রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

খুন

মারিয়া সামনে ধোঁয়াওঠা কফি নিয়ে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ পড়ছে। হঠাৎ, ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে বসলো আকাশ। একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেছে ও একটু আগে। ভয়ে-আতঙ্কে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা দাপাদাপি করছে পাগলের মতো। যেন বুকের খাঁচা ভেঙে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে জীবন নামের প্রাণবায়ু। বুকের ভিতর খচ করে বিঁধল ঈর্ষা। মারিয়া রকিং চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে অথচ তার এমন অবস্থা দেখে কোন ভাবান্তর হচ্ছে না। নির্লিপ্তভাবে মেয়েটা চায়ের কাপে তার পেলব ঠোঁট দিয়ে  ছোট্ট চুমুক দিয়ে চা আর সাপ্তাহিক কাগজে একমনে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে।  কিছুক্ষণের জন্য আকাশ একদৃষ্টিতে মারিয়ার নির্মল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আবেগশূন্য গলায় মারিয়া বলে উঠলো, 'তারপর?'
'আকাশ হাসলো অকারণে, চোখে চোখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য লুকোচুরি খেললো। নির্মলা,নির্জলা ও সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্মের ন্যায় মুখচ্ছবি দেখে মুহূর্তেই বিরক্তির ভাবটা উড়ে গেল। আকাশ খুব ভালো করেই জানে
সে প্রচণ্ড ভীতু স্বভাবের। খুব সহজেই ভয় পেয়ে যায়। সাধারণ কিছু দেখেই আঁতকে উঠে। বিশেষত: ভূতুড়ে বিষয়ে অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর। তাই এরকম একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে যে ভয় পাওয়ার নয় তা অস্বাভাবিক কিছু না। বাইরের কেউ আকাশের এমন স্বভাবের কথা শুনলে নিশ্চয়ই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিবে। অথচ, মারিয়া আকাশের চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। মারিয়া দিনের চেয়ে রাত্রিতেই ঘর থেকে বেশি বের হয়। দিনের বেলাতে যদিও বের হয় তবে বিশাল আকারের কালো চশমা নাকের উপর বসিয়ে দেয়। এতে অবশ্য মারিয়ার চেহারার সৌন্দর্য দ্বিগুণত্ব পায়।

মারিয়া ধোঁয়াউঠা এক কাপ গরম কফি এনে দেয়। মেয়েটা যেন জানতো, আকাশের এখন এক কাপ গরম কফির প্রয়োজন বোধ করছে। সাপ্তাহিকী খবরের কাগজটা চোখ বুলিয়ে যাবার সময় একটা খবরের কলামে এসে চোখ আঁটকে গেল। পুরনো একটা বাংলো নিলামে উঠানো হচ্ছে। বিশাল জমির উপর দ্বিতল একটা বাংলো ঘর, চারপাশে মনোরম পরিবেশ, মধ্যম আকৃতির একটা জলাধার আর পশু-পাখি লালন-পালনের জন্য খামারবাড়ি। সবমিলিয়ে খুব ভালো একটা প্যাকেজ। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলোবাড়িটা লোকালয় থেকে একটু দূরে। আকাশ পুরো বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকালো। মারিয়া উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে। পরক্ষণেই, আকাশ মারিয়ার চোখের ভাষা পড়ে নিল। নতুন বিয়ের পর এমন একটা বাড়ি অতি প্রয়োজন। বাবা-মা'র কোন ঝুট-ঝামেলা নেই। আকাশ ছোটবেলা থেকেই বাবামা-হীন এক সন্তান। বর্তমান সুশীল সমাজ যাদের জারজ সন্তান নামে আখ্যায়িত করে থাকেন। মারিয়ার ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। মারিয়া একা তবে সে নিজের স্মৃতি হারিয়েছে। স্মৃতি ফিরে পেলে অবশ্য মারিয়া বলতে পারবে তার পূর্বপরিচয়। কিন্তু, সেটা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার-স্যাপার !

আকাশ আর মারিয়া নিলামের জন্য রওনা হয়ে গেছে। নির্জন বাংলোটায় ঢুকতেই শির শির করে উঠল আকাশের পুরো শরীর । পুরনো পুরনো সোঁদা সোঁদা একটা গন্ধ সর্বত্র ।চারদিকে দেখলেই বুঝা যায় বহুদিনের পড়ে থাকা বাংলোটা পরিষ্কার করার কোন ত্রুটি করেনি কর্মচারীরা। তাও এর গায়ে  পুরনো পুরনো ভাবটা  থেকেই গেছে ।  পার্টিতে যারা অংশগ্রহণ করবে তারাও সবাই এসে গেছে। কিছু বয়স্ক দম্পতি, কয়েকজন মধ্যবয়স্ক আর মারিয়ারা দু'জন সব মিলে মোটের উপর ত্রিশ-চল্লিশ জন হবে। মারিয়ারা দুই আসনের একটা বেঞ্চ দখল করে শেষ কোণার দিকটায় বসে গেল। রুমের মধ্যে সকলের হৈচৈ আর মধ্যবয়স্ক দম্পতিদের উল্লাস চিৎকারে কান ঝালাপালা হয়ে আসছে। অনেকেই আবার  ভাম্পায়ার আর ওয়্যারউল্ফের কথা বলে একে অন্যকে পোড়ো-বাংলো সম্পর্কে ভয় দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মারিয়া যথারীতি বৃহদাকার কালো চশমা দিয়ে তার চেহারা ঢেকে আছে। বারকয়েক আকাশ মারিয়াকে বললও চশমা খুলে রাখতে যেহেতু রোদ কিংবা গাঢ় কোন আলো পড়ছেনা। মারিয়ার কোন স্বগোত্ত্বিক নেই। ব্যর্থ হয়ে আকাশ পার্টির জন্য অপেক্ষা করছে। রাত সাড়ে দশটায় নিলাম শুরু হবে।

রাত দশটা ঊনত্রিশ মিনিট। পরিচালক এসে পার্টিতে পৌঁছালেন। যথারীতি নিলাম শুরু হয়ে গেল। বাংলোটা শহরের বাইরে জঙ্গলের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় অনেকেই হাজার ডলারের বেশি উঠতে চাইলোনা। আকাশ দেড়শ ডলার বাড়িয়ে এগারোশ ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাকি পঞ্চাশ ডলার নিলামের বিভিন্ন কাগজপত্রাদি পূরণ করতে ব্যয় হবে। আকাশ মারিয়ার দিকে তাকাল। তাঁর চোখে তৃপ্তির ছায়া ফুটে উঠেছে। মারিয়ার চেহারায় তৃপ্তির রেখা দেখে আকাশও মনের মাঝে গভীর প্রশান্তি অনুভব করলো।

রাত দেড়টা। আকাশে অপেক্ষাকৃত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। মারিয়া একমনে হেঁটে চলেছে। মারিয়াকে প্রশ্ন করলে কোন উত্তর পাওয়া যায়না শুধু ওর চোখ দেখে বুঝে নিতে হয় ও কি বলতে চায়। আকাশের সাথে মারিয়ার দেখা হয় সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। অদ্ভুত প্রথম দেখা ! সেদিন ছিল সোমবার। রাত দেড়টা। সেলুনের দরজায় কালো ছায়া পড়ায় রায়হান সাহেবের সব গুলো চোখ দরজায় আটকে যায়। সুঠাম শরীরের এক যুবক দরজায় দাড়িয়ে। পড়নে কাউবয়ের পোশাক। নিচু করে ঝোলানো গান বেল্ট দেখেই বোঝা যায়, দক্ষ বন্দুকবাজ। আলোর উল্টোদিকে মুখ থাকায় চেহারা দেখা যাচ্ছে না। মাথার হ্যাটও সামনের দিকে ঝুঁকানো। চেহারার অর্ধেকের বেশি ঢাকা পরে আছে। কোন কারণে আগন্তুক তার চেহারা লুকিয়ে রাখতে চাইছে। ফাঁকা একটা চেয়ার দেখে  দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল যুবক। সেলুনটাও খুব একটা পরিচিত নয়। শহরের ঝামেলা গুলোর দিকেও ইদানীং তার কোন মন নেই। সবসময় একটা কলের অপেক্ষা করে। খুন করার সময় যখন অপর ব্যক্তির হাত পা খুব জোরে জোরে নাড়ায় তখন আকাশের কাছে মনে হয় পুকুরের জালে আটকা পরেছে সবচেয়ে বড় মাছটা। ব্যাটা জগলু চৌধুরী এতদিন অনেকের জীবন নিয়েছে। আকাশের মত হাজারো ছেলের জীবন নষ্ট করেছে। অন্যের জীবনের মায়া বোঝার সাধ্য তার ছিল না। এখন দুইটা কাজ বাকী, একটা চিঠি লিখতে হবে; পুলিশকে ফোন করতে হবে। ভাবতে ভাবতে, আকাশ জগলু চৌধুরীর ঘর থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে আসে।
চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষ। ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়ামের আলোয় আবছা আবছা রাস্তা দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার ফুঁড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আকাশ। হঠাৎ কোথায় যেন একটা বাজ পড়ল। সে আলোতে এক রমণীর মুখায়ব দেখা যাচ্ছিলো। স্বর্গের অপ্সরীর ন্যায় রমণীটাকে দেখা যাচ্ছিলো। রাস্তার উল্টোদিক থেকে ধীরপায়ে হেঁটে হেঁটে আসছে। আকাশ বিমোহিত হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এত রাতে একটা একা মেয়ে বাইরে থাকার কথা না তাহলে, এতো সুন্দরী মেয়ে বাইরে কি করছে। আকাশ কথা বলার জন্য ঔদ্ধত্য হয় কিন্তু তার আগেই মেয়েটা মুখাভিনয় করে বুঝিয়ে দেয়,  তার সাহায্যের প্রয়োজন। অন্যসময় হলে আকাশ পাশ কেটে চলে যেত কিন্তু, বর্তমানের ব্যাপার আলাদা। সেই থেকে মারিয়া, আকাশের সাথে থাকতে শুরু করে। আকাশও নিজেকে মানিয়ে নেয়। একসাথে থাকা শুরু করলেও প্রত্যেকের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ খুব ভালো ছিল। বদৌলতেই হয়তো দু'জন এখনো বেঁচে আছে। বেশীদিন নয় আজ মাত্র দু'দিন হল। অথচ, একদিনেই মারিয়া নিজেকে যথেষ্ট গুছিয়ে নিয়েছে।এও কি সম্ভব না পূর্ব-পরিকল্পনা !

বিকেল বেলা আকাশটা খুব পরিষ্কার ছিল। আকাশে ছিটে ফোটা মেঘও ভাসতে দেখা যায়নি। লাল হতে হতে সূর্যটা যখন বিদায় নিলো তখনো ছিল মেঘ মুক্ত স্বচ্ছ আকাশ। বাড়ি পরিবর্তের জন্য সকাল থেকেই বিভিন্ন লোকের আনাগোনা চলছে। সোফাসেট, খাট, টেবিল, ওয়্যার-ড্রোব ইত্যাদি একে একে পুরনো বাড়িটায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রচুর পরিশ্রমে আকাশ আজ খুব ক্লান্ত। মারিয়া তার রুমে ঝিম ধরে বসে আছে। চুলগুলো সব এলোমেলো করে রাখা। আকাশ ভাবলো একবার বলবে, কোন সমস্যা  ?  কিন্তু, পরক্ষণেই মারিয়াকে তার রুমে একা ফেলে চলে এল। বাহির থেকে কিছু খাবার আনিয়েছে আকাশ। মারিয়াকে খেতে দেয়া হলে প্যাকেটটা অমনিই পড়ে থাকে পুরো বিকেল। আকাশ ভাবলো হয়তোবা ওর শরীর খারাপ করছে। উপর থেকেও আজ কোন কল আসেনি। তারমানে, আজ ছুটি...

রাত এগারোটা। আকাশ,মারিয়া আর গাড়ির ড্রাইভার এসে পৌঁছুচ্ছে পুরনো বাংলোর সামনে। ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ প্রথমে গাড়ি থেকে নেমে ছাতা নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ির ভেতর ঢুকলো। মারিয়ার শুধু ভেজা চুল ছড়ানো মুখখানি দেখেই আকাশ গলে গেল। খুনিদের ভালোবাসতে নেই তবে আজকে যেন ভিন্ন কথা। এই মেয়েটাকে ভালোবেসে আপন করে নেয়ার ইচ্ছেটা আকাশের ভেতর বিদ্যুতের মতো জ্বলে জ্বলে উঠছে। কিন্তু, দু'দিনের পরিচয়ে সাহায্যপ্রার্থী মেয়েটাকে প্রেম নিবেদন করা ঠিক হবে ?
"ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে আসি। এমন ঝড়ো রাত্রে গাড়িতে থাকা ঠিক হবেনা।  আপনি বসুন।"
'তার আর প্রয়োজন হবেনা। সে গাড়িতে ঘুমিয়ে গেছে'
'আমি যাই' বলেই আকাশ বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। এমন বৃষ্টিতে আকাশের ভেজার কোন ইচ্ছে ছিলোনা। কিন্তু তার মনটা কেমন যেন হয়ে গেছে। অনেকদিনের পুরনো ড্রাইভার। বন্ধুর মত সবসময় পাশে পাওয়া যায়। তাই, অযথা তার কষ্ট দেখে আকাশের নিজেরও কষ্ট হচ্ছিল।
বিশালাকার লোহার পুরনো গেট ঠেলে আকাশ বেরিয়ে রাস্তায় নামলো। সরু রাস্তা। রাস্তা পেরিয়ে বিশাল একটা অশ্বথ গাছ। কতটা পুরনো কে জানে ? হঠাৎ একটা বাজ পড়ল।
"রাসেল,রাসেল ..রা..সে..ল !
বলে হ্যান্ডেল ধরে টানতেই খুলে এলো
দরজাটা। পাজেরোর দরজা খুলে ঠিক আকাশের উপর ঢলে পড়ল নিথর দেহটা। ঠিক তখন আরেকটা বাজ পড়ল। আকাশ পরিষ্কার দেখলো, রক্তহীন মুখটা। জমে গেছে। ঠোটদুটো সাদা হয়ে আছে। চোখ দুটো ভয়ার্ত। আকাশ সবকিছু ভেবে রেখেছিলো তবে  এত রাতে এই বৃষ্টির দিনে এমন কিছু দেখবে স্বপ্নেও ভাবেনি । শরীর কাঁপছে। কারন আকাশ স্পষ্ট দেখলো রাসেলের লোমশ বুকের কাছটাতে বিশাল এক খাবলা মাংস নেই। ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছে কিছু শিরা। ওগুলো রক্তহীন। শুষে নিয়েছে সবকিছু। ফ্যাশফ্যাশে একটা গন্ধ নাকে এলো। ভিজে যাচ্ছে লাশটা। সুদর্শন এই যুবক প্রাণ হারিয়েছে অন্তত মিনিট পাঁচেক আগে।

কে মেরেছে ?
মানুষ খুন করা আর মৃত মানুষ দেখা দুটোই আলাদা। ব্যাপারটা 'ওয়ান জার্নি বাট টু ডিরেকশনের' মত। আকাশ আতঙ্কগ্রস্ত মন নিয়ে রাসেলের দেহটাকে পাশের জলায় ফেলে দিল। কেউ দেখে ফেললে আবার মার্ডার কেসে ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাঁটুজোড়ায় কাঁপাকাঁপি নিয়ে আকাশ বাংলোয় ফিরে এল। ধপ করে আলোটা নিভে গেল। ভাবনায় ছেদ পড়ল। বিদ্যুৎ চলে গেছে হয়তো। কালো অন্ধকারে চারপাশ ছেয়ে গিয়েছে। দু’চোখে কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। কে যেন আকাশের রুমে প্রবেশ করল। আকাশ চিৎকার করে আঁতকে উঠলো। হাটা চলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, পায়ের নূপুরের রিনিঝিনি শব্দও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বুকের ভেতর আচমকা শূন্যতা অনুভব করলো আকাশ। ভয় লাগছে। ভীষণ ভয় পাচ্ছে। বারকয়েক মারিয়া মারিয়া বলে চিৎকার করলো আকাশ। কোন উত্তর নেই। হঠাৎ কে যেন আকাশের কাঁধে হাত রাখল। ভয়ানক ঠাণ্ডা সেই হাত। মারিয়ার হাত। ঠোঁটে তার স্মিত হাসি। চোখে ক্রুর দৃষ্টি যেন মুহূর্তেই সবকিছু নস্যাৎ  করে দিবে। বর্তমানের মারিয়ার সাথে অসহায় মারিয়ার একদমই মিল পাওয়া যাচ্ছেনা। এইতো কদিন আগেই শুনেছি এ বাংলোয় একটা অশরীরীকে দেখা যায়। বেশ কিছু মানুষ মরেছে। বাংলোটা ন্যাশনাল হেরিটেজ নাম পেয়েছে। কিন্তু আজকে সেই অশরীরী আমার ঘরে এসে উঠেছে। ভাবতেই আকাশের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।এভাবে সারারাত অপেক্ষা করা যাবেনা। কিছু একটা করতে হবে মনে মনে ভাবল আকাশ। এই অশরীরীকে কে যেকোন প্রকারেই হোক সকাল পর্যন্ত আটকে রাখতে হবে। গুরুজনকর্তৃক শোনা যায়, ভোর হলেই এদের ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু, আকাশ ভাবতে থাকে সারারাত কি এভাবে অপেক্ষা করব? কতক্ষণ?
ভাবার অল্প সময়টাতেই ঠিক ঘাড়ের উপর গরম নিশ্বাস পেয়ে চট করে ঘুরে যেতেই, ঘাড়ের উপর চেপে বসেছে ওটা। উফ! এভাবেই কি আমার মৃত্যু লেখা ছিল? এটা হতে পারেনা ভেবে আকাশ বাম হাতে ঝটকা মেরে ওটাকে দেয়ালে ছুড়ে দেয়। আর অমনি ওটা মাকড়শার মত চার হাত পায়ে দৌড়ে গেল বৈঠকখানায়। আকাশ ওটার পিছু পিছু দৌড়ে গেলো। লিকলিকে পা দুটো আর হাত দুটোকে আলাদা করা যাচ্ছেনা। সেই রূপ আর নেই ওটার। এখন অনেকটা বিচ্ছিরি ক্ষুধাগ্রস্থ নারীর মত দেখাচ্ছে। শরীর থেকে বেরোচ্ছে বিচ্ছিরি গন্ধ। ঘাড়ে হাত দিলাম অজান্তেই। এক খাবলা জায়গায় চামড়া নেই। ওখান থেকে বেরিয়ে এসেছে কিছু শিরা। হাতে লাগল চিটচিটে রক্ত। অমনি মাথায় রক্ত চড়ে গেল। বাইরের ঝড় বৃষ্টিতে বাড়িটা খানিকটা আলোকিত ও হল। কোথায় যেন শব্দ হচ্ছে। শোঁ শোঁ শব্দ।  করিডোরে ঝোলানো একটা বর্ষা। আকাশ ওটাকে খুলে হাতে নিলো। আর দৌড়ে গেলো বৈঠকখানায়। বৈঠকখানা শূন্য। কেউ নেই।

আকাশ ভাবছে তবে কি আমি ভুল দেখেছি? কিন্তু ঘাড়ের রক্তগুলো তো সত্য। তবে কি ওটা পালিয়েছে? কয়েকটা মোম জ্বলছে। আগেই জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ওগুলোকে অনেক কম শক্তিধর মনে হচ্ছে। আকাশ খুঁজতে শুরু করলো অশরীরীটাকে। কোথায় ওটা? এমন সময় একটা বাজ পড়তেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল দিনের আলোর মতো। তাতে আবিষ্কার করা গেল ঘরের মাঝে সিলিং এ ঝাড়বাতিতে ঝুলে আছে ওটা। সেই চোখ- সেই মুখ- সেই মোহনীয় হাসি। মারিয়া। মারিয়ার মাদকতাময় চাহনি। শুধু শরীরটা এখন অন্য কিছু। নাকি পুরোটাই। কালবিলম্ব না করে আকাশ তীক্ষ্ণ বর্ষাটা ছুড়ে দিলো। লক্ষ ভ্রষ্ট হল। জোরালো বাতাসের শব্দে ওটা বেডরুমের দিকে ছুটে গেল। আকাশ আবারও অশরীরীটার পিছু নিল। চেয়ারে বসে আছে ওটা। সাদা কাপড় পড়া, চুলগুলো এলোমেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, তুই পাপিষ্ঠ, তোর বাবা একটা খুনি!
তোর বাবা আমাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্টভাবে হত্যা করেছে। কি দোষ ছিল আমার ? কথা শেষ করেই আকাশের দিকে ক্রোধভরা দৃষ্টিতে তাকায় মারিয়া। ওর দৃষ্টি আগুনের মত আকাশের শরীরে বিদ্ধ হয়। হতবিহব্বল হয়ে পড়ে আকাশ। কি বলছে এই নারী! পাগলের প্রলাপ নয়তো? আকাশ বারংবার শুধরে দেবার চেষ্টায় মত্ত, দেখুন আমার বাবা ছাব্বিশ বছর হল মারা গিয়েছে। কেন তাকে নিয়ে এমন বাজে কথা বলছেন ? তিনি ছিলেন একজন নামকরা ব্যবসায়ী, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।  এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে বুকটাকে হালকা করার চেষ্টা করে আকাশ। মারিয়ার কোন ভাবান্তর হয়না। সে তাকিয়ে আছে শূন্যে। তার চোখে ক্ষুধার অনল। রক্ত। রক্ত প্রয়োজন তার। মোমবাতির লাল আলোতে তার মুখটা ভারি মায়াবী মনে হয়। মারিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। গড়গড়া কণ্ঠস্বরে বলে তুমি কি তোমার বাথরুমের নিচের ক্লজিটটা খুলে দেখেছো ?
না। ওটাতো বোধহয় ষ্টোর রুম।কোথাও চাবি পাইনি খুঁজে পাইনি। কেন?
শীতল গলায় মারিয়া বলে ওখানে আমার হাড়-গোড় পরে আছে।
ভয়ে শরীরের লোম দাড়িয়ে যায়। গলা শুকিয়ে যায় , কাঁপা কাঁপা গলায় আকাশ বলে, কি বলছেন? তা হবে কেন?
'তোর বাবা আমাকে বাথরুমে তালাবন্ধ করে রেখে ছিল। এরপর, একদিন হাড়গুলো ক্লজিটে রেখে তালাবন্ধ করে ফেলে !'
"কিন্তু কেন  ? "
মারিয়া ছুটোছুটিতে কিছুটা ক্লান্ত। তারপর দায়সরা উত্তর দেয়, তোর বাবা আমাকে ভালবাসতো। আমি গ্রামের মেয়ে ছিলাম। কিন্তু, শহরে গিয়ে বিয়ে করে অন্য একজনকে। তারপর আমাকে পাওয়ার জন্য সে আবার এই পরিত্যক্ত জঙ্গলে বাংলো বাড়ি বানালো। সে জানতো তোর মা শহরের মেয়ে সে কোনদিন জঙ্গলে আসবে না। এখানে থাকবো আমরা দু’জন। বাড়ি বানানো যখন শেষ তখন সে আমার জোড়াজুড়ির কারনে নিয়ে আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসলো। সারা রাত ট্রেন জার্নি করে বেশ ক্লান্ত ছিলাম। সে তাই আমাকে বললো তুমি ঘুমাও আমি এখন যাচ্ছি বিকেলের আগেই ফিরবো। তারপর বিকেল গড়িয়ে রাত। সে আর এলোনা। বন্দি আমি না খেয়ে দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে দিলাম আরো একটা দিন। কেউ এল না। তৃতীয় দিন এত বেশি দূর্বল হলাম যে নড়তে পারলাম না। ভারি অভিমান হল আমার। মনে হল তোর বাবা আমাকে খুন করার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে। সে আমাকে না খাইয়ে মেরে ফেলার জন্যই আমাকে রেখে ভেগেছে।
তখন চারদিক ছিল জনশূন্য, কোন বাড়ি ঘর ছিলনা। চিৎকার করে ছিলাম অনেক কিন্তু লাভ হয়নি। তাই ধুকে ধুকে না মরে অভিমান করে আত্মহত্যা করি। একদিন তোর বাবা শহর থেকে ফিরে এল। আমার কংকালসার দেহটাকে ক্লজিটে ঢুকিয়ে রেখে চিরবিদায় জানালো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমি প্রহরী হয়ে আছি। কাউকে ছাড়বো না। ক্ষুদার তৃষ্ণায়, আমি তৃষ্ণার্ত। রক্ত  প্রয়োজন। আকাশের উপর আচমকা ওটা ঝাঁপিয়ে পড়ল।

অনেকগুণ শক্তিশালী ওটা। আকাশ হাতের মুষ্টি শক্ত করে বারবার লিকলিকে দেহে ঢুকিয়ে দিল। আকাশকে ছুড়ে দিল ওটা চেয়ারের উপর। পুরোনো কাঠের চেয়ারটা হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল। দুটো মোমবাতি এর মাঝে নিভে গেছে। হাসছে ওটা। বিকৃত হাসি। মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে শ্বদন্ত। মারিয়ার রুপ যেন কয়েকগুন বেড়ে গেছে। ধীর পায়ে আকাশের জীর্ণপ্রায় দেহের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ঠিক যখন আকাশের মুখের উপর নিশ্বাস নিচ্ছিল ওটা তখন চেয়ারের একটা হাতল অনেকটা বর্ষার মত ধারালো হয়ে ভেঙ্গেছিল-ওটাকে শক্ত হাতে ঢুকিয়ে দেয় ওটার বুকে। কিলবিল করে উঠল ওটা।

বাথরুমের দরজার ঠক...ঠক...ঠক শব্দে বাস্তবে ফিরলো আকাশ। বাথরুমের কমোডে বসে ঝিঁমুচ্ছিলো। ধড়মরিয়ে জেগে উঠে নিজেকে সোজা করে। ঘেমে নেয়ে উঠেছে। গা বেয়ে দরদর করে ঘাম বেরুচ্ছে। দরজার ওপাশ থেকে কাজের ছেলেটা ডাকছে। বলছে, উপর অফিস থেকে ফোন এসেছে। কমোডের উপরে রাখা ল্যান্ডফোনের সুইচটা অন করে দিলো আকাশ। রাত দেড়টা। মাইকেল কান্তি গোমজ সেলুন। দেড় হাজার ডলার। ডিল !

মোঃ জাহিদুল ইসলাম

লেখক পরিচিতি - জন্ম ১০ জানুয়ারি, ১৯৯৮। চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি ২০১৩ সালে। বর্তমানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারি বিষয়ে অধ্যয়নরত। লেখালেখির ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই।