রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

 দ্বিতীয় খণ্ড

 চতুর্থ পরিচ্ছেদ
 সন্দেহ প্রবল হইল

     দেবেন্দ্রবিজয় কিছুদূর গিয়াছেন, এমন সময়ে দেখিলেন, হামিদা বিবি একখানি কাগজে অঞ্চলাগ্রে বাঁধিতে বাঁধিতে বাটীর বাহির হইল| দেখিয়া দেবেন্দ্রবিজয় মনে করিলেন, খুব সম্ভব, ইহা মজিদের পত্র| দেখিতে হইবে, পত্রখানি কোন্ উদ্দেশ্যে, কাহার নামে, কোথায় যাইতেছে|
     যেদিকে হামিদা বিবি যাইতেছিল, সেইদিক্কার পথে সহজে ঠাহর হয়; এমন জায়গায় অকটি টাকা ফেলিয়া দিয়া দেবেন্দ্রবিজয় কিছুদূরে গিয়া দাঁড়াইলেন| পথ চলিতে চলিতে হামিদা বিবি পথিমধ্যে সেই টাকাটিকে অভিভাবকশুন্য দেখিয়া তুলিয়া লইল| দেবেন্দ্রবিজয় দূর হইতে তাহা দেখিয়া হামিদা বিবির নিকটে ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, "কে রে মাগী তুই, দে আমার নোট দে-টাকা দে-আমার নোট আর টাকা হারিয়েছে|"
     বৃদ্ধা হামিদা বিবি থতমত খাইয়া বাহির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের হাতে দিয়া বলিল, "এই বাবু, তোমার টাকা|"
     দেবেন্দ্রবিজয় গলাবাজি করিয়া বলিলেন "নোট-আমার নোট কোথা? তুই মাগী নিয়েছিস্| চালাকি বটে! এখনই থানায় চালান্ দিব, জান না বটে?"
     হামিদা বিবিও তদপেক্ষা গলাবাজি করিতে জানে| আঘাতপ্রাপ্ত কাংস্যপাত্রের ন্যায় তাহার কণ্ঠ ঝন্ঝন্ করিয়া উঠিল; বলিল, "আ মর্ মিন্সে! মর্বার অর জায়গা পাও না-পথের মধ্যে বেইজ্জৎ করতে এসেছ| তোমার নোট কোথা, তা' আমি কি জানি?"
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আমি নিজের চোখে তোকে নোট তুলে নিতে দেখেছি, এখন, 'কি জানি' বল্লে চল্বে না| ঐ যে মাগী, এরই মধ্যে আঁচলে বেঁধে ফেলেছিস্| বেশী চালাকী কর্লে এখনই পাহারাওয়ালা ডেকে হাজির করব|"
     হামিদা বুড়ী রাগিয়া, চোখমুখ কপালে তুলিয়া, অস্থির হইয়া উঠিল, "আসুক না পাহারাওয়ালা-পাহারাওয়ালার নিকুচি করেছে! আমি সেই ভয়ে ম'রে গেলুম আর কি! আমি নোট নিয়েছি, এখানা কি তোমার নোট? চোখের মাথা একেবারে খেয়েছ? বলিয়া তাড়াতাড়ি আঁচল হইতে সেই পত্রখানা বাহির করিয়া ফেলিল|
"কই দেখি, কেমন নোট কি না, বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় সেই পত্রখানি হামিদা বিবির হাত হইতে টানিয়া লইলেন| পত্রখানি খামে বন্ধ না থাকায় দেবেন্দ্রবিজউের সুবিধা হইল| ভাজগুলি তাড়াতাড়ি খুলিয়া ফেলিয়া দেখিলেন, দুই-তিন ছত্রমাত্র লিপিবদ্ধ| খুলিতে-না-খুলিতে পাঠ শেষ হইয়া গেল| লিখিত ছিল:-
     "জোহেরা,
আমি অত্য্ন্ত বিপদ্গ্রস্ত| অদ্য সন্ধ্যার পর তোমাদের বাগানে অতি অবশ্য আমার সহিত গোপনে দেখ করিবে-কথা আছে|
     মজিদ"
     দেবেন্দ্রবিজয় পত্রখানি হামিদাকে ফেরৎ দিয়া বলিলেন, "না গো, কিছু মনে ক'রো না-আমারই ভুল হয়েছে-তুমি ভাল মানুষের মেয়ে-তুমি কেন নোট নিতে যাবে? টাকাটি পেয়েছিলে, তখনই আমাকে ফেরৎ দিলে-তা'কিছু মনে ক'রো না|"
হামিদা বিবি দেবেন্দ্রবিজয়ের মিষ্টবাক্যে একেবারে দ্রবীভূত হইয়া গেল| পত্রখানি আঁচলে বাঁধিতে বাঁধিতে বলিল, "না মনে আর কর্ব কি? টাকা খোয়া গেলে সকলেরই গায়ের জ্বালা হয়-গায়ের জ্বালায় দু'কথা যাকে তাকে ব'লেও ফেলে-সে কথা কি আর মনে করতে আছে, বাপু?" বলিয়া হামিদা বিবি নিজের পথ দেখিল|
     দেবেন্দ্রবিজয় চিন্তিতভাবে আপন মনে বলিলেন, "জোহেরার সহিত মজিদের কি কথা আছে? জোহেরার সহিত মজিদের বিবাহ হইবে, শুনিয়াছি| আজ সন্ধ্যার পর কোন্ অভিপ্রায়ে মজিদ গোপনে তাহার সহিত দেখা করিবে, তাহাও আমাকে দেখিতে হইবে; কিন্তু নিজের দ্বারা সে কাজ হইবে না-মজিদ আমাকে চিনে| শ্রীশের দ্বারা কাজটা যাহাতে ঠিক করিয়া লইতে পারি, সেই চেষ্টা দেখিতে হইবে|"

 

পঞ্চম পরিছেদ
বালক শ্রীশচন্দ্র

     যাঁহারা আমার "মনোরমা" উপন্যাস পাঠ করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে এই বুদ্ধিমান ছোক্‌রা শ্রীশচন্দ্রের পরিচয় দিতে হইবে না|
     অদ্যাপি শ্রীশ, সুযোগ্য ডিটেক্‌টিভ দেবেন্দ্রবিজয়ের নিকটে প্রতিপালিত হইতেছে| এখন সে আরও কাজের লোক হইয়া উঠিয়াছে| ঝুনা নারিকেলের ন্যায় দেবেন্দ্রবিজয় বাহিরে যতই কঠিন হউন, কিন্তু তাঁহার হৃদয় মায়া-মমতায় পূর্ণ ছিল| তাঁহার পরম নারী-শত্রু জুমেলিয়ার মৃত্যু-সময়েও আমরা একদিন চক্ষুর্দ্বয় সজল দেখিয়াছিলাম| তিনি শ্রীশকে অত্যন্ত স্নেহ করেন| বালক শ্রীশও তাঁহার একান্ত অনুরক্ত| দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে যখন যাহা আদেশ করেন, শ্রীশচন্দ্র তাহা সুচারূপে সম্পন্ন না করিয়া ছাড়ে না|
     শ্রীশের বয়স এখন পনের বৎসর| অতি শৈশবে সে মাতৃ-হীন হইয়াছে| মাতাপিতার কথা এখন আর তাহার মনেই পড়ে না| নিজের সম্বন্ধে যখন তাহার কোন চিন্তা উপস্থিত হয়, মনে হয়, সে আকাশ হইতে পড়িয়াছে, নয় মাটি ভেদ করিয়া উঠিয়াছে| তাহার পিতামাতা এমন কিছুই রাখিয়া যায় নাই-কোন চিহ্ণ নাই-যাহাতে তাহাদের কথা এই দীন বালকের মনে একবার উদয় হইতে পারে|
     শৈশবকাল হইতে এই সংসারের অনেক দুঃখ-কষ্টের সহিত যুদ্ধ করিয়া নিরাশ্রয় বালক শ্রীশচন্দ্রের বুদ্ধিটা অত্যন্ত প্রখরতা লাভ করিয়াছিল| দেবেন্দ্রবিজয়ের আদেশমত সে কখন কোন সন্দেহজনক গাড়ীর পশ্চাতে ছুটিত, প্রয়োজনীয় খবরাখবর লইয়া আসিত, এইরূপ আরও অনেক কাজ শ্রীশ এমন আশর্য্যরূপে, অতি সত্বরে এবং অতি সহজে সুসম্পন্ন করিত যে, অনেক সময়ে দেবেন্দ্রবিজয়কেও বিস্ময়াপন্ন করিয়া তুলিত| দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন, কালে শ্রীশ একজন পাকা, নামজাদা গোয়েন্দা হইয়া দাঁড়াইবে| শ্রীশ যাহাতে কিছু লেখাপড়া শিখিতে পারে, তিনি এমন বন্দোবস্ত করিয়াও দিয়াছিলেন| পাছে শ্রীশ, বাবু বনিয়া যায় মনে করিয়া, কখনও তিনি তাহাকে ভাল কাপড়. জামা কি জুতা কিছুই পরিতে দিতেন না-সেদিকে তাঁহার বিশেষ দৃষ্টি ছিল| সকল সময়েই শ্রীশকে একখানি মোটা, খাটো কাপড় পরিয়া থাকিতে দেখা যাইত; অধিকন্তু একখানি ছোট লাল গাত্রমার্জ্জনী তাহার স্কন্ধে সতত শোভা পাইত| দেবেন্দ্রবিজয় মনে করিয়াছিলেন, শ্রীশের এখনকার মনের ভাব ঠিক রাখিতে পারিলে, কালে সে নিশ্চয়ই উন্নতি করিতে পারিবে|
     অতি দ্রুতপদে সন্ধ্যার পূর্ব্বেই দেবেন্দ্রবিজয় ঘর্ম্মাক্ত কলেবরে বাটী ফিরিলেন| সারাদিন পরিশ্রমের পর তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন| গৃহিণী রেবতীসুন্দরী তাড়াতাড়ি আসিয়া, পাখা লইয়া ব্যজন করিতে বসিলেন| বলিলেন, "সেই কখন বাহির হইয়াছিলে, আর এতক্ষণের পর সময় হইল?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "কাজ ছিল"|
     রে| সারাদিনই কি কাজ?
     দে| আবার বাহির হইতে হইবে|
     রে| আজ আর নয়, বোধ হয়|
     দে| এখনই|
     রে| তবে না আসিলেই হইত|
     দে| সারাদিন ঘুরিয়া ঘুরিয়া অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলাম, তাই ঐ সুন্দর মুখখানি একবার দেখিতে আসিলাম| মনে আবার নূতন বল পাইলাম-যে কাজ বাকী আছে, তাহা এখন অনায়াসে শেষ করিতে পারিব|
     রে| পরিহাস কেন?
     দে| পরিহাস নয়-খুব সত্যকথা|
     রে| খুব মিথ্যাকথা|
     দে| না বিশ্বাস করিলে নাচার|
     রে| আজ আর কোনখানে গিয়ে কাজ নাই|
     দে| কেন?
     রে| কেন আবার কি?
     দে| না গেলে নয়| কাজ আছে|
     রে| তবে আসা কেন?
     দে| তা ত পূর্ব্বেই প্রকাশ করিয়াছি| এখন বল দেখি, শ্রীশ ছোঁড়াটা কোথা?
     রে| কেন? তাকে আবার কেন?
     দে| প্রয়োজন আছে|
     রে| নীচের ঘরে বোধ হয় ব'সে আছে|
     দেবেন্দ্রবিজয় উচ্চকণ্ঠে 'শ্রীশ' বলিয়া একবার হাঁক দিতেই, একেবারে দ্বিতলে-তাঁহার সম্মুখে শ্রীশচন্দ্রের আবির্ভাব|
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "কি খবর ?"
     শ্রীশ বলিল, "আপনার একখানা চিঠি এসেছে|"
     দে| কখন?
     শ্রীশ| এই কতক্ষণ!
     দে| কোথায় সে চিঠি?
     শ্রীশ| শচীদাদার কাছে|
     দে| তাহাকে এখন ডাক| আসিবার সময়ে যেন চিঠীখানা সঙ্গে লইয়া ফিরিয়া আসিল| শচীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রবিজয়ের ভাগিনেয়|   

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পত্র

     দেবেন্দ্রবিজয় শচীন্দ্রের নিকট হইতে পত্রখানি লইয়া, খুলিয়া ফেলিয়া তখনই পড়িতে আরম্ভ করিলেন|
 "দেবেন্দ্রবিজয়!
     এখনও তুমি তোমার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিলে না? ক্রমেই তুমি বাড়াবাড়ি আরম্ভ করিলে| তোমার নিতান্তই মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছে, দেখিতেছি|
     মাথায় দুই এক ঘা লাঠী না পড়িলে, তুমি কিছুতেই সোজা হইতেছ না| কেন বাপু, আর মিছিমিছি জ্বালাও? তুমি যে আমাকে কখনও ধরিতে পারিবে, ইহা মনেও স্থান দিয়ো না| আমি তোমার মত অনেক গোয়েন্দা দেখিয়াছি, তোমার চোখের সাম্নে হত্যাকারী ঘুরিয়া বেড়াইতেছে-আর তুমি তাহাকে দেখিয়াও দেখিতে পাইতেছ না?
     এতদিন গোয়েন্দাগিরি করিলে, সাধারণে সুনাম হইয়াছে; আর আমার কাছে তুমি একেবারে বোকা বনিয়া গেলে? কি লজ্জার কথা! এই তুমি পাকা ডিটেকটিভ্? এই তোমার নাম-ডাক? ছি-ছি-ধিক্-ধিক্? সত্যকথা বলিতে কি আমি তোমার মত নিরেট বোকা গোয়েন্দাকে গ্রাহ্যই করি না| আমি তোমাকে বার বার সাবধান করিয়া দিতেছি, আর বেশীদূর অগ্রসর হইয়ো না-একদিন ভারী বিপদে পড়িবে-এমন বিপদে পড়িবে, একদম্ এ জগৎ ছাড়িয়া যাইতে হইবে প্রিয়তম স্ত্রীর বৈধব্য যদি তোমার একান্ত প্রার্থনীয় হয়-তবে আমার উপদেশে কর্ণপাত করিবে না|
     আমি তোমাকে একটা সৎপরামর্শ দিতে চাই-শুনিবে কি? তুমি যদি এই কেস্টা ছাড়িয়া দাও, এরূপে আমাকে আর বিরক্ত না কর-আমি তোমাকে কিছু টাকা দিতে পারি, হাজার টাকা-কি বল, মন উঠিবে? যদি রাজী হও, কাল ঠিক রাত নয়টার সময়ে গোলদীঘীর ভিতরে যেয়ো| আমি সেইখানে তোমার সঙ্গে দেখা করিব| আর যদি তুমি আমাকে ধরিবার জন্য লোক বন্দোবস্ত ক'রে রাখ-আমার দেখা পাইবে না| কেবল দেখা পাইবে না নহে, তাহা হইলে বুঝিবে, তোমার মৃত্যু সন্নিকটে| আমি আর তখন তোমাকে কিছুতেই ক্ষমা করিব না| আমি এখনও তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছি, আমার কাছে গোয়েন্দাগিরি ফলাইতে চেষ্টা করিয়ো না|

                           সেই
                       মেহেদী-বাগানের খুনী|"
     এ কি ভয়ানক পত্র! শুনিয়া রেবতীর আপাদমস্তক শিহরিয়া উঠিল| শচীন্দ্র চিন্তিত হইল| বুঝিতে পারিল, তাহার মাতুল মহাশয় এবার একজন শক্ত লোকের পাল্লায় পড়িয়াছেন| শ্রীশচন্দ্র খুব মনোযোগের সহিত পত্রের আদ্যোপান্ত শুনিয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমানের ন্যায় মস্তকান্দোলন করিয়া বলিল, "হাঁ, দেখা যাবে!"
     শচীন্দ্র বলিল, "আমিও তবে আপনার সহিত যোগ দিব না কি?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "না, শচী, তুমি এই সেদিন অসুখ হইতে উঠিয়াছ; তোমার শরীর এখনও ভাল রকম সারে নাই| তাহা না হইলেও তোমাকে দরকার নাই; আমি নিজেই সব ঠিক করে ফেলিব|"
     শচীন্দ্র বলিল, "পত্রখানা দেখিয়া বুঝিতে পারা যাইতেছে, লোকটা বড় সহজ নহে; তাই বলিতেছিলাম|"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "লোকটা সহজ না হইতে পারে; কিন্তু আমিও তাহার অপেক্ষা বড় সহজ নহি| লোকটা আমাকে ঠিক জানে না; তাহা হইলে কি সে আমাকে এমন পত্র লিখিতে সাহস করে? নারী-পিশাচী জুমেলিয়ার ঘটনা তোমার মনে পড়ে?"
     শচীন্দ্র সহাস্যে বলিলেন "খুব! জুমেলিয়ার কথা এ জীবনে ভুলিবার নহে|"
     জুমেলিয়ার নামে রেবতীর অনেক কথা মনে পড়িয়া গেল| পিশাচী তাঁহাকে কত কষ্ট না দিয়াছে-কি ভয়ানক বিপদেই না ফেলিয়াছে-সমুদয় মনে পড়িয়া গেল! রেবতী শিহরিয়া কহিলেন, "সে কি মেয়ে? পুরুষের বাবা!"
     শ্রীশ বলিল, "ডাকিনী - ডাকিনী-মাগীটা আমাকে ত আর একটু হ'লেই গঙ্গায় ডুবিয়ে মারত|"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তাহার কথা ছাড়িয়া দাও, পিশাচী আমার শিক্ষাগুরু অরিন্দম বাবুকে পর্য্যন্ত নাস্তানাবুদ করিয়া তুলিয়াছিল| (শচীন্দ্রের প্রতি) অরিন্দম বাবুকে এখিতে গিয়াছিলে?"
     শচীন্দ্র বলিল, "হাঁ, এই কতক্ষণ হইল, আমি সেখান হইতে ফিরিতেছি|"
     দে| তিনি কেমন আছেন?
     শ| বড় ভাল নহে| বোধ হয়, তিনি এ যাত্রা রক্ষা পাইবেন না| একেবারে স্বাস্থ্যভঙ্গ হইয়াছে| ডাক্তারেরাও চিন্তিত|
     দে| এই কেস্টা হাতে লইয়া অবধি আমি কয়দিন একবারও দেখিতে যাইতে পারি নাই-সময় পাই নাই| আমার কথা তাঁহাকে বলিয়াছ যে, আমি একটা খুনের মাম্লা লইয়া বড়ই বিব্রত হইয়া পড়িয়াছি, সেজন্য কয়েকদিন যাইতে পারি নাই?
     শ| বলিয়াছিলাম| এই খুনের সম্বন্ধে যাহা কিছু জানিতাম, তাহাও আমি তাঁহাকে সমুদয় বলিয়াছি|
     দে| শুনিয়া তিনি কি বলিলেন?
     শ| আপনাকে একবার যাইতে বলিয়াছেন|
     দে| কিছু মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন?
     শ| আপনার নাম করিয়া বলিলেন যে, অনুসন্ধানের ঠিক পথ এখনও অবলম্বন করিতে পারেন নাই|
     দে| তা' হইবে| আজিকার কথা শুনিলে তিনি কখনই এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিতে পারিতেন না| ভাল, দুই-একদিনের মধ্যে আমি একবার তাঁহার সহিত দেখা করিব|
     রেবতী বলিলেন, "মা কালী করুন, দাদামশাই যেন শীঘ্র ভাল হইয়া উঠেন| তাঁহার মত সদাশয় পরোপকারী লোক থাকিলে এ জগতের অনেক উপকার আছে| আমাদের জন্য তিনি অনেক করিয়াছেন; তাঁহার কথা চিরকাল মনে থাকিবে| আমি আর একদিন তাঁহাকে দেখিতে যাইব|"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "চল শ্রীশ, তোমাকে একবার আমার সঙ্গে যাইতে হইবে| আর বিলম্ব করিলে চলিবে না|"
     শ্রীশ বলিল, "কোথায়? আমাকে কি করিতে হইবে?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "যাহা বলিব, তাহই করিতে হইবে| কোন একটা বাগানে তোমাকে লুকাইয়া থাকিতে হইবে| সেখানে দুইজন লোককে পরে দেখিতে পাইবে, একজন স্ত্রীলোক, একজন পুরুষ| তাহাদের কি কথাবার্ত্তা হয়, সব শুনিয়া আসিবে- খুব মন দিয়া শুনিবে, যেন একটি কথাও ভুল বা ছাড় না হয়|"
     রেবতী বলিলেন, "আবার এখনই যাইতে হইবে? তবে একটু জল খেয়ে যাও|"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এখন জল খাবার সময় নয়, ঠিক সময়ে পৌঁছাইতে না পারিলে সব মাটি হইয়া যাইবে|"
     রেবতী কহিলেন, "একটু মিষ্টি মুখে দিয়া এক গ্লাস জল খাইতে আর কত সময়ে যাইবে?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এতক্ষণ দিলে কথায় কথায় খাইয়া ফেলিতে পারিতাম-এখন আর নয়| এস শ্রীশ, আর বিলম্ব নয়|" বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় সত্বর উঠিয়া ঘরের বাহির হইয়া পড়িলেন| শ্রীশচন্দ্র তাঁহার অনুসরণ করিল| শচীন্দ্রও সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাহির হইয়া গেল|
     রেবতী একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া গৃহকার্য্যে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করিলেন|

সপ্তম পরিচ্ছেদ
জোহেরা

    জোহেরা সুন্দরী| অসীম রূপ-লাবণ্য তাহার সর্ব্বাঙ্গে ঝল্মল্ করিতেছিল| যৌবনের প্রথম বিকাশে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটা গভীর প্রগাঢ় প্রশান্তভাবে ও সৌন্দর্য্যে জোহেরা যেন ভরিয়া উঠিয়াছিল; কিন্তু উদ্দাম যৌবনের বসন্ত-চাঞ্চল্যে তাহা এখনও কূলপ্লাবী হয় নাই| মাধুর্য্যে যাহা কিছু-সকলই যেন সেই সুকুমার অবয়বের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে স্ফুটতররূপে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছে-বাহিরের চারিদিকে যেন তাহারই কেবল একটা উজ্জ্বল আভা প্রতিক্ষণে ঠিক্রিয়া পড়িতেছে| যেন তাহার অন্তরাকাশের দূর দিগন্ত হইতে মৃদু মলয়ানিল বহিয়া বিশ্বপৃথিবীকে কি এক মোহন বাসন্তীশ্রীতে ডুবাইয়া দিয়াছে| তাহার সেই কুঞ্চিত-কৃষ্ণ-কুন্তলাবলীপরিবেষ্টিত সুন্দর ঢল ঢল মুখখানি নবীন সূর্য্যাগ্রে বিকাশোম্মুখ পদ্মের সৌন্দর্য্যে, সৌকুমার্য্যে, ভাবে ভঙ্গিতে অতি সুন্দর! দেখিলে যেন দর্শন-বুভুক্ষা আরও বাড়িয়া উঠে-যেন তৎপ্রতি চিত্ত আরও আকৃষ্ট হইয়া পড়ে| উন্নত পরিপুষ্ট দেহ - সেই দেহের তেমনই সুন্দর, বসন্তসমীরসঞ্চালিত, নবপুষ্পিত ব্রততীর মন্দান্দোলনতুল্য সেই দেহের তেমনই কি সুন্দর ললিত কোমল মনোমোহন ভঙ্গী| একবার দেখিলে আর ভুলিতে পারা যয় না| তিমির-তরঙ্গের ন্যায় কেশদাম, অপ্রশস্ত নির্ম্মল ললাট, তন্নিম্নে তুলিকাচিত্রিতবৎ বিচিত্র ভ্রূযুগ, তন্নিম্নে নীলেন্দীবরতুল্য চক্ষু, তন্মধ্যে মধুময় চঞ্চল দৃষ্টি,পদ্মারক্ত অধরপুটে বিমল হাসির লীলা-একবার দেখিলে তাহা হৃদয়ের মর্ম্মকোষে গাঁথিয়া যায়|
     জোহেরা যখন বড় বালিকা, তখন তাহার পিতামাতার মৃত্যু হয়| তাঁহাদিগের কথা স্বপ্নের মত এখনও এক-একবার জোহেরার মনে পড়ে| জোহেরার পিতার নাম নাজিব-উদ্দীন চৌধুরী| তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত, অতি সদাশয় জমিদার ছিলেন| তাঁহার জমিদারীর আয় বাৎসরিক প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা| ইহার উত্তরাধিকারিণী এক্ষণে একমাত্র জোহেরা| নাজিব-উদ্দীন মৃত্যুপূর্ব্বে মুন্সী জোহিরুদ্দীনকে তাঁহার সমগ্র বিষয়ৈশ্বর্য্যের অছি নিযুক্ত করিয়া যান্| এবং যাহাতে পরে তাঁহার একমাত্র কন্যা, সুশিক্ষিতা এবং সুপাত্রে পরিণীতা হয়, সেজন্য তাঁহার প্রধান নায়েব জোহিরুদ্দীনের উপরে তাঁহার একটি বিশেষ আদেশ ছিল|
মুন্সী জোহিরুদ্দীন, নাজিব-উদ্দীনের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন| নাজিবউদ্দীন সকল রকমে তাঁহাকে খুব বিশ্বাস করিতেন| এমন কি সকল বিষয়ে তাঁহাকে নিজের দক্ষিণহস্ত স্বরূপ মনে করিতেন| তিনি অনেক বিবেচনা করিয়া তাঁহার নিজের জমিদারীতে তাঁহাকে নায়েবের পদ দিয়াছিলেন| তখন তাঁহার বার্ষিক আয় চল্লিশ হাজার টাকা ছিল, কিন্তু জোহিরুদ্দীনের নৈপুণ্যে তাহা অচিরকাল মধ্যে পঞ্চাশ সহস্রে পরিণত হইল| জোহিরুদ্দীনেরও মাসিক দেড়শত টাকা বেতন আড়াইশতে পরিণত হইল| মৃত্যুপূর্ব্বে নাজিব-উদ্দীন যখন তাঁহাকে সমগ্র বিষয়ের অছি নিযুক্ত করিয়া গেলেন, তখন তিনি তাঁহার বেতন তিন শত টাকা নির্দ্ধারণ করিয়া দিয়াছিলেন|
     জোহিরুদ্দীন মনে করিলে জোহেরার অনেক সম্পত্তি আত্মসাৎ করিতে পারিতেন; কিন্তু তিনি তাহা করেন নাই| একান্ত বিশ্বস্তভাবে তিনি নিজের সেই মৃত বন্ধু বা প্রভুর আদেশ পালন এবং নিজের কর্ত্তব্যসাধন করিয়া আসিতেছিলেন| তিনি প্রভু-কন্যাকে সুশিক্ষিতা করিয়া তুলিলেন; কিন্তু অদ্যাপি তাহাকে সুপাত্রে পরিণীতা করিতে পারেন নাই| পাত্রীকে বিষয়ৈশ্বর্য্যশালিনী দেখিয়া পাত্র অনেক জুটিল বটে; কিন্তু কেহই সে সৌভাগ্যলাভে কৃতকার্য্য হইল না| জোহেরা বিবাহে একান্ত নারাজ-শিক্ষার গুণে সে নিজে অনেক পরিমাণে স্বাধীন প্রকৃতির হইয়া উঠিয়াছিল| কেবল তাহাই নহে, মজিদ খাঁ ইতঃপূর্ব্বে তাহার চিত্তহরণ করিয়াছিলেন| মজিদের সহিত জোহেরার বিবাহ হয়, এ ইচ্ছা মুন্সী জোহিরুদ্দীনের আদৌ ছিল না; তিনি জোহেরার জন্য মনিরুদ্দীনকেই সুপাত্র স্থির করিয়াছিলেন; কিন্তু মনিরুদ্দীনের চরিত্রহীনতার জন্য জোহেরা তাঁহাকে আন্তরিক ঘৃণা করিত; সুতরাং বিবাহ স্থগিত রহিল| মজিদ ভিন্ন জোহেরা আর কাহাকেও বিবাহ করিবে না বলিয়া দৃঢ় পণ করিয়া বসিল; কিন্তু মৃত বন্ধুর আদেশ স্মরণ করিয়া মুন্সী জোহিরুদ্দীন কিছুতেই তাহাতে মত দিতে পারিলেন না-অভিভাবকের বিনানুমতিতে জোহেরাও বিবাহ করিতে পারিল না| এখনও সে নাবালিকা-অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া স্বেচ্ছায় কোন কাজই করিতে পারে না; সুতরাং বিবাহ আপাততঃ স্থগিত রহিল| আইনের নির্দিষ্ট বয়সে যখন সে সাবালিকা হইবে, তখন আর তাহাকে অভিভাবকের মুখপ্রেক্ষী থাকিতে হইবে না; তখন সে নিজেি মজিদকে বিবাহ করিতে পারিবে মনে করিয়া, জোহেরা দিনাতিবাহিত করিতে লাগিল| সত্যকথা বলিতে কি, ইহাতে জোহেরা মনে মনে জোহিরুদ্দীনের উপরে অত্যন্ত উষ্ণ হইয়া উঠিল| জোহিরুদ্দীনও মেয়েটাকে এইরূপ অবাধ্য দেখিয়া মনে মনে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন| জোহিরুদ্দীনের ইহাতে বিশেষ কোন দোষ দেখি না, তাঁহার বিশ্বাস, পাত্র সঙ্গতিসম্পন্ন হইলেই সুপাত্র| বিশেষতঃ মনিরুদ্দীন জমিদার-পুত্র; এক্ষণে তিনি নিজে একজন জমিদার, সমৃদ্ধির ইয়ত্তা হয় না| অতএব জোহিরুদ্দীনের মতে তিনি একটি সুপাত্র| তাঁহার সহিত জোহেরার বিবাহ হইলে তাঁহার পরলোকগত প্রভুর আত্মা নিশয়ই সুখানুভব করিবেন, ইহা জোহিরুদ্দীনের স্থির বিশ্বাস| পূর্ব্বেই বলিয়াছি, নিজের সঙ্কল্প কার্য্যে পরিণত করিতে না পারিয়া জোহিরুদ্দীন জোহেরার ব্যবহারে মনে মনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন; কিন্তু মজিদকে তাঁহার সঙ্কল্পসিদ্ধির অন্তরায় হইতে দেখিতে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিলেন| মজিদকে তাঁহাদিগের বাড়ীতে আসিতে নিষেধ করিয়া দিলেন| এবং জোহেরাকেও নিষেধ করিয়া দিলেন, সে যেন মজিদের সাক্ষাতে বাহির না হয় ও তাঁহার সহিত কথাও না কহে|
     কাজে তাহার কিছুই হয় না| প্রণয় বাধা মানে না-যেখানে বাধা, সেখানে প্রণয়ের চাতুর্য্য প্রকাশ পায়; এবং সেখানে প্রণয় প্রবঞ্চনা করিতে জানে| প্রায়ই জোহেরা ও মজিদ রাত্রে গোপনে গৃহসংলগ্ন উদ্যান মধ্যে মিলিত হইতেন| পরষ্পর পত্র লেখালেখিও চলিত| তাহাতে তাঁহাদের যেন আরও সুখবোধ হইত| মুন্সী জোহিরুদ্দীন আপনার কাজ লইয়া ব্যস্ত, ইহার বিন্দু-বিসর্গ জানিতে পারিতেন না| তিনি মনে করিয়াছিলেন, জোহেরার সম্মুখ হইতে মজিদকে কিছুদিনের জন্য সরাইয়া ফেলিতে পারিলে, জোহেরার মন পরিবর্ত্তিত হইতে পারে; কিন্তু সেটি তাঁহার মস্ত ভ্রম| বাধাপ্রাপ্ত প্রণয় ভাদ্রের রুদ্ধ নদীর ন্যায় একান্ত খরপ্রবাহ ও কূলপ্লাবী হইয়া উঠে|
     মুন্সী জোহিরুদ্দীন লোকটা বরাবরই মিতব্যয়ী| তিনি যৌবনকাল হইতে এই পঞ্চাশোর্দ্ধ বয়ঃক্রম পর্য্যন্ত নায়েবগিরি করিয়া নিজেও অনেক সঙ্গতিসম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছেন| কলিকাতার মধ্যে পনের ষোলখানি বড় বড় ভাড়াটীয়া বাড়ী তৈয়ারী করিয়াছেন; জায়গা-জমিও কিছু কিছু করিয়াছেন; বেতন ছাড়াও এদিকেও তাঁহার মাসে অন্যূন তিনশত টাকার আয় হইয়া থাকে| সংসারে ব্যয় কিছুই ছিল না-প্রথম যৌবনে একবার বিবাহ করিয়াছিলেন, সন্তানাদি হয় নাই; তাঁহার চল্লিশ বৎসর বয়সে স্ত্রী-বিয়োগ হয়| আট-দশ বৎসর পরে আবার একটী বিবাহ করেন| দুর্ভাগ্যবশতঃ এবারকার স্ত্রীটি একান্ত অমিতব্যয়িনী ছিলেন; কিন্তু সেজন্য জোহিরুদ্দীনের বিশেষ কিছু আর্থিক ক্ষতি হয় নাই-কিছুদিন পরে সেই স্ত্রীটি হঠাৎ তাঁহার স্কন্ধ পরিত্যাগ করিয়াছেন| তাঁহারই নাম সৃজান|

অষ্টম পরিছেদ
উদ্যানে

     মনিরুদ্দীন সৃজান বিবিকে লইয়া নিরুদ্দেশ হইয়াছেন; কিছুদিন পরে যখন জোহিরুদ্দীন ইহা জানিতে পারিলেন; তখন তাঁহার সুর একেবারে বদ্লাইয়া গেল| এ সময়ে যদি জোহেরা তাহার অভিভাবকের নিকটে মজিদকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব উপস্থিত করিতে পারিত, তিনি নিশ্চয়ই জোহেরাকে নিজের অপেক্ষা বুদ্ধিমতী জ্ঞান করিতেন-আর অন্যমত করিতে পারিতেন না|
     এই বৃদ্ধ বয়সে অপমানে, ঘৃণায় মুন্সী জোহিরুদ্দীনের মাথটা যেন কাটা গেল; তিনি একেবারে মুমূর্ষুর মত হইয়া পড়িলেন| তিনি আর বাটীর বাহির হইতেন না| কাহারও সহিত দেখা করিতেন না| তিনি সৃজান বিবিকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন; যাহাকে একদণ্ড চোখের অন্তরাল করিতে প্রাণ চাহিত না, সে আজ অই বিশ্বাসঘাতকতা করিল! আর মনিরুদ্দীন যে তাঁহার বুকে এমনভাবে বিষমাখা বাঁকা ছুরিকা বসাইবে, তাহাও তিনি একবার স্বপ্নেও ভাবেন নাই|
     জোহেরাও ইহাতে অত্যন্ত অপমান বোধ করিল| যদিও সৃজান তাহার কোন আত্মীয়া নহে; তথাপি সে তাহার অভিভাবকের বিবাহিতা পত্নী এবং সকলের এক বাটীতে বাস| পাছে কাহারও সহিত দেখা হইলে কেহ এই সকল কথা উত্থাপন করে, এই ভয়ে জোহেরাও আর বাড়ীর বাহির হইত না; এবং কাহারও সহিত দেখা করিত না| কেবল মজিদকে কয়েকবার আসিবার জন্য গোপনে পত্র লিখিয়াছিল| পত্রত্তোরে একটা-না-একটা অজুহাত দেখাইয়া মজিদ নিশ্চিত হইলেন; আসিতে পারিলেন না| জোহেরা মজিদের এরূপ ভাব বৈলক্ষণ্যের কারণ বুঝিতে না পারিয়া, অত্যন্ত চিন্তিত ও বিমর্ষ হইল| যখন জোহেরার মনের এইরূপ অবস্থা, এমন সময়ে মজিদের প্রেরিত সেই পত্র তাহার হস্তগত হইল| এ পত্রে মজিদ তাহাকে রাত্রে গোপনে তাঁহার সহিত দেখা করিবার জন্য অনুরোধ করিতেছেন| তিনি নিজেই আজ দেখা করিতে আসিতেছেন| ইহার অর্থ কি? জোহেরা পত্র পড়িয়া আরও চিন্তিত হইল| এবং মজিদের সহিত দেখা করিবার জন্য তাহার মন নিরতিশ্রয় ব্যগ্র হইয়া উঠিল|
     বাটীর পশ্চাদ্ভাগে প্রকাণ্ড উদ্যান| জোহেরা যথাসময়ে সেই উদ্যানে প্রবেশ করিল| কিছুদূর গিয়া দেখিল, পুষ্করিণীর নিকটে লতামণ্ডপ পার্শ্বে মজিদ খাঁ দাঁড়াইয়া| পরে পরষ্পর সাক্ষাৎ হইল; এবং নির্জ্জন স্থান পাইয়া নির্ভয়ে স্বাভাবিক স্বরে কথোপকথন আরম্ভ করিয়া দিলেন| তাঁহারা ঘুণাক্ষরে জানিতে পারিলেন না, বাহিরে অন্তরালে দাঁড়াইয়া দেবেন্দ্রবিজয়-প্রেরিত শ্রীশচন্দ্র নামক একটি চতুর বালক অত্যন্ত মনোযোগের সহিত তাঁহাদিগের কথোপকথন শ্রবণ করিতেছে|
     যখন মজিদ এখানে আসিতেছিলেন, পথে দেবেন্দ্রবিজয় শ্রীশকে দূর হইতে তাঁহাকে দেখাইয়া দিয়াছিলেন| শ্রীশচন্দ্র অলক্ষ্যে মজিদের অনুসরণে বাগানের মধ্যে আসিয়া যথাস্থানে লুক্কায়িতভাবে অপেক্ষা করিতেছিল|
রাত্রি প্রহরাতীত| চন্দ্রোদয়ে চারিদিকে জ্যোৎস্না ফুটিয়াছে| বড় অনুজ্জ্বল জ্যোৎস্না; কিন্তু তাহা বিশ্বজগতের স্বপ্নময় আবরণের মত বড় মধুর! মলিন জ্যোৎস্নামণ্ডিত আকাশের স্থানে স্থানে তরল মেঘখণ্ড রহিয়াছে-ম্রিয়মাণ চন্দ্রের ম্লান কিরণে শুভ্রকায় মেঘ-সন্ততিগুলি স্নান করিতেছে| বিমলিনজ্যোৎস্নাব-গুণ্ঠনমণ্ডিতা নিসর্গসুন্দরী মৃদুহাস্যে উর্দ্ধনেত্রে সেইদিকে চাহিয়া রহিয়াছে| ঝিল্লিরবে সেই বিজন উদ্যানভূমি মুখরিত| অগণ্য-তরুলতা-ফলপুষ্পবিশোভিত উদ্যানভূমি ছায়ালোক-চিত্রিত হইয়া সুচিত্রকর-অঙ্কিত একখানি উৎকৃষ্ট চিত্রের ন্যায় প্রতীয়মান হইতেছে| সম্মুখে স্বচ্ছ দর্পণের ন্যায় নীলজলপূর্ণ প্রকাণ্ড দীর্ঘিকা অনেকদূর পর্য্যন্ত বিস্তৃত রহিয়াছে; এবং তাহার উর্ম্মি চঞ্চল বক্ষে চন্দ্রকর-লেখা খেলা করিতেছে| যে লতাবিতানে বসিয়া মজিদ ও জোহেরা কথোপকথন করিতেছিল, সেখানে পত্রান্তরাল ভেদ করিয়া চন্দ্রকিরণ প্রবেশ করায় ঈষদালোক সঞ্চিত হইয়াছিল| সেই ঈষদালোকে শ্রীশ বহির হইতেও লতামণ্ডপমধ্যবর্ত্তী দুইজনকে দেখিতে পাইতেছিল| কিরূপ ভাবে হাত-মুখ নাড়িয়া, কোন্ কথা কিরূপ ভঙ্গীতে তাঁহারা বলিতেছিল, শ্রীশ তাহাও নিবিষ্টচিত্তে লক্ষ্য করিতেছিল| ইতিপূর্ব্বে লতামণ্ডপের বাহিরে দাঁড়াইয়া তাঁহাদিগের কি কথাবার্ত্তা হইয়াছিল, তাহা শ্রীশ শুনিবার জন্য সুবিধা করিতে পারে নাই| লতামণ্ডপমধ্যে প্রবেশ করিয়া তদুভয়ে যাহা বলাবলি করিতে লাগিলেন, শ্রীশ তাহার প্রত্যেক শব্দটি যেন গলাধঃকরণ করিতে লাগিল|
লতামণ্ডপ মধ্যস্থ শিলাখণ্ডের উপরে বসিয়া জোহেরা জিজ্ঞাসা করিল, "তাহা হইলে তোমার উপরেই কি লোকটার সন্দেহ হইতেছে?"
     বিষণ্ণভাবে মজিদ বলিলেন, "আমার ত তাহাই বোধ হয়| দেবেন্দ্রবিজয় লোকটা বড় সহজ নহে| আমি যে কিরূপে আত্মপক্ষ-সমর্থন করিব, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না| দায়ে পড়িয়া আমাকে মুখবন্ধ করিয়া থাকিতে হইবে, দেখিতেছি|"
     জো| কেন?
     ম| কেন? তাহার সন্দেহভঞ্জন করিতে হইলে আমাকে সে রাত্রের সমূদয় ঘটনা প্রকাশ করিতে হইবে| কিছুতেই আমি তাহা পারিব না|
     জো| কেন পারিবে না?
     মজিদ কোন উত্তর করিতে পারিল না-নীরবে নতমুখে রহিলেন| তাঁহার ভাব দেখিয়া জোহেরার মুখ ম্লান হইয়া গেল-জোহেরা চিন্তিত হইল| ক্ষণপরে বলিল, "ইহার ভিতর একটা কারণ আছে-কোন বিশেষ কারণ, কেমন?"
     মজিদ মুখ না তুলিয়া বলিলেন, "হাঁ, জোহেরা|"
     জোহেরা জিজ্ঞাসা করিল, "এই কারণটার ভিতরে কোন স্ত্রীলোকের অস্তিত্ব আছে কি?"
     মজিদ মাথা নাড়িয়া জানাইলেন, 'আছে'| মুখে কিছুই বলিলেন না|
     জোহেরার মলিনমুখে যেন আর একখানা বিষাদের মেঘ ঘনাইয়া আসিল|
     একটু পরে ঘৃণাভরে উঠিয়া কঠিন হাস্যের সহিত বলিল, "এ বড় মন্দ রহস্য নহে, মজিদ! এই খোস-খবর দিবার জন্য কি তুমি আজ আমার সঙ্গে দেখা করিতে চাহিয়াছিলে? আমি মনে জানি, তুমি আমাকে আন্তরিক ভালবাস-আমি তোমার মুখ চাহিয়া রহিয়াছি-আর তুমি-তুমি মজিদ, আমার কাছে অনায়াসে অন্য একজন স্ত্রীলোকের নাম লইয়া-"
     বাধা দিয়া বিচলিতভাবে মজিদ বলিলেন, "নির্ব্বোধের ন্যায় কি বলিতেছ? আমি যে স্ত্রীলোকের কথা বলিতেছি, তাহার সহিত প্রণয়ের কোন সংশ্রব নাই| কোনবিশেষ কারণে আমি কোন বিষয়ে তাহার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছি| প্রতিজ্ঞাভঙ্গ ভিন্ন দেবেন্দ্রবিজয়ের ও তোমার সন্দেহ-ভঞ্জনের আর কোন উপায় দেখি না; কিন্তু আমি কিছুতেই তাহা পারিব না| আমার কথায় কি তোমার বিশ্বাস হয় না? সত্য কি তুমি মনে করিতেছ, আমি তোমার সহিত প্রবঞ্চনা করিতেছি? এত সহজে আমাকে অবিশ্বাসী ভাবিয়ো না| আমি তাহা নহি|"
     জোহেরা সন্দেহপূর্ণদৃষ্টিতে ক্ষণেক মজিদের মুখপ্রতি চাহিয়া বিষণ্ণভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া কহিল, "পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করিতে নাই|"
     দুই হাতে জোহেরার হাত দুইখানি ধরিয়া মজিদ হাসিয়া বলিলেন, "সকলেই কি সমান? আমাকে অবিশ্বাস করিতে হয়-এখন না| যতক্ষণ না, আমি মুখ ফুটিয়া সে সকল কথা প্রকাশ করিতেছি, ততক্ষণ তুমি আমাকে অবিশ্বাসী ভাবিয়ো না| আমি একান্ত তোমারই|"
     সাগ্রহে জোহেরা জিজ্ঞাসা করিল, "তাহা হইলে তুমি সে সকল কথা প্রকাশ করিতে সম্মত আছ?"
     মজিদ বলিলেন, "যখন দেখিব, বিপদ্ অত্যন্ত গুরুতর-আর গোপন করিলে চলিবে না-তখন অবশ্যই আমাকে তাহা প্রকাশ করিতে হইবে; কিন্তু সহজে আমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিব না-সহজে আমি বিচলি
ত হইব না|"

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।