রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

 

 

 

 

 

 

 


 

হত্যাকারী কে ?

সপ্তম পরিচ্ছেদ


রাস্তায় আসিয়া মনটা বড়ই খারাপ হইয়া গেল। নিজেকে বারংবার ধিক্কার দিতে লাগিলাম। কেন আমি শশিভূষণকে এমন রাগাইয়া দিলাম? এই রাগের মুখে হয় ত আজ মদোন্মত্ত পিশাচ অভাগিনী লীলাকে কতই না যন্ত্রণা দিবে? এতদিন এত সহিয়াছি - আজ কেন আমি এমন করিলাম? কি কুক্ষণে কোন্‌ দুর্ম্মুখের মুখ দেখিয়া আজ আমি শশিভূষণের সহিত দেখা করিতে , বাটীর বাহির হইয়াছিলাম। কেন আমি এমন সর্ব্বনাশ করিলাম ! হায় হায় ! আমি লীলার ভাল করিতে গিয়া অগ্রেই তাহার মন্দ করিয়া ফেলিলাম ! মনুষ্য যা মনে করে - নির্দ্দয় বিধাতা এমনই তাহার বিপরীত ঘটাইয়া দেয়।

আমার মানসিক প্রবৃত্তি সমূহে তখন কেমন একটা গোলমাল পড়িয়া গেল। কি ভাবিতেছি - কি ভাবিতে হইবে - কি হইল , এইসব তোলাপাড়া করিতে করিতে যেন আমি কতকটা আত্মহারা হইয়া গেলাম। অশেষ সদ্‌গুণাভরণা , সৌম্যশ্রী লীলার সুখ দুঃখ যে এখন এমন একটা দয়াশূণ্য , ক্ষমাশূণ্য , নিষ্ঠুরতম বর্ব্বরের হাতে নির্ভর করিতেছে , এ চিন্তা প্রতিক্ষণে আমার হৃদয়ে সহস্র বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা অনুভব করাইতে লাগিল। কি করিব ? কোন উপায় নাই। নিজের বুকে বিষাক্ত দীর্ঘ ছুরিকা শতবার আমুল বিদ্ধ করিতে পারি ; কিন্তু মুঢ় শশিভূষণের গায়ে একবার একটা আঁচড় দিই , এমন ক্ষমতা আমার নাই।
নির্জ্জন পথিমধ্যে প্রতিমুহূর্ত্তে আমার বেশ স্পষ্ট অনুভব হইতে লাগিল যে , নির্ব্বিঘ্নে চিন্তারাক্ষসী আমার হৃদ্‌পিণ্ড শোষণ করিয়া রক্তশোষণ করিতেছে। আমি মুমূর্ষের ন্যায় গৃহে ফিরিলাম। তাহার পর - হে সর্ব্বজ্ঞ ! সর্ব্বশক্তিমান ! তুমি জান প্রভো ! তাহার পর যাহা ঘটিয়াছিল।


অষ্টম পরিচ্ছেদ

হায় , পরদিন প্রভাতের সেই লোমহর্ষণ ঘটনার সেই ভয়ঙ্করী স্মৃতির হাত হইতে আমি কি মরিয়াও অব্যাহতি পাইব ? তখন বেলা ঠিক দশটা। এমন সময়ে নরেন্দ্রনাথ ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া আসিয়া আমার ঘরে প্রবেশ করিল। দেখিলাম , তাহার মুখ বিবর্ণ , এবং দৃষ্টি উন্মাদের। মুখ চোখের ভাবে যেন একটা কোন ভীষণতার ছায়া লাগিয়া রহিয়াছে। দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। নরেন্দ্রনাথ দৃঢ়মুষ্টিতে আমার জামাটা ধরিয়া এমন একটা টান দিল , আর একটু হইলে বা জামাটা অধিক দিনের পুরাতন হইলে তাহাতেই সেটা একেবারে ছিঁড়িয়া যাইত। নরেন্দ্রনাথে ব্যাকুল কণ্ঠে কেবল বলিতে লাগিল , " যোগেশ দা সর্ব্বনাশ হয়েছে। যা ভেবেছিলাম , তাই হয়েছে - একেবারে খুন , আর উপায় নাই , যোগেশ দা কি হবে - তুমি চল - শীঘ্র ওঠো - এমন খুনে সে -"
আমি বিস্ময়বিহ্বলচিত্তে দাঁড়াইয়া উঠিলাম। সেই মুহূর্ত্তে একটা অনিবার্য্য বিমূঢ়তা আসিয়া আমার মস্তিষ্ক এমন পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিল যে , আমি নরেন্দ্রের কথা কিছুতেই হৃদয়সঙ্গম করিতে পারিলাম না। আমি তাহাকে একান্ত উৎকণ্ঠিত ভাবে জিজ্ঞাসা করিলাম , " কি হয়েছে নরেন , আমি তোমার কথা কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না।"
দেখিলাম , নরেন্দ্রনাথের চক্ষু অশ্রুপূর্ণ। সে কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল , " সর্ব্বনাশ হয়েছে যোগেশ দা! লীলা নাই - শশিভূষণ কাল রাত্রে লীলাকে খুন করিয়াছে। পুলিশের লোক শশিভূষণকে গ্রেপ্তার করেছে।"
আর শুনিতে পাইলাম না , বজ্রাহতের ন্যায় সেইখানে নিঃসংজ্ঞ অবস্থায পড়িয়া গেলাম।
যখন কিছু প্রকৃতিস্থ হইলাম , দেখি , নরেন্দ্রনাথ পাশে বসিয়া আমার চোখে মুখে জলের ছিটা দিতেছে।
আমি তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া তাহাকে বলিলাম , " আর কিছু করিতে হইবে না। সহসা এ ভয়ানক কথাটা শুনিয়াই - যাক , তুমি বলিতেছিলে না শশিভূষণকে পুলিসের লোক গ্রেপ্তার করেছে ?"
নরেন্দ্রনাথ কহিল , " তাহাকে অনেকক্ষণ চালান দিয়াছে , চালান দিতে শশিভূষণের উপরে বড় একটা জোর-জবরদস্তি করিতে হয় নাই , সে একটা আপত্তিও করে নাই - নিজেই ধরা দিয়াছে। হয়ত শশিভূষণের তখনও নেশার ঝোঁক ছিল। যাই হোক , তুমি একবার চল যোগেশ দা , এ সময়ে তোমার একবার যাওয়া খুবই দরকার - যদি কোন একটা উপায় হয়।"
আমি কম্পিতকণ্ঠে , কম্পিত-হৃদয়ে , এবং অক্ম্পিত-কলেবরে ভীতি-বিহ্বলের ন্যায় জিজ্ঞাসা করিলাম , " কোথায় ? লীলাকে দেখিতে ? দাঁড়াও - দাঁড়াও - নরেন্দ্র , আমায় একটু প্রকৃতিস্থ হতে দাও - আমি বুঝিতে পারিতেছি না , আমার বুকের ভিতর যেন কি হইতেছে।"
আমার ভাবভঙ্গি দেখিয়া নরেন্দ্রনাথ আমার মনের অবস্থা সম্যক্‌ বুঝিতে পারিয়াছিল। আমার কথায় সম্মত হইল ; কিন্তু সে একান্ত অধীরভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে দেখিয়া আমি আর বড় বিলম্ব করিলাম না - তখনই বাহির হইলাম।


নবম পরিচ্ছেদ

যথাসময়ে আমরা শশিভূষনের বাটীতে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। সেখানে উপস্থিত হইয়া যাহা দেখিলাম , এ কাহিনীর মধ্যে একান্ত উল্লেখযোগ্য হইলেও , তাহা আমি বলিতে ইচ্ছা করি না। সেজন্য আমাকে ক্ষমা করিবেন।
এই হত্যা-সম্বন্ধে শশিভূষণের বিরুদ্ধে যেসকল প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে , তাহাতে সেই যে দোষী , সে সম্বন্ধে আর কাহারও কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। গতরাত্রে উদ্যানমধ্যে আমার সহিত শশিভূষণের যে সকল কথা হইয়াছিল , একজন দাসী তাহা শুনিয়াছে , সে নিজের জোবানবন্দীতে আমাদের মুখনিঃসৃত প্রত্যেক কথাটিরই পুনরাবৃত্তি করইয়াছে। প্রাতঃকালে লীলার মৃতদেহ বিছানার পাশে পড়িয়াছিল এবং তাহার বক্ষে একখানি ছুরিকা আমূল প্রোথিত ছিল ; সে ছুরিখানি শশিভূষণের নিজেরই ছুরি। অনেকেই সেই ছুরিখানি তাহার বৈঠকখানা ঘরে অনেকবার দেখিয়াছে। সেরকম ধরণের প্রকাণ্ড ছুরি সে গ্রামের মধ্যে আর কাহারও ছিল না। শশিভূষণের বিরুদ্ধে আরও একটা বিশেষ প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে যে , গতরাত্রে শয়নকালে তাহাদিগের স্ত্রীপুরুষের মধ্যে একটা অত্যধিক বাগ্বিতণ্ডা হইয়াছিল। এবং শশিভূষণ তাহাকে অত্যধিক প্রহার করিয়াছিল। লীলার কপালে একটা মুষ্ট্যাঘাতের চিহ্ণও ছিল। তাহা ডাক্তারী পরীক্ষায় এইরূপ স্থিরীকৃত হয় যে , মৃত্যুর দুই-একঘণ্টা পূর্ব্বে তাহাকে সে আঘাত করা হইয়াছিল।
এসকল প্রতিপাদ্য প্রমাণ সত্ত্বেও সে যে স্ত্রীহন্তা , তাহা শশিভূষণ অখনও স্বীকার করিতে সম্মত নহে। সে অবিচলিতভাবে এখনও বলিতেছে , সে সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তাহাকে ফাঁসীই দাও - মায় - কাট - খুন কর - যা ইচ্ছা তাই কর - সেজন্য সে কিছুমাত্র দুঃখিত নহে। শশিভূষণ সর্ব্বসমক্ষে এখনও স্বীকার করিতেছে যে , সে তাহার পত্নীর প্রতি অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করিত , মদের খেয়ালিই তাহার একমাত্র কারণ ; নতুবা সে তাহার স্ত্রীকে যথেষ্ট ভালবাসিত ; এক্ষণে লীলাকে হারাইয়া তাহার জীবন একান্ত দুর্ব্বহ হইয়া উঠিয়াছে। জীবন ধারণে তাহারে তিলমাত্র ইচ্ছা নাই। শশিভূষণের এসকল কথা কতদূর সত্য , তাহা বিবেচনা করিবার শক্তি আমার তখন ছিল না। আরও শুনিলাম , আমার সহিত দেখা করিবার তাহার বড়ই আগ্রহ। যে কেহ তাহার সহিত দেখা করিতে যাইত , তাহাকেই সে বিশেষ করিয়া বলিয়া দিত , আমি যেন একবার যাইয়া তাহার সহিত দেখা করি।
শশিভূষণের সহিত দেখা করিবার আমার ততটা ইচ্ছা ছিল না ; কিন্তু তাহার এইরূপ বারংবার আগ্রহ প্রকাশে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একদিন আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলাম।


দশম পরিচ্ছেদ

নিজের হাজত ঘরে আমাকে উপস্থিত দেখিয়া শশিভূষণ অত্যন্ত আল্হাদিত হইল ; এবং আমার উপদেশ অগ্রাহ্য করিয়াছে বলিয়া - আরও আমার সহিত যে সমুদয় অন্যায় ব্যবহার করিয়াছে , তাহার উল্লেখ করিয়া বারংবার আমার নিকটে অশ্রু-সংরুদ্ধকণ্ঠে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিল। তাহার পর বলিল , " ভাই যোগেশ , তুমি আমাকে ক্সমা করিলে ; কিন্তু অভাগিনী লীলা কি এমন নরকের কীটকে কখন ক্ষমা করিবে ? আমি আজ আমার পাপের ফল পাইলাম। ধর্ম্মের বিচার অব্যাহত - আজ না হউক , দুদিন পরে নিশ্চয়ই সকলকে স্বকৃত পাপ-পুণ্যের ফলভোগ করিতে হইবে , কেহই তাহার হাত এড়াইতে পারে না। আমি লীলার প্রতি যে সকল নিষ্ঠুরাচরণ করিয়াছি , বোধ করি , কোন কঠোর রাক্ষসেও তাহা পারে না। আমি মনুষ্য নামের একান্ত অযোগ্য - আমার ন্যায় মহাপাপীর নাম এ জগৎ হইতে চিরকালের জন্য মুছিয়া যাওয়াই ভাল। ভাই যোগেশ , আজ সকলেই বিশ্বাস করিয়াছে , আমি লীলার হত্যাকারী। তুমিও যে এরূপ বিশ্বাস কর নাই , তাহাও নহে। জগতের সকলেরই মনে আমার মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এই ধারণা - এই বিশ্বাস চিরন্তন অটুট এবং অটল থাকিয়া যাক্‌ - বরং তাহাতে আমি সুখী ; কিন্তু যোগেশ , তুমি যেন আর সকলের মত তাহা মনে করিয়ো না , এই কথা বলিবার জন্যই আমি তোমার সহিত দেখা করিতে এত উৎসুক হইয়াছিলাম। আমার সত্য নাই - ধর্ম্ম নাই - এমন কিছুই নাই , যাহা সাক্ষ্য করিয়া স্বীকার করিলে তুমি কিছুমাত্র বিশ্বাস করিতে পার - আমি ধর্ম্মবিচ্যুত , মনুষ্যত্ত্ব-বিসর্জ্জিত , সয়তানের মোহমন্ত্রপ্রণোদিত , জগতের অকল্যাণের পূর্ণ প্রতিমূর্ত্তি - আমার কথায় কে বিশ্বাস করিবে ? ভাই যোগেশ , তুমি তাই অবিশ্বাস করিয়ো না , তাহা হইলে মরিয়াও আমার সুখ হইবে না - এ জগতে এমন একজন থাক্‌ , সে যেন জানে , আমি একটা মহাপাপী ছিলাম বটে , কিন্তু স্ত্রীহন্তা নই।"
বলিতে বলিতে শশিভূষণের কণ্ঠ কম্পিত এবং বাষ্পরুদ্ধ হইয়া আসিতে লাগিল। সে দুই হাতে মুখ চাপিয়া বালকের ন্যায় কাঁদিতে লাগিল।
বলিতে কি তাহার সেই সকরুণ অবস্থা তখন আমার মর্ম্মভেদ ও সহানিভূতি আকর্ষণ করিয়াছিল। অনেক করিয়া তাহার পর আমি তাহাকে শান্ত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম , " শশিভূষন , এ পর্য্যন্ত যাহা ঘটিয়াছে , তুমি অকপটে সব আমাকে বল ; কোন কথা গোপন করিতে চেষ্টামাত্রও করিয়ো না। যদি এ দুঃসময়ে আমি তোমার কোন উপকারে আসিতে পারি।"
শশিভূষণ বলিল , " আমি প্রভাতে উঠিয়া প্রথমেই দেখিলাম , লীলা রক্তাক্ত হইয়া আমার বিছানার পাশে পড়িয়া রহিয়াছে। ধরিয়া তুলিতে গেলাম - দেখিলাম , দেহে প্রাণ নাই। দেখিয়াই আমার বুকের রক্ত স্তম্ভিত হইয়া গেল। বুঝিলাম , লীলা এ পিশাচকে জন্মের মত পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে - বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে খুঁজিলে আর তাহাকে ফিরিয়া পাইব না - পাইবার নহে। বলিতে কি , যোগেশ প্রথমে আমার বোধ হইল , মদের ঝোঁকে আমিই তাকে রাত্রে হত্যা করিয়াছি। তাহার পর যখন দেখিলাম , আমারই ছুরিখানা , লীলার বুকে তখনও আমূলবিদ্ধ রহিয়াছে , তখন আমার সে ভ্রম দূর হইল। আমার এখন বেশ মনে পড়িতেছে , ছুরিখানি আমার বৈঠকখানায় যেখানে থাকিত , সেখানে ছুরিখানা কাল রাত্রে দেখিতে পাই নাই , পরে খুঁজিয়াও কোথাও পাওয়া গেল না। আমি সে কথা তখনই লীলাকে বলিয়াছিলাম। সেজন্যই মনে একটু সন্দেহ হইতেছে ; নতুবা এখনও আমার মনে বিশ্বাস , কাণ্ডজ্ঞানহীন আমিই লীলার হত্যাকারী ; কিন্তু সেই ছুরিখানা যোগেশ , আরও ইহার ভিতরে আর একটা কথা আছে , আমার বোধ হয় - ঠিক বলিতে পারি না - যদি - যদি -"
শশিভূষণকে ইতস্ততঃ করিতে দেখিয়া নিজেও যেন একটু ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিলাম। সে ভাব তখনই সামলাইয়া আমি তাহাকে বলিলাম , " কথা কহিতে এমন সঙ্কুচিত হইতেছ কেন ? তুমি যা জান বা বোধ কর , আমাকে স্পষ্ট বল।"
শশিভূষণ বলিল , "লীলার বুকে ছুরি বসাইতে পারে , একজন ছাড়া তাহার এমন ভয়ানক শত্রু আর কেহ না। তাহারই উপর আমার কিছু সন্দেহ হয় -"
আমি অত্যধিক ব্যগ্রতার সহিত জিজ্ঞাসা করিলাম , " কে সে ? - প্রকাশ কর নাই কেন ?"
শশিভূষণ অনুচ্চস্বরে বলিল , " তুমি তাহাকে জান , আমি মোক্ষদার কথা বলিতেছি। যেদিন আমার বিবাহ হইয়াছে , সেইদিন হইতে মোক্ষদাও ভিন্নমূর্ত্তি ধরিয়াছে। কি একটা হতাশায় সে যেন একেবারে মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। অনেকবার সে আমাকে শাসিত করিয়া বলিয়াছে , 'ইহার ফল তোমাকে ভোগ করিতে হইবে - আমি যে-সে নই - তবে আমার নাম মোক্ষদা। একবাণে কেমন করিয়া দুটা পাখী মারিতে হয় - আমা হতেই তা একদিন তুমি দেখিতে পাইবে।"
শশিভূষণ আবার দুইহাতে দুই চক্ষু আবৃত করিয়া কাঁদিতে লাগিল।
আমি অতিশয় চকিত হইয়া উচ্চকণ্ঠে বলিলাম , " অসম্ভব ; তাহা কি কখনও হয় ?"
অনুতাপদগ্ধ রোরুদ্যমান্‌ শশিভূষণ বলিল , " তাহা না হইলেও আমি তোমাকে বিশেষ অনুনয় করিয়া বলিতেছি , লীলার প্রকৃত হত্যাকারীকে , যাহাতে তুমি সন্ধান করিয়া বাহির করিতে পার , সেজন্য যথেষ্ট চেষ্টা করিবে।" যাহার পর মুখ হইতে হাত নামাইয়া তাহার অশ্রুসিক্ত করুণ দৃষ্টি আমার মুখের উপর স্থাপন করিয়া বলিতে লাগিল , " ভাই যোগেশ , তুমি মনে করিতেছ , আমার নিজের জন্য তোমাকে আমি এমন অনুরোধ করিতেছি - তাহা ঠিক নয় , আমার ফাঁসী হউক আর না হউক , সেজন্য আমি কিছুমাত্র চিন্তিত নহি , একদিন ত সকলকেই মরিতে হইবে - তা দুইদিন আগে আর পরে ; কিন্তু - কিন্তু যোগেশ , যখনই মনে হয় যে , লীলার হত্যাকারী তাহার এ নৃশংসতার কোন প্রতিফল পাইবে না -"
বলিতে বলিতে শশিভূষণের অশ্রুময় দৃষ্টি সহসা মেঘকৃষ্ণ রাত্রের তীব্র বিদ্যুদগ্নির ন্যায় ঝলসিয়া উঠিল। এবং এমন দৃঢ়রূপে সে নিজের হাত নিজের মুষ্টিবদ্ধ করিয়া ধরিল যে , হাতের কব্জিতে নখরগুলা বিদ্ধ হইয়া রক্তপাত হইতে লাগিল।
যদিও আমি শশিভূষণকে অতিশয় ঘৃণার চোখে দেখিতাম , কিন্তু এখন তাহাকে নিদারুণ অনুতপ্ত এবং মর্ম্মাহত দেখিয়া আমার সে ভাব মন হইতে একেবারে তিরোহিত হইয়া গেল। শোকার্ত্ত শশিভূষণের সেই কাতরতায় আর আমি স্থির থাকিতে পারিলাম না। বলিলাম , " শশিভূষণ , যেমন করিয়া পারি , তোমার নির্দ্দোষিতা সপ্রমাণ করিব। এখন হইতেই আমি ইহার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিব।"
এইরূপ প্রতিশ্রুতির পর আমি তাহার নিকটে সেদিন বিদায় লইলাম।

পরের অংশ

পাঁচকড়ি দে

পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩ – ১৯৪৫) সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক ডিটেকটিভ কাহিনীর লেখক। রহস্যকাহিনী লিখে উনি নাকি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। ওঁর লেখা ‘নীলবসনা সুন্দরী’, ‘মনোরমা’, ‘মায়াবী’, ‘হত্যাকারী কে?’ এক কালে পাঠকজগতে আলোড়ন তুলেছিল। পাঁচকড়ি দে প্রধানতঃ উইল্কি কলিন্স ও এমিল গাবোরিয়র-এর ধারা অনুসরণ করলেও, পরে কোনান ডয়েলের লেখা থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ওঁর বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশী মালমশলাকে দেশী ছাঁচে ফেলে পাঠকদের বিতরণ করা। ওঁর অনেক লেখা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।