রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

প্রতিহিংসা

আমার নাম বাদল।

আমার নাম এখন হয়তো অনেকেই জানেন কাকুর লেখালিখির কল্যাণে।

আমি চঞ্চলের বন্ধু থেকে এখন তো ভাই হয়ে গেছি আর আমি এখন তো একটু বেশ বড় ও হয়েছি। বারো বছর বয়স হয়ে গেছে আমার অনেক দিন। তেরো চলছে। তাই কাকুর মত করে গল্প লেখবার জন্য চেষ্টা ও করি আমি মাঝে মাঝে কিন্তু কেমন যে হয় তা কে জানে?

অবশ্য আমার দেখাদেখি পরীর দেশের রাজকুমার ছেলে চঞ্চল ও লুকিয়ে লুকিয়ে এই কর্মটি করে থাকে। তা আমি ঠিক জানি। তবে এখন চঞ্চল মাঝে মাঝে বাড়িতে মায়ের কাছে ও গিয়ে থাকে দরকারে আর কাকুর সেটি তো মনে হয় একদম পছন্দ নয়। অবশ্য বারণ ও করে না।

কাকু আমার সব কিছু দেখাশুনা করে। এক কথায় আমি কাকুর খুব আদরের ছেলে হয়ে গেছি এখন, তা সবাই জানে। আমি বড় হয়েছি তো তাই কাকু এখন রোজ সকালে আমাকে আধ ঘণ্টা ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করায় আর রবিবারে বসে আমার রূপের চর্চা ও করে ।

তা আমি কি আর পরীর দেশের রাজকুমার চঞ্চলের মতন অপরূপ সুন্দর ছেলে হ’তে পারি নাকি? কিন্তু কাকুকে সে’কথা কে বলে? কাকুর ব্যবহারে এই পরিবর্তন দেখেই আমার সন্দেহ শুরু হয়েছে যে কাকু কি আমাকে চঞ্চল তৈরী করছে না কি তার বিকল্প? কাকু যা অভিমানী ছেলে না, অসম্ভব কি?

এ’সব হয়তো শৌখিনতা কিন্তু আমাকে সাজিয়ে কাকু মনে হয় আত্ম সন্তুষ্টি পায়।
এই যেমন কাকুর ধারণা হয়েছে যে আমার নাকি দিনে দু’বার ফেস ও মাউথ ওয়াশ করা চাই, রাতে ক্লিনিং, টোনিং আর ময়েসচারাজিং আরো কত কি সব না করলে নাকি আমার নরম ত্বক চকচকে আর ভালো থাকবে না । আর ও আছে । ষ্টীম বাথ ও চাই আমার, বিশেষ করে শীত কালে আর চাই বডি স্ক্র্যাবিং।

আমি যত বলি কাকু আমি কি তোমার মেয়ে নাকি যে এত সব আমার জন্যে চাই। তা কাকু শুনলে তো। বলে তুমি আমার মেয়ে আবার ছেলে দুই ।

রবিবারে বডি স্ক্র্যাব করার জন্যে কাকু গরম দুধে খানিকটা পাউরুটি ভিজিয়ে তাই দিয়ে কাজ চালায়। আমি কৃত্রিম প্রসাধন পছন্দ করি না বলায় এই ব্যবস্থা। রাত্রে আমার ন্যাচারাল ফেস ক্রীম হয়েছে দুধের সর। আমি নাকি খুব সুন্দর ছেলে, তাই এত সব ব্যবস্থা। দুৎ….যত সব বাজে কথা।

তা সেদিন আমার রূপের পরিচর্যা সব সারতে বেলা সাতটা বেজে যেতে কাকু আমাকে নিয়ে জলখাবার খেতে বসেছে আর তখনই ফোনটা ঝনঝনিয়ে বেজে উঠলো আর কাকু রেগে গেল । আমার প্রসাধন করা তখন ও বাকি যে।

ফোনে সুদূর দিল্লী থেকে চঞ্চলের বাপী কথা বলছিলেন। কে একজন বেশ বড়লোক সে’খানে আত্মহত্যা করেছেন না খুন হয়েছেন তাই কাকুর ডাক পড়েছে। তা পড়তেই পারে। গরীব কেউ মারা গেলে কেউ জানতে ও তো পায় না কেননা সেটি নিউজ হয় না এই গরিবের দেশে। যেমন কুকুর বেড়াল তো রোজ কতোই মরে, সে আর কি নিউজ হয়?

তবে কাকু সাফ বলে দিলো যে এখন আমি কাজে একটু ব্যস্ত আছি আর ট্রেনের বার্থ রিজার্ভ ও তো করা নেই, তাই দিল্লী গিয়ে তদন্ত করা এখন সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

এই বলে ফোন রেখে দিয়ে ফিরে এসে বসে দু’গাল মুখে দিয়েছে কি দেয় নি কাকু, আবার ফোনটা বাজতে লাগলো। কি? না তোকে আসতেই হবে । আমার কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে, তাই ই-মেল আই ডিতে টিকিট পাঠিয়ে দেব প্লেনের। বেনারস থেকে দিল্লী। মাষ্টার বন্ডকে সঙ্গে নিয়ে তুই চলে আয়। কেসটা গন্ডগোলের মনে হচ্ছে বেশ। আত্মহত্যা না ও হ’তে পারে। কিছু ব্যাপার তো আছেই কিন্তু কোথায় যে অসঙ্গতিটা আছে, ধরতেই পারছি না। ।

জ্বালাতন আর কাকে বলে? কাকুর তখন ও আমার প্রসাধন করতে এক ঘণ্টা চাই। করে কি? তাই ই-মেল আই ডি বলে দিয়ে কাকু পালিয়ে এলো।

জল খাবার শেষ হ’তে আমাকে কাকুর ভাষায় সাজঘরে নিয়ে গিয়ে ক্রিম, পাউডার,
কাজল পরানো থেকে আর কত কি যে লাগানো শুরু হোল, সে সব লেখা কঠিন। সব শেষ হ’তে তখন আমাকে একটা খুব দামী সুন্দর ঝকঝকে ড্রেস পরিয়ে দিলো কাকু আর তখন আমি সত্যি সত্যি যেন একটা পরী ছেলে হ’য়ে গিয়েছি।

ততক্ষণে আবার ফোন। বড়লোকের বাড়ির কেস। পুলিশকে ও তারা যা বলবে তাই করতে বাধ্য হবে। টাকার এমনি মহিমা।

আর কাকু ও তখন জব্দ। হিঃ…..হিঃ…..হিঃ... সে বেশ মজা ।

‘টিকিট পেয়েছিস’?

‘না। দেখছি’।

‘দেখ। কনফার্ম কর দেখে নিয়ে, প্লীজ। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট তিনটেয়। মোটে তো দেড় ঘন্টা লাগে। গাড়ি থাকবে এয়ারপোর্টে’।

আমার কিন্তু বেশ মায়া হোল কাকুর জন্য এ’বার।

আমি গিয়ে কাকুকে বললুম-‘ তুমি না কাকু, আমাকে এখন দাও কম্পুটার। আমি ডাউনলোড, প্রিন্ট সব করছি টিকিটের। তুমি রান্না কর গিয়ে আর বলো, যদি যেতে চাও তবে ট্রলি ব্যাগ আর অ্যাটাচি ও গুছিয়ে নি আমি’।

আমার ঝকঝকে মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে কাকু একটু বিরক্তভাবে বলল -‘যাবো, আর কি উপায়? কি জ্বালাতন রে বাবা। দাদার পুলিশী ডিটেকটিভগিরির চাকরির না কাঁথায় আগুন। ছ্যা...তবে তুমি আমাদের জিনিষপত্র-- কম্পাস আর মেটাল ডিটেক্টারগুলো কিন্তু সঙ্গে নিয়ে নিও। আর চেক ইন লাগেজে ঢুকিয়ে রেখো, কেবিন হ্যান্ডব্যাগে নয় কিন্তু।

আমার কেবিন ট্রলিতে তোমার প্রসাধন সামগ্রী ও তো নিতে হবে। আমার সব কাজেই দেখি বাগড়া পড়ে…..কি গেরো রে বাবা……………’’
আমি আবার হিঃ…….হিঃ…….হিঃ…. করে হেসে দিলাম শুনেই । কাকু ও না দারুণ ছেলে একটা। যখন যা মাথায় ঢুকলো তাই নিয়েই চঞ্চলের মতন ব্যস্ত হয়ে থাকে আমার কাকু। আর হবে না কেন ছেলেমানুষ কাকু? বয়স তো মোটে পঁচিশ বছর।

তা কাকু আমাকে এক্কেবারে চঞ্চলের মতন একটা রাজ পুত্তুর ছেলে সাজিয়ে নিয়ে ঠিক এগারোটার সময় ট্যাক্সি ধরে রওনা হ’লো। বেলা একটায় এয়ারপোর্টে গিয়ে এন্ট্র্যান্সে টিকিট আর আই০ ডি০ দেখিয়ে ঢুকে সামনেই একসারি নরম গদির কালো চেয়ার দেখে গিয়ে খানিক বসে কেবিন ব্যাগ গুছিয়ে নিলো, কাকু।

এয়ারপোর্টে ঢুকে আর পকেটে কিছু তো রাখাই যায় না সিকিউরিটি চেকিংয়ের ঠ্যালায়। কেবিন ব্যাগেজে ও নানান ঝামেলা করে। এটা নিতে পারবে না, ওটা বার করে দাও....জ্বালাতনের একশেষ। ছোট্ট মেটাল ডিটেক্টারটা তো আমি ট্রলি লাগেজে ঢুকিয়েছি, তাই রক্ষা। আগে প্রথম যে বার আসে তখন তো কাকু এয়ারপোর্টের সব নিয়ম কানুন জানতোই না। তখন নতুন লাগেজ চেন, ছোট কাঁচি, সেভিং ব্লেড, মিনারেল ওয়াটারের নতুন কেনা ভর্তি বোতল… অনেক কিছু খুইয়েছে। তাই কাকু খুব সাবধানী এখন আর এই বায়ুপথ যাত্রায় মোটেই রাজী হ’তেই চায় না।

কাকু লম্বা লাউঞ্জের শেষের দিকে গিয়ে বাথরুম হ’য়ে এসে সেকেন্ড গেটে একটু পরে গেলো। বেনারসের লাল বাহাদূর শাস্ত্রী এয়ারপোর্টেই মাত্র এই ডবল এন্ট্রি সিস্টেম আছে।

তারপরে এক্সরে করিয়ে চেক ইন লাগেজ জমা দিয়ে দুটো বোর্ডিং পাশ হাতে নিয়ে সিকিউরিটি চেকিং সেরে একঘণ্টা বসে থাকবার পরে দু’নম্বর গেটের জন্য গেট কল হয়ে যেতে তখন কাকু আমার চকচকে হাত ধরে গিয়ে চলন্ত সিড়িতে উঠলো।

তারপরে আবার কোলাপসিবল গেটের সামনে গিয়ে থাকো বসে। গয়া থেকে ফ্লাইট সবে এসেছে। প্যাসেঞ্জার ও লাগেজ নামছে। সব শেষ হ’লে তখন না আমাদের ডিপার্চার গেট খুলবে। তখন লাইন দিয়ে বোর্ডিং পাশ মেশিনে চেক করিয়ে ছাড়পত্র পেলে তবে প্লেনের কানেক্টিং প্যাসেজের সরু আর ঢালু পথ দিয়ে গিয়ে প্লেনের দরজায় আর একবার পাশ দেখিয়ে কাউন্টার পার্টটা জমা দিয়ে তখন না প্লেনের পেটে ঢোকা। সে কি সহজ কাজ? কাকুর ভাষায় তার চেয়ে ততক্ষনে একটা খুনের রহস্যের কিনারা করে ফেলা অনেক সহজ।

কে জানে বাবা? আমার তো দু’টোই কঠিন বলে মনে হয় বেশ। কাকুর কথা অবশ্য আলাদা। খুব বুদ্ধি কাকুর। খামোকা কেন যে বড় কাকু আমাকে বলে মাষ্টার বন্ড, তা কে জানে?

তা ফ্লাইটটা মন্দ নয়। বেশ একটু জলখাবার ও পেলুম খেতে। স্পাইসজেটে তো সে’টুকু ও দেয় না। বাজে। প্লেনটা রানওয়েতে পৌঁছে সোজা একছুটে দিব্যি সোঁ করে আকাশে উঠে গেলো। সোজা পঁয়ত্রিশ হাজার ফিট। মেঘ টেঘ মানে বাদলকে ছাড়িয়েই গেল। একঘন্টা বিশ মিনিট পরে ঘড়ড় ঘড়ড় ঘড়ড় ঘড়ড় শব্দ করে প্লেনের চাকা দিল্লীর মাটি ছুঁয়ে নিলো।

লাগেজ নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে কারে চড়ে যখন যথাস্থানে গিয়ে হাজির হ’লুম আমরা, তখন রাত হয়ে গেছে, প্রায় সাতটা বাজে। জায়গাটা এয়ারপোর্ট থেকে বেশ খানিকটা দূরে। কি গ্রীন পার্ক না গার্ডেন না কি যেন নাম। বড় বড় গেটওয়ালা সব বাড়ী। বড়লোকের পাড়া। যে খানে গাড়ী থেকে আমরা নামলুম সেই বাড়িখানা ও বেশ বড় আর কে একজন ডঃ সানিয়েল সেই বাড়ির মালিক।

বড় কাকু আর একজন মনে হয় পুলিশের কেউ ছিলেন গেটে আমাদের অপেক্ষায় বাড়ির মালিক ছাড়া ও। আর ও একজন ছিলেন সাথে। দেখতে বেশ শীর্ণ চেহারার ভদ্রলোক। নাম অবিনাশ। বাড়ির মালিকের দূরসম্পর্কের ভাই। এই বাড়িরই তিনতলার বাসিন্দা। বড় কাকু মানে চঞ্চলের বাপী পরিচয় করিয়ে দিলেন।

সাদা পোষাকের সবল চেহারার ভদ্রলোক ও সি মিঃ মিত্তল। অবিনাশ না কি আসামী রূপে সাসপেক্টেড। ওসি নিজেই তাকে ধরেছেন। আরো একজন সাসপেক্ট ও না কি আছেন।

এ তো বেশ মজা।

আর অপরাধী যদি ধরাই পড়েছে তবে আর কাকু কি করবে? নাঃ…সত্যিই দেখি জটিল ব্যাপার। আর আত্মহত্যার কেসে অন্য কেউ অপরাধী হয়ই বা কি করে? তবে শুনলুম যে যিনি মারা গেছেন তিনি এই বাড়ির একমাত্র ভাড়াটে ছিলেন। নাম মিঃ সিয়েন। আর মালিক আর ভাড়াটে দু’জনেই শুনি যে বাঙালী। এ আবার কেমনধারা বাঙালী নাম রে বাবা? বাঙালী খ্রিশ্চানদের শুনেছি এমন সব নাম হয়।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে একটা বড় নরম সোফায় কাকুর পাশে বসে তখন কাকুকে চুপিচুপি কথাটা জিজ্ঞেস করে ফেলতেই হ’লো আমাকে আর আমার প্রথম প্রশ্ন শুনেই কাকু চট করে মুখে রুমাল চাপা দিলো হাসি চাপতে। যাঃ….কাকু যেন কি?

খানিক পরে আমার কানে কানে কাকু বললো-‘এইগুলো সব ডেলহাইট নাম। একজন
হ’লেন ডঃ স্যান্নাল। ইনি বাড়ির মালিক আর তিনি একজন বড় ডাক্তার তবে এখন আর প্র্যকটিশ করেন না। আগে করতেন। রাজৌরী গার্ডেন না কোথায় নিজস্ব চেম্বার সহ ওষুধের একটা দোকান ও ছিলো। লীনা মেডিক্যাল্স নামে। বয়স হয়েছে বলে সব বিক্রী করে দিয়েছেন। আর অন্য জন মিঃ সেন। দিল্লীতে বাঙালির কদর বুঝে নিতে পারবে তুমি এই নামগুলো থেকেই, বাদল’।

সে’খানে আর ও একজন ছিলেন। নাম মিঃ কুমার। তিনি না কি মিঃ সিয়েনের একমাত্র ছেলে । তবে তাঁর বয়স মনে হ’লো মোটেই বেশী নয়। কাকুর চেয়ে বছর তিন চার বড় হ’তে পারেন। একমাত্র ছেলে শুনে কাকুর ভ্রু কুঁচকে গেলো। আমার মনে হ’লো যে তিনি মিঃ সিয়েনের ছোট ছেলে হ’লে ও বা কথা ছিলো।

কাকু চুপি চুপি বললো-‘কে জানে বাবা? হয়তো বেশী বয়সে ছেলে হয়েছে। তবে আমাদের সব খরচ পত্র দিয়ে ডেকেছেন ইনিই। কারণ ও আছে। ইনি ও পুলিশেষ বিশেষ সন্দেহভাজন হয়ে আছেন যে…’।

সবাই এসে বসতে তখন বাড়ির মালিক এসে বসে বললেন—‘যে তিনি ডাক্তারী প্র্যাকটিশ ছেড়ে দেবার পরে বাড়িতে বসে তাঁর বড় একা লাগতো। সময় আর কাটতে চাইতো না। ভাইটা তো প্রায় বাড়িতেই থাকে না। কিসের যেন সেল্স রিপ্রেজেনন্টেটিভ..... তবে পয়সার খুব খাঁকতি আছে, আর হয়তো সেই লোভেই....................’

‘তাঁকে কাজের লোকের ভরসায় একলাই থাকতে হ’তো বাড়িতে। প্রায় বছরখানেক আগে একদিন ক্লাবে গিয়ে শুনলেন যে মিঃ সিয়েন তাঁর ছেলের সাথে থাকবেন না অশান্তি এড়াতে, সেই জন্য কোথাও বাড়ী ভাড়া নিতে চাইছেন। তিনি ও মেম্বার তবে অন্য একজন মেম্বার মিঃ আগরওয়াওলা একদিন পরিচয় ও করিয়ে দিলেন। তখন
ডঃ সানিয়েল ভাবলেন যে বাড়ির নিচের তলাটায় যদি ভালো একজন নির্ঝন্ঝাট টেনান্ট পাওয়া যায় তো মন্দ কি? তায় বাঙলী। গল্প গাছায় বেশ সময় কাটানো যাবে। কিছু পয়সা ও আসবে ঘরে বসে। হাজার দশেক। মন্দ কি? একমাত্র ছেলে তো চাকরী নিয়ে বেঙ্গালুরুতেই থাকে। কালেভদ্রে আসে।

তাই তিনি বাড়ী ভাড়া দিয়ে ফেললেন। তা সত্যিই তাঁর ভাগ্য ভালো। তিনি ভাড়াটের সজ্জনোচিত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। নির্ঝন্ঝাট একা মানুষ আর বেশ হাসি খুশী। গল্প গুজব আড্ডা তাশ টাশ খেলে দিন ভালোই কাটতে লাগলো’।

‘মিঃ সিয়েন প্রায় তাঁর সমবয়সী আর মন মেজাজ ছাড়া চেহারাতে ও বেশ মিল ছিল দু’জনের। মাঝারী হাইট, ফর্সা একহারা চেহারা আর মাথায় টাক ও ছিল দু’জনেরই। ডেলী রুটিন ও প্রায় এক। দু’জনেই ভোরে উঠে বেড়াতেন। জগিং মাঝে মধ্যে নইলে হাঁটতেই পছন্দ করতেন। দেখতে দেখতে পরিচিত মহলে মাণিকজোড় আখ্যা পেতে দেরী হ’লো না’।

‘বছর খানেক সময় বেশ কেটে গেলো। মিঃ সিয়েন নিজে থেকেই ভাড়া দু’হাজার আর ও বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর ওজর আপত্তি কানেই তুললেন না। আদর্শ টেনান্ট….বলেন কিনা রিটায়ার্ড তো আমরা দু’জনেই, পরষ্পরকে না দেখলে কে দেখবে?’

‘তাঁর ছেলে বৌমা ও নাতি কেউ ইতিমধ্যে একবার ও বাড়ী না এলেও তাদের অভাব টেরই পেলেন না তিনি। তারপরে হঠাৎ কি যে হয়ে গেলো। যার ভাগ্যে সুখ লেখা নেই তার এমনিই হয়’।

‘একদিন ভোরে উঠে তিনি তৈরী হয়ে বেরোবেন, দেখেন যে ঘরের দরজা বাইরে থেকে কে বা কারা আটকে দিয়েছে। যতই ডাকাডাকি করেন তিনি, কেউ আর সাড়া দেয় না। ফলে সে’ দিন আর প্রাতঃভ্রমণ করা হয়ে উঠলো না তাঁর ভাগ্যে। ভাইটা বাড়িতে তো থাকা বা না থাকা দুই সমান। ভোরে উঠতে তার বড় বয়েই গিয়েছে। খালি বেলা অবধি পড়ে ঘুমোয়’।

‘তিনি মুক্তি পেলেন সাতটায় কাজের লোক আসবার পরে’।

‘সে বললো যে মেন গেট তো খোলাই ছিল। শুনে তিনি নিচে নেমে এসে দেখেন যে গেটের তালা ভাঙ্গা। মিঃ সিয়েনের ঘরের দরজাও খোলা আর তিনি বিছানাতেই পড়ে আছেন’।

‘অনেক ডাডাডাকিতেও সাড়া না পেয়ে লোকাল থানায় ফোন করেন তখন তিনি’।
‘মিঃ মিত্তল ঘন্টখানেকের মধ্যেই এসে পড়েন। পুলিশের ডাক্তার ও সঙ্গে এসেছিলেন। তিনি মৃতদেহ পরীক্ষা করে শরীরে আঘাতের কোন চিহ্ন না পেয়ে বলেন যে হয়তো বিষ খেয়ে সুইসাইড করেছেন। পোষ্টমর্টেম হ’লে সঠিক জানা যাবে’।

‘আপাত দৃষ্টে পুলিশ সুইসাইড বললে ও তিনি ঘরের দরজা খোলা রেখে শুয়ে পড়লেন কেন? সুইসাইড নোট নেই কেন? গেটের তালা ভাঙলো কে? তাঁর ঘরের দরজাই বা
বাইরে থেকে বন্ধ করলো কে এবং কেন? এইসব প্রশ্নগুলোই কেসটাকে হত্যা বা হোমিসাইডর মনে করতে বাধ্য করছে সবাইকে। আর মোটিভ? বিনা উদ্দেশ্যে কি কেউ খুন করে? একজন রিটায়ার্ড বুড়োমানুষকে কেউ মারবে কেন? এমন কিছু কোটিপতি লোক তো ছিলেন না মিঃ সিয়েন আর তাঁর ছেলে তো উত্তরাধিকারী হিসেবে আছেনই। খুনী কি পাবে? তবে কি তাঁর ছেলেই…?’

‘এই সন্দেহের কারণ আছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যার পরে তিনিই ছিলেন মিঃ সিয়েনের কাছে একমাত্র ভিজিটার। মাঝে মধ্যে তিনি আসতেন দেখা করতে। অবশ্যই নিজের গরজে। সে’দিন ও এসেছিলেন মিঃ সিয়েনের নামের কোন একটা এল০আই০সি০ পলিসির ম্যাচ্যুরিটি পেপার্স নিয়ে সই করাতে। নইলে টাকা মিলবে না যদি ও তিনি নমিনী। টাকার অঙ্ক প্রায় পঁচিশ লাখ….’।

‘মিঃ সিয়েন সই করেননি বলে দু’জনে বেশ কথা কাটাকাটি ও হয়েছিল। চলে যাবার আগে মিঃ কুমার ওপরে তাঁর ঘরে ও এসে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর বাবাকে একটু বোঝাতে। নইলে অতোগুলো টাকা….। কিন্তু তিনি পিতা পুত্রের ঝগড়ায় মাথা গলাতে রাজী না হ’তে শেষে রাগ করে মিঃ কুমার উঠে চলে যান, ঘরের দরজাটা ঝনাৎ করে টেনে বন্ধ করে দিয়ে। হয়তো সেই ধাক্কাতেই দরজার ঢিলে হয়ে যাওয়া টানা হুড়কোটা একটু সরে এসে দরজাটা আটকে যায়। তখন তো আর তিনি সে দরজা টেনে দেখেন নি।

ইচ্ছাকৃতভাবে যে মিঃ কুমার তাঁর ঘরের দরজা আটকে দিয়ে যান নি তা তিনি পরে বার বার বলেওছেন। কিন্তু খুনের কেস হ’লে সন্দেহ তো হবেই আর অতোগুলো টাকা যেখানে পাবেন না তিনি……………এখন অবশ্য এল০ আই০ সি০ টাকা দিতে পারে অবশ্য যদি নমিনী মানে মিঃ কুমার খুন না করে থাকেন..’।

কাকু ফিসফিস করে বললো—‘স্বারথ লাগি করে সব প্রীতি…হুঁ….অমনি কি আর কেউ প্লেনের ভাড়া খসায় রে বাপু…’

ডঃ সানিয়েল বলে চললেন---‘ঘটনার দিন এবং আগের দিন ও আমার ভাই অবিনাশ
বাড়িতেই ছিলো কিন্তু পরের দিন ভোরেই সে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আমাকে ও জানিয়ে যায় নি। কেন? তা আমি জানি না। হয়তো জরুরী ফোন টোন এসেছিলো কিছু। তবে এমনিতে সে অতো ভোরে কখনোই ওঠে না। তাই সে বাড়িতে নেই এই খবর পেয়েই পুলিশ মানে ও সি সাহেব নিজে গিয়ে নতুন দিল্লী রেল স্টেশন থেকে সেইদিনই অবিনাশকে গ্রেফতার করেন সে ট্রেনে উঠে পড়বার আগেই’।

‘অবিনাশ হঠাৎ কেটে পড়বার তালে ছিল মনে করে তাকে ধরলে ও অনেক ‘কড়ী পুছতাছ’ করে ও পুলিশ তাকে দিয়ে অপরাধ স্বীকার করাতে তো পারেই নি, উল্টে বলেছে যে সে পালাতে যাবে কেন নিজেদের বাড়ী ছেড়ে? সে তো তার কাজে যাচ্ছিল মাত্র। জরুরী এস০এম০এস০ পেয়ে। এখন সেটা কে পাঠিয়েছিল, তা জানবার চেষ্টা চলছে…’।

কাকু বললো—‘বাদল, দু’ নম্বর সাসপেক্ট ও হাজির….বোঝ ঠ্যালা’।

‘এখন কথা এই যে মিঃ সিয়েনকে মারতে যাবে কেন সে? মোটিভ কি? পুলিশের ধারণা যে সে তাঁর কাছে টাকা ধার চেয়েছিলো আমাকে না জানিয়ে? কিন্তু অবিনাশ তা স্বীকার তো করেই নি, উল্টে বলেছে সে বাড়ির একজন টেনান্টের কাছে হঠাৎ টাকা ধার চাইতে যাবে কেন তার দাদা থাকতে আর কেউ অমনি চাইলেই বা তাকে টাকা দিতে যাবেই বা কেন? কোন প্রশ্নই ওঠে না। পুলিশ তাকে ফাঁসাতে চাইছে আসল অপরাধিকে ধরতে না পেরে’।

‘এই কথা না শুনে মিঃ মিত্তল তাকে তৎক্ষণাৎ লক আপে ঢুকিয়ে দেন বেজায় রাগ করে। বহু চেষ্টায় তবে একদিন পরে আজ সে বাড়িতে আসতে পেরেছে। তবে সে এখন ও পুলিশের নজর বন্দী। বিনা অনুমতিতে দিল্লির বাইরে যেতে পারবে না। বাধ্য হয়ে তাকে এখন দিন দশেক ছুটি নিতে হয়েছে…’।

হঠাৎ আমি বললুম—‘আংকল, আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি, প্লীজ?’

‘কে? ওঃ …তুমি….তা বেশ তো, করো না……….’

‘আপনারা কি রোজ দু’জনে একসাথেই ভোরে বেড়াতে বেরোতেন, আংকল?’

‘নাঃ, রোজ ঠিক তা হয়ে উঠতো না। আমি হয়তো একটু লেট হয়ে গেলাম। তখন মিঃ সিয়েন একলাই যেতেন বা তার উল্টোটাও হয়ে যেতো কোনদিন। এই নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না…’।

‘যে দিনের কথা বলছেন সে’দিন কি হয়েছিল আংকল? আপনার মনে আছে কি?’

‘কেন থাকবে না? ক’দিন মাত্র তো হয়েছে। সে’দিন আমি তো ঘরে বন্দী হয়ে যেতেই পারিনি আর মিঃ সিয়েন তো...’

‘হুঁ,....কিন্তু তিনি তো…..আচ্ছা থাক। এখন মৃতদেহ তো আর দেখা যাবে না।অন্ত্যেষ্টি ও হয়ে গেছে। তাঁর ঘরটা একটু আমি দেখতে চাই। যদি সম্ভব হয় তো…..।’

‘এখন আর দেখবার কি আছে? পুলিশ তিন বার সব দেখেছে আগেই’। মিঃ মিত্তল বলে উঠলেন শোনামাত্র….

আমি বড় কাকুর মুখের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন—‘ওঃ মিঃ মিত্তল, ওপন দি ডোর অব দি ফ্ল্যাট। ইটস্ অর্ডার…’

‘ওঃ ইয়েস স্যার। চলো হে ছোকরা…কি দেখতে চাও দেখবে চলো…ছোঃ…’

‘ওহ মিত্তল….মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগোয়েজ, প্লীজ…’

‘সরি…. স্যার….’

কাকু আর আমি ইন্সপেক্টরের সাথে নীচে নেমে এলাম। তিনি চাবি দিয়ে তালা খুলে আলো জ্বেলে দিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে কাকুকে বললেন-‘আসুন স্যার..দেখে নিন যা দেখবার আছে আপনার…’

ঢুকে দেখি যে থ্রি রুম ফ্ল্যাট…কিচেন বাথ সহ…সিলিং ফ্যান রুম কুলার টেবিল ফ্যান রিডিং টেবিল… চেয়ার… খাট..সোফা…সেন্টার টেবিল…গোদরেজ স্টোরওয়েল.. ওয়াড্রোব এমন কি একটা আয়না সমেত ড্রেসিং টেবিল ও রয়েছে।

তার ড্রয়ারে অনেক প্রসাধন সামগ্রী ও দেখি সাজানো রয়েছে। স্নো, ক্রীম, বোরোলীন, ময়েশ্চরাইজার, পাউডার, বডি স্প্রে, সেভিং সেট সেভিং ক্রীম আফটার সেভিং লোশন এমন কি একটা মাউথ ওয়াশের বটল ও।

ভদ্রলোক বেশ সৌখিন ছিলেন বলে মনে হয় …..কাকুর মতন। বড়লোক হ’লে হয়তো শৌখিনতা আপনিই জেগে ওঠে। আমার কাকু যদি বড়লোক না হয়ে ও……

আমি সেই বোতলটা সন্তর্পনে হাতে তুলে নিয়ে দেখলাম কাকু যে ব্র্যান্ড আমার জন্যে কিনেছে একদম সেই ব্র্যান্ড, তবে সেটা এখন খালি। আমি সেটা তুলে কাকুর হাতে দিয়ে মুখ টিপে একটু দুষ্টু হাসি হেসে দিলুম। ব্যস, আর যায় কোথায়? আমার কটাক্ষ ঠিক বুঝে নিয়ে কাকুর মুখ ভার হয়ে গেল।

আমি চট করে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলুম…কিন্তু নাঃ নেই তো এ’খানে ও। গেলো কোথায় অন্য ভর্তি বোতলটা রে বাবা? এক্কেবারে ভ্যানিশ…

কিন্তু তা হয় কি করে? যে মাউথ ওয়াশ করে সে তো রোজই করবে। ওই বোতলটা একদম শুকনো মানে দিন দশেকের ও আগে খালি হয়েছে। সুতরাং কেউ নতুনটা সরিয়েছে মনে হয়। কে হ’তে পারে আর কেনই বা?

সে এখন যাক গিয়ে। এইবার আমরা আবার ওপরে যাই। বাড়ির মালিকের ঘর ও বাথরুমটা ও কোন ছুতোয় দেখে নিয়ে তারপরে বড় কাকুর ফ্ল্যাটে চলে যাব। বেশ ক্ষিধে ও পাচ্ছে এখন আমার আর ক্লান্তি ও লাগছে দারুণ।

কে বলে যে এয়ার জার্নিতে মানুষ টায়ার্ড হয় না। বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টার ন্যাশনাল এয়ার পোর্টে গিয়ে পড়লে তো হয়েই গেলো কম্ম কাবার। বেরোতেই হাঁটতে হবে মাইল দুই। তারপরে লাগেজ কালেকশানের ঝামেলা আছে। খোঁজ, কোথায় পাঁচ নম্বর বেল্ট…..তাও দেখ সে আবার কখন ঘোরে……যত্ত সব বিচ্ছিরী ব্যবস্থা। কাকু ঠিকই বলে রাগ করে এয়ার জার্নির না কাঁথায় আগুন…হিঃ…..হিঃ……….হিঃ……….

তাই আর কিছু বেশী কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও করিনি আমি। মনে হয় একটু পাষ্ট হিস্ট্রী ও জানতেই হ’বে এই কেসে নইলে মোটিভই তো পাচ্ছি না ঠিক ধরতে। সামান্য টাকা চেয়ে না পেলেই কি কেউ খুন করে না পলিসির টাকা না পেলে ছেলে হয়ে নিজের বাপকে?…..যাঃ ….যতসব পুলিশের ফুলিশ বুদ্ধি….. এ’খানেই বড়কাকু ও আটকে গেছে বলে মনে হয়।

তা বাড়ির মালিকের শয়নকক্ষটি পুরনো হ’লে ও বেশ সুন্দর ও আধুনিক কেতায় সাজানো। মনে হয় কোন নামী ইন্টিরিয়র ডেকোরেটারের কাজ, তবে দরজায় বাইরে থেকে বন্ধ করবার জন্য যে ধাতুর টানা হুড়কোটা রয়েছে সেটা সত্যিই বেশ পুরনো বলে ঢিলে হয়ে গেছে। দরজার পাশেই বড় পাল্লার গ্রিল লাগানো জানলা।

ঘরে ঢুকে একটু পরেই আমি কাকুকে চুপিচুপি বললুম—‘কাকু, এক নম্বরে যেতে পারি কি?’

কাকু আমার দিকে কটমটিয়ে তাকালো কেননা কারো বাড়িতে গিয়ে সে’খানে
তাদের বাথরুম ব্যবহার করা একদম পছন্দ নয় কাকুর, কিন্তু আমাকে যে একবার যেতেই হবে বাথরুমে। কাকু আমার মুখের দিকে চেয়ে কি বুঝলো কে জানে তবে ঠিক কিছু বুঝে নিয়ে তখনি সেই জন্য অনুমতি চাইতেই ডঃ সাহেব নিজে উঠে এসে আমাকে অ্যাটাচড্ বাথ দেখিয়ে দিলেন। আমি ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলুম। দেখি....এইবার পকেটের মেটাল ডিটেক্টারটা হয়তো আমার একটু কাজে লাগবে।

সে’খানে চা জল খাবারের ঢালা ও ব্যবস্থা করা ছিল কিন্তু আমি খুব ক্লান্ত আর ঘুম পাচ্ছে বলে কিছু না খেয়ে চলে এলুম কাকুদের সাথে।

বাড়ী এসে খাওয়ার টেবিলে বসে বড় কাকু বললেন—‘হ্যালো মাষ্টার বন্ড, কি বুঝলে তাই বলো। গভীর গাঢ্ঢা, তাই না?….’

‘নাঃ…কাকু…..সরি…মাত্র ফিট দুয়েকের মতন হবে….হিঃ…হিঃ….হিঃ….’

‘তাই না কি? তবে তো মার দিয়া কেল্লা। তা এখন বলো তো আমাকে কী করতে হবে?’

‘আচ্ছা কাকু…..মেডিক্যাল স্টোরে মানে আধুনিক ভাষায় স্টোর্সে কর্মচারী থাকে না?’

‘হুঁ….তা তো থাকেই। কেন?.’

বড় কাকু আমার কথার ইঙ্গিতটায় তেমন গা দিলো না কিন্তু কাকু আমার দিকে আবার করে কট মট করে তাকালো।

আমি বললুম---‘কাকু, লীনা মেডিক্যাল্সে কতজন কাজ করতো জানা যেতে পারে কি? তাদের কাউকে যদি পাওয়া যায় তো তিন চারটে কথা জানতে চাইতুম আমি কাল…’

‘সমঝ গয়া…হো যায়গা মিঃ বন্ড….ডোন্ট ওরি…আর কিছু?’

‘ডঃ সানিয়েলের ঘরের দরজা ও জানলাটা আর বাথরুমের সামনের দেওয়ালটা একটু গোপনে পরীক্ষা করতে পারা যাবে? মানে তিনি যেন জানতে না পারেন’।

‘এনি থিং সাসপেক্টিং, মাষ্টার বন্ড?’

‘হুঁ....মেটাল ডিটেক্টার নিয়ে গেলে ভালো হবে হয়তো’।

‘ও কে.....জেরার অজুহাতে থানায় নিয়ে এসে ওনাকে বসিয়ে রেখে …ও হ’য়ে যাবে ডোন্ট ওরি …আমি আমার জন্য অনেক কাজ পেয়ে গেছি…..তবে এই কেসটায় গন্ডগোলটা কোথায় তা কি তুমি ধরতে পেরেছো, মাষ্টার বন্ড?’

‘হুঁ, মনে হয় কিছুটা পেরেছি, কাকু…।’

‘কি? কি বললে তুমি? ওহঃ ….মাই গুডনেস….রিয়েলী? তুমি কিন্তু যা বলছো তা সত্যি প্রমাণিত করতে পারলে নগদ পাঁচ লাখ পাবে। মিঃ কুমারের এই কেসে শিরে সংক্রান্তি হয়ে আছে। তিনিই ঘোষণা করেছেন …’

‘সে সব পরে হবে, কাকু…’

‘আচ্ছা, তুমি খুব ক্লান্ত…টেক রেষ্ট .....গুড নাইট..’ বড় কাকু চলে গেলেন।

কাকু শোবার আগে আমার জন্য মাউথ ওয়াশের ব্যবস্থা করছিলো। বললো—‘ওপরের ফ্ল্যাটের বাথরুমটা কেমন দেখলে, বাদল?’

‘ওয়ান্ডারফুল….একদম নিচের বাথরুমের কপি….তোমার ব্রান্ডেড মাউথ ওয়াশ ও আছে সেইখানে, কাকু…হিঃ…হিঃ….হিঃ….সত্যিই দু’জনের পছন্দ ও শৌখিনতা সব একই ধরনের যে তা কিন্তু তোমাকে মানতেই হবে…’

কাকু ভ্রু কুঁচকে বললো---‘হুঁ….এটা একটা পয়েন্ট। এই বয়সের দু’জন জেন্টলম্যানই এতো শৌখিন...?’

‘কেন কাকু? তুমি যদি আমাকে নিয়ে টাকার শ্রাদ্ধ করে শৌখিনতা করতে পারো আর অন্য কেউ করলেই দোষ? হিঃ............হিঃ.............হিঃ.’

‘আরে যাঃ...আমার বাদল তো একটা অতি সুন্দর বাচ্ছা ছেলে। তাকে আমি কেন, যে কেউ সাজিয়ে গুজিয়ে রাখতে ও পরিচ্ছন্নতা শেখাতে চাইবে। কিন্তু তাই বলে....নাঃ মনে হয় এটা অনুকরণ, বাদল?’

‘কাকু, তুমি সত্যিই বাহাদুর। ঠিক তখনকার আমার পয়েন্টটা তুমি ধরে ফেলেছ। আর দ্বিতীয় সূত্র হচ্ছে তোমার ওই মাউথ ওয়াশ। সেই বোতলটা গায়েব হ’লো কেন? থাক কাকু, এখন চলো, শুয়ে পড়া যাক। দাও, তোমার মাউথ ওয়াশ….সেরে নি…’।

শুয়ে পড়বার জন্য জামা প্যান্ট ছাড়তে ছাড়তে বললুম—‘কাল আর একবার বাড়ির মালিকের শোবার ঘরটা দিনের আলোয় গিয়ে ভালো করে দেখতে হবে আমাকে আর পোষ্টমর্টেমের রিপোর্ট আর লীনা মেডিক্যল্সের পর্ব চুকলেই কাল রহস্য ভেদ হয়ে যাবে, কাকু.। তারপর আমরা দে পিঠটান, কাকু। চঞ্চলের জন্য নইলে মন কেমন করছে তো এখনই আমার ...’।

কাকু আমাকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো জড়িয়ে ধরে, মুখে কিছুটি না বলে।

তার পরের দিনটা আমার প্ল্যানমতন সব করে টরে নিতেই কেটে গেল।

আর তার পরের দিনই আমাদের রওনা হবার পালা। তাই তৈরী টৈরী হয়ে সব জিনিষপত্র গুছিয়ে ব্যাগ ও অ্যাটাচী বন্ধ করে শেষে কাকুকে বললুম-‘কাকু, আজ বিকেলে তুমিই গিয়ে রহস্যটা ভেদ করে দিয়ে এসো, আমি আর যাবো না । আমি শেষটা সব বললে মিত্তল আংকল রেগে কাঁই হবেন। ডেঁপো ছোকরা রহস্যভেদী তাঁর দু’চোখের বিষ যে….’

তা আমার কাকু শুনলে তো।

আমাকে কাকু সে’দিন ও ঠিক সাজিয়ে গুজিয়ে একটা পরী ছেলে বানিয়ে নিয়ে গেল

আর বললো-‘এইবার শুরু করো, বাদল তোমার মাউথ ওয়াশ রহস্য…’

কি আর করি?

বললুম—‘থ্যাংক ইয়ু, কাকু। সংক্ষেপেই বলছি। কারণ আমাদের ফ্লাইট ছ’টায়। চারটেয় কাকু গিয়ে হাজির হবেই এয়ারপোর্টে। কাকুর নিয়ম মেনে চলা স্বভাব তো, তাই রওনা হবে তিনটেয়। এখন বেলা একটা। তাই……….’

‘প্রথমেই বলি পোষ্টমর্টেমের রিপোর্টের কথা। মিঃ সিয়েন মারা গিয়েছেন তীব্র বিষক্রিয়ায় কিন্তু খাবারে কোন বিষ ছিলো না। প্রশ্ন হবে বিষ তবে এলো কোথা থেকে? সহজ উত্তর হয় খাবার খেয়ে উঠে জল পান করবার সাথে হয়তো পেটে চলে গিয়েছে। কিন্তু জলের কোন গ্লাশে ও বিষ টিষ কিচ্ছুটি মেলে নি। রিপোর্ট তাই বলছে। তবে? শেষ বিকল্প কি থাকে? হ্যাঁ…. পরে যখন তিনি মাউথ ওয়াশ করেন তখন। তাই মাউথ ওয়াশের পুরো ফাইলটা গায়েব করতে হয়েছে….অপরাধিকে এই কেসে। খুব সুবিধা। এই মাউথ ওয়াশ নিয়ে কে আর মাথা ঘামাচ্ছে?’।

‘এখন প্রশ্ন হবে কে করেছে এই কাজ’?

উত্তর সহজ—‘খুনী…’

‘কিন্তু সে কে? মিঃ অবিনাশ কি? কি তার স্বার্থ? ঋণ না পাওয়ার জন্য রাগ’? না তাঁর নিজের ছোট ছেলে মিঃ কুমার?’

‘মাষ্টার বাদল। সরি ফর ইন্টারাপশন। মিঃ সিয়েনের ওই একটিই ছেলে। তুমি ভূল বলছো…..’ বললেন গৃহকর্তা।

‘না স্যার। আমি একটু ও ভূল বলিনি…..একটি মাত্র নয় ওনার আরো একটি ছেলে ছিলো। বড় ছেলে। মিঃ কুমারের বয়স আন্দাজ করে প্রথম দিনই আমার সন্দেহ হয়েছিলো । থরো পুলিশ ইনভেস্টিগেশানে তাই সঠিক বলে প্রমানিত হয়েছে। সব কথা শুনে হয়তো মিঃ কুমার নিজেই স্বীকার করবেন…।’

‘সে কথায় আমি আসছি এখুনি। তার আগে বলে নি বাড়ীর মালিক ডঃ সানিয়েলকে কেউ বাইরে থেকে দরজা আটকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল সেই রাতে। তাই তিনি তো
ঘরে বন্দী হয়েই ছিলেন সুতরাং তাঁকে তো এই অপরাধে দোষী বলাই চলে না। হ্যাঁ কেসটা সুইসাইড মোটেই নয় …হোমিসাইড অর্থাৎ হত্যা বা মার্ডারের কেস….আর তার শাস্তি ও সবাই জানেনই………..’

ডঃ সানিয়েল লাফিয়ে উঠলেন যেন-- ‘শাবাস ছেলে। বাহাদুর বটে। আমি তোমাকে গোল্ড মেডেল দেব। ডঃ সানিয়েল গোল্ড মেডেল….প্রত্যেক বছর বছর তোমার মতন বাহাদূর ও কুশাগ্রবুদ্ধি ছেলে মেয়েদের দেওয়া হ’তে থাকবে এই মেডেল, ফান্ড থেকে…’

‘সরি আংকল, মেডেল বা প্রাইজ তো হয় মেমোরিয়াল। এটা ও কি হবে তাই?’

‘মা…মানে? হোয়াট ডু ইয়ু মিন, মাই বয়?’

‘বলছি। খানিকটা সময় হাতে আছে এখন ও আমার। এই ঘরে এখন মিঃ বসাক উপস্থিত আছেন। আপনি তো চেনেন...’

‘না মানে হ্যাঁ...’

‘সে কী? আপনার কর্মচারিকেই ভূলে গেলেন, স্যার?’

‘ইনি সত্যের খাতিরে ও একজন নিরপরাধের প্রাণ রক্ষার্থে আমাদের মানে পুলিশকে একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। লীনা মেডিক্যাল্সের বন্ধ হ’বার সম্ভাবিত কারণ হিসেবে। তিনি ছাড়া ও আর ও দু’জন কর্মচারী ছিলেন সে’খানে যাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে। তারা কিছু অসাধু মেডিকেল কোম্পানির সেল্স রিপ্রেজেন্টেটিভদের সাথে ষড় করে নকল ওষুধ বেচতে থাকে ডঃ সানিয়েলের অগোচরে। কমিশন পঞ্চাশ পার্সেন্টের ও অনেক বেশী। অন্য আর ও গিফ্ট ও প্রাইজের আশাতীত লাভ ছিল’।

‘ডঃ সানিয়েল রোগীদের প্রেসক্রিপশান দিয়ে বলে দিতেন যে তারা যেন ওষুধ নিয়ে
যায় তাঁর দোকান থেকে। তিনি নকল ওষুধের কথা জানতেন বলে মনে হয় না আমার কেননা তিনি সত্যিই একজন সুচিকিৎসক ছিলেন…’

‘কি বলছো তুমি? ছিলেন??? আর ইয়ু গোয়িং ক্রেজী?’

‘নো স্যার… নট অ্যাট অল। আগে সবটা শুনুন একটু ধৈর্য ধরে। তা এই করে একদিন
একজন মিঃ সেনের বড় ছেলের অকালে পরলোকপ্রাপ্তি হয়। এমন আরো অনেকেই সে’খানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন হয়তো নকল ওষুধ খেয়ে, তবে তাদের বেলায় লোক জানা জানি হয় নি। তাদের মনে হয় তেমন সামর্থ্য ছিলো না কিন্তু এই কেসে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল’।

‘পুলিশ ও এসেছিল তাই পুলিশের পুরণো ডায়েরিতে সব বিবরণ পাওয়া গিয়েছে ও কম্প্যুটারাইজড্ ডাটা স্টোরেজ সেন্টারের মাধ্যমে সব বিশদ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যেতেই লীনা মেডিক্যাল্সের সেই দুই ধুরন্ধর কর্মচারী মিলে রাতারাতি নকল ওষুধের সব স্টক সরিয়ে ফেলে পৌঁছে দেয় সেই মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের গোপন আড্ডায়, আগের সুরক্ষার শর্তানুযায়ী’।

‘শর্ত দিতে আপত্তিই বা হবে কেন তার? ডবল লাভ কে ছাড়ে? আবার অন্য শহরে বিক্রী হবে ফেরৎ আসা সব ওষুধ। তখন তো আরো লাভ। । এই সব ওষুধ কর্মচারিরা স্টক রেজিস্টরে ও কখনো এন্ট্রি করতো না ভূলে ও, তাই ধরা পড়লো না কিছুই’।

‘ওষুধের রসীদ তখনো কম্প্যুটারে তৈরী হ’তো না তাই ব্রান্ড লেখা ও হ’তো না । কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন বুকে নিয়ে ঘুরতে রইলেন সুযোগ সন্ধানী এক পিতা। ডঃ সানিয়েল ওই ঘটনার পরেই ঘোর সন্দেহক্রমে নিজের দোকান বন্ধ ও বিক্রী করে প্র্যকটিশ ও ছেড়ে দিলেন’।

‘কিন্তু তিনি ছিলেন উদারমনা। চিনতে না পেরে, অতো রোগির ভীড়ে তাঁর অবশ্য মনে থাকার কথা ও নয়, তিনি বাড়িতে একজনকে ভাড়াটে রাখলেন’।

‘এই ক্ষেত্রে সন্দেহ জাগায় দুই প্রৌঢ়ের শৌখিনতা। ডঃ সানিয়েল চিরকালই একটু শৌখিন মানুষ ছিলেন যা মিঃ বসাকের কথায় জানা গেছে কিন্তু মিঃ সিয়েনের বেলায় তেমন কোন প্রমাণই কিন্তু পাওয়া যায় নি । কিন্তু তাঁর ঘরে ও বাথরুমে একই ধরণের শৌখিনতা ও প্রসাধনীর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কেন? অনুকরণ? না বাকী জীবনের জন্য অভ্যাস তৈরী করা? খুনী মার্ডারারস্ নার্ভাসনেসের জন্য সব প্রসাধনের জিনিষপত্র সরিয়ে ফেলতে পারে নি । হয়তো তার কোন দরকার ও মনে করে নি। কিন্তু মাউথ ওয়াশের বোতলটা রিপ্লেশ করে দিলেই আর কোন ঝামেলাই থাকতো না। হয়তো চেষ্টা ও করেছিলেন তিনি, কিন্তু আবার অকুস্থলে যাবার সাহসে কুলোয়নি’।

‘এখন বাকি থাকে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করা ও গেটের তালা ভেঙে তা খুলে রাখা নইলে কাজের লোকজন তো কেউ বাড়িতে ঢুকতে না পেরে চলে যাবে। এটা কোন অবস্থায় হ’তে পারে?’

‘হ্যাঁ, গেটের তালা ভাঙা ও খুলে রাখা বাড়ির যে কেউ করতে পারে কিন্তু কারো ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা কি সম্ভব ঘরে যে আছে তার পক্ষে? বাইরের কেউ ছাড়া?’

‘অবশ্য হুড়কোটা সত্যিই বেশ ঢিলে আর এইটি ও ইচ্ছাকৃত ভাবে করে রাখা হ’তেই পারে। দরজার পাশেই একটা জানলা ও আছে ঘরের। সুতরাং মিঃ কুমারের হাতের ধাক্কায় বা তাঁর জামাতে আটকে গিয়ে কোনক্রমে ঘরের দরজার হুড়কো আটকে না গেলেই বা কি? সে তো বরং ভালোই এবং সে’টাই তো দরকার । একটি কালো রবার ব্যান্ড ও খানিকটা কালো টোনসূতো হ’লেই কাজ হয়ে যায়। দেখতে ও পাবে না কেউ সহজে……’

‘রবার ব্যান্ড দিয়ে সূতোটা আগে থেকে হরাইজন্টাল হুড়কোতে আটকে সুরষো গলিয়ে এনে রেখে দিয়ে পরে ঘরের দরজা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করে দিয়ে, .জানলায় আটকে রাখা সূতোটা ধরে জোরে টান দিলেই হুড়কো ও আটকে গেল আর রবার ব্যান্ড ছিঁড়ে গোটা সূতোটা ও সহজেই হাতে ও এসে গেল। তারপরে জানলাটা বন্ধ করে ঘরে এ সি চালিয়ে দিলেই হয়ে গেল….ওঁ শান্তিঃ..’

‘আমি প্রসেসটা ডিমোনস্ট্রেট করে ও দেখাতে ও পারি কিন্তু সময় নেই যে…..কি করি? তবে বাথরুমের গোপন লকার থেকে অন্যান্য জিনিষপত্রের সাথে এই
মাউথ ওয়াশের বোতলটা পুলিশ খুঁজে পেয়েছে, অনেক কষ্ট করে। বোতল অবশ্য খালি কিন্তু তা’তে যে বিষ দেওয়া ছিল তা পরীক্ষায় জানা গেছে। মেটাল ডিটেক্টার না হ’লে বাথরুমের দেওয়ালের টাইল্সের পিছনের ওই গোপন চেম্বারের বিষয়ে জানা ও যেতো না। আর ছেঁড়া রবার ব্যান্ড সমেত এই কালো টোন সূতোটা কমোডে ফেলে ফ্লাশ করা হয়েছিল কিন্তু সূতোটার শেষ ভাগ রবার ব্যান্ডের সাথে আটকে গিয়েছিলো কমোডে । তাই জলের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে। আর মিলেছে কিছু নকল বেশ ধারণের বা মেকআপের সামগ্রী। সুতরাং সব কৃতিত্বই পুলিশের, আমার কিন্তু কোন বাহাদুরী নেই এই কেসে’

‘তা’হলে কেসটা কি দাঁড়ালো? আর এতো সব ইনভেস্টিগেশন তো আমি করিনি।’
বিস্মিত প্রশ্ন পুলিশের ও সির শোনা গেলো।

‘আমি নিজেই সব করেছি.’ বড়কাকু বলে উঠলেন। কিন্তু কেসটা যে কি দাঁড়ালো সেটা আমি ও ঠিক এখনো ..’

আমি বললুম--‘খুব সহজ….রিভার্সড মার্ডার বা বিলোমিত হত্যার কেস। আর কি?.’

‘….তার মা…মানে?’ ডঃ সানিয়েলের কম্পিত স্বর শোনা গেল’।

‘মানে খুবই সোজা। যিনি মারা গিয়েছেন তিনি যদি মিঃ সিয়েন না হয়ে স্বয়ং ডঃ সানিয়েল বা অনিমেষ স্যান্নাল হয়ে থাকেন তা হ’লেই হয়ে গেল এবং যিনি তার সমস্বভাবের অনুসরণকারী বন্ধু এবং ভাড়াটে ছিলেন এবং এখন আমাদের সামনে
ডঃ সানিয়েল সেজে বসে আছেন তিনিই সেই হতভাগ্য পিতা মিঃ সিয়েন বা রঞ্জন সেন’।

‘সবটাই ঠিক ছিল। শুধু যদি উনি ভয়ে নিজেকে নির্দোষ দেখাতে ঘর বন্দী করে না
ফেলতেন সব কাজ সেরে আর দোষটা মিঃ কুমারের ঘাড়ে গিয়ে না চাপতো, তা’হলে
আর আমাদের এ’খানে আসতে ও হ’তো না তাঁর অনুরোধে আর এতো সহজে উনি ধরা ও পড়তেন না। অবশ্য উনি ঠিকই জানতেন যে এই কেসের দু’জন সাসপেক্টই বেনিফিট অফ ডাউট পেতে বাধ্য কেননা খুন করবার কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা স্ট্রং মোটিভ কিছুই তো নেই কারো বিরুদ্ধে। সবটাই সন্দেহ….আর সবখানেই….. হয়তো…. মে বি….কোন কোর্ট তো তা মানতেই পারে না। সে’খানে চাই এভিডেন্স………’।

‘আর ওই দুই সাসপেক্টের কেউ তাঁকে ইচ্ছে করে ঘর বন্দী করে রাখতে যাবেই বা কেন? সুতরাং তিনি দৈবাৎ একদম অসহায়, ঘরবন্দী অবস্থায় আটকে ছিলেন ও তাই সম্পূর্ণ নিরপরাধ এই বিষয়টিই প্রমাণ হবে…………’

‘দরজা আটকানোর ঘটনাটি ঘটেছে বটে কেননা কাজের লোকেরা সাক্ষী ও যখন আছে, তখন ঘটনাটি মিথ্যা নয় আর তাইতে ডঃ সানিয়েল ঘরে আটক থাকতে বাধ্য হ’লে ও এই ঘটনাটি দৈবাৎ ঘটে গেছে মিঃ কুমারের হাতের ধাক্কায়, এই ভাবতে বাধ্য হবেন বিচারক। আর কোন ম্যাচিওর্ড পলিসী তো আর তামাদি হয় না তাই নিরপরাধ প্রমাণ হয়ে গেলে টাকা ও অবশ্যই পাবেন তিনি তার নমিনী হিসেবে। আসল অপরাধী থাকবে সব সন্দেহের বাইরে।’

‘কিন্তু অতি বুদ্ধিমান ও অতি সাবধানিদের এই ফল লাভই হয়’।

‘তা তুমি এখন চলো তো, কাকু। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে…এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ধরতে হ’লে আর দেরী করা যাবেই না………………’.

‘আরে আরে এ কী? আপনারা সব কে?....নো নো ফটো, প্লীজ। আপনারা কি জার্নালিস্ট? কে ডেকেছে আপনাদের এখানে?’ এইবার আমি নিজেই লাফিয়ে উঠলুম।

‘পুলিশে ডেকেছে……………’

‘তা বেশ তো, পুলিশের ফটো তুলে নিয়ে আপনারা চলে যান। আমাদের আটকাচ্ছেন কেন? আমরা এখন যাই’।

‘কি ইন্টারভিউ নেবেন? নাঃ …সে এখন অসম্ভব………আমাদের ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে’।

‘কোন কথাই শুনবেন না আপনারা আমার? কি গেরো রে বাবা? তবে আমাদের আটকে রেখে আর কি হবে বলুন তো স্যার? আটকাতে হলে আপনারা বরং গিয়ে অপরাধিকে আটকান দেখি’।

‘কী বললেন? পুলিশের হাতকড়ি তো আছেই…..’

‘হিঃ…..হিঃ……হিঃ…..হাতকড়ির বন্দিত্বের সময় তো উত্তীর্ণ প্রায়………’

‘তার মানে?’

‘কি মুশ্কিল? তার মানে ও আবার জানতে চাইছেন? সবই আমাকে বলতে হবে? কি ঝামেলাতেই পড়লুম রে বাবা?’

‘আচ্ছা, তাই বলছি শুনুন---আর নয় কি দশ সেকেন্ডের মধ্যেই উনি ও পরপারে চলে যাবেন। বুঝলেন না। একই বিষ। বড় সাংঘাতিক জিনিষ। মুখে একটু ঠেকলেই হয়ে গেল। মাত্র বিশ সেকেন্ড বড়জোর…লাগে সবশুদ্ধু…………..’

‘এ’সব কি বলছো তুমি?’ বলেই লাফিয়ে উঠলেন মিঃ মিত্তল ও বড়কাকু দু’জনেই একসাথে কথাটা শোনামাত্রই। একেই বলে পুলিশ স্মার্টনেস।

‘ঠিকই বলছি, কাকু। এতো করে ও শেষে ধরা পড়ার লজ্জায় সেই বিষ এখন নিজের ওপরেই প্রয়োগ করেছেন উনি। কেমন নিশ্চুপ অবস্থায় বসে রয়েছেন, দেখছেন না। যান, হে সাংবাদিকগণ আপনারা যদি পারেন তো কেউ ফোন করে এখুনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। নিয়ে যান ওনাকে হাসপাতালে । দেখুন যদি স্টম্যাক ওয়াশ করিয়ে একটা প্রাণ বাঁচাতে পারেন…. একটা অমূল্য জীবন।। আমার তো আর কিছু করবার নেই। সত্য বড় নির্মম …..বড় নিষ্ঠুর……’

‘এখন তুমি চলো না, ও কাকু’…..আমি কাকুর হাত ধরে টানলুম।


জি.সি.ভট্টাচার্য