দেখে-শোনে।
     দে। সে ত ঠিক কথা, উপযুক্ত ছেলের কাজই ত এই।
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, তিনি যথাস্থানে ও যোগ্য ব্যক্তির নিকটেই উপনীত হইয়াছেন। এই বৃদ্ধের নিকটে সকল খবরই পাওয়া হাইবে। বৃদ্ধ জাতিতে নাপিত-নাপিত গ্রামের সংবাদপত্র-বিশেষ। যেখানে যাহা কিছু ঘটে, সে সংবাদ আগে ইহাদের নিকটে পৌঁছায়। বিশেষতঃ ইনি বৃদ্ধ-তাতে বেকার-নিজেকে বড়-একটা কিছু করিতে হয় না; সুতরাং ইনি গ্রামের ভালমন্দ সর্ব্ববিধ সংবাদে কূলে কূলে পূর্ণ হইয়া আছেন। দেবেন্দ্রবিজয় "আঃ! আর পারা যায় না, অনেক ঘুরেছি," বলিয়া সেইখানে বসিয়া পড়িলেন। বসিয়া বলিলেন, "এখন কি মুন্সী সাহেবের সঙ্গে দেখা হইবে?"
বৃ। সকল সময়ে দেখা হবে। তিনি আজ পাঁচ বৎসর শয্যাশায়ী হ'য়ে রয়েছেন। খুব আমীর লোক ছিল গো-ইদানীং অবস্থাটা একেবারে খারাপ হ'য়ে গেছে। তাঁর কাছে আপনার কি দরকার?
     দে। (যাহা মনে আসিল)। তাঁহার একখানি বাড়ী বিক্রয় হইবে, শুনিয়াছি। সেই বাড়ী কিনিবার ইচ্ছা আছে।
     বৃ। সে বাড়ী অনেকদিন বিক্রী হ'য়ে গেছে। সে আজ সাত-আট বছরের কথা। এখন নিজে একখানি ছোট খোলার ঘর ভাড়া নিয়ে গঙ্গার ধারে থাকেন। তাঁর আর বাড়ী কোথায়। এখন অবস্থা বড় খারাপ।
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, কথাটা ঠিক খাটিল না উল্টাইয়া দেওয়া দরকার। বলিলেন, "তাই ত, তবে কি ক'রে তাঁর চলে? তাঁর কি আর কেহ নাই-ছেলে-মেয়ে?"
     তিতুরাম কহিলেন, "ছেলে নাই-দুইটি মেয়ে।"
     দেবেন্দ্রবিজয় সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তাঁর দুইটি কন্যা?"
     তিতুরাম বলিল, "হাঁ, দুটি মেয়ে-যমজ। বড় চমৎকার দেখতে, বামুন-কায়স্থের ঘরেও এমন রূপ হয় না-যেন ফেটে পড়্ছে। একজনের নাম মৃজান আর একজনের নাম সৃজান।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "বটে! মেয়ে দুটি কি এখন মুন্সী সাহেবের কাছেই আছে না কি?"
     গম্ভীরভাবে তিতুরাম বলিলেন, "না মশাই! বড়-বড় মেয়ে। মুন্সী সাহেব আজ পাঁচ বৎসর ব্যারামে প'ড়ে। কে বা মেয়েদের দেখে, কে বা বিয়ে দেয়! একটা মেয়ে, মৃজান যার নাম, একটা কোন লোকের সঙ্গে তার ভাব হয়, তারই সঙ্গে সে কোথায় চ'লে গেছে। সেই অবধি সে একেবারে নিরুদ্দেশ।"
     দে। কে সে লোক-নাম কি?
     তিতু। কি আমীর খাঁ, না হামির খাঁ-মুসলমানের নাম ঠিক মনে থাকে না, বাপু।
     দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, তিনি সেই সকল পত্র পড়িয়া পূর্ব্বে যাহা অনুমান করিয়াছিলেন, তাহা অভ্রান্ত। মনিরুদ্দীন আমীর খাঁ নামে এখানে আবির্ভূত হইয়া মৃজান সহ অন্তর্হিত হইয়াছিলেন। এবং বামুন বস্তিতে লতিমনের বাড়ীতে মৃজানকে দিলজান নামে জাহির করিয়া রাখিয়াছিলেন।         দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, "আর সেই সৃজান নামে যে মেয়েটি?"
     তিতু। তার অদৃষ্টা ভাল। খুব একজন বড়লোকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। সে এখন মুন্সী জোহিরুদ্দীনের পত্নী। যদিও জোহিরুদ্দীনের বয়স হয়েছে, তাতে আর আসে-যায় কি, খুব বড়লোক, বুড়ো হ'লে কি হয়!
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, বৃদ্ধ তিতুরাম এবার নিজের গায়ে হাত দিয়া কথা কহিতেছে। বলিলেন, "তা' ত বটেই, এক সময়ে সকলেই বুড়ো হ'তে হবে।" মনে ভাবিলেন, যাহা হউক, এখানে আসিয়া অনেকটা কাজ হইল। দিলজান যে সৃজানের ভগিনী, ইহাতে সন্দেহ নাই। এখন একবার মুন্সী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে পারিলেই সকল গোল চুকিয়া যায়।
অনন্তর দেবেন্দ্রবিজয় মুন্সী মোজাম হোসেনের বাসস্থানের ঠিকানা ঠিক করিয়া লইয়া সেখান হইতে উঠিলেন।

     
অষ্টম পরিচ্ছেদ
পারিবারিক

    দেবেন্দ্রবিজয় যখন গঙ্গার ধারে উপস্থিত হইলেন, তখন সূর্য্য অস্তোন্মুখ! অস্তোন্মুখ সূর্য্যের কনকপ্রবাহে চারিদিক্ ঝ্ল ম্ল করিতেছে। এবং সন্ধ্যার বাতাস বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। বাত্যাবিতাড়িত তরঙ্গমালা প্রচণ্ডবেগে গঙ্গার কূলে আঘাত করিতেছে।
     পশ্চিম-গগন হইতে বিকীর্ণ হইয়া কনকধারা গঙ্গার উভয় সৈকতশয্যায় স্বর্ণাস্তরণের ন্যায় বিস্তৃত রহিয়াছে। আকাশ এখনও স্বর্ণোজ্জ্বল রহিয়ছে; এবং সেখানে মেঘ বিচরণ করিতেছে। মেঘ কখনও বাঘ, কখনও হাতী, কখনও ঘোড়া, কখনও রথ, কখনও বা লাঠী কাঁধে এক বিকটাকার দৈত্যের আকৃতি ধারণ করিতেছে।
     বলা বাহুল্য, সেদিকে দেবেন্দ্রবিজয়ের দৃষ্টি ছিল না; তিনি আপনার কার্য্যোদ্ধারের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। কনকাস্তরণবিস্তৃত সৈকত-শয্যা, তথায় তরঙ্গের প্রচণ্ড আঘাত, অথবা আকাশে মেঘের নানারূপ মূর্ত্তিধারণ, এ সকল দেখিবার তাঁহার আদৌ অবসর ছিল না।
     যথা সময়ে দেবেন্দ্রবিজয় মুন্সী সাহেবের বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মুন্সী সাহেব একটী ঘরে একখানি খাটিয়ার উপরে শুইয়া আছেন। তিনি অত্যন্ত কৃশ-যেন সে শরীরে অস্থি ও ত্বক্ ছাড়া আর কিছুই নাই। চোখে মুখে কালিমা পড়িয়াছে। গণ্ডাস্থি বাহির হইয়া পড়িয়াছে। এবং চোখের দৃষ্টি একান্ত নিষ্প্রভ হইয়া গিয়াছে। তাহা হইলেও এখনও বুঝিতে পারা যায়, এক সময়ে এই মুখ খুব সুন্দর ছিল।
     দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিয়া মোজাম সাহেব বলিলেন, "কে আপনি, মহাশয়? কোথা হইতে আসিয়াছেন? কি আবশ্যক?"
     দেবেন্দ্রবিজয় প্রথম প্রশ্ন দুটীর উত্তর দেওয়া প্রয়োজন দেখিলেন না। বলিলেন "আবশ্যক কিছু আছে। আমি একটা বিশেষ কাজে আপনার নিকটে আসিয়াছি। আপনার সহিত অনেক কথা আছে।"
     মোজাম হোসেন বলিলেন, "অনেক কথা কহিবার সুবিধা আমার নাই। ডাক্তারের নিষেধ-খুব নির্জ্জনে থাকা দরকার। এমন কি কাহারও সঙ্গে দেখা করাও ঠিক নহে; আপনি বিদায় লইলে সুখী হইব।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "যথা সময়ে বিদায় লইব, সেজন্য আপনি অকারণ উদ্বিগ্ন হইবেননা। আপনার কন্যাদের সম্বন্ধে দুই-একটী কথা জিজ্ঞাস্য আছে।"
     অতিরিক্ত ক্রুদ্ধ হইয়া বৃদ্ধ মোজাম হোসেন বলিলেন, "কন্যাদের! আমার একটি ভিন্ন কন্যা নাই। আপনি কি ভুল বকিতেছেন?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "না, আমার কিছু মাত্র ভুল হয় নাই। আপনার দুইটি কন্যা। একজনের নাম সৃজান, কলিঙ্গা-বাজারের মুন্সী জোহিরুদ্দীনের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইয়াছে। অপর মেয়েটির নাম মৃজান।"
     রুগ্ন বৃদ্ধ কঠোর-নেত্রে দেবেন্দ্রবিজয়ের দিকে চাহিলেন। তেমনি কঠোর-কণ্ঠে বলিলেন, "কে তুমি বেয়াদব্, ঐ সকল পারিবারিক কথায় তোমার কি প্রয়োজন?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আমার নাম দেবেন্দ্রবিজয়-আমি ডিটেকটিভ-পুলিসের লোক।"
     মুন্সী মোজাম হোসেন শুইয়াছিলেন-ব্যগ্রভাবে উঠিয়া বসিলেন। রোষক্ষুদ্ধকণ্ঠে বলিলেন, "বুঝিয়াছি, মুন্সী জোহিরুদ্দীন কোন গুপ্ত অভিসন্ধিতে আপনাকে এখানে পাঠাইয়াছেন। পাঠাইয়া ভাল করেন নাই; আমি সেখানকার সকল খবর শুনিয়াছি। মুন্সী জোহিরুদ্দীনের দোষেই আমার কন্যার এই অধঃপতন হইয়াছে। তিনি যদি আমার কন্যার প্রতি সদ্ব্যবহার করিতেন, তাহা হইলে কখনই এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটিতে পারিত না। এমন কি তিনি, আমি শয্যাশায়ী হইয়া পড়িয়াছি জানিয়াও, আমাকে দেখিবার জন্য আমার কন্যাকে একবারও এখানে পাঠাইতেন না। দোষ আমার কন্যার নহে-দোষ তাঁহার নিজেরই।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "মুন্সী জোহিরুদ্দীন আমাকে পাঠান নাই। আমি নিজেই কোন প্রয়োজনে আসিয়াছি। আমার হাতে একটা বড় জটিল মাম্লা পড়িয়াছে।"
     মোজাম হোসেন বলিলেন, "কিসের মাম্লা?"
     দেবেন্দ্রবিজয় সহসা উত্তর করিলেন, "আপনার অপর কন্যার খুনের মাম্লা।"
     মৃত্যুশরাহত মৃগের ন্যায় মুন্সী সাহেব চমকিত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার বিবর্ণ মুখ আরও শুকাইয়া গেল। কম্পিতকণ্ঠে বলিলেন, "হা আল্লা! মৃজান খুন হইয়াছে!"
     দেবেন্দ্রবিজয় ছাড়িবার পাত্র নহেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, "মৃজান আবার কে?"
     "আমার কন্যা-আমার কন্যা!" বলিয়া বৃদ্ধ উভয় হস্তে মুখ আবৃত করিলেন।
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এই মাত্র আপনি বলিলেন, আপনার একটি ভিন্ন আর কন্যা নাই; আমিও ঠিক তাহাই মনে করিয়াছিলাম।"
     বৃদ্ধ রোদনোচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, "আমার দুইটি কন্যা-আমি আপনাকে মিথ্যা কথা বলিয়াছিলাম। আপনি যে মৃজানের কথা বলিতেছেন, সে আমীর খাঁ নামে একটা বদ্মায়েসের প্রলোভনে পড়িয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছে। তাহার আর সন্ধান পাই নাই। আমার নিজের অবস্থা দেখিতেছেন, তাহাতে সন্ধান করিবার সামর্থ্যও আর নাই। সে অবধি আমি সেই শয়তানীর নাম মুখে আনি না-সে আমার মুখে কলঙ্কের কালি দিয়া গিয়াছে; কিন্তু তথাপি সে দোষ তাহার নয়-বেইমান্ আমীর খাঁই তাঁহার সর্ব্বনাশ করিয়াছে।"
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, বৃদ্ধের মনের মধ্যে এ সময়ে একটা অদম্য বেগ আসিয়াছে। এই সময়ে বৃদ্ধের হৃদয়ের দ্বার কোন রকমে একটুখানি উদ্ঘাটন করিয়া দিতে পারিলে, তাঁহার মুখ হইতে অনেককথাই বাহির হইয়া পড়িবে; কিন্তু কোন্ কথা দ্বারা ঠিক স্থানে আঘাত করা যাইতে পারে, দেবেন্দ্রবিজয় তাহা খুঁজিতে লাগিলেন। তখনই একটা ঠিক করিয়াও ফেলিলেন। বলিলেন, "দেখুন মুন্সী সাহেব, আপনি একজন মান্য-গণ্য, মহাশয় ব্যক্তি, আপনার পারিবারিক বিষয়ে কোন কথার উত্থাপন করা আমার পক্ষে একান্ত অনুচিত, সেটুকু বুঝিবার শক্তি যে আমার নাই, এমন নহে। তবে আমার উপরে একটা দায়িত্ব রহিয়াছে, সে দায়িত্ব যে-সে দায়িত্ব নহে, একজন লোকের জীবন নিয়ে টানাটানি। যদি তাহা আমার কাছে শোনেন, আপনিও আমাকে সাধ্যমত সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইবেন। তখন আমার নিকটে আপনি অসঙ্কোচে সকল কথাই প্রকাশ করিবেন।"
     জ্বলন্ত রক্তচক্ষুঃ মেলিয়া মুন্সী সাহেব একবার দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে চাহিলেন; তাহার পর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, "বলুন, আমি শুনিতে প্রস্তুত আছি-আপনার বক্তব্য শেষ করুন। যদি উচিত বোধ করি, দ্বিধা করিবার কিছুই না থাকে, আমি আপনার কাছে কোন কথা গোপন করিব না।"
     তখন দেবেন্দ্রবিজয় মেহেদী-বাগানের খুন ও সৃজানের গৃহত্যাগ সম্বন্ধে যাহা কিছু জানিতেন, বলিলেন। এবং এই খুনের সহিত সৃজানের গৃহত্যাগের যে কতটা সংসক্তি আছে, তাহাও বুঝাইয়া দিলেন। তাহার পর মজিদ খাঁকে যে সকল ভিত্তিহীন সন্দেহ দ্বারা কঠিনভাবে জড়াইয়া ফেলিয়া, তিনি তাহাকে একেবারে হাজতে পুরিয়া ফেলিয়াছেন, তাহাও অনুক্ত রাখিলেন না।
বিশেষ মনোযোগের সহিত সকল কথা শুনিয়া মোজাম হোসেন ক্ষণকাল নতমুখে নিস্তব্ধ হইয়া রহিলেন। অনন্তর দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে চাহিয়া হস্তে হস্তাবমর্ষণ করিতে করিতে অত্যন্ত করুণ-কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, "এক সময়ে আমার এমন দিন ছিল, যখন অনেকেই আমার মুখ চাহিয়া থাকিত। যাহাদের আসন নিম্নে ছিল, এখন আমাকে অবস্থা বিপাকে তাহাদের নিম্নে আসন পাতিতে হইয়াছে। এখন একটা কিছু সামান্য নিন্দাতে সকলেই আমার উপরে চাপিয়া পড়িবে, সেইজন্য আমাকে খুব সাবধানে চলিতে হয়; কলঙ্কের কথা যত গোপন থাকে, সেজন্য এখন আমার বিশেষ চেষ্টা করাই কর্ত্তব্য; কিন্তু আপনার মুখে যেরূপ শুনিতেছি, তাহাতে একজন নির্দ্দোষীর জীবন-সংশয়। এখন তাহাকে উদ্ধার করিবার জন্য ভদ্রব্যক্তিমাত্রেরই চেষ্টা ও সাহায্য করা উচিত। বলুন, আপনি কি জানিতে চহেন? অবক্তব্য হইলেও আমি তাহা আপনাকে বলিব।"
     দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, "দিলজান কি আপনার কন্যা?"
     প্রত্যুত্তরে মুন্সী সাহেব একখানি কেতাবের ভিতর হইতে দুইখানি ফটোগ্রাফ বাহির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের সম্মুখে ফেলিয়া দিলেন।

        
নবম পরিচ্ছেদ
পূর্ব্বকথা

      ফটোগ্রাফ দুইখানি কুড়াইয়া লইয়া দেখিতে দেখিতে দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এ যে দুইখানিই আপনার কন্যা দিলজানের তস্বীর দেখিতেছি।"
মুন্সী সাহেব শুষ্কমুখে শুষ্ক হাসি হাসিয়া বলিলেন, "কেবল আপনার নহে, এরূপ ভ্রম অনেকেরই হইয়াছে। উহা একজনের নহে, আমার দুই কন্যারই তস্বীর। এইখানি মৃজানের-আপনি যাহাকে দিলজান বলিতেছেন। আর এইখানি সৃজানের।" বলিয়া নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিলেন।
দেবেন্দ্রবিজয় ছবি দুইখানি বিশেষ মনোনিবেশপূর্ব্বক পর্য্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। দুইখানিতে অনিন্দ্যসুন্দরী স্ত্রীমূর্ত্তি। উভয়ের মুখাকৃতির অতি সাদৃশ্য। তাহার উপর বেশভূষা একপ্রকার হওয়ায় আরও মিলিয়া গিয়াছে-চিনিবার যো নাই। এমন কি দুইজনের পৃথক্ ছবি উঠাইবার কোন আবশ্যকতা ছিল না; এবং কোন মিতব্যয়ী ইহাতে কখনই অনুমোদন করিতে পারিতেন না। যাহা হউক, সেই একমাত্র ছবি লইয়া লতিমন ও সাখিয়ার ভয়ানক গোলযোগ ঘটইবার কারণ দেবেন্দ্রবিজয়ের নিকটে এতক্ষণে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। তিনি এখন আর তাহাতে বিস্ময়ের কিছুই দেখিলেন না।
     মুন্সী মোজাম হোসেন বলিতে লাগিলেন, " আমি এখানে প্রায় আজ দশ বৎসর, এই গঙ্গার ধারে বাস করিতেছি। মেয়ে দুটি আমার কাছে থাকিত। অনেক দিন পূর্ব্বেই তাহাদিগের মাতার মৃত্যু হইয়াছিল। আমিই তাহাদিগকে মাতৃপিতৃস্নেহে বুকে করিয়া লালন-পালন করিয়াছি।
     হায়, তাহার পরিমাণ যে এমন হইবে, কে তাহা পূর্ব্বে ভাবিয়াছিল। প্রায় দুই বৎসর হইল, আমীর নামে একটী যুবক আমার কাছে ফার্সী শিখিতে আসিয়াছিল। আমি উত্থান শক্তি রহিত-কোথাও যাইবার ক্ষমতা ছিল না। আমীর খাঁ আমার এইখানেই অধ্যয়ন করিতে আসিত। এইখানেই সে কোথায় একটা বাসা ভাড়া করিয়াছিল। প্রথম হইতেই আমার কন্যা মৃজানকে তাহার একান্ত অনুরাগিণী দেখিয়াছিলাম। বুঝিলাম, মনের ভিতরে একটা ঘোরতর দুরভিসন্ধি লইয়া আমীর খাঁ আমার সংসারের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। কিছুদিন পরে আমি সেই চরিত্রহীন, বেইমান্ আমীর খাঁকে এখান হইতে দূর করিয়া দিলাম। আমার কন্যা তখন সেই প্রতারকের প্রলোভনে একান্ত মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। একদিন আমার মৃজানকে লইয়া একেবারে কোথায় অন্তর্হিত হইয়া গেল-আর তাহাদের কোন সংবাদ পাইলাম না। সেই অবধি আমি সেই কলঙ্কিনী কন্যার নাম মুখে আনি না-মৃজান নামে একটা শয়তানী যে আমার এখানে এতকাল আশ্রয় করিয়াছিল, সে কথা আমি একেবারে ভুলিয়া যাইতে চেষ্টা করিতেছিলাম। মৃজান নামে যে কোন কালে আমার একটা মেয়ে ছিল, তাহা আমি আর মনে মনে স্থান দিতে ইচ্ছা করিতাম না। এমন কি সৃজানই যে আমার একমাত্র মেয়ে, এই ধারণাই এখন আমার মনের মধ্যে এক রকম ঠিক হইয়া গিয়াছিল। ক্রমে সেই সৃজানও তাহার ভগিনীর পথানুসরণ করিল। আমার মান-সম্ভ্রম আর কিছুই রহিল না। কিন্তু এ কাজটা ঠিক জোহিরুদ্দীনের দোষেই হইয়াছে; তিনি সৃজানকে অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখিতেন-একে তাঁহার বয়স হইয়াছে, তাহার উপরে আবার তিনি অমূলক সন্দেহের বশে সৃজানের সহিত এমন সব ব্যবহার করিতেন যে, তাহাতে তাহার হৃদয় অধিকার করা দূরে থাক্, বরং তাহার হৃদয়ে যতটুকু স্থান পাইয়াছিল, নিজদোষে তাহাও নষ্ট করিয়া ফেলিলেন। এ দুনিয়ার নিয়মই এই। সে যাহা হউক, আমরাও তাই বোধ হয় যে, সৃজান ও মোনিরুদ্দীনের গুপ্ত-অভিসন্ধি মৃজান কোন রকমে টের পাইয়াছিল; পাছে, মনিরুদ্দীন তাহার যেমন সর্ব্বনাশ করিয়াছে, তাহার ভগিনীরও সেইরূপ দুর্গতি করে, এই আশঙ্কায় হয় ত সে নিজেই ভগিনীকে সাবধান করিতে রাত্রিতে জোহিরুদ্দীনের বাটীতে গিয়াছিল। সম্ভব, সৃজান মৃজানের কথায় কর্ণপাত করে নাই। তাই মৃজান আর কোন উপায় না দেখিয়া মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যায়, মনিরুদ্দীন তখন বাড়ীতে ছিল না- তাহার পর সেখান হইতে ফিরিয়া আসিবার সময়ে পথে হতভাগিনী খুন হইয়াছে। তেমন একজন সম্ভ্রান্ত, সদাশয় ব্যক্তির পুত্র হইয়া মনিরুদ্দীন যে এরূপে পিতৃনাম রক্ষা করিতেছে, ইহাই আশ্চর্য্য!"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "আপনার মুখে যাহা শুনিলাম, তাহাতে আপনার কন্যা দিলজানের খুনের কি কিনারা হইল?"
     বিরক্তভবে, মুন্সী মোজাম হোসেন বলিলেন, "দিলজানের নাম আমার কছে করিবেন না। আপনার কথাই ঠিক, কে মৃজানকে খুন করিয়াছে, কেমন করিয়া বলিব? আপনি যেমন বলিতেছেন, আমরাও তাহাই বোধ হয়; মজিদ খাঁর কোন দোষ নাই- সে কেন মৃজানকে খুন করিবে? কোন কারণ দেখি না।"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হাঁ, আমি তাহার বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণ পাইয়াছি; কিন্তু এমন কোন একটা কারণ দেখিতেছি না, যাহাতে তাহাকে খুনী বলিয়া বুঝিতে পারি। এখন আপনার কন্যা মৃজানের পূর্ব্বজীবন সম্বন্ধে দুই-একটী বিষয় আমার জানা দরকার। আমীর খাঁর পূর্ব্বে মৃজান আর কাহারও অনুরাগিনী হইয়াছিল?"
     অবনতমস্তকে মোজাম হোসেন বলিলেন, "না"।
     "মৃজানের কেহ অনুরাগী হইয়াছিল?"
     "না।"
     "একজনও না?"
     "না।"
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, মুন্সী মোজাম হোসেনের নিকট থাকিয়া আর বিশেষ কোনকাজ হইবে না; বিদায় লইয়া সুতরাং উঠিয়া পড়িলেন। কাজের মধ্যে-প্রকৃতরূপে এক্ষণে জানিতে পারা গেল, দিলজান সৃজানের সহোদরা ভগিনী। এবং উভয় ভগিনীই একজনের প্রেমাকাঙ্ক্ষিণী। সুতরাং দিলজানের খুনের সহিত সৃজানের গৃহত্যাগের যে একটা খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে, সে সম্বন্ধে দেবেন্দ্রবিজয়ের আর কোন সন্দেহ রহিল না। কিন্তু কিছুতেই ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিলেন না-সে সম্পর্কটি কি-এবং কেনই বা দিলজান খুন হইল-কে বা তাহাকে খুন করিল? একবার মনে হইল, সৃজানই কি ঈর্ষাবশে নিজের ভগিনীকে খুন করিয়া নিজের অধঃপতনের পথ পরিষ্কার করিয়া লইয়াছে? কে জানে, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না-আরও গোলযোগে পড়িলাম। মুন্সী মোজাম হোসেনের সহিত দেখা করিয়া এ রহস্য পরিষ্কার হওয়া দূরে থাক্, আরও গোলযোগ বাঁধিয়া গেল। দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, তিনি গন্তব্যস্থানে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিয়া যখন যে সূত্র অবলম্বন করিতেছেন, সামান্য দূর যাইতে-না-যাইতে তাহাই ছিঁড়িয়া গিয়া তাঁহাকে এমন অন্ধকারময় বিপথে চালিত করিতেছে যে, তিনি তথা হইতে বাহির হইবার কোন সুগম পথ খুঁজিয়া পাইতেছেন না। বুঝিলেন, এ রহস্যজালে যেরূপ বিষম জট্ ধরিয়াছে, যাহা আরও নিবিড়ভাবে পাক-খাইয়া যাইতেছে। দেবেন্দ্রবিজয় তখন আপন মনে বলিলেন, "এখন একবার মুন্সী জোহিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিতে হইবে। যদি তাঁহার স্ত্রী সৃজান বিবি এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে? অনুচিত হইলেও আমাকে এই সকল কথা তাঁহার নিকটে তুলিতে হইবে। তাঁহার কলঙ্কিনী স্ত্রী সম্বন্ধে কোন কথা এখন তাঁহাকে বলিতে গেলে তিনি রাগ করিতে পারেন। তাহাতে ক্ষতি কি? একজন নির্দ্দোষী ব্যক্তিকে রক্ষা করিবার জন্য আমি সর্ব্বতোভাবে চেষ্টা করিব। আমার খুব বিশ্বাস-মজিদ খাঁ নির্দ্দোষী।"

 
      

দশম পরিচ্ছেদ
উকীল-হরিপ্রসন্ন

     কোন কোন তৃণ করতলে দলিত করিলে তাহা হইতে সুগন্ধ বাহির হয়; তেমনই মজিদ খাঁ কারারুদ্ধ হইলেই অনেকেরই মুখে তাঁহার গুণগ্রামের কথা বাহির হইতে লাগিল। এমন একজন ধর্ম্মনিষ্ঠ, দয়ালু, বুদ্ধিমান্, সদ্বিদ্বান্ সচ্চরিত্র যুবক মজিদ খাঁ যে, এইরূপ একটা কলঙ্কজনক বারবনিতার হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত আছেন, একথা সহসা কাহারও বিশ্বাস হইল না। দুঃসহ বিস্ময়ের সহিত প্রথমে সকলেই এই অপ্রত্যাশিতপূর্ব্ব সংবাদ শুনিল, কিন্তু কেহ বুঝিতে পারিল না, কোন্ কারণে মজিদ খাঁ দিলজানকে খুন করিতে পারেন। সকলেই মজিদ খাঁকে এই বিপদ্ হইতে উদ্ধার করিবার জন্য সচেষ্ট হইল। সাধারণতঃ এরূপ দেখা যায়, কেহ বিপদে পড়িলে তাহার বন্ধুবর্গ ধীরে ধীরে গা-ঢাকা দেন; কিন্তু মজিদ খাঁর বন্ধুবর্গ তেমন নহেন, তাঁহার সকলে আজ মজিদ খাঁকে বিপন্মুক্ত করিবার জন্য বদ্ধপরিকর।
     
লদ্ধপ্রতিষ্ঠ বৃদ্ধ উকীল হরিপ্রসন্ন বাবু নম্র-স্বভাব মজিদ খাঁকে বড় স্নেহ করিতেন। তিনি মজিদ খাঁর এই বিপদের কথা শুনিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইলেন; এবং যাহাতে তাঁহাকে ফাঁসীকাঠের মুখ হইতে বাঁচাইতে পারেন, তাহার আয়োজন করিতে লাগিলেন।
      উকীল হরিপ্রসন্ন বাবু মনিরুদ্দীনের পিতার সহাধ্যায়ী বাল্যবন্ধু। বন্ধুর জমিদারী-সেরেস্তার সমস্ত মাম্লা-মোকদ্দমা তাঁহাকেই দেখিতে হইত; তাঁহার অবর্ত্তমানে এখনও দেখিয়া থাকেন। তিনি মজিদ খাঁ ও মনিরুদ্দীনের বাল্যকাল হইতে তদুভয়কে দেখিয়া আসিতেছেন। তদুভয়ের স্বভাব পরষ্পর ভিন্ন রকমের। মনিরুদ্দীন যেমন দাম্ভিক, নির্ব্বোধ, অশিষ্ট, চঞ্চল এবং নির্দ্দয়; মজিদ তেমনি ঠিক তাহার বিপরীত-মজিদ মার্জ্জিতবুদ্ধি, বিনয়ী, শিষ্ট শান্ত ধীর এবং পরোপকারী। সেইজন্য হরিপ্রসন্ন বাবু মজিদেরই বিশেষ পক্ষপাতী। মনিরুদ্দীনের পিতার মৃত্যুর পর হইতে তাঁহার জমিদার-সংক্রান্ত কোন মাম্লা-মোকদ্দমা উপস্থিত হইলে হরিপ্রসন্ন বাবু মজিদ খাঁর সহিতই তৎসম্বন্ধে পরামর্শ করিতেন। মনিরুদ্দীনকে সেজন্য তাঁহার বড়-একটা প্রয়োজন হইত না।
      জোহেরার পিতার সহিতও সুবিজ্ঞ উকীল হরিপ্রসন্ন বাবুর বন্ধুত্ব ছিল। মনিরুদ্দীনের পিতার ন্যায় তাঁহারও জমিদারী-সেরেস্তার মাম্লা-মোকদ্দমা, হরিপ্রসন্ন বাবুর হাতে আসিয়া পড়িত। জোহেরার পিতার সহিত মনিরুদ্দীনের পিতার বিশেষ সদ্ভাব থাকায় তদুভয়ের জমিদারী সেরেস্তার মাম্লা-মোকদ্দমা একা নিজের হাতে লইতে হরিপ্রসন্ন বাবুর কোন গোলযোগের সম্ভাবনা ছিল না। এবং দুইজন বড় জমিদারকে হাতে পাইয়া তাঁহার আয়ের পথ বেশ সুগম হইয়াছিল। এক্ষণে মুন্সী জোহিরুদ্দীন জোহেরার বিষয়-সম্পত্তির অছি হওয়ায় হরিপ্রসন্ন বাবুর একটু ক্ষতি হইয়াছে। মুন্সী সাহেব কিছু স্বজাতিপ্রিয়। তিনি অধিকাংশ মোকদ্দমা একজন স্বজাতীয় ব্যবহারজীবীর হস্তে নির্ভর করিয়া থাকেন। তবে কোন সঙ্গীন মোকদ্দমা উপস্থিত হইলে হরিপ্রসন্ন বাবুকেই তাঁহাকেই তাঁহার প্রয়োজন হইত। হরিপ্রসন্ন বাবুও তাহাতে কিছুমাত্র দুঃখিত ছিলেন না; যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিয়াছেন, এখন এই বৃদ্ধ বয়সে অতিরিক্ত পরিশ্রমে আর তাঁহার বড় একটি রুচি ছিল না। তবে তিনি জোহেরাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন বলিয়া অনেক সময়ে তাঁহাকে স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হইয়া অনেক কাজ সম্পন্ন করিতে হইত। যখন জোহেরা এতটুকুটি, তখন তিনি তাহাকে অনেকবার কোলে পিঠে করিয়াছেন। তাঁহার নিজের সন্তানাদি না থাকায় তিনি বিজাতীয় বন্ধুর কন্যা জোহেরাকে অত্যন্ত ভালবাসিয়া ফেলিয়াছেন। এবং জোহেরা অদ্যাপি তাঁহাকে পিতৃতুল্য ভক্তি করে। জোহেরা যে মজিদ খাঁর অনুরাগিণী এবং কেবল অভিভাবক মুন্সী জোহিরুদ্দীনের মত্ না থাকায় বয়স অধিক হইলেও জোহেরার বিবাহ বন্ধ আছে, তাহা হরিপ্রসন্ন বাবুর অগোচর ছিল না। মজিদ খাঁ অতি সুপাত্র। তাঁহার সহিত জোহেরার বিবাহে তিনি পক্ষপাতী ছিলেন; কিন্তু ইদানীং তিনি অত্যন্ত বিস্ময়ের সহিত একটা জনরব শুনিয়াছিলেন যে, জোহেরা মনিরুদ্দীনকে বিবাহ করিতে সম্মত হইয়াছে; কিন্তু অদ্য সহসা জোহেরা সাক্ষাৎ অভিলাষিণী হইয়া তাঁহার নিকটে একজন লোক পাঠাইতে বুঝিতে পারিলেন, তাহা জনরবমাত্র। উকীল মানুষ তিনি, জোহেরার মনোগত ভাব বুঝিতে তাঁহার কতখানি সময়ের আবশ্যক? তিনি আপন মনে কহিলেন, নিশ্চয়ই জোহেরা মজিদ খাঁ কারারুদ্ধ হওয়ায় অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিয়াছে, এখন আমার সহিত দেখা করিয়া একটা পরামর্শ করিতে চায়। মনে করিয়াছে, মজিদ খাঁর বিপদে আমি নিশ্চিন্ত আছি-কি ভ্রম! যাক্ এখন জোহেরার সহিত দেখা না করিয়া আগে মজিদ খাঁর সঙ্গে আর একবার দেখা করিতে হইবে। মজিদ, যেরূপ জটিলভাবে এই বিপদে পড়িয়াছে- যদিও সে নির্দ্দোষী, তথাপি তাহাকে উদ্ধার করা বড় শক্ত হইবে। তাহার বিরুদ্ধে তিনটি ভয়ানক প্রমাণ বলবৎ রহিয়াছে। প্রমাণগুলি লিখিয়া রাখা দরকার, " বলিয়া পকেট হইতে নোটবুকখানি বাহির করিয়া লিখিতে লাগিলেন।
     ১। মজিদ খুনের রাতিতে দিলজানকে শেষজীবিত দেখিয়াছে।
     ২। সেই রাত্রিতেই মেহেদী-বাগানে অকুস্থানের অনতিদূরে মোবারক মজিদকে দেখিয়াছে; তখন মজিদের বড় ব্যস্ত-সমস্ত ভাব।
     ৩। মজিদের বাসা হইতে একখানা বিষাক্ত ছুরি পাওয়া গিয়াছে। খুব সম্ভব, সেই ছুরিতেই দিলজান খুন হইয়াছে।
     অত্যন্ত কঠিন প্রমাণ। ভাবিয়া দেখিলেন, ইহাতে মজিদ যে প্রতিবাদ করিয়াছে, তাহা কোন কাজেরই নহে; তথাপি হরিপ্রসন্ন বাবু তাহাও নোটবুকের অপর পৃষ্ঠায় লিখিলেন:-
     ১। মজিদ এখন বলিতেছে, খুনের রাত্রিতে যে স্ত্রীলোকের সহিত তাহার দেখা হইয়াছিল, সে দিলজান নহে। সে অন্য কোন স্ত্রীলোক। তাহার নাম সে কিছুতেই প্রকাশ করিতে পারিবে না।
     ২। মেহেদী-বাগানে অকুস্থানের কিছুদূরে তাহার সহিত মোবারকউদ্দীনের যে সাক্ষাৎ হইয়াছিল, মজিদ বলিতেছে, তাহা দৈবক্রমেই হইয়া থাকিবে।
     ৩। যেদিন রাত্রিকালে দিলজান খুন হয়, সেই দিন অপরাহ্ণে দিলজানের সহিত মজিদের দেখা হইয়াছিল। মজিদ বলিতেছে, সে তাহার নিকট হইতে ঐ ছুরি জোর করিয়া কাড়িয়া লইয়াছিল।
     হরিপ্রসন্ন বাবু অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া দেখিলেন, মজিদ যে প্রতিবাদ করিতেছে, কিছুতেই টিকিবে না। নির্দ্দোষ হইলেও তাহাকে তাহারই দোষে এই হত্যাপরাধে দণ্ডার্হ হইতে হইবে। মজিদ কেন এরূপ কপট ব্যবহার করিতেছে? এখন আর একবার তাহার সহিত দেখা করিয়া যাহাতে তাহার মতি ফিরাইতে পারি, যাহাতে সে অকপটভাবে আমার কছে সকল কথা প্রকাশ করে, সে চেষ্টা এখন আমাকে দেখিতে হইবে। এইরূপ স্থির করিয়া হরিপ্রসন্ন বাবু মজিদ খাঁর সহিত দেখা করিতে বাহির হইয়া পড়িলেন।

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।