রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

 দ্বিতীয় খণ্ড

নবম পরিচ্ছেদ
বিশ্রম্ভালাপে

     জোহেরা কোমল বাহুদুটি প্রসারণ করিয়া সবেগে মজিদের কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া ধরিল| মজিদ সাগ্রহে জোহেরার সুন্দর মুখখানি লইয়া তদুপরি দুইটী চুম্বনরেখা অঙ্কিত করিয়া দিলেন| জোহেরা অনেকক্ষণ বাহ্যজ্ঞানপরিশূন্যা হইয়া রহিল| এইরূপে তাঁহাদিগের বিবাদ একেবারে মিটিয়া গেল| তাহার পর উভয় প্রেমিক-প্রেমিকার প্রমালাপে কত কথাই হইল-কত প্রাণের কথা-কত মানাভিমানের কথা, কত বিরহের কথা, বালক শ্রীশচন্দ্র তাহার একটি বর্ণও হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল না; এবং যুক্তাক্ষরসঙ্কুল বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগের ন্যায় তাহা শ্রীশচন্দের নিকটে একান্ত কঠিন ও দুর্ব্বোধ্য অনুমিত হইল|
তাহার পর মজিদ খাঁ পুনরায় নিজের কাজের কথা পাড়িলেন| এখন বিপদের বজ্র তাঁহার মাথার উপর ছুটিতেছে| তিনি বুঝিয়াছিলেন, নিশ্চিন্তে প্রেমালাপের সময় ইহা নহে| বলিলেন, "জান কি জোহেরা, গত বুধবার রাত্রে সৃজান বিবি কখন কোথায় গিয়াছিল, কোথায় কি করিয়াছিল?"
     জোহেরা বলিল, "কিছু কিছু খবর আমি বলিতে পারি| সেদিন রাজাব-আলির বাড়ীতে আমাদিগের নিমন্ত্রণ ছিল| সৃজান আর আমি দুইজনেই একসঙ্গে সেখানে যাই|"
     ম| কখন গিয়াছিলে?
     জো| রাত নয়টার পর|
     ম| রাজাব-আলির বাড়ী হইতে কখন তোমরা ফিরিয়া আসিলে?
     জো| সৃজান বিবির মাথা ধরায় বেশিক্ষণ সেখানে আমরা থাকিতে পারি নাই| রাত সাড়ে দশটার সময়ে আমরা সেখান হইতে চলিয়া আসিলাম|
     ম| বাড়ীতে ফিরিয়া সৃজান বিবি কি করিল?
     জো| তাহার সহিত দেখা করিবার জন্য একটি স্ত্রীলোক অপেক্ষা করিতেছিল| সৃজান বিবি তখনই তাহার সহিত দেখা করিতে গেল|
     ম| (সবিস্ময়ে) স্ত্রীলোক! কে সে?
     জো| তা' আমি ঠিক জানি না| তাহাকে আমি দেখি নাই| তাহার পর সৃজান বিবির সহিত আমার আর দেখা হয় নাই| বোধ হয়, সেই স্ত্রীলোকটি মনিরুদ্দীনের কোন সংবাদ আনিয়া থাকিবে| রাত সাড়ে এগারটার সময়ে সে চলিয়া যায়|
     ম| কিরূপে জানিলে|
     জো| সাখিয়ার মুখে শুনিয়াছি|
     ম| সাখিয়া কে?
     জো| সৃজান বিবির বাঁদী|
     ম| তাহার কাছে আর কি শুনিয়াছ? মুন্সী জোহিরুদ্দীন সাহেব তখন কোথায় ছিলেন?
     জো| তখন তিনি বাড়ীতে ছিলেন না; কোন কাজে তিনি বাহিরে গিয়াছিলেন; রাত বারটার সময়ে তিনি ফিরিয়া আসেন| জানিতে পারিয়া, সৃজান বিবি অভিমানের ভাণে তখন অন্য একটা ঘরে গিয়া দ্বাররুদ্ধ করিয়া শয়ন করে| তাহার পর সে কখন উঠিয়া চলিয়া গিয়াছে, কেহ তাহা জানে না| বোধ হয় শেষ রাত্রিতে, সৃজান বিবি পলাইয়া গিয়াছে|
     ম| কাহারও জন্য কোন পত্র রাখিয়া গিয়াছিল?
     জো| তাহা আমি ঠিক জানি না| কেন মজিদ, এ সকল কথা তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছ?
     ম| ফাঁসীর দড়ী থেকে নিজের গলাটা বাঁচাইবার জন্য, আর কেন? আমি বিভ্রাটে পড়িয়াছি; জোহেরা! কি করিব, কিছুই ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিতেছি না| শুনিলাম, মেহেদী-বাগানে যে স্ত্রীলোকটি খুন হইয়াছে, তাহার নাম দিলজান| সে মনিরুদ্দীনের রক্ষিতা| গত বুধবার সন্ধ্যার পূর্ব্বে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে তাহাকে আমি একবার দেখিয়াছিলাম| সেইদিনই রাত এগারটার পর সেখানে আমার সহিত আর একটি স্ত্রীলোকের দেখা হইয়াছিল| দেবেন্দ্রবিজয়ের ধারণা, রাত্রে যাহার সহিত আমার দেখা হইয়াছিল, সে স্ত্রীলোক দিলজান ভিন্ন আর কেহই নহে; কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সে দিলজান নহে| সেইদিন রাত বারটার সময়ে আমি মনিরুদ্দীনের বাড়ী হইতে বাহির হইয়া যাই| মেহেদী-বাগানেই আমাকে যাইতে হইয়াছিল; সেইখানে মোবারক উদ্দীনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়| যেখানে সাক্ষাৎ হয়, তাহার অল্পদূরেই দিলজানের লাস পাওয়া গিয়াছে| যদি এখন আমি এই হত্যাপরাধে ধৃত হই, ঘটনাচক্রে আমাকেই দোষী হইতে হইবে| রাত্রে আমার সহিত যে, দিলজানের আর দেখা হয় নাই, এ কথা আমি কিছুতেই সপ্রমাণ করিতে পারিব না-কেহই ইহা বিশ্বাস করিবে না| প্রতিজ্ঞালঙ্ঘন ভিন্ন তখন নিজের নির্দ্দোষতা সপ্রমাণ করিবার আর কোন উপায়ই থাকিবে না|
     জো| সকলই বুঝিলাম; কিন্তু ইহাতে সৃজান বিবির কি সংশ্রব আছে, বুঝিতে পারিলাম না|
     ম| না, তা', আমি মনে করি নাই| (চিন্তিতভাবে) প্রকৃতপক্ষে তা' আমি মনে করি নাই| তবে আমি জানিতে চাই, মনিরুদ্দীন সে রাত্রে কখন কোথায় ছিল-কি করিয়াছিল-কোথায় গিয়াছিল, এ সকল সংবাদ সংগ্রহ করা এখন আমার অত্যন্ত দরকার হইতেছে| আমি এখন ঘটনাচক্রে কিরূপ অবস্থাধীন হইয়া পড়িয়াছি, কি গুরুতর বিপদ্ চারিদিক্ হইতে আমাকে গ্রাস করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছে-বুঝিতে পার নাই কি? যদি আমি এখন ধরা পড়ি, অথচ মনিরুদ্দীন ফিরিয়া না আসে, তাহা হইলে আর আমার নিস্তার নাই|
     জো| কেন?
     ম| মনিরুদ্দীন ফিরিয়া না আসিলে, কিছুতেই আমি নিজেকে নির্দ্দোষ বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারিব না|
     জো| তুমি কি সত্যই নির্দ্দোষ?
     ম| আমাকে কি সন্দেহ হয়?
     জো| না|
     ম| তবে আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করিয়ো না|
     তাহার পর অন্যান্য দুই-একটি কথার পর মজিদ খাঁ বিদায় গ্রহণ করিলেন| জোহেরা দ্রুতপদে বাটীমধ্যে প্রবেশ করিল| এবং শ্রীশচন্দ্র অত্যন্ত উৎসাহের সহিত দেবেন্দ্রবিজয়ের সহিত দেখা করিতে ছুটিল|

দশম পরিচ্ছেদ
ঘটনা-সূত্র

     শ্রীমান্ শ্রীশচন্দ্রের স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর| শিক্ষকের নিকটে মেধাবী ছাত্র যেমন মুখস্থ পাঠ আবৃত্তি করিতে থাকে, ঠিক তেমনই ভাবে শ্রীশচন্দ্র, মজিদ ও জোহেরার কথোপকথনের যাহা কিছু শুনিয়াছিল, দেবেন্দ্রবিজয়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়া সমুদয় 'জলবত্তরলং' বলিয়া গেল| অধিকন্তু তাঁহারা যেরূপভাবে হাত-মুখ নাড়িয়া কথা কহিয়াছিলেন, সুদক্ষ অভিনেতার ন্যায় শ্রীশ তাহাও দেবেন্দ্রবিজয়কে ঠিক প্রদর্শন করিতে ত্রুটি করিল না| ইহাতে অনেক স্থলে শ্রোতা দেবেন্দ্রবিজয়কে অতিকষ্টে হাস্যসংবরণ করিতে হইয়াছিল|
শ্রীশের মুখে দেবেন্দ্রবিজয় যাহা শুনিলেন, তাহাতে এ পর্য্যন্ত তিনি এই হত্যাকাণ্ডের যে সকল সূত্র বাহির করিয়াছিলেন, সেই সূত্রাবলীতে আর একটি নূতন গ্রন্থির সংযোগ হইল| অনন্তবিধ চিন্তায় তাঁহার মস্তিক পূর্ণ হইয়া গেল| কিছুতেই তিনি ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিলেন না, মজিদ কেন এরূপ ব্যবহার করিতেছেন| খুনের রাত্রিতে দিলজানের সহিত যে তাঁহার দেখা হইয়াছিল; কেন তিনি ইহা কিছুতেই এখন স্বীকার করিতে চাহেন না? কারণ কি? তিনি এখন বলিতেছেন, যে স্ত্রীলোকের সহিত তাঁহার দেখা হইয়াছিল, সে দিলজান নহে; ইহাতে তাঁহার কি ফলোদয় হইতেছে? কে তাঁহার কথা বিশ্বাস করিবে? যাহাতে তাঁহার প্রতি কাহারও সন্দেহ না হয়, সেইজন্য তিনি এই মিথ্যাকথা বলিয়া অনর্থক নির্দ্দোষ সপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিতেছেন| রাত্রি এগারটার পর গনির মা দিলজানকে পুনরায় আসিতে দেখিয়াছে| আর গনির মা'র যদি ভুলই হয়-সে দিলজান না হইয়া যদি আর কেহই হয়-তাহা হইলে কে সে স্ত্রীলোক? মজিদের কথার ভাবে বুঝিতে পারা যাইতেছে, রাত্রিতে সেখানে এমন কোন স্ত্রীলোক আসিয়াছিল, যাহার নাম প্রকাশ করিলে সম্ভ্রমের হানি হইতে পারে| ভাবে বোধ হয়, মজিদ যেন কোন ভদ্রমহিলার সম্ভ্রম রক্ষার জন্যই এইরূপ ব্যগ্রতা প্রকাশ করিতেছেন| যদি তাহা সত্য হয়, সেই স্ত্রীলোক দিলজান না হইতে পারে| দিলজান ভদ্রমহিলা ছিল না, এবং হানি হইতে পারে-এমন সম্ভ্রমও তাহার কিছুই ছিল না| কে তবে সেই স্ত্রীলোক? কাহার জন্য মজিদ এমন বিব্রত হইয়া উঠিয়াছেন? মজিদ অতি অদ্ভুত প্রকৃতির লোক-এ জগতে তাঁহার দ্বিতীয় নাই দেখিতেছি| আমাকে তাঁহার অন্তরের ভিতরে ভাল করিয়া প্রবেশ করিতে হইবে; নতুবা সহজে তাঁহাকে ঠিক বুঝিতে পারিব না|
       এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে ঝাঁ করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের আর একটা কথা মনে পড়িয়া গেল| তবে কি সেদিন রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাটীতে যে স্ত্রীলোকের সহিত মজিদের সাক্ষাৎ হইয়াছিল, সে সৃজান বিবি? হয়তো সৃজান মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিতে আসিয়াছিল, ঘটনাক্রমে মজিদের সহিত তাহার দেখা হইয়া গিয়াছিল| মজিদ হয়তো ভিতরের কথা সকলই জানিতেন| যাহাতে সৃজান বিবি এই গর্হিত সঙ্কল্প পরিত্যাগ করে, সেজন্য হয় ত তাহাকে অনেক বুঝাইয়া থাকিবেন; এবং সেই কথা লইয়াই হয়তো দুজনের বচসা হইয়া থাকিবে| অসম্ভব নয়, তাহাই ঠিক-তেমন গভীর রাত্রে ভিন্ন স্থানে গিয়া নির্জ্জনে একজন পর-পুরুষের সহিত সাক্ষাৎ করা কোন ভদ্রমহিলার পক্ষে একান্ত অবৈধ ও নিন্দনীয় সে কথা সাধারণে প্রকাশ করাও ঠিক নহে| এই সকল কারণ বশতঃ অবশ্যই মজিদ এখন কথা একেবারে চাপিয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছেন| এখন তাহা প্রকাশ করিলে সৃজান বিবির সম্ভ্রম হানি না হইতে পারে; কেন না, সে নিজের মান-সম্ভ্রম একেবারে জলাঞ্জলি দিয়া মনিরুদ্দীনের সহিত উধাও হইয়া গিয়াছে; কিন্তু মজিদের চরিত্রে সকলেই দোষারোপ করিবে|
এই অনুমান সত্য হইলেও ইহার সহিত দিলজানের খুনের কি সংশ্রব আছে? কিছুই না| দিলজানকে কে খুন করিল? সৃজান বিবি কি তবে দিলজানকে খুন করিয়াছে? না, তাহা কখনই সম্ভবপর নহে|
শ্রীশের মুখে দেবেন্দ্রবিজয় যে সকল কথা শুনিয়াছিলেন, তাহাই মনে মনে আলোচনা করিতে লাগিলেন| সহসা তাঁহার চিন্তাস্রোত ভিন্ন পথে প্রবেশ করিল| তিনি ভাবিতে লাগিলেন, সৃজান বিবি যে শেষ রাত্রিতে গৃহত্যাগ করিয়াছিল, মজিদ ও জোহেরার কথোপকথনে তাহার প্রমাণও পাওয়া যাইতেছে| তাহা হইলে সেদিন রাত্রে এগারটার পর যে রমণীর সহিত মজিদের দেখা হইয়াছিল,-সে কখনই সৃজান হইতে পারে না| এখন আমাকে সন্ধান করিয়া বাহির করিতে হইবে, মনিরুদ্দীনের বাটীতে রাত্রিতে মজিদের সহিত যাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল সেই রমণীই বা কে; এবং এদিকে ঠিক সেই রাত্রে যে রমণী সৃজানের সহিত দেখা করিতে গিয়াছিল, সেই রমণীই বা কে| আরও সন্ধান করিয়া দেখিতে হইবে, ঠিক কোন্ সময়ে সৃজান গৃহত্যাগ করিয়াছিল| এই সকলের প্রকৃত সন্ধান যতক্ষণ না পাইতেছি, ততক্ষণ আমাকে অন্ধকারের মধ্যেই থাকিতে হইবে| আর যদি কাল গোলাদিঘীতে গিয়া কার্য্যোদ্ধার করিতে পারি, তাহা হইলে সকল রহস্যই প্রকাশ পাইবে-আর কোন সন্ধানের আবশ্যকতা থাকিবে না| হত্যাকারী বড় সহজ নহে; তাহাকে যে সহজে ধরিতে পারিব, এমন বোধ হয় না| উপন্যাসের সর্ব্বশক্তিমান্, সর্বজ্ঞ নিরাকার গোয়েন্দাদিগের মত ক্ষমতা এবং প্রভাব মাংসাস্থিবিশিষ্ট কাহারও থাকে না-আমারও নাই| গ্রন্থকারের কল্পনায় তাহারা সকল বিষয়েই অবলীলাক্রমে কৃতকার্য্যে হইতে পারে; সকল বিষয়েই অমানুষিক প্রভাব বিস্তার করিতে পারে|
       তাহাদিগের মত অনন্যসুলভ ক্ষমতা, সর্ব্বজ্ঞতা আমার মত এ শরীরী গোয়েন্দা কোথায় পাইবে? অনেকস্থলে আমার ভ্রম হইতে পারে, ভ্রমক্রমে আমি ভিন্ন পথেও চালিত হইতে পারি; এবং সকল বিষয়ে কৃতকার্য্যে না হইতেও পারি| তবে চেষ্টা করিলে এক-সময়ে-না-এক-সময়ে যে, যথাস্থানে আমি উপনীত হইতে পারিব, এ বিশ্বাস আমার নিজের মনে খুব আছে| হয় ত ইহাতে দিলজানের হত্যাকারীর কোন একটা উদ্দেশ্য আছে| যে উদ্দেশ্যই থাক্ না কেন, আমি কাল রাত্রি নয়টার পর গোলদিঘীতে গিয়া তাহার সঙ্গে দেখা করিব-ধরিবার চেষ্টা করিব| দেখা যাক্, কাজে কতদূর কি করিতে পারি|
         দেবেন্দ্রবিজয় পকেট হইতে নোটবুকখানি টানিয়া বাহির করিয়া এইরূপ মন্তব্যগুলি লিখিতে লাগিলেন;-
     ১| হত্যাকারী কোন্ উদ্দেশ্যে এরূপ পত্র লিখিতেছে? আমাকে যদি সে ভয়ই না করে, তবে হাজার টাকার উৎকোচ দিতে চাহে কেন?
     কাল রাত নয়টার পর গোলদিঘীতে গেলে, তাহা অনেকটা বুঝিতে পারিব| যদি তাহার উদ্দেশ্যটা মন্দ হয়-বলিতে পারি না-তাহাকে ধৃত করিবার জন্য লোক মোতায়েন রাখিতে হইবে|
     মন্তব্য-কাল রাত নয়টার পর গোলদিঘীতে যাইতে হইবে|
      ২| গত বুধবার (যে রাত্রে দিলজানের লাস মেহেদী-বাগানে পাওয়া গিয়াছিল) রাত্রি এগারটার হইতে বারটার মধ্যে কোন্ স্ত্রীলোক মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে গিয়াছিল, তাহার সন্ধান গ্রহণ|
       একমাত্র মজিদের নিকটে সে সন্ধান পাওয়া যাইতে পারে| গনির মা বলিতেছে, দিলজান; কিন্তু মজিদ তাহা একেবারে উড়াইয়া দিতেছেন| এখন দেখিতে হইবে, তদুভয়ের মধ্যে কে প্রকৃত মিথ্যাবাদী|
মন্তব্য-মজিদের সহিত দেখা করিয়া যে কোন কৌশলে হউক, সেই স্ত্রীলোকের নামটি বাহির করিয়া লইতে হইবে|
     ৩| সেই খুনের রাত্রিতে যে স্ত্রীলোক সৃজান বিবির সহিত দেখা করিতে গিয়াছিল, তাহার আকৃতি কিরূপ, বয়স কত, যদি সম্ভবপর হয়, নামটা জানিবার জন্য চেষ্টা করিতে হইবে| এই খুনের মাম্লায় কোন-না-কোন বিষয়ে সেই স্ত্রীলোক জড়িত থাকিতে পারে| মুন্সী জোহিরুদ্দীনের বাটীর কোন-না-কোন ভৃত্যের নিকটে ইহার সন্ধান হইতে পারে|
     মন্তব্য-ভৃত্যদিগের মধ্যে যে এ বিষয়ের কিছু জানে, এমন একজনকে হস্তগত করিতে হইবে|
      ৪| সেই খুনের রাত্রে ঠিক কোন্ সময়ে দিলজান গৃহত্যাগ করিয়াছিল; গৃহত্যাগ করিবার পূর্ব্বে ও পরে কখন কোথায় গিয়াছিল-কোথায় কি করিয়াছিল, তাহার গতিবিধির অনুসন্ধান করিয়া দেখা খুব প্রয়োজন|
চেষ্টা করিলে তাহাদের কোন ভৃত্যের নিকটে ইহারও কিছু-না-কিছু জানিতে পারিব|
মন্তব্য-রহস্যটা একটু পরিষ্কার হইয়া আসিলে-ঘটনা-সূত্রে ইহা আপনা হইতেই সব প্রকাশ হইয়া পড়িবে|
      ৫| যে বিষাক্ত ছুরিকায় দিলজান খুন হইয়াছে, সেই ছুরিখানা কোথায় গেল, তাহা খুঁজিয়া বাহির করা চাই|
     সম্ভব ইহা মজিদের নিকটে পওয়া যাইবে|
     মন্তব্য-গোপনে তাহার শয়ন-গৃহ অনুসন্ধান করিতে হইবে| নিজের দ্বারা বিশেষ সুবিধা হইবে না; অপর কাহারও দ্বারা-শ্রীশ আছে|
     ৬| দিলজানের পূর্ব্বজীবনী সংগ্রহ করিতে হইবে|
     লতিমন বাইজীর নিকটে কিছু কিছু সংগ্রহ হইতে পারে| দিলজান অনেক দিন তাহার নিকটে ছিল; অবশ্যই দিলজানের কিছু কিছু খবর লতিমন জানে|
     মন্তব্য-লতিমন বাইজীর সঙ্গে আর একবার দেখা করিতে হইবে|

একাদশ পরিচ্ছেদ
বিপদে
      পরদিন রাত্রি নয়টার সময় দেবেন্দ্রবিজয় গোলদিঘীতে উপস্থিত হইলেন| ইতিপূর্ব্বে তিনি স্থানীয় থানা হইতে কয়েকজন অনুচর ঠিক করিয়া লইয়াছিলেন| তাহাদিগকে স্থানে স্থানে লুকাইয়া রাখিলেন; এবং নিজে গোলদিঘীর ভিতরে গিয়া হত্যাকারীর অপেক্ষা করিতে লাগিলেন|
     ক্রমে রাত্রি দশটা বাজিয়া আসিল| দেবেন্দ্রবিজয় কোথায় কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না-হত্যাকারী আসিল না| সম্মুখবর্ত্তী পথ দিয়া পথিকগণ যে যাহার গন্তব্যস্থানে যাইতেছে; কত লোক যাইতেছে-আসিতেছে-কাহাকেও তাঁহার প্রতি লক্ষ্য করিতে দেখিলেন না-সকলেই আপন মনে ফিরিতেছে|
     আকাশে চাঁদ উঠিয়াছে| অষ্টমীর অর্দ্ধচন্দ্রের কিরণ তেমন উজ্জ্বল নহে-কেবল যেন একটু অন্ধকার-মাখা হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে| তুলারাশিবৎ লঘু মেঘখণ্ডগুলি আকাশতলে দুষ্ট বালকের মত উদ্দামভাবে ছুটাছুটি করিতেছে| চন্দ্রদেব মৃদুহাস্যে সেই অশিষ্ট মেঘশিশুদিগের সেই ক্রীড়া দেখিতেছেলন; কখনও বা কহাকেও আপনার বুকের উপরে টানিয়া লইতেছিলেন| অন্যত্র অদূরস্থিত অশ্বত্থশাখাসীন কলকণ্ঠ পাপিয়ার ঝঙ্কৃত মধুর স্বরতরঙ্গ আকাশ ভেদ করিয়া উঠিতেছিল এবং দক্ষিণ দিক্ হইতে বৃক্ষশাখা কাঁপাইয়া, পথের ধূলিরাশি উড়াইয়া হু হু শব্দে বাতাস বহিয়া আসিতেছিল| স্থান ও কাল উভয়ই সুন্দর|       দেবেন্দ্রবিজয়ের সেদিকে লক্ষ ছিল না-তিনি হত্যাকারীর অপেক্ষা করিতেছিলেন| এবং চারিদিকে তাঁহার সতর্কদৃষ্টি ঘন ঘন সঞ্চালিত হইতেছিল|
     চন্দ্র অস্ত গেল| ক্রমে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর উর্ত্তীণ হইল-তথাপি কেহই আসিল না|
     দেবেন্দ্রবিজয় হতাশ হইলেন; নিজের অনুচরবর্গকে বিদায় করিয়া দিলেন| এবং নিজে শীঘ্র বাড়ী পৌঁছিবার জন্য একটা গলিপথে প্রবেশ করিলেন| পথ একান্ত নির্জ্জন| চারিদিকে গভীর অন্ধকার-গলিপথে অন্ধকার গভীরতর; গগনস্পর্শী বৃক্ষগুলির নিম্নে অন্ধকার আরও গভীর হইয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে| সেই গভীর অন্ধকারবেষ্টিত সমুন্নশীর্ষ বৃক্ষসমূহের চতুষ্পার্শ্বে অসংখ্য খদ্যোৎ,হীরকখণ্ডবৎ জ্বলিতেছে-নিবিতেছে-নিবিয়া আবার জ্বলিতেছে| কেহ কোথায় নাই-কেবল অদূরে কতকগুলা শৃগাল ও কুকুর দল-বাঁধিয়া চীৎকার করিয়া ছুটাছুটি করিতেছে| দেবেন্দ্রবিজয় ক্রমশঃ অগ্রসর হইয়া চলিলেন| সহসা একটা পেচক কর্কশকণ্ঠে হাঁকিয়া তাঁহার মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেল| দেবেন্দ্রবিজয় সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করিলেন না, পূর্ব্ববৎ দ্রুতবেগে চলিতে লাগিলেন|
     এমন সময়ে কে তাঁহাকে পশ্চাদ্দিক হইতে বলিল, "আমার সঙ্গে চালাকি-এইবার মজাটা দেখ!"       দেবেন্দ্রবিজয় যেমন পশ্চাতে ফিরিয়াছেন, দেখিলেন একটা পাহারাওয়ালা উদ্যত সুদীর্ঘ বংশযষ্টিহস্তে দাঁড়াইয়া| দেবেন্দ্রবিজয় আত্মরক্ষারও সময় পাইলেন না-সেই উদ্যত যষ্টি সবেগে তাঁহার মস্তকের উপরে আসিয়া পড়িল|
     তিনি একান্ত নিঃসহায়ভাবে সেইখানে মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িলেন|

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
সংজ্ঞালাভে

      দেবেন্দ্রবিজয়ের যখন জ্ঞান হইল, তখন রাত্রি শেষ হইয়া আসিয়াছে| তিনি হস্তপদাদি-বিক্ষেপপূর্ব্বক চক্ষুরন্মীলন করিবামাত্র দুইটা শৃগাল তাঁহার মুখের নিকট হইতে সভয়ে দূরে পলাইয়া গেল| দেবেন্দ্রবিজয় ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিলেন| দারুণ আঘাতে তাঁহার মস্তকের একস্থানে কাটিয়া গিয়াছিল;এবং রক্তে তাঁহাদের পরিধেয় বস্ত্রাদি ভিজিয়া গিয়াছিল|
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, সারারাত তিনি অজ্ঞান অবস্থায় একান্ত নিঃসহায়ভাবে একা পথিমধ্যে পড়িয়া আছেন| সুযোগ বুঝিয়া শৃগাল কুক্কুর দন্তনখরসংযোগে যে এখনও তাঁহার দেহের মাংস কাটিয়া খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া দেয় নাই, সেজন্য তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করিলেন, এবং ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন|
     এদিকে রাত্রি শেষ হইয়া আসিয়াছে| ঊষার রক্তরাগ তখনও পূর্ব্বাকাশে অনুরঞ্জিত করে নাই| পাখীরা জাগিয়া, কুলায়ে বসিয়া কূজন আরম্ভ করিয়াছে| এবং ঊষার স্নিগ্ধবাতাস বহিয়া আসিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের ললাট স্পর্শ করিতেছে| তখনও দেবেন্দ্রবিজয়ের মাথা ঘুরিতেছে-শরীর একান্ত দুর্ব্বল| তাঁহার মনে পড়িল, তিনি মূর্চ্ছিত হইবার পূর্ব্বমুহূর্ত্তে একজন পাহারাওয়ালাকে উদ্যত বংশযষ্টি হস্তে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়াছিলেন| তাহারই উদ্যত বংশদণ্ড মস্তকে নিপতিত হওয়ায় তাঁহার যে এই দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে, তাহা নিশ্চিত; কিন্তু একজন পাহারাওয়ালা যে কেন তাঁহার প্রতি এমন সদ্ব্যবহার(?) করিল, ইহার মর্ম্মগ্রহণ তাঁহার অত্যন্ত কঠিন বোধ হইল| একবার ভাবিলেন, অর্থলোভে সামান্য বেতনভোগী পাহারাওয়ালাদিগের মধ্যে কেহ কেহ এরূপে অর্থসঞ্চয় করিতে পারে| দেবেন্দ্রবিজয় জামার পকেটে হাত দিলেন| তাঁহার যে কয়েকটি টাকা সঙ্গে ছিল, তাহা যথাস্থানেই রহিয়াছে; অঙ্গুলির দিকে দৃষ্টি করিলেন, হীরার আংটীটাও যথাস্থানে রহিয়াছে; এ পর্য্যন্ত কেহ তাহা খুলিয়া লয় নাই| বুক-পকেটে দুইখানি দশ টাকার নোট ছিল. দেবেন্দ্রবিজয় তাহাও টানিয়া বাহির করিয়া দেখিলেন| সেই নোট দুখানির সঙ্গে আর একখানি কাগজ দেখিতে পাইলেন; রাত্রিশেষের অস্পষ্টালোকে তিনি বুঝিতে পারিলেন না, সেখানি কি কাগজ! পকেট হইতে দিয়াশলাই-কাঠি বাহির করিয়া জ্বালিয়া দেখিলেন, একখানি পত্র| পত্রখানি খুব দ্রুতহস্তে উড্পেন্সিলে লেখা|
দেবেন্দ্রবিজয় দিয়াশলাই-কাঠি জ্বালিয়া জ্বালিয়া পত্রখানি পড়িয়া শেষ করিতে লাগিলেন;-
     "দেবেন্দ্রবিজয়!
     আজ তোমাকে একটু শিক্ষা দিলাম| যদি ইহাতেও তোমার আক্কেল না হয়, আবার একদিন আমার হাতে এমন শিক্ষা পাইবে, যাহা তুমি সারাজীবন ভুলিতে পারিবে না|
     তুমি এখন অজ্ঞান হইয়া আমার পায়ের কাছে লুটাইয়া পড়িয়াছ| মনে করিলে আমি এখনই তোমার লীলাখেলা একেবারে শেষ করিয়া দিতে পারি; তোমার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া কুক্কুর শৃগালের ভোজনেরও সুবন্দোবস্ত করিতে পারি| অনুগ্রহ করিয়া তাহা করিলাম না, এরূপ মনে করিও না-তোমার মত একটা নির্ব্বোধ গোয়েন্দাকে খুন করিয়া আমার মত ব্যক্তির লাভ কি?
     তুমি মনে করিয়াছিলে, সহজেই আমার হাতে হাতকড়ি লাগাইবে| কি স্পর্দ্ধা তোমার ! আমাকে তেমন নিরীহ ভালমানুষটি পাও নাই| তুমি বেড়াও ডালে ডালে, আমি বেড়াই পাতায় পাতায়-আমি তোমাকে আমার যোগ্য-প্রতিদ্বন্দ্বী বোধ করি না, তোমাকে আমি ক্ষুদ্র-কীটাণুকীট মনে করি| যখনই আমি মনে করিব, তখনই তোমাকে পদদলিত করিয়া মারিতে পারিব; কিন্তু সে ইচ্ছা আমার আদৌ নাই| তাহা না হইলে তোমার নাম এতদিন কোন্কালে এ জগতের জীবিত-মনুষ্যের তালিকা হইতে একেবারে মুছিয়া যাইত| তবে তুমি একান্তই বাড়াবাড়ি করিয়া তুলিয়াছিলে বলিয়া, তোমার মত রাস্কেলকে কিছু শিক্ষা দেওয়া গেল|
আমি ত পূর্ব্বেই বলিয়াছিলাম, আমার সহিত তুমি কিছুতেই পারিয়া উঠিবে না| তুমি আমাকে ধরিবার জন্য যে ফাঁদ পাতিয়াছিলে, তাহা আমি পূর্ব্বেই জানিতে পারিয়াছিলাম| আমার সঙ্গে "পাল্লা" দেওয়া তোমার মত অর্ব্বাচীনের কর্ম্ম নহে| তোমার মত নিরেট বোকা এ দুনিয়ায় দু'টী নাই| আমি ইচ্ছা করিয়া তোমার সম্মুখে গেলাম, তোমার সহিত কথা কহিলাম, তুমি আমাকে গোয়েন্দার চিহ্ণ দেখাইয়া তোমার সাহায্য করিবার লম্বা হুকুম জারী করিলে; কই, তুমি আমাকে ধরিতে পারিলে কি? আমি জানি, তোমার মত অকর্ম্মা নির্ব্বোধকে ভয় করিবার কোন কারণই নায়| তোমার দ্বারা আমার কোন অনিষ্ট হইতে পারে, যদি এরূপ আশঙ্কা কিছু থাকিত, তাহা হইলে আজই তোমার দেহ হইতে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িত| সাবধান, আর কখনও আমার কছে গোয়েন্দাগিরি ফলাইতে চেষ্টা করিয়ো না| এইবার যদি তুমি আমার কথা না শোন, তাহা হইলে নিশ্চয় জানিবে, তোমার আয়ুটা একান্ত সংক্ষিপ্ত হইয়া আসিয়াছে| সাবধান-সাবধান-সাবধান!
       সেই
     মেহেদী-বাগানের খুনী |"
"পুঃ-তুমি মজিদ খাঁকে অন্যায় সন্দেহ করিতেছ; তিনি একজন নিরীহ ভদ্রলোক| তোমার এ খুনী মোকদ্দমার সহিত তাঁহার কোন সংশ্রব নাই| এতকাল গোয়েন্দাগিরি করিতেছ, আর ভালমন্দ লোক দেখিয়া চিনিতে পার না?"
      পত্রপাঠে দেবেন্দ্রবিজয় চিন্তিত হইলেন| ভাবিতে লাগিলেন লোকটা খুব বাহাদুর বটে, আমাকে আজ খুব ঠকাইয়া গিয়াছে; পাহারাওয়ালার ছদ্মবেশে আমার অনুচর সাজিয়া আমার সহিত কথা কহিয়া গেল, আমার সমুদয় গুপ্ত অভিসন্ধি জানিয়া গেল-কি আশ্চর্য্য! আমি তাহাকে তিলমাত্র সন্দেহ করিতে পারিলাম না| এই মহাত্মা যদি পুলিস লাইনে কাজ করিতেন, বোধ করি, খুব একজন পাকা নামজাদা উচ্চ শ্রেণীর গোয়েন্দা হইতে পারিতেন; লোকটার অতুল বুদ্ধি দেখিতেছি| এখন লোকটাকে দেখিবার জন্য আমাকে প্রাণপণ করিতে হইবে| মজিদ কি এই পত্র লিখিয়াছে? অসম্ভব নয়-শেষের কয়েকটি পংক্তি পড়িয়া যেন তাহাই মনে হয়| মজিদ যে নির্দ্দোষ, নিরীহ ভদ্রলোক, হত্যাকারী কোন্ উদ্দেশ্যে ইহা লিখিবে? যাহাতে তাহার উপর আমার আর সন্দেহ না থাকে, সেজন্য সে এরূপ লিখিতে পারে| ইহাও একটা মন্দ চতুরতা নহে! দেখা যাক্ এই হত্যাকাণ্ডের সত্য আবিষ্কার করিবার জন্য আমাকে পৃথিবীর একপ্রান্ত হইতে অপরপ্রান্তে ছুটিতে হয়-এমন কি যমালয়ের দ্বার পর্য্যন্তও অগ্রসর হইতে হয়-আহাও আমি করিব| সে আমার হাত হইতে সহজে পরিত্রাণ পাইবে না-আমার নাম দেবেন্দ্রবিজয়! যেরূপ হউক, ইহার প্রতোশোধ গ্রহণ করিবই| যে কাজ দশ দিনে শেষ হইবার, এখন তাহা আমাকে দুই দিনে শেষ করিয়া ফেলিতে হইবে| দুই দিনের মধ্যে সেই নারীঘাতক পিশাচকে সমুচিত শিক্ষা দিতে হইবে|
       উৎসাহের সহিত দেবেন্দ্রবিজয় উঠিয়া দাঁড়াইলেন; দেখিলেন, প্রভাতোদয় হইয়াছে| নবীন সূর্য্যের কিরণলেখা আকাশের গায়ে অনেক দূর পর্য্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে| উচ্চবৃক্ষশীর্ষসমূহ হিরণ্য কররঞ্জিত| বৃক্ষশাখায় বসিয়া পাখীরা মধুর কাকলী বর্ষণ করিতেছে| বিরাট বিশ্ব যেন চারিদিক্ হইতে অশান্ত জনকোলহলে একেবারে জাগিয়া উঠিয়াছে| দেবেন্দ্রবিজয় গলির ভিতর হইতে অতি কষ্টে বাহির হইয়া বাটীতে ফিরিবার জন্য একখানি গাড়ীভাড়া করিলেন এবং তন্মধ্যে উঠিয়া বসিলেন| ঠিক সময়ে দূরবর্ত্তী ডোমপাড়া হইতে বাউলের সুরে কে গায়িয়া উঠিল;-
     "সামাল মাঝি এই পারাবারে|
     (ভারি বান্ ডেকেছে সাগরে)
     (এবার) তোমার দফা হলো রফা, প'ড়ে গেলে ফাঁপরে"|

 

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।