রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

নীল বসনা সুন্দরী

চতুর্থ খণ্ড
নিয়তি - ছদ্মবেশা

" Nature naver made
A heart all marble, but all in its fissures sows
The wild flower Love; from whose rich seeds spring forth
A word of mercies and sweet charities,"
Barry Cornwall.


প্রথম পরিচ্ছেদ
স্বপক্ষে না বিপক্ষে?

        মজিদ খাঁ এইরূপ বিপদ্গ্রস্ত হওয়ায় তাঁহার বন্ধুবর্গের মধ্যে মোবারক উদ্দীনকেই সর্ব্বপেক্ষা অধিক দুঃখিত বোধ হয়। কেবল দুঃখিত কেন, তিনি যে মজিদ খাঁর বন্দিত্বে যথেষ্ট অনুতপ্ত, তাহা তাঁহার ভাবগতিকে এখন অনেকেই অনুমান করিতেছেন। তাঁহার একটিমাত্র কথার জন্য আজ মজিদ খাঁ কারারুদ্ধ। যেখানে কত অসংখ্য দস্যু, নরহন্তা, তস্কর তাহাদের পদচিহ্ণ রাখিয়া গিয়াছে, সেইখানে আজ তাঁহারই দোষে নিরপরাধ মজিদ খাঁ লুণ্ঠিত হইতেছেন; ইহাতে কাহার না হৃদয় ব্যথিত হয়? সেদিন খুনের রাত্রে মজিদ খাঁর সহিত যে, তেমন সময়ে মেহেদী-বাগানে তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, এ কথা যদি তিনি নিজের এজাহারে পূর্ব্বে প্রকাশ না করিতেন, তাহা হইলে ত মজিদ খাঁকে আজ হত্যাপরাধে অভিযুক্ত হইয়া অকারণ কারাকূপে নিক্ষিপ্ত হইতে হইত না।
       অদ্য অপরাহ্ণে কলিঙ্গা-বাজারে রাজাব-আলির বহির্ব্বাটীর নিম্নতলস্থ প্রশস্ত বৈঠকখানায় বসিয়া তাঁহার পুত্র সুজাত-আলির সহিত মোবারক-উদ্দীনের নিভৃতে এইরূপ কথোপকথন হইতেছিল। সঙ্গে সঙ্গে মদ্যপানও চলিতেছিল। বাল্যে উভয়ে এক ক্লাসের ফ্রেণ্ড ছিল, যৌবনে এখন এক গ্লাসের ফ্রেণ্ডে পরিণত হইয়াছে-এইটুকু পরিবর্ত্তন।
       মোবারক বলিল, "আমার দোষেই বৈ কি; কে জানে যে এমন হইবে? তাহা হইলে কি আমার মুখ দিয়া একটা কথাও প্রকাশ পায়! প্রকাশ করিবার ইচ্ছাটাও আমার ছিল না; কথায় কথায়- ডিটেক্টিভ দেবেন্দ্রবিজয় লোকটা বড় ধড়ীবাজ-আমার কাছ থেকে এমনভাবে কথাটা বাহির করিয়া লইল যে, কাজটা ভাল করিতেছি, কি মন্দ করিতেছি-আমি তখন তাহা বিবেচনা করিয়া দেখিবারও অবসর পাইলাম না। লোকটা ভয়ানক বদলোক-আমার সেই কুকুরটাকেও নিকেশ করিয়াছে।"
       সুজাত বলিল, "এখন শুনিতে পাই, সে ছুরিতে যে দিলজান খুন হইয়াছে, দেবেন্দ্রবিজয় তাহা এখন ঠিক প্রমাণ করিতে পারিতেছে না। মজিদকে দোষী বলিয়া আমার একবারও মনে হয় না।"
       মুখের কথা লুফিয়া লইয়া মোবারক বলিল, "কেনই বা হইবে? মজিদ খাঁকে যে জানে, সে কখনই ইহা বিশ্বাস করিবে না। আরও ভাবিয়া দেখা উচিত, কেনই বা সে দিলজানকে খুন করিতে যাইবে? কারণ কি? এমন একটা ভয়ানক খুন-অবশ্যই ইহার একটা কারণ থাকা চাই। মজিদের সঙ্গে দিলজানের কোন সম্বন্ধই নাই। দেবেন্দ্রবিজয় লোকটা পাকা ডিটেক্টিভ হইলেও কাজটা বড়ই অন্যায় করিয়াছে। কেবলমাত্র সেই ছুরির উপর নির্ভর করিয়া, একজন নির্ব্বিরোধ ভদ্রলোককে অকারণ টানাটানি করা কাজটা তাহার নিতান্ত গর্হিত হইয়াছে। মজিদ কোন্ উদ্দেশ্যে দিলজানকে খুন করিবে? তাহাকে ধরিয়া পুলিস অনর্থক পীড়াপীড়ি করিতেছে; বরং মনিরুদ্দীনকে-"বলিতে বলিতে মোবারক মধ্যপথে সহসা চুপ করিয়া গেল।
       সুজাত বলিল, "মনিরুদ্দীনও বড় বাদ যাইবে না। আমার বোধ হয়, তাহাকেই শেষে বেশি জড়াইয়া পড়িতে হইবে। দেবেন্দ্রবিজয় যখন ইহাতে হাত দিয়াছে, তখন একটা-না-একটা কিছু না করিয়া ছাড়িতেছে না। এদিকে মনিরুদ্দীনেরও সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। তাহার সঙ্গে দেখা করিতে আজ মুন্সী সাহেব, দেবেন্দ্রবিজয় ও উকীল হরিপ্রসন্ন বাবু সকলে একসঙ্গে রওনা হয়েছেন।"
       সুজাত বলিল, "হাঁ, সৃজান বিবিও সেখানে আছে।"
       মোবারক জিজ্ঞাসা করিল, "কোথায়-এই শহরে না কি?"
       সুজাত বলিল, "সহরে না-ফরিদপুরে মনিরুদ্দীনের নিজের যে একটা বাগান-বাড়ী আছে, দুজনে মিলিয়া সেখানে সুখে-স্বচ্ছন্দে নিরিবিলি বাস করিতেছে। এইবার যত গোলযোগ আরম্ভ হইল, আর কি।"
মোবারক বলিল, "খুব গোলযোগ-মনিরুদ্দীনের একটা খুবই দুর্নাম রটিয়া গেল। এদিকে জোহেরার সঙ্গে তাহার বিবাহের কথা হইতেছিল, তা' আর ঘটিতেছে না, দেখিতেছি। জোহেরা যদিও সম্মত হইত, এখন সে কিছুতেই মনিরুদ্দীনকে বিবাহ করিবে না। মনিরুদ্দীন নিতান্ত নির্ব্বোধ-সৃজানের লোভে এমন একটা স্বর্ণসুযোগ ছাড়িয়া দিল।"
       সুজাত বলিল, "মনিরুদ্দীনের আর স্বর্ণসুযোগ কি? স্বর্ণসুযোগ মজিদ খাঁর। মনিরুদ্দীনের এ দুর্নামটা না রটিলেও জোহেরা তাহাকে বিবাহ করিত না। তাহা হইলে কি বিবাহ এতদিন বাকী থাকে! মুন্সী সাহেব অনেক চেষ্টা করিয়াছিলেন; জোহেরা কিছুতেই স্বীকার করে নাই। কেনই বা করিবে, অগাধ ঐশ্বর্য্য-নিজেই সর্ব্বেসর্ব্বা-তার উপরে আবার সে লেখাপড়া-জানা মেয়েমানুষ-পরের মতে মত দিবার মেয়েই নয়! এ রত্ন মজিদ খাঁর ভাগ্যেই আছে!"
       মোবারক বলিল, "আমার ত আর তাহা মনে হয় না। যদিও মজিদ মুক্তি পায়-এ দুর্নাম কি তাহার সহজে যাইবে, মনে করিয়াছ? আমার বিশ্বাস, জোহেরা এখন আর মজিদকেও বিবাহ করিতে রাজী হইবে না। আমার কথাটা ঠিক কি না, পরে দেখিতে পাইবে।"
       সুজাত জিজ্ঞাসা করিল, "কেন, কিসে তুমি জানিলে?"
       মোবারক বলিল, "আমি এখন নিজেই মজিদ খাঁর পদপ্রার্থী।"
       সুজাত চমকিত হইয়া বলিল, "দূর-মিথ্যাকথা!"
       মোবারক বলিল, "মিথ্যা নয়; অতি সত্যকথা। আমি এতদিন জোহেরাকে দেখি নাই-সেদিন তাহাকে দেখিয়া একেবারে মুগ্ধ হইয়াছি। আমি কিছুতেই আর তাহার আশা ত্যাগ করিতে পারিব না।"
সুজাত হাসিয়া বলিল, "তুমি না আশা ত্যাগ করিলেই যে , তোমার আশা নিশ্চয় পূর্ণ হইতেই হইবে, এমন কি কথা? মজিদ মধ্যে থাকিতে তুমি কিছুতেই জোহেরাকে লাভ করিতে পারিবে না।"
       মোবারক বলিল, "একবার চেষ্টা করিয়া দেখিতে ক্ষতি কি আছে?"
       সুজাত বলিল, "সহস্র চেষ্টাতেও তুমি কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিবে না। জোহেরা কখনই তোমার প্রস্তাবে সম্মত হইবে না। সে যদি তোমাকে বিবাহ করে, আমার নাম সুজাত-আলি নয়।"
মোবারক দৃঢ়স্বরে বলিল, "যদি আমি জোহেরাকে বিবাহ করিতে না পারি-আমার নামও মোবারক-উদ্দীন নয়।"


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পট-পরিবর্ত্তন

         যখন মোবারক ও সুজাত-আলির মধ্যে এইরূপ তর্কবিতর্ক চলিতেছে, তখন এদিকে পাংসা স্টেশনে একখানি ট্রেন আসিয়া লাগিল। তাহার একটি কাম্রা হইতে তিন ব্যক্তি ব্যস্তভাবে নামিয়া পড়িল-মুন্সী জোহিরুদ্দীন, ডিটেক্টিভ দেবেন্দ্রবিজয় এবং উকীল হরিপ্রসন্ন।
       ফরিদপুর জেলার উত্তর-পূর্ব্বভাগে পাংসা অবস্থিত। সেখান হইতে একমাইল দূরে মনিরুদ্দীনের বাগান-বাটী। স্টেশন ত্যাগ করিয়া তখনই তিনজনে সেই বাগানের দিকে চলিলেন।
       পথিমধ্যে দেবেন্দ্রবিজয় উকীল হরিপ্রসন্ন বাবুকে বলিলেন, "সেই ভাঙ্গা ছুরিখানি খুনের রাতে মজিদ খাঁর বাসাতেই ছিল-মজিদ খাঁ তাহা সঙ্গে করিয়া বাহির হ'ন্ নাই, এরূপ স্থলে এই ছুরিদ্বারা দিলজান যে খুন হয় নাই, আপনি এখন হামিদা দ্বারা প্রমাণ দিতে চেষ্টা করিবেন; কিন্তু তাহাতে আপনি কতদূর কৃতকার্য্য হইবেন, বলিতে পারি না। ঐ ছুরি দিলজান সঙ্গে লইয়া বাহির হইয়াছিল; আর মজিদ খাঁই মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে দিলজানের নিকট হইতে ঐ ছুরি কাড়িয়া লইয়াছেন, ইহা যখন স্পষ্ট জানা যাইতেছে-পরে স্পষ্টরূপে প্রমাণীকৃতও হইবে, তখন হামিদার কথা কতদূর টিকিবে তাহা আপনি সহজেই বুঝিতে পারিতেছেন। মজিদ খাঁর নিকটে যখন ছুরিখানি পাওয়া যাইতেছে, তখন ঐ ছুরিতেই দিলজান খুন হইয়াছে, ইহা খুবই সম্ভব; ইহাতে সন্দেহের কিছুই নাই।"
       হরিপ্রসন্ন ববু বলিলেন, "এ সংসারে লোকও আনেক আছে-ছুরিও অনেক আছে।"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তাহা সত্য; কিন্তু ঐ ছুরিখানিই যখন দিলজানের সেই বিষাক্ত ছুরি বলিয়া জানা যাইতেছে-এবং যখন বিষাক্ত ছুরিই দিলজানের মৃত্যুর কারণ, তখন কে বিশ্বাস করিবে, দিলজান অন্য একখানা ছুরিতে খুন হইয়াছে?"
       হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "সকলই প্রমাণের উপরে নির্ভর করিতেছে। বেশই বুঝা যাইতেছে, একটা দুর্গম রহস্যের ভিতরে সকলই প্রছন্ন রহিয়াছে।"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আমারও তাহাই অনুমান-আমরা একটা দুর্লঙ্ঘ্য রহস্য-ব্যুহের চারিদিক্ বেড়িয়া, অন্ধের ন্যায় ঘুরিয়া বেড়াইতেছি; ভেদ করিয়া যাইবার পথ এখনও খুঁজিয়া পাই নাই। আমার বোধ হয়, সেদিন রাত্রিতে মজিদ খাঁর সহিত সৃজান বিবির যে সকল কথোপকথন হইয়াছিল, তাহা যদি এখন কোন রকমে জানিতে পারা যায়, তাহা হইলে সহজে আপনা হইতে সত্যাবিষ্কার হইয়া পড়ে, আর কোন গোল থাকে না।"
       মুন্সী সাহেব বলিলেন, "বুঝিয়াছি, আপনাদের মনে ধারণা, আমার স্ত্রীর দ্বারাই দিলজান খুন হইয়াছে।"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "যতক্ষণ সৃজান বিবির সহিত দেখা না হইতেছে, ততক্ষণ আমাদিগের ধারণা কতদূর সত্য, বুঝা যাইতেছে না।"
       যথাসময়ে তাঁহারা সেই বাগানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সুন্দর সাজান বাগান। তখন সন্ধ্যার তরল অন্ধকারে চারিদিক্ আছন্ন হইতে আরম্ভ হইয়াছে। সম্মুখে স্বচ্ছ জলপূর্ণ নীল দীর্ঘিকা সেই তরল অন্ধকরে গভীর নীলবর্ণ দেখাইতেছে। তাহার বক্ষে পার্শ্বস্থিত প্রেতবৎ বড় বড় গাছগুলার দীর্ঘতর প্রতিবিম্ব আসিয়া পড়িয়াছে-এবং ঝিল্লিমন্দ্রে চারিদিক্ মুখরিত। দীর্ঘিকার অপর পারে একখানি সুন্দর ছোট দ্বিতল বাটী। সেই বাটীর উপরিতলস্থ দুই-একটি কক্ষে দীপ জ্বলিতেছে। এবং উন্মুক্ত গবাক্ষ-পথ দিয়া সেই দীপলোক নিকটবর্ত্তী দেবদারুশ্রেণীর উপরে আসিয়া পড়িয়াছে। সকলে সেই বাটী-অভিমুখে চলিলেন। দ্বার-সম্মুখে আসিয়া একজন ভৃত্যকে দেখিতে পাইলেন।
       দেবেন্দ্রবিজয় সেই ভৃত্যকে বলিলেন, "মনিরুদ্দীন সাহেবকে সাথ, একদফে মোলাকাৎ কর্না চাহিয়ে; তুম জলদী খবর দেও।"
       ভৃত্য বলিল, "সাহাব খানা-পিনা কর্কে বারা বাজাকে ট্যরেণ্মে সহর্মে চলা গ্যয়া।"
হরিপ্রসন্ন বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, "মল্লিক সাহাব কো সাথ্ যো বিবি সাহাব অ-রহা, উন্নে অযবি কাঁহা হৈ? সাহাবকে সাথ্ তো গ্যয়া নেহি?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "বিবি সাহেব আর কোথায় যাইবেন, এইখানেই আছেন। (ভৃত্যের প্রতি) আব্বি তুম্ বিবি সাহাব্কী খবর দেও।"
       ভৃত্য সঙ্কুচিতভাবে কহিল, "হুজুর, আব্বি সাহাব্কী সাথ্ কেঁও কর-"
       দেবেন্দ্রবিজয় বাধা দিয়া বলিলেন, "জল্দি খবর দেও, ন্যহিতো তুম্হারা বিবি সাহাব্কী বহুৎ মুস্কিল হোগা!"
       অনন্যোপায় ভৃত্য তাঁহাদিজকে নিম্নতলস্থ একটি কক্ষে লইয়া গিয়া বসাইল। এবং 'বিবি সাহেবের' নিকটে সংবাদ লইয়া উপরিতলে উঠিয়া গেল।
       ঘরটি ছোট-টেবিল, কৌচ, আল্মারী, চেয়ার ও ছবিতে সুন্দররূপে সাজান। এক কোণে একটা বড় টেবিল-হার্মোনিয়ম রহিয়াছে, তাহার পার্শ্বে বাঁয়া তবলা, মৃদঙ্গ, সারঙ্গ, সেতার, এস্রাজ-কয়েকটা বাদ্যযন্ত্র পড়িয়া রহিয়াছে।
       সকলে নীরবে সেই ছোট ঘরটিতে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইল না। কক্ষের বাহিরে কাহার মৃদু পদধ্বনি শুনা গেল। তখনই পার্শ্ববর্ত্তী একটি কক্ষের দ্বারসম্মুখস্থ পর্দ্দা উঠিয়া দীর্ঘাবয়বসম্পন্না, চারুচন্দ্রবদনা একটি সুন্দরী দ্বারপথে বিস্ময়োদ্বিগ্নমুখে দাঁড়াইল।
       দেবেন্দ্রবিজয় ও হরিপ্রসন্ন বাবু বিস্মিতভাবে মুন্সী সাহেবের মুখের দিকে চাহিলেন। ইচ্ছা - পলাতক পত্নীর পুনাবির্ভাবে মুন্সী সাহেব কি ম্করেন, দেখিবেন।
       মুন্সী সাহেব রুষ্ট সিংহের ন্যায় গর্জ্জিয়া উঠিলেন, "পিশাচী-সয়তানী" বলিতে বলিতে লাফাইয়া সেই রমণীর সম্মুখীন হইলেন। সহসা যেন একটা কি বাধাপ্রাপ্ত হইয়া, চকিত দুই পদ পশ্চাতে হটিয়া জড়িতকণ্ঠে বলিলেন, "তুমি-তুমি-তুমি-ত সেই সৃজান নও।"
       রমণীও বিস্মিতভাবে স্মিতমুখে কহিল, "আমি! আমি কেন সৃজান হইতে যাইব? আমি নই-আপনাদের ভুল হইয়াছে।"
       দেবেন্দ্রবিজয় ও হরিপ্রসন্ন বাবু উভয়ে বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় দাঁড়াইয়া উঠিলেন। সমস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, "কে তবে তুমি?"
       রমণী কহিল, "দিলজান।"


তৃতীয় পরিচ্ছেদ
 ভ্রম-নিরাস

        আরও বিস্ময়-একি ব্যাপার-দিলজান জীবিতা-কি ভয়ানক ভ্রম! বিস্ময়বিহ্বলচিত্তে নিনির্মেষনেত্রে দিলজানের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। সহসা কেহ কিছু বলিতে পারিলেন না।
রমণী তাঁহাদিগকে অবাঙ্মুখে তাহার দিকে চাহিতে দেখিয়া বিস্মিত হইল। মৃদুকণ্ঠে বলিল, "আপনাদের কি প্রয়োজন, মহাশয়? বোধ করি, মল্লিক সাহেবের সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন; তিনি ত এখন এখানে নাই।"
       দেবেন্দ্রবিজয় কতকটা প্রকৃতিস্থ হইয়া বলিলেন, "না, আমরা আপনার সঙ্গেই দেখা করিতে আসিয়াছি।"
       রমণী সবিস্ময়ে বলিল, "আমার সঙ্গে! কেন? কই আপনাদিগের কাহাকেও আমি ত চিনি না!"
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "না চিনিতে পারেন। ঠিক আপনার সঙ্গে দেখা করিতে আসি নাই-আপনার পরিবর্ত্তে আমরা এখানে সৃজান বিবিকেই দেখিতে পাইব, মনে করিয়াছিলাম।"
       সৃজান বিবির নাম শুনিয়া দিলজান একবার ঘৃণার হাসি হাসিয়া বলিল বলিল, "এত্ক্ষনে আমি আপনাদের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিলাম। আপনারা মনে করিয়াছিলেন, মল্লিক সাহেব সৃজানকে গৃহের বাহির করিয়া আনিয়া এখানে রাখিয়াছেন। সেই ইচ্ছাটা তাঁহার ছিল বটে, কিন্তু আমি তাহা ঘটিত দিই নাই। আমি মাঝে পড়িয়া সেদিন রাত্রিতে সব গোল বাধাইয়া দিয়াছি।"
       হরিপ্রসন বাবু বলিলেন, "সেদিন রাত্রিতে তুমি সৃজানের সহিত দেখা করিতে গিয়াছিলে, তাহা আমরা জানিতে পারিয়াছি। তোমার সহিত তাঁহার কি কথা হইয়াছিল?"
       দিলজান বলিল, "অনেক কথা হইয়াছিল। আপনারা কে, কেনই বা আমাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, তাহা জানিতে না পারিলে আমি সে কথা আপনাদিগের নিকটে প্রকাশ করিতে পারি না।"
হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "আমাদের নাম বোধ হয়, তুমি শুনিয়া থাকিবে। আমার নাম হরিপ্রসন্ন-আমি উকীল, ইনি দেবেন্দ্রবিজয়-ডিটেক্টিভ-পুলিসের একজন নামজাদা কর্ম্মচারী-"
       "আর আমার নাম মুন্সী জোহিরুদ্দীন," বলিয়া মুন্সী সাহেব নিকটবর্ত্তী একটা আসন গ্রহণ করিলেন।
       দিল। (সবিস্ময়ে) আপনি-আপনি মুন্সী সাহেব।
       দেবেন্দ্র। হাঁ-ইনি তোমার ভগিনীপতি।
       দিল। সৃজান যে আমার সহোদরা, কিরূপে আপনি তাহা জানিতে পারিলেন?
       দেবেন্দ্র। অনেক অনুসন্ধানের পর জানিয়াছি।
       দিল। কে আপনাকে বলিল?
       দেবেন্দ্র। তোমার পিতা-মুন্সী মোজাম হোসেন।
       দিল। (বিবর্ণমুখে) আমার পিতা! সেখানেও আপনি গিয়াছিলেন।
       দেবেন্দ্র। গিয়াছিলাম বৈ কি! কোন জায়গাই বাকী রাখি নাই; নতুবা জানিতে পারিব কিরূপে?
       দিল। তাহ হইলে আমার আর আমার ভগিনী সম্বন্ধে সকলি ত আপনি জানিতে পারিয়াছেন; তবে আমাকে আবার কি জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন?
       দেবেন্দ্র। তোমার ভগিনী সম্বন্ধে আমরা একটি কথা জানিতে পারি নাই।
       দিল। কোন্ বিষয়ে, বলুন?
       দেবেন্দ্র। তাহার হত্যা বিষয়ে।
       দিলজান বজ্রাহতের ন্যায় চকিত হইয়া উঠিল; তীব্রকণ্ঠে বলিল, "কি ভয়ানক! হত্যা-হত্যা! কি সর্বনাশ! কাহার কথা আপনি বলিতেছেন?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "যেদিন রাত্রিতে মনিরুদ্দীনের সহিত সৃজানের গৃহত্যাগ করিবার কথা, সেইদিন রাত্রিতে মেহেদী-বাগানে একটা স্ত্রীলোকের লাস পাওয়া যায়। আমরা প্রথমে তাহা তোমারই মৃতদেহ মনে করিয়া-ছিলাম; এখন দেখিতেছি, আমাদের সে অনুমান মিথ্যা-সে মৃতদেহ সৃজান বিবির।"
"আমার স্ত্রী! কি মুস্কিল- হা ঈশ্বর, শেষে এই করিলে!" বলিয়া মুন্সী সাহেব একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া অত্যন্ত কাতরভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরাইলেন।
       দিলজান শুনিয়া, সেইখানে ব্যাকুলভাবে বসিয়া পড়িল। কাতরকণ্ঠে বলিল, "কি ভয়ানক! সৃজান নাই-খুন হইয়াছে-খুন! কে তাহাকে খুন করিল?"
       হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "জানা যায় নাই; তাহাই এখন আমাদিগকে সন্ধান করিয়া দেখিতে হইবে।"
       দিলজান চিন্তিতভাবে বলিতে লাগিল, "তার কে এমন ভয়ানক শত্রু ছিল, আমি ত কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না; আপনারা কি কিছু ঠাহর করিতে পারিয়াছেন? ভাল কথা, আপনারা সৃজানের মৃতদেহ দেখিয়া আমি খুন হইয়াছি, এরূপ মনে করিয়াছিলেন কেন?"
       দে। সেদিন তুমি যে কাপড়-চোপড় পরিয়া বাহির হইয়াছিলে, সৃজানের মৃতদেহে আমরা তাহা দেখিয়াছিলাম।
       দিল। হাঁ, তাহাই ত বটে-এতক্ষণে আমি সব বুঝিতে পারিয়াছি, ঠিক হইয়াছে।
       দে। তুমি সেদিন রাত্রিতে তোমার ভগিনীকে কোথায় শেষ-জীবিত দেখিয়াছ?
       দিল। তাহার বাড়ীতে।
       দে। কখ্ন তুমি চলিয়া এস?
       দিল। রাত দুইটার পর।
       দে। এত রাত্রি পর্য্যন্ত তোমার ভগিনীর সহিত তুমি কি করিতেছিলে? কি এত কথা ছিল?
       দিল। কথা যাহা ছিল, তাহা অনেকক্ষণ শেষ হইয়া গিয়াছিল। রাত এগারটার পর সৃজান বাহির হইয়া যায়। আমি তাহার জন্য দুইটা পর্য্যন্ত তাহাদের বাড়ীতে অপেক্ষা করিয়াছিলাম।
       দেবেন্দ্রবিজয়ের দৃষ্টিপথ হইতে যেন একখানা মেঘ সরিয়া গেল। তিনি ব্যগ্রভাবে বলিলেন, "ওঃ! সকলই বুঝিতে পারিয়াছি-পাছে কেহ জানিতে পারে, এই ভয়ে সৃজান তোমার বেশ ধরিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল।"
       দিলজান বলিল, "হাঁ-সে মনিরুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিল; তাহার পর তাহাকে আর আমি ফিরিতে দেখি নাই-রাত দুইটা পর্য্যন্ত আমি অপেক্ষা করিয়াছিলাম।"
       হরিপ্রসন্ন বাবু খুব উৎসাহের সহিত বলিয়া উঠিলেন, "আমার অনুমানই ঠিক, রাত বারটার সময়ে যে স্ত্রীলোকের সহিত মজিদ খাঁর দেখা হইয়াছিল-সে নিশ্চয়ই সৃজান।"
       দিলজান বলিল, "মজিদ খাঁ-মজিদ খাঁ-তাঁহাকে আমি চিনি, তিনি ইহার কি জানেন?"
       হরিপ্রসন্ন বাবু বলিলেন, "তিনি বিশেষ কিছু না জানিলেও-এখন তাঁহার মাথার উপরেই এই সকল বিপদ্ চাপিয়া পড়িয়াছে। দিলজানের হত্যাপরাধে অভিযুক্ত হইয়া তিনি অবস্থা-বিপাকে এখন হাজত-বন্দী।"
       দিলজান বলিল, "আপনারা আমার ভগিনীর মৃতদেহ দেখিয়া মনে করিয়াছিলেন, আমি খুন হইয়াছি-কি ভয়ানক ভ্রম! কিন্তু মজিদ খাঁ-তিনি নিরীহ ভাল মানুষ; আমি তাঁহাকে জানি। তিনি কেন খুন করিতে-(সহসা বাধাপ্রাপ্ত হইয়া) কি জানি আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না-আমি যতদূর-
মধ্যপথে বাধা দিয়া মুন্সী সাহেব বলিলেন, "শোন, দিলজান, এখন কিছুই জানি না বলিলে চলিবে না। একজন নিরীহ ভদ্রলোক আজ বিপদ্গ্রস্ত-ভয়ানক বিপদ্-এমন কি তাহার প্রাণও যাইতে পারে; এ সময়ে তুমি কোন কথা গোপন করিবার চেষ্টা করিয়ো না। তোমার ভগিনীর সহিত তোমার কি কি কথা হইয়াছিল; অকপটে সমুদয় প্রকাশ কর।"


চতুর্থ পরিচ্ছেদ
দিলজানের কথা

         দিলজান একজন ভৃত্যকে ডাকিয়া এক গ্লাস জল আনিতে আদেশ করিল। ভগিনীর মৃত্যু-যে-সে মৃত্যু নহে-খুন, তাহার পর এই সকল জবাবদিহি। দিলজান যেন প্রাণের ভিতরে হাঁপাইয়া উঠিয়াছিল। ভৃত্য জল লইয়া আসিলে দিলজান পর্দ্দার অন্তরালে গিয়া এক নিঃশ্বাসে একগ্লাসে জল পান করিয়া ফেলিল-এবং অনেকটা যেন সুস্থ হইতে পারিল। পুনরায় আসিয়া সে দ্বারপ্রান্তে উপবেশন করিল। বসিয়া দিলজান বলিতে আরম্ভ করিল-প্রথমে স্বরটা কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল-ক্রমে তাহা বেশ সংযত হইয়া আসিল। দিলজান বলিতে লাগিল;-"আমার বাল্য-জীবনী প্রকাশের কোন প্রয়োজন দেখিতেছি না আপনারা তাহা এখন শুনিয়াছেন। মল্লিক সাহেব আমাকে লতিমন বাইজীর বাড়ীতে আনিয়া রাখিয়াছিলেন। তিনি আমাকে বিবাহ করিবেন বলিয়া আশাও দিয়াছিলেন; সেই প্রলোভনে আমি তাঁহার সহিত গৃহত্যাগ করি; কিন্তু আমাকে নিজের করতলগত করিয়া শেষে তিনি বিবাহের কথায় বড় একটা কান দিতেন না-কখন কখন আশা দিতেন মাত্র।
       এইরূপে অনেকদিন কাটিয়া গেল। একদিন তাঁহারই মুখে শুনিলাম, কলিঙ্গা বাজারের মুন্সী সাহেবের সঙ্গে আমার ভগিনী সৃজানের বিবাহ হইয়াছে। শুনিয়া প্রথমতঃ সুখী হইলাম-তাহার পর ভিতরের কথা ক্রমে ক্রমে জানিতে পারিয়া নিজের সর্ব্বনাশ বুঝিতে পারিলাম। শুনিলাম আমার ভগিনীও মল্লিক সাহেবের প্রলোভনে মুগ্ধ হইয়াছে। আর রক্ষা নাই-সত্বর ইহার প্রতিবিধান করা দরকার। আমি গোপনে সন্ধান লইতে লাগিলাম। একদিন শুনিলাম, আমার ভগিনী মনিরুদ্দীনের সহিত গৃহত্যাগ করিবার জন্য স্থিরসঙ্কল্প। যাহাতে তাহার সঙ্কল্প সিদ্ধ না হয়, সেজন্য প্রাণপণ করিতে হইবে-নতুবা আমাকে একেবারে পথে বসিতে হয়। যেদিন রাত্রিতে আমার ভগিনী গৃহত্যাগের বন্দোবস্ত ঠিক করিয়া ফেলিয়াছিল, সেইদিন অপরাহ্ণে আমি মল্লিক সাহেবের বাড়ীতে গিয়াছিলাম। মনে করিয়াছিলাম, যেমন করিয়া হউক, তাঁহাকে নিরস্ত করিতে হইবে। পায়ে ধরিয়া পারি-না পারি, তাঁহাকে খুন করিব-এ সঙ্কল্পও আমার ছিল। তাঁহাকে খুন করিয়া সেই ছুরিতে নিজের প্রাণ নিজে বাহির করিয়া ফেলিতে কতক্ষণ সময়ের দরকার? সেজন্য আমি একখানি ছুরিও নিজের সঙ্গে লইয়াছিলাম। দারুণ নৈরাশ্যে, ঈর্ষা-দ্বেষে আমি তখন এক রকম পাগলের মতই হইয়া গিয়াছিলাম-মনের কিছুই ঠিক ছিল না। মল্লিক সাহেব তখন বাড়ীতে ছিলেন না; মজিদ খাঁর সঙ্গেই আমার দেখা হয়-মনের ঠিক ছিল না-আবেগে তাঁহাকে সকল কথা বলিয়া ফেলিলাম। তিনি আমাকে বুঝাইয়া বিদায় করিয়া দিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আমি কিছুতেই বুঝিলাম না-সে শক্তিও তখন আমার ছিল না। তিনি জোর করিয়া আমার নিকট হইতে ছুরিখানি কাড়িয়া লইতে আসিলেন। আমি কিছুতেই দিব না-তিনিও কিছুতেই ছাড়িবেন না-আমি তখন অনন্যোপায় হইয়া ছুরিখানা ঘরের বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলাম। যেমন তিনি তাহা উঠাইয়া লইবার জন্য ছুটিয়া যাইবেন-দেখিতে না পাইয়া জুতাসুদ্ধ পা সেই ছুরিখানির উপরে তুলিয়া দিতে, সেখানা দুই টুক্রা হইয়া গেল। তিনি সেই ভাঙা ছুরিখানি নিজের জামার পকেটের মধ্যে রাখিয়া দিলেন। আমি হতাশ হইয়া বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম। বাড়ীতে ফিরিয়া মন আরও অস্থির হইয়া উঠিল-আশা ত্যাগ করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হইল। আমি আর একটা নূতন উপায় স্থির করিলাম। স্থির করিলাম, আমার ভগিনীর সহিত গোপনে দেখা করিয়া মর্ম্মকথা সমুদয় খুলিয়া বলিল। যাহাতে সে আমার গন্তব্য পথের অন্তরায় না হয়, সেজন্য তাহাকে বুঝাইয়া বলিব-নিশ্চয়ই সে আমার কথা ঠেলিতে পারিবে না-জানিয়া-শুনিয়া সে কখনই আমার সর্ব্বনাশ করিবে না। শুধু আমার নয়-সকল কথা খুলিয়া বলিলে সে নিজের সর্ব্বনাশও নিজে বুঝিতে পারিবে, মনে করিয়া আমি তাহার সহিত দেখা করিতে যাইলাম। যাইয়াই তাহার দেখা পাইলাম না; সে কোথায় নিমন্ত্রণ রাখিতে গিয়াছিল। আমি তাহার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। যখন আমার ভগিনী ফিরিয়া আসিল, তখন রাত প্রায় এগারটা। আমি তাহাকে নিজের অভিপ্রায় বেশ করিয়া বুঝাইয়া বলিলাম। কিন্তু কিছুতেই সে বুঝিল না-আমার সহিত ঝগড়া আরম্ভ করিয়া দিল। কিছুতেই সে মল্লিক সাহেবকে ত্যাগ করিতে সম্মত হইল না। শেষে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর স্থির হইল;-সে অগ্রে মল্লিক সাহেবের বাড়ীতে গিয়া, তাঁহার সহিত দেখা করিয়া জানিবে, আমার কথা কতদূর সত্য-তিনি আমাকে আন্তরিক ভালবাসেন কি না-তাহার পর যাহা হয় করিবে। যদি সে বুঝিতে পারে, মল্লিক সাহেব তাহার সর্ব্বনাশ সাধনের জন্য তাহার সহিত এইরূপ প্রণয়াভিনয় আরম্ভ করিয়াছেন, তাহা হইলে সে তাঁহার আশা ত্যাগ করিবে, নতুবা নহে-এইরূপ স্থির হইল। আমিও তাহা যুক্তিযুক্ত বলিয়া বোধ করিলাম! তখনই মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করা দরকার-কিন্তু কিরূপে তেমন সময়ে সে গোপনে তাঁহার সহিত দেখা করিবে, কোন উপায় স্থির করিতে পারিল না। বিশেষতঃ তেমন সময়ে বাটীর বাহির হইয়া একজন অপর পুরুষের সহিত দেখা করা তাহার পক্ষে খুবই দোষাবহ; কিন্তু দেখা করা চাই-ই । আমি একটা নূতন উপায় ঠিক করিয়া ফেলিলাম; তাহাকে আমার কাপড় জামা ওড়্না সমুদয় খুলিয়া দিলাম। সে তাহাই পরিয়া বাহির হইয়া গেল। আমি তাহার পোষাক পরিয়া তাহার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। পাছে কোন রকমে ধরা পড়ি, এই ভয়ে আমি তাহার শয়নকক্ষে গিয়া ভিতর হইতে দ্বার বন্ধ করিয়া রহিলাম। মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিয়া, যা' হয় একটা স্থির করিয়া তাহার শীঘ্র ফিরিবার কথা ছিল; কিন্তু অনেকক্ষণ আমি তাহার অপেক্ষা করিলাম। ক্রমে রাত দুটা বাজিয়া গেল। তখনও সৃজানকে ফিরিতে না দেখিয়া আমার মনে নানারকম সন্দেহ হইতে লাগিল। মনে ভাবিলাম, সে নিশ্চয়ই আমাকে বড় ফাঁকি দিয়া গিয়াছে; তথাপি নিরাশ হইলাম না-গোপনে আমিও সেখানে হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম। আমি বরাবর মনিরুদ্দীনের বাড়ীর দিকে গেলাম। বাড়ীর পশ্চাতে একটা গলিপথে দেখি, একখানা গাড়ী তখনও সেখানে দাঁড়াইয়া আছে। দেখিয়া অনেক ভরসা হইল; বুঝিতে পারিলাম, সৃজান আমাকে ফাঁকি দিতে পারে নাই। মল্লিক সাহেব সৃজানের জন্য গাড়ী লইয়া অপেক্ষা করিতেছেন। তখন আমার মাথায় আর একটা মতলব উপস্থিত হইল; আমি সেই গাড়ীর দ্বার-সম্মুখে গিয়া দ্বারের হাতলে হাত দিয়া দাঁড়াইলাম। ভিতরে মনিরুদ্দীন সাহেব বসিয়াছিলেন। তিনি আমার হাত ধরিয়া গাড়ীর ভিতরে উঠাইয়া লইলেন। অন্ধকারে আমাকে তিনি চিনিতে পারিলেন না। গাড়ীর ভিতরে আরও অন্ধকার-আমার আরও সুবিধা হইল। আমি গাড়ীর ভিতরে উঠিয়া বসিলে, তিনি মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, "এত রাত হ'ল? আমি তাঁহার অপেক্ষা মৃদুস্বরে-পাছে ধরা পড়ি-খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর করিলাম, 'হাঁ।' তখনই গাড়ী ছাড়িয়া দেওয়া হইল। পথে তিনি অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, পাছে কণ্ঠস্বরে আমাকে চিনিতে পারেন, সেইজন্য আমি খুব মৃদুস্বরে তাঁহার প্রশ্নের 'হাঁ' 'না' 'হুঁ' বলিয়া উত্তর দিতে লগিলাম। ক্রমে গাড়ী শিয়ালদহ ষ্টেশনে আসিয়া পৌঁছিল। ষ্টেশনে অনেক লোকের ভিড়-দীপালোকে চারিদিক্ আলোকিত। অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া গাড়ী হইতে নামিয়া পড়িলাম; না ঢাকিলেও ক্ষতি ছিল না-সহজে তিনি আমাকে চিনিতে পারিতেন না; তথাপি সাবধান হওয়া দরকার। যাহা হউক, আমার একটা খুব সুবিধা ছিল। আমার পরিধানে সৃজানের পোষাক-সৃজানের জাফ্রাণ রঙের সিল্কের কাপড় জামা ওড়্না-তিনি আমাকে সন্দেহ করিতে পারিলেন না। এদিকে ট্রেণ ছাড়িবার বিলম্ব ছিল না; তিনি তাড়াতাড়ি প্রথম শ্রেণীর টিকিট কিনিয়া আমাকে লইয়া ট্রেণে উঠিলেন। তৎক্ষণাৎ সে ট্রেণ ছাড়িয়া দিল। তখন আমি অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করিয়া দিলাম। প্রথমে তিনি আমাকে চিনিতে পারিলেন না; তাহার পর যখন তিনি নিজের ভ্রম বুঝিতে পারিলেন, তখন যেন একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। তখন আমি তাঁহাকে সমুদয় কথা খুলিয়া বলিলাম। শুনিয়া তিনি আমার উপরে একেবারে খড়গহস্ত হইয়া উঠিলেন- অনেক তিরস্কার করিতে লাগিলেন। আমি তাহাতে কর্ণপাত করিলাম না। তিনি পরের ষ্টশনে নামিয়া পুনরায় কলিকাতায় ফিরিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন। তাহা হইলে আমি ট্রেণ হইতে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিব বলিয়া তাঁহাকে আমি ভয় দেখাইলাম। তিনি আর বাড়াবাড়ি করিলেন না। ষ্টেশনের পর ষ্টেশন পার হইয়া ট্রেণ চলিতে লাগিল। তিনি আর উচ্চবাচ্য করিলেন না; আমাকে এই বাগানে আনিয়া রাখিলেন।"

পঞ্চম পরিছেদ
ঘটনা-বৈষম্য

        দেবেন্দ্রবিজয় দিলজানকে বলিলেন, "তোমার কথায় অনেক গুপ্তরহস্য ভেদ হইল বটে; কিন্তু তোমার ভগিনীর হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভেদে সুবিধা হইতে পারে, এমন কোন কথাই পাওয়া গেল না। তোমার কথায় বুঝিতে পারিলাম, মজিদ খাঁ সেই ছুরি সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, মিথ্যা নহে। আর তাঁহার সহিত মনিরুদ্দীনের বাড়ীতে যে স্ত্রীলোকের দেখা হইয়াছিল, যাহার নাম তিনি এমন বিপদে পড়িয়াও অদ্যাপি প্রকাশ করেন নাই-আমরা মনে করিয়াছিলাম, তুমিই সেই স্ত্রীলোক। এখন বুঝিলাম, তোমার বেশ ধরিয়া তোমার ভগিনীই সেখানে গিয়াছিল। একমুহূর্ত্তে সকলই উল্টাইয়া-পাল্টাইয়া গেল। যাহা হউক, এখন যাহাতে যোমার ভগিনীর হত্যাকারী ধরা পড়ে, তাহা করিতে হইবে; এ পর্য্যন্ত হত্যাকারীকে ধরিবার কোন সূত্রই পাওয়া যায় নাই। তুমি কি ইহার সম্বন্ধে কিছুই জান না?"
       দিল। না।
       দেবেন্দ্র। তোমার ভগিনী খুন হইয়াছে, তাহা কি মল্লিক সাহেব জানিতেন? সে সম্বন্ধে তিনি তোমাকে কিছু বলিয়াছেন?
       দিল। না, তিনি কিরূপে জানিতে পারিবেন?
       দে। কিরূপে জানিতে পারিবেন, তা' আমি তোমাকে কি বলিল? তিনি তোমার ভগিনীর না হউক-যে কোন একটা খুন সম্বন্ধে কিছু বলিয়াছেন কি?
       দিল। না।
       মুন্সী সাহেব দেবেন্দ্রবিজয়কে বলিলেন, "এখনকার কাজ ত সব মিটিয়া গেল; মেহেদী-বাগানের সেই নিহত স্ত্রীলোক যে আমারই স্ত্রী, সে সম্বন্ধে আর কোন সন্দেহ নাই। এখন কি করিবেন, স্থির করিয়াছেন?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "এখন কলিকাতায় গিয়া একবার মনিরুদ্দীনের সহিত দেখা করিতে হইবে। তিনি সেদিন রাত বারটার পর হইতে কোথায় ছিলেন, কি করিয়াছিলেন-তাঁহার গতিবিধি সম্বন্ধে সমুদয় কথা জানা এখন আমাদের বিশেষ দরকার হইতেছে।"
       ব্যাঘ্রীর মত সবেগে মাথা তুলিয়া দিলজান দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, "কি ভয়ানক! আপনি কি শেষে তাঁহাকেই সন্দেহ করিলেন?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "কই-সন্দেহের কোন কথা ত আমি বলি নাই। তিনি সেদিন রাত বারটার পর কোন্ কাজে কোথায় ছিলেন, কোথায় গিয়াছিলেন, তাঁহারই গতিবিধির সন্তোষজনক উত্তর আমাদিগকে দিবেন মাত্র। ইহাতে ক্ষতি কি?"
       "ক্ষতি কিছুই না," বলিয়া দিলজান সহসা উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, "যাহা ভাল বুঝিবেন, তাহাই করিবেন। আমি যাহা কিছু জানিতাম, সমুদয় বলিয়াছি।" তৎক্ষণাৎ দিলজান পর্দ্দা তুলিয়া, সেই দ্বারপথে কক্ষের বাহির হইয়া গেল।
       হরিপ্রসন্ন বাবু দেবেন্দ্রবিজয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "সত্যই কি আপনি এখন অনুমান করিতেছেন, মনিরুদ্দীন সৃজানকে খুন করিয়াছে? সে সৃজানকে কেন খুন করিতে যাইবে?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তা' সৃজানকে সে কেন খুন করিতে যাইবে? সৃজানকে খুন করিবার কোন কারণই নাই; তা' না থকিলেও সে খুন করিতে পারে আর তাহার কারণেরও কোন অভাব নাই।"
মুন্সী সাহেব চকিত হইয়া বলিলেন, "তবে কি মনিরুদ্দীন দিলজানকে খুন করিতে গিয়া ভ্রমক্রমে আমার স্ত্রীকে খুন করিয়াছেন?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "তাহাই ঠিক।"

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
প্রত্যাগমন

         এদিকে মনিরুদ্দীন সুস্থ শরীরে বাড়ী ফিরিয়া আসিতে গনির মার আনন্দ ধরে না। সে মনিরুদ্দীনকে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছে; মনিরুদ্দীনের উপরে তাহার খুব একটা স্নেহ পড়িয়া গিয়াছিল। কাল অনেক রাত্রিতে মনিরুদ্দীন বাড়ীতে আসিয়াছিলেন, রেলপথে আসায় অনেকটা অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। গনির মা তাহার সহিত ভাল করিয়া কথা কহিবার অবসর পায় নাই। বেলা দশটার পর নিদ্রাভঙ্গে উঠিয়া যখন মনিরুদ্দীন দ্বিতলের বৈঠকখানা গৃহে বসিয়া আল্বোলায় নল-সংযোগে ধূমপানে মনোনিবেশ করিয়াছেন, বৃদ্ধা গনির মা একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হইয়া, একখানি ধপ্ধপে কাপড় পরিয়া তাঁহার সম্মুখে গিয়া বসিল। গত রাত্রিতে মনিরুদ্দীন গনির মার সহিত ভাল করিয়া কথা কহে নাই বলিয়া, গনির মা মুখখানা একটু ভারি করিয়া বসিল।
       মনিরুদ্দীন মৃদুহাস্যে তাহাকে পরিহাস করিয়া বলিলেন, "আর তোমার এ বিরহ-য্ন্ত্রণা দেখিতে পারি না-গনির মা, একটা নিকা করিবার চেষ্টা দেখ। চেষ্টা বা দেখিতে হইবে কেন-তুমি একবার মত্ কর, কত বাদশাহ ওম্রাও এখনি তোমার দ্বারস্থ হয়। আমি এখানে ছিলাম না- বোধ হয়, ইহার মধ্যে কোন বাদ্শাহ তোমার কাছে এক-আধখানা দরখাস্ত পেস করিয়া থাকিবে। তোমার মুখের ভাব দেখিয়া আমার ত তাহাই বিবেচনা হয়।"
       গনির মা বলিল, "ওম্রাও বাদ্শাহে আর দরকার কি? আর দুইদিন বাদে একেবারে গোরের মাটির সঙ্গে নিকা হবে।"
       মনিরুদ্দীন বলিল, "তাই বা মন্দ কি! কোন খবর এসেছে না কি?"
       গনির মা বলিলেন, "খবর ত হ'য়েই আছে-পা বাড়ালেই হয়। এখন তামাসা থাক্, কাজের কথা শোন, তুমি এখান থেকে চ'লে গেলে একজন থানার লোক আমার কাছে তোমার সন্ধান নিতে এসেছিল।"
মনিরুদ্দীন চকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "থানার লোক? সে কি, কি হইয়াছে? সে কে?"
       গনির মা বলিল, "কি নাম বাপু তার-ঠিক মনে পড়্ছে না, কি দেবিন্দর না ফেবিন্দর-লোকটা বড় নাছোড়বান্দা।"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "ওঃ! ঠিক হয়েছে, দেবেন্দ্রবিজয়-ডিটেক্টিভ-ইন্স্পেক্টর। তিনিই ত এখন আমাদের মজিদ খাঁকে গ্রেপ্তার করিয়াছেন।"
       গনির মা জিজ্ঞাস করিল, "এ সকল কথা তুমি কোথায় শুন্লে বাপ্?"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "আমি কাল বাড়ীতে ঢুকিবার আগেই সব শুনিয়াছি। মেহেদী-বাগানে কে একটা মাগী খুন হইয়াছে-পুলিসের লোক তাহাকে দিলজান মনে করিয়াছে-কি পাগল!"
       গনির মা ব্যগ্রভাবে বলিল, "তবে কি দিলজান সত্যি সত্যি খুন হয় নি?"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "না, সৃজান বিবি খুন হইয়াছে।"
       গনির মা সংশয়িতচিত্তে বলিয়া উঠিল, "সে কি! তবে শুনেছিলুম, তুমি না কি সৃজানকে কোথায় নিয়ে গিয়ে রেখেছ; পাড়ার লোকের কাছে একেবারে কান-পাতা যায় না-ছেলে বুড়ো আদি ক'রে কেবল তোমার নিন্দা। দেখ দেখি কোথায় কিছু নাই-একজনের নামে অমনি এত বঢ় একটা অপবাদ কেমন করে রটিয়া দিলে গো!"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "তুমি কি আমাকে এমনই মনে কর? যাহা হউক, পুলিস এখন সৃজানের হত্যাকাণ্ডে আমাকে বোধ হয়, জড়াইতে চেষ্টা করিবে। আজ সকালেও একবার দেবেন্দ্রবিজয়ের এখানে আসিবার কথা ছিল। এখনও যে তাঁর কোন দেখা নাই, তাহাই ভাবিতেছি।"
       গনির মা বলিল, "কেন, এখানে আবার তোমার কাছে আস্বে কেন?"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, 'খুন সম্বন্ধে আমি কিছু জানি কি না, তাহাই জিজ্ঞাসা করিতে আসিবেন!"
গনির মা জিজ্ঞাসা করিল, "মজিদ খাঁ কি সত্য-সত্যই খুন করিয়াছে?"
       মনিরুদ্দীন বলিল, "কি আশ্চর্য্য! মজিদ খাঁকেই খুনী বলিয়া তোমার বিশ্বাস হইল? তুমি আমাদের সংসারে থাকিয়া চুল পাকাইয়া ফেলিলে-আমাদের দুইজনকে জন্মাবধি দেখিয়া আসিতেছ-নিজের হাতে মানুষ করিয়াছ, তবু তুমি আমাদের এখনও চিনিতে পারিলে না?"
       এমন সময়ে কক্ষদ্বারে কে মৃদু শব্দ করিল। মনিরুদ্দীন বলিলেন, "কে ওখানে?"
       ধীরে ধীরে দ্বার ঠেলিয়া একটী বালক ভৃত্য কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল। এবং মনিরুদ্দীনের হাতে একখানি কার্ড দিল।
       মনিরুদ্দীন কার্ডের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া গনির মাকে বলিলেন, "দেবেন্দ্রবিজয় উপস্থিত। আমি ত তোমাকে পূর্ব্বেই বলিয়াছিলাম, তিনি খুনের তদন্তে আজ আমার কাছেও আসিবেন। (ভৃত্যের প্রতি) যাও, তাঁহাকে এইখানেই লইয়া এস।"
       ভৃত্য চলিয়া গেল। গনির মা-ও উঠিয়া যাইবার উপক্রম করিল। মনিরুদ্দীন তাহাকে বসিতে বলিলেন। ক্ষণপরে তথায় দেবেন্দ্রবিজয় প্রবেশ করিলেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ
দোষক্ষালনের জন্য কি?

          মনিরুদ্দীন দেবেন্দ্রবিজয়কে বসিতে বলিয়া বলিলেন, "আপনার নাম দেবেন্দ্রবিজয় বাবু-একজন খুব খ্যাতনামা ডিটেক্টিভ, তাহা আমি শুনিয়াছি। মহাশয়ের সহিত পরিচয় হওয়ায় আমি খুব সুখী হইলাম। বোধ করি, মেহেদী-বাগানের খুনের তদন্তেই আপনি আমার কাছে আসিয়া থাকিবেন।"
দেবেন্দ্রবিজয় মনিরুদ্দীনকে একবারে কাজের কথা পাড়িতে দেখিয়া অত্যন্ত বিস্মিত হইলেন। বলিলেন, "হাঁ, আপনার অনুমান ঠিক-আমি দুই-একটী কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই; সন্তোষজনক উত্তর পাইলে সুখী হইব।"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "বটে, ফরিদপুরে আমার বাগানে গিয়া যাহার সহিত দেখা করিয়াছিলেন, তাহার নিকটে আপনি ত সকলই শুনিয়াছেন।"
       দেবেন্দ্রবিজয় আরও বিস্মিত হইয়া বলিলেন, "আপনি তাহা কিরূপে জানিতে পারিলেন?"
মনিরুদ্দীন বলিলেন, "আমি কাল রাত্রেই সেখানকার একখানা বড় রকম টেলিগ্রাম পাইয়াছি। আমার বাগানে যাহার সঙ্গে আপনাদের দেখা হইয়াছিল, সে সৃজান নয়-দিলজান, তাহা আপনি এখন বেশ বুঝিতে পারিয়াছেন?"
       দে। হাঁ, আমার ভুল হইয়াছিল।
       মনি। আপনার ন্যায় খ্যাতনামা লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডিটেক্টিভের এমন ভুল হওয়া ঠিক নহে।
       দে। উপন্যাসের ডিটেক্টিভের ভুল না হইতে পারে; আমরা সে রকমের ডিটেক্টিভ নহি-সামান্য মনুষ্যমাত্র; আমাদের পদে পদে ভ্রম হওয়াই সম্ভব।
       মনি। যাক্, সে কথায় আর দরকার নাই। দিলজানই যে সেদিন রাত্রিতে সৃজানের সহিত দেখা করিতে তাহাদের বাড়ীতে গিয়াছিল, আপনি ফরিদপুরে গিয়া তাহার নিজের মুখে সে কথা শুনিয়াছেন, বোধ হয়।
       দে। শুনিয়াছি।
       মনি। সৃজান যে এখানে আমার বাড়ীতে আসিয়াছিল, তাহাও বোধ হয়, দিলজান আপনাকে বলিয়াছে।
       দে। বলিয়াছে।
       মনি। তবে আপনি সকলই ত শুনিয়াছেন, এ ছাড়া আমার নিকটে আর নূতন কথা কি পাইবেন?
       দে। আপনার কাছে আপনার সম্বন্ধে, দুই-একটী কথা জানিবার জন্য আসিয়াছি।
       মনি। কি, বলুন?
       দে। সেদিন রাত্রে আপনি রাত এগারটার পর কোথায় গিয়াছিলেন-কি করিয়াছিলেন-কোথায় কাহার সহিত আপনার দেখা হইয়াছিল, আশা করি, আপনার কাছে তাহার সন্তোষজনক উত্তর পাইব।
মনি। ওঃ! এতক্ষণে আপনার মনের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিলাম; তাহা হইলে আপনি এখন আমাকেই সৃজানের হত্যাকারী স্থির করিয়াছেন দেখিতেছি; মন্দ নয়!
       দেবেন্দ্রবিজয় কোন কথা কহিলেন না। একটু অপ্রতিভভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরাইলেন।
মনিরুদ্দীন বলিতে লাগিলেন, "মহাশয়, এ আপনার কিরূপ পরিহাস, বুঝিতে পারিলাম না। পরিহাস-প্রসঙ্গেও এ কথা বলা আপনার যুক্তি-সঙ্গত হয় নাই। আমার স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে বোধ হয়, আপনি সবিশেষ অবগত নহেন; তাহা হইলে কখনই আপনি আমার উপরে এমন একটা ভয়ানক সন্দেহ করিতে পারিতেন না। মদ্যপ, বেশ্যাসক্ত হইলেও আমি এমন পিশাচ নহি-একজন স্ত্রীলোককে খুন করিতে যাইব। আপনি যে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, মজিদ খাঁ ধৃত না হইলে আপনি কিছুতেই আমার কাছে তাহার একটিরও উত্তর পাইতেন না। কিন্তু এখন দেখিতেছি, মজিদ খাঁর জন্য বাধ্য হইয়া আমাকে আপনার এই সকল প্রশ্নের উত্তর করিতে হইবে। বেশ ভাল হইয়া বসুন, বলিতেছি।" গনির মাকে বলিলেন, "তুনি এখন যাইতে পর-তোমার এখানে থাকিবার অরার কোন প্রয়োজন নাই।"
গনির মা যেমন উঠিয়া যাইবে, দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে বলিলেন, "আমার একটু প্রয়োজন আছে। তুমি না আমায় বলিয়ছিলে, সেদিন রাত এগারটর পর মজিদ খাঁর সহিত যে স্ত্রীলোকের দেখা হইয়াছিল, সে দিলজান?"
       গনির মা বলিলেন, "হাঁ, দিলজানই ত - সে নিশ্চয়ই দিলজান আর কেহ নহে?"
       গনির মা বলিল,"কি মুস্কিল্! আমি যে নিজের চোখে তাকে দেখেছি। আমি কি তাকে চিনি না? সেই মুখ - সেই চোখ, তা ছাড়া সন্ধ্যার আগে, সে যেমন সেজে-গুজে এসেছিল-রাতেও ঠিক সেই কাপড়-চোপড় পরেই এসেছিল।"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "মিথ্যাকথা-ঠিক চিন্তে পার নাই।"
       বৃদ্ধা গনির মার ক্রোধ মস্তকে উঠিল। সে হাত মুখ নাড়িয়া বলিল, "আমি বুড়োমাগী, আমার মিথ্যাকথা-তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে-আমি মিছে কথা বল্তে গেছি! কি আমার পীর-পয়গম্বর এসেছে রে" বলিতে বলিতে ক্রোধভরে ঘরের বাহির হইয়া গেল।
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "দিলজান ও সৃজান যমজ ভগিনী-উভয়েই একই রকম দেখিতে-তাহাতে উপরে আবার একই রকমের পোষাক-তাহাতে বৃদ্ধা গনির মার যে এরূপ ভুল হইবে, তাহার আশ্চর্য্য কি?"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "ভুল হওয়াই খুব সম্ভব। যাহা হউক, আপনি এখন আমাকে কি জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন?"
       দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, "আপনারই কথা।"
       মনিরুদ্দীন বলিলেন, "দেখুন, আমি সামান্য মনুষ্য মাত্র- প্রলোভনের দাস-প্রবৃত্তির দাস-কি জানি, কি মোহবশে সৃজানকে দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। তাহাকে লাভ করিবার জন্য আমার হৃদয় একটা অদম্য তৃষ্ণায় পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। আপনি আমাকে অসচ্চরিত্র পরস্ত্রীলোলুপ বলিয়া ঘৃণা করিতে পারেন; কিন্তু আপনি স্থির জানিবেন, আমার কথা ছাড়িয়া দিই-অনেক সাধুপুরুষও এ প্রলোভনের হাত এড়াইতে পারে না। সেইদিন রাত্রিতে সত্যসত্যই আমি সৃজানকে লইয়া কলিকাতা ত্যাগ করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলাম। রাত্রি এগারটার পর হইতে আমি বাড়ীর পশ্চাদ্ভাগে একখানা গাড়ী লইয়া সৃজানের অপেক্ষা করিতেছিলাম। নিজের গাড়ী নহে-একখানা ভাড়াটিয়া গাড়ী ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলাম। আপনি সে প্রমাণ সেই গাড়ীর কোচম্যানের নিকটে অনায়াসে পাইবেন। তাহার নাম করিম; এই জানবাজারেই সে থাকে। রাত যখন প্রায় বারটা, তখন আমি গাড়ী ছাড়িয়া একবার চলিয়া আসি; তাড়াতাড়িতে ঘড়ীটা সঙ্গে লইতে ভুল করিয়াছিলাম। পুনরায় বাড়ীর ভিতরে গিয়া ঘড়ীটা লইয়া আসিতে হইবে, মনে করিয়া আমি গাড়ী হইতে উঠিয়া আসিলাম। বাড়ীর সম্মুখভাগে আসিতেই দেখিলাম, একটী স্ত্রীলোক দ্রুতবেগে উন্মাদিনীর মত আমার বাড়ী হইতে বাহির হইয়া গেল। সেদিন ভয়ানক অন্ধকারময় রাত্রি-তাহার উপর কুয়াশায় চারিদিক্ ঢাকিয়া ফেলিয়াছিল। বাহিরে অন্ধকারের মধ্যে সে কোথায় মিশিয়া গেল, আর তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। বহির্দ্বারের ভিতরে একটা লণ্ঠন জ্বলিতেছিল; তাহারই আলোকে আমি কেবল একবার নিমেষমাত্র তাহার মুখ দেখিতে পাইয়াছিলাম; তাহাতেই তাহাকে আমি তখন দিলজান মনে করিয়াছিলাম। সাজসজ্জাও ঠিক দিলজানের অনুরূপ। আমি দেখিয়াই আর অগ্রসর হই নাই; সেখানেই স্তম্ভিত ভাবে দাঁড়াইয়া রহিলাম। এমন সময়ে আর একজন কে আমার পাশ দিয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল। সেই স্ত্রীলোকটি যেদিকে গিয়াছিল, সেই লোকটিকেও সেইদিকে যাইতে দেখিলাম। মনে বড় সন্দেহ হইল-কে এ লোক? কেনই বা দিলজানের অনুসরণ করিতেছে? অবশ্যই ইহার ভিতরে কিছু রহস্য আছে সেটুকু দেখা দরকার। তাহারা দুইজনে যেদিকে গিয়াছিল, আমিও দ্রুতপদে সেইদিকে তখন ছুটিয়া গেলাম। নিকটবর্ত্তী সকল স্থানেই তাহাদের অনুসরণ করিতে লাগিলাম। যে অন্ধকার, নিজেকেই নিজে দেখিতে পাওয়া যায় না। অনেক চেষ্টা করিলাম, দুইজনের কাহাকেও আর দেখিতে পাইলাম না। পরিশ্রান্ত হইয়া প্রায় একঘণ্টা পরে আবার সেই গাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম। সৃজানের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। রাত্রি দুইটার পর দিলজান আমার গাড়ীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। আমি সৃজান মনে করিয়া তাহাকে ভিতরে তুলিয়া লইলাম। এদিকে গাড়ী শিয়ালদহ ষ্টেশনের দিকে চলিল। সেখানে ট্রেণে উঠিয়া আমার ভ্রম আমি বুঝিতে পারিলাম।"
       দেবেন্দ্রবিজয় অত্যন্ত আগ্রহের সহিত মনিরুদ্দীনের কথা শুনিয়া যাইতেছিলেন। মনিরুদ্দীন নীরব হইলে, তিনি সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "যে লোকটিকে আপনি সেই রমণীর অনুসরণ করিতে দেখিয়াছিলেন, কে সে লোক?"
       ম। কিরূপে জানিব?
       দে। সে কি আপনার পরিচিতের মধ্যে কেহ নহে?
       ম। পরিচিত হইলেও--তেমন অন্ধকারে তাহাকে কিরূপে চিনিতে পারিব?
       দে। যদিও ঠিক না চিনিতে পারেন-তাহার আকার-প্রকারে ভাবে অমুক লোক বলিয়া আপনার মনে কোন রকম একটা ধারণা হয় নাই কি? হওয়াই খুব সম্ভব।
       ম। (চিন্তিতভাবে) সে ধারণা হয় নাই কি? হওয়াই খুব সম্ভব।
       দে। (ব্যগ্রভাবে) কি নাম?
       ম। মুন্সী সাহেব।
       দে। (চকিতে) কে, জোহিরুদ্দীন?
       ম। হাঁ।

 

পাঁচকড়ি দে

 

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।