রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

 

 

 

 

 

 

 


 

বধূ বরণ

মিনুকে তাহার শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইতে গিযাছিল -- মিনুর সেই থার্ড ক্লাসে পড়া ভাই -- জিতু।
সেদিন বৈকালে গৌরী তাহাদের রান্নাঘরের সুমুখের চালায় বসিয়া পান সাজিতেছে, এমন সময় ছুটিতে ছুটিতে জিতু আসিয়া হাজির। গৌরী তাহাকে দেখিবামাত্র পান সাজা ফেলিয়া হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'ফিরে এলি তোরা, কেমন শ্বশুরবাড়ি রে?'
জিতু তাহার সুমুখে চাপিয়া বসিল। বসিয়া দুই হাঁটুর উপর হাত রাখিয়া দুলিয়া দুলিয়া মিনুর শ্বশুরবাড়ির গল্প আরম্ভ করিল। প্রথমেই আরম্ভ করিল, 'দুটো যা কুকুর আছে বাড়িতে -- ফাইন। একটা কালো আর একটা কালোয় শাদায়।'
গৌরী কুকুরের গল্প শুনিতে চায় নাই। জিজ্ঞাসা করিল, 'শ্বশুর শাশুড়ী আছে কিনা তাই বল আগে।'
'দাঁড়াও বলছি।' বলিয়া কুকুর দুটো যে নূতন মানুষ দেখিলেই চিৎকার করে, এবং তাহাকেও যে দিনকতক অত্যন্ত বিব্রত করিয়া তুলিয়াছিল, প্রথমে সেই কথাই বলিল, পরে জামাইবাবু কেমন করিয়া তাহাদের সঙ্গে তাহার ভাব করিয়া দিলেন, অঙ্গভঙ্গি সহকারে তাহার বিস্তারিত বর্ণনা করিয়া বলিল, 'হঁযা, শ্বশুর আছে, শাশুড়ীও আছে।'
বলিয়াই জিতু মুখ বাড়াইয়া গৌরীর কানের কাছে চুপি চুপি বলিল, 'শাশুড়ী মাগী ভারি বজ্জাত। এমনি উঁচু উঁচু দাঁত, যেমন কালো মাগী, তেমনি মোটা। দিদিকে আসতে দিচ্ছিল না কিছুতেই। তবে শ্বশুরটা ভাল।'
পানে সুপারি দিতে দিতে গৌরী জিজ্ঞাসা করিল, 'মিনু কাঁদেনি তো সেখানে গিয়ে?
'বাঃ, কাঁদবে কেন?' বলিয়া আবার সে তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া গেল। বলিল, 'জামাইবাবু যে খুব ভালবাসে।'
গৌরীর মুখখানা হঠাৎ লাল হইয়া উঠিল। হাসিয়া বলিল, 'যা! তোকে যেন ঐ কথা আমি জিজ্ঞেস করেছি!'
জিতু বলিল, 'দিদি তোকে যেতে বলেছে।'
গৌরী হেঁটমুখে পানের খিলি করিতে করিতে ভাবিতে লাগিল, যাইতে সে পারিবে কি না কে জানে। জিতু ভাবিল, কথাটা সে বিশ্বাস করে নাই। বলিল, 'মাইরি বলছি। যাস যেন!' বলিয়াই হাত বাড়াইয়া একবারে যতগুলা পান হাতে ওঠে একসঙ্গে ততগুলা তুলিয়া লইয়া জিতু পলায়ন করিতেছিল।
'অতগুলো নিসনে।' বলিয়া হাঁ হাঁ করিয়া গৌরী তাহার হাত হইতে পানগুলা কাড়িয়া লইতে গেল, কিন্তু জিতুও ছাড়িবার পাত্র নয়। দুজনে টানাটানি ছেঁড়াছেঁড়ি করিতে গিয়া কতক পান ছিঁড়িয়া পড়িল মাটিতে, একটি মাত্র খিলি আসিল গৌরীর হাতে, বাকী গোটা দুই পান এক সঙ্গে মুখে পুরিয়া দিয়া হাসিতে হাসিতে জিতু ছুটিয়া পলাইল। যাইবার সময় চিৎকার করিয়া বলিয়া গেল, 'যাস যেন।'
ঘাড় নাড়িয়া গৌরী বলিল, 'যাব।'
বলিয়াই সে মুখ ফিরাইতেই উপরের জানালার পানে সহসা তাহার নজর পড়িল। দেখিল জানালা খোলা, এবং সেই জানালার একটা কপাটের আড়ালে ননীমাধবের সন্দিগ্ধ তীক্ষ্ণ দুই চক্ষু তাহারই উপর স্থির নিবদ্ধ।

কয়েকদিন পরে শাশুড়ীকে ডাকিয়া ননীমাধব একখানি চিঠি দেখাইল। চিঠিখানি অত্যন্ত জরুরী। লিখিয়াছেন, ননীমাধবের সেই বড়লোক মামীমা। ননীমাধব বলিল, 'বিয়ে করেছি শুনে ভারি খুশি হয়েছেন; আবার দুঃখও করেছেন একটুখানি। লিখেছেন, বৌ নিয়ে তুই আমার এই চিঠিখানি পাবামাত্র আসিস যেন। না এলে কিন্তু ভাল হবে না।'
মাও খুব খুশি হইয়া একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, 'যাক! ভাবছিলাম রাগ করবেন হয়তো। বাঁচা গেল! খুশি হয়েছেন তাহলে - কি বল বাবা, অ্যাঁ? খুশি হয়েছেন, কি বল?'
এই বলিয়া আহ্লাদে একেবারে আটখানা হইয়া চিঠিখানি মা একবার হাতে করিয়া তুলিয়া লইলেন। পড়িতে জানেন না, কি করিবেন, নাড়াচাড়া করিতে করিতে বলিলেন, 'এই কটি কথা তাও খামে চিঠি লিখেছেন... যেতে বলেছেন। তা বলবেন বৈকি!'
কিয়ৎক্ষণ পরে ননীমাধব জিজ্ঞাসা করিল, 'কি হবে তাহলে, কবে যাওয়া হচ্ছে আমাদের?'
মা বলিলেন, 'দাঁড়াও বাবা, দাঁড়াও। যাবে, দুদিন সবুর কর। ভটচাজকে দিনটিন দেখাই।'
ননীমাধব বলিল, 'আজই দেখাবেন যেন। মামীমাকে অনেকদিন দেখিনি, আমারও মন কেমন করছে।'
মা বলিলেন, 'তা তো করবেই বাছা।'

দিন পনের পরে মামীমার কাছ হইতে একখানি 'টেলিগ্রাম' আসিল। 'এখনও তোমরা আসিলে না কেন?'
মা আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। দিন স্থির হইল, মাসের তের তারিখে। রাত্রে ট্রেন।
একটিমাত্র মেয়ে। বিবাহের সময় মা তাহাকে ফাঁকি দেন নাই। গয়না দিয়াছিলেন প্রায় তিন হাজার টাকার। জিজ্ঞাসা করিলেন, 'হঁযা বাবা ননীমাধব, সব গয়নাই দেব সঙ্গে? কি বল তুমি? কিন্তু বাবা, আঁধার রাত, গরুর গাড়িতে যাবে...'
ননীমাধব বলিল, 'কিছু ভয় নেই মা।'
একটি একটি করিয়া মা তাহাকে সব গহনাই পরাইয়া দিলেন। সবচেয়ে ভাল শাড়ি পরাইলেন, সবচেয়ে ভাল জামা পরাইলেন, দামী একখানি শাল দিলেন সঙ্গে, তাহার পর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে বাক্স গুছাইয়া দিয়া সাবধানে থাকিতে বলিয়া পিঠে হাত দিয়া বলিলেন, 'কাঁদিসনে মা, বড়জোর সাতদিন কি দশ দিনের বেশি রাখবে না, আমি বলে দিয়েছি ননীমাধবকে।'
মেয়েকে কাঁদিতে নিষেধ করিয়া মাও কাঁদিলেন। 'একা ঘরে তোকে ছেড়ে আমি কেমন করে থাকব মা?'
গরুর গাড়ি আসিয়া দরজায় দাঁড়াইল। শীতকাল। অন্ধকার রাত্রি। গ্রামে তখনও পর্যন্ত দু একজনের খামারে ধান ঝাড়াইয়ের কাজ চলিতেছিল। গাড়ির নিচে গাড়োয়ান তখন একটি লণ্ঠন বাঁধিয়া লইল। মাও কাঁদিলেন। মেয়েও কাঁদিল। মেয়ে জামাই গাড়িতে উঠিয়া বসিলে গাড়োয়ান গাড়ি ছাড়িয়া দিল। যতক্ষণ দেখিতে পাওয়া গেল লণ্ঠন হাতে লইয়া দরজার কাছে মা দাঁড়াইয়া রহিলেন।
দুধারে ধানের ক্ষেত। মাঝখানে গরুর গাড়ি চলিবার পথ। চারিদিক অন্ধকার। আকাশে অগণিত নক্ষত্র। গাড়ির নিচের লণ্ঠনটির আলোকে পথের একটুখানি মাত্র দেখা যাইতেছিল। দূরে দূরে কয়েকটা অস্পষ্ট গ্রাম।
কতকগুলো শৃগাল একবার কাছাকাছি কোথায় যেন চিৎকার করিয়া উঠিতেই ননীমাধব জিজ্ঞাসা করিল, 'হাঁরে পাঁচু, এইখানেই না সেদিন সেই কাকে যেন আগলেছিল?'
গাড়োয়ান বলিল, 'আজ্ঞে না, এখানে নয় জামাইবাবু, সে ঐ সেই ভূতেশ্বরের মাঠে। জায়গাটা তেমন ভাল নয়। মড়ুইপুরে একটা শ্মশান আছে।'

গাড়ির মধ্যে একটু একটু করিয়া সরিয়া সরিয়া গৌরী ননীমাধবের গা ঘেঁষিয়া বসিল।
'এই যে এই দিকে ভূতেশ্বরের মাঠ। ঠাকুর আছেন, প্রণাম কর।' বলিয়া ননীমাধব নিজের হাত দুটি কপালে ঠেকাইয়া গৌরীকেও একটি প্রাণাম করিতে বলিল। জিজ্ঞাসা করিল, 'ভয় করছে তোমার?'
গৌরী ঘাড় নাড়িয়া তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া অত্যন্ত চুপি চুপি বলিল, 'হুঁ।'
ননীমাধবও তেমনি আস্তে আস্তে কহিল, 'গয়নাগুলো পরে আসা ভাল হয় নি। হাত বাক্সটা কোথায়?'
'এই যে।' গৌরী তাহার পাশে হাত বাড়াইয়া বাক্সটা ননীমাধবের হাতের কাছে আগাইয়া দিল।
ননীমাধব বলিল, 'খোল। এক একটি করে ধীরে ধীরে গয়না টয়না সব খুলে তুমি রাখ এতে। রেখে চাবি বন্ধ কর।'
গৌরী তাহাই করিতে বসিল। এবং কিছুক্ষণ পরেই নাকের নাকছবিটি ছাড়া গয়না গাঁটি সবই খুলিয়া ফেলিয়া বাক্সবন্দী করিয়া চাবিটি ননীমাধবের হাতে দিয়া বলিল, 'তুমি রাখ।'
ননীমাধব বলিল, 'চাবি থাক না তোমার কাছে।'
গৌরী ঘাড় নাড়িয়া চুপি চুপি বলিল, 'না। যদি কেড়ে নেয়?'
বলিয়া ফিক করিয়া একটুখানি হাসিল। অন্ধকারে সে হাসির কিছু দেখা গেল না। কিন্তু গৌরীর মাথাটা তাহার কোলের উপর ঢলিয়া পড়িতেই ননীমাধব ধীরে ধীরে তাহা কোল হইতে নামাইয়া দিয়া বলিল, 'ঘুম পাচ্ছে তো শোও এইখানে।'

গাড়ি স্টেশনে আসিয়া পৌঁছিল। সেই স্টেশন। সেদিনও এমনি এক অন্ধকার রাত্রে তাহারা এইখানে আসিয়াই নামিয়াছিল। লণ্ঠনের কাঁচটা কালি পড়িয়া পড়িয়া একেবারে কালো হইয়া গেছে। গৌরী কতদিনের জন্য বাপের বাড়ি ছাড়িয়া চলিয়াছে কে জানে। পাঁচুর সঙ্গে কথা বলিবার আর কোনও ছুতা না পাইয়া বলিল, 'এ আলোয় তুমি কেমন করে ফিরে যাবে পাঁচু?'
লণ্ঠনটার দিকে একবার তাকাইয়া ঈষৎ হাসিয়া পাঁচু বলিল, 'এতেই ঠিক চলে যাব দিদি, ঘরমুখো গরু, কিচ্ছু বলতে হবে না, দেখতে না দেখতে ওরা উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলবে।'
গৌরী চুপি চুপি বলিল, 'মাকে বোলো পাঁচু, মা যেন আমার জন্যে না ভাবে।'
কথাটা বলিতে বলিতে গৌরীর ঠোঁট দুইটি কাঁপিয়া উঠিল। আরও কি যেন সে বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু বলা হইল না।
গহনার ছোট বাক্সটি হাতে লইয়া ননীমাধব বলিল, 'নে পাঁচু, একে একে বড় বক্স দুটো নাবিয়ে দিয়ে চল প্ল্যাটফর্মে দেখি, গাড়ি আসতে হয়তো আর বেশি দেরি নেই।'
স্টেশনট নিতান্ত ছোট। প্ল্যাটফর্ম বলিতে কোথাও কিছু ছিল না। গাড়ি যেখানে আসিয়া দাঁড়ায়, লাইনের ধারে সেইখানের জমিটা মাত্র লাল কাঁকর বিছাইয়া সমতল করা হইয়াছে। চারিদিক অন্ধকার। স্টেশন ঘরের সুমুখে দেওয়ালের গায়ে মাত্র কেরোসিনের একটি আলো মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছিল। বাকী আলোগুলো তখনও জ্বালানো হয় নাই।
বাংলাদেশে শীত তখন আর নাই বলিলেই হয়। চৈত্রের প্রথম। বসন্তের হাওয়া বহিতেছিল। বাক্সদুটি নামাইয়া দিয়া প্রণাম করিয়া পাঁচু বিদায় লইল। ননীমাধব বলিল, 'বস, তুমি ঐ বাক্সের ওপর চেপে।'
কিন্তু স্বামী দাঁড়াইয়া আছে, নিজে সে বসিবে কেমন করিয়া! গৌরী ইতস্তত করিতেছিল। ননীমাধব বলিল, 'বস, আমি টিকিট কেটে আনি।'
দু'পা আগাইয়া গিয়াই আবার পিছন ফিরিয়া বলিল, 'একা ভয় করবে না তো?'
গৌরী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, 'না।'
ট্রেন আসিল আধ ঘণ্টা দেরি করিয়া। ব্র্যাঞ্চ লাইনের ট্রেন। না আছে আলো, না আছে যাত্রী। জন দুই তিন উঠিল, জন চার পাঁচ নামিল। একটুখানি গোলমাল হৈ চৈ হইল। তাহার পর সিটি দিয়া ট্রেন ছাড়িয়া দিল।
দেখা গেল, ইণ্টার ক্লাসের একটি কামরায় গৌরী ও ননীমাধব উঠিয়া বসিয়াছে।

ট্রেনের জানালার বাহিরে ননীমাধব ঘন ঘন তাকাইতেছিল। সুমুখের দুইটা বেঞ্চে আরও জন কতক যাত্রী আগাগোড়া মুড়িসুড়ি দিয়া ঘুমাইতেছে। গৌরীর ইচ্ছা করিতেছিল, স্বামীর সঙ্গে দুটা কথা কয়। এমনি আর এক রাত্রে এমনি একটি ট্রেনের কামরাতেই যে তাহাদের প্রথম পরিচয় -- হাসিয়া এই কথাটি তাহাকে এই কথাটি তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য গৌরী উসখুস করিতে লাগিল। কিন্তু সুমুখের বেঞ্চের ঘুমন্ত লোকটা তাহাদেরই দিকে মুখ ফিরাইয়া রহিয়াছে বলিয়া গৌরী না পারিল কথা কহিতে, না পারিল ননীমাধবের কাছ ঘেঁষিয়া আর একটুখানি সরিয়া বসিতে। গায়ের শালখানি মুড়ি দিয়া সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
ঘণ্টাখানেক পরে অনেকগুলো ছোট ছোট স্টেশন পার হইয়া আসিয়া অন্ধকার একটি ছোট স্টেশনে ট্রেন আসিয়া দাঁড়াইতেই ননীমাধব বলিল, 'ওঠো।'
গৌরী প্রস্তুত হইয়াই ছিল, চট করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, 'বাক্স দুটো?'
'তুমি নামো আগে।' বলিয়া ননীমাধব দরজা খুলিয়া ধীরে ধীরে তাহাকে প্রথমে নামাইয়া দিল। তাহার পর বাক্স দুইটা টানিয়া দরজার কাছে আনিয়া নিজেও নামিল, বাক্সও নামাইল। প্ল্যাটফর্মের বালাই এখানেও নাই।
বাক্স দুইটা নিজের হাতেই কতক টানিয়া, কতক তুলিয়া স্টেশন ঘরের কাছাকাছি লইয়া গিয়া বলিল, 'বস, আমি গাড়ি দেখি। ধর তো, এই টিকিট দুটো।' বলিয়া গৌরীকে আবার তেমনি বাক্সর উপর বসাইয়া ননীমাধব 'গাড়ি, গাড়ি' করিয়া চিৎকার করিতে করিতে অন্ধকারে বোধ করি স্টেশনের বাহিরেই খোঁজ করিতে গেল।

ট্রেন আবার ছাড়িয়াছে। দেখা গেল, গহনার বাক্সটি হাতে লইয়া ননীমাধব একাকী সেই চলন্ত ট্রেনের যে কক্ষে আসিয়া উঠিয়াছে তাহাতে লোকজন কেহ নাই। মুখে তাহার কেমন যেন একটি অত্যন্ত নীরস নিষ্ঠুর নিরানন্দ হাসি।
স্বল্পালোকিত সেই নির্জন কক্ষের বাতায়ন পথে মুখ বাড়াইয়া ননীমাধব একবার স্টেশনের দিকে তাকাইল। কেরোসিন বাতির একটুখানি আলো গৌরীর মুখের উপর আসিয়া পড়িয়াছে। বাক্সের উপর সবুজ রঙের শালখানি গায়ে দিয়া তখনও সে ঠিক তেমনিভাবে নিশ্চল পাষাণ মূর্তির মত বসিয়া। স্বামীর আগমন প্রতীক্ষায় অন্ধকারের দিকে ব্যাকুল একাগ্র দৃষ্টি তাহার তখনও নিবদ্ধ।
এই বয়ঃসন্ধিগতা কিশোরীর -- এবং শুধু এই কিশোরীর কেন, সমগ্র নারীজাতির নিষ্ঠা ও ভালবাসার উপর আস্থা তাহার অনেকদিন হইতেই নাই। আজও তাই সে তাহার দৈনন্দিন ঘটনার মতই অত্যন্ত সহজভাবে গৌরীকে পরিত্যাগ করিয়া আসিয়া নিশ্চিন্ত নীরবে গহনার বাক্সটি কোলের উপর চাপিয়া ধরিয়া চুপ করিয়া বসিয়া আছে। কিন্তু এমনি মজা, মুখখানি তাহার চোখের সুমুখ হইতে যতই ঝাপসা হইয়া আসে, ননীমাধবও জানালার বাহিরে তত বেশি করিয়া তাহার গলা বাড়াইয়া দেয়।
কিন্তু সে আর কতক্ষণ।
গাড়ির বেগ ক্রমশ দ্রুত হইতে দ্রুততর হইতে লাগিল। ননীমাধবের চোখের সুমুখ হইতে গৌরীর সেই একাগ্র উন্মুখ দুটি চক্ষু অদৃশ্য হইল, মুখখানি অদৃশ্য হইল, দেহ অদৃশ্য হইল, সবুজ রঙের শাল, শালের নিচে গৌরীর দুটি অলক্তকরঞ্জিত সুকোমল শুভ্র পা, টিনের তোরঙ্গ কেরোসিনের আলো -- দেখিতে দেখিতে পশ্চাতের অন্ধকারের মধ্যে বিলীন হইয়া গেল। হু হু করিয়া বাতাস বহিতে লাগিল। দু'পাশের ঘন বন বেষ্টিত গ্রাম, দিগন্ত বিলীন শস্যশূন্য উন্মুক্ত প্রান্তর, শুষ্ক ধানের ক্ষেত, সকলের উপরেই অন্ধকারের গাঢ় আস্তরণ ক্রমশ আরও গাঢ়তর হইয়া উঠিল।

গত পনের বৎসরের ইতিহাসে নিষ্ঠুরতার কাহিনী যে তাহার জীবনে একেবারেই নাই তাহা নয়, তবে মানুষের জীবন লইয়া এমন খেলা কোনদিন খেলিয়াছে বলিয়া তাহার মনে হইল না।
গহনার বাক্সটার উপর হাত পড়িতেই ক্ষণপূর্বে যে মুখ তাহার বিগত জীবনের মতই পশ্চাতের অন্ধকারে মিলাইয়া গেছে, সেই গৌরীর মুখখানাই তাহার আবার মনে পড়িল। মনে পড়িতেই কেমন যেন একটা শুষ্ক অসাড়তায় মাথার ভিতরটা তাহার ঝিমঝিম করিতে লাগিল।
গাড়ি তখন খুব জোরে চলিয়াছে।
গাড়ির ঝকঝক শব্দ নির্জন কক্ষের সেই একক যাত্রীটির দুই কানের ভিতর দিয়া, বুকের উপর দিয়া, ধকধক করিয়া বাজিতে বাজিতে কোথায় যেন অতি নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করিতে শুরু করিল। কেন করিল কে জানে। এই অভাবব্ননীয় ব্যাপারে ননীমাধবের বিস্ময়ের তাহার পুঞ্জীভূত ঘৃণার চমৎকার প্রতিশোধ লইতেছে ভাবিয়া যে আনন্দ সে অনুভব করিয়াছিল, সহসা না জানি কেন সেই আনন্দের আবেগ কেমন যেন এক প্রাণান্তকারী নির্মম বেদনায় রূপান্তরিত হইয়া তাহার সমস্ত অন্তঃকরণটিকে মুহূর্তের মধ্যে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। শ্বাসরোধ হইবার উপক্রম করিতে লাগিল। মনে হইল, এ তাহার হৃদয়ের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইয়া চলন্ত গাড়ির মধ্যে টলিতে টলিতে পদচারণা করিতে লাগিল। বাহিরে সূচীভেদ্য ঘন অন্ধকার পরিবেষ্টিত বিশাল বহিঃপ্রকৃতির মাঝখানে নিঃসহায় নিরবলম্ব নিরপরাধ একটি বালিকার বেদনা পরিম্লান দুটি সজল পক্ষ্ম চক্ষু, একটি ব্যথিত করুণ মুখচ্ছবি ব্যতীত তাহার মনশ্চক্ষুর সম্মুখে আর কোথাও কিছু অবশিষ্ট রহিল না। গহনার বাক্সটা একবার মাত্র হাতে করিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা সে দূরে সরাইয়া দিল।

ট্রেনের গতি তখন আরও বাড়িয়াছে। এইবার বহুদূরে জংশন স্টেশন। আর একবার সে জানালার বাহিরে তাকাইল। গাড়ি তখন একটি নদীর পুলের উপর দিয়া সশব্দে চলিয়াছে। পশ্চাতে -- ঘন অন্ধকার নদীতীরের বায়ু হিল্লোলিত শুভ্র কাশগুচ্ছের অস্পষ্ট শুভ্রতা, সম্মুখে -- বহু দূরে একটি ডিসট্যাণ্ট সিগনালের রক্তিম আলোক -- ও যেন সেই পরিত্যক্তা গৌরীর দুটি ব্যথিত পাণ্ডুর চোখের মত জ্বলজ্বল করিতেছে।
ননীমাধব কোন প্রকারেই সেদিক হইতে তাহার মুখ ফিরাইতে পারিল না।
কিন্তু বাসন্তীর মুখখানা এখনও তাহার মনে আছে। মায়ার কথাও বিস্মৃত হয় নাই। ও মেয়ে সেই তাহাদেরই জাত, এই কথা ভাবিয়া সে জোর করিয়া চোখ বুজিল।
চোখ বুজিয়াও নিস্তার নাই। মুদিত চক্ষুর সম্মুখবর্তী মসীকৃষ্ণ ঘন অন্ধকারের দুর্ভেদ্য যবনিকা ভেদ করিয়া সে আলোক যেন তাহার অন্তরের মাঝখানে প্রবেশ করিতে চায়।
এতদিন পরে সত্যই তাহার মনে হইতে লাগিল, নিখিল ব্যাপী এই বিরাট মিথ্যাচারের বাহিরে সত্য বস্তু হয়তো বা কোথাও কিছু থকিতেও পারে।

শেষ

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১ - ১৯৭৬)। বিখ্যাত সাহিত্যিক, প্রায় ১৫০ খানি গ্রন্থের রচয়িতা। কালিকলম ও কল্লোলগোষ্ঠীর লেখক ছিলেন। দাদামশাই ছিলেন ধনী কয়লা-ব্যবসায়ী, নিজেও প্রথম জীবনে কয়লাকুঠিতে কাজ করেছেন। খনি-শ্রমিকদের নিয়ে বাংলাসাহিত্যে সার্থক গল্প ও উপন্যাস তিনিই প্রথম রচনা করেন। 'কয়লাকুঠির দেশে' এককালে বহুপঠিত গ্রন্থ ছিলো। সিনেমা জগতের সঙ্গে শৈলজানান্দ জড়িত হিলেন - চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে। ওঁর প্রথম পরিচালিত ছবি পাতালপুরী। রহস্যকাহিনীকার হিসেবে উনি তেমন পরিচিত না হলেও ওঁর কিছু কিছু লেখা এর পর্যায়ভুক্ত করা চলে।