রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড

 

 

 

 

 

 

 


 

সাতসুরবায় আধিভৌতিক

(১১)

পিছনের দাওয়ায় বসে ঝিংলি খেলছিল । হঠাৎ একটা ঢ্যাঙা মত লোক তার সামনে হাজির হয়, "ও খুকি তোমার দাদি কোথায়?" ঝিংলি আঙুল তুলে দেখায়। লোকটি হেসে পুণরায় জিঞ্জাসা করে, "খুকি তোমার বাপ ঘরে আছে?" ঝিংলি দুপাশে মাথা নাড়ায়।
"তোমার বাপ তোমাকে দেখতে আসে না?
ঝিংলি উত্তর দেয় না। চেঁচিয়ে ডাকে, "এ্যাই দাদি।"
"কি রে কি হল?" বিমলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটাকে দেখে থতমত খেয়ে যায়, "কাকে চাই?"
"হোতোখোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। সে নেই?"
বিমলা সরু চোখে তাকায়, "সে এখানে থাকে না।"
"থাকে না? আমি যে ওর জন্য একটা কাজের সন্ধান নিয়ে এলাম। মিট্টিবাবু ডেকে পাঠিয়েছিলেন।"
"তুমি কি মিট্টিবাবুর ওখানে কাজ কর ? তোমাকে তো এখানকার বলে মনে হচ্ছে না।"
"এখানকার হতে যাব কেন? আমি কলকাতা থেকে এসেছি। মিট্টিবাবুর অফিসেই কাজ করি।"
"ও।" বিমলা খানিকটা আশ্বস্ত হয়। "হোতোখো এখানে খুব কম আসে। এলে বলে দেব।"
"ওকে অন্য কোথাও পাওয়া যাবে?"
"মদমাতাল লোক দেখগে ভাটিখানায় পড়ে আছে।" কি মনে হতে বিমলা জিঞ্জাসা করে, "শোনো, মিট্টিবাবুর কাজ আমায় দিয়ে চলবে?"
লোকটি বিমলার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর সুর করে বলে, "মেয়েছেলে তো। সাহেব রাখবে না।"
বিমলা রেগে যায়। "আচ্ছা তুমি এস এখন। হোতোখো এলে বলে দেব।" তারপর দুম্দাম্ পা ফেলে ঘরে ঢুকে পলিথিনের ঝাঁপ ফেলে দেয়। লোকটি এবার ঝিংলির কাছে যায়।
"ও খুকি কি খেলছ?"
"আক্কোশ আক্কোশ।"
"রাক্ষস খেলছ তো তোমার মুখোশ কোথায়?"
"এই তো," ঝিংলি পাশে পড়ে থাকা একটা পুরোনো ছেঁড়া মুখোশ দেখায়।
"ও খুকি ওটা কি দেখি, আমার হাতে দাও তো। আর হঁযা ওটাও দাও।"
ঝিংলি মুখোশের পাশে পড়ে থাকা জিনিসদুটো তার হাতে তুলে দেয়। লোকটি ঝিংলির কানে কানে বলে, "এ দুটো আমায় দেবে?"
"না," ঝিংলি বেশ জোর গলায় বলে ওঠে।
লোকটি নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখে, "চুপ চুপ। এ দুটো আমায় দিলে তোমায় চকলেট দেব। খেয়ে দেখ কি ভাল খেতে।"
ঝিংলি ভয়ে ভয়ে একটা চকলেটের রাংতা খুলে মুখে দেয়। গোটা মুখে মিষ্টি স্বাদ ছড়িয়ে পড়তে খুব খুশী হয়। এমন জিনিস কোনদিন খায়নি। ইস্ কি বোকা সে। এতবড় একটা কামড় দিয়ে ফেলেছে। একবারে কতটা শেষ হয়ে গেল।এখন থেকে একটু একটু করে খাবে। লোকটি দ্বিতীয় চকলেটটা বাড়িয়ে ধরে, "এই নাও এটাও তোমার।" ঝিংলি ফোকলা দাঁতে হাসে।
"দাদিকে যেন বোলো না এগুলো আমায় দিয়েছ।" ঝিংলির তখন উত্তর দেওয়ার অবস্থা নেই। পরম আনন্দে চকলেটের মণ্ড জিভে বুলিয়ে চলেছে।

(১২)

মিট্টিবাবু

যারা বলেন সারমতী আর জাপভো ছাড়া কোহিমায় অন্যান্য জায়গা তেমন আহামরি কিছু নয় তাদের সকলকে আমি সাতসুরবায় আমন্ত্রণ জানাই (কাউকে থাকতে দেওয়ার ক্ষমতা অবশ্য আমার নেই)। পাথর চেনার অপূর্ব ব্যবস্থা প্রকৃতি এখানে করে রেখেছে। গ্র্যানাইট, শিস্ট, স্লেট, নাইস - পাথরগুলি বিভিন্ন স্তরে সাজানো। দূর থেকে দেখেও তাদের আলাদা করা যায়। বইয়ের তাকে কতগুলি বিভিন্ন রঙের বই পরপর সাজিয়ে রাখলে যেমন দেখায় ঠিক তেমনটি। আজ চাঙ্কিকে নিয়ে যে জায়গায় এসেছি সেটা সাতসুরবার জাপভো অর্থাৎ সবচেয়ে উঁচু পয়েন্ট। একটু বেলা করে বেরিয়েছিলাম। টপ পয়েন্টে বসে লাঞ্চ সেরে নিয়েছি। সামন্য খাবার, রুটি তরকারি আর ফল। আমি আবার ফিল্ডে ভাত একদম খেতে পারি না, ভীষণ ঘুম পায়। চাঙ্কি ভাতই খেল। এরা হাড়িয়া খেয়ে পাহাড়ে উঠলেও আমার থেকে আগে উঠবে। কি অবলীলাক্রমে উঠে যায়! ঠিক ছাগলের মত, টুক্টুক্ করে স্বাভাবিক গতিতে। মনে হয় যেন সমভূমিতে হাঁটছে। রাস্তার একধারের জঙ্গলে কাজ শেষ করতে সাড়ে চারটে বেজে গেল। অন্যধারে না গেলেও চলত। কিন্তু একটা জিওলজিক ফিচারের কন্টিনিউশন দেখার জন্য আজই যাওয়া দরকার। কাল এলে হয়ত খেই হারিয়ে ফেলব। আসল জায়গায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে পৌনে ছটা বেজে গেল। চারিদিক বেশ অন্ধকার হয়ে আসছে। চাঙ্কি বলে ওঠে, "শাব ওই দেখ, আকাশ কালো হয়ে উঠেছে।" তার কথা শেষ হতে না হতেই কোথায় বাজ পড়ল। বললাম, "তাড়াতাড়ি পা চালা।" ততক্ষণে ঝড় শোঁ শোঁ আওয়াজে ফুঁসতে শুরু করেছে। একে তো উঁচুনিচু জমি তার উপর হাওয়ার দাপট। রাজ্যের শুকনো পাতা উড়ে এসে চোখেমুখে পড়ছে, ছোটছোট নুড়ি পাথর এদিক ওদিক থেকে ছিটকে আসছে। আমি দু দুবার হড়কলাম, চাঙ্কি একবার হড়কাতে হড়কাতে নিজেকে সামলে নইযেছে। ঝড়, পাতা আর পাথরের সঙ্গে যুধ করতে করতে আমরা একসময় পথ হারালাম। ততক্ষণে জঙ্গলে রাত শুরু হয়ে গেছে।

ডিজে-পারভেজ

"চামখা ফাঁসাবে না তো?"
"এর আগে তো কখনো ফাঁসায়নি।"
"একটা ব্যাপারে শক হচ্ছে।ও যেদিন ছাড়া পেল সেদিন সন্ধ্যায় তোর কাছে গেল। এর মধ্যে মেয়ে জোগাড় করল কি করে?"
"আগে থাকতে ঠিক করা ছিল হয়ত। কদিন থানায় থেকে শালার হাত খালি হয়ে গিয়েছে। চটজলদি সব ইন্তজাম করে ফেলেছে ।"
"তা হবে। তবে দামাং এ ছেলেটাকে বিশেষ রিলাই করত না।"
"ওর কথা ছাড়ো তো বস। তোমার কাছে যা পেত তার টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্টও ওকে দিত না।"
"খবরদার, দামাং এর প্রিভিয়স পেমেন্ট যেন ওর কাছে ফাঁস না হয়।"
"না না কি যে বলো। আররে, ওটা কে?"
"কোথায়?"
"আরে ওই যে। জঙ্গলের ধারে একটা মেয়েছেলে দাঁড়িয়ে আছে না?ওই দেখ হাত নাড়ছে।"
"ও কি চামখার মাল? বাস গুমটি এখন অনেক দূরে।"
"বোধহয় অসুবিধা ছিল যেতে পারেনি। ওর কাছে তো আর মোবাইল নেই।"
"কিন্তু চামখা কোথায়?"
"ভেতরে কোথাও আছে হয়তো ।ওই যা মেয়েটা ভেতরে ঢুকে গেল যে।"
"ঠিক ওই স্পটে গাড়ি থামা। আমি গিয়ে নিয়ে আসছি।"
"তুমি কেন যাবে বস? আমি যাচ্ছি।"
"যা বলছি তাই কর পারভেজ । হেড লাইট অন্ করবি না।"
পারভেজ মনে মনে গালি দেয়, "শাল্লা। ভাবছে আমি গেলে টাকার অঙ্কটা জেনে যাব। ঠিক আছে দেখে নেব।"

মিট্টিবাবু

"কি রে পথ চিনতে পারছিস?"
চাঙ্কি দিশেহারা হয়ে বোলে, "না শাব। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।"
আমি বলি, "চল, নাক বরাবর এগিয়ে চল।"
কতটা এগিয়েছি খেয়াল নেই, হঠাৎ শুনি আর্তচীৎকার,"ডাইন ডাইন!"
আমাদের পা যেন আটকে গেছে। কোনরকমে চাঙ্কিকে জিঞ্জাসা করি, "শুনলি কে যেন চীৎকার করছে।"
"শাব আর এগিও না, সামনে বিপদ।"
"কি বলছিস তুই? কেউ বিপদে পড়েছে হয়ত। চল শিগ্গিরি যাই।"
"না শাব এখানে থাকো।"
"তুই থাক আমি দেখছি।" চীৎকার লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ হুড়্মুড়্ করে কে যেন গায়ের উপর পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে জাই। সাথে সাথে টর্চের আলো জ্বলে উঠল।
"কেউ এক পাও নড়বে না।" আরে এ তো ইন্সপেক্টর দত্তের গলা। টর্চের আলোয় আরেকটি বীভৎস দৃশ্য চোখে পড়ল। যাকে নিয়ে পড়েছি সে একটা আস্ত মেয়েমানুষ, সাদ শাড়ি পরা। ইন্সপেক্টর দত্ত ততক্ষণে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এতক্ষণে আমি কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়েছি, "এই তাহলে ডাইন?"
"ডাইন নয়। ডাইনের মা। তবে আসল কালপ্রিট ওখানে পড়ে আছে।"
দূরে একটা লোক উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পিঠে ছোরা গাঁথা। তাকে সোজা করতেই অাঁতকে উঠলাম,
"গুড়ুং সিং!"
মিস্টার দত্ত বললেন, "ওরফে ডিজে, ওরফে বস। এসে এক্ষুণি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পথে আপনাদের গাড়ির কাছে নামিয়ে দেব।"

(১৩)

সকালবেলায় বসে চা খাচ্ছি একটি পুলিশের জীপ এসে তাবুর বাইরে থামল। ইন্সপেক্টর দত্ত জীপ থেকে নেমে এলেন।
"আসুন মিস্টার দত্ত। চাঙ্কি আর এক কাপ চা দে।গুড়ুংয়ের অবস্থা কেমোন?"
দত্ত বললেন, "ভাল না। ডিপ ইনজিওরি। আর একদিন না কাটলে বলা যাচ্ছে না। তবে হাসপাতালে যাওয়ার আগে সব দোষ স্বীকার করে গেছে।"
"পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুন প্লিজ।"
দত্ত হেসে উঠলেন, "আরে সেটা বলার জন্যই তো এখানে আসা। তবে আরো একটি স্বার্থ আছে। তার আগে গল্পটা বলি।"
আমি, ধিলোঁজি আর চাঙ্কি ওঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসলাম। "গোটা ব্যাপারটায় একজন নয় দুজন খুনী। তাদের দুজনকেই আপনারা দেখেছেন। প্রথমজন গুড়ুং সিং, প্রাক্তন মিলিটারি ম্যান। বর্তমানে ব্যবসায়ী হলেও আসলে সে একটি ফ্লেশ ট্রেডার। গরীব মেয়েগুলোকে ধরে ইণ্ডিয়া, মায়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় চালান করত। তার ডানহাত বাঁহাত দামাং আর পারভেজ। এরা তিনজন মিলে মেয়ে আর আর্মস কেনাবেচা করত। অপরজন নারোলার মা বিমলা। আপনার ড্রাইভার প্রকাশ সিং গুড়ুংয়ের গাঁয়ের লোক। সে ওর কাজকারবার খানিকটা জানত। নারোলা অন্তঃস্বত্তা জেনে প্রকাশ পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে সে গুড়ুংকে নারোলার কথা জানায়। গুড়ুং এর সুযোগ নেয়। প্রকাশ পালিয়ে গেলে নারোলার কাছে রকিকে পাঠায়। বলে প্রকাশ তার জন্য কোহিমায় অপেক্ষা করছে। নারোলা রকির কথা বিশ্বাস করে। যেদিন নারোলা ঝগড়া করে হোতোখোর বাড়ি ছাড়ে সেদিন সে তার পরনের কাপড়খানা পাহাড়ের ওপর থেকে ছুঁড়ে দেয়। তারপর ঘুর পথে বিমলার কাছে আসে। তাকে জানায় রাতেই সে প্রকাশের কাছে পালিয়ে যাবে। বিমলার খারাপ লাগলেও সে নারোলাকে সাপোর্ট করে। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল এরপর নারোলার গ্রামে টেকা মুস্কিল হবে। সেদিন সন্ধায় যখন গোটা গ্রাম প্রকাশকে খুঁজতে ব্যস্ত সেই সময় একটি গাড়ি এসে বিমলার বাড়ির সামনে এসে থামে। গাড়িতে ছিল রকি, দামাং এবং ছদ্মবেশে গুড়ুং সিং। গাড়ি কিছু দূরে যেতেই ওদের কথাবার্তা শুনে নারোলা বুঝল তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে চীৎকার করে গাড়ি থামাতে বলেছিল। ফলতঃ তাকে স্ট্যাব করে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। নারোলা গুরুতর আহত অব্স্থায় তার মায়ের কাছে আসে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়।- এখানে কাহিনীর টুইস্ট হল। আঙ্গামী মেয়েরা আর পাঁচটা শহুরে মেয়ের মত হয় না। সন্তানের মৃত্যুতে বিমলা প্রতিশোধপরায়ণা বাঘিনীর মত হয়ে উঠল। পণ করল শয়তানগুলোকে একটা একটা করে শেষ করবে। মেয়ের মৃতদেহটা সে ঘরের সামনে পুঁতে দেয়। সে ঝাড়ফুঁক, ডাকিনী মন্ত্র জানত, বিশ্বাস করত। পুলিশের কাছে সে জানিয়েছে মেয়ের আত্মা স্বপ্নে তাকে প্রতিশোধ নিতে বলত। এরপর সে ভূতনীর বেশ ধরে রকিকে মরে। মা ও মেয়ের চেহারায় প্রচুর মিল থাকায় রকি তাকে চিনতে পারেনি। ভিক্টিমের ওপরে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলায় তার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করত। তারপর বাঘ নখ দিয়ে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে রক্ত বের করত। সেই রক্ত মেয়ের আত্মার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত।"
আমি শিউরে উঠি, "কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ! আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।"
দত্ত বলেন, "কাঁটা দেওযার মতই ব্যাপার। এসব কাহিনী শহরের ঝলমলে আলোয় শুনলে বোধহয় আজগুবি বলে উড়িয়ে দেবেন। যাইহোক, এইভাবে সে রকি আর দামাংকে হত্যা করল।"
ধিলোঁ জিঞ্জাসা করে, "অউর প্রকাশ? উসকো ভি ক্যা ইসনেহি মারা হ্যায়?"
" প্রকাশকে মেরেছে গুড়ুং। প্রকাশের আসার খবর শুনে সে ভয় পেয়ে যায়। কারণ প্রকাশ তার ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে ফেলেছিল। - সেদিন আপনাদের গাড়িটা আসলে স্যাবোটাজ করা হয়েছিল। গুড়ুং এর গ্যারাজে তারগুলো শর্ট সার্কিট করানো হয়। গোটা ইঞ্জিন বিকল হওয়ার অগে গাড়িটা তাঁবুতে পৌছায়। পরেরদিন স্টার্ট করার আগেই খারাপ হয়ে যায়। গুড়ুং তার গাড়িতে প্রকাশকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের শুনশান জায়গায় মার্ডার করে।"
দত্ত জিঞ্জাসা করলেন, "আচ্ছা মিস্টার গুপ্ত সেদিন জঙ্গলে গুড়ুং এর পাশে নকল চুলদাড়ি দেখতে পেয়েছিলেন কি?"
আমি মনে করার চেষ্টা করি, "ঠিক খেয়াল করতে পারছি না।"
"দ্যাটস ওকে। গুড়ুং কিন্তু ছদ্মনামে এবং ছদ্মবেশে বেআইনী ব্যবসা চালাত। তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা তাকে ডিজে অথবা বস বলে জানত। ওই নকল চুলদাড়ি পরে সে ষাটোর্দ্ধ লোক সাজত। কয়েকদিন আগে রীটা নামের এক কলগার্লকে সে হত্যা করে। এ মেয়েটি আবার দামাং এর ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে গুড়ুংয়ের খপ্পরে পড়েছিল। কদিন ধরেই টাকাপয়সার বখরা নিয়ে গুড়ুং আর দামাং এর মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল। দামাংকে মারতে গুড়ুং এই মেয়েটাকে ব্যবহার করতে চায়। তবে মেয়েটি মারার আগেই বিমলার হাতে দামাং খুন হয়।"
"পরশু সন্ধ্যায় আপনি ওই স্পটে পৌঁছালেন কি করে?"
"ব্যাপারটা খুব সিম্পল। চামখাকে কাজে লাগালাম। ইনভেষ্টিগেশনের স্বার্থে স্পেশাল ইস্যুতে ওকে জামিনে ছাড়া দিই। আমার কথামত ও দামাং এর আড্ডায় যায়। পরশু রাতে ওর বাড়িতে ডিজের আসার কথা ছিল। সেখানে এলে বোধহয় এই আক্রমণ এড়ানো যেত।বদলে পারভেজ সেখানে যায়। চামখা ডিজের সাথে ডাইরেক্ট ডিল করার ফাঁদ ফেলে। তবে সেদিন পুলিশ ছাড়াও আরো একজন তার বাড়ি গিয়েছিল। সে হল বিমলা। চামখার বউয়ের অনুরোধে সে ঝাড়ফুঁক করতে গিয়েছিল। সেই একই দিন সকালে হোতোখোর খোঁজ করতে বিমলার আস্তানায় যাই। সেখান থেকে দুপাটি নকল দাঁত ও একটা বাঘনখ উদ্ধার করি। এই বাঘনখে রক্তের ছিটে লেগেছিল। কোহিমা থেকে আসা ফরেনসিক রিপোর্ট জানাচ্ছে সেই রক্ত আর দামাং এর রক্ত একই ব্লাডগ্রুপের।"
"চামখার বাড়িতে ঝাড়ফুঁক করতে গিয়ে পারভেজের মুখে ডিজে নামটা শুনে বিমলা কান পেতে ওদের সব কথা শোনে। সেই একই নাম সে তার মেয়ের মুখে শুনেছিল। প্রস্তুত হয়ে পরদিন রাতে সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের লোক ডিজের গাড়ি ফলো করছিল। হঠাৎ গাড়ি থামাতে দেখে খবর দেয়। তবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ব্যাপারটা অনেকদূর গড়িয়ে যায়।"
"রকি ও দামাংকে খুন করার কথা বিমলা স্বীকার করেছে?"
"সেদিন রাত্রে সে অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় ছিল। পরদিন সুস্থ হয়ে সব কথা স্বীকার করেছে।"
জিঞ্জাসা করি, "বিমলার কি কোন শাস্তি হবে?"
"তাতো হবেই। চেষ্টা করব যাতে মৃত্যুদণ্ড না হয়। ও যা করেছে জঙ্গলের আইন অনুসারে সেটাই সঠিক। আমাদের অইন ওদের সাথে মেলে না।"
চাঙ্কি বলল, "হোতোখোর মেয়েটা ওর সাথে থাকত শাব। ওর কি হবে?"
দত্ত হাসেন, "সেকথা বলতেই এখানে আসা। তোমাদের শাবের কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।"
আমি বললাম, "কি ব্যাপার বলুন তো?"
"গতকাল সকালে হোতোখো এসেছিল। খুব কান্নাকাটি করছিল। সে কথা দিয়েছে আর মদ ছোঁবে না। বাচ্চাটাকে মানুষ করবে। আপনি ওকে একটা সুযোগ দিন।"
"ঠিক বুঝলাম না।"
"ওর পুরোনো কাজটা ফিরিয়ে দিন। নয়ত মেয়েটা ভেসে যাবে। গাওবুড়াও একই অনুরোধ করেছেন।"
ইন্সপেক্টরের কথা শুনে চাঙ্কি তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, "তাহলে আমার কি হবে শাব। আমার চাকরি তো থাকল না।"
আমি গম্ভীর হওয়ার ভাণ করি, "তাও তো ঠিক। চাঙ্কিকে তো আর ওমনি ওমনি ছাড়ানো যায় না।"
ইন্সপেক্টর দত্ত একটু মিইযে যান, " তাও ঠিক। সরি মিষ্টার গুপ্ত।"
ওনার মুখের চেহারা দেখে আমি হেসে প্হেলি, "দুঃখ পাবেন না স্যার। আপনাকে এই জনহিতকর কাজ থেকে বঞ্চিত করতে পারব না। হোতোখো এখানে থাকবে।"
চাঙ্কি চেঁচিয়ে ওঠে, "আর আমি!"
"তুমি হবে আমার ফিল্ড অ্যাসিসটান্ট আর হোতোখো টেন্ট ম্যানেজার।"
ইন্সপেক্টরের মুখে হাসি ফোটে, "থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ্। হোতোখোকে পাঠিয়ে দিই।"
ধিলোঁ চেঁচায়, "সবকা সব হুয়া। অব মেরে বারে মে কুছ শোচিয়ে।"
ইন্সপেক্টর ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকান, "তুমি বরং ট্রেনের টিকিটটা কেটেই ফেল। স্যারের এখন দু দুটো বডিগার্ড রয়েছে। আর চারপাশে অনন্ত পাহাড়।"

সমাপ্ত

মৈত্রী রায় মৌলিক