রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

দশম পরিচ্ছেদ
অনুসন্ধান

     মেহেদী-বাগানের বাহিরে পশ্চিমাংশে মনিরুদ্দীন মল্লিকের প্রকাণ্ড ত্রিতল অট্টালিকা। সম্মুখে অনেকটা উন্মুক্ত তৃণভূমি প্রাচীর-বেষ্টিত। দেবেন্দ্রবিজয় তৃণভূমি অতিক্রম করিয়া বহির্দ্বারে করাঘাত করিলেন। অনতিবিলম্বে রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত করিয়া একজন স্থূলাঙ্গী বৃদ্ধা দেখা দিল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন, সে এখান্কার প্রধানা দাসী অথবা পাচিকা হইবে।
     দেবেন্দ্রবিজয়ের অনুমান সত্য। সেই বৃদ্ধা মনিরুদ্দীনের প্রধানা দাসী তাহার নাম কেহ জানে না-এমন কি বোধ হয়, মনিরুদ্দীনও না। সকলে তাহাকে গনির মা বলিয়া ডাকিয়া থাকে-সে অত্যন্ত বিশ্বাসী-আজীবন এই সংসারেই আছে-মনিরুদ্দীনকে সে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছে।
     বৃদ্ধা গনির মা বলিল, " কাকে খুঁজেন, মশাই ?"
     দেবেন্দ্রবজোয় বলিলেন " মল্লিক সাহেবের কি এই বাড়ী ?"
     বৃ। হাঁ।
     দে। তিনি এখন কোথায় ?
     বৃ। তিনি এখন এখানে নাই। তাঁকে কি দরকার ?"
     দে। তাঁকে বিশেষ কোন দরকার নাই। তাঁর সম্বন্ধে আমি দুই একটা কথা জানিতে চাই।
     মনিরুদ্দেনের নামে যে অপবাদ গ্রামের মধ্যে প্রচারিত হইয়াছিল, তাহা বৃদ্ধা গনির মায়েরও কাণে উঠিয়াছিল; সুতরাং দেবেন্দ্রবিজয়ের কথায় সে বড় বিব্রত হইয়া উঠিল। বিরক্তভাবে বলিল, "তা এখানে কেন-এখানে কি জান্বেন ? আপনি যান্-মশাই।" বলিয়া দ্বার রুদ্ধ করিবার উদ্যোগ করিল।
     দেবেন্দ্রবিজয় বেগতিক দেখিয়া তাড়াতাড়ি দ্বারের ভিতরের দিকে একটা পা বাড়াইয়া দিয়া দাঁড়াইলেন। বলিলেন, "আমি মনিরুদ্দীনের ভালর জন্যই আসিয়াছি। যা' বলি শোন, আমাকে তাড়াইলে ভাল কাজ করিবে না। বিশেষ একটা কথা আছে।"
     বৃদ্ধার বিরক্তি অদম্য কৈতূহলে পরিণত হইল। বলিল, " তবে ভিতরে এসে বসুন; মনিরুদ্দীনের কিছু খারাপী ঘটেছে না কি ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "না-না, তিনি ভাল আছেন-সেজন্য কোন ভয় নাই। তবে একটা বেজায় গাফিলী হয়েছে-বসো-স্থির হ'য়ে সব শোন।"
     বৃদ্ধা দেবেন্দ্রবিজয়কে বাহিরের বৈঠকখানা ঘরে লইয়া বসাইল।
     বৈঠকখানাটি অতি সুন্দররূপে সজ্জিত। গৃহতলে মূল্যবান গালিচা বিস্তৃত; তদুপরি দুই-তিনখানি মখমলমণ্ডিত কৌচ; একপার্শ্বে একটি মর্ম্মর প্রস্তরের ছোট টেবিল। টেবিলের উপরে সুদীর্ঘলাঙ্গলবিশিষ্ট রৌপ্যনির্ম্মিত আলবোলা শোভা পাইতেছে। গবাক্ষপার্শ্বে দুইটি কারুকার্য্য-বিশিষ্ট আল্মারী। তন্মধ্যে সুন্দররূপে বাঁধান, স্বর্ণাক্ষরে শোভিত অনেকগুলি ইংরাজী ও বাঙ্গালা উপন্যাস সাজান রহিয়াছে। দেবেন্দ্রবিজয় সর্ব্বাগ্রে একখানি কৌচের উপরে নিজের দেহভার অর্পণ করিয়া দিলেন। গনির মা অদূরে দ্বার-সম্মুখে গালিচার উপরে বসিল।
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "দেখ, আমি মল্লিক সাহেবের ভালর জন্যই এসেছি। যা' যা' জিজ্ঞাসা করি-ঠিক ঠিক উত্তর দিয়ে যাবে, মিথ্যা বল্লেই মুস্কিল। আমি কে, সে পরিচায়টাও তোমাকে এখনই দিয়ে রাখ্ছি; তা' না হলে তোমার কাছে যে, সব কথা সহজে পাওয়া যাবে না, তা আমি বেশ বুঝ্তে পেরেছি। আমার নাম দেবেন্দ্রবিজয়-আমি পুলিশের লোক।"
     শুনিয়া বৃদ্ধার চক্ষুঃস্থির; অত্যন্ত ভীতভাবে সে উঠিয়া দাঁড়াইল, সভয়ে কম্পিতস্বরে বলিল, " কি মুস্কিল, ওমা! পুলিসের লোক এখানে কেন গো ! মনিরুদ্দীন আমাদের কি করেছে !"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "না-না, মনিরুদ্দীন এমন কিছু করে নাই। তবে কি জান, তার পিছনে অনেক শত্রু লেগেছে-সেই শত্রুদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করবার জন্য আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি।"
     বৃদ্ধা বলিল, " তা আমাকে কি করতে হবে ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "বিশেষ কিছু করতে হবে না-আমি যা জিজ্ঞাসা করি, তোমাকে তার ঠিক ঠিক উত্তর দিতে হবে। দিলজানকে তুমি জান ?"
     ক্রুদ্ধভাবে বৃদ্ধা বলিল, " না দিলজান-ফিলজানকে আমি জানি না।"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "ফিলজানকে না জান, তাতে ক্ষতি নাই, দিলজানকে জানা দরকার হচ্ছে। যা জিজ্ঞাসা করি, উত্তর দাও; নতুবা তোমাকেও বড় মুস্কিলে পড়্তে হবে।"
     গনির মা প্রথমটা মনে করিয়াছিল, কিছু বলিবে না, কিন্তু দেবেন্দ্রবিজয়ের রুষ্টভাব দেখিয়া সে নিজে একটু নরম হইয়া গেল।
     দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, " কোন্ দিন থেকে মনিরুদ্দীন বাড়ীতে নাই ?"
     বৃদ্ধা বলিল," গত বুধবার রাত্রে কোথায় গেছেন এখনও ফিরেন নাই।"
     দে। কোথায় গেছেন।
     বৃ। তা' জানি না।
     দে। সঙ্গে কেহ আছে ?
     বৃ। কি জানি মশাই, তা' আমি ঠিক জানি না-পাঁচজনের মুখে ত এখন পাঁচ রকম কথা শুনতে পাচ্ছি-সত্যি-মিথ্যা কি ক'রে জানব বাবু ?
     দে। গত বুধবারে দিলজান কি এখানে এসেছিল ?
     বৃ। এসেছিল।
     দে। কখন ?
     বৃ। সন্ধ্যার আগে।
     দে। কেন এসেছিল ?
     বৃ। মনিরুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করতে।
     দে। দেখা হয়েছিল কি ?
     বৃ। না, মনিরুদ্দীন বাড়ীতে ছিল না। দিলজান রাত্রে দেখা কর্তে আস্বে ব'লে তখনই চ'লে যায়।
     দে। রাত্রে আবার এসেছিল।
     বৃ। এসেছিল, কিন্তু মনিরুদ্দীনের সঙ্গে তার দেখা হয় নাই। দিলজানের আসিবার আগে মনিরুদ্দীন আবার বেরিয়ে গিয়েছিল।
     দে। সেদিন রাত্রে মনিরুদ্দীন সৃজানকে নিয়ে পালাবে, তা' দিলজান জান্তে পেরেছিল ?
     বৃ। তা আমি ঠিক জানি না।
     দে। মনিরুদ্দীনের দেখা না পাওয়ায় দিলজান তখন কি করিল ?
     বৃ। মজিদ তখন এখানে ছিল। উপরের একটা ঘরে ব'সে তার সঙ্গে দিলজান অনেকক্ষণ ধ'রে কি পরামর্শ কর্তে লাগ্ল।
     দে। মজিদ এসেছিল কেন ?
     বৃ। মজিদ এমন মাঝে মাঝে এখানে আসে।
     দে। তাদের পরামর্শ কিছু শুনেছ ?
     বৃ। কিছু না। আমিই বা তা' শুন্তে যাব কেন ? আমাকে কি বাপু, তেমনি ছোটলোকের মেয়ে পেয়েছ ? যা হো্ক শেষকালটা তাদের মধ্যে যেন কি খুব রাগারাগির মতন হয়। দুজনেই যেন খুব জোরে জোরে কথা বল্ছিল।
     দে। তখন রাত কত হবে ?
     বৃ। এগারটার কম নয়।
     দে। সেই রাগারাগির পর দিলজান কি একা এখানে থেকে চ'লে যায় ?
     বৃ। একা; কিন্তু তার একটু পরেই মজিদও তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যায়।
     দে। মজিদ যাবার সময়ে তোমাকে কিছু বলেছিল ?
     বৃ। কিছু-না-কিছু না।
     দেবেন্দ্রবিজয় বিষম সমস্যায় পড়িলেন। তাঁহার মনে হইল, মজিদও এই খুন-রহস্যের মধ্যে অবশ্য কিছু-না কিছু জড়িত আছে। দিলজানের সহিত তাহার রাগারাগির কারণ কি ? তাহার মুখে এমন কি কথা শুনিল, যাহাতে দিলজানের ক্রোধসঞ্চার হইয়াছিল ? এ প্রশ্নের সদুত্তর এখন একমাত্র মজিদের নিকটে পাওয়া যাইতে পারে। সেই সময়ে সহসা আর একটা কথা দেবেন্দ্রবিজয়ের মনে পড়িয়া গেল; মোবারক-উদ্দীন দিলজানের মৃতদেহ আবিষ্কারের অনতিকাল পূর্ব্বে মেহেদী-বাগানের মোড়ে মজিদকে সেই গলির ভিতর হইতে ফিরিতে দেখিয়াছিলেন। তাহা হইলে মজিদের কি এই কাজ ? মজিদই কি দিলজানের হত্যাকারী ? দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, তিনি ক্রমেই এক গভীর রহস্য হইতে অন্য এক গভীরতর রহস্যে উপনীত হইতেছেন; কিন্তু সেই রহস্যোদ্ভেদের কোন পন্থা না দেখিতে পাইয়া তিনি মনের মধ্যে অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। স্থির করিলেন, এখনই তিনি একবার বালিগঞ্জে যাইয়া মোবারক-উদ্দীনের সঙ্গে দেখা করিবেন। তাহার নিকটে যাহা জানিবার, তাহা জানিয়া পরে মজিদের সহিত দেখা করিবেন। এখানে গত বুধবার রাত্রে তাঁহার সহিত দিলজানের কি কি কথা হইয়াছিল, তদুভয়ের বাগ্বিতণ্ডার কারণ কি; এবং নিজেই বা তিনি তেমন সময়ে মেহেদী-বাগানে কেন গিয়াছিলেন, এই সকল প্রশ্নের সদুত্তর না দিতে পারে-তাহা হইলে সে যে এই খুনের ভিতরে জড়িত আছে, সে সম্বন্ধে আর তখন সন্দেহের কোন কারণ থাকিবে না।
     গনির মা দেবেন্দ্রবিজয়কে অনেকক্ষণ নীরব থাকিতে দেখিয়া বলিল, "মশাই, যা কিছু আমি জানি, সব আপনাকে বলেছি; এখন আপনার যা'ইচ্ছে হয় করুন। আমি ত এখনও কিছু বুঝ্তে পার্ছি না। কি হয়েছে ?
     দেবেন্দ্রবিজয় সংক্ষেপে বলিলেন, " খুন।"
     বুড়ী বসিয়াছিল, খুনের কথা শুনিয়া যেন সবেগে তিন হাত লাফাইয়া উঠিল; চোখ-মুখ কপালে তুলিয়া কহিল, " কি মুস্কিল ! কে খুন হয়েছে-আমাদের মনিরুদ্দীন না কি ?"
     "না, দিলজান।"
     "দিলজান !"
     "হাঁ, দিলজান মজিদের সঙ্গে রাগারাগি ক'রে যাবার পরে মেহেদী-বাগানের একটা গলি-পথে খুন হয়েছে।"
     বৃদ্ধা ব্যগ্রভাবে কহিল, " তা হ'তে পারে, মজিদের কোন দোষ নাই-সে কখনই খুন করে নাই, আমি তা বেশ জানি ! সে কেন দিলজানকে খুন করতে যাবে ? সে ওদিকে বড় মেশে না; মদ, বাইজীর সখ তার নাই-জোহেরার সঙ্গে তার খুব আস্নাই হয়েছে।"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " তবে শুন্লেম, মনিরুদ্দীনের সঙ্গেই না কি, জোহেরার সাদি হবে, ঠিক হ'য়ে গেছে?"
     বৃদ্ধা বলিল, "না, না-সে কোন কাজের কথাই নয়। জোহেরা কখনই মনিরুদ্দীনকে সাদি কর্বে না-সে মজিদকেই সাদি কর্বে-মজিদের সঙ্গে তার খুব ভাব। আপনি কি মনে করেছেন, মজিদ দিলজানকে খুন করেছে ? আপনি মজিদকেই খুনী ব'লে চালান দিবেন না কি ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "না, মজিদের বিরুদ্ধে তেমন বিশেষ কোন প্রমাণ এখনও কোন পাই নাই।"
     অন্যান্য আরও দুই-একটী কথার পর দেবেন্দ্রবিজয় মনিরুদ্দীনের বাটী ত্যাগ করিলেন। বৃদ্ধা গনির মা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।

 

একাদশ পরিচ্ছেদ
দারুণ সন্দেহ

 

      দেবেন্দ্রবিজয় তখনই মোবারক-উদ্দীনের সহিত দেখা করিতে বালিগঞ্জের দিকে চলিলেন। তাঁহার মন অত্যন্ত চিন্তাপূর্ণ এবং অত্যন্ত সন্দেহপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। তিনি পথে চলিতে চলিতে ভাবিতে লাগিলেন, মজিদ দিলজানকে কেন হত্যা করিবে ? আপাততঃ ইহার তেমন কোন কারণ দেখিতেছি না। সেদিন রাত্রে রুষ্টভাবে দিলজান মনিরুদ্দীনের বাটী ত্যাগ করিবার পরক্ষণেই মজিদও বাহির হইয়া যায়। ইহাতে বোধ হইতেছে, মজিদ নিশ্চয়ই কোন কারণে দিলজানের অনুসরণ করিয়াছিল। মেহেদী-বাগানের পথে সেই রাত্রে মোবারক-উদ্দীনও মজিদকে একা ফিরিতে দেখিয়াছিলেন। তাহা যেন হইল, কিন্তু দিলজান বাড়ীতে ফিরিবার অন্য সোজা পথ থাকিতে রাত এগারটার পর এই গলি পথে কোনা্‌ অভিপ্রায়ে প্রবেশ করিয়াছিল ? না, কুয়াসা ও অন্ধকারে হতভাগিনী পথ ভুল করিয়া ফেলিয়াছিল ? তাহার মত বুদ্ধিমতী যুবতী স্ত্রীলোকের কি সহসা এতটা ভুল হইতে পারে ? ইহা সম্ভবপর নহে। হয় ত পথে এমন কোন পরিচিত ব্যক্তির সহিত তাহার দেখা হইয়া থাকিবে যে , কোন কারণে তাহাকে এই গলির ভিতরে ডাকিয়া লইয়া যাইতে পারে; কিন্তু এত অধিক রাত্রে এই নির্জ্জন পথে কোন পরিচিতের সহিত দেখা সাক্ষাত্‍‌ হওয়াও অসম্ভব। অর্থলোভে কোন দুর্ব্বৃত্ত যে এ কাজ করিয়াছে, তাহাও বোধ হয় না। তাহা হইলে দিলজানের গায়ে যে দুই-একখানি স্বর্ণালঙ্কার ছিল; তাহা দেখিতে পাইতাম না। বিশেষতঃ এখনও এ দেশের তস্কর ও দস্যুদিগের মধ্যে বিষমাখা ছুরির ব্যবহার প্রচলন হয় নাই। তবে যদি কেহ, দিলজানের কাছে যে ছুরি ছিল, সেই ছুরি লইয়া-দূর হউক, এ সকল কোন কাজের কথাই নয়। যতক্ষণ না মজিদের সহিত দেখা করিয়া আমার জ্ঞাতব্য বিষয়গুলির সন্তোষজনক উত্তর পাইতেছি, ততক্ষণ এ জটিল রহস্যের উদ্ভেদ সুদূরপরাহত।
অনন্তর দেবেন্দ্রবিজয় যখন বালিগঞ্জে উপস্থিত হইলেন, তখন বেলা পড়িয়া আসিয়াছে। শ্যামল তরুশ্রেণীর অন্তরালে রক্তরাগোজ্জ্বল রবি সুবৃহত্‍‌ স্বর্ণপাত্রের ন্যায় দেখাইতেছে। তাহার হেমাভকিরণচ্ছটা পশ্চিমাকাশ হইতে সমগ্র আকাশে উজ্জ্বলভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বায়ুচঞ্চল বৃক্ষশিরে সেই স্বর্ণকিরণ শোভা পাইতেছে। এবং তখন হইতে সন্ধ্যার বাতাস ধীরে ধীরে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
      যখন দেবেন্দ্রবিজয় মোবারক-ইদ্দীনের বাসায় উপনীত হইলেন, তখন মোবারক একখানি ইংরাজী সংবাদপত্র হাতে লইয়া দ্বার-সম্মুখে ধীরে ধীরে পদচারণা করিতেছিলেন। এবং তাঁহার একটা পোষমানা কুকুর দ্বারপার্শ্বে দাঁড়াইয়া ঘন ঘন লাঙ্গুলান্দোলন করিতেছিল। দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিয়া কুকুরটা লাফাইয়া গর্জ্জন করিয়া উঠিল। মোবারক তাহাকে একটা ধমক দিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে কহিলেন, "কি দেবেন্দ্রবিজয় বাবু, এদিকে কোথায় ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "আপনার কাছে।"
      মোবারক-উদ্দীন ললাট কুঞ্চিত এবং ভ্রূযুগ সঙ্কোচ করিয়া বলিলেন, " আমার কাছে কেন ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "সেই খুনের মামা্‌লা-"
      বাধা দিয়া মোবারক বলিলেন, "হাঁ, তা' কি হইয়াছে, আমি যাহা জানি, সকলেই তা আপনাদিগকে বলিয়াছি।"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হাঁ, আরও দুই-একটা কথা জিজ্ঞাসা করিবার আছে।"
      মোবারক বলিলেন, "বেশ, চলুন ঘরের ভিতরে গিয়া বসি।"
      মুবারক দেবেন্দ্রবিজয়কে একটি ঘরের ভিতরে লইয়া গেলেন। কুকুরটাও লাঙ্গুলান্দোলন করিতে করিতে সেখানে গিয়া উপস্থিত হইল, এবং দুই-একবার এদিকা্‌ ওদিকা্‌ করিয়া ঘরের মাঝখানে শুইয়া পড়িল। দেবেন্দ্রবিজয় দ্বারপার্শ্বে একখানি চেয়ার টানিয়া উপবেশন করিলেন। এবং মোবারক কিছু তফাতে ঘরের অপর পার্শ্বস্থ একটি ক্ষুদ্র শয্যার উপরে বসিয়া, সই ইংরাজী খবরের কাগজখানা নাড়িয়া-নাড়িয়া নিজের দেহের উপরে ব্যজন করিতে লাগিলেন। জিজ্ঞাসিলেন,       "কেসা্‌টার কিছু সুবিধা করিতে পারিলেন কি ?"
      ইতিমধ্যে যতটা সুবিধা করিতে হয়, তা' করিয়াছি। অনেক সন্ধান-সুলভও হইয়াছে।"
      "বটে, কে খুন করিয়াছে, তাহা কিছু ঠিক করিতে পারিলেন কি ? কে সে, কি নাম ?"
      "খুনির নাম এখনও ঠিক করিতে পারি নাই; তবে যে খুন হইয়াছে, তাহার নাম পাইয়াছি।"
      "বটে, কে সে, কি নাম ?"
      "দিলজান।"
      "কই, এ নাম ত পূর্ব্বে কখনও শুনি নাই; কে সে, কোথায় থাকিত ?"
      "মনিরুদ্দীনের রক্ষিতা। বামুন-বস্তিতে, লতিমন বাইজীর বাড়ীতে থাকিত। মনিরুদ্দীন তাহাকে কোথা হইতে আনিয়া সেখানে রাখিয়া ছিল, বলিতে পারি না।"
      "অন্ধকার রাত্রে মেহেদী-বাগানে সেই অন্ধকার গলির ভিতরে সে কেন গিয়াছিল ? কিরূপে আপনি এ সকল সন্ধান পাইলেন ?"
      "আমি সমুদয় আপনাকে বলিতেছি; কোন কোন বিষয়ে এখন আপনার সাহায্য আমাদের অবশ্যক হইতেছে।"
      "সেজন্য চিন্তা নাই-আমি সাধ্যমত আপনাদের সাহায্য করিব-তাহার কোন ত্রুটি হইবে না।"
দেবেন্দ্রবিজয় বলিতে লাগিলেন, "মেহেদী-বাগানে যে লাস পাওয়া যায়, তাহার সেই রেশমের কাজ করা ওড়া্‌নাখানি অবলম্বন করিয়া আমি এতদূর অগ্রসর হইতে পারিয়াছি। আমি প্রথমে সেই ওড়া্‌নাখানি লইয়া করিমের মা'র কাছে যাই; সেখানে শুনিলাম, তাহারাই সেই ওড়া্‌না বামুন-বস্তির লতিমন বাইজীকে তৈয়ারী করিয়া দিয়াছিল। তখন আমি মনে করিলাম, তবে লতিমন বাইজীর খুন হইয়াছে; কিন্তু লতিমন বাইজীর বাড়ীতে গিয়া দেখিলাম, আমার সে অনুমান ঠিক নহে; লতিমন বাইজী বেশ সবল ও সুস্থদেহে বাঁচিয়া আছে। তাহার কাছে শুনিলাম, গত বুধবার রাত্রে দিলজান তাহার নিকট হইতে সেই ওড়া্‌নাখানি চাহিয়া লইয়াছিল। সেই ওড়া্‌না গায়ে দিয়া সে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে গিয়াছিল।"
      মো। মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে কেন ?
      দে। সৃজান বিবিকে লইয়া সরিয়া পড়িবার উদ্যোগ করিতেছিল, তাহা দিলজান কিরূপে জানিতে পারে; কিন্তু কার্য্যতঃ সেটা যাহাতে না ঘটে, সেই চেষ্টায় দিলজান রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যায়; কিন্তু মনিরুদ্দীন তার আগেই বাড়ী হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিল। সেখানে মজিদ খাঁ ছিলেন; তাঁহারই সহিত দিলজানের দেখা হইয়া যায়; তাহার পর লি কথা লইয়া দু'জনের কিছু বচসা হয়। রাত প্রায় বারটার পর দিলজান সেখানে হইতে বাহির হইয়া যায়; মজিদ খাঁ তাহার সঙ্গে সঙ্গে বাহির হইয়া পড়েন। মজিদ খাঁ দিলজানকে শেষজীবিত থাকিতে দেখিয়াছেন।"
      মোবারক বলিলেন, "তা' হইলে দিলজান রাত্রে আর বাড়ী ফিরে নাই। কিন্তু যখন সে দেখিল, মনিরুদ্দীনের সহিত তাহার সাক্ষাত্‍‌ হইল না, তখন সে সেখান হইতে বরাবর নিজের বাড়ীতে না আসিয়া, এত অধিক রাত্রে মেহেদী-বাগানের সেই ভয়ানক অন্ধকার গলিপথে কি উদ্দেশ্যে গিয়াছিল, বুঝিতে পারিলাম না। মনিরুদ্দীনের বাড়ী হইতে বামুন-বস্তিতে যাইবার ত একটা বেশ সোজা পথ রহিয়াছে।"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "তা' আমি ঠিক বলিতে পারি না। হয় সে পথ ভুল করিয়া থাকিবে, নতুবা ইহার ভিতরে আরও কোন লোক জড়িত আছে।"
      মোবারক কহিলেন, " এ কোন কাজের কথাই নয়। ইহার ভিতরে আবার কে জড়িত আছে ?"
      দে। আছে-মজিদ খাঁ।
      শুনিয়া মোবারক লাফাইয়া উঠিলেন; বলিলেন, "মজিদ খাঁ-কি সর্ব্বনাশ !" তালু ও জিহ্বার সংযোগে বারদ্বয় এক প্রকার অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিলেন, "না-ইহা কখনই সম্ভব নয়; আমি মজিদ খাঁকে বরাবর খুব রকমেই জানি; খুব ভাল চরিত্র-তিনি কখনই খুন করেন নাই; এমন একটা ভয়ানক খুন কখনই তাঁহার দ্বারা হইতে পারে না। আপনার এ সন্দেহ একান্ত অমূলক।"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " শুনিয়াছি, সেদিন রাত্রে আপনি যখন বাসায় ফিরিতেছিলেন, দিলজানের মৃতদেহ আবিষ্কারের পূর্ব্বে এই মেহেদী-বাগানে মজিদ খাঁর সঙ্গে আপনার দেখা হইয়াছিল। তাহা বোধ হয়, এখন আপনার স্মরণ আছে ?"
      রুষ্ট ও উদ্বিগ্নভাবে মোবারক বলিলেন, "কি ভয়ানক লোক আপনি ! মজিদ আমার বন্ধু, যাহাতে তিনি বিপদে পড়েন, তাঁহার বিরুদ্ধে কোন কথা বলা আমার ঠিক হয় না। আপনি কি সেইজন্য এখানে আসিয়াছেন ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হাঁ, আপনি তখন মজিদ খাঁকে কিরূপে দেখিয়াছিলেন, আপনার সঙ্গে তাঁহার কি কথাবার্ত্তা হইয়াছিল, সেই সকল জানিবার জন্য আমি আপনার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি। আপনি কি তাহা আমাকে বলিবেন না ?"
      মোবারক কহিলেন, "কেন বলিব না ? ইহাতে দোষের কথা কিছুই নাই। রাত্রে মেহেদী-বাগানে মজিদ খাঁকে দেখিয়াছি বলিয়াই যে, তিনি খুনী হইলেন এমন ধারণা ঠিক নহে।"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " কি ভাবে আপনি তাঁহাকে প্রথম দেখেন, আপনার সঙ্গে তাঁহার কি কি কথা হয় ?"
      মোবারক কহিলেন, "অন্ধকারে আমি তাঁহার ভাব-ভঙ্গী দেখিবার সুবিধা পাই নাই। তিনি তাড়াতাড়ি ফিরিতেছিলেন। অন্ধকারে তিনি একবারে আমার গায়ের উপরে আসিয়া পড়েন। যে অন্ধকার ! তাহাতে এরূপ ঘটনা সচরাচর ঘটিয়া থাকে, তিনি যদি আমার গায়ের উপরে আসিয়া না পড়িতেন, হয় ত আমিই তাঁহার গায়ের উপরে গিয়া পড়িতাম। যাহা হউক, তার পর আমি তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া নিজের বাসায় আনিবার জন্য জেদাজেদি করিলাম-মনিরুদ্দীনের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম-এই রকম দুই-একটী বাজে কথা হইয়াছিল।"
      দেবেন্দ্রবিজয় চিন্তিতভাবে বলিলেন, "তাই ত ! ঠিক সেইদিন তেমন রাত্রে মেহেদী-বাগানে মজিদ খাঁর আবির্ভাব কিছু সন্দেহজনক বলিয়া বোধ হয়।"
      মো। আমি ত ইহাতে সন্দেহের কিছুই দেখি না; যদি আপনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি অবশ্যই আপনাকে ইহার কারণ দেখাইবেন। বিশেষতঃ তিনি দিলজানকে খুন করিতে যাইবেন কেন-দিলজানের সহিত তাঁহার সংশ্রব কি ?
      দে। খুন করিব মনে করিয়াই যে, মজিদ খাঁ দিলজানকে খুন করিয়াছেন, আমি এমন কথা বলিতেছি না; তবে দৈবাত্‍‌ কি রকম হ'য়ে গেছে। আপনি এই ছুরিখানা দেখিলেই বুঝিতে পারিবেন।"
      এই বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় লতিমন বাইজীর বাড়ীতে যে ছুরিখানি পাইয়াছিলেন, তাহা বাহির করিয়া দেখাইলেন।

 দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
ছুরি - বিষাক্ত

 

      সভয়ে মোবারক কহিলেন, "ছুরি কোথায় পাইলেন? এই ছুরিতেই খুন --"
      বাধা দিয়া দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " না, এই ছুরিতেই খুন হয় নাই। ইহার জোড়া ছুরিতে খুন হইয়াছে। লতিমন বাইজীর কছে শুনিলাম, দিলজানের এইরূপ দুইখানি ছুরি ছিল। দিলজান, সৃজান বিবির কথা কিরূপে জানিতে পারে, বলিতে পারি না। সে মনিরুদ্দীনের উপরে রাগিয়া এমন অধীর হইয়া উঠে যে, যদি মনিরুদ্দীনকে বুঝাইয়া সে নিজের কাজ উদ্ধার করিতে না পারে, তবে ছুরিতে কাজ উদ্ধার করিবে স্থির করিয়া গত বুধবার রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যায়। মনিরুদ্দীন তখন বাড়িতে ছিলেন না। সেখানে মজিদ খাঁর সঙ্গে তাহার দেখা হয়; সম্ভব -এই সকল কথা লইয়া মজিদ খাঁর সঙ্গে বচসাও হয়। সেই সময়ে রাগের মুখে দিলজান রাগভারে মজিদ খাঁকে সেই ছুরি দেখাইয়া থাকিবে। এবং যে সঙ্কল্প করিয়া সে ছুরি লইয়া ফিরিতেছে, তাহাও বলিয়া থাকিবে। হয়ত মজিদ খাঁ তখন তাহাকে প্রবোধ দিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু দিলজান সেখানে হইতে বাহির হইয়া আসে। রাগের বশে দিলজান হ্ঠাত্‍‌ কি একটা অনর্থ ঘটাইবে মনে করিয়া, মজিদ খাঁ সেই ছুরিখানি তাহার হাত হইতে কাড়িয়া লইবার চেষ্টায় তাহার অনুসরণ করিয়া থাকিবেন; তাহার পর হয় ত মেহেদী-বাগানে আবার উভয়ের দেখা হইয়াছে। মজিদ খাঁ সেই সময়ে দিলজানের সহিত ছুরিখানি লইয়া কাড়াকাড়ি করিয়াছেন; এবং অসাবধানবশতঃ ছুরিখানি হঠাত্‍‌ দিলজানের গলায় বিদ্ধ হওয়ায় দিলজানের মৃত্যু হইয়াছে। পাছে খুনী বলিয়া অভিযুক্ত হইতে হয়, এই ভয়ে মজিদ খাঁও সে সম্বন্ধে আর কোন উচ্চবাচ্য না করিয়া চুপ করিয়া গিয়াছেন।"
      মোবারক বলিলেন, " অনেকটা সম্ভব বটে; কিন্তু ইহা কতদূর সত্য, আমি বলিতে পারি না। মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে দিলজানের সহিত মজিদ খাঁর কি কথাবার্ত্তা হইয়াছিল, তাঁহার সঙ্গে দেখা করিয়া আপনি এখন তাহা তদন্ত করিয়া দেখুন। ইহা ভিন্ন সত্য আবিষ্কারের আর কোন উপায় দেখি না। এই ছুরি লইয়া আপনি এখন কি করিবেন?"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "ছুরিখানি বিষাক্ত কি না , তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে। যদি এই ছুরিখানি বিষাক্ত হয়, তাহা হইলে ইহার জোড়া ছুরিখানি বিষাক্ত নিশ্চয়। এই খুনটা কোন বিষাক্ত ছুরিতেই হইয়াছে।"
হস্ত প্রসারণ করিয়া মোবারক কহিলেন, " একবার আমি ছুরিখানি দেখিতে পারি কি?"
"অনায়াসে," বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় ছুরিখানি মোবারকের হাতে দিতে উঠিলেন। মোবারক একটু তফাতে বিছনার উপরে বসিয়া ছিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় যেমন তাঁহার দিকে এক পা অগ্রসর হইয়াছেন, সম্মুখে কুকুরটা শুইয়াছিল-একেবারে তাহার ঘাড়ের উপরে পা তুলিয়া দিয়াছেন। কুকুরটা রাগিয়া চীত্‍‌কার করিয়া তত্‍‌ক্ষণাত্‍‌ দেবেন্দ্রবিজয়ের পায়ে কামড়াইয়া দিল। দেবেন্দ্রবিজয় যেমন চমকিত ভাবে সরিয়া যাইবেন, হাত হইতে ছুরিখানি কুকুরটার উপরে পড়িয়া গেল।
      মোবারক উঠিয়া তাড়াতাড়ি কুকুরটাকে সরাইয়া লইলেন।  একটা চপেটাঘাতের সহিত ধমকও দিলেন। তাহার পর দেবেন্দ্রবিজয়ের নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, " কি মহাশয়, আপনাকে কামড়াইয়াছে না কি? দেখি দেখি-"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "না-দাঁত ফুটাইতে পারে নাই, কাপড়খানা একটু ছিঁড়িয়া গিয়াছে মাত্র।"
কুকুরটা তখন মাটিতে পড়িয়া ছটা্‌ফট করিতেছে; অথচ চীত্‍‌কার করিতেও পারিতেছে না। কুকুরটাকে তদবস্থ দেখিয়া মোবারকের বড় ভয় হইল; দেখিলেন, কুকুরের গলার কাছে অল্প রক্তের দাগ; রক্ত মুছিয়া দেখিলেন, সামান্য ক্ষতচিহ্ণ। একান্ত রুষ্টভাবে বলিলেন, "নিশ্চয়ই আপনার ছুরি বিষাক্ত-কুকুরটা এমন করিতেছে কেন? কি সর্ব্বনাশ কুকুরটাকে মারিয়া ফেলিলেন-কি রকম ভদ্রলোক আপনি?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আপনাকে যদি কাহারও কুকুর এরূপভাবে আক্রমণ করিত, সম্ভব, আপনিও এইরূপ ভদ্রতার পরিচয় দিতেন। যাহা হউক, আপনার এরূপ ক্ষতি করিয়া আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম।"
মোবারক বিরক্তভাবে বলিলেন, "যথেষ্ট হইয়াছে, আর আপনার দুঃখিত হইয়া কাজ নাই; কুকুরটাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলেন !"
      কুকুরটা ক্রমশঃ অবসন্ন হইয়া আসিতে লাগিল। দেবেন্দ্রবিজয় বিশেষ মনোযোগের সহিত সেইদিকে চাহিয়া রহিলেন। মোবারক কুকুরটাকে ধরিয়া উঠাইবার চেষ্টা করিলেন। অবসন্নভাবে কুকুরটা আবার গৃহতলে লুটাইয়া পড়িল। মোবারক পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া বারংবার ক্ষতস্থান মুছাইয়া দিতে লাগিলেন। তখন আর উপায় নাই, জীবন প্রায় শেষ হইয়া আসিতেছে। কুকুরটা দুই-একবার বিকৃত মুখব্যাদনসহকারে জৃম্ভণ ত্যাগ করিল; তাহার পর কয়েকবার অন্তিম বলে উঠিয়া দাঁড়াইবার চেষ্টা করিয়া পড়িয়া গেল। দুই-একবার এইরূপ করিয়া আর উঠিল না-ধীরে ধীরে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল।
      একান্ত উত্তেজিতভাবে মোবারক বলিলেন, " আপনি করলেন কি-কুকুরটাকে সত্যসত্যই মারিয়া ফেলিলেন ! আপনার মত বে-আক্কেলে লোক দুনিয়াই নাই !"
      দেবেন্দ্রবিজয় ছুরিখানা কাগজে ভাল করিয়া জড়াইতে জড়াইতে বলিলেন, "অপনি আমার উপরে অন্যায় রাগ করিতেছেন; দৈবাত্‍‌ --"
      বাধা দিয়া ক্রোধভরে মোবারক বলিলেন, " আর আপনার কথায় কাজ নাই-আপনি নিজের পথ দেখুন। আপনার ছুরি ভনায়ক বিষাক্ত।"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "হাঁ, নতুবা একটু আঘাতেই আপনার কুকুরটা মরিবে কেন? এ ছুরিখানি বিষাক্ত হওয়ায় আমি এখন বেশ বুঝিতে পারিতেছি, দিলজান যে ছুরিতে খুন হইয়াছে, তাহাও বিষাক্ত। একজোড়া ছুরির একখানিতে দিলজানের অদৃষ্টলিপি গ্রথিত ছিল, অপরখানিতে আপনার কুকুরটা মারা পড়িল।"
মোবারক পূর্ব্ববত্‍‌ ক্রুদ্ধভাবে বলিলেন, "বেশ, এখন আপনার পথ দেখুন-আমি আপনাকে মানে মানে বিদায় দিতেছি-ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট।"
      দেবেন্দ্রবিজয় রাগ প্রকাশ করিলেন না। মোবারকের কথা তিনি কানে না করিয়া, আপন মনে ছুরিখানি ভাল করিয়া কাগজে জড়াইয়া, সাবধানে পকেটের মধ্যে রাখিয়া দিয়া তথা হইতে বহির্গত হইলেন। ছুরিখানি বিষাক্ত হওয়ায় তিনি মনে মনে অনেকটা পরিমাণে আনন্দানুভব করিলেন। রাস্তায় আসিয়া আপন মনে বলিলেন, "এইবার একবার মজিদ খাঁর সহিত দেখা করিতে পারিলে, এই নিবিড় খুন-রহস্যাটা অনেকটা তরল হইয়া আসিবে।"

                                     

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।