রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

সপ্তম পরিচ্ছেদ
লতিমন

    দেবেন্দ্রবিজয় লতিমন বাইজীর সন্ধানে বামুন-বস্তিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন | লতিমনের প্রকাণ্ড দ্বিতল বাটী, বামুন-বস্তির আবালবৃদ্ধবনিতার পরিচিত | লতিমনও তদ্রূপ | তাহার জন্য দেবেন্দ্রবিজয়কে বিশেষ কষ্ট-স্বীকার করিতে হইল না; পাড়া প্রতিবেশীদিগের নিকট হইতে তিনি অল্পায়াসে লতিমন বাইজীর সম্বন্ধে অনেকখানি সংবাদ গ্রহণ করিয়া ফেলিলেন | লতিমন সর্ব্বদা বাটীর বাহির হয় না-কখন কখন দেশে-বিদেশে মজ্রো কর্তে যায়-সুতরাং লতিমন এখন বাড়ীতে আছে, কি বিদেশে গাওনা করিতে গিয়াছে, এই সম্বন্ধে কেহ কোন সন্তোষজনক উত্তর করিতে পারিল না | দেবেন্দ্রবিজয় আরও একটা সংবাদ পাইলেন, মনিরুদ্দীনেরও সেখানে যাতায়াত আছে | লতিমনের বাড়ীতে দিলজান নামে আর একটি ষোড়শী সুন্দরী বাস করে; মনিরুদ্দীন কোথা হইতে তাহাকে এখানে আনিয়া রাখিয়াছে | লতিমনের বাড়ী দ্বিমহল, ভিতর মহলে লতিমন নিজে থাকে; বাহির মহলের দ্বিতলে একটা প্রকাণ্ড হলঘরে দিলজান বাস করে |
দেবেন্দ্রবিজয় মনে মনে স্থির করিলেন, দিলজানের সহিত দেখা করিলে লতিমন সম্বন্ধে সমুদয় সংবাদ পাওয়া যাইবে; তা' ছাড়া মনিরুদ্দীনের সম্বন্ধেও অনেক বিষয় জনিতে পারা যাইবে |
     দেবেন্দ্রবিজয় লতিমন বাইজীর বাড়ীতে প্রবেশ করিলেন | একজন ভৃত্য তাঁহাকে উপরে একটী সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠে লইয়া গিয়া বসাইল এবং সংবাদ লইয়া বাড়ীর ভিতরে চলিয়া গেল |
     দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, গৃহটী মূল্যবান্ আস্বাবে পূর্ণ | গৃহতলে গালিচা বিস্তৃত | গৃহ-প্রাচীরে উৎকৃষ্ট তৈল-চিত্র ও দেয়ালগিরি | একপার্শ্বে একখানি প্রকাণ্ড দর্পণ-সম্মুখে গিয়া কেহ দাঁড়াইলে তাহার মাথা হইতে পা পর্য্যন্ত তাহাকে প্রতিবিম্বপাত হয় | অপরপার্শ্বে গবাক্ষের নিকটে একটি হারমোনিয়ম রহিয়াছে, নিকটে একখানি মখমলমণ্ডিত চেয়ার ও একখানি কৌচ | দেবেন্দ্রবিজয় মনে করিলেন, হয়ত দিলজান বিবি ঐ চেয়ারে বসিয়া হারমোনিয়মের স্বরে কণ্ঠস্বর-সংযোগপূর্ব্বক শব্দতরঙ্গে সেই সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠ প্লাবিত করিতে থাকে, আর মনিরুদ্দীন সেই কৌচে কান পাতিয়া পড়িয়া থাকেন |
     দেবেন্দ্রবিজয় পশ্চাদ্ভাগে হাত দুইখানি গোট করিয়া সেই কক্ষমধ্যে পরিক্রমণ করিতে করিতে গৃহের সমগ্র সামগ্রী সবিশেষ মনোযোগ সহকারে দেখিতে লাগিলেন | কিয়ৎপরে সহসা তাঁহার দৃষ্টি হারমোনিয়মের উপরিস্থিত মরক্কো-মণ্ডিত দুইটি ক্ষুদ্র বাক্সের উপরে পড়িল | বাক্স দুইটি দেখিতে একপ্রকার | দৈর্ঘ্যে অর্দ্ধ-হস্ত এবং প্রস্থে পাঁচ-ছয় অঙ্গুলি পরিমিত | দেবেন্দ্রবিজয় একটি বাক্স তুলিয়া লইলেন, এবং ডালাখানি ধীরে ধীরে খুলিয়া দেখিলেন, তন্মধ্যে একখানি সুদীর্ঘ সূক্ষাগ্র, ধারাল ছুরিকা রহিয়াছে | ছুরিখানির মূলদেশ উজ্জ্বল হস্তিদন্তনির্ম্মিত | অপর বাক্সটিও লইয়া খুলিয়া দেখিলেন | দেখিলেন, তন্মধ্যে কিছুই নাই, কিন্তু তন্মধ্যে যে ঠিক সেইরূপ একখানি ছুরি ছিল, তাহা দেবেন্দ্রবিজয়ের বুঝিতে বাকী রহিল না |
     বাক্স দুইটি একই ধরণের তৈয়ারী | হস্তস্থিত বাক্সটি যেখানে ছিল, সেইখানেই রাখিয়া দিলেন | তাহার পর গবাক্ষের সম্মুখে আসিয়া ছুরিখানি ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া বিশেষ মনোনিবেশ পূর্ব্বক দেখিতে লাগিলেন | দেখিলেন, ছুরিখানির অগ্রভাগ তেমন উজ্জ্বল নহে-নীলাভ এবং খুব সূক্ষ; বিষাক্ত বলিয়া বোধ হইল | দেবেন্দ্রবিজয় মনে মনে স্থির করিলেন, এখন রাসায়নিক পরীক্ষা দ্বারা দেখিতে হইবে, এই ছুরিখানি বিষাক্ত কি না | তাহার পর কোন একটা বিড়াল বা কুকুরের গায়ে বিদ্ধ করিলেই বুঝিতে পারিব, এই বিষে কতক্ষণে কিরূপ ভাবে মৃত্যু ঘটে | মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় কক্ষের চতুর্দ্দিকে দৃষ্টি সঞ্চালন করিয়া দেখিলেন, কেহ কোথায় নাই | তখন ছুরিখানি ব্যগ্রভাবে একখানি কাগজে জড়াইয়া নিজের পকেটে ফেলিলেন ; এবং একখানি চেয়ার টানিয়া বসিয়া রুমালে মুখ মুছিতে লাগিলেন |
     অনতিবিলম্বে পার্শ্ববর্ত্তী দ্বারপথ দিয়া একটি স্ত্রীলোক তথায় প্রবেশ করিল | তাহাকে দেখিতে তেমন সুন্দরী নহে - শ্যামবর্ণা-বয়ঃক্রমও ত্রিশ বৎসর হইবে | মুখে বসন্তের ক্ষতচিহ্ণ | সর্ব্বাঙ্গে স্বর্ণালঙ্কারে শোভিত | পায়ে জরীর কাজ করা চটিজুতা | দেবেন্দ্রবিজয় তাহার আপাদমস্তক সাভিনিবেশ দৃষ্টিসঞ্চালন করিতে লাগিলেন | ভাবিলেন, কে এ ! দিলজান কখনই নয়-মনিরুদ্দীন কি ইহারই প্রেমে মুগ্ধ হইয়া এ যাবৎ বিবাহ করে নাই ? একান্ত অসম্ভব !
     সেই স্ত্রীলোকটি অপরিচিত দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে বিস্মিত চিত্তে চাহিয়া বলিল "আপনি কি সেই দিলজানের সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিল্লেন, "হাঁ, বিশেষ প্রয়োজন আছে, অপনার নাম কি দিল -"
     বাধা দিয়া স্ত্রীলোকটি বলিল, " না, আমার নাম দিলজান নয় | আপনার কি প্রয়োজন বলুন-আমি দিলজান্কে তাহা বলিব |"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "তাহার সহিত আমার দেখা করা দরকার |"
     স্ত্রী | এখন দেখা হইবে না-দিলজান এখন এখানে নাই | আপনি কোথা হইতে আসিতেছেন ?
     দে (ইতস্ততঃ করিয়া ) আমি-আমি-এই মনিরুদ্দীনের নিকট হইতে আসিতেছি |
     স্ত্রী | আপনি মিথ্যা বলিতেছেন |
     দে | কেন ?
     স্ত্রী | মনিরিদ্দীন এখন অখানে নাই | দিলজান্কে সঙ্গে লইয়া তিনি কোন্ দেশে বেড়াইতে গিয়াছেন |
দেবেন্দ্রবিজয় বড় বিভ্রাটে পড়িলেন | দেখিলন, কথাটা ঠিক খাটিল না; পাছে অপ্রতিভ হইতে হয়, মনে করিয়া তিনি সে কথাটি একেবারে চাপা দিয়া বলিলেন, "ওঃ ! তা হবে; কিন্তু আরও একটা কথা আছে, আপনি বাহিরের খবর কিছু রাখেন ?"
     স্ত্রী | কি খবর বুঝিলাম না | তা' বাহিরের খবরের জন্য এখানে আমার কছে কেন ? বাহিরে অনেক লোক আছে |
     দে | এখানে প্রয়োজন আছে |
     স্ত্রী | আপনার কথা আমি ভাল বুঝিতে পারিতেছি না-আপনার অভিপ্রায় কি, স্পষ্ট বলুন | আপনার নামটি জানিতে পারি কি ?
     দে | আমার নাম দেবেন্দ্রবিজয়-আমি পুলিস-কর্ম্মচারী |
     শুনিয়া স্ত্রীলোকটি চমকিত হইল | বিস্মিতনেত্র দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "আপনার কি প্রয়োজন, বলুন ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "লতিমন সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন ?"
     পুনরপি স্ত্রীলোকটি চমকিত হইল; বলিল, "সে ত ঘরের সংবাদ - জানি | আপনি তাহার সম্বন্ধে কি জানিতে চাহেন বলুন |"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " লতিমন বাই খুন হইয়াছে-মেহেদী-বাগানে তাহার লাস পাওয়া গিয়াছে |"
     স্ত্রীলোকটি বলিল, "আপনার ভ্রম হইয়াছে |"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " আমার ত তা' বোধ হয় না | এই দেখুন দেখি, এটা চিনিতে পারেন কি না |" বলিয়া তিনি সাগ্রহে কাপড়ে জড়ান সেই ওড়্নাখানি বাহির করিয়া তাহার হাতে দিলেন | ওড়্নাখানি দেখিয়া সেই স্ত্রীলোকটির হৃদয় অত্যন্ত উদ্বেগপূর্ণ হইয়া উঠিল এবং মুখমণ্ডলে সে চিহ্ণ সুস্পষ্ট প্রকটিত হইল | সোদ্বেগে কম্পিতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, "হাঁ, চিনিতে পারিয়াছি-ইহা আপনি কোথায় পাইলেন ?"
     দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " মেহেদী-বাগানে যে স্ত্রীলোকটি খুন হইয়াছে, তাহারই গায়ে ইহা ছিল |"
     শুনিয়া স্ত্রীলোকটি দুইপদে পশ্চাতে হটিয়া গেল-কি এক ভয়ানক আশঙ্কায় তাহার চোখ-মুখ একবারে বিবর্ণ হইয়া গেল | রুদ্ধশ্বাসে কহিল, " কি সর্ব্বনাশ ! এ কি ভয়ানক ব্যাপার !"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " ব্যাপার গুরুতর, লতিমন খুন হইয়াছে |"
     দারুণ উৎকণ্ঠার সহিত সেই স্ত্রীলোকটি বলিল, " না-পনি ভুল করিয়াছেন, লতিমন খুন হয় নাই |"
     দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " আপনি কিরূপে জানিলেন, লতিমন খুন হয় নাই ?"
     স্ত্রীলোকটি ব্যাকুল্ভাবে বলিল, "আমারই নাম লতিমন |"
     দেবেন্দ্রবিজয় বিস্ময়বিহলনেত্রে লতিমনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন |

অষ্টম পরিচ্ছেদ
নুতন রহস্য

      লতিমন মলিল, "হাঁ, ওড়্না আমারই বটে, আপনি কিরূপে ইহা জানিতে পারিলেন ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " আমি এই ওড়না লইয়া করিমের মার কাছে গিয়াছিলাম | তাহারই মুখে শুনিলাম, আপনি তাহার নিকট হইতে এই ওড়্না তৈয়ারী করিয়া লইয়াছেন | এই ওড়না যদি আপনার-আপনারই নাম লতিমন বাই-তবে মেহেদী-বাগানে যে স্ত্রীলোকটি খুন হইয়াছে, সে কে ?"
      এবার লতিমন বাই আকুলভাবে কাঁদিয়া ফেলিল | দেবেন্দ্রবিজয় কারণ বুঝিতে না পারিয়া আরও বিস্মিত হইলেন |
লতিমন কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, "হায় ! হায় ! কি সর্ব্বনাশ হ'ল গো-আমাদেরই সর্ব্বনাশ হয়েছে ! মেহেদী-বাগানে যে মেয়েমানুষটি খুন হয়েছে-তার কাপড়-চোপড় কি রকম ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " সকলই নীলরঙের সিল্কের তৈয়ারী | সাঁচ্চার কাজ করা |"
      লতিমন বাই হতাশভাবে বলিল, "তবেই ঠিক হয়েছে |
      "ঠিক হয়েছে কি?"
      "আমাদের দিলজানই খুন হয়েছে |" বলিয়া লতিমন দুই হাতে মুখ ঢাকিল |
      দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন রহস্য ক্রমশঃ নিবিড় হইতেছে-এই রহস্যের মর্ম্মভেদ বড় সহজে হইবে না | তিনি একখানি ফটোগ্রাফ বাহির করিয়া লতিমনকে দিয়া কহিলেন, "চিনিতে পারো কি ?"
      লতিমন বাই দেখিবামাত্র কহিল, " এ দিলজান বাইএর চেহারা; কিন্তু মুখখান যেন কেমন-এক-রকম ফুলো ফুলো দেখাইতেছে |"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " দিলজানের মৃত্যুর পর এই ফোটো লওয়া হইয়াছে-বিষে মুখখানা ফুলিয়া উঠিয়াছে |"
      "বিষে?"
      "হাঁ, গত বুধবার রাত্রে কেহ বিষাক্ত ছুরিতে তাহাকে হত্যা করিয়াছে |"
      "গত বুধবার রাত্রে ! সেইদিনেই সে আমার নিকট হইতে এই ওড়্না লইয়া বাহির হইয়াছিল," বলিয়া লতিমন বাই পুনরায় ক্রন্দনের উপক্রম করিল |
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " দেখুন, এখন কান্নাকাটি করিলে সকল দিক নষ্ট হইবে | দিলজান সম্বন্ধে আপনি যাহা কিছু জানেন, আমাকে বলুন | দিলজানের হত্যাকারীর অনুসন্ধানে আমি নিযুক্ত হইয়াছি-যাহাতে হত্যাকারী ধরা পড়ে, সেজন্য আপনার সর্ব্বতোভাবে চেষ্টা করা উচিৎ | বোধ হয়, আপনার সাহায্যে আমি প্রকৃত হত্যাকারীকে সহজে গ্রেপ্তার করিতে পারিব |"
      লতিমন বাই চোখের জল মুছিয়া ভাল হইয়া বসিল | বলিল, "যাহাতে হত্যাকারী ধরা পড়ে সেজন্য যতদূর সাহায্য আমার দ্বারা হইতে পারে, তাহা আমি করিব | দিলজানকে আমি সহোদরা ভগ্নী অপেক্ষাও স্নেহ করিতাম | আমি যাহা কিছু জানি, সমুদয় আপনাকে এখনই বলিতেছি; কিন্তু কে তাহাকে হত্যা করিল-আমি ভাবিয়া কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছি না | কে জানে, কে তাহার এমন ভয়ানক শত্রু ! সে কাহারও সঙ্গে মিশিত না-কাহারও সঙ্গে সঙ্গে তাহার বাদ-বিসংবাদ ছিল না-একমাত্র মনিরুদ্দীনকে সে খুব ভালবাসিত | মনিরুদ্দীন তাহাকে কোথা হইতে আনিয়া আমার এখানে রাখিয়াছিলেন | মনিরুদ্দীন তাহাকে বিবাহ করিবে বলিয়া মধ্যে মধ্যে আশা দিতেন | দিলজানও সেজন্য তাঁহাকে যখন-তখন পীড়াপীড়ি করিত | ইদানীং মনিরুদ্দীন বড় একটা এদিকে আসিতেন না-আসিলে তখনই চলিয়া যাইতেন | তিনি ইদানীং আর একজন সুন্দরীর রূপ-ফাঁদে পড়িয়াছিলেন |"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " আমি তাহাকে জানি-সে সুন্দরীর নাম সৃজান নয় কি ?"
      লতিমন সবিস্ময়ে কহিলেন, "হাঁ, সৃজান | আপনি কিরূপে নাম জানিলেন ? এই সৃজান বিবিকে লইয়া দিলজানের সহিত মনিরুদ্দীনের প্রায় বচসা হইত | সপ্তাহ-দুই হইবে, আমি মজ্রো করিতে বিদেশে যাই | যখন ফিরিয়া আসিলাম-দেখি, দিলজানের সে ভাব আর নাই-মনিরুদ্দীনের উপরে সে একবারে মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে | শুনিলাম, দিলজান কিরূপে জানিতে পারিয়াছে-মনিরুদ্দীন সৃজানকে কুলের বাহির করিবার মতলব ঠিক করিয়াছে | দিলজানকে আমি অনেক করিয়া বুঝাইতে লাগিলাম; আমার একটা কথাও তাহার কানে গেল না | সে বলিল, যদি তাহাই হয়-তাহা হইলে সে দুইজনকে খুন না করিয়া ছাড়িবে না | গত বুধবার রাত্রে মনিরুদ্দীন সৃজানকে লইয়া সরিয়া পড়িবার বন্দোবস্ত করিয়াছিল | সেইদিনেই দিলজান একটা মতলব ঠিক করিল-চতুরের সহিত চাতুরী করিতে হইবে | সৃজানকে কোন রকমে আটক করিয়া নিজেই মনিরুদ্দীনের সঙ্গ গ্রহণ করিবে |"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, " তাহা হইলে মেহেদী-বাগানের খুনের রাত্রেই এখানে এই ঘটনা হয় |"
      লতিমন বলিতে লাগিল, " সেইদিন অপরাহ্ণে দিলজান যখন মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যায়, তখন মনিরুদ্দীন বাড়ীতে ছিলেন না | যে বাঁদী মাগী ইহার ভিতরে ছিল, তাহাকে কিছু ইনাম্ দিয়া দিলজান তাহার নিকট হইতে বেবাক্ খবর বাহির করে | কখন কোন্ সময়ে ঘটনাটা ঘটিবে-কোথায় গাড়ী ঠিক থাকিবে, তামাম খবর লইয়া সে সন্ধ্যার পর আবার এখানে ফিরিয়া আসে | তাহার পর রাত দশটার সময়ে নিজে সাজিয়া-গুজিয়া বাহির হইয়া যায়; যাইবার সময়ে আমার ওড়্নাখানি চাহিয়া লইয়াছিল | তাহার পর আমি আর তাহার কোন খবর পাই নাই | মনে করিয়াছিলাম, সে তাহার মতলব ঠিক হাসিল্ করিয়াছে-সৃজানকে ফাঁকি দিয়া সে নিজেই মনিরুদ্দীনের সঙ্গে চলিয়া গিয়াছে |"
      দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, " আপনি কি ইতিপূর্ব্বে মেহেদী-বাগানের খুনের কথা কিছুই শোনেন নাই ?"
লতিমন বাই কহিল, "শুনিয়াছিলাম, কিন্তু ঐ খুনের সঙ্গে আমাদের দিলজানের যে কোন সংশ্রব আছে, এ কথা আমার বুদ্ধিতে আসে নাই |"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "মেহেদী-বাগানের নিকটে মনিরুদ্দীনের বাড়ী | বুধবার রাত্রে দিলজান মেহেদী-বাগানে গিয়া যে খুন হইয়াছে, সে সম্বন্ধে আর কোন সন্দেহ নাই | এখন দেখিতে হইবে খুনী কে ? আপনি জানেন কি দিলজানের প্রতি কাহারও কখন কোন বিদ্বেষ ছিল কি না ?"
      " না, কই এমন কাহাকেও দেখি না|"
      দেবেন্দ্রবিজয় চেয়ার ছাড়িয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন | বলিলেন, আচ্ছা, আমি সময়ে আবার আপনার সহিত দেখা করিব | আর একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে; ইহার ভিতরে কি ছিল বলিতে পারেন ?" বলিয়া সেই ছুরির বাক্স দুইটি লতিমনের হাতে দিলেন |
      লতিমন কহিল, "কি সর্ব্বনাশ ! দুইখানি ছুরি যে নাই, দেখ্ছি |"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "একখানি আমার কাছে আছে-আর একখানি কোথায় গেল ?"
      লতিমন কহিল, "বুধবার রাত্রে দিলজান যাইবার সময়ে একখানা ছুরি সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়াছিল | যদি কৌশলে তাহার সঙ্কল্প সিদ্ধ না হয়, সেই ছুরি দ্বারা সে নিজের সঙ্কল্প সিদ্ধ করিবে স্থির করিয়াছিল | আমি ত পূর্ব্বেই আপনাকে বলিয়াছি, মনিরুদ্দীনের উপরে সে একবারে এমন মরিয়া হইয়া উঠিয়াছিল যে যদি মনিরুদ্দীন তাহাকে নিরাশ করেন, মনিরুদ্দীনকেও সে হত্যা করিতে কুণ্ঠিত নহে | সেই অভিপ্রায়েই দিলজান ছুরিখানা সঙ্গে লইয়াছিল |"
      দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, "তাহা হইলে প্রয়োজনমত মনিরুদ্দীনকেই হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে দিলজান ছুরিখানি সঙ্গে লইয়াছিল, নিজেকে নিজে খুন করে, এমন অভিপ্রায় তাহার ছিল না ?"
      লতিমন কহিল, "না, আত্মহত্যা করিবার কথা তাহার মুখে একবারও শুনি নাই-সে অভিপ্রায় তাহার আদৌ ছিল না | দিলজানের এদিকে সব ভাল ছিল-কিন্তু রাগলেই মুস্কিল-একেবারে মরিয়া | সে কথা যাক্, আপনি এখন এ ছুরিখানা লইয়া কি করিবেন ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " এখানা আমার অনেক কাজে লাগিবে বলিয়া, আমি ছুরিখানি লইয়াছি | প্রথমতঃ পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে, এই ছুরি বিষাক্ত কিনা | যদি বিষাক্ত হয়-দিলজান যে ছুরিখানি লইয়া গিয়াছে-সেখানিও বিষাক্ত হওয়া ষোল আনা সম্ভব | বাক্স দেখিয়া বুঝিতে পারিতেছি, দুইখানি একই প্রকার | তাহার পর এই ছুরি কোন একটা বিড়াল বা কুকুরের গায়ে বিদ্ধ করিলেই বুঝিতে পারিব-ইহার বিষে কতক্ষণে কিরূপভাবে মৃত্যু ঘটে, মৃত্যুর পরের লক্ষণই বা কিরূপ হয় | যদি লক্ষণগুলি দিলজানের সহিত ঠিক মিলিয়া যায়-তবে বুঝিতে পারিব, এই একজোড়া ছুরির অপরখানিতেই দিলজানের মৃত্যু ঘটিয়াছে |"
      লতিমন শিহরিত হইয়া কহিল, "দিলজানের ছুরি লইয়া দিলজানকেই খুন করিয়াছে, কে এমন লোক ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "এখন তাহার সন্ধান করিয়া দেখিতে হইবে |"
      লতিমন কহিল, " হতভাগী আত্মহত্যা করে নাই ত ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "আত্মহত্যা করিয়াছে বলিয়া বোধ হয় না ; আর স্ত্রীলোকে পথে-ঘাটে এইরূপে কখনও আত্মহত্যা করে না | খুবই সম্ভব, দিলজানের কোন শত্রু তাহাকে রাত্রে নির্জন গলিমধ্যে একা পাইয়া খুন করিয়াছে ! যাহা হউক, সময়ে সকলেই প্রকাশ পাইবে-এখন উঠিলাম |"
      লতিমন জিজ্ঞাসা করিল, " আবার কখন আপনার দেখা পাইব ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "দুই-একদিনের মধ্যে আবার আমি আসিতেছি |" এখন একবার সন্ধান লইতে হইবে, খুনের রাত্রে মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে কি ব্যাপার ঘটিয়াছিল |"
      উপস্থিত অনুসন্ধান অনেকাংশে সফল হইয়াছে মনে করিয়া, দেবেন্দ্রবিজয় প্রসন্নমনে লতিমনের গৃহত্যাগ করিয়া বাহিরে আসিলেন |

 

নবম পরিচ্ছেদ
বেনামী পত্র

      লতিমনের বাটী ত্যাগ করিয়া বাহির হইবামাত্র একটী মুসলমান বালক ছুটিয়া আসিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের হাতে একখানি পত্র দিল। বলিল, "বাবু, আপনার পত্র।"
      দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, পত্রের খামে তাঁহারই নাম লিখিত রহিয়াছে। বালককে জিজ্ঞাসা করিলেন, "এ পত্র তুই কোথায় পাইলি?"
      বালক কহিল, "একজন বাবুলোক দিয়ে গেছে।"
      দেবেন্দ্রবিজয় তখনই খাম ছিঁড়িয়া, পত্রখানি বাহির করিয়া পড়িতে লগিলেন;-
"দেবেন্দ্রবিজয়!
      বৃথা চেষ্টা-তুমি আমাকে কখনও ধরিতে পারিবে না-তোমার ন্যায় নির্ব্বোধ গোয়েন্দার এ কর্ম্ম নহে। আমি তোমাকে গ্রাহ্যই করি না। তোমার মত বিশ-পঁচিশটা গোয়েন্দাকে আমি কেনা-বেচা করিতে পারি-সে ক্ষমতা আমার খুব আছে। যাহা হোউক, এখনই এমন কাজে ইস্তফা দাও নতুবা প্রাণে মরিবে। তোমার মত শতটা অকর্ম্মা গোয়েন্দা আমার কিছুই করিতে পারিবে না। তোমাকে আমি এখন হইতে সাবধান করিয়া দিতেছি, আমাকে বিরক্ত করিতে চেষ্টা করিয়ো না। এ পত্র পাইয়াও যদি তুমি বাহাদুরী দেখাইতে যাও-তাহা হইলে যদি কিছু বিষয়-সম্পত্তি থাকে, তাহা উইল করিয়া কাজে হাত দিবে। আমার ত মনে খুব বিশ্বাস, তোমার মত গোয়েন্দার হাতে আমি কখনও ধরা পড়িব না-যদি তেমন কোন সম্ভবনা দেখি-যদি ফাঁসীর দড়ীতে একান্তই ঝুলিতে হয়, তোমাকে খুন করিয়া ফাঁসী যাইব। তুমি যখন যেখানে যাইতেছ, যখন যাহা করিতেছ, আমি সকল খবরই রাখি। আমি সর্ব্বদা তোমার পিছু পিছু ফিরিতেছি। তাহাতে বুঝিতে পারিয়াছি-তুমি এখনও ঘোর অন্ধকারে আছ-অন্ধকারে অন্ধের মত ঘুরিয়া বেড়াইতেছ। তুমি একটা আস্ত বোকা, সেইজন্য তোমাকে আমি একতিল ভয় করি না।
সেই
মেহেদী-বাগানের খুনী।"
      পত্রখানি পাঠ করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন। বুঝিলেন, তিনি যাহার অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, সে বড় সহজ লোক নহে। দেবেন্দ্রবিজয় পত্র হইতে দৃষ্টি নামাইয়া সম্মুখস্থ বালকের মুখের দিকে চাহিবামাত্র, সেই বালক তাঁহার খুব উপকার করিয়াছে মনে করিয়া বলিল, "বাবু বখা্‌শিশ দিনা্‌। যে বাবু আমার হাতে পত্র দিয়া গেল, সে বাবুর কছে একেবারে একটাকা বখা্‌শিশ পেয়েছি, এই দেখুন।" বলিয়া বালক বামহস্তের মুষ্টিমধ্যে হইতে চাকচিক্যময় একটি টাকা বাহির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখাইল।
      দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, "তুই সে বাবুকে চিনিস? আর কখনও দেখিয়াছিসা্‌?"
      বালক কহিল, "না বাবু।"
      দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, " সেই বাবুর চেহারা কি রকম?"
      বালক সেই পত্রদাতার যেরূপ বর্ণনা করিল, তাহাতে পত্রগ্রহীতার কিছুমাত্র উপকার দর্শিল না।
      দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, " এ পত্র যে আমাকে দিতে হইবে, তুই তা' কি ক'রে জানা্‌লি?"
বালক বলিল, " সেই বাবু আমার হাতে এই পত্রখানা দিয়ে ব'লে গেল এই বাড়ী থেকে এখনই যে একজন বাঙ্গালী বাবু বেরুবে, তার হাতে এই পত্রখানা দিবি।"
      দে। সে কতক্ষণের কথা?
      বা। এই খানিক আগে।
      দে। সে বাবু কোনা্‌ দিকে গেল।
      বা। এইদিক দিয়ে বরাবর সোজা চ'লে গেল।
      দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, এখন তাহার অনুসরণ করা বৃথা-এতক্ষণ সে কোথায়-কোনা্‌পথে চলিয়া গিয়াছে, ঠিক করা কঠিন।
      দেবেন্দ্রবিজয়কে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া বালক পুনরপি বলিল, "হজুর, আমার বখা্‌শিশ?"
      দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, " সেই বাবুকে যদি তুই কোন রকমে চিনাইয়া দিতে পারিস, কি তার বাড়ী কোথায় আমাকে ব'লে দিতে পারিসা্‌ তোকে আমি দশ টাকা বখা্‌শিশ দিব।"
      বালক বলিল, " আমি দিন-রাত ঘুরে ঘুরে চেষ্টা ক'রে দেখব, যদি তাকে আমি দেখতে পাই, ঠিক আপনাকে খবর দেব। কোথায় আপনার দেখা পাব?"
      দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে নিজের ঠিকানা বলিয়া দিলেন; কিন্তু মনে মনে বুঝিলেন, এই বালক দ্বারা তাহার বিশেষ কোন কাজ হইবে না; পত্রলেখক লোকটি যেরূপ চতুর দেখিতেছি, তাহাতে অবশ্যই সে ছদ্মবেশে আসিয়া থাকিবে। তিনি বালককে পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, " সে বাবুর দাড়ী গোঁফ ছিল?"
      বালক কহিল, "হাঁ, খুব মস্ত মস্ত দাড়ী গোঁফ, মস্ত মস্ত চুল-চোখে নীল রঙের চশমা।"
      দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিতে পারিলেন, তাঁহার অনুমান ঠিক-লোকটি ছদ্মবেশেই আসিয়াছিল। বালককে বলিলেন, " তবে আর তুই সে লোককে দেখিতে পাইবি না-তোর অদৃষ্টে আর বখা্‌শিশের টাকাগুলো নাই দেখা্‌ছি।"
      অনন্তর দেবেন্দ্রবিজয় বালককে বিদায় করিয়া দিলেন এবং নিজে মনিরুদ্দীনের বাটী অভিমুখে চলিলেন।                                                        

                                                                                                 

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।