রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


এ. মুখার্জী এণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড

 

 

 

 

 

 

 


 

সাতসুরবায় আধিভৌতিক

(১)

"তারপর ধর্মপুত্তুর, চটপট বল তো বাপ খুন করে টাকাটা কোথায় লুকিয়ে ফেলেছ?"
"সত্যি বলছি শাব খুন করিনি। আমি তার স্যাঙাৎ ছিলাম। তাকে মেরে ফেলে আমার কি লাভ?"
"স্যাঙাৎই বটে। দুজনে মিলে গাঁয়ের মেয়েগুলোকে ফুসলিয়ে বাইরে চালান দিতে।"
"না হুজুর ! আমরা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট বিজনেস করতাম।"
"এক চড়ে সামনের দাঁত কটা গুঁড়িয়ে দেব জানোয়ার। এই নিম্বু এটাকে থার্ড ডিগ্রি দে তো।"
"আর মারবেন না হুজুর। দুদিন ধরে না খেয়ে আছি। এক্কেবারে মরে যাব।"
"এই তো! পথে এস চটপট খোলসা করতো বাপধন।"
"হুজুর আমি জেলা শহরে ঘরামির কাজ করতাম। শীতের মাসে হাতে কাজ ছিল না। দামাংকে ধরলাম। এক একটা মেয়ে পিছু দুহাজার ইনকাম। প্রথমটায় মন সায় দেয় নি। পরে ভেবে দেখলাম এতগুলো পেট উপোসী রাখার চেয়ে এ অনেক ভাল। পেটের জ্বালায় ঢুকে পড়েছি।"
"শেষ কবে মেয়ে সাপ্লাই দিয়েছিস?"
"গত সপ্তাহে শনিবার। আমার শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ে থাকে। ওখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে হাতে পায়ে ধরল। একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। দামাংএর গুদাম ঘরে এনে তুললাম। পরের ভোরে মাল পাচার। দামাং পাওনা গণ্ডা চুকিয়ে দিয়েছে।"
"এ পর্যন্ত কটা মেয়ে ওর হাতে তুলে দিয়েছিস?"
"এবারেরটা নিয়ে পাঁচটা।"
"পরে আর কোনদিন তাদের দেখেছিস?"
"কেবল একজনের খবর জানি। কোহিমায় একটা হোটেলে কাজ করে।"
"এখন বল তো এই শনিবার কি ঘটেছিল?"
"আমরা দুজনে নেশা করে বাড়ি ফিরছিলাম। দামাং পেট খালি করতে জঙ্গলে ঢুকল। হঠাৎ শুনি বিকট চিৎকার। জঙ্গলে ঢুকেছি, কে যেন আমায় জোরে ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালাল।"
"সে কে দেখতে পেলি? মেয়েমানুষ না ব্যাটাছেলে।"
"ছেলে-মেয়ে কিছু নয়। সে মানুষই নয় হুজুর।"
"আবার চালাকি হচ্ছে? নিম্বু......"
"বিশ্বাস করুন শাব। ছোটবাবুও আমার কথা শুনতে চাইলেন না। না খাইয়ে ফেলে রাখলেন।"
"কি বিশ্বাস করব বল তো। ভুত এসে দামাংকে খতম করেছে?"
"ভুত নয় শাব ভুতনী। তার চেহারা এখনও চোখে ভাসছে। বড় বড় দাঁত ঠোঁটের কোণ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। আঙ্গুলে ইয়া বড় বড় নোখ। ধাক্কা লাগতে মাটিতে পড়ে গেলাম। সে তেড়ে এল। তারপর আর কিছু মনে নেই।"
"বুঝলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার তো মেলানো যাচ্ছে না সোনা। তোদের দুজনের পকেটে কিছু টাকা ছিল।"
"সেগুলো কোথায় জানিনা হুজুর, সত্যি বলছি জানি না।"
"ফেঁসে গেলি চামখা। টাকার জন্য গুরুকে খুন করলি। ভুতনীর গল্প ফাঁদলি। কিন্তু ভুত তো আর টাকা হাতিয়ে চম্পট দেবে না। নাহ্ তোকে দেখছি থার্ড ডিগ্রী দিতে হবে।"
চামখা কেঁদে ফেলল, "এর বেশী আর কিছু জানিনা, আমায় মেরে ফেললেও বলতে পারব না।"
"তাই! তাহলে ভুতনীর ব্যাপারটা একটু খুলে বল।"
"তার কথা এ গাঁয়ে সবাই জানে হুজুর। গত মাসে রকিকে মেরেছে। এবার দামাংকে মারল। তার আত্মা প্রতিশোধ নিচ্ছে।"
"ইন্টারেস্টিং! প্রতিশোদলিপ্সু আত্মার গল্প। একটু জমিয়ে শোনা দেখি। তারপর ব্যবস্থা করছি। তোর ঘাড় থেকে ভুতনী নামাতে হবে তো। নে শুরু কর।"
"একটু জল খাব শাব।"
"কে আছিস এখানে এক ঘটি জল দিয়ে যা!"

(২)

সত্যি বলতে কি সাতসুরবায় ফিরে আসার ইচ্ছা আমার ছিল না। ছ মাস আগে নাগাল্যাণ্ডের এই অজ গ্রামে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা এখনও ট্রমার মত মাথার কোণে সেঁধিয়ে রয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডার হাতে পাওয়ার পর বসের কাছে ছুটে গিয়েছি, ট্রান্সফারের অ্যাপিলও করেছিলাম, কাজ হয়নি। উপরতলায় কোন শক্ত খুঁটি ধরলে হয়ত স্টে অর্ডার পেতাম। কিন্তু সে সময় আমাকে দেওয়া হয়নি। সাতদিনের মধ্যে ফিল্ড সাইট ভিজিট করার অর্ডার দিয়েছে। এবার আর গ্রামের ভিতরে ক্যাম্প করিনি। আগের বারের গাওবুঢ়াটা মারা গেছে। তার ছেলে এখন গাঁয়ের মাথা। গাঁয়ে ঢুকতে দেয়নি। তবে গাঁয়ের বাইরে ক্যাম্প করার অনুমতি দিয়েছে। শর্ত সেই আগের বারের মত, ইণ্ডিয়ান আর্মির সাথে যোগাযোগ রাখা চলবে না। এবং ওদের লোকেদের কাজ দিতে হবে। শর্তদুটো মেনে নিতেই হবে। আই এন এস কোয়ার্টারে লেফট্যানন্ট কৃপালনীকে বলে রেখেছি, কোনক্রমেই তাঁবুতে এসে যেন আমার হাল হকিকত জানার চেষ্টা না করে। দরকার হলে ফোন করব। আর্মির লোক দেখলেই এরা কোঅপারেশন বন্ধ করে দেয়। কৃপালনী হাসির ছলে বলেছিল, "আগের বারের কথা ভুলে গেলেন স্যার।"

এবারের কাজটা মাসদুয়েকের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। বেশী বেগড়বাঁই না করলে মাস দেড়েকের মধ্যে তাঁবু গোটানোর ইচ্ছা আছে। ভেবেছিলাম টানা দেড়মাস কাজ করব। মানুষ মাথা খাটিয়ে ভাবে আর ঈশ্বর ফিচেল হাসি হাসেন। কাজ শুরু করার দুদিনের মধ্যে আমার প্ল্যানের পিরামিড ধ্বসে গেল। তাঁবুর মাইল খানেক দূরে জীপটা হঠাৎ গোঁত্তা খেয়ে থেমে গেল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, রেডিওর সিগ্ন্যাল নেই। জীপ থেকে বেরোনোর উপায় নেই, ছাতা, বর্ষাতি আনিনি। নয়তো এটুকু পথ হেঁটে যাওয়া যেত।
"ক্যা হুয়া ধিলোঁজি?"
"গড্ডী নহি যায়েগা সাহাব। ট্রান্সমিটার ফ্লুইড লিক হো রহা হ্যায়।"
"ঠিক আছে আমি চাঙ্কিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। মেকানিক নিয়ে এস।"
"ইতনি বারিষ মে কোই নহি আয়েগা। ফৌজি ক্যাম্প তক লেকে যায়েঁ তো কুছ হো সকতা হ্যায়।"
"ও চিন্তা বাদ দাও, দুসরি তরকিব সোচো।"
চাঙ্কি আও যুবক আমাদের কুক কাম ম্যানেজার। সার্ভেন্ট টেন্টে পৌঁছে তাকে ডাকি, "গাড়িটা রাস্তায় খারাপ হয়ে গেছে। শিগগির ধিলোঁর কাছে যা।"
চাঙ্কি গরম জলের পাত্র হাতে বেরিয়ে আসে, "পুলিশ বাবু এসেছে শাব। তোমার ঘরে বসিয়েছি।"
মুখটা নিজের অজান্তে পাঁচের মত হয়ে গেছে টের পেয়ে হাল্কা সুরে বলি, "দুকাপ চা দিয়ে রেখে আয়। কাপড় ছেড়ে যাচ্ছি।"
ফোল্ডিং চেয়ারে বসে বছর চল্লিশের ইন্সপেক্টর। পরাগজ্যোতি দত্ত, ক্রাইম ব্র্যাঞ্চে পোস্টেড। আসামের ছেলে, পরিষ্কার বাংলা বলে। হাসিমুখে পরিচয় দিল। আমার গোমড়া ভাবটা কাটে না, বলি, "সরি মিঃ দত্ত, সাতসুরবায় বসে কোন সরকারী লোকের সঙ্গে কথা বলতে পারব না।"
"তাহলে কাল মোকটচুঙ চলে আসুন।"
"আমার জীপটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে।"
"তাহলে তো আরও ভাল হল। বাসে চলে আসবেন। এখানকার কেউ সন্দেহ করবে না।"
চাঙ্কি দুকাপ চা নিয়ে ঢোকে। "চা খেতে আপত্তি নেই তো।"
"সার্টেনলি নট!" গাল ছড়ানো হাসি।

পরদিন প্রবল বৃষ্টিতে মোকটচুঙের ভাঙা হাটে বেশীর ভাগ দোকান বন্ধ। আমার প্রিয় খাবারের দোকানটি খোলা এই যা সুখের কথা। দোকানের মালিক গুড়ুং সিং একসময় আই এন এস এ ছিল। এছাড়াও তার একটা মোটর গ্যারেজ আছে। আমায় দেখে যথেষ্ট অবাক, "মিট্টি বাবু এখানে যে !" এখানকার লোকজনের মুখে এই নামটি চাউর হয়ে গেছে। এখান ওখান থেকে মাটি পাথর তুলে আনি। এর চেয়ে ভাল নাম আর হতে পারে না।
"জিলিপি খেতে এলাম।"
"এই বারিষে জিলিপি খেতে এদ্দূর এলেন? গাড়ি কোথায়?"
"আপনার শপে।"
"ও! মঙ্গের আগে কেমন ভাসাচ্ছে দেখুন। গরীবগুলোর পেট মারার সুযোগ ভগবানও ছাড়ে না। সারা বছরে দুটো মঙ্গ। বিক্রি বাটা যা হওয়ার এই সময় হয়।"
"কি আর হবে, গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতে হবে।"
"তাতে খাটুনি বেশী আয় কম। অনেক দোকানদার পাহাড় ঠেঙিয়ে ফিরি করতে চায় না। জিনিসপত্রের দাম চড়ায়। গাঁয়ের মানুষ এতটা অzাফোর্ড করতে পারবে না।"
"আপনার দোকান কেমন চলছে?"
"বিশেষ হেরফের নেই। আজ পুরী পনির বানিয়েছি একদম পাঞ্জাবী স্টাইল। চেখে দেখুন।"
"এই সকালে মটর পনীর একটু ভারি হয়ে যায়। জিনিপি সিঙাড়া থাকলে দুটো দিন।"
"এই বিচকি, বাবুকে জিলাবি আর সামোসা দে।"
গুড়ুং উল্টোদিকে বসেছিল। কথাটা বলে আমার পাশে এসে বসে। গলার স্বর নামিয়ে জিঞ্জাসা করে, "আপনার কাজ কেমন চলছে?"
এমন সাধারন প্রশ্ন এই ফিসফিসিয়ে জিঞ্জাসা করায় বেশ অবাক হই, "ভালই।"
"শুনলাম সাতসুরবায় নাকি ডাইন দেখা গেছে।"
"ডাইন?"
"ডাইন, ভুতনী বা চুড়েল কিছু একটা হবে। যারা দেখছে কেউ বেঁচে ফিরছে না।"
পরাগজ্যোতি দত্ত ঠিক সময় হাজির হলেন। গুড়ুং একমুখ হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়াল। দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে হাটের শেষ প্রান্তে একটি পরিত্যাক্ত দোকানে ঢুকে পড়ি। ইন্সপেক্টর দত্ত নোটবই খোলেন, "এখানে আপনার কি ধরনের কাজ?"
"মোকটচুঙে থাকতে নর্থের পাহাড়গুলোর জিওলজিকাল ম্যাপিং করেছি। সাতসুরবায় থাকতে ইস্টের পাহাড়গুলো ম্যাপিং করব।"
"সাতসুরবা রিমোট গ্রাম। গোটাটাই আও অধ্যুষিত দু একটা আঙ্গামী পরিবার আছে। গতবারে যখন প্রথম এলেন আপনাকে গ্রামে থাকতে দিল?"
"প্রথমটায় দেয় নি। মোকটচুঙে আমাদের সাথে এক আঙ্গামী কাজ করত। সেই গাওবুঢ়াকে ধরে টরে ব্যবস্থা করে দিয়েছে।"
"এবারে সে ছেলেটি নেই? আপনার ক্যাম্পে একজন আওকে দেখলাম।"
"না এবার হোতোখো নেই।"
"গতবারে যে ড্রাইভারটি এসেছিল এবারেও সেই এসেছে?"
"না, প্রকাশ সিং আসেনি। এবারে নতুন ড্রাইভার, নাম ধিলোঁ।"
"তার মানে গতবার যারা আপনার সাথে কাজ করেছে তারা কেউ আসেনি। এসব পুরোনো জায়গায় পুরোনো ড্রাইভার আনা বেটার। প্রকাশকে নিয়ে এলেন না কেন?"
"আমাদের ডিউটিগুলো রিজিওনাল অফিস প্ল্যান করে। ওরা যাকে পাঠাবে সেই আসবে।"
"গতবারে আপনি কতদিন ফিল্ড করেছেন?"
"তিনমাস, জানুয়ারী থেকে মার্চ।"
"ফিল্ড তো শুনেছি ছ মাস হয়। জুলাই আগষ্ট বর্ষার জন্য বন্ধ থাকে। গতবার মাত্র তিনমাস ফিল্ড হল কেন?"
এতক্ষণ এই প্রশ্নের ভয় করছিলাম। হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে। "মিঃ দত্ত, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আপনাকে রিজিওন্যাল অফিসের পারমিশন আনতে হবে। আমাকেও বসের কাছ থেকে রিটেন অর্ডার আনতে হবে।"
ইন্সপেক্টর নোটবই বন্ধ করলেন, "আজ এ পর্যন্ত থাক।"
দত্তর জীপ চলে যেতে গুরুং এর দোকানে গিয়ে চোখেমুখে ভাল করে জলের ঝাপটা দিই। গুরুং জিঞ্জাসা করে, "মিট্টিবাবু খানা দিতে বলি।"
"দিন।"
একথালা গরম পুরী আর পনির তরকারী আসে সাথে কাঁচা লঙ্কা। থালা এগিয়ে দিয়ে গুরুং প্রশ্ন করে, "পুলিশের লোক আপনার কাছে কেন?"
নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি, "সেটা আপনি ওঁকেই জিঞ্জাসা করুন গুরুং। উনি তো আবার আসবেন।"

(৩)

উনোনে মাটির হাড়িতে চাল বসানো হয়েছে অনেকক্ষণ, সিদ্ধ হওয়ার নাম নেই। ভিজে কাঠে আগুন কম ধোঁয়া বেশী। তার উপর হাওয়ার দাপট। হাজার ফুটোর ছেঁড়া পলিথিন হাওয়ার তোড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনভাগের একভাগ ইতিমধ্যে খুলে আলুথালু হয়ে পড়েছে। বিমলা উঠে গিয়ে পলিথিনের কোণা বাঁশের খাঁজে গুঁজে দেয়।
"ও দাদি ভাত দে।" সাত বছরের নাতনী থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
"দিচ্ছি একটু সবুর কর।"
"তখন থেকে দিচ্ছি দিচ্ছি করছিস। দিলি কই?"
"কাঠটা জ্বলছে না। চাল সিজোয় নি।"
"যা হয়েছে তাই দে। আমার খিদে পেয়েছে।"
"একটু মুড়ি খাবি?"
"দে।"
বিমলা টিনের বাক্স ঝেড়ে মুছে মুড়ি নিয়ে আসে।
"এইটুকুন? আরও দে।"
"ওটুকু খা আগে। ভাত হলে খেয়ে নিবি।"
হাওয়ার শোঁ শোঁ আওয়াজ ভেদ করে পলিথিনের দরজায় চিৎকার আছড়ে পড়ে, "অ্যাই ঝিংলি, দরজা খোল।"
বিমলা ঠোঁটে আঙুল চেপে নাতনীকে ইশারা করে। ঝিংলি পা টিপে টিপে ঘরের কোণে গিয়ে বসে।
"ঝিংলি বাড়ি নেই।" সে ঘরের ভিতর থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দেয়।
বাইরের অপেক্ষারত লোকটি ক্রমাগত ঝিংলির নাম ধরে চেঁচাচ্ছে। পলিথিনের চাদর সরিয়ে একরাশ বিরক্তি মুখে বিমলা মুখ ঝামটা দেয়, "দিনদুপুরে হল্লা করছিস কেন? ঝিংলি বাড়ি নেই।"
হোতোখো জড়ানো গলায় প্রশ্ন করে, "বিষ্টির মধ্যে কোথায় পাঠিয়েছিস?"
"সে খোঁজে তোর দরকার কি? যা বলতে এসেছিস বলে ফেল।"
"একটু ভাত দিবি বিম্লা।"
"মরণ! দুজনের পেট চালাতে পাচ্ছি না। আপদ জুটে গেছে। ভাগ এখান থেকে।"
হোতোখো মুখটা যথাসম্ভব করুণ করে, "তাড়িয়ে দিচ্ছিস। বউটা বেঁচে থাকলে দুটো ভাতের জন্য মুখ ঝামটা দিতে পারতিস?"
বিমলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, "হাড়িয়া না খেয়ে চাল কিনতে পারিস না?"
"পয়সা দিয়ে খাই নি রে, চুরি করেছি। মঙ নাচের মহড়ায় মরদগুলো খাচ্ছিল। ধরা পড়ে থ্যাঙানি দিয়েছে। দ্যাখ কেমন ফাটিয়ে দিয়েছে!" হোতোখো বাঁ কান দেখায়। লতির নিচে রক্ত গড়াচ্ছে।
"ইস্! জানোয়ার গুলোর দয়ামায়া নেই গো। আয় ভেতরে এসে বোস।"
ঘরের কোণে ঝিমলিকে দেখে হোতোখো চেঁচিয়ে ওঠে, "ওই তো ঝিংলি! নেই বললি তবে।"
বিমলা উত্তর দেয় না। পুরোনো শাড়ি ছিঁড়ে ন্যাকড়া বানাচ্ছে। ঝিংলি আরও কুঁকড়ে দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে বসল। বিমলা জামাইয়ের কানে রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলে, "ডাকিস না। তোকে ভয় পায়।"
"আমাকে? আমি বাঘ না ভালুক," হোতোখো খ্যাক খ্যাক করে হাসে।
"তার চাইতেও বেশী, হাড় বজ্জাত। চুপ কর আর হাসতে হবে না।"
হোতোখো ঠোঁটের ওপর তর্জনী রাখে, "ওক্কে ম্যাডাম, একদম চুপ।"
"একটা কাজে লাগ। এমন আর কদ্দিন চলবে? পড়ালিখা জানিস ঠিক জুটে যাবে।"
"এ শরীরে জুটবে না। লোকে দেখলেই বুঝতে পারে। পড়ালিখার কাজ পেতে শহরে যেতে হয়। সে মুরোদ আমার নেই।"
হোতোখোর শুকনো বুকে পাঁজরগুলো উঁচু ঢিবির মত জেগে আছে। হাড়িয়া খেয়ে মুখ ফুলো ফুলো। এভাবে চললে বেশীদিন বাঁচবে কিনা সন্দেহ। ওকে দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে বিমলা ভাত নামায়। "এই ঝিংলি ভাত খাবি আয়।"
ঝিংলি পায়ে পায়ে এগিয়ে বিমলার গা ঘেঁষে বসে পড়ে। ভাতের গেরাস মুখে হোতোখো বলে, "তোর মেয়ে নাকি ভূতনী হয়ে সবার ঘাড় মটকাচ্ছে।"
"এসব কথায় বিশ্বাস করিস?"
"পরশু যেটা মরেছে সে মেয়েদের দালালি করত। আগেরটাও তাই। এসব লোক হঠাৎ মার্ডার হয়ে যায়। ভূত না মানুষ কে মেরেছে কে জানে।"
"সাবধানে থাকিস। পুলিশের লোক নাকি চারিদিকে ঘুরঘুর করছে।"
দু গ্রাস মুখে দিয়ে হোতোখোর চোখ বুজে আসে। বিমলার কথা শেষ হতে না হতে তার নেশা টইটম্বুর অসাড় শরীর মাটির উপর গড়িয়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে বিমলা চাপা গলায় গরগর করে, "বেওড়া কাহিকা। নিজেও খেল না আমাকেও খেতে দিল না।"

(৪)

অফ্ সিজনে ব্লু মুন হোটেল মোটামুটি ফাঁকা। ইন্সপেক্টর দত্ত পছন্দমত একটি ঘর বেছে নিলেন। দোতলার কোণঘেঁষা ঘরটির সাথে লাগোয়া অর্ধচন্দ্রকার ব্যালকণি। ওখান থেকে কোহিমা শহরের অনেকটা ফোকাসে আসে। রুমে ঢোকার কিছু পরে বছর তিরিশেক এক যুবক হাসি হাসি মুখে ভিতরে ঢোকে, "কিছু লাগবে শাব? খাবার ড্রিঙ্কস। অর্ডার দিলে এনে দেব।"
"তুমি বরং এক প্লেট চিলি চিকেন আর স্টিমড মোমো নিয়ে এস।" দত্ত দুটো একশ টাকার নোট বাড়িয়ে ধরেন, "তোমার নাম কি হে?"
"নুদা।"
"মণিপুরের লোক, তাই না? কদ্দিন আছো এখানে?"
"কোহিমা শহরে পাঁচবছর হয়ে গেল। এই হোটেলে গত বছর এসেছি।"
নুদা বেরিয়ে যেতে স্নান পর্ব সেরে ফেললেন। এককাপ গরম কফির স্বাদ পেতে জিব ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। নুদা না ফিরলে অর্ডার দেওয়া যাবে না। আয়েস করে একটা সিগারেট ধরান। হোটেলের মালিক শৌখিন মানুষ। টেবিলে দামি পাথরের অzাশট্রে, বাথরুমের রাzকে সুগন্ধী মোমবাতি। এসব দামি সুক্ষ্ণ জিনিস পাঁচতারা হোটেলে মানানসই লাগে। অzাশট্রেটায় ছাই ফেলতে চরম অস্বস্তি, অনেকটা পরিষ্কার রাস্তায় পানের পিক ফেলার মত। লম্বা লম্বা পা ফেলে ব্যালকনিতে এসে সিগারেটের ছাই হাতের টোকায় হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে মনের গ্লানি কতক দূর হল। দ্বিতীয় সিগারেটটি আধপোড়া হওয়ার মুখে নুদা ফিরে আসে, "শাব আপনার ডিনার। এখন খাবেন না দেরীতে?"
"আরেকটু রাতে হোক। তুমি বরং এককাপ কফি দিয়ে যাও।"
পনেরো মিনিটের মধ্যে নুদা একমগ কফি নিয়ে হাসিমুখে হাজির হয়, "খাওয়ার আগে একবার কল দেবেন শাব। সব গরম করে দেব।"
"তোমাদের হোটেলে নাকি রাতের বেলা পরী নামে?"
নুদা মুখ টিপে হাসে, "আপনার চাই?"
"বিশেষ একজনকে। নাম রীটা। রাতে নিয়ে আসতে পারবে?"
নুদা বোঝে নতুন বাবু আগে থাকতে খবরাখবর নিয়ে এসেছে। বলে, "রীটা ম্যাডাম আজ আসবে না। প্রীতি, রিচা, প্রেমা আরও অনেকে আছে।"
"আমার ওকেই দরকার। ওর বাড়ি কোথায়?"
নুদা মুখ শক্ত করে, "কল গার্লদের বাড়ি জেনে কি লাভ শাব?"
"যা জিঞ্জাসা করছি উত্তর দাও।"
"এসব ইনফরমেশন কাস্টমারদের দিতে মানা।"
দত্ত আইডেন্টিটি কার্ড বের করেন, "এবার বলবে নাকি লক আপে ঢোকাব?"
নুদা মিইয়ে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে। "ওর বাড়ি হোটেল থেকে বেশী দূরে নয়। তবে আজ শনিবার। ওকে পাবেন না।"
"গত শনিবার কি ও এখানে ছিল? ভেবে জবাব দাও।"
"ভাবার দরকার নেই শাব। গত শনিবার একটা ব্যাচেলার পার্টির অর্ডার নিয়ে ওর ঘরে গিয়েছিলাম। তালা বন্ধ।"
"হুম। আমাকে ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে চল।"
নুদা চোখে মুখে যাবতীয় কাতরতা ফুটিয়ে তোলে, "মাফ করুন হুজুর। এসব করলে চাকরি চলে যাবে।"
"না করলেও কি থাকবে ভেবেছ। পুলিশ একবার ছুঁয়ে দিলে গুণ্ডা বদমাশ ছাড়া আর কেউ ছোঁবে না।"
নুদা মিনিট দুই মুর্তিবৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময়টুকুর মধ্যে বেচারার ছোট্ট মগজে যাবতীয় জট পাকানো অzাক্সন ডেনড্রনগুলো আপদকালীন সমস্যা জোর মিটিং চালাচ্ছে। সাইনুসয়ডাল ফ্লুইড ঝড়ের আগের প্রকৃতির মত নিথর নিস্তরঙ্গ। মস্তিষ্ক খবর পাঠালে সেগুলো টপাটপ ফ্লুইডে পড়বে এবং পরবর্তী ডেন্ড্রনে ডেলিভারি হয়ে যাবে। মস্তিষ্ক নির্দেশ পাঠিয়েছে। ঠোঁট দুটি নড়ে চড়ে ওঠে, "দুটোর পর আমার ডিউটি শেষ। এ হোটেলের ডান হাত বরাবর কিছুটা এগোলে হোয়াইট ক্যাসল বার। ওখানে অপেক্ষা করবেন।"
রীটার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি নুদার কাছে ছিল। ফলে মাস্টার কি র দরকার পড়ল না। টর্চের আলোয় ঘন্টাখানেকের তল্লাশি চালিয়ে দত্তের মুখে পরিতৃপ্তিজনিত হাসি। বিশেষ কোন জিনিসের খোঁজে আসেননি। তবে যা পেয়েছেন খুব কম নয়।

(৫)

বিপদ আর আপদ সহোদর ভাই হবে বোধহয়। কখনও হাত ধরাধরি করে আসে। কখনও একলাটি। আমার এই ফিফটি ইয়ার্স রমরমিয়ে চলার জীবন নাট্যে তারা বহুবার যাওয়া আসা করে গেছে। আদর যত্ন করিনি তবে কখনও সখনও একগলা ভয় নিয়ে খাতির করে থাকতে দিয়েছি। কখনও আবার চটেমটে গলাধাক্কাও দিয়েছি। তারা এবং আমি দুটো প্রতিপক্ষ দল, কখনও ডিফেন্সে কখনও অফেন্সে। তবে এবারের ব্যাপারটা অন্যরকম। এবার তারা বাড়ি বয়ে আমার সাক্ষাতলাভ করতে আসেনি। আমিই তাদের কাঁধে চেপে সাতসুরবায় এসেছি। কতকটা নিধিরাম সর্দারকে হেলিকপ্টার থেকে টুক করে কাবুলে ফেলে দেওয়ার মত। 'নে বাবা যুদ্ধ কর।' অটোমেটিক মেশিনগানের যুগে যে লোকটার হাতে একটাও বুক ভাঙা ঢাল বা জং ধরা তরোয়াল পর্যন্ত নেই সে কাবুলের ন্যাড়া পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ঠিক কি করতে পারে, তার খানিকটা আন্দাজ আমাট দেখলে পাওয়া যায়। একটি ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনার মধ্যে দিয়ে গতবারে সাতসুরবা সফর শেষ হল। বছরখানেকের মাথায় পেটের তাগিদে সেখানেই তাঁবু গেড়েছি। গত তিনমাসে এখানে দুজন লোক মার্ডার হয়ে গেছে। গাঁয়ের লোকের বিশ্বাস কোন নারী প্রেতাত্মা নাকি তাদের খুন করেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর কেস ফাইল ঘেঁটে ঘুঁটে যে যে তথ্য পেয়েছেন সেগুলো পরপর জোড়ার জন্য কিছু মানুষের কাছে যাতায়াত করছেন। এই দলে আমিও আছি। আমার গাড়ি খারাপ হয়ে গুড়ুং এর শপে পড়ে আছে। এ পর্যন্ত বিপদ এসেছে মোটামুটি ছক বাঁধা রুট ধরে। কিন্তু আজ যে উটকো আপদের আগমনবার্তা পেয়েছি তাকে এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই। সকালে রিজিওন্যাল অফিস থেকে টেলিগ্রাম এসেছে ২২শে সেপ্টেম্বর প্রকাশ সিং ধিলোঁর রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে সাতসুরবায় আসছে। ধিলোঁর বউয়ের অসুখ। একমাসের ছুটি নিয়ে দেশে যাবে। টেলিগ্রাম হাতে নিয়ে ভ্যাবা গঙ্গারামের মত বসে আছি। মাথায় কিছু খেলছে না। বাইরে বৃষ্টি, অলস সকাল ভাবনাতেও কেমন গা ছাড়া ভাব এসে যাচ্ছে। কতকটা জেগে জেগে ঘুমানোর মত অবস্থা। তাঁবুর পর্দা সরিয়ে একখানা মুখ উঁকি মারে। স্প্রিং এর মত লাফিয়ে উঠি, "আসুন মিঃ দত্ত। আপনাকেই স্মরণ করছিলাম বোধহয়।"
"বোধহয় কেন? স্মরণপটে আমার ছবিটি ঠিকঠাক ফোটেনি বুঝি?"
"এগজ্যাক্টলি কেমন যেন ধোঁয়াশা মত। আপনাকে দেখে মনে হল, এই সেই যাকে সব খুলে বলা যায়।"
"সর্বনাশ! পুলিশের লোক মশাই। বুঝে শুনে হৃদয় উজাড় করবেন। যাক আপনাকে ইন্টারোগেট করার পারমিশান পাওয়া গেছে। নাউ ইউ ক্যান ওপেন ইয়োরসেল্ফ। আজ নিজের বাইকে এসেছি আশেপাশের লোক বিশেষ সন্দেহ করবে না। আশা করি এখানে বসেই কথা সারা যাবে।"
টেলিগ্রামটা দেখালাম। আজ সকালে এসেছে। "এই লোকটা এখানে এলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।"
উনি শান্তভাবে সেটা পড়ে আমার হাতে ফেরত দিলেন, "টেলিগ্রামটার ব্যাপারে পরে আসছি। তার আগে আগের ঘটনাগুলো বলে যান।"
"আপনি ঠিক ধরেছেন মিঃ দত্ত। গতবার ফিল্ডে যারা আমার সাথে ছিল তারা এবার নেই, প্রকাশ, হোতোখো...."
"আর রকি। আপনার কুলির কাজ করত। গত ২৩শে আগস্ট তাকে গুরুতর অবস্থায় জঙ্গলে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরদিন সে মারা যায়।"
"গতবার হোতোখো তাকে এখানে আনে। কদিন বাদে সে নিজের বউকে রান্নার কাজে ঢোকাতে চায়। আমার আপত্তি ছিল। সন্ধ্যার পর সার্ভেন্ট টেন্টে যুবতী মেয়ে রাখার রিস্কি হয়ে যায়। হাতে পায়ে ধরে রাজি করালো। সত্যি বলতে কি হোতোখোকে চটানোর ইচ্ছা আমার ছিল না। মেয়েটার নাম নারোলা। ঠিক হয় সন্ধ্যার পর নারোলা তাঁবুতে থাকবে না। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ঠিকঠাক চলল। সন্ধ্যার পর রকি আর নারোলা যে যার বাড়ি চলে যেত। তাঁবুতে থাকতাম আমি হোতোখো আর প্রকাশ। ক্রমে ব্যবস্থা অন্যকরম হল। হোতোখো রকির সাথে বেরিয়ে যেত। ফিরত গভীর রাতে। বেহেড মাতাল অবস্থায়। নারোলা রাত অবধি প্রকাশের তাঁবুতে থাকত। একদিন হোতোখোকে ডেকে সাবধান করে দিই। ততদিনে মদের নেশা ভূতের মত তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। বউকে আগলে রাখার ক্ষমতা তার ছিল না। একদিন সে কাজে আসা বন্ধ করে দিল। রকি জানাল সে অসুস্থ। নারোলাও এল না।"
"তারপর?"
"একদিন প্রকাশ ছুটির দরখাস্ত করল। তার বাবার নাকি খুব অসুখ। এক সপ্তাহের জন্য ক্যাজুয়াল লিভ নিল।"
'তাঁবুতে শুধু আপনি আর রকি ছিলেন?"
"শুধু আমি। রকিকে ছুটি দিলাম। বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি ছাড়া বেশীদূরতো ফিল্ডে যাওয়া যাবে না। আশেপাশের এলাকাগুলোয় নিজেই ফিল্ড করে ফেলব। কিন্তু তার দরকার পড়েনি।"
"কেন?"
"রকিকে যেদিন আসতে মানা করি তার পরদিন সকালে একটি ছেলে খবর দেয় নারোলা আত্মহত্যা করেছে। গাঁয়ের মানুষ খেপে গেছে। তারা দলবেঁধে ক্যাম্পের দিকে আসছে।"
"নারোলা কখন আত্মহত্যা করে সে সম্বন্ধে জানা আছে কিছু?"
"সম্ভবত শেষ রাতের দিকে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। হোতোখোর সাথে নাকি কদিন ধযে অশান্তি চলছিল। সকালে পাহাড়ের কাঁজে তার শাড়ি আটকে থাকতে দেখা যায়।"
"গাঁয়ের লোক হঠাৎ আপনার উপর খেপে গেল কেন?"
"হোতোখো তাদের জড় করেছিল। নারোলার মৃত্যুর দায় সে প্রকাশের উপর চাপিয়েছে। নারোলার পেটে নাকি প্রকাশের সন্তান ছিল।"
"তারপর ?"
"ছেলেটি আমায় পালাতে বলেছিল। কিন্তু তিনখানা তাঁবু গুটিয়ে একগাদা জিনিসপত্র নিয়ে যাব কোথায়। ততক্ষণে দেরীও হয়ে গিয়েছিল। একদল লোক লাঠি কুকরি নিয়ে তাঁবু ঘিরে ফেলেছে। প্রকাশকে না পেয়ে আমাকে অzাটাক করে। গাঁওবুঢ়া এসে কোনরকমে আটকালেন। আধঘন্টার মধ্যে দরকারি কয়েকটা জিনিস জিপে তুলে স্টার্ট দিলাম। পাহাড় ছাড়ার আগেই দেখি তাঁবুগুলো জ্বলছে। আই এন এস কয়েকজন আর্মি আমায় উদ্ধার করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম।"
"প্রকাশের শাস্তি হয়নি?"
"শো কজ করা হয়েছিল। সে লিভ নিয়ে কমাস ঘরে বসেছিল। এসব ঘটনার প্রমাণ যোগাড় কে করবে, কেই বা ডাইরি করবে।"
"আপনি নিশ্চয় জানেন যে নারোলার মৃতদেহ আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি।"
"জানি।"
"সে নিখোঁজ হওয়ার চারমাসের মাথায় রকিকে গুরুতর আহত অবস্থায় জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া যায়। তার সারাটা শরীর নখের আঁচড়ে ফালাফালা হয়ে গিয়েছিল। তার শেষ জবানবন্দী অনুযায়ী সে ভূতনী বা চূড়েল জাতীয় কিছু দেখেছিল। এখানকার লোকের বিশ্বাস নারোলার আত্মা তাকে মেরেছে। ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই শেষ হয় নি। গত শনিবার দামাং নামে এক মেয়ে পাচারকারী খুন হয়েছে। তার চ্যালা ভূতনী জাতীয় কিছু দেখেছে।"
"বেশ গোলমেলে ব্যাপার। যাইহোক প্রকাশের ব্যাপারটা কি করবেন?"
"কাল ভোরে ওকে স্টেশন থেকে তুলে মোকটচুং থানায় পাঠিয়ে দেবেন। এরপর আমাদের দায়িত্ব। আচ্ছা হোতোখোর সাথে আর দেখা হয়েছে?"
"নাহ্। শুনেছি সে নেশা করে এখানে ওখানে পড়ে থাকে।"
"কখনও দেখতে পেলে আমাকে খবর দেবেন। চলি তাহলে।"


পরের অংশ

মৈত্রী রায় মৌলিক

মৈত্রী রায় মৌলিক পেশায় জিওলজিস্ট, কিন্তু নেশা সাহিত্যে। ওঁর লেখা গল্প, উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনী সানন্দা, সুখী গৃহকোণ, আনন্দবাজার ইত্যাদি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।