রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


প্রেমেন্দ্র মিত্রের

সুজন দাশগুপ্তের

গ্যাসলাইট মিস্ট্রি সিরিজ

এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড

 

 

 

 

 

 

 


 

মিলেনিয়াম মল

(দ্বিতীয় অধ্যায়)

ক্যামেলিয়ার কথাঃ


সাত সক্কালে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। কতবার নীতাকে বলেছি রোববার সকালে কাউকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিবি না। শনিবার বিছানায় গিয়ে হাত-পা ছড়াতে বেশ দেরি হয়ে যায়।
বলেছি যেই হোক, রোববার সকালে আমি ফোন-টোন ধরবো না। নীতা রামানী আমার ম্যানেজার ও বন্ধু। বুঝদার মেয়ে। ও সাধারণতঃ দুপুর দেড়টা নাগাদ আসে। তখন আমরা বিছানায় পা ঝুলিয়ে আইরিশ কফি খাই। ও কিছু ফ্রুট নিয়ে আসে। এ দিন আমি জিমেও যাইনা।
কফি খেতে খেতে ও সেদিনের কাকে কাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে জানিয়ে দেয়। আর ও হল দারুণ গসিপ। এই লাইনে নানা জায়গায়, বিজনেসের অলিগলিতে ওর অবাধ যাতায়াত। ও বলেও বেশ মজা করে। আমরা দুজনেই হাসি। হেসে গড়িয়ে পড়ি।
এই সেদিন ও বলছিল কানের পাশে সাদাচুল , টেকো এক প্রবাদপ্রতিম নাট্যকারের কথা।
গত গ্রীষ্মে একটি স্পন্সর্ড সেমিনারে ইউরোপ ঘুরে এসেছিলেন। দলের চ্যালাচামুন্ডাদের কাটিয়ে দিয়ে উনি ওঁর বুড়োবয়সের প্রেমিকা এক মেয়ের বয়েসী হুকারের সঙ্গে মাদ্রিদের একটি হোটেলে সাতদিন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ হলে যা হয়!
শরীর চলে না কিন্তু ওই দিল-হ্যায়-কি-মানতা -নহীঁ। তারপর হাভাতের মত মদ গেলা! লুজ মোশন! কোথায় বেড়াতে যাবেন কি খালি পটি যাচ্ছেন আর আসছেন। বাঁ-হাত আর শুকোয় না। তো সেই মেয়েটি বিরক্ত হয়ে শেষের চারদিন ওঁকে সারাক্ষণ হাগিস্ পরিয়ে রাখল।
কিস্সাটা নাকি দেশেও মেয়েদের কানেও পৌঁছে গেছে।
হাসতে হাসতে আমার চোখে জল এসে গেছিল।
--- সব পুরুষগুলো একরকম, না রে নীতা? মারাঠি, গুজরাতি, বাঙালী, তামিল, জাঠ, সর্দার সব এক। কতই তো দেখলাম , আলাদা কিছু তো পাইনি। অবশ্যি তোদের সিন্ধিদের কথা জানিনে। হয়তো--?
--- 'জ্যাদা শোচোঁ মত জেসমিন! আলাদা কিছু না। পুরুষ হল এক বিচিত্র প্রজাতি। ভাল ভাল কথা, আর্ট-ফার্ট, সব কিছুর আড়ে একই চিন্তা, একই মতলব। তাই দেখনি শংকরজী কৈলাসপতির সিম্বল কী ? একটি উত্থিত লিঙ্গ। অ্যাপ্রোপিয়েট। কারণ এটা হল গোটা পুরুষ প্রজাতির লোগো।
একবার হল কি, সমস্ত মেয়েরা কৈলাসে পার্বতীর কাছে জয়েন্ট পিটিশন নিয়ে গেল যে--'।
আমি হেসে ফেলে হাত তুলে বাধা দিই।
-- এই চুটকুলা আগেও শুনেছি। ওসব ছাড়। এবার কাজের কথা বল।
ও চট করে ডায়েরি দেখে নেয়।

--- আজ বেশি নেই। তিনটে তিরিশে ডারবান হোটেলের ম্যানেজার এগ্রিমেন্ট রিনিউয়ালের কাগজপত্র নিয়ে আসবে। ৫টায় সমশের। নতুন গানের লিরিক শোনাতে চায়। আর বুড়ো ডি কস্টা ছুটি চাইছে, একমাসের। বাইরে যাবে। তাই সন্ধে সাতটায় একজন অল্প বয়েসী ছেলেকে ফুরনে কাজ করার জন্যে নিয়ে আসবে। লীড গিটারে কাজ চালিয়ে নেবে।ব্যস্! তারপর ডিনার।
---- আর লা মেগাপোড? ওদের কি হল? ওদের এই উইক এন্ডেই আসার কথা ছিল না? ফোন করিস নি?
--- ওরা কন্ট্র্যাক্ট রিনিউ করবে না, আজ জানিয়ে দিয়েছে।
--- বাস্টার্ড! অ্যাদ্দিন ধরে ঝুলিয়ে রেখে এখন--! মরুক গে! ভবিষ্যতে ডাকলেও যাব না। আর দলবিন্দরের নামটা নোট করে রাখবি।
আমার প্রোগ্রামের কোন ফ্রি-পাস ইন শালোঁ কো নহীঁ মিলনা চাহিয়ে।
-- সওয়াল হী নহীঁ, প্রশ্নই ওঠে না।
ইদানীং বড় ক্লান্ত লাগে। বয়স হচ্ছে বুঝতে পারি। সবগুলো রোববার কেমন একইরকম হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আজকের রবিবারটা যে অন্যরকম হবে কে জানত?
নীতার জন্যে আলাদা করে রাখা মোবাইলটা কোঁ কোঁ করে বারবার এস এম এস পাঠাচ্ছে। ঘুমচোখে স্ক্রীনে নীতার নাম। ঘড়ি বলছে মাত্র সাড়ে দশটা।
অবাক হওয়ার চেয়েও ভয় পেলাম বেশি। ওর অসুখ-বিসুখ? বা ইম্পর্ট্যান্ট কারো ডেথ?

--- জেসমিন, আমি কল ফরওয়ার্ড করছি, কথা বলে নাও।
-- এখন?, কী ব্যাপার? হয়েছেটা কী?
--- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কোন সিকিউরিটির মামলা। ভদ্রলোক তোমার সঙ্গে ডিরেক্টলি কথা বলতে চান।
বিরক্ত হই।
--তুই বললি না, বিকেল চারটের সময় কথা বলতে? আমাদের সিকিউরিটি নিয়ে কোন প্রবলেম নেই তো! কোন বাউন্সার বা কাস্টমারের সঙ্গে কোন ঝামেলা হয় নি। তাহলে তাড়া কিসের?
--- না, জেসমিন, লোক্যাল কোন পেটি লফড়া না। এটা এসটিডি কল,। নাম বললেন সদাশিবন। কিসের একটা হাই সিকিউরিটির মামলা। বললেন মিস ক্যামেলিয়া যদি পূর্বজীবনে সেন্ট অ্যাগনেস স্কুলের টিচার জেসমিন ম্যাম হন তবে যেন এই ফোনটা ধরেন। ভদ্রলোক কিন্তু বেশ নাছোড়বান্দা। আমার মনে হল মামলা অন্যরকম। তাই বলছি ফোনটা ধর।

হ্যাঁ, ধরেছিলাম ফোনটা। নীতা রামাণীর কথা মেনে। ও আমার সেক্রেটারি বল্লে কম বলা হয়।
একটা ভারি পুরুষালি গলা। সাতসকালে কেন জ্বালাচ্ছে বাবা! কী চায়?
নাম বলছে সদাশিবন! সদাশিবন? সদাশিবন? কোন সদাশিবন? দক্ষিণী মন্ত্রীর পিএ? মুম্বাইয়ের ফিনান্সিয়ার?
আবার জানতে চাইছে আমি আর হরিয়ানার ক্যাথালের সেন্ট অ্যাগনেস স্কুলের মিস জেসমিন একই ব্যক্তি কি না?
সতর্ক হয়ে যাই।সিকিউরিট? আই বি? স্পেশাল ব্রাঞ্চ? এই পরিচয় তো সবার জানার কথা নয়। সতের বছর আগে সেসব চুকে বুকে গেছে, আমি মনে রাখতেও চাই না।
গলায় একটা প্রফেশনাল টোন আনি। বলি -- কাম কী বাত কীজিয়ে।
আপনার এসব কথার উত্তর দেব কেন?
ওদিক থেকে একটা শান্ত প্রত্যুত্তর এলো।
-- না, না। বিব্রত হবেন না। আপনি জেসমিন ম্যাম না হলে আমি মাপ চাইছি। এই কনভার্সেশন ভুলে যান। আপনাকে একটুও বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু আমি খুঁজছি এমন একজন মহিলাকে যাকে প্রায় ১৭-১৮ বছর আগে আমি স্কুল টিচার জেসমিন নামে জানতাম। পরে তিনি স্কুলের চাকরি ছেড়ে পেশাদারি গানের জগতে পা রাখেন।
--তারপর?
--তারপর আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই, ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছি। আজ তাঁকে আমার খুব দরকার।
-- বেশ। কিন্তু আপনার কেন মনে হল আমিই সেই ? আমাদের পেশাদারি গানের জগত বিশাল। অনেকেই আসে আবার হারিয়ে যায়। হরিয়ানার মফঃস্বল থেকে কোন মেয়ে আসতেই পারে। হয়তো টিকতে পারেনি। ফিরে গেছে। সেখানে খোঁজ করুন। আর আমি তো হরিয়ানার নই। বিলাসপুরের।
-- না, মানে ওই মেয়েটিও বিলাসপুরের। ক্যায়থালের স্কুলে ঘটনাচক্রে চাকরি করছিল মাত্র।
(লোকটা কি আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ছে? দেখাচ্ছি বাছাধনকে।)
--শুনুন, আপনি আবার ভুল করছেন। ভারতে চার-চারটে বিলাসপুর আছে। পাঞ্জাবে, হিমাচল প্রদেশে, হরিয়ানায় এবং ছত্তিশগড়ে।আপনি যাকে খুঁজছেন সে হরিয়ানার বিলাসপুরের; আর আমি ছত্তিশগড়ের।
-- আমার ভুল হয় নি। জেসমিন ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরের রেল কলোনির মেয়ে। চাকরিসূত্রে হরিয়ানার ক্যায়থালে। আমি ওকেই খুঁজছি।
--- কেন? বলতে আপত্তি আছে?
-- না, না! একসময় ওকে ছোটখাট সাহায্য করেছিলাম। আর আজ আমারই কিছু সাহায্যের দরকার।
--- কী রকম সাহায্য? কিছু আর্থিক লেনদেন? ধারশোধ? আমার তো কারো কাছে কিছু ধারকর্জ নেই! যদি বড় রকম ডোনেশন এর কথা ভেবে থাকেন তবে তার জন্যে সাতসকালে আমার ঘুম ভাঙানোর দরকার ছিল না। নীতার সঙ্গে কথা বললেই পারতেন। ভালকথা , আপনার ট্রাস্টের নামটা কী ? ইনকাম ট্যাক্স বেনিফিটের জন্যে রেজিস্ট্রি করা আছে তো? নইলে বড় ডোনেশন দেওয়া সম্ভব হবে না।

(আমি এত কথা বলছি কেন? লোকটার গলার আওয়াজ ভাল লাগছে বলে? না, অন্য কিছু? লোকটা আমার পুরনো জীবন সম্বন্ধে বেশ কিছু জানে বুঝতে পারছি। কিন্তু কতটা? আর মতলবটা কী? ব্ল্যাকমেল? কথা বলতে বলতে বোঝার চেষ্টা করছি।)
-- ম্যাডাম। আর্থিক নয়। অন্যরকম সাহায্য দরকার। সেসব ফোনে সম্ভব নয়। যদি আগামীকাল এই সময় বা দুপুরে একবার সামনাসামনি কথা বলা যায়।

(এবার বিরক্ত হই। লোকটা কি ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছে?)
-- কাইন্ডলি আমার পিএ রামানীর সঙ্গে কথা বলুন। অ্যাপো ওই ঠিক করে দেবে। গুড ডে!
--- আরে শুনুন, শুনুন! জেসমিন! আমার কোড ওয়ার্ড হল-- বেতলপুর চার্চ, ফাদার মনোহর লাল।
(আমার শরীরে বিশহাজার ভোল্টের শক্। )
---আপনি সদাশিবন? এক্স-আইপিকে এফ অফিসার?
-- যাক, চিনতে পেরেছেন তাহলে! তাহলে কাল দেখা হতে পারে?
-- হ্যাঁ, দুপুরে আমার সঙ্গে লাঞ্চ করুন।

সদাশিবনের কথা

আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না। ওরা দুজন নয়, একজন। হরিয়ানার ক্যায়থালের স্কুল টিচার জেসমিন ম্যাডাম আর দিল্লির ডিস্কো কুইন মিস্ ক্যামেলিয়া ।
সেন্ট অ্যাগনেস স্কুলে কিছু নিরীহ এনকোয়ারি -- যেমন জেসমিন ম্যাডাম কোন বছরে স্কুল থেকে রিজাইন করেছিলেন ; তারপর দিল্লিতে খোঁজখবর-- গানের লাইনে ক্যামেলিয়া কবে উদিত হলেন, প্রথম ম্যানেজার কে ছিল, ব্যস্। সব খাপে খাপে মিলে গেল। তবু সন্দেহ থেকে যায়। একই রকম পরিস্থিতি , একই নাম দুজন আলাদা ব্যক্তিরও হতে পারে। যেমন ভারতবর্ষে চার-চারটে বিলাসপুর। চার আলাদা রাজ্যে, তিনটে আবার পাশাপাশি। তেমনি একাধিক ক্যামেলিয়া হতে বাধা কোথায়?
কিন্তু উল্টো কোশ্চেনের উল্টো জবাব দিতে গিয়ে ফাঁদে পড়ল ক্যামেলিয়া। বলেই বসল আসলে ও হরিয়ানার নয়, ছত্তিশগড়ের। এটাই ছিল ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। আর তখনই আমাকে চিনতে পারল।
---আপনি সদাশিবন? এক্স-আইপিকেএফ অফিসার?
ওর গলার আওয়াজে ছিল বিস্ময়, ভালোলাগা আর কি একটা যেন? ভয়? রাগ ? নাকি ঘৃণা? বুঝতে পারছি না।
ভয় কেন হবে? আমি কি ব্ল্যাকমেলার?
আর আমি তো কোন থ্রেট করিনি। বরং স্টার্টার শেষ হতে হতে বুঝিয়ে দিয়েছি ওর আগের জীবন, অর্থাৎ কনভেন্ট স্কুলে টিচারের প্রেডিক্টেবল ছায়ায় ঘেরা শান্ত জীবন ছেড়ে এই হাজার ওয়াটের আলোয় ঝলমলে উদ্দাম জীবনে আসার রোডম্যাপ নিয়ে আমার কোন কৌতূহল নেই।
কথাটা কি বিশ্বাস করল? বুঝতে পারিনি। হয়ত ভেবেছে সবই আমার জানা। না জানার ভান করছি। আসলে সত্যিটাই বিশ্বাস করানো কঠিন।
সেই একটা ঘটনা। তারপর থেকে কোন যোগাযোগ ছিল না। আমিই চাইনি। কোন উপায় ছিল না। চাকরি বদলে অনেক দূরে চলে গেছি। তাই আই পি কে এফ,--- জাফনায় যাওয়া।

কিন্তু ও কথাটা কী বলল যেন?
---আপনি সদাশিবন? এক্স-আইপিকেএফ অফিসার?
তার মানে ও বহুদিন আমার খবর রেখেছে। শুধু জাফনা যাওয়া নয়, সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়াও, --হ্যাঁ, এক্স-আই পি কে এফ!
কিন্তু আমি এখন রায়পুরের মিলেনিয়াম মল প্রোজেক্টের সিকিউরিটি কনসাল্ট্যান্ট। সেজন্যেই দিল্লি আসা। মিস ক্যামেলিয়াকে ওখানে পারফর্ম করতে রাজি করানো আর ওর সিকিউরিটির ব্যবস্থা। সবটাই আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
কিন্তু তার চেয়েও বড় কৌতূহল ছিল -- কেন ও মিলেনিয়াম মল উস্বোধনের প্রোগ্রামে রায়পুর যেতে রাজি হয় নি। কেউ ভয় দেখিয়েচে? না যাওয়ার জন্যে আলাদা টাকার অফার করেছে? কে সে? রাজকুমার গুলবচন্দানী বা ওর লোক? আমাকে যে সব সম্ভাবনার কথাই খেয়াল রাখতে হবে। আঘাত যে কোথা থেকে আসতে পারে!
হ্যাঁ, আঘাত আসবেই। আমি গন্ধ পাই।


ডিনারের সময় কিছু টুকটাক কথাবার্ত; বক্সিং রিংয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সতর্ক পদক্ষেপ। ছোট ছোট জ্যাব, ফেইন্ট, এক-দুবার ডাক করা, এর বেশি নয়।
হ্যাঁ, এই ডিনারের তুলনা শুধু বক্সিং রিংয়ের সঙ্গেই চলে। দুজনেই স্বেচ্ছায় এসেছি; দুজনেই একে অপরের ক্ষমতা খানিকটা জানি। কিন্তু দুজনেরই টান টান স্নায়ু; জিততে হবে। অপরপক্ষকে মাটিতে পেরে ফেলতে হবে। ডিনার সার্ভ হল যেন প্রথম রাউন্ড শেষের বেল বাজল। ডিনার শেষ। জেসমিন একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েসী ভঙ্গিতে রিং ছাড়ল। অর্থাৎ , তৃতীয় রাউন্ডের খেলা শুরু হল। আমি দ্বিগুণ সতর্ক। ওর চোখে চোখ রাখি। চোখ অনেক কিছু বলে।
প্রথম ওপেনিংটা আমার।
-- মিলেনিয়াম মলের প্রোগ্রামের অফার অ্যাক্সেপ্ট করলে না?
সোজাসুজি একটি স্ট্রেট লেফট, ওর চোয়াল লক্ষ্য করে।
একটু অবাক হলেও সামলে নিল।
-- আপনার ইন্টারেস্ট?
হিটটা সামলেছে ডানকাঁধের ওপর নিয়ে।
--- বললাম না--আমি মলের ইনগারেশন প্রোগ্রাম শেষ হওয়া অব্দি গুলাবচন্দানীদের সিকিউরিটি কন্সালট্যান্ট। ভুলে যাচ্ছ কেন?
চটুল ফুটওয়ার্কে আমি সার্কলটা ছোট করে আনি।
--- ও!
পিছিয়ে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে, ওপেনিং খুঁজছে।
-- তাই কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু দেখলে কারণ জানতে চাইব না?
রাইট হ্যান্ড জ্যাব, বাঁদিকের রিবসে।
--- অস্বাভাবিক কী দেখলেন?
লেফট হুক, তৈরি ছিলাম। ডাক করে সামলে নিয়েছি। কিন্তু গার্ড নেমে গেছে।
-- স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যে প্রোগ্রামে আসছেন তাতে লোকে ফি না নিয়ে পারফর্ম করতে চায়। অথচ তুমি রাজি হলে না। ফিরিয়ে দিলে। কারণটা কী? তুমি এখন অনেক বড় আর্টিস্ট, এদের নাগালের বাইরে? নাকি অন্য কোন কিছু?
দ্রুত কয়েকটি পাঞ্চ, ও একেবারে দড়ির ওপর গিয়ে পড়ে। তারপর জড়াজড়ি করতে করতে দম নেয়।
--- আমাকে কী ভেবেছেন? সম্মান ও আত্মমর্যাদা কম্প্রোমাইজ করে শুধু পয়সার জন্যে যে কোন জায়গায় যাব?
আচমকা এক আপার কাট্! ঠিক থুতনির ওপর। হড়বড়িয়ে রোপের সাহায্য নিই।
-- শুধু তাই?
-- শারীরিক ক্ষতিরও সম্ভাবনা ছিল।
একটি দুর্বল রাইট হুক; ইম্প্রেসড্ হইনি। কাউন্টার পাঞ্চে ওকে ঠেলে দিই।
---- ছোট ভাই? রাজকুমার গুলাবচন্দানি?
এটা কনুই থেকে আচমকা হুক; তৈরি ছিল না। চোয়াল নড়ে যায়, শুধু মাথা নাড়ে।
আমি ছাড়ি না। জয়ের গন্ধ পেয়েছি। দুর্বল হলে চলবে না। টেকনিক্যাল জিত নয়,আমি চাই নক আউট ।
কিন্তু রাউন্ড শেষের বেল বাজে। ও ওয়াশ রুম থেকে ঘুরে আসার অনুমতি চায়।

 

(২)

উঃ, সেদিনের লড়াইটা যে এইভাবে শেষ হবে ভাবি নি। ওয়াশ রুম থেকে প্রায় আধঘন্টা পরে যে বেরিয়ে এল তাকে দেখে চমকে উঠলাম। এবার ও মেক আপ এবং শরীরী বিভঙ্গে রাজকুমারের ফাইলে দেখা লাস্যময়ী মিস ক্যামেলিয়া।
না, এবার আর আগের সেই সতর্ক স্টেপিং, চিন্ গার্ড করে প্রদক্ষিণ , দু'পায়ে এল-শেপ বানিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা নেই। ও এগিয়ে এল যেন দু'হাতে জোরালো পাঞ্চ ছুঁড়তে ছুঁড়তে!
---আমি যে সদাশিবনকে চিনতাম সে যে এতবড় কাওয়ার্ড তা তো জানতাম না। পরে জাফনাতে যাক বা জ্যামাইকাতে , সিংহের খাল গায়ে দিয়েও শেয়াল চামড়ার রং লুকোতে পারে কি?
--- কী বলছেন বুঝতে পারছি না।
-- আপনার কোড ওয়ার্ডটাই আপনাকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি;-- বেতলপুর চার্চ, ফাদার মনোহর লাল। কিছু মনে পড়ছে?
--- হ্যাঁ; ওই চার্চেই আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। ফাদার মনোহর লালের মাধ্যমে।
-- এগজ্যাকটলি!
--- আমি ওই চার্চে সাতদিন ধরে লুকিয়ে ছিলাম। বিলাসপুরের পুলিশ আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ওখান থেকে বেতলপুর চার্চের দূরত্ব মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার। ওরা এলিমিনেশন করতে করতে প্রায় ট্রেস করে ফেলেছিল। আমার আগের শেলটারে ওরা গন্ধ শুঁকে পৌঁছে গেছে দু'দিন আগে। এভাবে যেকোন সময়ে ওরা বেতলপুর চার্চে পৌঁছে যাবে --হয়ত আগামী কাল ভোর বেলায়। ফাদার ভয় পাচ্ছিলেন। চার্চের স্টাফ কোয়ার্টার থেকে আমি ধরা পড়লে ওঁদের নিয়ে টানাটানি হবে।
[আর আমি? ভয় নয় আতংক, হাত পায়ের আঙুল দুমড়ে কুঁকড়ে যাওয়া আতংক। কারণ, ঠেকেদার ভাটিয়া, থানার ওসি কাটরে ও সেকন্ড অফিসার পান্ডে পুলিশমহলে বলে রেখেছে --- একদফে কেরেস্তান শালী কো অন্দর তো হোনে দো, ফির দেখো হম বারী বারী মেঁ উসকী ক্যা গত বনাতে! অপনা সুরত নহীঁ পহচানেগী।
কী যে ভাবে এই শকুনের দল! ক্রিশ্চান মেয়ে হলেই এত সহজে পাওয়া যায়!]
-- তা আপনিও তো কম ন'ন। শহরের নামজাদা ঠেকেদারের ছেলেটাকে থাপ্পড় মেরে দিলেন!
--- আরে রোজ রোজ স্কুলে এসে বিরক্ত করত। বলে স্কুল ফেরত আমার বাড়িতে চলুন। দুটো বাচ্চা কে ইংরেজি পড়াতে হবে। গাড়ি এসে নিয়ে যাবে , দিয়ে যাবে। ওর বউ নেই, দু'বছর আগে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়ে মরেছে। ওর স্বভাব গোটা বিলাসপুর শহর জানত।
--- কিন্তু ওদের লম্বা হাত।
---সেই থাপ্পড় মারাই কাল হল, আমার গোটা জীবন বদলে গেল। থানায় কমপ্লেন করল যে আমি নাকি ওর দুটো বাচ্চার মার্কশীটে ব্লেড দিয়ে আগের নম্বর তুলে খুব নম্বর লিখে ফেল করিয়েছি। বাপের সঙ্গে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে বাচ্চাদের ওপর বদলা নিয়েছি। ব্যস্, ফ্রড ও ফোর্জারির দায়ে আমার বিরুদ্ধে নন-বেইলেবল ওয়ারেন্ট। ঘরে এলোমেলো সার্চ। থানার ভেতর থেকেই আগাম খবর পেয়েছিলাম যে আমকে গ্রেফতার করতে আসবে। প্রথম কয়দিন সেই পুলিশ কর্মচারির বাড়িতেই লুকিয়েছিলাম। ওরা এটা আন্দাজ করতে পারে নি। যখন গন্ধ পেল তখন কোন উপায় না দেখে ফাদার মনোহর লালের আশ্রয়ে এলাম। আর সেই কঠিন সময়ে আপনি এলেন । সেদিন ছিল শনিবার। কিছু ডোনেশন । আর? আর বোধহয় শনিবারে ফাদারের কাছে কনফেশন করতে। কী? ঠিক বলেছি না?
জেসমিন হেসে ওঠে, ক্যামেলিয়া হাসি। আমি সতর্ক হই।
--- হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।
--- তা আপনিও পাপ করেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি মিলিটারি পোশাকে একজন সেন্ট!


--প্লীজ জেসমিন, লিসন।
-- নো-ও-ও! ইউ বেটার লিসন ফার্স্ট! You owe me an explanation! you moron,
গর্জে উঠেছে জেসমিন; উত্তেজনায় নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। বড় বড় শ্বাসের সঙ্গে উঠছে নামছে ওর বুক। কিন্তু আমি অনায়াসে অন্যদিকে চোখ ফেরাই।
--- ও কে; শুট্!
--- ফাদার তোমাকে আদেশ দিলেন আমাকে রাতারাতি হরিয়ানার ক্যায়থালে সেন্ট অ্যাগনেস চার্চে পৌঁছে দিতে। ওখানে স্কুলে ভ্যাকান্সি আছে। ওখানকার প্যাস্টর ইম্মানুয়েলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়ে গেছে। আমি অরফ্যান। আমার সমস্ত কাগজপত্তর এক অগ্নিকান্ডে পুড়ে গেছে। আর তুমি তো জানতে আমি ছিলাম রেল কলোনির মেয়ে সুমতি সুসান। সেদিন থেকে হলাম জেসমিন অ্যালেক্স, বাপ-মা নেই, অরফ্যান।
তুমি তখন রায়পুরে, এনসিসির কম্যান্ডান্ট--তিনবছরের জন্যে। কিন্তু তুমি আমাকে চার্চ অবদি নিয়ে যাও নি। ক্যাথালের বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি ট্যাক্সিতে আমাকে বসিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে আগাম পেমেন্ট করে গায়েব হয়ে গেলে। অথচ--!
--- বাকিটা আমি বলছি। ফাদার তোমাকে বলেছিলেন যে উনি আমাকে রাজি করাবেন। মানে তোমাকে বিয়ে করতে।আগে চিঠি লিখে সেদিন আমাকে আনিয়েছিলেন। বলেছিলেন-- তোমরা একে অপরকে দেখে নাও। খোলাখুলি কথা বলতে পারো। মেয়েটি মা মেরীর মত পবিত্র। কিন্তু সেই শনিবার আমি ফাদারকে কনফেশনের সময় জানিয়েছিলাম কেন আমি এই বিয়ে করতে পারব না। উনি চমকে উঠেছিলেন, খালি বারবার বলছিলেন-- জেসাস সেভস্!
-- দিল্লিতে একরাত আমরা হোটেলে ছিলাম। পুলিশের ভয়ে একই কামরায়। ফাদারের নির্দেশে স্পাউজ সেজে।
আমি খাটে, কিন্তু তুমি ভীতুর ডিম সোফায় শুয়ে ছিলে। যদিও সেদিন তুমি যদি আমায় ছুঁতে বাধা দিতাম না। আমার মন ভরে ছিল কৃতজ্ঞতায়, ভালোলাগায়। তবু বলি-- তোমার ওই সংকোচ, ওই সাবধান হওয়া ভাল লেগেছিল।
কিন্তু, পরদিন আমাকে ফেলে পালিয়ে গেলে কেন কম্যান্ডার সদাশিবন? কেন হিউমিলিয়েট করলে?
--- আমার উপায় ছিল না।
-- লায়ার! কেন উপায় ছিল না? ডিড য়ু লাভ সাম আদার গার্ল? টেল মি!
-- নো নো! নো আদার গার্ল! আই ওয়জ কমপেল্ড। ফরগিভ মি?
-- নেভার! আইদার য়ু টেল মি দ্য ট্রুথ, এল্স--!
-- আই কান্ট! বিলিভ মি।
--- বিলিভ য়ু? ডু য়ু নো ইয়োর কাওয়ার্ডিস হ্যাজ মেইড মি এ স্লাট?
--- কী সব বলছ? শান্ত হও জেসমিন; হোঁশ মেঁ আও।
--- আমি ঠিকই বলছি। তুমি যদি সেদিন ফাদারের কথা শুনে আমায় বিয়ে করতে তো আজ আমি ক্যামেলিয়া না হয়ে জেসমিনই থাকতাম, জেসমিন সদাশিবন। আ টিচার লাভড বাই অল।
-- খুলে বল, ইট ইজ স্টিল ফগি।
--- তুমি পালালে, আমি কাজ পেলাম, শেলটার পেলাম। কিন্তু দুজন জেনে গেছল আমার ট্রু আইডেনটিটি। আমি ব্ল্যকমেইলের শিকার হলাম, পালা করে। শেষে এমনি সব মেয়েদের যা হয়, অ্যাবর্শন করাতে হল। ব্যস্, চার্চের শেল্টার হারালাম। আমি এখন দিল্লির ফ্লাঅওয়ার ভাসে ক্যামেলিয়া। সব তোমার জন্যে। নাও ইট ইস ইওর টার্ন। টেল মি দ্য ট্রুথ।
[ এই আচমকা রাইট হুকে আমি রিংয়ের কোনায় ছিটকে গেছি। ও এগিয়ে এসেছে নক আউট পাঞ্চের জন্যে। আমি কী করি? কোন উপায় নেই। একটা আপার কাট?]
আমার ফুসফুসের সব হাওয়া বেরিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে রিজার্ভ স্ট্রেংগথ থেকে ধার নিয়ে ওর চোখের দিকে তাকাই।
--- তুমি ফাদার মনোহরলাল কে জিগ্যেস করলে পারতে, উনি সব জানেন।
--নো! আই উড লাইক টু হিয়র ইট ফ্রম য়োর ওন মাউথ।
--- জেসমিন। আমার--- আমার পক্ষে কোন মেয়েকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
জেসমিনের ভ্রূ কুঁচকে যায়, চোখ প্রথমে ছোট হয়ে তারপর আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে,। সে তীব্র দৃষ্তির সামনে আমি চোখ নামিয়ে নিই।
--- হোমো? তুমি ছোট ছেলেদের বিছানায় ডেকে নাও?
---ওহ নো , নাথিং লাইক দ্যাট। অ্যাম নো পেডোফিল, বাট--
---- বাট গে?
আমি চুপ। এক মিনিট। কেউ কোন কথা বলি না। রিস্টওয়াচের টিক টিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। হটাৎ ও হো-হো করে হেসে ওঠে। তারপর হাত বাড়িয়ে দেয়।
-- ও মি, ও মাই! হাউরিডিকুলাস! লেট আস বি ফ্রেন্ড্স্। এবার বল, ওই স্কাউন্ড্রেল রাজকুমারকে কী করতে হবে?

(৩)

ফিরেছি রায়পুরে, তিনদিন বাদে। দুপুরবেলা রমেশ গুলাবচন্দানির অফিসে গিয়ে ফোল্ডারটা সামনে রাখি। তাতে একটি একশ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে তৈরি কন্ট্র্যাক্টে Camelia nee Jesmin Alex এর সিগনেচার, দুজন উইটনেস-- আমি আর ওর সেক্রেটারি নীতা রমানী। ফার্স্ট পার্টির জায়গায় রমেশের সিগনেচার আগে থেকেই করা ছিল। একটা কপি আমি জেসমিনকে আগেই দিয়ে এসেছি।

সেদিন ডিনারের পর আমাদের কথাবার্তা অনেকক্ষণ চলেছিল। দুজনেই একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। জেসমিন জানতে চাইছিল আরো কিছু। যেন আমাকে বুঝেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না। দুজনেই অনেক কথা বলি। কি করে যেন আমাদের গার্ড নেমে গেছল। ও বলে রাজকুমার জেনে ফেলেছে ওর অতীত।
ওকে ভয় দেখিয়েছে ফাঁস করে ওর প্রফেশনালি ক্ষতি করবে। ক্যামেলিয়া ওরফে জেসমিনের এখন দিল্লিতে ক্লাউট কম নয়। ও পাল্টা থ্রেট করে রাজকুমারকে নোংরা ব্ল্যাকমেল ও ক্রিমিন্যাল ডিফেমেশন এর দায়ে জেলে পুরতে পারে বলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় পায়। নীতা পরামর্শ দেয় ঝামেলা এড়াতে। তাছাড়াও রয়েছে শারীরিক ক্ষতির ভয়। দিল্লিতে রাজকুমার কিছুই পারবে না। কিন্তু রায়পুরে? ভাড়াটে লোক দিয়ে? অন্ততঃ মুখে অ্যাসিড?
রাজকুমার আশ্বস্ত হয় যে রায়পুরে মিলেনিয়ম মলের উদ্বোধনের দ্বিতীয় দিনে মিস ক্যামেলিয়া আসছে না। কিন্তু রায়পুর শহরে পোস্টার আগের মতই চলতে থাকে। সবাই জানে যে ও আসছে।
রমেশ আমাকে বললেন যে ছোটের মতলব হল প্রত্যাশা বাড়িয়ে শেষ মুহুর্তে আমাদের দিয়ে অন্য নাম ঘোষণা করিয়ে ইয়ুথ ক্ষেপিয়ে সব লন্ডভন্ড করা। তারজন্য তিনটে ক্লাবের ছেলেপুলেরা তৈরি হচ্ছে। নুন খেয়েছে যে!
তাই আমদের স্ট্র্যাটেজি হওয়া উচিত ক্যামেলিয়াকে ঘোষিত সময়ে স্টেজে তোলা-- যেমনটি ছোটের লোকজনের শহরের দেওয়াল ভরে দেওয়া পোস্টারে লেখা আছে। আর ওই গান তিনটে অবশ্যই।
ওই যে-- যেমন, Baby, Baby! It's time'.
বা You asked me only once
আর It is no sin honey, we are in love।

কিন্তু আমার ঘুম উপে গেছে।রমেশের কথা শুনলে আমাকে জেসমিন এর ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হতে হবে। আহত বাঘ অনেক বেশি খুংখার। নিজের জন্যে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ও'রকম অনেক rogue আমার দেখা আছে। কিন্তু ক্যামেলিয়া যে সফ্ট টার্গেট।
ও রাজকুমারের কথা মেনে আসতে রাজি হয় নি। রমেশ গুলাবচন্দানির লোভনীয় প্রস্তাবকে পাত্তা দেয় নি। নিজের সেফটি নিয়ে নিজের মত করে ডিসিশন নেওয়ার অধিকার সবার আছে। দিল্লিতে থাকলে ও নিশ্চিন্ত। কিন্তু আমি ওকে রাজি করিয়েছি রায়পুরে ইউথ ইভনিং প্রোগ্রামে প্রাইমা ডোনা হিসেবে আসতে। উস্কে দিয়েছি ওর মধ্যে সুপ্ত অ্যাডভেঞ্চার স্পৃহাকে, সুড়সুড়ি দিয়েছি পঙ্গা নেওয়ার বেহিসাবী উদ্ধত ইগোকে। তারপর?
ওর যদি কিছু হয়ে যায়? অন্ততঃ কোন আওয়ারা ছোঁড়ার মুখে অ্যাসিড বাল্ব ছুঁড়ে দেওয়া? হ্যাঁ, ইডিয়ট ছোকরা বা স্থানীয় কোন মাওয়ালী ধরা পড়বে। থানায় ওর হাড্ডি-পসলি গুঁড়ো করে দেওয়া হবে। দশ বছর জেলে পচবে। কিন্তু রাজকুমারের টিকিটি ছোঁয়া যাবে না, তা জানি।
কিন্তু জেসমিন? ওর জীবন যে শেষ হয়ে যাবে। মলিকা- এ-হুস্ন থেকে বীভৎস চেহারার এক পঙ্গু নারী-- সকলের অবজ্ঞা, ঘৃণা বা করুণা কুড়িয়ে বেঁচে থাকা! ও বাঁচতে পারবে? আর সদাশিবন তুমি নিজে? নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে? তোমার কাছে জেসমিন কি শুধুই একটি কোল্যাটারাল ড্যামেজ হয়ে স্মৃতিতে থেকে যাবে? অথবা তুমি ওকে মন থেকে পুরোপুরি ডিলিট করে দেবে? যেমন এতদিন দিয়েছিলে?
একবার পালিয়ে গিয়ে ওকে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিয়েছিলে, আর এখন সেই নাটক আর একবার? তোমার কি রাইট আছে এসব নিয়ে ছেলেখেলা করবার?
তারচেয়ে রমেশকে বল --এই জেসমিন ফ্যাক্টর তোমার কন্ট্রাক্টের অঙ্গ নয়। এর দায়িত্ব তুমি নিতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়ে মল এর ইনঅগারেশনের সময় যেন কেউ মাংকি রেঞ্চ থ্রো না করে সেটার দায়িত্ব তোমার। কাজেই এই কন্ট্রাক্ট বাতিল করা হোক। বা পরে অন্য অনুষ্ঠানে জেসমিনের প্রোগ্রাম করা হোক।

রমেশ গুলাবচন্দানি এসব যুক্তি মাছি তাড়ানোর মত করে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলেন।
-- আপনি কি ভয় পেলেন? আরে, রাজকুমার নিশ্চিন্ত যে জেসমিন আসছে না। কাজেই ও সমস্ত শক্তি ও এনার্জি খরচ করবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রোগ্রাম ভন্ডুল করতে। আপনার সহযোগিতায় আমরা সেটা ভালভাবে সম্পন্ন করব আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার মত দ্বিতীয় দিন ক্যামেলিয়াকে হাজির করে ওর থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেব। আর ওই প্রোগ্রমের পর মিলেনিয়াম মল হয়ে উঠবে শুধু রায়পুর নয়, গোটা ছত্তিশগড়ের ইয়ুথের প্লেস অফ রাঁদেভূ! একবার ভেবে দেখুন। তারপর গুলাবচন্দানি সাম্রাজ্যের বড়ে শেঠজি নিজের ব্যাটন কার হাতে দেবেন সেটা সহজেই অনুমেয়। এক্ষেত্রে ওটাই হবে ন্যাচারাল জাস্টিস।
সদাশিবন ভাঙলেও মচকাবেন না। উনি আবার এগ্রিমেন্টের কথা তুললেন।
রমেশ গম্ভীর। খানিকক্ষণ কোন কথা বললেন না। টেবিলের কাঁচের নীচে রাখা কিছু নক্শার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে একটা পেপারওয়েট নিয়ে খেলছেন। তারপর পূর্ণ দৃষ্টিতে সদাশিবনের দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় কেটে কেটে বললেন--আপনার কন্ট্রাক্টটি ভালো করে পড়েছেন? সবগুলো ক্লজ? ঘরে গিয়ে আরেকবার দেখে নেবেন। পেজ নাম্বার 7, ক্লজ f। একটি ইনডেম্নিফাইয়িং ক্লজ। তাতে বলা আছে যে গোটা প্রোগ্রামটার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্যে আবশ্যক সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আপনার এবং ওই প্রোগ্রামের খুঁটিনাটি নিয়ে আমার ডিসিশন ফাইনাল ও বাইন্ডিং। আপনার কাজ হল তার জন্যে সিকিউরিটির ছক তৈরি করা , সেটার এক্সিকিউশনের দায়িত্ব পালন করা ; আর সে জন্যে আপনি যা যা হেল্প চাইবেন তা পূর্ণ করা আমার দায়িত্ব এবং এ ব্যাপারে আপনাকে সবরকম লজিস্টিক সাপোর্টের ব্যবস্থা করা আমার জন্যে বাইন্ডিং।
আপনি ঘাবড়াবেন না। শুরুতে তো একটুও ভয় পান নি! আসলে তখন জেসমিন আপনার আমার কাছে একটি ঘুঁটি মাত্র ছিল। যেই আপনার চেনা বেরোল অমনি আপনি আর ইম্পার্সোন্যাল থাকতে পারলেন না। এতে সিকিউরিটির ক্ষতির সম্ভাবনা।
সদাশিবন চমকে উঠলেন।
কিন্তু আরও বাকি ছিল।

(৪)

দিনটা শুক্রবার। সেদিন সকাল থেকেই মিলেনিয়ম মলে আমি ব্যস্ত।
চিন্তায় ফেলেছে থার্ড ফ্লোরের স্লো প্রগ্রেস। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকেই , মানে গণপতি উৎসবের সময় থেকেই ধীরে ধীরে কাজের প্রোগ্রেস ঢিমে চালে চলছে। প্রথমে ব্যাপারটা বোঝা যায় নি। এটা শুরু হয়েছিল আস্তে আস্তে। প্রথমে এক-দুজন ইলেক্ট্রিশিয়ন কমল, তারপর দু-একজন ওয়েল্ডার, তারপর দুজন সুপারভাইজার; শেষে একজন ইঞ্জিনিয়র।
সবাই নাকি ছুটিতে যাচ্ছে। অনেকেরই বাড়িতে বিয়ে,। কারো কারো বাড়িতে নবজাতকের আগমন। প্রথমে কেউ গা করে নি।
কিন্তু লক্ষ্যণীয় - অধিকাংশই দু-চারদিনের নাম করে ছুটি নিয়ে টেলিগ্রাম করে বা ফোন করে ছুটি বাড়িয়েই চলেছে।
রমেশ প্রথমে পাত্তা দেন নি। এমন নাকি শরতের শেষে প্রতিবছরই হয়। এরপর ঠিকেদারের মজুররা ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গেল।
রমেশ অবিচল।
-- এখন আমাদের উত্তরভারতের তেওহার বা পরবের দিন শুরু হয়ে যে! গণেশ চতুর্থী, দশেরা, দীপাবলী--ব্যস্। দেখবেন সব কাজে ফিরছে। আপনি চিন্তা করবেন না। সীমেক কোম্পানির কাছে প্রোজেক্টের পার্ট চার্ট দেখুন। এসব হিসেবের মধ্যে ধরা আছে।
তাই হল।
দীপাবলী গেল, এবার কাজের লোকজন ফিরতে শুরু করেছে।রমেশের মুখে একগাল হাসি। আমি কি সিকিউরিটি নিয়ে একটু প্যারানইয়াক?
কিন্তু আমার মনটা কু-ডাক ডাকছে কেন? গত এক পক্ষ ধরে?
এই কেন'র উত্তর আজ পেয়েছি।
আজ সারাদিন ধরে সমস্ত ঠিকাকর্মীদের জন্যে জারি গেট্পাস আর মাস্টার রোলের রেকর্ড চেক করেছি। না, ওদের সংখ্যাতে কোন ইতরবিশেষ হয় নি। কিন্তু অনেকগুলো স্টাফ বদলে গেছে যে! সবাই নয়। কিন্তু বেশ ক'জন। সাধারণ মজদূর, ইলেক্ট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার ও আরও কয়জন সেমি-স্কিল্ড লেবার। কেন?
এটাই নাকি দস্তুর। কিছু লোকের গাঁয়ে ক্ষেতিবাড়ি আছে। ওরা ধানকাটার পরে ফিরবে।
এইসব নতুন লোকের ঢোকা কতদূর সেফ? এমন একটা হাই-রিস্ক প্রোজেক্টের জন্যে? এগুলো রমেশ এত সহজে নিচ্ছেন কেন?
আর মাত্র দু'মাস বাকি। ক্রিসমাসের আগে সবটা কম্প্লিট করে সার্কিটগুলোর একটা রান করিয়ে দেখতে চাই।
বিকেলের দিকে মনে হল সব প্রশ্নের উত্তর এখানে পাব না। নিজের কামরায় গিয়ে কিছু ফাইল আর নক্শা মিলিয়ে দেখতে হবে। রবিনকে বললাম গাড়ি বের করতে, তাড়াতাড়ি ফিরব। ঘরে পৌঁছে স্নান করে কহি খেয়ে একটু পড়াশোনা করব।
কিন্তু সেই সন্ধ্যেয় আর তাড়াতাড়ি ফেরা হল না। গাড়ি হাইওয়েতে ঢোকার আগে একটা সাদা গাড়ি হর্ন দিতে দিতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আর আমার মোবাইলও প্রায় একই সঙ্গে বেজে উঠেছে।
-- রাজকুমার বলছি। আপনাদের ছোটে! পাশের সাদা গাড়িটায় উঠে বসুন। আপনার ওই ছোকরা ড্রাইভার আমার পেছনে পেছনে চলুক। চিন্তার কিছু নেই। কোন ফাউল প্লে নয়, জরুরী কিছু কথাবার্তা আছে।
আমি রবিনকে আব্শ্যক নির্দেশ দিয়ে ওই রাজহাঁসের মত গাড়িটার কাছে যাই। পেছনের দরজা খুলে যায়। ভেতরে ঢুকে দেখি রাজকুমারের হাসি হাসি মুখ। দুধসাদা সীটে এলিয়ে না পড়ে সোজা হয়ে বসি। না, কোমরের কাছের ব্যারেটা রিভলবারে হাত ছোঁয়ানোর দরকার বোধ করি নি।
গাড়ি ৩৬গড় মলের কাছে এয়ারপোর্ট যাওয়ার ভিআইপি রোড দিয়ে ছুটে চলে। চোখে পড়ে একের পর এক বিভিন্ন বিজনেস হাউসের বোর্ড লাগানো কিছু রিসর্ট। কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশাল আশ্রমিক মঠ । ভারত সেবাশ্রমের প্রণবানন্দ অ্যাকাডেমি ও আশারাম বাপুর আশ্রম। স্বামীজি জেলে থাকায় কেমন হতশ্রী ভাব।
এবার গাড়ি ঢুকছে রাজকুমার গুলাবচন্দানির নিজস্ব বাগানবাড়ি কাম অফিসে। সারা রাস্তা উনি গন্তব্যস্থল জানিয়ে দেওয়া ছাড়া একটাও কথা বলেন নি। কিছু ভাবছেন।কিন্তু মুখের বিদ্রূপাত্মক স্টেনসিল হাসিটি টোল খায় নি।
পোর্টিকোতে গাড়ি দাঁড়াতেই জনা তিন কর্মচারী এগিয়ে এল। উনি তাদের ঠেট ছত্তিশগড়ি ভাষায় কিছু নির্দেশ দিয়ে মাছি তাড়ানোর মত করে হাত নাড়লেন।
আমরা ওঁর ইশারায় অফিসের পাশে একটি অ্যান্টি রুমে আরাম করে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলাম।
জানিয়ে দিলাম শুধু এককাপ কড়া কফি ছাড়া কিছু খাব না।
উনি মাথা নেড়ে হেসে সায় দিলেন। আর পাশের ড্রয়ার থেকে দুটো ফোল্ডার বের করে কফিটেবলের ওপর রাখলেন।

-- প্রফেশনাল লোকজনের সঙ্গে ডীল করতে আমার খুব ভাল লাগে, বিশেষ করে আপনাদের মত মানুষ হলে।
আমি তাকিয়ে রয়েছি দেখে বললেন-- কোন ন্যাকামি নেই। ডিসিশন নিতে দ্বিধা নেই। নিজের লক্ষ্যে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাওয়া। আরে আমরা আসলে একই নক্ষত্রে জন্মেছি, আমি আর আপনি। বড়ে ভাইয়ার কথা আলাদা। ওর বোধহয় কন্যারাশি, ভাবীজির কথায় চলে! বাবুজিও জেনে গেছেন যে গুলাবচন্দানি এম্পায়ার কেমন লোকের হাতে পড়লে ফেঁপে ফুলে উঠবে।
-- আপনার সমস্যাটা কী? নিশ্চয় আপনি আমাকে নিজের বড়ভাইয়ের চরিত্রগাথা শোনাতে এখানে তুলে আনেন নি?
মুচকি হেসে রাজকুমার একটু গলা তুলে বললেন-- আই প্রটেস্ট! 'তুলে আনা' কথাটা এখানে বেমানান। আপনাকে কোন কিডন্যাপ করা হয় নি। সে সাহস আমার নেই। আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে নিজেই গাড়ি থেকে নেমে আমার গাড়িতে উঠে বসেছিলেন।
--তাই?
-- উঃ! কারণ আপনার অদম্য কৌতূহল। আপনি আমার ডেরায় এসে আমাকে জরিপ করে দেখার পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা সুযোগটি হাতছাড়া করতে চান নি।
--- আমার লাভ?
-- সব কথা আমার মুখ দিয়েই বলাবেন? বেশ। স্ট্র্যাটেজি মশাই স্ট্র্যাটেজি! আপনাকে বড়ে ভাইয়া এনেছে আমার সম্ভাব্য চোরাগোপ্তা আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলতে। আপনি অভিজ্ঞ। সেপহটি-সিকিউরিটির সমস্ত খুঁটিনাটি সব ব্যবস্থা আপনি তন্নতন্ন করে স্ক্যান করেছেন। তবু আপনার মনটা খুঁত খুঁত করছে। কারণ আমার চালটা আপনি জানেন না।
-- আপনার সঙ্গে কফি খেয়েই সব জেনে যা্বো?
-- আপনার মত বুদ্ধিমানও যদি ওইসব ঘিসিপিটি inane কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট করে--! আরে, আপনি আমার ডেরা দেখলে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বললে আমার কিছুটা আন্দাজ তো পাবেন।
-- কফিটা ভাল।মনে হচ্ছে কেরালার কোন গার্ডেনের থেকে আনা সীড।
-- থ্যাংকস্! এবার কাজের কথা।
প্রথম, আমার সম্বন্ধে যা যা উল্টোপাল্টা কথাবার্তা শুনেছেন তা ভুলে যান।
--যেমন?
-- এই যেমন আমি মিলেনিয়ম মলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ভেস্তে দেওয়ার তালে আছি।
-- আপনি নেই কি?
রাজকুমারের চোখ জ্বলে ওঠে।
-- ব্র্যাভো! আমার ঘরে বসে আমাকে প্রকারান্তরে মিথ্যেবাদী বললেন! আপনার সাহস আছে মানতে হবে।
-- না, আমি শুধু একটা পার্টিনেন্ট কোশ্চেন করেছি। অ্যান্সারটা এখনও পেলাম না।
--- শুনুন, ভাইয়া আপনাকে বলেছে যে আমি ওই প্রোগ্রাম বানচাল করে বাবুজির সামনে ভাইয়াকে অপদস্থ করে ওঁর গদিতে বসতে চাই। ভুল। একেবারে গোড়ায় গলদ। ভাইয়ার সঙ্গে আমার যাই থাক, আমি গুলাবচন্দানি সাম্রাজ্যের গায়ে দাগ লাগতে দেব না। আমিও তো গুলাবচন্দানি। নিজেদের ব্র্যান্ডনেমে দাগ লাগিয়ে গুড উইল লস করে ভাঙা সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে আমার লাভ? আমি স্বভাবে ঔরংজেব নই। এসব মাথায় ঢোকাচ্ছে ওই বড়েভাবী। এসেছে এক বানিয়া পরিবার থেকে। ইন্ডাস্ট্রির কিচ্ছু বোঝে না। ও কী বুঝবে আমাদের ফিলিং? sense of belonging? কিন্তু ভাইয়াকে ওই চালাচ্ছে।
-- বেশ, এবার কী বলবেন? যেহেতু স্যাবোটাজের কোন আশংকা নেই, অতএব আমার উচিত ইস্তফা দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাওয়া? আর আমার যা ফিনানশিয়াল লস হবে সেটা আপনি পুষিয়ে দেবেন, এই তো? তা আমার দাম কত ধার্য করেছেন?
ঠহাকা মেরে হাসতে থাকেন রাজকুমার। হাসির শব্দে কেঁপে ওঠে দেওয়াল। হাতের ধাক্কায় কফি টেবলের ওপর জলের গ্লাস থেকে জল ছলকে পড়ে। তক্ষুণি প্রায়ান্ধকার এক কোণা থেকে একজন বেড়াল পায়ে এসে টেবিলটি মুছে দিয়ে গ্লাসটি সরিয়ে নেয়।

---- দাঁড়ান, দাঁড়ান! নট সো ফাস্ট! সব বলছি, একটু সামলে নিই?

 

(৫)

 

সেদিন একঘন্টার মধ্যেই ফিরে এসেছিলাম।

রাজকুমার বললেন -- তাহলে আপনার দিল্লি সফর সফল হল না?
আমি নিরুত্তর।
তখন উনি একটি ফোল্ডার খুললেন। তাতে অনেকগুলো ফোটো। আমার এবং জেসমিনের। দিল্লির হোটেলের পোর্টিকোতে গাড়ি থেকে আমি নামছি। দুজনে ড্রিংক্স নিয়ে কথাবার্তায় মশগুল রয়েছি। একটিতে জেসমিনের আঙুল উঁচিয়ে আমাকে শাসানোর ছবি। আরেকটিতে জেসমিন ওয়াশ রুম থেকে ফিরে আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে, এইসব।
--- দেখছেন তো,

-- শুনুন। আপনি জেসমিনকে ভাইয়ার কথায় রাজি করাতে গেছলেন। পারেন নি। জেসমিন প্রফেশনাল। ফালতু গুলাবচন্দানিদের বাওয়ালে নাক গলিয়ে বকরী হবে কেন?
-- তাহলে আপনার চিন্তা কিসের? কথাটা শেষ করুন, আমি ফিরে যাই।
-- আরে তাড়া কিসের? আভি ভী রাত জওয়ান হ্যায়! আমি চাইছি আপনি এবার আমার কথাটা শুনে ভাইয়াকে রাজি করান।
-- মাপ করবেন, আমি রমেশ গুলাবচন্দানির সিকিউরিটি কনসালট্যান্ট, কোন বিজনেস টাউট নই।
-- এত তাড়াতাড়ি রেগে গেলে চলে? আমি তো একটা সন্ধি প্রস্তাব দিচ্ছি। সিজফায়ার। শর্তগুলো শুনে নিলে আপনারই লাভ।
উনি হাতের ইশারায় আরেক কাপ কফি দিতে বললেন।
-- আপনারটা?
--- আমি এ'সময় অন্য কিছু খাই। আপ তো সাথ দেনে সে ইনকার কিয়ে। কোঈ বাত নহীঁ। যদি আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান তো সেলিব্রেট করবো। সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি!
-- শুনি।
-- দেখুন, রমেশভাইয়ার ভয় আমি মুখ্যমন্ত্রী এসে মল উদ্ঘাটনের সময় কিছু খুরাপাত, কিছু হরকৎ করব। ওঁর আশংকা খুব অমূলক নয়। কিন্তু ভাবীজি গিয়ে ভারি দরবার করেছেন পিতাজির কাছে। ওল্ডম্যান আমাকে ডেকে দাবড়ানি দিয়েছে। এখন যদি আপনার বা কোন মিস্ত্রীর দোষেও সেদিন কোন ঘটনা ঘটে তো আমি সাজা পাবো। একেবারে নির্বাসন!
বলার ভঙ্গিতে আমি হেসে উঠি। রাজকুমারও মুচকি হেসে কাঁধ ঝাঁকান।
-- শুনিয়ে, ইয়ে হঁসনে কী বাত নহীঁ হ্যায়। ভাবীজি মোক্ষম চাল দিয়েছেন। আসলে ক্ষমতার শতরঞ্জ খেলায় প্রতিপক্ষ হলেম আমরা দুজন। ভাইয়া তো ডামি।
এবার আমার পালা। আমি বলছি কোন হরকৎ কোন শরারৎ করব না। তবে আমিই লুজার কেন হব? আমারও শর্ত আছে। জেসমিন।
প্রথম দিন ভাইয়া-ভাবীর। মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ফিতে কাটা , বেলুন ওড়ানো , লেজার শো -- যা যা ওঁরা চান, সব নির্বিঘ্নে হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় দিন কিন্তু আমার হওয়া চাই। ইয়ুথ নাইট না কি--সেটা আমার মুতাবিক হবে। কোন দিল্লি থেকে আসা পপ সিঙ্গার নয়, আমি করাবো ছত্তিশগড়ি ফোক সং অ্যান্ড ফোক ড্যান্স।
আসবেন চন্দ্রাকর সিস্টার্স, চন্দেনী গোন্দা, আরও সব--বাঁশগীত, ভরথহরি, পান্ডবানি। আর নামকরা যুবদলের পংথী, সুয়া ইত্যাদি নাচ। একদম শেষে বস্তার ব্যান্ড।
-- আমার থেকে কি চান?
-- এই প্রোপোজাল আপনি ভাইয়াকে দিন। প্রথম নাইট ওঁর, দ্বিতীয় আমার। বদলে পাবেন আমার ফুল কোঅপারেশন।
--- উনি রাজি না হলে?
-- আপনার কোন দায়িত্ব নেই। আপনি চেষ্টা করুন মিস জেসমিনের প্রোগ্রাম ইউথ নাইটে করাতে। কিন্তু ঝামেলা বাড়বে। আপনি জেসমিনকে কন্ট্রাক্ট সাইন করালেও ও ঠিক সময়ে রায়পুরে পৌন্চবে না-- সেটা আমার গ্যারান্টি। না, না; যা ভাবছেন তা নয়।মুখে অ্যাসিড ছোঁড়া জাতীয় কাঁচা কাজ নয়। ওঁর কোন ক্ষতি হবে না। শুধু উনি সময়মত রায়পুরে পৌঁছতে পারবেন না।
-
--আপনি এতটাই নিশ্চিত?
-- ও হো! আপনার অহংকারে লেগেছে! অন এ সিরিয়াস নোট, আমি আপনাকে বুঝি। আপনি কী কী স্টেপ নিতে পারেন তার অংক কষে রেখে তবে খেলতে নেমেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না?
ধরুন, আপনি চিফ মিনিস্টারের প্রোগ্রামের দিনেই জেসমিনকে দিল্লি থেকে আনিয়ে কড়া সিকিউরিটি চেক এ রাখবেন। সেদিন আমার সীমিত শক্তি মূল প্রোগ্রামে মাংকি রেঞ্চ থ্রো করতে ব্যস্ত থাকবে। পরের দিন আপনি ওর জন্যে ভিআইপি সুরক্ষার বন্দোবস্ত করবেন। এটা প্ল্যান A।
আর প্ল্যান B হল প্রোগ্রামের তিনঘন্টা আগে চার্টার্ড প্লেনে করে ওকে দিল্লি থেকে নিয়ে আসা। প্রোগ্রামের পরই সেই প্লেনে ওকে দিল্লি পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু আমার কাউন্টার স্ট্র্যাটেজি আপনার অজানা।
তার চেয়ে আমার ট্রুসের প্রোপাজাল নিয়ে ভাইয়ার কাছে যান। ওতে সবারই মঙ্গল।
আমি উঠে দাঁড়াই।
-- কেন ইতস্ততঃ করছেন ইয়ে হীলা-হবালা কা কোঈ জরুরত নহীঁ। আপনি কি ভাবছেন আপনার আমার সঙ্গে এই বৈঠকের ব্যাপারে ভাইয়া কিছু জানে না? আমার এই গেস্ট হাউসে পা রাখতেই আপনার ওই কিম্ভূত রবিন না কি যেন, ভাইয়াকে ফোনে সব জানিয়ে দিয়েছে। জেনে রাখুন, ও হল বড়ে ভাইয়ার জাসুস। মিনিটে মিনিটে খবর দেয়।
এই ফোল্ডারটি রাখুন। আপনি জেন্টলম্যান , এটা খুলবেন না। সোজা ভাইয়ার হাতে দেবেন।
-- এতে কী আছে?
-- এতে আছে ফিউচার প্ল্যান। উনি আমার সন্ধিপ্রস্তাবে রাজি হলে দুপক্ষেরই কী কী লাভ হতে পারে সেগুলোর রোডম্যাপ ছকে দেওয়া।
আর আপনি এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে যান। শ্রীমান রমেশ গুলাবচন্দানী উর্ফ বড়ে ভাইয়া এতক্ষণে ছটফট করছেন আপনার মুখ থেকে সব শুনতে। আপনি যা যা কথা হল সবই বলবেন। কিচ্ছু লুকোনোর দরকার নেই। গুড নাইট।

পরের অংশ

 রঞ্জন রায়