রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড

 

 

 

 

 


 

প্রেমের প্রান্তে পরাশর

নয়

"রহস্যটা জানতে চন?" বেশ একটু গম্ভীর মুখে বললে পরাশর, "তাহলে শুনুন। এসবকিছু জানতে পেরেছি জ্যোতিষের গণনায়।"
"জ্যোতিষের গণনায়!" বিস্ময় আমিও প্রকাশ না করে পারলাম না।
"হ্যাঁ, জ্যোতিষের গণনায় । এই দেখুন না জ্যোতিষের আর একটা গণনার কথা আপনাদের শোনাচ্ছি।" পরাশর আমার কাছ থেকে গালা দেওয়া খামটা চেয়ে নিয়ে ছিঁড়ে ভেতরকার কাগজটা পড়তে পড়তে বললে, "আপনাদের হোটেলের দোতলার সবচেয়ে ভালো স্যুইটটা আজ খালি হবার কথা আছে। কিন্তু তা হবে না। মিঃ র্যা থবোন আর তাঁর স্ত্রী আরো পাঁচদিনের জন্যে স্যুইটটা বুক করবেন অর তার মধ্যে ওঁদের একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা। সেইটেই ঠেকাবার জন্যে আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।"
"আপনি জ্যোতিষের গণনার জোরে এসব ভবিষ্যদ্বাণী করছেন!" বারোহা বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টি নিয়েই জিজ্ঞাসা করলে। "র্যা থবোন দম্পতির মধ্যে দুর্ঘটনাটা কার হবে আর কি ধরণের তা আপনার জ্যোতিষের গণনায় কিছু পাচ্ছেন?"
"গণনা ত আমার নয়!" পরাশর তার হাতের কাগজতা দেখতে দেখতে বললে - "আমি একজন অসামান্য জ্যোতিষীর কাছ থেকে এসব 'টিপস' মানে হদিস পাই। তাঁর এ কাগজ থেকে যা পাচ্ছি তাতে দুর্ঘটনা মিস্টার বা মিসেস র্যা থবোন যে কোনো জনেরই হতে পারে। দুজনেরই একসঙ্গে হওয়া অসম্ভব নয়। আর দুর্ঘটনাটা আপনাদের যা হয়েছে তারই একটু বড় সংস্করণ।"
"তার মানে?" বারোহা আর ম্যানেজার দুজনেই প্রায় একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন। "এ হোটেলে আবার এইরকম বিষক্রিয়া গোছের ব্যাপার দেখা যাবে আর তা হবে আরো গুরুতর।"
একটু থেমে বারোহা একটু তীক্ষ্ণস্বরেই পরাশরকে প্রশ্ন করলে, "এবারে আমাদের যা হয়েছে তা কোনো বিষ থেকেই হয়েছে বলে আপনি মনে করেন! কিন্তু বিষ আসবে কোথা থেকে? মিঃ সেঙ্গার সমস্ত খাদ্য আর পানীয়ই চেক করে গ্যারাণ্টি দিচ্ছেন। তাতে কোন বিষ থাকতেই পারে না।"
"তাতে না থাক।" পরাশর গম্ভীর হয়েই জানালে, "আপনারা যা খেয়েছেন পান করেছেন তার মধ্যেই বিষ ছিল।"
"কেমন করে থাকবে।" বারোহা বেশ একটু ঝাঁঝের সঙ্গেই বললে, "আমাদের খাবার আর ড্রিংক বিষ দেবে কে, আর কি উদ্দেশ্যে।"
"তাই এখন খুঁজে বার করতে হবে!" বললে পরাশর।
"আপনি আমাদের হোটেলের রেস্তোরাঁর ওয়েটার বা বারবয়দের সন্দেহ করছেন কি?" মিঃ সেঙ্গার বেশ তীক্ষ্ণ স্বরেই জিজ্ঞাসা করলেন।
"না, তা করছি না।" শান্তভাবে জানালে পরাশর।
"তাহলে!" উত্তেজনায় বিছানা থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ পেটে যেন একটা ব্যাথা বোধ করে বারোহা মুখটা একটু বিকৃত করে আবার বিছানায় বসে পড়ল।
"আপনি মিছিমিছি অত উত্তেজিত হবেন না মিঃ বারোহা।" পরাশর কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্ত করতে চাইলে।

ফল কিন্তু উল্টো হল। বারোহা সাময়িক ব্যাথাটা ঝেড়ে ফেলে আবার সোজা হয়ে বসে বললে, "আমার এ উত্তেজনা মিছিমিছি বলছেন! আপনি যা বলছেন তার মানেটা নিজেই তলিয়ে বুঝেছেন। আপনার মতে আমাদের খাবার বা পানীয়ে বিষ অতি অবশ্য কিছু ছিল। সে বিষের জন্যে এ হোটেলের ব্যবস্থা বা লোকজন দায়ী নয়। তার অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে নাকি যে আমাদের খাবারে বা ড্রিংকে আমাদের পার্টির কেউই বিষ মিশিয়েছে? কিন্তু পার্টির চারজনই আমরা যে অসুস্থ সেটা হিসেবে ধরেছেন?"
"মিস এলসার অসুস্থ হওয়ার খবর অবশ্য আমি এখনো পাইনি।" জানালে মিঃ সেঙ্গার।
"খবর না পেলেই তিনি সুস্থ মনে করার কোনো কারণ নেই।"
ম্যানেজারের মন্তব্যটা সংশোধন করলে বারোহা, "মিস এলসার কোনো খবর না পাওয়া ত আরো ভাবনার ব্যাপার বলে আমার মনে হচ্ছে। তিনি হয়ত আমাদের চেয়ে বেশী অসুস্থ বলে কোনো খবর দিতেও পারেন নি?"
"না, তিনি অসুস্থ নন।" বাধ্য হয়েই প্রতিবাদ জানালাম।
"অসুস্থ নয়। আপনি কি করে জানলেন।" একটু সন্দিগ্ধ ভাবেই জিজ্ঞাসা করলে বারোহা।
"জানলাম, আমি তাঁকে সুস্থ শরীরে ওপরের ল্যাণ্ডিং-এ নিচে নামবার লিফটের জন্যে অপেক্ষা করতে দেখেছি বলে।"
"সেই অত সকালে আপনি নিজের কামরায় যাবার সময় তাঁকে ল্যাণ্ডিং-এ দেখেছেন!" মিঃ সেঙ্গার সবিস্ময়ে বললেন, "কিন্তু মিস এলসা ত সে লিফটে নিচে নামেন নি। আমি আর মিঃ বর্মা ঐ লিফটে ওপরে আসব বলেই অপেক্ষা করছিলাম। লিফট ত কোথাও না থেমে সোজা নিচে নেমে এসেছে।"
তাহেল তিনি বোধহয় কিছু ভেবে তাঁর কামরাতেই আবার ফিরে গেছেন! বারোহা বললে, "তার কারমায় একবার ফোন করে দেখলে ত পারেন।"
"হ্যাঁ, তাই করুন।" বললে পরাশর, "নম্বর ত চারশ' পঁচিশ।"

চারশ' পঁচিশ শুনে মনে মনে একটু চমকালাম। পঁচিশ মানে একেবারে আমার পাশের কামরা। আমাকে ঠিক ছাব্বিশ নম্বরেই ঘর দেবার মধ্যে সেদিক দিয়ে কোনো অর্থ আছে নাকি?
মিঃ সেঙ্গার তখন এলসার ঘরে ডায়াল করে কোনো সাড়াই কিন্তু পাচ্ছেন না। ফোনটা ধরে রেখেই তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, "এ তো শুধু রিং-ই হয়ে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না।"
"তাহলে মিঃ ভদ্র আর কাউকে দেখে এলসা মনে করে ভুল করেননি ত?" সন্দেহ প্রকাশ করলে বারোহা।
"না, সে-ভুল হওয়াও সম্ভব নয়," বললেন ম্যানেজার, "ফ্লোরে এলসার বয়স বা চেহারার কোনো মেয়েই নেই।"

লিফটের জন্যে ল্যাণ্ডিং-এ দাঁড়িয়ে থাকলেও কোন কারণে হয়ত তখন না গিয়ে এলসা পরে নেমে গেছে মনে করে নিচের রিসেপশন কাউণ্টারে খোঁজ নেওয়া হল এর পর। না, মিস এলসা নিচে নামেই নি বলে সেখান থেকে জানা গেল।
"তাহলে তার কামরাতেই খোঁজ করতে যেতে হয়।" উদ্বিগ্ন হয়ে বললে বারোহা।
"তা যাওয়া যাবেখন, পরে।" বললে পরাশর, "আপাততঃ উপরের তলায় একবার ফোন করে দেখুন ত মিঃ সেঙ্গার।"
"ওপরের তলায় ফোন করে দেখব," ম্যানেজার বেশ অবাক, "সে কি!"
"নিচে না নেমে থাকলে ওপরে গেছে ভাবাই স্বাভাবিক নয় কি!" পরাশরের গলায় একটু যেন প্রচ্ছ্ন্ন কৌতুক।
"কিন্তু ওপরতলায় ফোন করা হবে কাকে।" জিজ্ঞাসা করলে বারোহা।
"র‍্যাথবোনদেরই ফোন করে দেখুন।" নির্দেশ দিলে পরাশর।
"র‍্যাথবোনদের?" বারোহার গলায় তার অবিশ্বাসের সুরটা অস্পষ্ট রইল না। কিন্তু র‍্যাথবোনদের কামরাতেই এলসার খবর পাওয়া গেল। সে কিচ্ছুক্ষণ আগে ও-কামরাতেই গেছে। এই মিনিট দুযেক হল নিজের কামরয় নেমে গেছে।
"মিস এলসার হঠাৎ র‍্যাথবোনদের ঘরে যাবার মানে।" ভুরু কুঁচকে নিজের বিমূঢ়তাটা বুঝিয়ে বারোহা এবার সোজাসুজি পরাশরকেই চেপে ধরতে চাইল, "কিন্তু আপনি সবকিছু জড়িয়ে যে রকম একটা শয়তানী ষড়যন্ত্র কল্পনা করছেন, এই সবেমাত্র দিল্লীর ঐ শোভরাজের দল ধরা পড়ার পর নেহাৎ গবেট ছাড়া কারুর পক্ষে সেরকম কিছু করা কি সম্ভব? খবরের কাগজে কাগজে এখনো ত সে দলের নানা খবর বার হচ্ছে। কি করে তারা ট্যুরিস্ট সেজে নিরীহ সরল অন্য ট্যুরিস্টদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাদের বিষ দিয়ে অজ্ঞান কে যথাসর্বস্ব লুট করত সে বিবরণ ত এখন কারুর অজানা নয়। সদ্য সদ্য ঐ ঘটনার পর ঐ এক প্যাঁচ দিয়ে বাজিমাৎ করার কথা কোনো আহাম্মকও নিশ্চয় ভাববে না।"
"আহাম্মকেরা পারবে না বলেই অতি বুদ্ধিমানেরা ভাববে।" পরাশর তার নিজস্ব ব্য্খ্যা শোনালে, "সাধারণের পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত বলেই এই সময়টা তারা বেছে নেবে একই প্যাঁচ খাটাবার জন্যে।"
"না। আমায় মাপ করবেন মিঃ বর্মা," নিজের মাথাটা ঝাঁকি দিয়ে বললে বারোহা। "আমার মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।"
"বোঝবার চেষ্টা এখন তাহলে করবেন না।" পরাশর উপদেশের সুরেই বললে, "আপনি শুধু একটু সাবধানে থাকবেন।"
"আমি সাবধানে থাকব।" পরাশরের কথায় বারোহা আমাদের মতই হতভম্ব, "আমারও এখনো ভয়ের কিছু আছে নাকি? কাল রাত্রের ব্যাপারেও তা কেটে যায় নি?"
"না, মিঃ বারোহা!" বেশ গম্ভীর হয়েই জানালে পরাশর, "আপনার আসল বিপদ এইবারেই আসছে। আর র্যা থবোনদের চেয়েও তা অনেক গুরুতর।"
"বলেন কি?" বারোহার মুখ দেখে মনে হল পরাশরের কথাটা ঠাট্টা না সত্যি সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। হেসে উঠবে না ভয় পাবে ঠিক করতে পারছে না তাই।

বারোহার এ প্রতিক্রিয়াটা পরাশর লক্ষ্য করল কিনা বুঝতে পারলাম না। ম্যানেজারের দিকে ফিরে সে তখন তাঁকে আরেকবার এলসার ঘরে ফোন করতে বলছে।
"আবার মিস এলসার ঘরে!" ম্যানেজার একটু আপত্তি জানাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু পরাশর সে আপত্তি খণ্ডন করে বললে, "এতক্ষনে মিস এলসা নিজের ঘরেই ফিরেছেন বলে মনে হচ্ছে। ওঁকে ফোন করে শুধু বলুন যে বিশেষ একটা জরুরী প্রয়োজেনে আপনি দুজন সঙ্গীকে নিয়ে ওঁর সঙ্গে একটু দেখা করতে চান।"
"দেখা করতে যদি না চান?" রিসিভারটা তুলে ধরেও ডায়াল করবার আগে ম্যানেজার তাঁর সন্দেহটা জানালেন।
"আপত্তি করলে ভিন্ন ব্যবস্থা করতে হবে। তবে আপত্তি করবে না বলেই আমার বিশ্বাস।" আশ্বাস দিলে পরাশর।

পরাশরের আশ্বাস মতই এলসাকে ফোন করলেন ম্যানেজার। হঠাৎ তাঁর মুখে হিন্দী শুনে প্রথমটা অবাক হবার পরই মনে পড়ল এলসা ইংরেজী জানে না। ফোনে ম্যানেজারের কথা থেকে বোঝা গেল পরাশরের অনুমানই ঠিক। এলসা দেখা করতে আপত্তি জানাল না, একনকি দেখা করার উদ্দেশ্য বা ম্যানেজারের সঙ্গীদেরও নামও জানতে চাইল না।
এলসার কামরাতেই এবার গেলাম, যাবার আগে কামরা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বারোহা শুধু একটু ক্ষুণ্ণ স্বরে জানালে, "আপনাদের সঙ্গে আমিও যদি থাকতে পারতাম।"
"তার জন্যে দুঃখ করবেন না।" তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গেল পরাশর। "যা যা কথা ওখানে হবে সব আপনি আমার বা মিঃ ভদ্রের মুখে জানতে পারবেন। অচ্ছা শেষবার বলে যচ্ছি সাবধানে থাকবেন!"

দশ

এবারে লিফট দিয়েই উঠে এলসার ঘরে পৌঁছোবার পর তার দরজায় বেল টিপতে হল না। দরজা খুলে এলসা নিজেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
ম্যানেজারের সঙ্গে আমাদের দেখে মুখে তার কোনো ভাবান্তর কিন্তু দেখা গেল না। ম্যানেজার দরজা থেকেই আমাদের পরিচয় দেওয়া শুরু করেছিল। এলসার কামরায় গিয়ে বসবার পর ম্যানেজার হঠাৎ হিন্দী ছেড়ে ফরাসী ধরায় প্রথমটা বেশ চমকেই গেলাম। তারপর ম্যানেজারের এ ভাষা বদলের মানেটা অস্পষ্ট রইল না।

ফরাসী আমি জানি না। তবে বলতে বা লিখতে না পারলেও দু'চারটে কথা একটু আধটু জানা আছে। ম্যানেজারের ফরাসীতে দখল আমার চেয়ে খুব বেশী নয়। তিনি কোনোরকমে ভুল ভাল শব্দ যা বোঝাবার চেষ্টা করলেন সেটা হল এই যে আমরা কোথা থেকে উড়ে আসা এক গা-জ্বালানো উপদ্রব। হোটেলের একটা সামান্য গোলমালের কথা কেমন করে জেনে ফেলে এখন জুলুম করে মাতব্বরি করছি। হোটেলের সুনামের খাতিরে আমাদের অত্যাচার তাঁকে সহ্য করতে হচ্ছে। সেই জন্যেই বাধ্য হয়ে আমাদের আবদার শুনে এ সময়ে এঘরে আমাদের আসতে হয়েছে। মিস এলসা এ ত্রুটি যেন ক্ষমা করেন।

এলসা যেরকম নির্বিকার মুখ করে আমাদের দিকে একবারও না তাকিয়ে এসব কথা শুনে গেল ও তারপর একটু হাসি মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার উদ্দেশ্যে জানতে চাইল তাতে তার অভিনয় ক্ষমতারও তারিফ না করে পারলাম না।
এলসার হাসিমুখের প্রশ্নের উত্তরে পরাশর বেশ একটু নীরস গলায় যা বলল তাতে কিন্তু আমি রীতিমত স্তম্ভিত।
কোনোরকম ভণিতা না করে সে বললে, "হিন্দী, ফরাসী হয়েছে এবার সাধু বাংলায় আমাদের উদ্দেশ্যটা শুনুন। উদ্দেশ্যটা, আপনাকে এখনি এ হোটেল শুধু নয় এ দেশই ছেড়ে যেতে অনুরোধ করা।"

একথাতেও এলসার মুখের হাসি একটু মুছেও গেল না। আগের মতই প্রসন্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলে, "এ অনুরোধের কারণ নিশ্চয় আছে?"
"তা আছে বইকি।" পরাশর গম্ভীর হয়েই বললে, "সেগুলো কি আপনি শুনতে চান?"
"হ্যাঁ, শুনলে নিজের সম্বন্ধে একটু জ্ঞান লাভ হতে পারে।"
"তাহলে এক এক করে শুনুন," - পরাশর যেন আঙ্গুল গুনে বলতে আরম্ভ করলে, "আপনি ভারতীয় পুরাতত্ত্বের ছাত্রী নন, এলসা আপনার নাম নয়, আর্জেণ্টিনা থেকে আপনি আসেন নি।"
"দাঁড়ান, দাঁড়ান!" এলসা কথার মধ্যেই বাধা দিয়ে বললে, "আপনাদের পরিচয়ের ফিরিস্তি বেশ লম্বা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এসব কথা শোনাবার অধিকার আপনার কি যদি জিজ্ঞাসা করি?"
"তাহলে আপনাকে সোজা আমাদের সঙ্গে এখানকার হেড কোয়ার্টার্সে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করব।" পরাশর একটু কড়া গলাতেই বললে, "সেটা চাই না বলেই আপনাকে নিজর মান নিয়ে আগে থাকতে সরে পড়বার সুযোগ দিচ্ছি।"
"অনেক ধন্যবাদ!" এলসা হেসেই বললে, "তবে আমার প্রতি এই বিশেষ অনুগ্রহ কেন, সেটাও ত জানতে ইচ্ছে করে!"
"ধরুন, ধরুন..." পরাশরকে এবার জবাব দিতে থতমত খেতে দেখে উত্তরটা আমারই দিয়ে দিতে ইচ্ছে হল। ইচ্ছে হল বলি, "অনুগ্রহের কারণ অসময়ে অপাত্রে একটু দুর্বলতা, এটা বুঝতে পারছেন না?"

আমার কিছু বলা হল না, পরাশরেরও তাই তোৎলামি সারলো না। তার আগে ম্যানেজার মিঃ সেঙ্গারই স্পষ্ট বিরক্তির সঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠলেন। কথা বাঙ্গলা বোঝা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হলেও, কিছু কিছু শব্দ আর পরাশরের কথা বলার ভঙ্গি মানে তাঁর কাছে খুব অস্পষ্ট থাকে নি। পরাশর বিরূপ হতে পারে জেনেও, তাতে তিনি নিজের অধৈর্যটা গোপন করবার চেষ্টা না করে বললেন, "সকাল থেকে হোটেলের কাজ-কর্ম কিছুই আমার দেখা হয় নি। আপনাদের যা বলবার যদি শেষ হয়ে থাকে তাহলে মিস এলসাকে আর বিরক্ত না করে আমরা যেতে পারি।"
"না, না আপনি নারাজ হবেন না মিঃ সেঙ্গার!" পরাশর কিছু বলার আগে এলসাই আমাদের অবাক করে জানালে, "এঁরা আমার বন্ধু লোক। আপনার কাজ থাকলে মিছিমিছি আর আপনাকে আটকে রাখব না।"
"এঁরা বন্ধুলোক!" উচ্চারিত ভাষায় না হলেও মুখের ভাবে এই বিমূঢ় বিস্ময়টুকু পুরোপুরি ফুটিযে ম্যানেজার হতভম্বের মত চলে যাবার পর, পরাশরই প্রথমে মুখ খুলল। তার গলার স্বর কিন্তু আগের মতই রুক্ষ। জিজ্ঞাসা করলে, "আমরা যখন বন্ধুলোক তখন কালকের পার্টির রহস্যটা এবার একটু ভাঙবেন?"
"পার্টির রহস্য! পার্টির আবার রহস্য কি অছে? চারজনের একটু খেয়াল হয়েছিল তাই একসঙ্গে খেয়ে দেয়ে একটু আনন্দ করেছি।"
"আনন্দ করেছেন? আনন্দের পরিণাম কি হয়েছে তা কিছু জানেন? জানেন যে আপনি ছাড়া অপর তিনজন রাত্রে বেশ অসুস্থ আর অল্প বিস্তর বেহুঁশ হয়ে গিযেছিল।"
"তাই নাকি!" এলসা যেন অবাক, "আশ্চর্য! কই আমার ত কিছু হয় নি।"
"এই কিছু না হওয়াতা আশ্চর্য শুধু নয়, আরও কিছু।"
"আরো কিছু!" এলসা ভুরু কোঁচকালে, "আরো কি?"
"রীতিমত সন্দেহজনক।"
এলসা এ কথায় কি বলতে যাচ্ছিল পরাশর তাকে হাত তুলে থাম্যে বললে, "শুনুন মিস এলসা। মিছে কথা কাটাকাটি করে কোনো লাভ আর নেই। আপনার সম্বন্ধে যা কিছু জানবার আমাদের জানা হয়ে গেছে। অভিযোগের ফিরিস্তি আপনার বিরুদ্ধে সত্যিই অত্যন্ত লম্বা, সেগুলি মুখে বলার সময় না নিয়ে কাগজে এই লিখে এনেছি।"
পকেট থেকে সত্যিই একটা লম্বা খাম বার করে এলসার হাতে দিয়ে পরাশর বললে, "ধীরে সুস্থে এতা পড়বার সুযোগ খানিক বাদেই আপনাকে দেবো। তার আগে আপনার কামরাটা একটু সার্চ করতে চাই।"
"সার্চ করবেন আমার ঘর!" এলসা যেন অবাক, "সার্চ করবার তল্লাসী পরোয়ানা এনেছেন?"
"আপনার মত মেয়ের ঘর তল্লাস করবার জন্যে সার্চ ওয়ারেণ্ট লাগে না।" পরাশর তাচ্ছিল্যভরে বললে, "তাছাড়া আমি শুধু আপনার এ কামরায় দেরাজ আলমারীগুলো দেখব। লুকোবার মত কিছু থাকলে আপনি তা সরিয়ে রাখতে পারেন।"
"না, সরিয়ে রাখবার আমার কিছু নেই। আপনি ইচ্ছে করলে সমস্ত কামরাই খুঁজে দেখতে পারেন।" রেগে উঠেই যেন এলসা ঢালাও স্বাধীনতা দিলে পরাশরকে।

পরাশর কিন্তু সারা ঘর তল্লাসী করল না। এমন কি দেরাজ আলমারীও খুলল না। তার বদলে প্রথমেই কামরার ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে প্রসাধনের জিনিষের বিভিন্ন কৌটো আর জার নাড়তে নাড়তে একটি ছোট শিশি তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করলে, "এটা কি?"
"পরীক্ষা করলেই যখন জানতে পারবেন, তখন লুকিয়ে লাভ নেই।" বললে এলসা, "ওটা বিষ।"
"কি রকম বিষ। মানুষ মারা যায়?"
"তা মাত্রা বেশী হলে তাও যেতে পারে।" এলসা স্বীকার করলে, "তবে সাধারণ মাত্রায় কিছুক্ষণের জন্যে অজ্ঞান করে দেয় মাত্র।"
"আপনার অকপটতার জন্যে ধনবাদ।" পরাশর যেন ব্যঙ্গ করল, "আপনার বুদ্ধিকেও তারিফ। গোপন কোথাও না রেখে চোখের ওপর রেখে লুকোবার সবচেয়ে চতুর ব্যবস্থা করেছেন।"
"প্রশংসা আপনাকেও ফিরিয়ে দিচ্ছি," এলসার গলার স্বরও একটু বাঁকা, "অন্য কোথাও না খুঁজে প্রথমেই যে খোলা জায়গায় নজর দিযেছেন সেটা আপনার বাহাদুরী।"
"আচ্ছা এসব তারিফের লেনদেন এখন থাক," পরাশর ড্রেসিং টেবিলেরই একটা দেরাজ খুলে বললে, "আপনার এ ড্রয়ারের এই ছোট অ্যালবামটাও দামী মনে হচ্ছে।"
"হ্যাঁ, ওটাতে খুব বিরল কিছু ছবি আছে।"
"তাহলে ওটাও আমার নিতে হবে।" পরাশর অম্লান বদনে বললে, "তবে এখন নেবার দরকার নেই। তার কারণ আমরা আজ রাত্রে এই কামরাতেই থাকছি।"
"এই কামরাতে আমার সঙ্গে থাকছেন!" এলসার গলাটা বিমূড়তাতেই যেন তেমন তীক্ষ্ণ হতে পারল না।
"না, আপনার সঙ্গে নয়।" পরাশর ব্যাখ্যা করলে, "আজ রাতটা কামরা বদল করে আপনাকে আমার বন্ধু কৃত্তিবাসের ঘরেই থাকতে হবে।"
"না, আমি তা থাকব না।" এলসা ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানালে।
"না থাকতে চাইলে আপনাকে এখনই অনেক বিশ্রী জবাবদিহির দায়ে পড়তে হবে। তার চেয়ে বিনা ঝামেলায় ঘরটা বদল করাই ভালো নয়কি?"
"এ আপনাদের অন্যায় জুলুম!" নিরুপায় বলেই এলসার গলাটা কেমন করুণ শোনালো।
"এ জুলুম না করে আমাদের উপায় কি?" প্রায় নির্মম ভাবেই বললে পরাশর, "আপনার বন্ধু সহায় সাথী কে বা কারা, আজ আশা করি জানতে পারব।"

আমার কাছ থেকে ঘরের চাবিটা নিয়ে এলসাকে দিয়ে পরাশর আবার বললে, "পালাবার চেষ্টা আপনি করবেন না জানি। তবু শুনে রাখুন, এ হোটেলের চারিধারে ত বটেই এখান থেকে যাবার আসবার সমস্ত রাস্তাই আজ আমাদের নজরবন্দী। নেহাৎ ইঁদুর বেড়াল না থাকলে সে পাহারা এড়িয়ে যেতে পারবেন না।"
এবার কোনো উত্তর না দিয়ে দেরাজ আলমারী থেকে কয়েকতা তার নিতান্ত দরকারী জিনিস একটা হ্যাণ্ড ব্যাগে ভরে এলসা চলে যাবার পর পরাশর আমার দিকে ফিরে বললে, "আজ রাতটা জেগে কাটাবার জন্যেই তৈরী থাকো। বারোহাকে যে কথা দিয়েছিলাম তা রেখেই আমি আসছি।"

এগার

নাটকের যবনিকা সে রাত্রেই পড়ল। ঘুম কাটাবার জন্যে ক্যানটিন থেকে কড়া কফি আনিয়ে খেয়ে টেবিল ল্যাম্পের পাশে একটা ডিভানে শুয়ে এলসার কামরাতেই পাওয়া একটা ডিটেকটিভ নভেল পড়বার চেষ্টা করছিলাম। এ সব সময়ে পরাশরের কবিতা লেখার কথা। কিন্তু সে চেষ্টা না করে সে পাশের অন্য টেবিলে বসে এলসার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারী পাওয়া অ্যালবামটা একটু যেন অতিরিক্ত মন দিয়ে দেখছিল। রাত তখন বারোটা বাজে। এয়ারকণ্ডিশনারের মৃদু আওয়াজ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ পরাশর অ্যালবাম রেখে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের সব কটা বাতি নিভিযে দিলে। পরাশরের কান আমার চেয়ে খাড়া। বুঝলাম সে নিশ্চয় সন্দেহজনক কোন শব্দ বাইরে পেয়েছে। সেই অনুমানটা ঠিক। কয়েক সেকেণ্ড বাদেই ঘরের দরজায় মৃদু টোকা শোনা গেল। সেই সঙ্গে দেখা গেল দরজার তলা দিয়ে লম্বা একটা চিরকুট কাগজ কে ঠেলে দিচ্ছে কাগজটা টেনে নেবার পর পরাশরের টর্চের আলোয় সেটা তার সঙ্গে পড়লাম। তাতে অত্যন্ত জড়ানো হাতে লেখা, "আমি দারুণ বিপদ মাথায় নিয়ে তোমাকে দুটো কথা জানাতে এসেছি। দরজাটা খুলে আমায় দু মিনিটের জন্যে ভেতরে যেতে দাও।"
ওপরে যেমন সম্বোধন নেই নিচে তেমনি কোনো সই নেই। এ কার হাতের লেখা! দরজার বাইরে কে? আমি রীতিমত ভাবিত হলেও পরাশর বিনা দ্বিধায় দরজাটা খুলে দিলে।আলোটা অবশ্য না জ্বেলেই। দরজা খুলে দিতে যে ঘরে ঢুকল করিডরের আলোতে তার কাঠামোটা দেখেই বারোহা বলে চিনলাম। বারোহা অন্ধকার দেখে একটু দ্বিধাভরেই ঘরে ঢুকে বললে, "ঘরটা অন্ধকার কেন এলসা? আলোটা জ্বালো।"
পরাশর আলোটা জ্বালল সেই মুহূর্তেই। এলসার বদলে আমাদের দুজনকে দেখে বারোহার অবস্থা তখন বেশ কাহিল। নিজেকে সামলাবার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও একটু ধরা গলায় শুধু বলতে পারলে, "আপনারা! এ ঘরে?"
"হ্যাঁ, আমরাই।" পরাশর ঐ সাড়ে ছ'ফুট লম্বা মানুষটাকে যেন নাবালক হিসেবে দেখে ব্যঙ্গের সুরে বললে, "তা এ ঘরে এত রাত্রে কেন এসেছেন? এলসার সঙ্গে গোপন অভিসারের মতলবে?"
"না, না। আমায় বিশ্বাস করুন," বারোহা কাতর প্রতিবাদ জানালে।" এলসার সঙ্গে আমার সে-রকম সম্বন্ধ নয়। আমি শুধু..."
ঐ পর্যন্ত বলে বারোহা একটু থামতেই পরাশর যেন ঠেলা দিয়ে বললে, "আমি শুধু বলে থামলেন কেন? আমি শুধু, কি বলতে যাচ্ছিলেন?"
"বলতে যচ্ছিলাম যে - আপনারা আমাকে সন্ধ্যাবেলা যা বলে এসেছিলেন তা শুনে আমি সত্যি, মিস এলসার জন্যে ভাবিত হয়ে পড়েছিলাম। তাই লুকিয়ে ওকে একটু সাবধান করে দিতে এসেছিলাম।"
"সাবধান করতে এসেছিলেন না আপনার চিরশত্রুর হদিশ পেয়ে তাকে শেষ করতে!" পরাশর কড়া গলায় বললে, "কিন্তু কি আজ আপনাকে সকালে বলে দিলাম? বলেছিলাম না যে আপনার মাথার ওপর একটা মস্ত বিপদের ফাঁড়া ঝুলছে! এমন করে এ ঘরে এসে সে বিপদ এখন ত সঙ্গীন করে তুলেছেন।"
"সঙ্গীন করে তুলেছি!" বারোহা হতাশ স্বরে বললে, "কিন্তু আপনারা থাকতে এ ঘরে আমার বিপদ হবে কেন? আপনারা আমায় রক্ষা করবেন না।"
"বিপদ আপনার যে নিজের ডাকা!" পরাশর নির্মমভাবে বললে, "তার আমরা রক্ষা করব কি করে।"
যে অ্যালবামটা খানিক আগে সে দেখছিল সেইটে বারোহার হাতে উলে দিয়ে পরাশর আবার বললে, "দেখুন দেখি এ ছবিগুলো চিনতে পারেন?"
বারোহা অ্যালবামটা খুলে ছবিগুলো তাচ্ছিল্যভাবে একটু দেখেই সেটা মুড়ে ফেলে বললে, "হ্যাঁ পারি - । এগুলো আমারই ছবি। কিন্তু তাতে কি বলতে চান কি?"
কথাটা শুনে শুধু নয় - গলার স্বরটাতেও আমি যেন চমকে উঠলাম। সেই বারোহাই আমাদের সামনে অ্যালবাম হাতে বসে আছে। কিন্তু গলার আওয়াজ থেকে মুখের ভাব ও দেহের ভঙ্গিতে এ যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।
পরাশরেরও এ চমকটা লাগল কি না জানি না - কিন্তু তার কথায় সেটা প্রকাশ পেল না।
আগের মতই চাপা বিদ্রুপের সুরে সে বললে, "বলতে চাই এই যে - অতি বুদ্ধিমান হওয়ার বিপদ এক্টু বেশী। এই সেদিন দিল্লীতে চার্লস শোভরাজের দল ধরা পড়ার পরই ও জাতীয় শয়তানী আবার হওয়া সম্বন্ধে কেউ সাবধান থাকবে না ধরে নিয়ে তুমি খুব চতুর ফাঁদই এখানে পেতেছিলে। প্রথমে নিজেই যেন বিষের শিকার হয়েছে। এমনভাবে ড্রেস রিহার্সাল দিয়ে জমিটা ভালোভাবে তৈরী করে নিয়েছিলে। তোমার লক্ষ্য র্যা থবোন - এরা ছিল না। ওদের নাম আমি তোমায় একটু ধোঁকা দেবার জন্যই করেছিলাম। তোমার আসল লক্ষ্য হল মঁসিয়ে রেনোয়া। প্রচুর দামী জিনিস নিয়ে ঘোরা তার এক বদরোগ। এ হোটেলে তাঁকে বধ করাবার জন্যেই তুমি জাল পেতে বসেছিলে। একটা কথা শুধু তুমি ভুলে গেছলে যে - ডালে ডালে যারা চরে তাদের ওপরেও পাতায় পাতায় চরবার মানুষও আছে।"
"আর সেই পাতায় পাতায় যার চরে - তাদের মরণ হয়, অতিবুদ্ধির অহঙ্কারে।"
একেবারে চাবুকমারা গলায় কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে পিস্তল বার করে বারোহা ঘরের বালবের দিকে ছুঁড়ে সেটা ফাটিয়ে দিলে।
তারপর গাঢ় অন্ধকারে তার হিংস্র শাসানি শোনা গেল, "আমি এখন ঘর থেকে বেরিয়ে যচ্ছি। কেউ বাধা দিতে চেষ্টা করলে মশা মাছি মারার দ্বিধাটুকুও আমি যে করব না এইটুকু শুধু জানিয়ে যচ্ছি। যে যেখানে আছ সেখান থেকে এক পা নড়বে না।"

"এই হুকুমটা তোমার ওপরও রইল।"
হঠাৎ তীব্র একটা চোখ-ধাঁদানো জোরালো টর্চের আলো বারোহার ঠিক মুখের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে এই কথাগুলো শুনতে পেলাম। কথাগুলো একটি মেয়ের গলার - আর সে মেয়ে যে এলসা তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পরাশর কামরার অন্য একটা আলো জ্বেলে দেওয়ায় তা বুঝতে পারলাম। এলসার এক হাতে টর্চ আর অন্য হাতে বারোহার ঠিক কপাল লক্ষ্য করে উঁচিয়ে ধরা পিস্তল।
এলসা শুধু একা নয় তার সামনে আর একটা যে মেয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে মঁসিয়ে রেনোয়া-র ভাগনী বলেই চিনলাম।
আলো জ্বলবার পরই আবার কড়া আদেশ শোনা গেল, "তোমার পিস্তল ফেলে দাও বারোহা। তুমি যত বড় লক্ষভেদীই হও, তুমি জানো যে তোমার হাত ঘুরিয়ে পিস্তল ছোঁড়ার আগেই তোমার মাথার ঘিলু এই কার্পেটকে নোংরা করে দেবে। ফেলো পিস্তলটা।"
বারোহা দুচোখে অগ্নি বৃষ্টি করেও পিস্তল ফেলে দিতে এবার বাধ্য হল।
জিনেৎকে টর্চ ধরা হাতে ঘৃণাভরে বারোহার দিকে ঠেলে দিয়ে এলসা এবার বললে, "এই নাও তোমার যোগ্য সহচরীকে বুড়ো লম্পট মঁসিয়ে রেনোয়াকে কাবু করবার জন্যে ভাগনী বলে সেবাদাসী করে নিজেই যাকে তুমি জুটিয়ে দিয়েছেলে।"

এ নাটক দেখতে দেখতে সত্যি তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি। পরাশরের কথায় আমার চমক ভাঙল। বারোহার ফেলে দেওয়া পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়ে সে আমায় বললে, "সাবধানের মার নেই। আর কিছু না পাও ওপর থেকে মিস এলসার স্কার্ফ টার্ফ কিছু এনে গুণধরের হাত দুটো একটু বেঁধে ফেলো দিকি।"
পাশের ঘরে বাঁধবার কিছু খোঁজবার জন্যে যেতে যেতে একটা কথা শুধু না জিজ্ঞেস করে পারলাম না। "আচ্ছা মিস এলসার রহস্যটা দু কথায় একটু বলবে? উনি কি আমাদেরই আরক্ষী বাহিনীর কেউ? তুমি কি ওকে চিনতে?"
এলসা হাসল, আর সংক্ষেপেই উত্তর দিলে পরাশর, "না, উনি ইণ্টারপোল।"
বিশ্ব পুলিশ সংস্থার একজন বড় গোয়েন্দা। প্রায় দু বছর ধরে নানা দেশে নানা বেশে বারোহাকে চোখে চোখে রেখে যাকে বলে রাঙা হাতে ধরবার জন্যে পেছনে লেগে আছেন। আর তাঁকে চেনার কথা জিজ্ঞাসা করছ? ওঁকে চিনতে দেরী হয়েছে বলেই এ ব্যাপারটা এতদূর গড়াতে পেরেছে।

পাঁচতারা হোটেলের সব ঝামেলা চুকে তুকে যাবার পর পরাশরের সঙ্গে এই ব্যাপারটা নিয়েই আলোচনা করতে করতে একদিন জ্যোতিষ চক্রবর্তী শঙ্কর মহারাজের কথা জানতে চেয়েছিলাম। পরাশর হেসে বলেছিল, "আরে উনিই ত চর চরাবার চাঁই। জ্যোতিষ সেজে দেশী বিদেশীদের পেটের খবর বার করে আমাদের জন্যে জমা করে রাখেন। এরপর একটু ধোঁকায় ধাঁধায় পড়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "আচ্ছা, তোমাদের এই আন্তর্জাতিক ঠগ ধরার ব্যাপারে আমাকে অমন ধড়াচূড়া পরিয়ে নিয়ে গেছলে কেন বলো ত? আমি তোমাদের কোন কাজে ত লাগিনি!"
"বাঃ, তোমায় না নিয়ে গেলে এ বৃত্তান্তের কথক হত কে! আমি কি আবার নিজের জবানীর দায়ে পড়ব নাকি!"
বন্ধু বাৎসল্য এরপর আর রাখা যায়!

শেষ

আগের অংশ

প্রেমেন্দ্র মিত্র

প্রেমেন্দ্র মিত্রঃ জন্ম ১৯০৪; মৃত্যু ১৯৮৮। একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্রকার । ১৪-টি চলচ্চিত্রের পরিচালক, চিত্রনাট্য লিখেছেন অজস্র। ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যগ্রন্থ লিখে পান আকাদেমি পুরস্কার ও রবীন্দ্রপুরস্কার। বাংলা ভাষায় সায়েন্স ফিকশনকে সাহিত্যের মর্যাদা তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন ঘনাদাকে সৃষ্টি করে। গোয়েন্দা সাহিত্যর ওঁর অবদান পরাশর বর্মা। পরাশর বর্মার বই মূলতঃ বড়দের জন্যে লেখা, তাই কিশোরদের গোয়েন্দাকাহিনী সংগ্রহে পরাশর বর্মাকে চোখে পড়ে না। ‘প্রেমের প্রান্তে পরাশর’ উপন্যাসটি এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রকাশিত ‘পরাশর সমগ্র’ থেকে নেওয়া। এটি এখানে ছাপানোর অনুমতি দিয়ে তার কর্ণধার রঞ্জন সেনগুপ্ত আমাদের বাধিত করেছেন।