রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

 

 

 

 

 

 


 

সোনার বিষ্ণুমূর্তি

আমার নাম বাদল।

আমার বয়স তেরো হ’তে চলেছে।
দুপুর বেলা। আমার কাকুর জায়গায় সে’দিন আমিই কম্প্যুটারে একটা গল্প লেখবার চেষ্টা করছি ঘরে বসে। কাকু তো আমাকে আর চঞ্চলকে নিয়ে অনেক গল্প লিখেছে আজ অবধি।

কাকু নিজের ভাইপো ও আমার একমাত্র বন্ধু, আমি যাকে ভাই বলি, সেই পরীর দেশের রাজকুমার অতি সুন্দর দুধের বরণ ছেলে চঞ্চলকে সাথে নিয়ে একটু বেরিয়েছিলো।

কাল সন্ধ্যায় যে নাছোড়বান্দা মতন একজন লোক এসে কাকুকে নৌগড়ে অনুসন্ধানের জন্যে যেতে বার বার করে বলছিল সেই লোকটার বিষয়ে কাকু কিছু খোঁজখবর নিতেই বেরিয়েছিল বলে আমার মনে হয়। লোকটা কাকুকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু টাকা পয়সাও না কি দেবে বলেছিল। কিন্তু কেসটা ঠিক বুনো হাঁসের পেছনে ধাওয়া করে বেড়ানোর মতন বলে কাকু রাজী হচ্ছিল না। তবে কাকু সেই সব তো এখন আমাকে কিছু বলেও যায় নি।

আজকাল এই এক কি যে মুশ্কিল হয়েছে সে আর বলবার নয় কেননা কি করে যেন সব্বাই জেনে ফেলেছে যে কাকু একজন খুব বড় রহস্যানুসন্ধানী বা ডিটেক্টিভ। কাকু যেন সবজান্তা আর সব কিছু করতে পারে। এটা বিপজ্জনক হ’তেই পারে ইয়ু০পি০র মতন অপরাধিদের স্বর্গরাজ্যে।

নৌগড়ে নাকি ইদানিং চুরি চামারি এমন কি ডাকাতী ও বেজায় বেড়ে যাওয়ায় কাকুর সাহায্যের দরকার হয়ে পড়েছিল। লোকেদের বাড়ির দামী জিনিষপত্রের সাথে গত সপ্তাহে কয়েকটি মন্দির থেকে ঠাকুরের কষ্টিপাথরের ও অষ্টধাতুর মূর্ত্তি ও শেষে সেখানকার গড়ের বিখ্যাত মন্দির থেকে সোনার বিষ্ণু মূর্ত্তি অবধি চোরের দল অনায়াসে গায়েব করে দেওয়ায় আশেপাশের সব গ্রামের লোকেরা ক্ষেপে উঠে পুলিশের ওপরে ভরসা ছেড়ে দিয়ে শেষে নিজেরাই চোর ধরবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তাদের পক্ষ থেকেই সেই লোকটা না কী এসেছিলো।

তা সেই নৌগড় যে ঠিক কোথায় সেটাই আমি বুঝতে পারিনি বটে তবে এটুকু বুঝে ছিলাম যে ঐতিহাসিক বিজয়গড় বা চুণারগড় আর নৌগড় সম্বন্ধে টি০ভি০তে কি চন্দ্রকান্তা না কি যেন একটা ধারাবাহিক অনেক দিন ধরে চলেছিল, সেই সব গল্পের জায়গায় কোথাও হ’তে পারে।

চুণারগড় তো মির্জাপুর জেলায় গঙ্গার ধারে,তা আমি জানি এবং সে’খানে কয়েকবার কাকুর সাথে গিয়েছি ও কিন্তু নৌগড় না কি সেখান থেকে অনেকটা দূরে। সে’খানে গঙ্গা নেই বটে কিন্তু নদী একটা ছিল, কি সরগো না কি যেন নাম ঠিক জানি না। শুনেছি সেই নদী ছিল চুণারের আগে প্রবাহিত জারগোর এক শাখা নদী। তবে জারগো নদীর অস্তিত্ব থাকলেও সেই শাখা নদীর নাকী এখন আর কোন চিহ্ন ও নেই। কবে মরে হেজে শুকিয়ে গিয়েছে।

সে না থাকুক গিয়ে চিহ্ন। আমি তখন সেই নদী নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে লোকটা কি করে খবর পেল কাকুর বিষয়ে তাই ভাবছিলাম।

তাই আমার গল্পটা তাড়াতাড়ি করে আর লেখা হচ্ছিলো না বিশেষ।

হঠাৎ বাধা পড়লো। দরজায় কলিং বেল বাজলো।

আমার মনে হ’লো কাকুরা তাড়াতাড়িই হয়তো এসে পড়েছে। কিন্তু বাড়িতে তো একলা আমি আছি তখন, তাই কাকুর নির্দেশ মেনে একটু সাবধান হয়েই আমাকে যেতে হবে।

আমি আমার বিশেষ জুতো জোড়া ও গেন্জির ওপরে শার্টটা পরে নিয়ে তবে গেট খুলতে চললুম। ঘরের দরজাটা বেরিয়েই টেনে দিলুম আমি। দরজা অটোমেটিক ভাবে লক হয়ে গেল। এখন চাবী ছাড়া আর খোলা যাবে না। চাবী আমার কাছে নেই ও। সে একটা আছে কাকুর কাছে আর অন্য একটা আছে বাড়িতেই, তবে একটা গোপন জায়গায়।

আমি গিয়ে সদর দরজাটা একটুখানি খুলে দেখি যে এসেছে সে কাকু নয় মোটেই। অন্য একজন বুড়ো মতন ভদ্রলোক এসেছেন কাকুর সাথে দেখা করতে কোন জরুরী কাজে। মাথার চুল যদি ও সব সাদা কিন্তু তিনি বেশ বলিষ্ঠ লোক। হাতে একটা লাঠি ও আছে। ব্যাপারটা বেশ বেমানান মনে হ’লো আমার।

একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে লোকটা চেয়ে আছে দেখে মনে মনে ভাবলুম-‘আমি কি চঞ্চলের মতন অপরূপ সুন্দর ছেলে না কি যে এতো করে আমাকে দেখছে। কাকু অবশ্য আদর করে বলে যে আমি বেশ স্মার্ট, চকচকে ঝকঝকে আর সুন্দর ছেলে। দেখলেই কাকুর না কি আমাকে আদর করতে ইচ্ছে হয়। সে কাকু বলুক গিয়ে যা খুশী, কাকুর কথা আলাদা। কিন্তু এই লোকটা হয়তো আমাকে চিনে রাখছে’।

আমি চেন লকটা না আটকেই দরজা আর একটু খুলে মুখ বার করে বললুম –‘এখন তো আমার কাকু বাড়ি নেই আংকল, আপনি প্লীজ একঘন্টা পরে যদি আসেন তা’হলে দেখা হ’তে পারে’।

তিনি উত্তরে কোন কথাই না বলে নিজের হাতের লাঠিটা আমার সামনে একটু উঁচু করে তুলে ধরলেন। আমি ভাবলুম এ বেশ মজা তো। কিন্তু আমি কিছু বুঝে উঠতে পারবার আগেই সুঁইইইই…………… করে কেমন একটা যেন শব্দ হ’লো আর আমার নাকে বেশ মিষ্টি মতন তীব্র এক গন্ধ এসে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে বোঁ করে আমার মাথাটা ঘুরে গেল।

নিজের ভূলটা তখন আমি বেশ বুঝতে পারলুম কিন্তু লোকটা তৈরী হয়েই এসেছিল।
আমি কাকুর ট্রেনিং মতন দম বন্ধ করে নিয়ে মাথা নীচু করতেই তিনি বললেন-‘কাম হো গিয়া রাম সিং, আব লে চলো ইস লৌন্ডে কো উঠা কর’।

কি কান্ড রে বাবা। দিনদুপুরে ছেলে ডাকাতী। কি করতে চায় আমার মতন একটা সাধারণ ছেলেকে নিয়ে এরা? দেখাই যাক।

একটা গুন্ডামতন লোক দৌড়ে এসে আমাকে ধরেই একটা পাঁচ বছরের ছোট্ট বাচ্ছা ছেলের মতন করে একটানে নিজের কোলে তুলে নিলো। আমাকে সে তার কাঁধে ও তুললো না দেখে মনে হ’লো যে লোকটার গায়ে বেশ জোর আছে, কাকুর মতন। আমি তখন অগত্যা হাত পা ছেড়ে দিয়ে একদম অজ্ঞান হয়ে পড়বার ভান করলুম। কি আর করবো?

সেই লোকটা নীচু স্বরে অন্য কাউকে বললো-‘নাটে, দোপহর মে ভীড়ভাড় হ্যায় নহী, গেটকে পাশ রিক্সা লে আও অউর রাম সিং কো বৈঠাও। সড়ক তক জল্দি সে লে চলো। বঁহা মেরি গাড়ী মে ইস লৌন্ডে কো তুরন্ত লেটা দো। শালে জাসুস কো রোকনা হোগা হর হাল মে। নহি তো সব গড়বড় …….’

তারপর নিজের মনেই বললো -‘শালে বঙ্গলিয়া জাসুস অগর ইস পর ভি না মানে, তো ফির ইস লৌন্ডে কো উঠাকর তটবন সে…. খিক …খিক …খিক…’

আমাকে রিক্সায় তুলে সড়কে নিয়ে এসে সে’খানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা টাটা সুমোর মতন দেখতে গাড়ির পেছনের লম্বামতন সীটে ঠেলে শুইয়ে দিলো। রুমাল দিয়ে আমার মুখটা বেঁধে দিয়ে দরজা লক করে দেবার আগে আবার কি যেন ভেবে আমি অজ্ঞান হয়ে আছি দেখে ও সে আমার হাত দু’টোও বেঁধে দিলো।

ঠক ঠক করে শব্দ শুনে মনে হ’লো ততক্ষনে সেই লাঠি হাতে লোকটা এসে সামনের দিকের সীটে বসেছে। হয়তো রাম সিংই ড্রাইভার। নাটে ও হয়তো আছে। মোটমাট তিনজনের গ্যাং।

কেউ কিছু বোঝবার আগেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ছেলে ধরার পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেলো। মনে হ’লো যে এই গাড়িটার গায়ে এ্যাম্বুলেন্স লেখা থাকলেই কোন লোকের আর কিছুই বলবার বা জিজ্ঞাসা করবার থাকবে না। বেশ ফন্দি । হয়তো ছিল ও লেখা কিন্তু তা অবশ্য আমি দেখতে পাইনি।

গাড়ী এগিয়ে চলতে শুরু করেছে তখন।

বেশ খানিকক্ষন পরে আমার গায়ে জলো বাতাস লাগতে বুঝলুম আমরা গঙ্গা পার হয়ে বেনারসের বাইরে চলেছি। গাড়ী সোজাই যাচ্ছে অর্থাৎ মোগল সরাই হয়ে চাকিয়া চন্দৌলির দিকে হয়তো যাবে । দেখা যাক কি হয়।

আমার সাইড সিটের নীচে একটা স্পেয়ার চাকা পড়ে ছিলো। আমার তখন কিচ্ছুটি তো করবার নেই। তাই নিজের পা দু’টোকে খুব আস্তে আস্তে মুড়ে ডানপায়ের জুতোর গোড়ালিটা হাতের কাছে আনলুম। অনেক কষ্টে আঙুল দিয়ে টিপে ধরে হিলটা ঘুরিয়ে একটা মোটা সূতোর মতন জিনিষ টেনে বার করে হাতের বাঁধনের ওপর দিয়ে টেনে দিতেই বাঁধন কেটে গেল।

জিনিষটা বিদেশী আয়রণ কাটার। কাকু যোগাড় করে দিয়েছে আমাকে। লোহার বন্ধন হ’লেও কাটতো। তারপরে জিনিষটাকে আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে পা সোজা করলুম তেমনি ধীরেই। মুখের বাঁধনটা খুললুম না। পুরো কাজটা করতে অনেকটা সময় নষ্ট হ’লো। তারপরে আবার চুপচাপ।

নেই কাজ তো খই ভাজ হচ্ছে আমার কাকুর নীতি।

হাতে কোন কাজ না থাকলে কাকু এই নীতি মেনে নিয়ে আমাকে ও চঞ্চলকে ধরে আদরে আদরে এক্কেবারে অস্থির করে তোলে। কাকুর সেই নীতি অনুসারে এখন আমি ও শুয়ে শুয়েই হাত দিয়ে জামার পকেট থেকে একটা মোটামতন পিন বার করে ডান হাতটা নীচু করে চাকাটার হাওয়া ভরবার ভাল্বের মুখে আস্তে করে চাপ দিলুম।

ফুসসসসস করে শব্দ হ’লো।

আমি একটু থেমে গেলুম। কেউ শুনতে যেন না পায়। তারপরে আবার চাপ দিলুম। এই করে করে সেটাকে ফ্ল্যাট টায়ার বানাতে বেশ মজা লাগছিলো আমার।

মোগলসরাই আসতে আসতে আমার সে কাজ ও শেষ। তখন আর কি করি ভাবছি।

সে’খানে গাড়ি থামলো।

বিকেল পড়ে এসেছে মনে হ’লো তখন।

রাম সিং নেমে গেল হয়তো চা বা ঠান্ডা কিছু আনতে। গরমকাল। কিছু তো ওদের দরকার হবেই। আমি চোখ মেলে দেখলুম । বুড়োর লাঠিটা তার সীটের পিছনে ঝুলছে। যাক, ভাগ্য সদয়। গাড়ী চলুক। ওই লাঠিটাকে ঠিক বাগাতে হবে। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। মিনিট দুই পরেই গাড়ী ও আবার হাইস্পীডে চলতে শুরু করলো আর রাস্তাও ভাঙ্গাচোরা খারাপ পড়তে শুরু হ’লো।

বেশ পুরণো গাড়ি বলে দারুণ জার্কিং দিচ্ছে তখন। কিন্তু ওরা তবু ও অতো স্পীডে চালাচ্ছে কেন তা বুঝলুম না। হঠাৎ পিছনে কোঁ …কোঁ ..করে সাইরেন বেজে উঠলো। পুলিশের জীপ বা অ্যাম্বুলেন্স কিছু একটা হবে মনে হয়।

এইবার সাইড দিতে সচেষ্ট হ’লো আমাদের গাড়ী। তবে তো ঠিক পুলিশেরই গাড়ী আগত কিন্তু তারা তো আর কিছু জানে না তাই থামবে ও না।

রাস্তাটা সরু মনে হয় বেশ। কাকু আমাকে এই বয়সেই ভালোই ড্রাইভিং শিখিয়ে দিয়েছে। তাই মনে হ’লো, এইরকম রাস্তায় সাইড দিতে হ’লে স্পীড কমাতেই হয়। নইলে….।

পাশ দিয়ে সাইরেণ বাজানো গাড়িটা হুশ করে পাশ করলো আর আমাদের গাড়িটা সমান স্পীডে চলবার ফলে রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে বাঁ পাশে নীচু হয়ে যেতেই কোন গাছ বা অন্য কিছুতে দমাস করে প্রচন্ড এক ধাক্কা মেরে ঘুরে গিয়ে উল্টে যেতে যেতে ঝপ করে যেন সামনের দিকে নীচু হয়ে গিয়ে খড়র খড়র খড়র করে শব্দ করে চলতে চলতে হঠাৎ খ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেলো ।

সেই ধাক্কায় আমি নীচে গড়িয়ে পড়লুম আর সেই লাঠিটা এসে আমার গায়ের ওপরে পড়লো। বেশ লাগলো আমার পড়ে গিয়ে কিন্তু ব্যথা সামলে আগে লাঠিটাকে আমি সীটের নীচে একদম ভিতরে ঠেলে দিলুম।

ততক্ষনে সবাই গাড়ী থেকে নেমে পড়েছে আর অন্ধকার ও হয়ে এসেছে দিব্যি। আমি যেন পড়িই নি তাই দেখাতে নিঃশব্দে হাতে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে সীটে উঠে শুয়ে পড়লুম আবার।

আমার দিকে তখন কারো বেশী নজর নেই মনে হ’লো।

কে একজন বেশ হতাশ গলায় বাইরে থেকে বললো-‘হায় রাম, ই তো সত্যানাশ হো গিয়া। অগলা বাঁয়া চক্কওয়া নিকল গয়ল হও, ধক্কে সে। চার কে চারো নাট গায়ব। জবর বচ গইলি লেকিন অব কা হোই? স্পেয়ার নিকাল কে ফিট কর নাটে পহলে, আউর টর্চ লে আকর খোজ, উ পহিওয়া সরবা ছটককে গয়ল কঁহা’।

শুনে আমার তো খুব মজা লাগলো। হিঃ …হিঃ …হিঃ করে ঠিক হেসেই ফেলতুম পরিস্থিতি একটু ভালো থাকলে।

সেই একটা কবিতা আছে না--গাড়ির চাকা ছিটকে পালায়, উল্টে বুঝি পড়বে নালায়…., এই গাড়ির ও সেই অবস্থা হয়েছে মনে হয়। সে বেশ মজা।

এইবার তাদের বাধ্য হয়ে পেছনের দরজার লক খুলতে হ’লো। আমি তেমনিভাবেই শুয়ে পড়ে আছি দেখে তারা বিশেষ নজর ও দিলো না আমার দিকে। তারা চাকাটাকে ধরে নীচে নামাবার জন্য টানাটানি শুরু করে দিলো।

খানিক পরে সেটা দমাস করে নীচে পড়লো গিয়ে। দরজাটা ঠেলে দিয়ে চাকাটাকে গড়িয়ে নিয়ে চললো তারা।

তখনই কে বললো-‘আবে, ই তো সরবা পাংচর হো গয়ল বা হো। আব পহলে খোজ উ পহিয়া গয়ল কিধর? ও হি কে ফিট করে কে পড়ি। চার ঠে নাট ভি চাহি’।
মনে হয় সে রাম সিং।

আর একজন বললো—‘আরে নীচে কঁহি পর ছটককে যাকে গিরল হোই পহিয়া। নাটে, তু জল্দি সে যো, আউর উঠা উসে’।

সকলে চাকা তুলে আনতে ছুটলো আর আমি সেই লাঠিটা বাগিয়ে নিয়ে টুপ করে বেরিয়ে এলুম গাড়ী থেকে।

ওরে বাবা, দেখি যে বুড়োটা যায় নি মোটেই। পাহারায় আছে ।

আমাকে দেখতে পেয়েই সে তেড়ে এলো হাতে এই বড় এক ছুরি নিয়ে। আমি তখন কি করি? চট করে সেই লাঠিটা তুলে নিয়ে তার ডগাটা তার মুখের দিকে এগিয়ে দিলুম আর আগেই দেখে রাখা সুইচটা চেপে ধরে রইলুম।

সুঁইইইইইইইই….

ধপ করে পড়ে গেল লোকটা নিঃশব্দে ঠিক একটা আলুর বস্তার মতন। ছুরিটা ছিটকে গেল। সেটাকে তুলে দূরে গাছের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তখন সেই বস্তাটাকে টেনে এনে আমার সীটে তুলে শুইয়ে দেওয়া কি সহজ কাজ না কী? আমাকে একলাই করতে হ’লো তা ও। অবশ্য চঞ্চল সঙ্গে থাকলে একটু সুবিধে হ’তো।

ততক্ষনে চাকা তুলে নিয়ে আসছে অন্য দু’জন। দেখেই আমি গাড়ির আড়ালে সরে গেলুম।

তারা আমি শুয়ে আছি কিনা দেখে নিয়েই চাকা ফিট করতে বসে গেলো।
আমি সরে এসে রাস্তার উল্টোদিকের কয়েকটা গাছের আড়ালে আড়ালে চলে গেলুম অনেকটা। শেষে গাছেতেই উঠবো কি না ভাবছি একটা মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে কেননা চাকা ফিট হলেই সব ধরা পড়ে যাবে যে আমি নেই, তখন হঠাৎ দেখি সামনে থেকে এক মোটর সাইকেল আরোহী আসছে। সে এসে থামলো আর নির্জন পথ দেখে ইঞ্জিনটা বন্ধ না করেই দ্রুত নেমে পড়ে ছুটলো এক নম্বর সারতে। আমি ও লাঠিটা নিয়ে গিয়ে উঠে পড়লুম তার মোটর সাইকেলের সিটে।

লোকটা কিন্তু বেজায় চালাক। ঠিক নজর রেখেছিল। গাড়ির হেডলাইট তো জ্বলছিল। দেখে ফেলেছে। তা আমি বসেই আছি লোকটা তেড়ে আসছে দেখেও। আসুক। ওকে আর বেশী চিৎকার করতে দেওয়া উচিৎ নয়। আমার কলার বা চুলের মুঠি টেনে ধরবার জন্য সে হাত বাড়িয়ে আরো কাছে আসতেই আমি লাঠিটা তার দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বোতামটা টিপে দিলুম। লোকটা গড়িয়ে পড়ে যেতে লাঠিটাকে ঠিক করে বাইকের গায়ে আটকে বেঁধে নিয়ে সাইড স্ট্যান্ড সরিয়ে দিয়ে দু’হাতে হ্যান্ডেল ধরে বসে ক্লাচ টিপে গিয়ার দিলুম। দেখতে দেখতে থার্ড গিয়ার।

ডাকাতির বদলে ডাকাতিতে মনে হয় দোষ নেই। চুরী তো আর আমি করিনি। এখন বাড়ী পোঁছলে বাঁচি।

অবশ্য হ্যান্ডেলটা আমার পক্ষে বেশ বড়। দু’হাতে ধরে বসে থাকা সহজ নয়। কবে যে বড় হবো মা দুর্গাই জানেন।

আমি ঠিক করলুম যে চুরির মোটর সাইকেলটাকে বাড়ী পৌঁছানোর আগেই সড়কে কোথাও ফেলে রেখে দিয়ে যেতে হবে। আধ মাইলটাক আগে হ’লেই হবে। অতোটা রাস্তা না হয় লাঠি হাতে নিয়ে হেঁটেই যাবো, আর কি?

চঞ্চল আর কাকু কি করছে এতোক্ষন তা কে জানে? তবে আমি কিন্তু একটু ও ভয় পাইনি, সত্যি বলছি। কিন্তু এই ঘটনার পরে যদি কাকুর সাথে আমাকে নৌগড় যেতে হয় তবে ছদ্মবেশ একটু নিতেই যে হবে, তা ঠিক। নইলে আমাকে দেখলেই তো চিনে ফেলবে।

বাড়ী পৌঁছে দেখি তখন ও সেখানে হৈ হৈ কান্ড চলছে। কাকু বাড়ীতে ফিরে এসে আমাকে কোথাও না দেখতে পেয়ে চঞ্চলের বাপীকে ফোন টোন করে চারদিকে আমার খোঁজে পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েছে অনেক। সে যাক গিয়ে, তারা সকাল নাগাদ আমার ফেলে আসা মোটর বাইকটা হয়তো ঠিক খুঁজে বার করবে।
চঞ্চল ছুটে এসে নিজের নরম চকচকে দুধসাদা হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিলো। অপরূপ সুন্দর ছেলেটার পদ্মপত্রের মতন টানা টানা বড় বড় চোখে জল টল টল করছে তখন ও। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো-‘বাদল, তুই কোথায় গিয়েছিলিস এইভাবে? সদর দরজা খুলে রেখে দিয়ে? আর তোর হাতে লাঠি কেন? তোর কি কোথাও চোট লেগেছে?’

আমি হেসে বললুম-‘চঞ্চল, অনুমান কর দেখি কি হয়েছিলো। মাথা ঠান্ডা করে বল’।

চঞ্চল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো-‘আমি এখন কিচ্ছু বলতেই পারবো না। তুই বাড়িতে নেই দেখে আমাদের মাথা ঘুরে গিয়েছে। কাকু বলেছে তোকে কে বা কারা এসে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছে। তুই কাউকে দরজা খুলেছিলিস হয়তো কাকু এসেছে ভেবে সিকিউরিটি চেন ছাড়াই, তখন…..’

আমি শুনে বললুম-‘কাকু একদম ঠিক বলেছে, চঞ্চল। খানিকটা হয়রানি গেল আমার একটু ভূলের জন্য আর কি, তবে গন্ডগোল দেখা গেল বেশ বেড়েছে। মনে হয় সেই নৌগড়ের কয়েকজনই এসেছিলো খবর পেয়ে যে কাকু এই কেসটা হাতে নিয়েছে। এর সাথে একটা বড় গ্যাং কিন্তু জড়িয়ে আছে। শুধু ছিঁচকে চোরের দল এরা নয়। কোন বিদেশী শক্তির সাহায্য ও আছে। এই লাঠিটাই তার প্রমাণ। এটা এই দেশের তৈরী জিনিষই নয়, চঞ্চল। এই লাঠির অনেক গুণ আছে। দেখে আমি ও বুঝতে পারিনি প্রথমে’।

‘তবে আমাদের আজ আর এখুনি পালাতে হবে এ’খান থেকে দ্বিতীয় আক্রমন হবার আগেই। ঘরে চল এখন। কাকু কোথায়? সব বলছি’।

কাকু প্রথমে আমার কথা সব শুনে নিয়ে তারপরে বললো—‘বাদল, তুমি ঠিকই বলেছো। আজই রাতে পালাতে হবে আমাদের। ওদের জায়গাতেই গিয়ে হাজির হবো আমরা, তবে সুরক্ষা চাই। রাস্তায় আর সে’খানে বিশেষ পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা আমি করছি। তবে এই যাত্রায় ছদ্মবেশ ও একটু চাই আমাদের। বিশেষ করে বাদল, তোমার জন্যে তো চাইই। দেখি, দাদাকে আবার ফোন করি। ভালো গাড়ী ও আমাদের চাই একটা। নৌগড়ের কাছে কোথাও থাকবার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রেনে আমরা যাব না। সুবিধাজনক ট্রেন ও নেই আর সময় ও যাবে অনেক। সেই সাথে আমাদের বন্ধুদের নজরে পড়বার ভয় ও থাকবে। মনে তো হয় বেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আর নৌগড়ের গোটা জঙ্গুলে জায়গাটা ও না কী নক্সাল প্রভাবিত। দাদা বলছিলো।’

‘তা চঞ্চল, বাদল তো নিজেই এসে গিয়েছে। ওকে উদ্ধার করে আনতে যেতে হয় নি আমাদের বলে অনেকটা সময় ও বেঁচে গিয়েছে। তাই ততক্ষনে তোমরা দু’জনে মিলে আমাদের সব কিছু দরকারী জিনিষপত্র গুছিয়ে নিয়ে নাও গিয়ে। আলো নিবিয়ে রেখে খানিকক্ষন দেখতে হবে তারা কেউ হয়তো আসতে পারে আবার রাতে আর নাহ’লে বেরিয়ে পড়া যাবে তখন….’

চঞ্চল সুন্দর হেসে বললো-‘চল বাদল, আমরা তৈরী হয়ে নিই গিয়ে। রাতের খাবার দাবার কাকু সব তৈরী করে নেবে ততক্ষনে ঠিক। খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়লেই হবে’।

জি০সি০ভট্টাচার্য, বারাণসী, উত্তর প্রদেশ।