রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

আমি-ই সেরা গোয়েন্দা

 

      খবরের কাগজওয়ালার ডাকে সকালবেলা ঘুমটা ভেঙে গেল। বিছানা ছেড়ে  উঠে মুখ-হাত ধুয়ে চা-টা হাতে নিয়ে বারান্দায়ে এলাম। শীতের সকালের উষ্ণ রোদটা বেশ আরামদায়ক। যাই হোক, বারান্দায় চেয়ারটা পেতে খবরের কাগজটায় চোখ রাখলাম। আমার ছোটো থেকেই খবরের কাগজের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা পড়া শুরু করার অভ্যাস। তবে আজ কাগজটা হাতে নিয়ে দ্বিতীয় পাতা ওলটাতে যাব, এমন সময় হঠাৎ প্রথম পাতার ডানদিকের একটা শিরোনামে চোখ চলে গেল। ওহ, আমার নামে কলকাতায় আরেকজন গোয়েন্দা আছে, বুঝি! তার আগে বলে দিই, আমার পেশা হল গোয়েন্দাগিরি করা। খুব একটা বড় মাপের কেস দেখি না; এই ছোটোখাটো চুরি-ডাকাতির কেসেই মাঝে-মধ্যে ডাক পড়ে। অবশ্য এখানে বলা দরকার, আমার শেষ কেসটা কিন্তু বেশ অদ্ভুত ছিল। আমার নামের আরেকজন গোয়েন্দার ব্যাপারে লেখা ছাপা হয়েছে দেখে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত কৌতূহল জাগল- দেখি তো ব্যাপারটা কী! “রিয়াঙ্কা সাহা-র নাম হয়তো কেউ-ই জানতেন না, তবে সবার মুখে তার নাম ঠোঁটস্থ” – আরে, এ তো যে আমার কেসটার ব্যাপারে লিখেছে! শেষ কেসটা যে বেশ জমজমাট ছিল তা জানতাম, তবে তা যে কাগজে ছাপবার যোগ্য, তা বুঝিনি। লেখাটা পড়তে পড়তে কেসটার কথা মনে পড়ে গেল।

“মিস্‌ সাহা! মিস্‌ সাহা!”
সাত সকালে কে হাঁক পাড়ছে, একথা ভাবতে ভাবতে তিতিবিরক্ত হয়ে দরজার কাছে গেলাম। দরজা খুলেই দেখি একজন স্যুট-বুট পরা অচেনা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে ভয় পেয়েছেন।
“মিস্‌ সাহা?”
“হ্যাঁ, আমি-ই। কী চাই?”
“আমার বড় সমস্যা হয়েছে। প্লিজ আমায় সাহায্য করুন।”
“আমি? আমি আবার... আচ্ছা, আসুন ঘরে আসুন।”
ঘরে নিয়ে এসে জল খেতে দিয়ে বললাম-
“হ্যাঁ, মানে, কী সমস্যার কথা বলছিলেন?”
“ওহ, সে আর কী বলব! আমি যে এখনো বেঁচে আছি, এই অনেক। ওরা তো আমায় মেরেই দিত!”
“ওরা কারা?”
“আরে, সে তো আর আমি জানি না।”
“ঠিক কী ঘটেছে খুলে বলুন তো?”
“তবে শুনুন। সেদিন রাতে ঘুমোতে যাব, এমন সময় হঠাৎ একটা শব্দ পেলাম। কেউ যেন জানালার কাঁচে টোকা মারছে। জানালা খুলে ব্যাটাকে ধরব কী, তার আগেই সে উধাও। তারপর হঠাৎ মনে হল, বালিশের নীচে যে আলমারির চাবিটা ছিল ওটা আবার কেউ নিয়ে নিল না তো। বালিশ সরাতেই দেখি, যা ভেবেছিলাম! কোনও চাবি নেই। সেদিন খুব ঝড় উঠেছিল। ওপরের ছাঁদের দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছি, এমন সময় নীচের গেটটা খোলার শব্দ পেলাম। সঙ্গে-সঙ্গে নীচে যাব কি, তার আগেই কেউ মেইন-সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে।”
“তারপর?”
“পুরো বাড়ি অন্ধকার। কোনও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। নীচে যেতে যেতেই দড়াম করে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেলাম। নীচে গিয়ে বুঝলাম ব্যাটারা উধাও।”
“বুঝলাম।”
“কী করি বলুন তো! আমি যদি তখন ঘরের মধ্যে থাকতাম, তাহলে তো আমায় মেরেই দিত।”
“তো, আপনি বলতে চাইছেন চোরেরা আপনার আলমারি খুলেছিল?”
“তা নয়তো কী? চাবিটা তো আর এমনি এমনি উধাও হয়ে যায়নি।”
“কিন্তু আপনি তো বললেন যে ছাদে যাওয়ার আগেই চাবিটা উধাও হয়েছে। তবে তো চোরেরা আগে থেকে আপনার ঘরে ছিল।”
“তা হবে।”
“কিন্তু তবে ওরা আবার দরজা খুলবে কেন?”
“মানে?”
“আপনি বললেন যে আপনি ছাদে যাওয়ার সময় দরজা খুলে আবার বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পান। তাই বলছি যে যদি চোরেরা আগেই আপনার ঘরে ঢুকে থাকে তবে তারা আবার দরজা খুলবে ও বন্ধ করবে কেন? তাও আবার সজোরে।”
“তা আমি জানি না। সেটা খুঁজে বের করা আপনার কাজ।”
এই বলে তিনি চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। অনেক জায়গায় খটকা লাগছিল। ভাবলাম পরের দিন একবার ভদ্রলোকের বাড়িটা দেখে আসব।

      পরের দিন সকালে ভদ্রলোককে টেলিফোন করে আমার যাওয়ার কথা জানালাম। সকালের জলখাবার খেয়ে ওঁর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। বাড়ির সামনে আসতেই চোখে তাক লেগে গেল। আহ্‌, কি বিশাল বাড়ি! রাজপ্রাসাদের সমান। ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন। এদিক-ওদিক ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগলাম। ভদ্রলোকও আমার পিছন-পিছন আসতে থাকলেন। মনে মনে ভাবছিলাম- এত বড় বাড়িতে একা থাকা সহজ নয়। কত ধরনের  বাদ্যযন্ত্র, ঘর সাজানোর জিনিস ইত্যাদি। ভদ্রলোক আমাকে ওঁর শোয়ার ঘরে নিয়ে গেলেন- সেই ঘরটা যেখানে আলমারিটা ছিল। ঘরটায় ঢুকতেই হঠাৎ জানালার কাঁচে দুটো টোকা পড়ার শব্দে আমরা সজাগ হয়ে উঠলাম।
ভদ্রলোক আস্তে আস্তে আমার কানের সামনে এসে বললেন-“এক ধরনের শব্দ। সেদিন এটাই শুনেছিলাম।”
ছোটো ছোটো পা ফেলে আমি জানালার সামনে পৌঁছলাম। সটান করে জানলাটা খুলতেই দেখি দুটি পায়রা সশব্দে উড়ে গেল। নীচে চোখ যেতেই দেখি পাখির বাসা। পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হল। সেদিন কোনও চোর নয়, বরঞ্চ পায়রাগুলিই জানলার কাঁচে টোকা মেরেছিল। ভদ্রলোকের মুখ দেখে বুঝলাম ব্যাপারটা তিনিও বুঝতে পেরেছেন। তিনি শীঘ্র জিজ্ঞাসা করলেন-
“তবে, আলমারির চাবিটা কে নিল?”
আমি কোনও উত্তর না দিয়ে আবার এদিক-ওদিক দেখতে লাগলাম। সামনেই একটা টেবিল ছিল। টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানি থেকে ফুলগুলো বের করতেই ভেতরে দেখি একটা চাবি। ভদ্রলোককে দেখাতেই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। বুঝলাম ওটা আলমারির চাবি। তিনি শীঘ্র আমার হাত থেকে চাবিটা নিয়ে আলমারি খুললেন। কিছুক্ষণ ভাল করে দেখে তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন-
“স- সবই তো দেখছি আছে।”
আমার চোখ তো কপালে উঠেছে। এ আবার হয় নাকি? চোর এলো অথচ চুরি করল না? সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন এলো। প্রশ্নটা ওঁকে করে ফেললাম-
“আচ্ছা, সেদিন আপনি দরজা বন্ধ করেছিলেন তো?”
ভদ্রলোকের জবাব শুনেই পুরো ব্যাপারটা জল-ভাত হয়ে গেল। বললাম, “সেদিন আপনার বাড়িতে কোনও চোর আসেনি।”
“মানে?”
“আপনি তো এইমাত্র বললেন যে ঘুমনোর আগে অবধি সচরাচর দরজা বন্ধ করেন না- ভেজিয়ে রাখেন।”
“তাতে আর কী হল?”
পুরো ব্যাপারটা ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম-
“সেদিন জানলার টোকাটা মানুষ নয়। পাখির করা। চাবিটাও আপনি-ই ফুলদানিতে রেখেছেন। ঘরে এত মূল্যবান জিনিস থাকলে মনের মধ্যে সর্বক্ষণ একটা ভীতি কাজ করে। সেই ভয়ের বশবর্তী হয়েই বারবার চাবি সরিয়ে রাখতেন। এতবার চাবি সরাতে সরাতে শেষবার কোথায় রেখেছেন, নিজেই ভুলে গেছিলেন।”
“তা নয় বুঝলাম, কিন্তু তবে দরজাটা কে খুলল?”
“তার উত্তর তো আপনি নিজেই দিলেন। সেদিন বলেছিলেন যে সেই রাতে নাকি খুব ঝড় উঠেছিল এবং আজ বললেন রাতে ঘুমনোর আগে দরজা বন্ধ করেন না। তাহলে ঝড়ের দাপটেই দরজা খোলে ও দড়াম করে বন্ধ হয়। আর অন্ধকারটাও ঝড়ের কারণে। আপনাদের বাড়ির সামনেই কয়েকজনকে তার সারাতে দেখলাম। সেদিন তার ছেঁড়ার কারণে অন্ধকার হয়।”
পুরো ব্যাপারটা শুনে ভদ্রলোক ফিক করে হেসে ফেললেন ও বললেন- “ব্যাপারটা কিন্তু ভুল বলেননি।”
আমার একটুও হাসি পেল না। সাত-সকালে এরকম একটা কারণে আমাকে বিরক্ত করা ওনার উচিত হয়নি। আমার মুখের ভঙ্গি দেখে উনি বললেন-
“আমায় ক্ষমা করবেন, মিস্‌ সাহা। সেদিন সত্যিই খুব ভয় পেয়েছিলাম।”
“হ্যাঁ, বুঝলাম। আমি তাহলে চলি।”
ভদ্রলোক আমার জন্য সরবত করে নিয়ে এলেন। সরবত শেষ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম।

      একটা গাড়ির হর্ন শুনে মনটা হঠাৎ খবরের কাগজের দিকে ফিরে এলো। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখি ১০:৩০ বাজে। মামাকে হাসপাতালে দেখতে যেতে হবে। শেষবারের মত কাগজে লেখাটা দেখতে দেখতে ভাবলাম- প্রতিদিন কত গোয়েন্দা বন্দুক, যন্ত্র ইত্যাদির দ্বারা গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে যান। তারা যদি যন্ত্রপাতি সরিয়ে রেখে মানুষের মানসিকতাটা বোঝার চেষ্টা করতেন, তবে কাজটা অনেকটা সহজ হয়ে যেত।

      চেয়ারটা ছেড়ে ঘরে যেতে যেতে মনে হল: এ-ই সেরা গোয়েন্দা। তবে এটা তো আমারই কেসের ব্যাপারে লেখা। কথাটা ভেবে কিছুটা উল্লাসের সঙ্গেই নিজেকে বললাম- “আমিই সেরা গোয়েন্দা।”

         

রিয়াঙ্কা সাহা

লেখক পরিচিতি - রিয়াঙ্কা বর্তমানে মহাদেবী বিড়লা ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমির একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। ২০১৬ সালে গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের ছাত্রী থাকাকালীন বালীগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের প্রাক্তনীদের আয়োজিত 'গোয়েন্দা গল্প' লেখার আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় রিয়াঙ্কার লেখা এই গল্পটি দ্বিতীয় স্থান পায়।