রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

চুরী না বাহাদুরী ?


------প্রথম পরিচ্ছেদ।------

অনেক দিনের পর বাড়ী যাইতেছিলাম। দুই বৎসরের অধিক প্রবাসে অর্থোপার্জ্জন করিতেছিলাম। দুই বৎসরের সঞ্চিত অর্থ সঙ্গে লইয়া দেশে যাইতেছিলাম। রেলের পথে দুই দিন লাগে। অবশিষ্ট পথ গাড়ীর ডাকে আসিয়াছিলাম। রেলে উঠিয়া অতিশয় সাবধানে যাইতেছিলাম। সঙ্গে যে অর্থ ছিল তাহার অধিকাংশ নোট, সে গুলি বাক্সে অথবা ব্যাগে রাখিতে সাহস হয় নাই। কোমর হইতেও অনেক টাকা অনেক সময় চুরি যাইতে শুনিয়াছি। সেইজন্য নোট গুলি বাঁধিয়া একখানা বড় রেশমের রুমালে পৈতার মত করিয়া কাঁধে বাঁধিয়াছিলাম। নোটের তাড়া বুকের উপর রহিল। তাহার উপর কাপড় চোপড় পরিলাম। আমার অজ্ঞাতে টাকা চুরি যাইবার আর কোন ভয় রহিল না। দিব্য নিশ্চিন্ত হইয়া রেলে উঠিলাম। পথ খরচের যে কয়টা টাকা আবশ্যক তাহা একটা কুরিয়র ব্যাগে ছিল, রাত্রে সেটা মাচার তলায় রাখিলাম। সেটা গেলেও বিশেষ ক্ষতি হইত না।
ঘোড়ার গাড়ীতে যতটা পথ আসিয়াছিলাম কোন ভয়ই ছিল না। সে অঞ্চলে লোকে আমাকে বিলক্ষণ চিনিত, কাজ কর্ম্মের উপলক্ষে সে পথে আমার প্রায়ই যাওয়া আসা ঘটিত। সঙ্গে কিছু টাকা আছে জানিয়া কয়কজন চাপরাসী সঙ্গে আনিয়াছিলাম, তাহারা আমাকে রেলে তুলিয়া ফিরিয়া গেল। রেলের পথ যে নির্ব্বিঘ্নে কাটিয়া যাইবে তাহাতে আমি কোন সন্দেহ করি নাই।
যে শ্রেণীর গাড়ীতে আমি চড়িয়াছিলাম তাহাতে অধিক লোক জন উঠে না। আমি প্রায়ই একা ছিলাম, কখন কখন দুই এক জন ওঠে আবার দুই চার ষ্টেশন পরে নামিয়া যায়। দীর্ঘ কালের জন্য সঙ্গী না থাকাতে আমি বরং খুসী হইলাম। যতই একা থাকি ততই নিশ্চিন্ত থাকি। বিশেষ যে কোন ভয় হইতেছিল তাহা নহে তবে আর কেহ আমার গাড়ীতে আসিলেই মনটা একটু খুঁৎ খুঁৎ করিতেছিল, যে আসিতেছিল তাহাকেই যে চোর মনে হইতেছিল এমত নহে, হয়ত আমাদের মধ্যে অনেকে আমার অপেক্ষাও ভদ্র লোক, হয়ত আমার পক্ষে চুরী করা যেমন সম্ভব তাহাদের পক্ষে চুরী করা তাহা অপেক্ষা কম সম্ভব। কিন্তু বিচার করিয়া মনকে বুঝান যায় না। যখন কেহ আমার গাড়ীতে আসে আমি তখনি মনে করি, কেন, এই বই কি আর অন্য গাড়ী নাই ? মুখে কিছু বলিতে পারি না। কি করিয়াই বা বলিব ? একখানা টিকিট লইয়া একখানা গাড়ী সমুদয় দখল করিবার আমার অধিকার কি ?
প্রথম দিন নির্ব্বিঘ্নে কাটিয়া গেল। আর এক রাত্রি কাটিলেই বাড়ীতে পঁহুছি। কত কথাই মনে পড়িতে লাগিল। বাড়ীতে আত্মীয় বন্ধুদিগের পুনর্দর্শন লালসা যেন কত প্রবল হইয়া উঠিল। আর একটা দিন যেন কাটে না। এত দিনের পর সহধর্ম্মণীকে কি করিয়া সম্ভাষণ করিব তাহাই ভাবিতে লাগিলাম। শেষ বারের চিঠি পকেটে ছিল বাহির করিয়া আবার পড়িতে লাগিলাম। ছেলে দুটির মুখ মনে পড়িতে লাগিল। তাহারা এখন কত বড় হইয়াছে ? আবার কি আমাকে চিনিতে পারিবে ? বড়টি বোধ হয় চিনিতে পারিবে। ক্রমে ক্রমে আর সব ভুলিয়া গেলাম। প্রিয়জনদিগের পরিচিত কন্ঠরব অস্পষ্ট ভ্রমর গুঞ্জনের ন্যায় শ্রবণে পশিতে লাগিল। প্রিয়তমার আলিঙ্গন স্পর্শ যেন হৃদয়ে অনুভূত করিতে লাগিলাম। সন্তানের মুখ চুম্বন শব্দ শুনিলাম, বন্ধুদিগের সাদর সম্ভাষণ শুনিলাম, সস্নেহ সাগ্রহ সহস্র প্রশ্ন শুনিতে পাইলাম। অনতিদূর ভবিষ্যতের গাঢ় কল্পনায় বর্ত্তমান বিস্মৃত হইলাম।
সন্ধ্যা হইয়া আসিল। মাঠের ভিতর দিয়া, বনের ভিতর দিয়া, পুষ্করিণীর সম্মুখ দিয়া নদীর উপর দিয়া গাড়ী চলিতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার চারিদিক আচ্ছন্ন করিল। আকাশে একে একে নক্ষত্র উঠিতে লাগিল।
অন্ধকার হইলে গাড়ী একটা ষ্টেশনে লাগিল। আমি এক কোণে বসিয়া নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিলাম। এমন সময় ষ্টেশনের এক জন লোক গাড়ীরে দরজা খুলিল। আমি মনে মনে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া আরও কোণে ঘেঁষিয়া বসিলাম। শেষ রাত্রিটা যে একেলা থাকিব তাহারও যো নাই। আবার একজন সঙ্গী জুটিল। কিছুক্ষণ আমার সঙ্গীর কোন চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। কেবল জিনিস পত্র গাড়ীতে বোঝাই হইতে লাগিল। একজন লোককে গাড়ীতে এত জিনিস পত্র লইয়া উঠিতে আমি কখন দেখি নাই। গাড়ীর মধ্যে একটুও স্থান রহিল না। পোঁটলা পুঁটলি পর্ব্বতের সমান হইয়া উঠিল। আমি বিস্মিত হইয়া একজন কুলিকে জিজ্ঞাসা করিলাম “কয়জন উঠিবে?”
“এক জন।”
“এক জনের জন্য এত আসবাব ? ব্রেকভ্যানে কিছু দেওয়া হয় নাই কেন ?”
কুলিরা অত শত জানে না। তাহাদের পয়সা লইয়া কাজ। ব্রেকভ্যানে তুলিলে তাহারা কিছু পায় না। তাহারা ব্যাস্ত হইয়া আসবাব স্তূপ সাজাইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে ষ্টেশন মাষ্টার আরোহীকে সঙ্গে লইয়া আসিলেন। দরজা খুলিয়া ষ্টেশন মাষ্টার বলিলেন, “মহাশয়, এই গাড়ী।”
লোকটা কৃষ্ণ বিষ্ণুর মধ্যে হইবে। ষ্টেশন মাষ্টার স্বয়ং গাড়িতে তুলিয়া দিতে আসিয়াছে।
আমাকে গাড়ীতে দেখিয়াই সে ব্যক্তি যেন একটু অপ্রসন্ন হইল। ষ্টেশন মাষ্টারকে জিজ্ঞাসা করিল, “খালি গাড়ী নাই ? এ গাড়ীতে যে লোক দেখিতেছি।”
ষ্টেশন মাষ্টার কহিল, “আজ কিছু ভিড়। অন্য গাড়ীতে আরও লোক। আপনার এই গাড়ীতে সুবিধা হইবে। আমি দেখিয়া শুনিয়াই আপনাকে এই গাড়ীতে উঠিতে বলিতেছি।”
আর এক দিকে ষ্টেশন মাষ্টারের ডাক পড়িল। আমি মুখ বাড়াইয়া ষ্টেশন মাষ্টারকে ডাকিলাম। সে ফিরিল। আমি বলিলাম, “মহাশয়, গাড়ীতে যে রকম জিনিস বোঝাই হইয়াছে তাহাতে বসিবার স্থান পাওয়া ভার। কতক বোঝা ব্রেকভ্যানে পাঠাইলে ভাল হয়।”
ষ্টেশন মাষ্টার উঁকি মারিয়া গাড়ীর ভিতর দেখিল। বলিল, “তাইত”। তার পর দ্বিতীয় আরোহীর দিকে চাহিয়া কহিল, “আপনি কি বলেন?”
সে লোকটি শশব্যস্তে বলিল, “তাহা হইবে না। আমার সমুদয় জিনিস আমার সঙ্গে যাইবে।”
ষ্টেশন মাষ্টার আমার দিকে চাহিয়া একটু হাসিল। কহিল, “মহাশয়, আপনি ভদ্রলোক। এত মাল লইয়া গাড়ীতে উঠিবার নিয়ম নাই বটে, কিন্তু আপনার বোধ হয় অসুবিধা হইবে না। আর কেহ বোধ হয় এ গাড়ীতে উঠিবে না। আর সময়ও নাই। জিনিস বাহির করিতে, টিকিট মারিতে, ব্রেকভ্যানে তুলিতে বিলম্ব হইবে। আপনি এখন আর পীড়াপীড়ি করিবেন না।”
আমার পীড়াপীড়ি করিবার বড় ইচ্ছা ছিল না। আর একটা রাত বই ত নয় যেমন তেমন করিয়া কাটিয়া যাইবেই। বিশেষ ষ্টেশন মাষ্টার যে রকম করিয়া আমাকে বুঝাইয়া বলিল তাহাতে আমি নিরুত্তর হইলাম।
ষ্টেশন মাষ্টার আরোহীর দিকে চাহিয়া কহিল, “আপনি গাড়ীতে উঠুন। গাড়ী ছাড়ে।” এই বলিয়া সেকহ্যান্ড করিয়া চলিয়া গেল। আরোহী গাড়ীতে উঠিল।
গাড়ীতে উঠিয়া সে ব্যক্তি তাহার বোঁচকা বুঁচকি গণিতে লাগিল। খানিক ক্ষণ কুলিদিগের সহিত বচসা করিয়া তাহাদিগকে বিদায় দিল।

------ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ------


আমি এক ধারে বসিয়া নবাগত লোকটিকে দেখিতেছিলাম। তাহাকে দেখিলে বড় ভয় হইবার কথা নহে। লোকটি কিছু বেঁটে, মোটাসোটা, ছোট রকম একটী ভুঁড়ি আছে। গায়ে আঁটা পোশাক, ভুঁড়ির উপর একগাছা মোটা চেন ঝুলিতেছে। লোকটিকে দেখিলে সঙ্গতিশালী বোধ হয়। অর্থ এবং পদের যে ক্ষুদ্র অভিমান তাহাও বোধ হয় যথেষ্ট পরিমাণ আছে। লোকটি দেখিতে বিজ্ঞ ডিপুটীর মত, কিন্তু বোধ হয় ডিপুটীর অপেক্ষা অধিক ধনী। গাড়ীতে উঠিয়া ব্যস্ত সমস্ত ভাবে তাহার অসংখ্য পুঁটুলি সাজাইতে আরম্ভ করিল, কিন্তু অলক্ষিতে আমার প্রতি ঘন ঘন কটাক্ষপাত করিতে লাগিল। মাঝে মাঝে কুলিরা জিনিস পত্র অসাবধানে রাখিয়াছে বলিয়া তাহাদিগকে গালি দিতে লাগিল।
ঘন্টা বাজিল, বাঁশী ডাকিল, গাড়ী চলিতে আরম্ভ করিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “মহাশয় কোথায় যাইবেন?”
“কলিকাতা। আপনি কোথায় যাইবেন?”
আমি বলিলাম, “শ্রীরামপুর।” মনে করিয়াছিলাম এ লোক অল্প দূর গিয়া নামিয়া যাইবে। দেখিলাম আমার সাথের সাথী।
আমি শ্রীরামপুরে যাইব শুনিয়া লোকটী তাহার লটবহর ছাড়িয়া আর এক কোণে বসিয়া পড়িল। বসিয়া বলিল, “আঁ।”
শব্দটা সন্তোষ অথবা অসন্তোষসূচক ভাল বুঝিতে পারিলাম না। ঐ শব্দটী করিয়া লোকটী আমায় ভাল করিয়া দেখিতে লাগিল।
আমাকে কতকটা বিদেশীর মত দেখাইতেছিল। বসন ভূষণের বড় পারিপাট্য ছিল না। বেশ ভূষার প্রতি অনুরাগ কোন কালেই আমার বড় নাই তাহাতে রেলের পথে অতি সামান্য বস্ত্র ধারণ করিয়াছিলাম। ঘড়ী ও চেন বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। আমার আকৃতি দীর্ঘ, শরীর বলিষ্ঠ। বুকের উপর দুই হাত রাখিয়া পা ছড়াইয়া বসিয়াছিলাম।
খানিকক্ষণ আমকে দেখিয়া বোধ হয় সে ব্যক্তি বড় আশ্বস্ত হইল না। জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয়ের এ পথে যাতায়াত আছে?”
আমি বলিলাম, “না।”
“আপনি রেলে বড় একটা উঠিয়া থাকেন?”
“বড় নয়।” লোকটার কথায় আমার একটু বিরক্তি বোধ হইতে লাগিল। কোথায় সহজ কথাবার্ত্তা কহিবে না আমায় পরীক্ষা করিতে আরম্ভ করিল!
কিছু পড়ে আমার সঙ্গী আবার জিজ্ঞাসা করিল, “আমি গাড়ীতে এত জিনিস পত্র লইয়া কেন উঠিয়াছি, জানেন?”
“না।”
“সম্প্রতি ব্রেকভ্যান হইতে অনেক সামগ্রী চুরী গিয়াছে। গার্ড বলে সে কিছু জানে না। তাহার মেয়াদ হইয়াছে বটে কিন্তু সে যে চুরী করিয়াছে তাহার কোন প্রমাণ নাই।”
কথাটা শুনিয়া আমার উৎসুক্য জন্মিল। বুকের উপর হাত ছিল, হাত দিয়া নোটের তাড়া একবার টিপিয়া দেখিলাম। কিছু কুতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “কত দিনের কথা?”
“এক সপ্তাহ হইবে।”
আমি বলিলাম, “যদি ব্রেকভ্যান হইতে চুরী যায় ত গাড়ী হইতে চুরী যাওয়াই বা আশ্চর্য্য কি?”
“আশ্চর্য্য কি!” এই বলিয়া আমার সঙ্গী কাতর দৃষ্টে চারিদিকে চাহিতে লাগিল। একবার তাহার জিনিস পত্রের দিকে তাকায়, একবার গাড়ীর চারিদিকে তাকায়, একবার গাড়ীর বাহিরে অন্ধকারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, আবার ঘুরিয়া ফিরিয়া আমার দিকে তীব্র অথচ অলক্ষ্য কটাক্ষ করে। একটা ছোট বাক্স পায়ের কাছে ছিল থাকিয়া থাকিয়া সেইটাকে আরও কাছে টানিয়া আনে। অবশেষে বাক্সটা তুলিয়া পাশে রাখিল। আমাকে চোর বলিয়া সন্দেহ করিতেছে অথবা অকারণ সংশয় করিতেছে ভাল বুঝিতে পারিলাম না। স্থির হইয়া বসিয়া তাহাকে দেখিতে লাগিলাম।
এইরূপ কিছুক্ষণ যায়। আমি একটু অন্যমনস্ক হইলাম। এক একবার আমার সঙ্গীর দিকে চাহিয়া দেখি। সে লোকটী নির্নিমেষ চক্ষে আমার দিকে চাহিয়া আছে। আমার সঙ্গে চোকাচোকি হইলেই অন্য দিকে চক্ষু ফিরায়, আমি অন্য দিকে তাকাইলেই নিষ্পন্দ হইয়া আমায় দেখে। আমার মনটা একটু খুঁৎ খুঁৎ করিতে লাগিল। হঠাৎ আমার সঙ্গী আমায় জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয় আপনি কি অস্ত্র লইয়া পথ চলেন ?”
আমি একটু হাসিয়া কহিলাম, “ইংরাজের রাজ্যে কেহ সশস্ত্র হইয়া রেলে ওঠে না।”
আমার ক্ষুদ্রকায় সঙ্গী একটু রুক্ষস্বরে কহিল, “আমি অস্ত্র লইয়াই ভ্রমণ করি। এই যে আমার পাশে বাক্স দেখিতেছেন তাহাতে একজোড়া পিস্তল আছে।”
আমি হাসিমুখে কহিলাম, “আপনি কি শীকারে যাইতেছেন ?”
সে ব্যক্তি কিছু কঠোর হাস্য করিয়া বলিল, “আপাততঃ কোন শীকার নাই, তবে আমাদের গাড়ীতে যদি কোন চোর ওঠে তাহাকে শীকার করিব। তাহাকে প্রাণে না মারি তাহার পা ভাঙ্গিয়া রাখিব।” এই বলিয়া অত্যন্ত সাহাসিক পুরুষের ন্যায় বুক ফুলাইয়া আমার প্রতি খর খর দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল।
আমার বড় হাসি পাইল। লোকটা আমায় তস্কর বিবেচনা করিতেছে অথবা সেইরূপ সন্দেহ করিতেছে বেশ বুঝিতে পারিলাম। একটু রঙ্গ করিবার অভিপ্রায়ে বলিলাম, “পিস্তল ছোঁড়া আপনার অভ্যাস আছে ?”
তাহার মুখ একটু মলিন হইল, কহিল, “এক রকম অভ্যাস আছে। এ গাড়ীতে চোর আসিলে তাহাকে অবশ্য ঘায়েল করিতে পারি।”
আমি গম্ভীর ভাবে কহিলাম, “আপনার কাছে দুইটা পিস্তল আছে বলিতেছেন। আপনি একটা পিস্তল আমাকে দিন, আর এই দুয়ানিটি এই জানালার সম্মুখে ধরুন। আমি গাড়ীর অন্য ধার হইতে পিস্তল ছুঁড়িয়া দুয়ানি উড়াইয়া দিতেছি। আপনার হাতে কিছুই লাগিবে না।”
আমার কথা শুনিয়া সে বেচারির মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। বাক্সটী আরও কাছে টানিয়া লইল। হাত একটু কাঁপিতেছিল আমি দেখিতে পাইলাম। বলিল, “আপনার বোধ হয় বন্দুক ও পিস্তল ছুঁড়িবার বিলক্ষণ অভ্যাস আছে। কিন্তু পরীক্ষা করিবার আবশ্যক নাই।”
আমার মনে প্রথমেই সন্দেহ হইয়াছিল যে বাক্সটী দেখিতে পিস্তলের বাক্সের হইলেও তাহাতে পিস্তল নাই। আমার সঙ্গী যে মিথ্যা বলিতেছে তাহা পূর্ব্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম।
এই সময় আমরা একটা ছোট ষ্টেশনের নিকটবর্ত্তী হইলাম। আমি ষ্টেশনের অপর দিকে জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া দিয়া দেখিতে লাগিলাম। নিশীথের শীতল পবন মুখে লাগিতে লাগিল। আকাশে চতুর্দ্দিকে নক্ষত্র জ্বলিতেছে, বিস্তৃত মাঠ, দূরে লোকালয়। দূর হইতে প্রদীপের আলোক দেখা যাইতেছে। অন্ধকারে কখন বাদুর উড়িয়া যাইতেছে, কখন পেচক ডাকিতেছে, কখন কোন নিশাচর জন্তুর রব শোনা যাইতেছে। ষ্টেশনে গোলমাল, বারান্ডায় লোকজন দৌড়াদৌড়ি করিতেছে, কেহ জল চাহিতেছে কেহ কোন সামগ্রী বিক্রয় করিতেছে, কেহ অনর্থক চীৎকার করিতেছে। আমি সে দিকে মুখ ফিরাইলাম না।
দুই মিনিটের পর গাড়ী ছাড়িয়া দিল। আমি ঘুরিয়া বসিলাম – দেখিলাম, গাড়ীতে আর একজন লোক উঠিয়াছে। অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম। দরজা খুলিবার শব্দ অথবা অন্য কোন শব্দ শুনিতে পাই নাই। এত নিঃশব্দে যে কেহ গাড়ীতে উঠিতে পারে আমি না দেখিলে বিশ্বাস করিতাম না। বিস্ময় কিছু অপনীত হইলে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কী এই ষ্টেশনে উঠিলেন ?”
আগন্তুক মৃদু হাসিয়া বলিল, “হাঁ! আপনি বুঝি আমায় উঠিতে দেখেন নাই।”
আমি বলিলাম, “দেখা দূরে থাকুক, দরজা খোলার অথবা বন্ধ হইবারও কোন শব্দ শুনি নাই। গাড়ীতে যদি ছাদ না থাকিত ত বলিতাম আপনি আকাশ হইতে পড়িয়াছেন।”
আগন্তুক হাসিতে লাগিল। হাসিতে হাসিতে কহিল, “মহাশয়, হাল্কা বোঝা মাথায় করিলে মুটে কিছু ভার বোধ করে না। চার গাছা মল না পরিলে যুবতীর পায়ে শব্দ হয় না। আমি যদি আপনার বন্ধুর মত রাজ্যের সামগ্রী লইয়া উঠিতাম তাহা হইলে অবশ্য শুনিতেও পাইতেন দেখিতেও পাইতেন।”
‘আমার বন্ধু’ এতক্ষণ হাঁ করিয়া বসিয়াছিলেন। তিনিও আগন্তুককে আসিতে দেখেন নাই। কিন্তু আর একজন লোক দেখিয়া তাহার ধড়ে প্রাণ আসিল। আমার হাত হইতে রক্ষা পাইল। তৃতীয় ব্যক্তিকে দেখিয়া অত্যন্ত আনন্দের সহিত কহিল, “আসুন মহাশয়, যেমন করিয়াই আসুন আসিয়াছেন বেশ করিয়াছেন। আপনি কলিকাতায় যাইতেছেন ত ?”
আগন্তুক হাসিয়া কহিল, “তাহা হইলে কি এমন করিয়া যাইতাম। অন্ততঃ আপনার আসবাবের দশভাগের একভাগ লইয়া আসিতাম। আর তাহা হইলে আমার অলক্ষ্য আগমনও সম্ভব হইত না, আপনারাও বিস্মিত হইতেন না। আমি মোটে এক ষ্টেশন যাইব, তাহার পরে আপনারা স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইবেন।”
কলকাতার যাত্রী কিছু বিষণ্ণ হইল, দুই একবার আমার দিকে চাহিয়া দেখিল। আমি অন্ধকার কোনে ঠেসান দিয়া বসিয়া আগন্তুককে ভাল করিয়া দেখিতেছিলাম।
আগন্তুক যুবা পুরুষ, বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসরের ঊর্দ্ধ হইবে না, বরং কম হইবে। আকৃতি মাঝারি রকম ঈষদ্দীর্ঘও বলা যাইতে পারে। শরীর ক্ষীণ কিন্তু অত্যন্ত স্ফূর্ত্তিব্যঞ্জক। মুখের শ্রী অত্যন্ত মনোহর, হাস্যও বড় মধুর। পরিধান পরিচ্ছন্ন বস্ত্র, হাতে একটী ক্ষুদ্র ব্যাগ। কিন্তু যুবকের চক্ষু দেখিতে পাইলাম না। রেলে লোকে যেমন নীল রংএর চসমা পরে চক্ষে সেই রকম চসমা রহিয়াছে। রাত্রিকালে চোখে চসমা দেখিয়া একটু আশ্চর্য্য বোধ হইল। যুবক আমার মনোভাব বুঝিয়া আমার দিকে চাহিয়া কহিল, “রাত্রে আমার চক্ষে চসমা দেখিয়া বিস্মিত হইবেন না। চক্ষে কিছু বেদনা হইয়াছে সেইজন্য চসমা পরিয়াছি।”
এ ব্যক্তিকে দেখিয়া আমার মন একটু চঞ্চল হইল। বলিতে পারি না কেন, মনে একটু বিপদের আশঙ্কা হইল। বোধ হয় অন্য মনে দুই একবার দুকে হাত দিয়া নোটের তাড়া স্পর্শ করিয়া থাকিব। যুবক কি দেখিতেছিল কি না চক্ষে চসমা থাকাতে কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। সে এদিকে ওদিকে না চাহিয়া আমার পূর্ব্ব পরিচিত সঙ্গীর সহিত কথাবার্ত্তা কহিতেছিল। একবার হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয়, আপনার ও বাক্সের ভিতর কি? পিস্তল না কি ?”
আমার সঙ্গী অত্যন্ত বিস্মিত ও কিছুটা শঙ্কিত হইয়া কহিল, “হাঁ। আপনি কি করিয়া জানিলেন ?”
যুবক কহিল, “পিস্তলের বাক্স দেখিয়া বলিলাম। আপনি কি চোরের ভয়ে পিস্তল লইয়াছেন ?”
সে ব্যক্তি আরও বিস্মিত হইল, বলিল, “আপনি কি সব জানেন ?”
যুবক আবার হাস্য করিল। তাহার দশন পংক্তি শুভ্র ও সুন্দর। কহিল, “আমি কিছুই জানি না। কিন্তু যদি চোর আসে ত কি আপনাকে বলিয়া চুরী করিবে ?”
আমার সঙ্গী অত্যন্ত ভীত হইয়া কহিল, “চোর ত বাহির হইতে আসিবে না। যদি চোর আসে ত এই গাড়ীতেই আসিবে।”
যুবক আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া হাসিতে লাগিল। জিজ্ঞাসা করিল, “আমাদের দু জনের মধ্যে কাহাকেও সন্দেহ হয় ?”
“না, না, আপনাদের কথা হইতেছে না। যদি আর কেহ ওঠে।”
যুবক কহিল, “তা ও বটে।”
আমার সন্দেহ ও আশঙ্কা বাড়িতে লাগিল। আশঙ্কার কোন কারণ ছিল না তথাপি অত্যন্ত শঙ্কা হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে অন্য ষ্টেশন আসিল। যুবক উঠিয়া দাঁড়াইল। আমাদের দু জনকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, “আপনারা এখন নিশ্চিন্তে নিদ্রার চেষ্টা করুন। চোরের ভয়ে সমস্ত রাত্রি জাগিয়া থাকিবেন না।” এই বলিয়া নিঃশব্দে দরজা খুলিয়া যুবক নামিয়া গেল।
অকারণে এরূপ আশঙ্কা হওয়াতে আমার অত্যন্ত আশ্চর্য্য বোধ হইতে লাগিল। কিন্তু যুবক নামিয়া গেলে স্বচ্ছন্দ বোধ করিতে লাগিলাম। বিছানার উপর পা ছড়াইয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া শুইলাম।


------ তৃতীয় পরিচ্ছেদ------

আমাকে শুইতে দেখিয়া আমার সঙ্গী জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি নিদ্রা যাইবেন ?”
আমি বলিলাম, সমস্ত রাত্রি কি বসিয়া থাকা যায় ?”
আমার সঙ্গী কহিল, “আমি সমস্ত রাত্রি জাগিয়া থাকিব।”
“আপনার যেমন অভিরুচি হয় করিবেন,” বলিয়া আমি পাশ ফিরিলাম।
শুইলাম বটে কিন্তু চক্ষে নিদ্রা আসিল না। ঘন্টা কয়েক পরেই বাড়ী পঁহুছিব – এমন সময় নিদ্রা হয়ও না। যে আরোহী এক ষ্টেশন আমাদের সঙ্গে আসিয়াছিল তাহার বিষয় ভাবিতে লাগিলাম। রাত্রে চক্ষে চসমা কেন ? তাহাকে দেখিয়া মনে মনে আশঙ্কাই বা কেন হইল ? লোকটা দেখিতে মন্দ নয়, কথাবার্ত্তা শিক্ষিত ভদ্র লোকের মত। তথাপি সে নামিয়া গেলে নিশ্চিন্ত বোধ হইল কেন ? ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না।
একবার আমার সঙ্গীর দিকে ফিরিয়া দেখিলাম সে বাক্সটি মাথার কাছে লইয়া প্রাণপণে জাগিয়া থাকিবার চেষ্টা করিতেছে কিন্তু কিছুতেই বসিয়া থাকিতে পারিতেছে না। অবশেষে শয়ন করিবা মাত্র নিদ্রাভিভূত হইল। আমার তখনও নিদ্রাবেশ হয় নাই।
সেই গভীর নিশীথের মধ্য দিয়া গাড়ী চলিতে লাগিল। সে শব্দে আর কোন শব্দ শোনা যায় না, গাড়ীর বেগ মন্দীভূত হইলে আমার নিদ্রিত সঙ্গীর নাসিকারব শুনিতে পাওয়া যায়।
ক্রমে ক্রমে আমার শরীর শিথিল হইল, মনে হইল তন্ত্রাকর্ষণ হইতেছে। কিন্তু এরূপ নিদ্রাবেশ পূর্ব্বে কখন অনুভব করি নাই। বোধ হইল যেন সারা শরীর গুরু ভারাক্রান্ত হইয়াছে, নেত্রদ্বয় যেন কে চাপিয়া ধরিয়াছে। একবার চক্ষু উন্মীলন করিবার চেষ্টা করিলাম – চক্ষু নিমীলিত রহিল। ক্রমে চৈতন্য লুপ্ত হইতে লাগিল, কিন্তু একেবারে অচৈতন্য হইলাম না। কয়েক মুহূর্ত্ত পরে সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল, আপনা আপনি চক্ষু উন্মীলিত হইয়া গেল। অন্য কোন দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে পারিলাম না, কেবল অঙ্গারের মত উজ্জ্বল চক্ষু দেখিতে পাইলাম। সমুদয় ইন্দ্রিয় বৃত্তি আমার চক্ষে কেন্দ্রীভূত হইল, স্তিমিত নয়নে ভীতিমুগ্ধ হইয়া সেই জ্বলন্ত চক্ষু যুগলের প্রতি চাহিয়া রহিলাম। দেখিতে দেখিতে সমস্ত শরীর অবসন্ন হইয়া পড়িল, চক্ষু মুদ্রিত হইয়া আসিল।। নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া আমি অচৈতন্য হইলাম।
কতক্ষণ এরূপ রহিলাম বলিতে পারি না। যখন আমার চৈতন্যোদয় হইল তখন রাত্রি শেষ হইয়া আসিয়াছে, অন্ধকার তত গাঢ় হয় নাই। মুক্ত গবাক্ষ দিয়া শীতল পবন আসিতেছে, আমার ললাটে লাগিতেছে। আমি একেবারে উঠিয়া বসিলাম। উঠিয়া বসিতেই অভ্যাসবশতঃ বুকে হাত পড়িল। অমনি তীরের মত উঠিয়া দাঁড়াইলাম। বুকে নোটের তাড়া নাই।
সর্বাঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল, মাথা ঘুরিতে লাগিল। চক্ষে কিছু দেখিতে না পাইয়া বসিয়া পড়িলাম। মনে করিলাম রুমাল খানা বুক হইতে খসিয়া পড়িয়াছে। তৎক্ষণাৎ জামা খুলিয়া ফেলিলাম। রুমাল শুদ্ধ নোটের তাড়া অদৃশ্য হইয়াছে। বিছানার নীচে, বেঞ্চের নীচে চারিদিকে খুঁজিলাম, কোথাও কোন চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না।
গাড়ীতে কোথা হইতে চোর আসিল, এত সাবধানে রক্ষিত নোটগুলি কিরূপে অপহৃত হইল ? গাড়ীতে কেবল সেই একজন সঙ্গী, তৃতীয় ব্যক্তি নাই। আমি দ্বিতীয় আরোহীর দিকে চাহিয়া দেখিলাম সে অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে। গাড়ীর আলোক ক্ষীণ হইয়া আসিতেছে।
আমি ক্ষিপ্তের মত হইয়া উঠিয়াছিলাম। অর্দ্ধ দন্ডের মধ্যে সর্ব্বস্বান্ত হইলে সকলে স্থির থাকিতে পারে না। আমার সঙ্গীকে ধরিয়া সবলে আকর্ষণ করিলাম। সে অর্দ্ধস্ফুট স্বরে বকিতে বকিতে উঠিয়া বসিল। আমার মূর্ত্তি দেখিয়া সে অত্যন্ত ভীত হইল – সম্পূর্ণ জাগরিত হইল। আমি বলিলাম, “এ কেমন তামাসা ? আমার টাকা ?”
তাহার মুখ শুকাইয়া গেল, কহিল, “টাকা ? আমার কাছে কিছু টাকা নাই।”
আমি তাহার হাত ধরিয়াছিলাম, তাহার কথা শুনিয়া তাহার হাত ধরিয়া টানিলাম; সে পড়িতে পড়িতে রহিল। আমি চীৎকার করিয়া কহিলাম, “আমার নোট কোথায় আছে বল।”
ভয়ে ও বিস্ময়ে আকুল হইয়া সে কহিল, “তোমার নোট আমার কাছে ?” এই কথা বলিয়াই তাহার শিয়রের দিকে দৃষ্টি পড়িল। অত্যন্ত কাতর স্বরে চীৎকার করিয়া কহিল, “আমার বাক্স ?”
আমি দেখিলাম তাহার বাক্সটি নাই। তখন তাহার হাত ছাড়িয়া দিলাম। সে শোকে ও ভয়ে বিহ্বল হইয়া বেঞ্চের উপর বসিয়া পড়িল। কিছু পড়ে অতি করুণ স্বরে আমায় কহিল, “আমার বাক্সটী কোথায় রাখিয়াছ ?”
আমি বুকে হাত দিয়া কহিলাম, “আমার নোট ?”
সে ব্যক্তি কহিল, “আমার বাক্স ?”
আমি ভাবিতে লাগিলাম। আমাদের দুইজনের মধ্যে কেহ চোর নয় বেশ বুঝিতে পারিলাম। দুই জনেরই চুরী গিয়াছে। আমার সঙ্গীর বিশ্বাস আমিই তাহার বাক্স চুরী করিয়াছি, তাহাকে উলটা চোর বানাইতেছি। নোটের কথাটা সে উপকথা মনে করিতেছিল। আমি কিছু স্থির হইয়া আমার সঙ্গীকে বলিলাম, “মহাশয়, আমিও চোর নই, আপনিও চোর নন। দুজনেরই চুরী গিয়াছে। কে চুরী করিয়াছে সেটা জানা কঠিন।”
সে ব্যক্তি বোধ হয় আমার একটা কথাও বিশ্বাস করিল না। আমার দিকে চাহিয়া কেবল বলিল, “আমার বাক্স।”
আমি কহিলাম, “আপনার কত গিয়াছে আমি জানি না। আমি সর্ব্বস্বান্ত হইয়াছি। আমার প্রতি আপনার যে সন্দেহ হইতেছে তাহা শীঘ্রই দূর হইবে, কিন্তু আর কিছু গেল কি না দেখি।”
বাক্স ব্যাগ যেমন তেমনি রহিয়াছে। আমার আর যে সামান্য টাকা কড়ি ছিল তাহাও তেমনি রহিয়াছে। আমার সঙ্গীর বাক্সটি ছাড়া আর কিছু যায় নাই। তাহার ঘড়িটিও যেমন তেমনি রহিয়াছে, তবে চেনে কিছু তফাৎ হইয়াছে। সোণার চেনের বদলে একগাছি লোহার চেন রহিয়াছে। নূতন রকমের চুরী বটে!
তাহার পরের ষ্টেশনে আমার সঙ্গীটি ভারি গোল বাধাইল। আমি আবার প্রকৃতিস্থ হইয়াছিলাম। ষ্টেশন মাষ্টার আসিলে বলিলাম, “আমাদের দুই জনের চুরী গিয়াছে।”
ষ্টেশনের লোক দেখিয়া আমার সঙ্গীর সাহস বাড়িল। আমার কথায় বাধা দিয়া কহিল, “নোট ফোট কিছু নয়। এই ব্যক্তি চোর। আমার বাক্সে দুই হাজার টাকার গহনা ছিল।”
আমি ষ্টেশন মাষ্টারকে কহিলাম, “আমার কাছে দশ হাজার টাকার নোট ছিল। নোটের নম্বর আমার কাছে আছে। আমার পরিচয় আমার কর্ম্ম স্থানে টেলিগ্রাম পাঠাইলেই পাইবেন। নোট ট্রেজারি হইতে লইয়া আসিয়াছি, জিজ্ঞাসা করিলেই জানিতে পারিবেন।” এই বলিয়া ষ্টেশন মাষ্টারকে কাগজ পত্র দেখাইলাম। রাত্রে যে বিশেষ অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিয়াছিল সেটা কেহ বিশ্বাস করিবে না বলিয়া আর বলিলাম না।”
ষ্টেশন মাষ্টার কহিল, “আপনার কথায় আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেছি। কিন্তু এখানে আপনাকে কেহ চেনে না। যতক্ষণ টেলিগ্রামের উত্তর না আসে ততক্ষণ আপনাকে এইখানে থাকিতে হইবে।”
আমি কহিলাম, “অবশ্য।”
আমার সঙ্গী ষ্টেশন মাষ্টারের প্রতি চাহিয়া কহিল, “আমাকেও কি থাকিতে হইবে ? আমাকে অনেকে এদিকে চেনে।”
ষ্টেশন মাষ্টার কহিল, “আজ্ঞা হাঁ। লোকনাথ বাবুকে অনেকে চেনে।”
আমি মৃদু মৃদু কহিলাম, “লোকনাথ বাবু ? নিবাস ?”
“সোমড়া। মহাশয়ের নামটি কি বলিলেন ?”
আমি বলিলাম, “অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।”
লোকনাথ বাবু আমার কাছে সরিয়া আসিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার নিবাস শ্রীরামপুর বলিলেন না “?
“আজ্ঞা হাঁ।“
“ঠাকুরের নাম “?
“মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।”
“কর্মস্থান ?” “ফরাক্কাবাদ।”
“এতক্ষণ বলিতে নাই ? আমার নাম লোকনাথ মুখোপাধ্যায়। নিবাস সোমড়া। আমায় চিনিতে পার ?”
আমি প্রণাম করিয়া বলিলাম, “আপনাকে পূর্ব্বে দেখি নাই। আপনি আমার কণিষ্ঠ ভ্রাতাকে আপনার কন্যা দান করিয়াছেন ?”
লোকনাথ বাবু ব্যস্ত হইয়া ষ্টেশন মাষ্টারকে ডাকাইলেন। বলিলেন, “ইহার উপর কোন সন্দেহ নাই। ইনি আমার আত্মীয় লোক। আমাদের দুই জনের চুরী গিয়াছে।”
ষ্টেশন মাষ্টার জিজ্ঞাসা করিল, “ইহার উপর আপনার কোন সন্দেহ নাই ?”
লোকনাথ বাবু সবেগে বলিলেন, “কিছু না।”
ষ্টেশন মাষ্টার আমার দিকে ফিরিয়া কহিল, “তবে টেলিগ্রামের উত্তরের অপেক্ষা করিবার প্রয়োজন নাই।”
আমরা দুই জনে আবার গাড়ীতে উঠিলাম।

------চতুর্থ পরিচ্ছেদ -----

গাড়িতে উঠিয়া আমি একটু কুন্ঠিত ভাবে কহিলাম, “আপনাকে চিনিতে না পারিয়া রাত্রে সদ্ব্যবহার -”
লোকনাথ বাবু কথাটা সমাপ্ত হইতে দিলেন না। কহিলেন, “বিলক্ষণ তোমার ত কোনই দোষ নাই। আমি যে তোমাকে দশ জনের সাক্ষাতে চোর বলিয়াছি।”
আমি বলিলাম, “অমন অবস্থায় সকলেই বলে। আমিও ত প্রথমে আপনাকে সন্দেহ করিয়াছিলাম।”
লোকনাথ বাবু কহিলেন, “যে কথা যাক, চোর কেমন করিয়া ধরা যাইবে ? এ ত সাধারণ চুরী নয়।”
লোকনাথ বাবু একজন প্রসিদ্ধ ধনী এবং অত্যন্ত কৃপণ। সেইজন্য তাঁহাকে অনেকে চিনিত। আমার সর্ব্বস্ব গিয়া যত না বিপদ হইয়াছে, দুই হাজার টাকার গহনা গিয়া তাঁহার ততোধিক বিপদ। একমাত্র কন্যার জন্য এই গহনা গড়াইয়া ছিলেন।
রাত্রে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল অবিকল লোকনাথ বাবুকে বলিলাম। শুনিয়া তিনি কাঁপিতে লাগিলেন। বলিলেন, “আমি বরাবর ঘুমাইয়াছিলাম, কিছুই টের পাই নাই। একবার কেবল ঘুম ভাঙ্গিয়াছিল তখন উঠিতে পারিলাম না। চক্ষে যেন পাথর চাপা ছিল। আবার ঘুমাইয়া পড়িলাম।”
আমি বলিলাম, “আমাদের সঙ্গে একজন সেই যে চসমা পড়া লোকটী উঠিয়াছিল তাহাকে মনে পড়ে ?”
লোকনাথ বাবুর মুখ ও চোক খুলিয়া গেল। বলিলেন, “অ্যাঁ! পড়ে বই কি! সে ত বেশ লোক বোধ হইল। আর সে এক ষ্টেশন বই ত আর আসে নাই।”
আমি বলিলাম, “তাহাকে দেখিয়া আমার কেমন ভয় হইয়াছিল বলিতে পারি না। তাহাকেই আমার সন্দেহ হইতেছে।”
লোকনাথ বাবু বলিলেন, “তোমার বুক থেকে কেমন করিয়া রুমাল খুলিয়া লইল। আর তুমি যাহা বলিতেছ এমন আশ্চর্য্য ব্যাপার আমি কখনো শুনি নাই।”
শ্রীরামপুরে আমি নামিয়া গেলাম। ষ্টেশনে আমার জ্যেষ্ঠ সহোদর দাঁড়াইয়াছিলেন তাঁহাকে সব বলিলাম। তিনি লোকনাথ বাবুকে নামিয়া আহার করিয়া কলিকাতায় যাইতে অনুরোধ করিলেন। লোকনাথ বাবু বলিলেন, “আর এক দিন আসিব। এখন এই চুরীর একটা উপায় করি।”
গাড়ী ছাড়িলে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কহিলেন, “ব্যাঙ্কে টেলিগ্রাম পাঠাও। নোটের নম্বর তোমার কাছে আছে। ব্যাঙ্কে নোট গেলে ধরা পড়িবে। আহার করিয়া আমরা কলিকাতায় যাইব।”
তখন মনে হইতে লাগিল সঙ্গে টাকা আনিয়া কি মূর্খের কাজই করিয়াছি। যদি রেজিষ্টরি করিয়া টাকা পাঠাই ত এতগুলা টাকা – আমার যথাসর্ব্বস্ব – মারা যায় না। বিদেশে যাইবার সময় মাকে বলিয়া গিয়াছিলাম ফিরিয়া আসিয়া তোমার হাতে টাকা দিব। সেই জন্য নিজের সঙ্গে টাকা লইয়া আসিতেছিলাম। এখন গিয়া মাকে কি বলিব ? বহু পরিশ্রম উপার্জ্জিত অর্থ বাড়ীর কাছে আসিয়া হারাইলাম। বাড়ী ফিরিবার এত আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হইল।
মা বড় বুদ্ধিমতী। সমস্ত টাকা চুরী গিয়াছে শুনিয়া মনে যাহাই হউক মুখে কোন দুঃখ প্রকাশ করিলেন না। বলিলেন, “অমর বেঁচে থাক, টাকার ভাবনা কি ? পুরুষ মানুষ আবার কত টাকা রোজগার কোরবে।”
আহারাদি করিয়া দুপুরের গাড়ীতে আমরা দুই ভাই কলিকাতায় গেলাম। রেলওয়ে পুলিসে চারিদিকে সন্ধান করিতেছিল, কিন্তু তাহারা যে তদন্ত করিতে পারিবে আমাদের সে ভরসা বড় ছিল না। আমরা একজন বিখ্যাত ডিটেক্টিভের কাছে গেলাম। তাহাকে সকল কথা আদ্যোপান্ত বলিলাম। সে একটু চুপ করিয়া রহিল। পরে জিজ্ঞাসা করিল, “সে ব্যক্তির চক্ষু আপনি দেখিতে পান নি ?”
আমি বলিলাম, “একবারও না।”
ডিটেক্টিভ বলিল, “তাহা হইলে তাহাকে চেনা দুষ্কর। মানুষের চোক না দেখিলে তাহাকে চেনা যায় না।”
রাত্রে যাহা দেখিয়াছিলাম, সেই উজ্জ্বল চক্ষুদ্বয় দেখিয়া যে অবস্থা হইয়াছিল সে সম্বন্ধে ডিটেক্টিভ অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিল। পরিশেষে কহিল, “আমরা ইহাতে কিছু করিতে পারি না।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কেন ? যে চুরী আর কেহ ধরিতে পারে না সেই চুরী ধরাই ত তোমার ব্যবসা।”
ডিটেক্টিভের দুটি দাঁত বাহির হইল। কহিল, “চুরী হইলে ত। এ চুরী নয়।”
আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে কি ?”
“বাহাদুরী।”
“সে কী ?”
ডিটেক্টিভ বাম হস্তে দক্ষিণ হস্তের দুই অঙ্গুলি রাখিয়া ধীরে ধীরে কহিতে লাগিল, “আপনারা একটু বিবেচনা করিয়া দেখুন। এ সহজ কৌশলের চুরী নয়। যখন চুরী কোন মতে সম্ভব নয় তখন চুরী হইল। আপনি জাগিয়া ছিলেন আপনাকে কোন কৌশলে ঘুম পাড়াইয়া রাখিল। আপনার সঙ্গীরও সেই দশা। যে নোটের তাড়ার জন্য আপনি বড় ভীত সেই নোটের তাড়া গেল। আপনার সঙ্গী যে বাক্সটির জন্য ভয়ে সারা সেই বাক্সটী গেল। আপনার ঘড়ী, খুজরা টাকা, আপনার সঙ্গীর ঘড়ী কিছু গেল না। চেন জোড়া লইল সেটা যেন তামাসা করিবার জন্য। এমন সুবিধা পাইয়া কোন চোর দুটা দুটা ঘড়ী রাখিয়া যায় ?”
আমি এ কথা গুলা আগে ভাবি নাই। এখন নিরুত্তর হইলাম। ডিটেক্টিভ বলিতে লাগিল, “যার চোকে চসমা ছিল আমারও তাহাকেই সন্দেহ হইতেছে, কিন্তু তাহাকে চিনিবার কোন উপায় নাই।
বোধ হয় চুরী করা তাহার কাজ নয়। আর যদি এ রকম চুরী করে তবে তাহাকে কোন কালে কেহ ধরিতে পারিবে না। যদি ব্যাঙ্কে আপনার নোট ভাঙ্গাইতে যায় কিম্বা চসমা পরিয়া কেবল রেলে বেড়ায় তাহা হইলেই ধরা পড়িবে। কিন্তু তাহাকে এমন বোকা বোধ হয় না।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে তুমি চেষ্টা করিবে না ?”
ডিটেক্টিভ বলিল, “চেষ্টা অবশ্যই করিব, কিন্তু আপনাকে কোন আশা দিতে পারি না। আমাকে নিযুক্ত করিয়া আপনাদের কোন লাভ হইবে না।”
আমরা হতাশ হইয়া বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম।

------ পঞ্চম পরিচ্ছেদ ------

সংবাদ পত্রে এই ঘটনা নানা রূপ অলঙ্কার বিশিষ্ট হইয়া প্রকাশিত হইল। আমি প্রকৃত ঘটনা একখানি পত্রে লিখিয়া পাঠাইলাম, কেবল যে টুকু সাধারণের বিশ্বাসযোগ্য নহে তাহাই গোপন করিলাম। নোটগুলা যে আর কখন পাইব সে আশা কিছু মাত্র ছিল না।
দুই মাসের বিদায় লইয়া বাড়ী আসিয়াছিলাম। দুই মাস দেখিতে দেখিতে গেল। আমি কর্মস্থানে ফিরিবার উদ্যোগ করিলাম। দুই বৎসর পূর্ব্বে যেমন রিক্ত হস্তে গৃহত্যাগ করিয়াছিলাম এখনো সেইমত বাহির হইলাম। রাত্রি দশটার সময় গাড়ীতে সেই রাত্রের সমস্ত বৃত্তান্ত মনে পড়িতে লাগিল। দুই মাস ভাবিয়া আমি কিছুই ঠিক করিতে পারি নাই। কেবল সেই ডিটেক্টিভের কয়টি কথা মনে পড়িত – চুরী নয় বাহাদুরী।
দ্বিতীয় দিবস সন্ধ্যার সময় গাড়ী বদল হয়। আমি নূতন গাড়ীতে উঠিতে গেলাম। দেখিলাম গাড়ীতে বড় ভিড়, একখানি গাড়ীতে কেবল একজন লোক, আর কেহ নাই। আমি সেই গাড়ীতে উঠিলাম।
সে লোকটী মুখ ফিরাইয়া বসিয়াছিল। আমাকে উঠিতে দেখিয়া ফিরিয়া চাহিল। আমি আর এক বেঞ্চে গিয়া বসিলাম। অপর ব্যক্তি আবার অন্য দিকে মুখ ফিরাইল। সে পর্য্যন্ত আমি তাহার মুখ দেখি নাই। তাহার অবয়ব দেখিয়া বোধ হইল যেন তাহাকে পূর্ব্বে কোথাও দেখিয়াছি। কোথায় দেখিয়াছি মনে করিতে লাগিলাম।
সে আবার ফিরিয়া চাহিল। দেখিলা যুবা পুরুষ। অকস্মাৎ স্মরণ হইল যে ব্যক্তি লোকনাথ বাবু ও আমার সঙ্গে এক ষ্টেশন আসিয়াছিল সেও এইরূপ যুবা পুরুষ। অলক্ষিতে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম। মনে মনে সন্দেহ হইবা মাত্রই শরীর কন্টকিত হইয়া উঠিল।
যুবক আমার দিকে ফিরিয়া বসিল। চক্ষে চসমা নাই। আমি তাহার চক্ষের প্রতি লক্ষ্য করিতে লাগিলাম। তখন সন্ধ্যা হইয়াছে, গাড়ীর বাহিরে অন্ধকার হয় নাই, গাড়ীর ভিতরে আলোক জ্বলিতেছে।
যুবকের চক্ষু দীর্ঘ, দৃষ্টি শান্ত। চক্ষের পাতা কিছু ভারি। আর কিছু লক্ষ্য করিতে পারিলাম না। আমি এক দৃষ্টে তাহার প্রতি চাহিয়া আছি এমন সময় সে আমার মুখের দিকে চাহিল। আমি কিছু অপ্রতিভ হইয়া চক্ষু নত করিলাম।
যুবক আমায় জিজ্ঞাসা করিল, “মহাশয় কোথায় যাইবেন ?”
আমি আবার বিস্মিত হইলাম। এ স্বর কোথায় শুনিয়াছি না ? বলিলাম, “ফরাক্কাবাদ।”
যুবক একবার আমার প্রতি কটাক্ষ করিল। বলিল, “ফরাক্কাবাদ ? সম্প্রতি সেখানে একটা আশ্চর্য্য ঘটনা ঘটিয়াছিল না ?”
আমি যুবকের প্রত্যেক কথা, প্রত্যেক কটাক্ষ লক্ষ্য করিতেছিলাম। বলিলাম, “ফরাক্কাবাদ নয়। ফরাক্কাবাদের একজন লোকের রেলে চুরী গিয়াছিল।”
যুবক বলিল, “হাঁ, মনে পড়িয়াছে। আপনি অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনেন ?”
“অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আমারই নাম।”
যুবক আমার দিকে ভাল করিয়া চাহিল। আমার বোধ হইল তাহার চক্ষু পূর্ব্বাপেক্ষা উজ্জ্বল হইয়াছে।
যুবক জিজ্ঞাসা করিল, “এ পর্য্যন্ত চুরীর কোন সন্ধান পাইয়াছেন ?”
“কিছু মাত্র না।”
“পাইবার কোন আশা আছে ?”
“কোন আশা নাই।”
“কেন ?”
“এ রকম চোর ধরা যায় না।”
যে যুবক লোকনাথ বাবু ও আমার সঙ্গে গাড়ীতে উঠিয়াছিল সে রঙ্গপ্রিয়, চঞ্চল, এ ব্যক্তি গম্ভীর, মুখে হাসি নাই। তাহাকে দেখিয়া আমার মনে শঙ্কা হইয়াছিল, ইহাকে দেখিয়া কোন শঙ্কা হয় নাই। তথাপি আমার বোধ হইতেছিল এ দুইজন একই ব্যক্তি।
আমার কথা শুনিয়া যুবক যেন একটু হাসিল, কহিল, “পুলিসে কিছু করিতে পারিল না ?”
আমি বলিলাম, “পুলিসের সে ক্ষমতা নাই।”
যুবক জিজ্ঞাসা করিল, “সংবাদ পত্রে যাহা প্রকাশিত হয় সে মতই কি আনুপূর্ব্বিক ঘটিয়াছিল ? না আপনি কিছু অপ্রকাশিত রাখিয়াছে্ন ?”
এ কথার উত্তর দিব কি না মনে করিয়া আমি একটু ইতস্ততঃ করিতে লাগিলাম। যুবক বুঝিতে পারিয়া বলিল, “অপরিচিত ব্যক্তিকে সব কথা বলিতে পারা যায় না। যদি কোন কথা গোপনীয় থাকে ত প্রকাশ করিবার আবশ্যক নাই।”
আমি বলিলাম, “গোপনীয় কিছু নাই। যে কথা আমি গোপন রাখিয়াছি তাহা সকলে বিশ্বাস করেনা, আমিও এ পর্য্যন্ত কিছু বুঝিতে পারি নাই।”
যুবক সে কথা ছাড়িয়া দিল। কহিল, “আপনার সঙ্গে গাড়ীতে আর কে ছিলেন ?
আমার একজন আত্মীয় – লোকনাথ বাবু ।“
“বড় ধনী ?”
“হাঁ ।“
“কৃপণ ?”
“লোকে বলে বটে।”
“তাঁহার কি চুরী গিয়াছিল ?”
“দুই হাজার টাকার গহনা ।“
“আপনার কত গিয়াছিল ?”
“দশ হাজার টাকা – আমার সর্ব্বস্ব।”
যুবক আমার প্রতি চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কি সর্ব্বস্বান্ত হইয়াছেন ?”
আমি বলিলাম, “দুই বৎসরে যাহা উপার্জ্জন করিয়াছিলাম তাহা সমুদয়ই গিয়াছে। আমার কিছুই নাই।”
যুবক আমার প্রতি চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “নোটের নম্বর আপনার কাছে আছে ?”
আমি বিস্মিত হইয়া কহিলাম, “আছে।”
যুবক জিজ্ঞাসা করিল, “সে রাত্রে আপনাদের গাড়ীতে তৃতীয় ব্যক্তি কেহ ছিল ?”
আমি কহিলাম ,”একজন লোক এক ষ্টেশন আমাদের গাড়ীতে আসিয়াছিল। তাহার পর আর কেহ ছিল না।”
“লোকটি দেখিতে কী রকম ?”
“চোকে চসমা পরা, দেখিতে অনেকটা আপনার রকম।” এই বলিয়া আমি যুবকের মুখ দেখিতে লাগিলাম।
সে ভ্রু কুঞ্চিত করিল। কহিল, “আপনার ভ্রম হইয়াছে। আপনি যাহাকে দেখিয়াছিলেন সে আমি নই। আমি তাহাকে চিনি।”
এবার আমি কুতুহল সম্বরণ করিতে পারিলাম না, আগ্রহাতিশয়ে জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে ব্যক্তি কে ? তাহার নাম কি ?”
যুবক উত্তরে কেবল কহিল, “রাত্রে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল অবিকল বর্ণনা করুন।”
আমি সব কহিলাম, পরিশেষে জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে লোকটি কে ?”
যুবক কহিল, “তাহা বলিতে পারিব না। কিন্তু আপনার টাকা চুরী যায় নাই। আপনি টাকা ফিরিয়া পাইবেন।”
আমি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলাম, “মহাশয় এ পর্য্যন্ত আপনার নাম শুনিতে পাইলাম না ?”
যুবক কহিল, “নাম শুনিলেও আমার পরিচয় পাইবেন না। আমাকে অপরিচিতই বিবেচনা করুন ।”
এই কথা শুনিয়া আমার নানা সন্দেহ হইতে লাগিল। এ ব্যক্তি আপনার নাম গোপন করিতেছে কেন ? এত কথা বলিয়া আত্ম পরিচয় দিতে কুন্ঠিত হয় কেন ? আমি আমার টাকা ফিরিয়া পাইব এ কথাই বা কেমন করিয়া বলিতেছে ?
কিছু পরে একটা বড় ষ্টেশনে গাড়ী লাগিল। আমি কোন প্রয়োজনে গাড়ী হইতে নামিলাম। একটু পরে ফিরিয়া আসিয়া দেখি সে যুবক আর গাড়ীতে নাই। ষ্টেশনে খুঁজিলাম, সব গাড়ীতে খুঁজিয়া দেখিলাম, কোথাও কোন সন্ধান পাইলাম না। ষ্টেশনে কত লোক যাইতেছে, কত লোক আসিতেছে কে তাহার খবর রাখে ?
রাত্রে চক্ষে নিদ্রা আসিল না। রাত্রি অনেক হইল তথাপি নিদ্রার লেশমাত্র নাই। আমার সঙ্গী যাহা যাহা বলিয়াছিল সব কথা ভাবিতে লাগিলাম। সে যেরূপে অদৃশ্য হইল তাহাতে আরো অনেক ভাবনা বাড়িল।
অকস্মাৎ উঠিয়া বসিলাম। যে রাত্রে নোট গুলা চুরী যায় সেই রাত্রে যেমন শরীর অবসন্ন হইয়াছিল এখনো সেরূপ বোধ হইতে লাগিল। মনে অত্যন্ত ভয় হইল, গাড়ীর ভিতরে চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম – কোথাও কিছু নাই। ক্রমে শরীর অবশ হইয়া পড়িল, আর বসিয়া থাকিতে পারিলাম না। চক্ষু মুদ্রিত করিলাম। বোধ হইতে লাগিল যেন কেহ আমায় ধীরে ধীরে স্পর্শ করিতেছে। ললাটে যেন অঙ্গুলি স্পর্শ অনুভব করিতে লাগিলাম। মুখে যেন কাহার নিশ্বাস লাগিতে লাগিল। চক্ষু খুলিয়া যে দেখিব সে সাধ্য নাই। কয়েক মুহূর্ত্ত পরে নিদ্রা আসিল, গভীর নিদ্রায় মগ্ন হইলাম।
নিদ্রাভঙ্গ হইলে দেখিলাম প্রভাত হইয়াছে, পূর্ব্ব দিকে সূর্য্যের আভা দেখা যাইতেছে। আমি চক্ষু মুছিতে মুছিতে উঠিয়া বসিলাম। বসিলে বোধ হইল যেন বুকে কি বাঁধা রহিয়াছে। বুকে হাত দিয়া দেখিলাম উঁচু মতন যেন কি ঠেকিল। নোট নহে ত ?
নিমেষের মধ্যে অঙ্গবস্ত্র খুলিয়া ফেলিলাম – দেখিলাম আমার সেই রেশমের রুমালে যেমন করিয়া আমি বাঁধিয়া রাখিয়াছিলাম সেই রকম নোটের তাড়া বাঁধা রহিয়াছে! খুলিয়া গণিয়া দেখিলাম, নোটের নম্বর মিলাইয়া দেখিলাম, সব ঠিক আছে। যেমন টাকা তেমনি ফিরিয়া পাইলাম।
ফরাক্কাবাদে পঁহুছিয়া কাহাকেও কিছু বলিলাম না। যে কথা শুনিয়া সকলে হাসিবে সে কথা না বলাই ভাল। নোটগুলি রেজিষ্টরি করিয়া মার কাছে পাঠাইয়া দিলাম।
কয়েক দিন পরে লোকনাথ বাবুর একখানি পত্র পাইলাম। তিনি লিখিতেছেন, “বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিয়াছে। পরশু রাত্রের গাড়ীতে আমি বাড়ী যাইতেছি, পথে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। ঘুম ভাঙ্গিয়া দেখি যে গহনার বাক্স চুরী গিয়াছিল সেই বাক্স আমার শিয়রে রহিয়াছে। তাহার কাছে নীল রংএর এক জোড়া চসমা। যে বাক্স ফিরাইয়া দিয়াছে তাহাকে আমি দশ টাকা পুরস্কার দিতে স্বীকার করিয়াছি, কিন্তু কেহই সে পুরস্কার লইতে আসে নাই। চসমা জোড়া কি করিব বুঝিতে পারিতেছি না। গহনা গুলা পাইলাম ভাল হইল। আমার কন্যার জন্য নূতন গহনা গড়াইতে হইবে না।”

( ‘ভারতী ও বালক’ মাসিক পত্রিকা, বৈশাখ ১২৯৪ সংখ্যা থেকে দীপক সেনগুপ্ত কর্তৃক সংকলিত।)

নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত

 

নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত খুব অল্পই রহস্যকাহিনি লিখেছেন । অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের মতে "...... রহস্যজনক গোয়েন্দা গল্পের যথার্থ স্রষ্টা তাকে বলা চলত যদি তিনি এ পথে থাকতেন। রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি, ভৌতিক আবেশ রচনা ও শেষাবধি কৌতুক নির্মানে সিদ্ধহস্ত লেখক ট্রেনের মধ্যে দুই ভদ্রলোকের চুরি ও গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার একটা ঠাসবুনুনিতে পাঠকদের অভিভূত করে রাখেন।”