রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

 

 

 

 

 

 


 

সোনার বিষ্ণুমূর্তি

দিনভোর গোটা এলাকাটা ঘুরলো কাকু। বিকেলে দক্ষিনদিকটা দেখা বাকি আছে বলে সেইদিকে চললো পায়ে হেঁটে। তা সে’দিকে চামারদের বস্তি ছাড়া আর কিছুই নেই দেখা গেল। খাঁ খাঁ করছে মাঠ। দূরে গোটা কয়েক গাছ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বস্তির মধ্যে একটা মোটে গাছ ছিল। বহু পুরণো, তা সেটাকেও জন চারেক লোক মিলে দড়ি দড়া বেঁধে কাটছে দেখে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। গ্রামেতেও দেখি শহরের হাওয়া লেগেছে। গাছ কেটে ঘর বাড়ী তোলা শুরু হয়েছে।

আমরা দাঁড়িয়ে গাছ কাটা দেখছি।

মাথার ওপরে তিন চারটে কি পাখি যেন খুব জোরে জোরে ডেকে ঘুরে ঘুরে উড়ছে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

হঠাৎ গাছটা মড় মড় করে উঠলো। আর যারা গাছ কাটছিল, তারা গাছকাটা বন্ধ করে লাফিয়ে উঠে সরে গেল পেছন দিকে। সরে গিয়ে তারা সবাই একসাথে মিলে সেই দড়িদড়া টেনে ধরলো। গাছটা মড় মড় করে আড় হয়ে নীচু হচ্ছে তখন ধীরে ধীরে। কাকু সরে এলো আমাদের নিয়ে কিন্তু চঞ্চল হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে ছুটে গেল সেই পড়ন্ত গাছটার দিকে।

কি দুষ্টু ছেলেরে বাবা? ভয় ডর বলে কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাকু ও ছুটলো দুষ্টু ছেলেটার পেছনে। বললো –‘এই চঞ্চল, না… না যেও না ও’দিকে এখন। গাছ পড়ছে তো, সাবধান…’।

চঞ্চল খানিক এগিয়ে গিয়েই হাই জাম্প দিলো একটা । ছেলেটা যখন নীচে এলো ধপ করে তখন তার দুধসাদা হাতের গোলাপী করতলে কিছু রয়েছে দেখে কাকু বললো-‘ওটা আবার কি চঞ্চল?’

‘পাখির বাসা, কাকু। দু’টো ছোট্ট ছোট্ট সাদামতন ডিম ও আছে এর ভেতরে। আমি দেখে নিয়েছি। এইজন্যেই তো ওই পাখিরা অতো কাঁদছিলো, কাকু। তুমি শুনলে না এসেই …’
‘কি হবে ওই পাখির বাসা দিয়ে এখন?’

‘দূরের ওই গাছগুলোর একটার ডালেতে তুলে বসিয়ে দেব। বাদল তো এক্সপার্ট ছেলে। ওর পকেটে সুতলি ও আছে। আমি ঠিক জানি। বাসাটাকে দু’মিনিটেই ও ঠিক করে গাছে বসিয়ে দেবে ডিম গুলোকে না ছুঁয়েই। জানো, কাকু। আমি অবশ্য পারবো না হিঃ…হিঃ…হিঃ….’

আবার সেই নেই কাজ তো খই ভাজ অবস্থা আমার কপালে।
পরীর দেশের রাজকুমার অতি সুন্দর ছেলে চঞ্চলের আব্দার। না মেনে আমি যাই কোথায়?’

যে গাছের ডালে বাসাটা বসিয়ে দিলুম আমি সেই গাছেই গিয়ে দেখি পাখিগুলো ও বসে পড়লো সব ঝুপ ঝাপ করে। চেঁচামেচি সব তখন তাদের একদম বন্ধ। কাকু অবশ্য বাসাটা নিচে থেকে আমার হাতে তুলে দিয়ে ছিলো সাবধানে, নইলে একলা পারতুম না আমি তা ঠিক।

গাছটা থেকে নেমে এসে আমি বললুম-‘এ’বার কি হুকুম, চঞ্চল?’

‘চল সোজা এগিয়ে গিয়ে, দেখি ও’দিকটায় কি আছে?’

‘ভূত আছে…’

‘তাই দেখবো, চল’।

তাই চললুম তিনজনে। খানিকপথ গিয়ে দেখি কিছু কোথাও নেই। নির্জন প্রান্তরে দূরে সূর্যাস্ত হচ্ছে। খুব সুন্দর দৃশ্য। পিছন থেকে একটা পাখি এসে আবার উড়ছে ঠিক আমাদের মাথার ওপরে।

‘ওই বাঁধমতন জায়গাটা কিসের বল তো বাদল? ওইটার ওপরে উঠবো চল,বাদল। সূর্যাস্ত সুন্দর দেখা যাবে’।

আমি তাই গেলুম।

চঞ্চল আগে গিয়ে লাফিয়ে উঠলো হাত চারেকের মতন উঁচু সেই মাটির বাঁধে।
আমি নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছি যে মাঠের মাঝে এই লম্বামতন বাঁধটা কিসের? ভেতরে ইট আছে হয়তো। তা এ’টা কোনকাজেই বা লাগে?

‘ওপারে কি আছে, চঞ্চল?’ আমি জিজ্ঞাসা করলুম।

‘কিচ্ছু তো নেই বাদল। শুধু বালির সমুদ্র। ওরে বাপরে….আরে আরে ঠোক্কর মারছিস কেন আমাকে। আমি কি দোষ করলুম আবার?’।

বলেই ধপ করে নীচে আমার পাশে লাফিয়ে নেমে এলো, চঞ্চল।

‘কি হয়েছে, চঞ্চল?’

‘আরে, ওই দুষ্টু পাখিটা না আমাকে ঠুকরে তাড়িয়ে দিলো। সূর্যাস্ত দেখতে ও দেবে না ও আমাকে। কি পাজী পাখি রে বাবা? আমি আবার উঠছি গিয়ে’।

চঞ্চল উঠেই কিন্তু আবার পরক্ষনেই লাফিয়ে নেমে এলো সেই পাখিটার ঠোকর খেয়ে।

দারুণ রাগ করে চঞ্চল বললো—‘আমার না বেজায় রাগ হচ্ছে, বাদল। তোর পিন পিস্তলটা একবার আমাকে দে তো, আমাকে ঠোকর মারা বার করে দিচ্ছি। দুষ্টু পাখিটার দু’টো ঠোঁটই না পিন দিয়ে গেঁথে বন্ধ করে দিয়েছি তো আমার নাম চঞ্চল নয়’।

আমি ভ্রু কুঁচকে বললুম –‘একদম না চঞ্চল। আর কাকু, তুমি এই দুষ্টু ছেলেটাকে কোলে তুলে নাও তো। একদম ছাড়বে না কিন্তু। আমার মনে হচ্ছে কিছু বিপদ আছে এই জায়গাটায়। ওই পাখিটা সব জানে। আমরা কিচ্ছুটি জানি না। আমি পরীক্ষা করবো। এখুনি আসছি…’

কাকু চঞ্চলকে তখনি নীচু হয়ে কোলে তুলে নিলো আর পাখিটা ও তাই না দেখে ফিরে চলে গেল সেই গাছটায়। এ’ কি রহস্য রে বাবা?

আমি যখন ফিরে এলুম তখন আমার হাতে সেই কাটা গাছটার একটা ছোট ডাল দেখে চঞ্চল বললো-‘গাছের ডাল দিয়ে পাখি তাড়াবি না কী, বাদল?’

আমি উত্তর না দিয়ে ডালটা নিজের শার্টের মধ্যে গুঁজে নিয়ে সেই বাঁধটার ওপরে চঞ্চলের মতন লাফিয়ে না উঠে দু’পায়ে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দু’হাতের চাপে আস্তে করে উঠে পড়লুম ।

আমার দেখাদেখি কাকু ও চঞ্চলকে নামিয়ে দিয়ে ছেলেটাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে নিজে ও উঠে পড়ল বাঁধটায়। চঞ্চল দুষ্টু ছেলে হ’লে কি হয়, ও ভীষণ বুদ্ধিমান আর কাকুর দারুণ বাধ্য ছেলে। ঠিক শ্বেতপাথরের মূর্ত্তির মতন রূপবান ছেলেটা দাঁড়িয়ে রইলো।

আমি ডালটা হাতে নিয়ে বাঁধের ও’পারে বালিতে ছুঁড়ে দিয়ে বুকে ভর দিয়ে শুয়ে রইলুম বাঁধের ওপরে। কাকুও। তবে কাকু বার বার মুখ ফিরিয়ে চঞ্চল কি করছে তাও দেখে নিচ্ছিলো।

প্রথমে কিছুক্ষন তো কিছুই হ’লো না। ডালটা বালিতে পড়েই ছিলো। তারপরে ধীরে ধীরে সেটা সোজা হয়ে উঠতে শুরু করলো আপনিই। ঠিক যেন ভৌতিক কান্ড।
ভারী দিকটা নীচু হয়ে বালিতে গেঁথে গেল। একটু পরেই গোড়ার দিকটা ডুবে গেলো আর তারপরে গোটা ডালটাও খুব ধীরে ধীরে বালিতে তলিয়ে যেতে শুরু করলো।

ব্যাপার দেখে কাকু বললো-‘বাদল, তোমার কি মহাভারতের যুদ্ধের গল্পের কথা মনে আছে? মহারথী কর্ণের রথচক্র দিনের শেষে মেদিনী গ্রাস করে ছিলো জানো তো? কুরুক্ষেত্রের বিশাল প্রান্তরের কোন ও এক অংশের মতন এও হচ্ছে সেই সর্বগ্রাসী মেদিনী। আসলে কোন নদী বা জলাশয়ের বহু পুরনো খাত। এখন সেই নদী লুপ্ত বা অন্তঃসলিলা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বালির নীচে এখন ও শক্ত মাটি নেই, হয়তো পাঁক কাদা বা জল আছে। তাই ওপরের বালি ও শক্ত নয়, চলায়মান। এই হচ্ছে সেই প্রাচীন নদীর …’

আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেললুম-‘বাঁধ বা তটবন্ধ, কাকু। যাকে ওরা হিন্দীতে তটবন বলছিলো। আর আমাকে এই বালিতেই ফেলে দেবে বলছিলো তুমি এই জায়গায় যদি আসো, ওদের বারণ না শুনে। আমাকে তাই অপহরণ করেছিলো বাড়িতে কখন আমি একলা আছি তা জেনে নিয়ে। এই তবে চোরাবালি, কাকু?’

‘একদম ঠিক, বাদল। এখন আমি বুঝে গেছি রহস্যটা কোথায়। বাদল তুমি নেমে যাও। আমি শুয়ে শুয়ে আর বুকে হেঁটে পুরো বাঁধটা এখুনি পরীক্ষা করতে চাই। তুমি পিস্তলটা নাও আমার। রেডী থাকবে। কোন কিছু এগিয়ে আসছে বা নড়ছে দেখলেই গুলি চালাবে। নো মার্সি। কুইক’।

আমি নেমে পড়লুম নীচে আর কাকু নিজের ডান হাতটা বাঁধের ভেতর দিকে ঝুলিয়ে রেখে বাঁ হাতে ভর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলো বাঁধের ওপরে শুয়েই। কাজটা খুব কঠিন। হাতে ভীষণ জোর লাগে। একটুতেই হাঁফিয়ে যেতে হয়। কাকু থেমে থেমে এগিয়ে চললো। সাথে নীচে আমরা ও।

অনেকক্ষন পরে ঘোর অন্ধকার হয়ে আসতে কাকু নেমে এসে মাটিতেই শুয়ে পড়ে বললো-‘বাদল, চঞ্চলকে বলো, ওর বাপিকে ফোন করতে। যেন এখুনি কপ্টারে চলে আসে’ ।

একটু থেমে শ্বাস নিয়ে কাকু আবার বললো—‘ততক্ষণ আমাদের এইখানেই থাকতে হবে পাহারায়, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। এখন ও হয়তো ফোর্স আসে নি। তবে আমি রহস্যের সন্ধান পেয়ে গেছি। এই বাঁধের নীচের দিকে ঠিক এইখানে একটা লোহার বোল্ট পোঁতা আছে । আর সেই বোল্টে বাঁধা আছে একটা সরু কালো মজবুত নাইলন কর্ড। দড়িটা অনেক লম্বা। সব কিছুই বালিতে ডুবে আছে আর সেই দড়ির অপরপ্রান্তে খুবই ভারী কিছু বাঁধা আছে। টেনে তোলা একলার সাধ্য নয়’।

চঞ্চল ফোন করলো।

চঞ্চলের বাপী ফোন তুলেই রাগ করে বললেন—‘আরে, আমি তো এসেই পড়েছি। যতদূর পেরেছি কপ্টারে আসবার পরে এখন পুলিশের অয়্যারলেস ভ্যানে আসছি। তুই কাকুর সঙ্গে নৌগড় গিয়েছিস শুনেই তোর মা আমাকে ফোনে তাড়া করতে শুধু বাকি রেখেছে। বাদল ছেলেটা তো হচ্ছে মাস্টার বন্ড, ওকে তো যেতেই হবে, তাই গেছে। তোর খামোকা ওই সব ডেন্জারাস জায়গাতে যাবার কি দরকার ছিল, শুনি?’

‘আমি তোকে কিন্তু ধরে এমন পিট্টি দেব যে তখন বুঝবি। তা নৌগড় বাজার আসছে। সে’খান থেকে তোরা যেখানে আছিস সেইখানে যাবার রাস্তা বল। নাঃ, সে ও তোর দ্বারা হ’লে তো। ফোনটা তোর কাকুকে দে শীগ্গির করে দেখি…’।

তারপরে তো কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ নিয়ে ভ্যান এসে হাজির।

তখন কাকু সব চোরাই মাল উদ্ধার করতে শুরু করলো।

একটা নয় চারটে বোল্টে বাঁধা বিরাট বিরাট সব বান্ডিল টেনে তোলা হ’লো। সোনার বিষ্ণু মূর্ত্তির সাথে অনেক অনেক অন্য সব ঠাকুরের মূর্ত্তি আর গয়না পত্র টাকা পয়সা বহু কিছু দামী জিনিষ উদ্ধার করা হ’লো। পুলিশ সতর্ক ছিলো বলে চোরেরা সব চুরি বা ডাকাতী করে নিয়ে এসে ও কিছুই বিক্রী করে উঠতে পারে নি।

তবে আমার কিন্তু মনে হয় যে এইবার আর চোর ডাকাতগুলোর কোন নিস্তার নেই,
তা ঠিক। বিশেষ করে চঞ্চল সমেত সবাইকে পুড়িয়ে মারবার অপচেষ্টার কথা শুনে চঞ্চলের পুলিশ অফিসার বাপী যা রাগবে না।
এখন ও তো সে’কথা কিছু জানেই না …হিঃ হিঃ হিঃ …

কাকু, কিন্তু তখন সেই সমস্ত জিনিষপত্র পুলিশের জিম্মাতে দিয়ে আমাদের দু’জনের হাত ধরে নিয়ে ছুটলো বাড়ী মানে বাসার পথে।

আমাদের গায়ের গরম আর ধূলো ময়লা কাটাতে আগে তিনজনে করলুম সেই কূয়োর মিষ্টি ঠান্ডা জলে চান তারপরে চিঁড়ে টিঁড়ে যা ছিলো জলে ভিজিয়ে পেট পুরে খেয়ে নিলুম।

আর তারপরেই কাকু জিনিষপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে গাড়িতে উঠে পডলো। সেই ঘরে আর থাকে কাকু চঞ্চলকে নিয়ে?

আমি কিন্তু গাড়ির পিছনের সীটে শুয়ে একটু পরেই একদম ঘুমিয়ে গেলাম। চঞ্চল ও ঘুমিয়ে পড়েছিলো আমার পাশেই শুয়ে, খানিক পরে। কিন্তু কাকু ঠায় জেগে বসে ছিল।

সকাল হয়ে যাবার পরে আমার ঘুম ভাঙতে উঠে দেখি ততক্ষনে আমরা কাশীর গঙ্গার ব্রিজ পার হয়ে এসেছি।

তার মানে বাড়ী তো এসেই গেছে। আর কি?

 

জি০সি০ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ।