রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

ছায়া কালো কালো

পাঁচ

বেচারা বিজয়বাবু। সাতে নেই, পাঁচে নেই, নিতান্ত ভলোমানুস, আজ এ কী বিপদেই পড়েছেন! বেলা ন”টা থেকে ‘বাণী বনে’ লোকের পর লোক আসছে। জয়ন্তীর উদ্যোগীরা, পরীক্ষিৎবাবুর সাহিত্যিক ভক্তরা, খবরের কাগজের লোকেরা, কলকাতার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা - কেউ বাদ নেই। সবাই এসে জানতে চায় ব্যাপার কী! ব্যাপার কী, তা কি বিজয়বাবুই জানেন! ছোকরার দল আর নড়ে না, তারা প্রাণপণে চেঁচামেচি করছে, আর নিমাইকে ফরমায়েশ করে বার বার চা খাচ্ছে। দু একজন এমন কথাও বলেছে যে বিজয়বাবুই দাদাকে সরিয়েছেন, হয়তো আরও কিছু খারাপ কাজ করেছেন; কারণ, কে না জানে, পরীক্ষিৎ মজুমদার তাঁর উইলে এই ভাইকেই সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। ঘোরতর কলরব করতে করতে তারা বলছে - “শিগগিরি বার করে দিন ওঁকে, নয়তো আপনাকে আস্ত রাখবো না।” নিজের সম্বন্ধে নানারকম বিশেষণ বিজয়বাবুর কানে পৌঁছচ্ছে, যা মোটেই সুশ্রাব্য নয়। ভদ্রলোকের অবস্থা প্রায় কাঁদো কাঁদো। একে তো এই বিপদ, তার উপর এই অত্যাচার। তিনি বসে বসে ভাবতে লাগলেন, দাদা অজ্ঞাতবাস করুন আর নাই করুন, তাঁকে অবিলম্বে কোনো গোপন জায়গায় পালাতে হবে, নয়তো প্রাণেই বাঁচবেন না। এই একা বাড়িতে আজকের দিনটাও যে তিনি কাটাতে পারবেন, এমন মনে হল না।

দুপুরের দিকে নিতান্ত অবসন্ন হয়ে তিনি মহিমবাবুকেই ফোন করলেন। এ বিপদে মহিমবাবু ছাড়া আর বন্ধু কে? মহিমবাবু বাড়িতে ছিলেন না, ‘হরকরা’র আপিসে তাঁকে পাওয়া গেল।
“দাদা, প্রাণ তো বেরিয়ে গেল।”
মহিমবাবু বললেন, “বুঝেছি। আমার আপিসেওও সেই অবস্থা। লোকের পর লোক, ফোনের পর ফোন। কী আর করবে - সইতে হবে। আমার ফটোগ্রাফারও গিয়েছিল, তোমার ছবি তুলে এনেছে।”
“ছবি! ছবি কেন?”
“তুমি কিছুই বোঝ না, বিজয়। ‘হরকরা’য় ছাপা হবে ছবি - বিকেলে একটা এডিশন বেরুচ্ছে। সমস্ত দেশ খবরের জন্য হাঁ করে রযেছে, তা তো বোঝো? এখনও আছে লোক?”
“কয়েকটা ছোকরা এখনও বসে আছে। আমি আর নীচে নামছি না। এ বড়িতে আমার আর থাকা পোষাবে না।”
“কী যে বল! এত বড় একজন লোকের ভাই হওয়া কি সোজা কথা! তোমার সঙ্গে দেখা করতে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে কত লোক আসবে - আর তুমি পালিয়ে যাবে - তা কি হয়?”
“ছোঁড়ারা বলছে কি জানেন? দাদাকে দাকে নাকি আমিই...”
“ওঃ, ও-রকম কত কথাই বেরুবে! ওতে কান দিলে কি চলে?”
“তা ওদের যে রকম মেজাজ দেখছি, এক সময় হয়তো আমাকে মারধোরই করবে! তাহলে?”

মহিমবাবু হেসে বললেন, “তুমি বড্ড ভীরু, তুমি বড্ড ভীরু!”
“ভীরু বলুন আর যাই বলুন, আমার একটুও ভালো লাগছে না আর।”
“আচ্ছা, আচ্ছা, রাত্রিতে না হয় চঞ্চলকে পাঠিয়ে দেব। হ্যাঁ, শোন - এত লোক যে এসেছিল, তার মধ্যে উপেন ধরকে দেখেছিলে?”
“কই না!”
“তবেই তো দেখেছ? উপেন ধর যদি নির্দোষ হত তাহলে নিশ্চয়ই আসত।”
“তাও তো বটে!”
“উপেন ধর যে আসেনি, তাও তুমি লক্ষ কর নি? নাঃ, বিজয় তোমাকে নিয়ে মুশকিলেই পড়া গেছে... আচ্ছা, রেখে দিচ্ছি। যখন যা দরকার, জানিও।”

ফোন রেখে দিয়ে মহিমবাবু কলম তুলে নিলেন।।‘হরকরা’র একটা বৈকালিক এডিশন বেরোবে, তার জন্যে একটা সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখছিলেন। আজ দিনটা তিনি বড়ব্যস্ত; সকাল থেকে বহু লোক এসেছে আপিসে, সকলের সঙ্গেই দেখা করেছেন, দু চারটা করে কথাও বলতে হয়েছে। সকলের মুখেই উদ্বেগের দুশ্চিন্তার ছায়া। মফস্বল থেকে জয়ন্তীর যে সব ডেলিগেট এসেছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন কিছু উষ্মাও প্রকাশ করে গেছেন। রেলভাড়া খরচ করে এসেছেন, হোটেল খরচা করে আছেন, আর এখন কিনা নাটকের নায়কই উধাও! এ কী কাণ্ড! দেশের লোক নিয়ে তামাশা করা হচ্ছে নাকি! মহিমবাবু সকলকেই যথাসম্ভব সান্ত্বনা দিয়েছেন, পরামর্শ করে স্থির হয়েছে, কাল সকালের মধ্যে কোনো খবর যদি না পাওয়া যায়, তাহলে জয়ন্তীর তারিখ অনির্দিষ্টভাবে পেছিয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া আর উপায়ই বা কী!

মহিমবাবু বলে রেখেছিলেন, চঞ্চল আপিসে এলেই যেন তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একটার মিনিট পাঁচেক পরে চঞ্চল তাঁর কমরায় এসে ঢুকল। মহিমবাবু তখন প্রবন্ধ শেষ করে সেদিনকার অন্যান্য কাগজগুলোর উপর চোখ বুলোচ্ছিলেন।
“বোসো চঞ্চল।”
উপরিওয়ালা হিসেবে মহিমবাবু সত্যি ভালো। তাঁর চাকুরেদের সকলকে বসতে বলেন, এমন কি তিনি যখন কোনো কাজে কারও টেবিলের ধারে যান, কেউ যেন উঠে না দাঁড়ায় এই হল এ আপিসের নিয়ম।
“এটা একটু পড়ে দ্যাখ তো,” তাঁর সদ্যলিখিত প্রবন্ধটা এগিয়ে দিলেন চঞ্চলের দিকে।
মিনিট দশেক পরে মুখের সামনে থেকে সেদিনের ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ নামিয়ে বললেন, “পড়লে?”
“পড়লুম।”
“কেমন হয়েছে?”
“বেশ ভলো।”
“আমাকে খাতির করে বলছ?”

চঞ্চল লজ্জিত হয়ে বললে, “না, না, সত্যি খুব ভলো লীডার হয়েছে। আপনি তাহলে মনে করেন, বৃন্দাবন গুপ্তেরই এই কাজ? এই যে লিখেছেন - “গত ত্রিশ বৎসর ধরিয়া যে বিষাক্ত শত্রুতা, যে দুঃসহ নির্যাতন, সাহিত্য জগতের উপদ্রবসদৃশ কতিপয় ব্যক্তির কুটিল চক্রান্তপ্রসূত যে লাঞ্ছনা পরীক্ষিৎবাবু ভোগ করিয়া আসিতেছেন, আজ বুঝি তাহারই চরম পরিণতি দেখিতে পাইলাম। তাঁহার এই আকস্মিক অন্তর্ধান, যাহা সমগ্র দেশবাসীর পক্ষে মর্ম বিদারক, তাহা যদি কাহারও মুখে পাশবিক হাস্য ফুটাইয়া থাকে, সে বা তাহারা শুধু পরীক্ষিৎবাবুরই শত্রু নয়, তাহারা সাহিত্যের শত্রু, সমাজের শত্রু, স্বদেশের শত্রু, তাহাদের পশুত্ব প্রকাশিত ও দণ্ডিত করা প্রত্যেক সত্যপরায়ণ ব্যক্তিরই কর্তব্য।”“

নিজের রচনার অংশ শুনে মহিমবাবু গম্ভীর হয়ে রইলেন, কিছু বললেন না। চঞ্চল বললে, “একটু বেশি কড়া হয়ে গেছে না?”
“কড়া? তুমি বলছ কি চঞ্চল! এ তো কিছুই হয় নি। নেহাৎই আইন বাঁচিয়ে লিখতে হয় বলে, নয়তো দেখতে।”
“আপনার কি মনে হয়, বৃন্দাবন গুপ্ত ক্রাইম করতে পরে?”
“শুধু করতে পরে না, অনেক করেছে। তুমি সেদিনের ছেলে - তুমি আর ওর কথা কী জান।”
“তাহলে আপনি কি নিশ্চিন্ত জানেন যে, এটা ওরই কাজ?”
“নিশ্চয় করে কি আর বলা যায়? তবে হ্যাঁ - কিছু যোগাযোগ থাকা থাকা খুবই সম্ভব।”
চঞ্চল উত্তেজিতভাবে বললে, “তবে তো বৃন্দানবাবুকেই সকলের আগে অ্যারেস্ট করা দরকার।”
“তা হয়তো পুলিশ করেওছে এতক্ষণে। ব্যস্ত হয়ো না, বসো। ইন্সপেক্টর রণজিৎ সামন্ত এক্ষুণি আসবেন - তোমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন। ততক্ষণে একটু চা খওয়া যাক।”

মহিমবাবু প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা খান, বাড়ির মতো আপিসেও তাঁর চাযের সরঞ্জাম সর্বদাই প্রস্তুত। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চা এল। চায়ে চুমুক দিযে মহিমবাবু বললেন, “কাল কখন মেস-এ ফিরলে?”
“কাল আর ফিরলুম কোথায়, আজ সকালে ফিরেছি।”
মহিমবাবু একটু হেসে বললেন, “বেশ কাজের ছেলে তুমি, চঞ্চল। জীবনে তোমার উন্নতি হবে।”

চঞ্চল লজ্জিত হয়ে চায়ের পেয়ালায় নাক ডুবিয়ে রইল।
“তা, এ ব্যাপারটার তুমি কিছু করতে পার কিনা দ্যাখ না।”
“কোন ব্যাপারটা?”
“এই পরীক্ষিতের ব্যাপারটা।”
চঞ্চল অবাক হয়ে বললে, “এর আমি কী করব?”
“আমি ভাবছিলুম কী - ব্যাপারটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দিয়ে তো নিশ্চিত থাকা যায় না।”
“না থেকে উপায়ই বা কী?”
“হ্যাঁ, পুলিশ যা করবার তা তো করছেই। কিন্তু তোমাকে সত্যি বলছি, ওদের উপর আমার ঠিক ভরসা হয় না। আমরা নিজেরা কিছু চেষ্টা করলে দোষ কী? এই ধর, তুমি। তোমার বুদ্ধি আছে, সাহস আছে, কোনো কাজেই তুমি পেছ পা নও। ধর, তুমি যদি এটা নিয়ে উঠে পড়ে লাগো?”

মহিমবাবুর কথা শুনতে শুনতে চঞ্চলের মনে বিরাট একটা অ্যাডভেঞ্চারের কল্পনা ফুটে উঠল। এতবড় একটা রহস্যের সমাধান তাকে দিয়ে হবে এ-কথা ভাবতেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল সে। অসম্ভব শোনায়, কিন্তু কে জানে - হয়তো তাই হবে। খুব বিনীত সুরে সে বললে, “আপনি আমাকে কী করতে বলেন?”
কিন্তু মহিমবাবু এ প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই একজন বেয়ারা ঢুকে খবর দিলে যে লালবাজার থেকে ইন্সপেক্টর সায়েব এসেছেন।
“তাঁকে আসতে বল।”
রণজিৎবাবু ঘরে ঢুকতেই মহিমবাবু বললেন, “এই যে - এই আমার বিখ্যাত সাব-এডিটর চঞ্চল নাগ। আর ইনি ইন্সপেক্টর রণজিৎ সামন্ত।”
রণজিৎবাবু বললেন, “এতো একেবারে ছেলেমানুষ দেখছি!”
“ছেলেমানুষ কিন্তু কাজের মানুষ।”

চঞ্চল মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। ইন্সপেক্টর তাকে কালকের ঘটনা সম্বন্ধে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন, পকেট থেকে নোট বই বের করে তার উত্তরগুলো মিলিয়ে নিলেন।
“ঠিক আছে। তারপর আর কী খবর?”
“খবর তো আপনার কাছে।”
রণজিৎবাবু বললেন, “আমাদের নিযমমাফিক খোঁজ খবর সবই নিয়েছি। পরীক্ষিৎবাবুর ড্রাইভার যা বলেছে তাতে ভুল নেই।”
“কেন, ড্রাইভারকেও আপনারা সন্দেহ করেছিলেন নাকি?”
যতক্ষণ উল্তোটা প্রমাণিত না হয়, সকলকেই সন্দেহ করতে হয়।”

মহিমবাবু একটু ঠাট্টার সুরেই বললেন, “সন্দেহ যত খুশি লোককে করুন, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু কাজ কিছু এগিয়েছে কি?”
“সেন্ট্রাল এভিনিউর এ. বি. সি. গারাজ বলেছে, কাল রাত প্রায় সাড়ে আটটায় পরীক্ষিত্টবাবুর গাড়ির একটা টায়ার তারা বদলে দিয়েছে। ড্রাইভারের সই করা ভাউচারও দেখাল। গড়ির ব্রেকডাউন হয়েছিল ইডেন গার্ডেনের সামনে, এ. এ. বি-র সাহায্য নিয়ে গাড়িটাকে এ. বি. সি. গারাজে নিযে যাওয়া হয় - এ. এ. বি-র লোক যা বলল তার সঙ্গে ড্রাইভারের কথায় কোনো গরমিল নেই।”
“তাহলে কাঞ্চা সন্দেহমুক্ত হল। তারপর?”
“তারপর ঐ নিমাই -”
মহিমবাবু দু-হাত শূন্যে তুলে বললেন, “রক্ষে করুন! নিমাইকে সন্দেহ!”
“লোকটার অত বেশি কান্নাকাটি দেখেই আমার কেমন কেমন লাগছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধেও কোনো এভিডেন্স আছে বলে মনে হয় না।”
“বাঁচালেন মশাই। নিমাইকে সন্দেহ করলে আমাকেও করতে পারেন।”

এ সব ঠাট্টা একটুও গায়ে না মেখে রণজিৎবাবু বলতে লাগলেন, “তারপর বৃন্দাবন গুপ্তর কথা।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, তার কী করলেন?
“তাকে অ্যারেস্ট করেছি।”
“অ্যারেস্ট করেছেন?”
“হ্যাঁ, করেছি। কিন্তু করে বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হয় না। অমন দুর্দান্ত লেখক, কিছু চেহারা দেখে দয়া হয়। একে তো ভয়ানক বেঁটে, তার উপর এমন রোগা যে, লোকটা আছে কি নেই অনেক কষ্টে ঠাহর করতে হয় -”
“বলেন কী! আপনিও দেখছি সাহিত্যিক হয়ে উঠলেন!”
“সাহিত্যিকের পাল্লায় পড়ে হয়তো ও রোগে ধরেছে। কেঁদে কেটে অস্থির ভদ্রলোক। আমার পায়ে ধরতে বাকি রেখেছেন। “আমি এর কিছুই জানি নে, আমি এর কিছুই জানি নে।” কেবল এ কথা বলেন আর ফোঁসফোঁস কাঁদেন।”
“ভারি মজর ব্যাপার তো।”
“হ্যাঁ, ব্যাপারটা একটু মজারই হয়েছিল। ভিজিটিং কার্ড মিলিয়ে দেখলুম - এটা ওঁরই কার্ড বটে, জাল নয়।”
“না, না, জাল তো নয়ই।”
“জাল যে নয়ই আমরা তা বলব না, যতক্ষণ প্রমাণ না পাই, তবে আপনার কথা আলাদা। সাহিত্য জগতের নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখেন আপনি।”
মহিমবাবু বিনীতভাবে বললেন, “না না, সে রকম কিছু নয়। খবরের কাগজের লাইনে থাকলে নানা লোকের নানা জিনিস জেনে ফেলতেই হয়, সে জন্য চেষ্টা করতে হয় না।”
“কার্ডের কথায় বৃন্দাবনবাবু একেবারে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। “ও নিশ্চয়ই আমার কোনো শত্রুর কাজ, আমি দশ বছরের মধ্যেও প্রিন্সেপ ঘাটে যাই নি, কাল আটটার সময় আমি সিনেমায় ছিলুম - এই দেখুন টিকেটের কাউণ্টার ফয়েল।”“
“তা উনি নিজে গিয়েছিলেন, তা তো কেউ বলছে না। লোক লগিয়েছিলেন। এবং সে লোক সম্ভবত উপেন ধর।”
“বাঃ, আপনি দেখছি সমস্ত জিনিসটাই চমৎকার ভেবে রেখেছেন।”

মহিমবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, “আমি ডিটেকটিভ নই, কমন সেন্স থেকে বলছি। চঞ্চলকে জিগ্যেস করুন না, উপেন ধরকে ওরা দেখেছিল কিনা।”
“হ্যাঁ, সে কথা তো শুনেছি। যাই হোক, বৃন্দাবনবাবুকে তো হাজতে এনে রেখেছি। কষ্টই হচ্ছে ভদ্রলোকের জন্য।”
“আপনারা পুলিশের লোক, আপনাদের বলে দেওয়া বাহুল্য যে অনেক ডেঞ্জারাস ক্রিমিনাল দেখতে ও রকম হাবাগোবা গোবেচারা হয়।”
“তা ঠিক, চেহারা দেখে ক্রিমিনাল চিনতে পারলে তো আর কথাই ছিল না। তবে এভিডেন্স হিসেবে একটা ভিজিটিং কার্ড অবশ্য কিছুই নয়। যে কোনো লোকের কার্ড খুব সহজেই যোগাড় করা যায়, তারপর জায়গা বুঝে ফেলে রাখলেই হল।”
“ঠিক ঐ তারিখে ঐ জায়গায় এত লোক থাকতে, বৃন্দাবন গুপ্তেরই কার্ড কে ওখানে ফেলে রাখতে যাবে? আর তার উদ্দেশ্যই বা কী হতে পরে?”

রণজিৎবাবু একটু চুপ করে তেকে বললেন, “হ্যাঁ, সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে বইকি। সে জন্যই তো অ্যারেস্ট করা হল। কিন্তু দু চারকিনের মধ্যে আরও এভিডেন্স যদি না পাওয়া যায় তবে বোধহয় ছেড়েই দিতে হবে।”
“চেষ্টা করলে এভিডেন্সের অভাব হবে বলে মনে হয় না।”
“চেষ্টার ত্রুটি হবে না। কিন্তু আসল লোকটিকে ধরা গেল না, মহিমবাবু।”
“কে সে?”
“উপেন ধর। তার হোটেলের ঠিকানায় খুঁজে নিয়ে দেখলুম, কাল থেকে সেও ফেরার। নানা জায়গায় খোঁজা হল, লোকটার পাত্তাই নেই।”

মহিমবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “তাহলে উপেনবাবুর উপর খুব গভীরভাবেই সন্দেহ পড়ছে। কিন্তু ও পালাবে কোথায়? ওকে পাকড়াও করতে হবে, রণজিৎবাবু।”
“অনেকগুলো চর তো লাগিয়ে দিয়েছি - আর নানা জায়গার রেলওয়ে পুলিশও খবর পেয়ে গেছে। লুকিয়ে তাকে থাকতে হবে না।”
“না না, উপেন ধরকে চাই-ই। বৃন্দাবন অতি ঘোড়েল লোক, তার কাছ থেকে কিছু বের করা শক্ত হবে, কিন্তু উপেনটা একটা ল্যাগব্যাগে সং। ওকে দুই ধমক দিলেই সব বেরিয়ে আসবে। আঃ, পালিয়ে গেল লোকটা।”
“উপেন ধরের খোঁজে লালবিহারী মালাকারের ওখানেও গিয়েছিলুম।”
“গিয়েছিলেন? বেশ করেছিলেন। তবে লালবিহারীবাবুর সঙ্গে উপেন ধরের কোনো যোগাযোগ এখন আর নেই। আলাদা কোম্পানি করেছে, তাই নিয়েই ঘোরাঘুরি করেছিল। তা, লালবিহারীবাবু কিছু বললেন?”
“বললেন - তিনি যে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন, তার টাকাটা আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন, যদি তাতে কোনও কাজ হয়।”
“আহা - এ কাজ সবাই নিজের গরজেই করবে, এর জন্য কি আর পুরস্কার ঘোষণার দরকার করে। তবে এদেশে এত বড়লোক থাকতে, ওঁরই এদিকে মন গেল - লোকটি মহা সদাশয় বটে।”
“সুন্দর বাড়িটি লালবিহারীবাবুর। পয়সা যেমন আছে, ভোগ করতে জানে। বাড়ির গৃহপ্রবেশের সময় আপনার কাগজে ছবি দেখেছিলুম, আজ আসল বাড়িটি দেখে চোখ ধন্য হল।”

মহিমবাবু হেসে বললেন, “ব্যবসা ছাড়া কোনো দিকেই লালবিহারীবাবুর মন ছিল না। এখন যে সাহিত্যে টাহিত্যে একটু আধটু উৎসাহ হয়ছে তার কারণ আমিই। পরীক্ষিৎবাবুকে দু একদিন নিয়েও গিয়েছি তাঁর বাড়িতে। এ সব কারণেই এ ব্যাপারে তাঁর এতখানি গরজ দেখছেন।”
রণজিৎবাবু বললেন, “হ্যাঁ, তাই দেখছি।”

ছয়

ইন্সপেক্টরববুর কথা চঞ্চল যতই শুনছিল ততই হতাশ হচ্ছিল। এর বেশি কি সামন্ত সায়েবের কিছুই বলবার নেই? এ যে নেহাৎ ধরা বাঁধা মামুলি কথাবার্তা, এর মধ্যে সেই চমক কোথায়, গল্পের ডিটেকটিভদের কার্যকলাপ পদে পদেই যা পাওয়া যায়? সে লক্ষ করল যে মহিমবাবু যা যা বলছেন তারই উপর নির্ভর করে ইন্সপেক্টরবাবু কাজ করে যাচ্ছেন, এর বাইরে কিছুই বোধহয় তিনি ভাবতে পারেননি। মনে হয়, মহিমবাবুর পরামর্শ নিতেই যেন এসেছেন, মহিমবাবুর মুখের দিকে কেমন দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে থাকেন, ছাত্রের মতো তাঁর কথা শোনেন।

এ থেকে চঞ্চলের মনে দুটো ধারণা হল। প্রথমত, অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন মহিমবাবু সম্বন্ধে তার মন গর্বে ভরে উঠল, দ্বিতীয়, পুলিশকে ডিঙিয়ে, সমস্ত দেশীর লোককে অবাক করে দিয়ে এ রহস্যের সমাধান হয়তো সে-ই করতে পারবে, এমন একটা অসম্ভব দুরশা প্রবল হয়ে উঠল তার মনে। কী করে কী করবে কিছুই জানে না, শুধু একটা অস্পষ্ট উদ্যমের প্রেরণায় ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগল।

রণজিৎবাবু বললেন, “আপনার সময় আর নষ্ট করব না - এখন উঠি।”
মহিমবাবু অমায়িকভাবে বললেন, “আসুন আর দুটো মিনিট।”
“আপনি নিশ্চয়ই ব্যস্ত - আজ আবার বিকেলে আপনার কাগজ বেরোবে।”
“ব্যস্ত আমি সব সময়েই, কিন্তু আপনি তো আজ আমার চেয়েও ব্যস্ত। এত বড় একটা কেস হাতে!”
“চট করে কিছু হবে বলে মনে হয় না - আমার তাড়া নেই।” রণজিৎবাবু হাতের কাছে সেদিনের ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ পড়ে ছিল, সেখানা তুলে নিয়ে বললেন, “কী লিখেছে আজকের ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ?’“
“দেখেন নি?”
“না। সকাল থেকে তো ঘুরছিই।”
“দেখুন দেখুন, ভারি মজার। তৃতীয়পৃষ্ঠার পঞ্চম কলম দেখুন।”
“ওঃ, আপনার দেখছি মুখস্থ,” বলে রণজিৎবাবু নির্দেশমতো পাতা উল্টালেন।
“যার যা কাজ। তাছাড়া আমার স্মরণশক্তি একটু ভালোই।”

‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ পরীক্ষিত জয়ন্তীর উদ্যোক্তাদের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছে যে পরীক্ষিৎবাবুর মতো শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিয়ে এই হৈ চৈ করতে গিয়েই কাণ্ডটা হল।
তিনি নিশ্চয়ই এটা এড়াবার জন্যেই গৃহত্যাগী হয়েছেন, হয়তো সন্ন্যেসী হয়েছেন, হয়তো বিদেশে পালিয়েছেন। “আমরা যে প্রথম হইতেই এই অনুষ্ঠানের বিরোধী ছিলাম তাহার যৌক্তিকতা কি এখন প্রমাণ হইল না?” শেষে লিখেছে যে এই জয়ন্তী অবিলম্বে বাতিল করে দেওয়া হোক, পরীক্ষিত ভক্তরা ঘোষণা করুক যে এ রকম অনুষ্ঠানের কল্পনা তারা আর কখনো মনে স্থান দেবে না, তাহলে মজুমদারমশাই নিজে থেকেই হয়তো ফিরে আসবেন, পুলিশের সাহায্য কি পুরস্কার ঘোষণা কিছুই দরকার হবে না।

রণজিৎবাবু পড়ে বললেন, “হুঁ।”
“কেমন বুঝলেন?”
“প্যারাগ্রাফটা বোধহয় আমাদের বৃন্দাবনবাবুর লেখা? বেচারা! এখন হাজতে বসে হাত কামড়াচ্ছে। বড় কষ্ট হচ্ছে ভদ্রলোকের জন্যে, ওঁকে ছেড়েই দিতে হবে।”
মহিমবাবু বললেন, “আপনার মতো দয়াশীল লোক পুলিশের মধ্যে খুবই কম, এ কথা বলতেই হয়। আচ্ছা প্যারাগ্রাফটা পড়ে আপনার কী মনে হল?”
“লেখাটা বড়ই মোটা রকমের। যেন ওঁরাই পরীক্ষিৎবাবুকে সরিযেছেন, জয়ন্তী বন্ধ করে দিলেই বার করে দেবেন, এ রকম একটা ভাব আছে বটে।”
“আমাদেরও তাই মনে হচ্ছিল। আপনার মতো সতর্ক অফিসার না হলে হয়তো শুধু বৃন্দাবনকে নয়, ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’-এর স্বত্বাধিকারীকেও এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলত। ভারি কাঁচা হয়েছে লেখাটা।”
“তা, আমাদের সতর্কতা মানেই চারিদিকে চোখ কান খোলা রাখা। আপনাকে তো বলেছি - সকলকেই আমরা সন্দেহ করি, যতক্ষণ উল্টোটা প্রমাণিত না হয়।”
“শশাঙ্কবাবুর সঙ্গে পরীক্ষিতের কিছুদিন আগে একটা মামলাও হয়ে যায় তা তো জানেন।”
“শশাঙ্কবাবু কে?”
“শশাঙ্ক বক্সি – ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপে’র প্রোপ্রাইটর।”
“কি নিয়ে মামলা?”
“ওর একটা গ্রন্থাবলী ওরা পাব্লিশ করেছিল, রয়ালটি ঠিক মতো দিচ্ছিল না। হাইকোর্টে পরীক্ষিতের জিৎ হয়।”
“এখন ওঁর পাব্লিশর কে বলতে পারেন?”
“নব সাহিত্য ভবন নমে একটা নতুন ফার্ম। যদ্দুর জানি ওর নতুন বই, নতুন এডিশন আর গ্রন্থাবলী ইত্যাদি বই এখন থেকে নব সাহিত্যই বার করবে। কন্ট্র্যাক্ট হয়ে গেছে।”
“ফার্মটা কার?”
“একটা লিমিটেড কোম্পানি - ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়রাম শীল।”
“কী নাম বললেন?”
“জয়রাম শীল।”
“তাহলে ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপে’র গাত্রদাহ হবার নানারকম কারণই আছে দেখছি।”
“তা আছে। অবশ্য প্রমাণ না পেলে বলা শক্ত, কিন্তু আমার প্রথম থেকে মনে হযেছে যে এ রহস্যের চাবি - মানিকতলা অঞ্চলেই আছে।” (মানিকতলায় ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপে’র আপিস।)
“সেই তো আমাদের মুশকিল মহিমবাবু, প্রমাণ না পেলে কিছুই করবার উপায় নেই। আস্তে আস্তে, অতি সাবধানে এগোতে হয়।”
“আপনারা তো আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন, এদিকে নানারকম আজগুবি গুজবে শহরে তো কান পাতা যায় না। এ পর্যন্ত কটা থিওরি হয়েছে, জানেন?”

রণজিৎবাবু বললেন, “আমি যদ্দুর জানি, সাতটার বেশি নয়। যথা: এক নম্বর - শান্তিপ্রিয পরীক্ষিৎবাবু জয়ন্তীর ভয়ে দেশত্যাগী হয়েছেন -”
মহিমবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “এ থিওরি তো আপনার মগজেই প্রথম গজায়। জাপানি জাহাজের কথা মনে আছে?”
এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে রণজিৎবাবু বললেন, “দুই নম্বর - পরীক্ষিৎবাবুর হঠাৎ স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে; তিনি যে কে, সে কথাটাই মনে করতে পারছেন না, হয়তো এতক্ষণে খিদিরপুর ডকে কি ঝরিয়ার কয়লাখনিতে কুলিগিরিতে ভর্তি হয়েছেন।”
“বাহ, চমৎকার থিওরি তো! তারপর?”
“তিন নম্বর - তিনি পাগল হয়ে গেছেন।”
“তা তো বুঝলাম - কিন্তু কোথায় গেছেন সেটাই ও প্রশ্ন।”
“চার নম্বর - তিনি আত্মহত্যা করেছে, কিংবা তাঁকে খুন করা হয়েছে।”
“একেবারে গুম খুন। মৃতদেহ শুদ্ধু হওয়া হয়ে গেল!”
“পাঁচ নম্বর - টাকা আদায় করবার ফিকিরে গুণ্ডার দল তাঁকে সরিয়েছে। ছয় নম্বর - তাঁর সাহিত্যিক শত্রুরাই এটা ঘটিয়েছে, জয়ন্তী কাণ্ড লণ্ডভণ্ড করবার জন্য।”
“এই শেষেরটাই সম্ভব বলে আমার মনে হয়।”
“এটা তো বলতে গেলে আপনারই থিওরি। এ পর্যন্ত সন্দেহের জোরটাও এদিকেই পড়েছে। যাই হোক, আরও একটা আছে, সেটা আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। সাত নম্বর - এটা বিজয়কৃষ্ণবাবুরই কারসাজি, কারণ দাদার অনুপস্থিতিতে সম্পত্তি টম্পত্তি সব তাঁরই।”

কথাটা শুনে মহিমবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন। “এরকম একটা থিওরি হয়েছে নাকি? তাহলে আট নম্বর থিওরিটা আমি বলছি শুনুন, পরীক্ষিৎবাবুকে - মহিম চাটুয্যেই সরিয়েছে।”
রণজিৎবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, “হাসির কথা নয়। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে অল্পদিন আগেই পরীক্ষিৎবাবু উইল করেছেন, তাতে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী ভাইকেই করে গেছেন। মানুষের কখন কী মনে হয় তা তো বলা যায় না।”

মহিমবাবু একটা বেল টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেয়ারা এল। তার হাতে একটা কাগজ দিয়ে বললেন, “টাইপ।” তারপর রণজিৎবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার কি সত্যি সত্যি মনে হয় যে বিজয় - “
কিন্তু তাঁর কথা শেষ হতে পারল না। গুড়ুম করে একটা শব্দ হল, বারুদের গন্ধে ঘর গেল ভরে অর মহিবাবুর কামরার কাঠের পার্টিশনের একটা অংশে হঠাৎ চুরমার হয়ে ভেঙে গেল।

সমস্ত আপিসে হুলস্থূল, ছুটে এল বেয়ারা দারোয়ান কেরানি যে যেখানে ছিল, রণজিৎবাবু রাস্তায় দুজন কনেস্টবল দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছিলেন তারাও এল। কিন্তু মহিমবাবুর হল কী! তাঁর জন্যে অবশ্য বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হল না, চঞ্চল তাঁকে টেনে বার করলে টেবিলের তলা থেকে। কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে পড়ে তিনি শুধু বললেন, “উঃ!”

সাত

রণজিৎবাবু বললেন, “খুব বেঁচে গিয়েছেন, চঞ্চলবাবু। আর একটু হলেই আপনার মাথার খুলিটা গিয়েছিল।”
চঞ্চল বললে, “মাথাটা যে আস্ত আছে এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।” হাসবার চেষ্টা করলে বটে, কিন্তু বুকের ভেতর তার ধড়াস ধড়াস করছে, মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
মহিমবাবু অতি কষ্টে উচ্চারন করলেন, “একটু জল।”
রণজিৎবাবু বললেন, “বরং এক পেয়ালা চা খান, মহিমবাবু, সুস্থ বোধ করবেন।”
দু তিন ঢোঁক জল খেয়ে মহিমবাবু বললেন, “ উঃ, কী ভয়ানক! কী ভয়ানক! আপনাকে সুদ্ধু ফেলতে চায়! মস্ত একটা ক্রিমিন্যাল গ্যাঙ পিছনে লেগেছে, কী উপায় হবে, রণজিতবাবু?”
মহিমবাবু চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলেন।
রণজিৎবাবু একটু হেসে বললেন, “আপনার টেবিলের তলায় ঢোকাটা কিন্তু ভারি চমৎকার হয়েছিল আচ্ছা বিশ্রাম করুন, আমি ব্যাপারটার একটু তদন্ত করে আসি।”

ইন্সপেক্টরের মুখে এ রকম হালকা কথা শুনে চঞ্চলের শরীরটা যেন জ্বলে গেল। সে না বলে পারলে না, “একটু আগে, আপনার মুখের চেহারাও ঠিক বীরের মতো দেখা যাচ্ছিল না, ইন্সপেক্টরবাবু?”
“রণজিৎবাবু নির্লজ্জের মতো বললেন, “ওরে বাবা বন্দুকের গুলির সামনে বীরত্ব! চাচা, আপন বাঁচা।”
এ কথা বলেই তিনি কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন, চঞ্চল অত্যন্ত বিরক্ত মনে গুম হয়ে বসে রইল। মহিমবাবুও চোখ বুজে চুপ।

দিন দুপুরে কলেজ স্কোয়ারের উপরে এমন একটা কাণ্ড - রাস্তায় প্রকাণ্ড ভিড় জমে গেছে, তাদের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে, তেতলার ঘরে বসেও। মহিমবাবু যেখানে বসেন তার ঠিক পিছেই একট মস্ত খোলা জানলা, জানলার উল্টোদিকে আর একটা তেতলা বাড়ি, মাঝখানে সরু গলি। সেই উল্টোদিকের বাড়ির একটা জানলা আর এ জানলা একেবারে মুখোমুখি। সে বাড়ি থেকেই কেউ যে এ কাণ্ড করেছে তাতে সন্দেহ নেই।

গুলির আওয়াজ হবার সঙ্গে সঙ্গেই নীচে রণজিৎবাবুর কনেস্টবলরা একটা কাজ করেছিল প্রাণপণে তাদের হুইসল বাজিয়ে দিয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের রাস্তা থেকে পুলিশ এসেছিল ছুটে, এখন ‘হরকরা’ আপিসের সামনে এক বিচিত্র দৃশ্য। পিছনের গলিও পুলিশে ভর্তি, দেখতে দেখতে সার্জেণ্ট এল চার পাঁচজন, আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা থেকে দুজন দারোগা এল, কিন্তু গুলি ছুঁড়ল তার একেবারেই কোনো পাত্তা মিলল না।

প্রায় আধঘণ্টা পর রণজিৎবাবু ফিরে এলেন। মহিমবাবুর টেবিলের উপর বন্দুকের গুলিটি রেখে বললেন, “এটি পাওয়া গেছে আপনার টাইপিস্টের টেবিলের তলায়। এ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না।”
চঞ্চল বেশ একটু ঝাঁঝাল সুরেই বললেন, “সে রকম আশাও আমরা করিনি।”
তার কথার কোনো জবাব না দিযে ইন্সপেক্টরবাবু বলতে লাগলেন, “উল্টোদিকের বাড়িটা দু মাস ধরে খালি পড়ে আছে। সদর দরজা তালা বন্ধ।”
“তাতে তো ডাকাতের আরও সুবিধে।”
“আমরা তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকে তন্ন তন্ন করে খুঁজলুম, কোনো হদিশ মিলল না। এই জানলার মুখোমুখি ঘরটা অবশ্য খোলা ছিল, কিন্তু আশ্চর্য এই যে গলির দিকের জানলাটা ছিল বন্ধ।”
“তা পালাবার আগে জানলা বন্ধ করতে কতক্ষণ।”
“জানলার কাচে কি দেয়ালে কোথাও আঙুলের ছাপ নেই, ঘরে অনেকদিনের ধুলো জমে আছে, পায়ের ছাপ নেই।”
“ইন্সপেক্টরবাবু, যারা এত পারে তারা পায়ের আঙুলের ছাপ লুকোতেও জানে।”
“তাও বটে, তাও বটে,” বলে রণজিৎবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন। একটু পরে বললেন, “আচ্ছা চঞ্চলবাবু, আপনার মনে আছে, আমরা যখন এখানে বসে ছিলাম, ঐ জানালাটা খোলা ছিল না বন্ধ ছিল?”
চঞ্চল একটু ভেবে বললে, “কী যেন, আমার ঠিক মনে পড়ছে না।”
মহিমবাবু বললেন, “বন্ধ থাকলেই বা কী! একটুখানি ঘুলঘুলি ফাঁক করে নিয়েও রিভলভার ছোঁড়া যায়।”
রণজিৎবাবু তৎক্ষণাৎ বললেন, “সে কথা ঠিক। তারপর একতলায় দোতলায় আপনার প্রেস ও আপিসও খোঁজা হল - যদি কোথাও লুকিয়ে থাকে -”
মহিমবাবু একটু হেসে বললেন, “তার চাইতে সটান আমার কাছে এসে ধরা দিতেও তো পারত।”
“পালাবার পথ না পেলে, ধরা তো দিতই। পালাল কেমন করে তাই ভাবছি।”
চঞ্চল বললে, “আপনার পদ্ধতিতে ভাবাটা বড্ড বেশি হচ্ছে, কাজ সে তুলনায় কম।”
“তাই তো, ভারি জব্দ হয়ে গেলাম লোকটার কাছে। দিনে দুপুরে এতগুলো পুলিশের নাকের তলা দিয়ে বেমালুম সরে পড়ল। আশ্চর্য!”
চঞ্চল বললে, “এটা বোঝ যাচ্ছে যে পরীক্ষিৎবাবুকে যারা সরিয়েছে, মহিমবাবুর উপরেও তাদের রাগ কম নয়।”
মহিমবাবু ফ্যাকাশে একটু হেসে বললেন, “হবেই বা না কেন! এ ব্যাপারটা নিয়ে ‘হরকরা’ যে রকম উঠে পড়ে লেগেছে, তেমন তো আর কেউ লাগেনি। পাবলিক ওপিনিয়ন ক্ষেপিয়ে তুলতে পারলে ব্যাপারটার একটা হদিশ হবেই।”
রণজিৎবাবু বললেন, “হ্যাঁ, আপনি একটু সাবধানেই থাকবেন, মহিমবাবু। লোক ওরা সুবিধের নয়।”
“আমার আর সাবধান আর অসাবধান। কাজ করে যাব - তারপরে যা হবার হবে।... দেখুন, আমার মনে হয় ঐ উপেন ধর লোকটাকে ধরতে পারলেই সমস্যার সমাধান হয় যায়।”
“চেষ্টা তো কারছি, কিন্তু ...”

রণজিৎবাবুর কথা শেষ হল না - উসকোখুসকো চুল, চোখ ঘোলাটে বিজয়বাবু ঝড়ের মতো ঘরে এসে ঢুকলেন। একখানা খামে ভরা চিঠি মহিমবাবুর সামনে টেবিলের উপর ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগলেন, ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে।
মহিমবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, “কী, বিজয়? কী খবর?”
“খবর... এই চিঠি। এই যে রণজিৎবাবুও আছেন দেখছি। ভালোই হল।”
বিজয়বাবু মোটাসোটা নাদুসনুদুস চেহারার উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে, চোখে পড়েছে কালি, মুখে পান নেই, তাঁর এমন রুক্ষ লক্ষ্মীছাড়া মূর্তি কেউ কখনও দ্যাখেনি।
মহিমবাবু বললেন, “একটা ডাব আনিয়ে দিই, বিজয়? না একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক? বড্ড শুকনো দেখাচ্ছে তোমাকে।”
“না না - আমার কিচ্ছু লাগবে না। চিঠিটা দেখুন।”
খামটা খোলাই ছিল, মহিমবাবু ভিতর থেকে চিঠিটা বের করলেন। খুলে চোখের সামনে ধরেই বলে উঠলেন, “এ কী! এ যে দেখছি পরীক্ষিতের -”

সত্যিই তাই, পরীক্ষিৎবাবু লিখেছেন:
“বিজয়,
আমি এখন বন্দী। আছি ডায়মণ্ড হার্বারে, নদীর ধারে একটি বাংলোয়। বাড়িটা যেমন মস্ত, তেমনি পুরোনো। এর বেশি লিখতে পারব না। মহিমকে খবর দিও।
তোমার দাদা”

চিঠিটা হাতে হাতে অনেকবার ঘোরাঘুরি করল। পুরোনো ময়লা দুমড়োনো এক টুকরো কাগজে পেনসিলের অস্পষ্ট লেখা। সেরকমই আর একটা কাগজ জোড়া লাগিয়ে কোনোরকমে খাম তৈরি হয়েছে। বেয়ারিং চিঠি। ডাকঘরের ছাপ, ডায়মণ্ডহার্বারের বটে।
কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বললে না।তারপর মহিমবাবু বললেন, “চিঠিটা যে জাল নয়, তার কী প্রমাণ?”
“হাতের লেখা দাদারই বটে,” বললেন বিজয়কৃষ্ণ।
“মনে তো হচ্ছে তাই, তবে...”

বিজয়বাবু অধীরভাবে বললেন, “তবে আবার কী? কত কষ্টে একটু কাগজ পেনসিল জোগাড় করে দাদা লিখেছেন। হাতের লেখা একটু আঁকা বাঁকা তো হবেই। মহিমবাবু, ইন্সপেক্টরবাবু, আপনারা ... আপনারা দাদাকে উদ্ধার করুন,” বলতে বলতে বিজয়বাবুর গলা প্রায় ধরে এল।
“আহা, বিজয়, ও রকম কর না, একটু শান্ত হও।”

চিঠিটা রণজিৎবাবুর হাতে ধরা ছিল, তিনি সেটা পকেটে ভরে বললেন, আচ্ছা আমি এখন উঠি।”
বিজয়বাবু কাতরস্বরে বললেন, “তাহলে...”।
“আপনি ভাববেন না, যা ব্যবস্থা করবার সবই করা হবে।”
“এক্ষুণি বাড়িটাকে পুলিশ দিয়ে ঘেরাও করিয়ে ফেলুন। কে জানে, দেরি হলে ওরা যদি আবার সরিয়ে ফ্যালে।”
“হ্যাঁ, সেইরকমই কিছু একটা করতে হবে। ...মহিমবাবু, আজ মোহনবাগানের খেলা দেখতে যাবেন না?”
মহিমবাবু অবাক হয়ে বললেন, “আপনি যাচ্ছে নাকি?”
“ভাবছি তো ধন্য মোহনবাগান! এত হেরে এত নাম জগতের আর কোনো টিম করেছে বলতে পারেন?”
চঞ্চল বলে উঠল, “আপনি দেখছি খেলা নিয়ে মেতে উঠলেন। এদিকে পরীক্ষিৎবাবু-”
“আর কয়েক ঘণ্টা সমুদ্রের হাওয়া খেলে পরীক্ষিৎবাবুর ক্ষতি হবে না। ব্যাপারটা তো বলতে গেলে চুকেই গেছে। আজ কালীঘাটের সঙ্গে খেলা। মোহনবাগান ক’গোলে হারবে তাই ভাবছি।”

চঞ্চল আরও তীব্রস্বরে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মহিমবাবু তার আগেই বললেন, “চঞ্চল, তুমি নীচের ঘরে গিয়ে বিকেলের এডিশনে এই চিঠিটার খবর দিযে এস। ডবল কলম নিউজ। চিঠিটার নকল আমি তক্ষুনি রেখেছিলাম - এই নাও। আর এই গুলি ছোঁড়ার ব্যাপারটাও দিতে হবে। শুনেছ তো, বিজয়, এদিককার কাণ্ড।”
“আপনার আপিসে ঢোকবার আগেই শুনেছি। আমাকে আর কিছু বললেন না, আমার আর সহ্য হচ্ছে না। উঃ!” বিজয়বাবু টেবিলের উপর দু হাতে মুখ ঢাকলেন।

চঞ্চল তার টেবিলে গিযে লিখতে বসল, রণজিৎবাবু বিদায় নিলেন। বিজয়বাবু মাথা তুলে বললেন, “এই ইন্সপেক্টরকে দিযে কোনো কাজ হবে বলে তো মনে হয় না। তিনি চললেন ফুটবল খেলা দেখতে।”

মহিমবাবু বিজয়ের পিঠে হাত রেখে বললেন, “তুমি ভেব না, বিজয়, এ ব্যাপারটার কুল কিনারা না করে আমি ছাড়ছিনে। আমাকে একটু বেরুতে হচ্ছে। তুমি বসবে।”
বিজয়কৃষ্ণ উদ্ভ্রান্তভাবে বললেন, “আমি বাড়ি ফিরে যাই।”
“বাড়িতে ভালো না লাগলে বরং আমার সঙ্গেই চল।”
“তাই চলুন।”

আট

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মহিমবাবু আপিসে ফিরে এলেন, বিজয়বাবুকে অনেকটা শান্ত করে রেখে এলেন। তাঁর বাড়িতেই। নিজের বাড়ির বিরাট বোবা শূন্যতা থেকে পালাতে পেরে বিজয়বাবু যেন একটু আরাম বোধ করলেন।

আপিসে এসেই মহিমবাবু ডেকে পাঠালেন চঞ্চলকে।
“নিউজ লিখে দিয়েছো?”
“দিয়েছি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কাগজ বেরিয়ে যাবে। হকাররা এখন থেকেই আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। খুব ডিমাণ্ড হয়েছে।”
“হ্যাঁ, শহরের সবাই ব্যস্ত হয়ে আছে তো। শোনো চঞ্চল, তোমাকে এখন ডায়মণ্ড হার্বরে পাঠাতে চাই।”
চঞ্চল চুপ করে রিল।
“পারবে তো?”
“পারব না কেন?”
“ভয় পাবে না?”
চঞ্চল দৃঢ়স্বরে বলল, “না। কী করতে হবে বলুন।”
“এক্ষুণি চলে যাও শেয়লদা। সেখান থেকে ট্রেন চেপে ডায়মণ্ড হার্বার। বাড়িটা খুঁজে বের করতে আশা করি তোমার কষ্ট হবে না। যতক্ষণ দিনের আলো থাকবে, কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করবে - নজর রাখবে কে ঢুকছে আর কে বেরুচ্ছে। সন্ধের পরে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তোমার আসল কাজ শুরু। কৃষ্ণপক্ষের রাত আছে, সুবিধাই হবে।”
“সুবিধে পেলে, বাড়িটার ভিতরেই যাব।”
“তা যদি যেত পার তবে তো ভালোই। কিন্তু খুব সাবধান। ওরা লোক ভালো নয়, রিভলভার টিভলভারও আছে। যদি শুধু এইটেই জেনে আসতে পার যে পরীক্ষিৎ সত্যি ওখানে আছে, তাহলেই অনেকখানি হল। দুঃসাহস করো না, বুঝে সুঝে চল। যদি জানতে পাও যে পরীক্ষিৎ ওখানে আছে, তাহলেই তোমার কাজ শেষ হল। আর কিছু করবার চেষ্টা কোরো না। তারপর ডাক বাংলোয় গিয়ে ঘুমিয়ে কি কলকাতায় ফিরে এস, যদি ট্রেন পাও। আর একটা ফোন কোরো আমার বাড়ির নম্বরে। আমাকে না পেলেও বিজয়কে পাবে।”
“আপনি কি আজ রাত্রে বাড়ি থাকবেন না?”
“আমার আজ রাত্রে অনেক কাজ, চঞ্চল, কখন কোথায় থাকি, ঠিক নেই। এ হাঙ্গামা চুকে গেলে যা একচোট ঘুমিয়ে নেব!”
“রাত্তিরে এত কম ঘুমিয়ে আপনি কী করে পারেন! আশ্চ্চর্য!”
“সবই অভ্যেস! তাহলে আর দেরি কোরো না। এই নাও” বলে মহিমবাবু পকেট থেকে ব্যাগ বের করে দুটো দশটাকার নোট চঞ্চলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“এত টাকা দিয়ে কী হবে?”
“রাখ সঙ্গে, যদি লাগে। আমার মনে হয়, পুলিশের লোকও আজ রাত্রেই যাবে ওখানে। দেখ, তারা যেন আবার তোমাকে শত্রুপক্ষের বলে সন্দেহ না করে! যতটা পার তাদের সাহায্য কোরো।”
“আপনার কি মনে হয়...”।।
“এখন আর মনে হওয়া না হওয়ার সময় নেই। পনেরো মিনিটের মধ্যেই একটা গাড়ি আছে। তুমি বেরিয়ে পড়।”

শেয়ালদা সাউথ স্টেশনে টিকিট কিনে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে চঞ্চল দেখল, গাড়ি ছাড়তে তখনও মিনিট পাঁচেক বাকি। ভিড় কম এমন একটা গাড়ি খুঁজে বের করে সে উঠে বসল। কী এক অদ্ভুত উদ্দেশ্য নিয়ে সে চলেছে। কে জানে হয়তো কোনো বিপেই পড়বে, কে জানে হয়তো, চিঠিটাই জাল, একদম ঠকে ফিরে আসবে। তার বুকের ভিতরটা ঈষৎ দুর দুর করতে লাগল - না জানি কী হয়!

গাড়ি ছেড়ে দিয়ে প্রায় প্ল্যাটফর্মের বাইরে চলে এসেছে, পাশের কামরা থেকে একটা হৈ চৈ শব্দ উথল। চঞ্চল মুখ বাড়িয়ে দেখল, একটা লোক চলতি ট্রেনে উঠতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। এখনও লম্বা দুটো ঠ্যাং বাইরে ঝুলে আছে, কিন্তু একটু পরেই ভিতরের লোকেরা তকে টেনে তুলল, গাড়ি ছুটল, গাড়ি ছুটল বেগে। চঞ্চল লোকটার মুখ দেখতে পেল না, দেখতে পেলে খুশি হত। কেমন একটা সন্দেহ তার মনে খচ খচ করতে লাগল, লোকটা তারই পিছু নেয়নি তো? প্রত্যেক স্টেশনে সে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল, পাশের কামরা থেকে একে একে নামল। কহনও মনে হয় সে লোকটা নেমে গেল, কখনও মনে হয় উল্টোটা। কখনও আবার মনে হয়, বাজে কথা ভেবে সময় নষ্ট করছে, ও সব কিছুই নয়। এই রকম মনের অবস্থার মধ্যে সন্ধের একটু আগে সে ডায়মণ্ড হার্বারে এসে পৌঁছল। গাড়ি স্টেশনে আসতেই সে লাফ দিয়ে পড়ল প্ল্যাটফর্মে, পাশের কামরা থেকে বিশেষ কেউ নামে কিনা সেটা লক্ষ করে দেখবে এইরকম তার মতলব। কিন্তু মুহূর্তে প্ল্যাটফর্ম ভিড়ে ভরে উঠল, তার ভিতরে কাউকে আলাদা লক্ষ করা সম্ভব হল না।

ডায়মণ্ড হার্বারে সে আগেও এসেছে, পথঘাট মোটামুটি জানে। স্টেশনে এক পেয়ালা চা খেয়ে নিল তারপর বেরিয়ে এসে নদীর দিকের রাস্তা ধরল। একটু হাঁটে আর এদিক ওদিক তাকায় - কেউ তার পিছু নিয়েছে কিনা। ছোটো মফস্বল শহরের রাস্তায় বেশি লোক নেই, এর মধ্যে কেউ যে লুকিয়ে কারো পিছু নেবে সেটা সম্ভব নয়। চঞ্চলের সন্দেহ না যে এটা তার ভুল মাত্র।

নদীর ধার ধরে ঘোরাঘুরি করতে করতে শহরের খানিকটা বাইরে মস্ত পুরোনো একট বাড়ির কাছে সে এসে দাঁড়াল। দেখে সন্দেহ রইল না যে এই সেই বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা প্রকাণ্ড বাড়ি, কম্পাউণ্ডে অনেক বড় বড় গাছ ছায়া রচনা করেছে, দোতলার সব জানলা বন্ধ, একতলাটা রাস্তা থেকে ভালো করে দেখা যায় না। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় না এখানে কোনো মানুষ আছে বা কোনোকালে থেকেছে। হয়তো কোম্পানির আমলে কোনো শৌখিন সাহেব নদীর ধারে বাড়িটি করেছিল। এখন কালের কবলে পড়ে এই দশা হয়েছে।

চঞ্চল বাড়িটির চারদিক ঘুরে একবার দেখল, তারপর নদীর ধারে ঘাসের উপর বসে ভাবতে লাগল, এখন কী করা।
জায়গাটি এমনিতেই নির্জন, তার উপর সন্ধে হবার সঙ্গে সঙ্গেই দূর থেকে শেয়াল ডেকে উঠল, নদীর জলের ছলছল শব্দ যেন বেড়ে উঠল, হাওয়া হু হু করে ফিরতে লাগল। দেখতে দেখতে আকাশ ভরে তারা ফুটল আর কালো অন্ধকারে জোনাকি উঠল জ্বলে।

তখন চঞ্চল আস্তে আস্তে উঠে বাড়িটার ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। ভাঙা ফটক হাঁ করে খুলে আছে, ঢুকতে বাধা নেই। চঞ্চল ঢুকল, ঢুকেই একটু থমকে দাঁড়াল। মনে হল বাড়িটার ভিতর থেকে মানুষের গলার চাপা আওয়াজ যেন আসছে। কোথায় কোন ঘরে একটা আলো জ্বলে উঠেই যেন নিতে গেল। না কি এসব তার মনের ভুল? চোখের ভুল? না, স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে পায়ের শব্দ। চঞ্চলের গলা যেন বুজে আসতে চাইল, কিন্তু জোর করে সমস্ত ভয়ের ভাব মন থেকে তাড়িয়ে সে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল, উথল এসে একতলার বারান্দায়।
এখন কোন দিকে যাবে?

অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। চঞ্চলের পকেটে ছোটো একটা টর্চ আছে বটে, কিন্তু সেটা তার জ্বালতে সাহস হল না। সবচেয়ে ভালো হবে তার পক্ষে কোনোখানে লুকিয়ে থাকা। নিজে গোপন থেকে এখানকার সব ব্যাপার দেখে নেবার চেষ্টাই তাকে করতে হবে। বেশি ভাববার সময় নেই, হাতের কাছে একটা দরজা ছিল খোলা, কী করে ঢুকে পড়ল। বহুদিনের পুরনো অব্যবহৃত ঘরে একটা ব্যাপসা গন্ধে তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। চোখে যখন অন্ধকার সরে গেল, দেখতে পেল কয়েকতা ভাঙা চেয়ার টেয়ারও আছে ঘরে। পা টিপে টিপে গিযে বসল তারই একটায়, চেযারটা ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠল। মাথার উপর দিয়ে চামচিকে গেল উড়ে, মেঝেয় আরশোলা ইঁদুরের দুদ্দাড় ছুটোছুটি। তারই মধ্যে বসে চঞ্চল অপেক্ষা করতে লাগল।

সময় আর কাটে না। বাড়িটার নানা অংশ থেকে নানারকম শব্দ আসতে লাগল, তবে হয়তো সে সব এমনি এমনিই হচ্ছে। পুরোনো পোড়ো বাড়িতে কত রকম শব্দ হয় তার কি অন্ত আছে! কিন্তু মানুষ যে এখানে আছে, সে সন্দেহ তার মন থেকে কিছুতেই গেল না। পরীক্ষিৎবাবু কোন ঘরে? সে উঠবে নাকি? দেখবে নাকি সমস্ত বাড়ি খুঁজে? মহিমবাবুর উপদেশ মনে পড়ল - দুঃসাহস কোরো না। এদিকে রণজিৎবাবুই বা কী করছেন? তিনি তাঁর দলবল নিয়ে তো এখন চলে এলেই পারেন। না কি তিনি অসবেনই না?

নয়

কতক্ষণ এ ভাবে কাটল কে জানে, হঠাৎ চঞ্চল লক্ষ করল, বারান্দায় অন্ধকারে একটা মূর্তি ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। চঞ্চল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; লম্বা একটা ছায়া যেন স্তব্ধ হয়ে তাকেই লক্ষ করছে। মুহূর্তের জন্যে চঞ্চলের গা ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, কিন্তু এখন ভয় পেলে চলবে না, এখনই মাথা ঠাণ্ডা রাখবার সময়। চঞ্চল আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ছায়ামূর্তি তবু সরল না, নড়ল না। চঞ্চল একটু একটু করে এগোতে লাগল, তারপর যেই দরজার কাছে এসেছে, মূর্তিটা এক লাফে নামল বারান্দা থেকে মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চলও দৌড় দিল, পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বালাতেই যা দেখল, মনে মনে তা দেখতেই হয়তো আশা করেছিল, তবু সত্যি সত্যি তাই দেখল তার সমস্ত শরীরে যেন চকিতে বিদ্যুৎ খেলে গেল।

সেই অন্ধকারে টর্চের আলো বিঁধল কাকে? ফুটে উঠল উপেন ধরের দীর্ঘ মূর্তি, তার মুখে হিংস্র কুটিল হাসি।

অবাক হবার সময় চঞ্চল বেশি পেল না, এক লাফে সেও নামল মাটিতে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথার উপর প্রচণ্ড একটা ঘুষি নামল, টর্চ খসে পড়ে গেল মাটিতে, ভোঁ করে উঠল মাথা। সেটা হয়তো সামলে উঠতে পরত, কিন্তু তার পরেই পরপর কয়েকটা বজ্রমুষ্টির আঘাত তাকে যেন একেবারে গুঁড়ো করে দিল। শেষটায় বুকের উপর এমন এক কিল খেল যে, দম বন্ধ হয়ে উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে। অন্ধকরের ভিতর দিয়ে উপেন ধর দিল দৌড়।

পালাচ্ছে, লোকটা পালাচ্ছ। হাঁটুর উপর বুক চেপে চঞ্চল মিনিট খানেক বসে রইল, কিন্তু তক্ষুনি আবার টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। উহ, লোকটা জোয়ান বটে। জু-জুৎসুর প্যাঁচ চঞ্চলের জানা ছিল, গায়ে জোরও তার মন্দ নেই, কিন্তু কিছু করতে পারলে না, শুধু পড়ে পড়ে মার খেল। কিন্তু পালাতে সে দেবে না ওকে, কিছুতেই না। কষ্টে নিঃশ্বাস পড়ছিল, তবু দৌড় দিলে উপেন ধর যেদিকে গেছে সেটা আন্দাজ করে। ঐ রাস্তায় একটা মোটর দাঁড়িয়ে না? উপেন ধর লাফিয়ে উঠল গাড়িতে, এঞ্জিন গাঁ গাঁ করে উঠল। চঞ্চল ছুটল প্রাণপণে, গাড়ি যেই চলতে শুরু করেছে , উঠল ফুটবোর্ডে, তারপর মাথা গলিয়ে ভিতরে ঢুকে বসে পড়ল পিছনের সিটে। হাওয়ার বেগে গাড়ি ছুটল।

গাড়ি চালাচ্ছে উপেন ধরই। কোথায় যাচ্ছে চঞ্চল জানে না। হয়তো এই ছোটো বিপদ থেকে আরও বড় বিপদের দিকে সে যাচ্ছে। এখন সে বুঝতে পারল উপেন ধরই শেয়ালদা থেকে তার পিছু নিয়েছিল, তার আগেই এ বাড়িতে এসে ছিল লুকিয়ে। কিন্তু এই গাড়িটা এল কোত্থেকে? আর পরীক্ষিৎবাবুই বা কোথায়? যদি তিনি এখানে নাই থাকবেন, তাহলে উপেন ধরের এখান থেকে পালিয়ে যাবার কথা নয়। যাই হোক, চঞ্চল মনে মনে ভাবলে, সে যে গাড়িটায় চড়ে বসতে পেরেছে, এটাই মস্ত লাভের কথা, কারণ এ রহস্যের সমাধান যে উপেন ধরের সূত্রেই হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কোথায় যাচ্ছে উপেন ধর? কে জানে! গাড়ি এমনভাবে ছুটেছে যেন একেবারে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়ে থামবে।

খানিক পরে গাড়ির বেগ একটু কমিযে উপেন ধর পিছনে তাকিয়ে বললে, “ভালো চাও তো নেমে যাও গাড়ি থেকে।”
চঞ্চল জবাব দিল, “পার তো জোর করে নামিয়ে দাও।”
“সেতা ইচ্ছে করলেই পারি তা জান?
চঞ্চল বললে, “দ্যাখো না চেষ্টা করে।”

আশ্চর্যের বিষয়, উপেন ধর অনেকবার শাসালে বটে কিন্তু তাকে জোর করে নামিয়ে দেবার চেষ্টা একবারও করল না। ইচ্ছে করলেই সে যে তা পরে তার কিলঘুষির সঙ্গে পরিচিত হবার পর চঞ্চলের তাতে আর সন্দেহ নেই। উপেন ধর একটু পরপরই পিছনের দিকে তাকাচ্ছিল, আর বিড়বিড় করে নিজের মনে কী বলছিল - চঞ্চল ভাবছিল যে সে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখছে আর তার উদ্দেশেই গালাগালি দিচ্ছে - কিন্তু খনিক পরে কেমন সন্দেহ হওয়ায় সেও পিছনের দিকে তাকাল, দেখল, আর একটি গাড়ি তাদের পিছন পিছন আসছে।

ডাযমণ্ড হার্বারের রাস্তায় বেশি রাত্রেও গাড়ি চলাচল কিছু আশ্চর্য নয়, কিন্তু খনিকক্ষণ লক্ষ করবার পর চঞ্চলের সন্দেমাত্র রিল না যে অন্য গাড়িটা ঠিক তাদেরই পিছু নিয়েছে। নিঃশব্দে মাঝখানকার দূরত্ব সমানে রেখে গাড়িটা আসছে] উপেন ধর স্পিড বাড়ালে সেটারও বাড়ে, কমালে সেটারও কমে। বারবার পিছনে তাকিয়ে উপেন ধর ঐ গাড়িটাকেই তাহলে দেখছে, তাকে নয়?

ঐ গাড়িতে কে? ষে যাই হোক, উপেন ধর যে তকে পছন্দ করে না, এটা বেশ বোঝা যচ্ছে। ঝড়ের বেগে গাড়ি ছুটিয়ে সে চলেছে কোথায়? একটা অ্যাকসিডেন্ট না করে! দেখতে দেখতে কলকাতা এসে পড়ল, সার্কুলার রোড ধরে গাড়ি সোজা চলেছে উত্তরে। অন্য গাড়িখানা ঠিক পিছন পিছন আসছে। চঞ্চল এতক্ষণে বুঝতে পারল যে উপেন ধর যে তকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেবার চেষ্টা করছে না তার কারণ ঐ পিছনের গাড়িই। তাকে জোর করে নামাতে হলে গাড়ি থামাতে হবে, আর গাড়ি থামালেই পিছনের ওরা এসে পড়বে ঘাড়ে। মজা মন্দ নয়। হয়তো কোনো নতুন দারুণ বিপদের দিকে চলেছে, কিন্তু ভয়ের ভাবের চেয়েও চঞ্চলের যেন ভালোই লাগছিল বেশি।

শেয়ালদা পার হয়ে সার্কুলার রোড যেই বেশ চওড়া হয়ে এল, উপেন ধর এমন স্পিড দিলে যে, চঞ্চলের মাথা ভোঁ করে উঠল। বাপরে, দু দিকে কিছু দেখা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে শরীরটা শূন্যে হাওয়া হয়ে মিলিয়ে যাবে। চঞ্চল গদিতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল কিন্তু একটু পরেই উপেন ধর বিকট সুরে চিৎকার করে উঠতেই তাকিয়ে দেখল, একটা ল্যাম্পপোষ্ট তীরের বেগে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আর উপায় নেই। এক্ষুণি চুরমার। চঞ্চলের শুধু এ কথা ভাবার সময় হল যে মরবার পক্ষে তার বয়েসটা বড়ই কম, সেই মুহূর্তেই উপেন ধর প্রাণপণে ব্রেক কষলে, সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা ল্যাম্পপোস্টে গিয়ে ধাক্কা খেল, মস্ত একটা ঝাঁকুনি, তারপর চুপ।

একটু পরেই পিছনের গাড়িখানা তাদের পাশে এসে দাঁড়াল, ভিতর থেকে কে একজন বলল, “কিছু ভাববেন না উপেনবাবু, আমাদের গাড়িতে আসুন, অনেক জায়গা রয়েছে।”
চঞ্চল গলার আওয়াজ চিনতে পারল, এ তো রণজিৎ সামন্ত।
রণজিৎবাবু গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “চলে আসুন, আর দেরি করে লাভ কী! গাড়িটা থাক, আমার একজন লোক এখানে রেখে যাচ্ছি। এস, চঞ্চল, তুমিও এস।”

চঞ্চল গাড়ি থেকে আগে নেমে পড়ল। “আপনি ডায়মণ্ড হার্বারে ছিলেন?”
“সে সব পরে হবে। উপেনবাবু, আর দেরি করে লাভ নেই। আজ রাত্তিরে একটু ঘুমোতে দেবেন, না দেবেন না?”
উপেন ধর নামল গাড়ি থেকে, তার মুখ একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর উপায় নেই, ধরা দিতেই হল পুলিশের হাতে।
রণজিৎবাবুর সঙ্গে তিনজন ধুতি পরা কনেস্টবল ছিল, তাদের একজন রইল উপেন ধরের গাড়ির পাহারায়। ইন্সপেক্টর নিজেও ধুতি পরা, চেহারা দেখে মনে হতে পরে বিযের নেমন্তন্ন খেতে চলেছেন।

গড়িটা বেশ বড়, সবারই জায়গা হয়ে গেল।
চঞ্চল রণজিৎবাবুকে জিগ্যেস করল, “কোথায় চলেছেন।”
“চল, দেখবে।”
পরীক্ষিৎবাবুর খোঁজ পেয়েছেন?”
“তুমি কি দেখলে ওখানে?”
“কিছুই না। ঐ উপেন ধর -”
“হ্যাঁ, তিনি তো সঙ্গেই চলেছেন। উপেনবাবু, আপনার তো দেখছি অনেক গুণ। গাড়িও চালান চমৎকার। দয়া করে বলে দিন, পরীক্ষিৎবাবু কোথায় আছেন - আপনার কিছু ভয় নেই।”
কিন্তু উপেন ধর একটিও কথা বললে না, সমস্ত রাস্তা চুপ করে রইল।

রাস্তা আর খুব বেশিও ছিল না। লালবিহারী মালাকারের কাশীপুরের প্রকাণ্ড বাগানবাড়িতে গাড়ি যখন ঢুকল, তখন রাত ঠিক দেড়টা। চঞ্চল বাড়িটা চিনতে পারলে, আগে সে একবার এসেছিল মহিবাবুর কাজেই। গাড়ি থামতেই একতলার একটা দরজা খুলে গেল, ভিতরে দেখা গেল আলো।
রণজিৎ বাবু সকলের আগে গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “আসুন উপেনবাবু। নিজেই আসবেন, না হাত ধরতে হবে?”
উপেনবাবু নিঃশব্দে নামলেন, তার পিছনে চঞ্চল ও কনেস্টবল দুজনও নামল।
রণজিৎবাবু বললেন, “আপনি আগে যান, উপেনবাবু।”
লম্বা সিঁড়ি দিযে উঠে সামনেই একটা মস্ত হল। সেই হলঘরে উপেন ধরের পিছন পিছন সবাই ঢুকল। সেই ঘরে আছেন মহিমবাবু - আর পরীক্ষিৎ মজুমদার।

দশ

মহিমবাবু বললেন, “আসুন ইন্স্পেক্টরবাবু, আসুন। কিন্তু আপনার আগেই আমরা পরীক্ষিতের খোঁজ পেয়েছি, তা তো দেখেছেন। কী করে পেলুম, তা যদি জানতে চান - “
কী করে পেলেন তা জানি” বলেই ইন্স্পেক্টরবাবু আবার পাহারাওয়ালাদের কী ইঙ্গিত করলেন, তারা হঠাৎ দুজনে মহিমবাবুর দু’দিকে গিয়ে দাঁড়াল পরের মুহূর্তে একজন খপ করে তাঁর হাত দুটো ধরে ফেললে আর একজন পরিয়ে দিলে হাতকড়া।
চঞ্চল চিৎকার করে উঠল, “এ কী! এ কী কাণ্ড!” পরীক্ষিৎবাবু উঠে দাঁড়িয়ে হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন, আর উপেন ধর মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়ল।

পরীক্ষিৎবাবু বললেন, “কে হে তুমি, তোমার তো বদ সাহস। খোলো, ওর হাত কড়া, খোলো। জান, ও আমার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু।”
“কী রকম বন্ধু প্রমাণ করে দিচ্ছি। ঐ টেবিলের উপর কাগজখানা কী?”
“তা দিয়ে তোমার দরকার?”
“তা দরকার একটু আছে বৈকি! আপনার নতুন উইলটা কী রকম হল?”
“সে সব বিষয়ে তোার সঙ্গে কথা কইতে আমি প্রস্তুত নই। তুমি এখানে এসেছ কেন - তোমাকে তো কেউ ডাকেনি?”
“কেন এসেছি? এইজন্যে -” রণজিৎবাবু এগিয়ে গিয়ে ছোঁ মেরে টেবিলের উপর থেকে কাগজখানা তুলে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে ভরলেন। পরীক্ষিৎবাবু অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে কী বলতে যাচ্ছিলেন, রণজিৎবাবু তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “আমার সব কথা আগে শুনে নিন, তারপর যা হয় বলবেন। মহিমবাবু, আপনাকে একটু কষ্ট দিতে হল, কিন্তু আপনি যেরকম ডেঞ্জেরাস ক্রিমিনাল, ঐ হার কড়াটা না হলেও চলছে না। মাপ করবেন। তাই বলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন, বসুন না এখানে।”

পরীক্ষিৎবাবুর মুখে অপার বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। তিনি শুধু বললেন “তুমি কি পাগল হলে?”
রণজিৎবাবু একটা চেয়ারে বলে বললেন, “তাহলে সবটাই শুনুন। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, চ্যাটার্জি ব্যাঙ্ক যখন ফেল পড়ল? আপনার কত টাকা ছিল সেখানে?”
“ছিল কিছু। সে কথা এখানে কেন?”
“কে একজন লোক জাল শেয়ার বেচে সরে পড়ল, ধরা গেল না। তাতেই ব্যাঙ্ক ফেল পড়ল, তাই তো? লোকটিকে এখন ধরা গেছে।”
“কে সে?”
“সে আপনার সামেই বসে আছে। তার আসল নাম মহিম চ্যাটুয্যে, কিন্তু শেয়ারগুলো বেচেছিল, হলধর হালদার নামে; অর্থাৎ আপনাদের পাঁচজনের টাকা মেরে দিয়ে...”

পরীক্ষিৎবাবু ভয়ানক উত্তেজিত হয় বললেন, মিথ্যে মিথ্যে কথা। এর প্রমাণ?”
“প্রমাণ আমি যথাসময়ে কোর্টে দাখিল করব। তারপর হল কী - নানা ব্যাঙ্কে নানা বেনামিতে লাখ কযক টাকা রেখে তিনি খুব গরিবের মতো কিছুদিন ঘুরে বেড়ালেন। তারপর বের করলেন, ‘কলকাতা হরকরা,’ এ পত্রিকার জন্য লালবিহারী মালাকারের কাছ থেকে মোটা টাকা বাগানো হল, আপনারা পাঁচজনও বাদ গেলেন না। কিছুদিন পরে নব-সাহিত্য-ভবনের সূত্রপাত হল, আপনার সব বই এখন থেকে ওরাই বার করবে, এইরকম কন্ট্র্যাক্ট হয়েছে, না?”
“তা তো হয়েছে। কিন্তু - “
“নব সাহিত্য ভবনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়রাম শীলকে আপনি চেনেন? তাঁকে দেখেছেন কখনও?”
“তাকে দেখবার দরকার হয় নি। মহিমই সব ব্যবস্থা করে দিযেছে।”
“তাকে দেখবেনও না কখনও, কারণ মহিম চাতুয্যে আর জয়রাম শীল একই ব্যক্তি। নব সাহিত্য ভবন বেনামিতে মহিমবাবুরই কোম্পানি।”
“বল কী হে।”
“ঠিকই বলি। ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’কে খাটো করে ‘কলকাতা হরকরা’ যাতে জাঁকিয়ে উঠতে পারে এই উদ্দেশ্যে আগাগোড়া উনি নানারকম প্যাঁচ খেলে যাচ্ছেন। অসম্ভব চালাক লোক আপনার এই বন্ধুটি! আপনি কি লালবিহারীবাবু কেউ কিছু বুঝতে পারেন নি।”
এখানে চঞ্চল বলে উঠল, “কিন্তু পরীক্ষিৎবাবুর অন্তর্ধানের রহস্য - “
কথাটা শুনে পরীক্ষিৎবাবু চমকে উঠলেন, “আমার অন্তর্ধান! তার মানে?”
“বাঃ, এই একটা প্যাঁচেই তো ‘হরকরা’র কাটতি তিনগুণ বেড়ে গেল। আপনি তো এই কাশীপুরের বাগানবাড়িতে বসে আছেন - এদিকে খবরের কাগজে কী হুলুস্থূল - কলকাতায় কী হৈ চৈ - পুলিশ, গুলি ছোঁড়া - ডায়মণ্ড হার্বরে একটা পড়োবাড়িতে ধস্তাধস্তি - কত কিছুই তো হযে গেল! আপনি কি করে জানবেন - আপনাকে তো খবরের কাগজ পড়তে দেওয়া হয়নি, কি কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় নি।”
“খবরের কাগজ আমি ইচ্ছে করেই পড়িনি। কাগজ খুলেই বড় বড় অক্ষরে পরীক্ষিৎ জয়ন্তীর খবর - এ আর ভালো লাগে না। বিরাট একটা হৈ চৈ তো হবেই, তার আগে একটা দিন নিরিবিলি এই বাগানবাড়িতে কাটাব, এই রকম ইচ্ছে ছিল। তা, এ নিযেও বুঝি হুলুস্থূল?”
“হুলুস্থূল বাড়িয়েছেন আপনার বন্ধুই - আর এই বাগানবাড়িতে এসে একটা দিন কাটাবার ইচ্ছেটা, মহিমবাবুই আপনার মনে জাগান - কেমন, ঠিক কিনা?”
“তা, মহিমই বলেছিল বটে -”
“এ কথাও বলেছিলেন যে বিজয়বাবুকে যেন আগে জানানো না হয়, পাছে তাঁর আপত্তিতে এমন চমৎকার প্ল্যানটা ভণ্ডুল হয়ে যায়।”
“কিন্তু বিজয় কি খবর পায় নি? মহিম, তুমি জানাওনি যে, আমি এখানে আছি?”
মহিম চাটুয্যে চুপ।

রণজিৎবাবু বলতে লাগলেন, “ব্যাপারটা এইরকম। মহিমবাবুর টাকার তৃষ্ণা অসীম! নানা অসৎ উপায়ে প্রায় সাত লাখ টাকা তিনি করেছেন, কিন্তু লোভ তাঁর বেড়েই চলেছে। এত বেশি লোভ করতে গিয়ে শেষ সামলাতে পারলেন না। কিন্তু মহিমবাবু, এ কথা বলবই যে আপনি অদ্ভুত ক্ষমতাশালী লোক। যেমন আপনার কল্পনাশক্তি, তেমনি আপনার দুঃসাহস। এ ব্যাপারটাও প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন, উপেন ধর মশাইও তাঁর পার্ট প্লে করেছেন চমৎকার, কিন্তু পরীক্ষিৎবাবুর ঘরে তাঁর টেবিলের উপর আরও একখানা অর্ধ সমাপ্ত চিঠি পড়ে ছিল, সেটি অপনি সরাতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাতেই আমার পক্ষে ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। আজ সকালে যে চিঠিটা পরীক্ষিৎবাবুর টেবিল থেকে তুলে নিয়ে আপনাদের সকলকে দেখালুম, তার তলাতেই আর একখানা চিঠি ছিল, সেখানা চট করে আমি পকেটে ভরে ফেলেছিলুম, আর কেউ লক্ষ করেনি।”
মহিমবাবুর মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট আর্তস্বর বেরুল।
রণজিৎবাবু পকেট থেকে একগদা কাগজ বার করলেন। তার ভিতর থেকে একটি বেছে নিয়ে পড়লেন - “মহিম, আমি প্রিন্সেপ ঘাটে থাকব, তুমি সেখানেই ।।... চিঠি শেষ করা হয়নি, টেবিলের উপরেই পড়ে ছিল। এ চিঠির পরে কি আপনি আবার লিখে পাঠিয়েছিলেন?”

রণজিৎবাবু কাগজখানা পরীক্ষিৎবাবুর সামনে টেবিলের উপর মেলে ধরলেন।
পরীক্ষিৎবাবু কাগজটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঐ আমার এক বদভ্যাস , একবারে একটা চিঠি প্রায়ই শেষ করে পারিনে - এক লাইন লিখে উঠে যাই। হ্যাঁ, পরে এই চিঠিই আবার লিখে পাঠিয়েছিলুম বইকি, তাতে হয়েছে কি?”
“এ হাতের লেখা তবে আপনারই?”
“হ্যাঁ, আমার বইকি!”
“আচ্ছা, দেখুন তো, এ হাতের লেখা আপনার কিনা?” বলে রণজিৎবাবু আর একখানা কাগজ ঔপন্যাসিকের সামনে মেলে ধরলেন।
“আরে, এ কী আশ্হর্য! এ তো হুবহু আমার হাতের লেখা, কিন্তু এ চিঠি তো আমি কখনও লিখিনি! কেনই বা লিখব? আমি তো কখনও ডায়মণ্ড হার্বারে বন্দী হইনি। এ কী কাণ্ড? এ যে দেখছি দস্তুরমতো নভেলিয়ানা!” পরীক্ষিৎবাবু বিহ্বলভাবে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।

রণজিৎভাবে বললেন, “হ্যাঁ, খুবই আশ্চর্য! আপনার হাতের লেখার সঙ্গে এতই মিল যে, আমাদের হ্যাণ্ডরাইটিং এক্সপার্টেরও প্রথমটায় ধাঁধা লেগেছিল। উপেন ধর মাশাই নিপুণ শিল্পী বটে!
পরীক্ষিৎবাবু উপেন ধরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “উপেন, তোমার এই কাজ?”
উপেনবাবু হঠাৎ ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠে বললেন, “আপনার পা ছুঁয়ে বলছি, আমার কোনো দোষ নেই-”
রনজিৎবাবু বললেন, “ছি ছি, আপনি এত ব্যাকুল হয়ে পড়লেন কেন? থামুন, থামুন! আরে আপনাকে নিয়ে মহা মুশকিলই হল দেখছি। আপনার মতো একজন করিৎকর্মা লোকের কি এ সব কান্নাকাটি মানায়? বাস্তবিক,” পরীক্ষিৎবাবুর দিকে তাকিয়ে সামন্তমশাই বলতে লাগলেন, “এই উপেন ধরের মতো চৌকস লোক বাংলাদেশে প্রায় দেখা হায় না। রিভলবার ছুঁড়তেও ইনি ওস্তাদ। ছোট্ট কামরায় তিনজন লোক বসে আছে, একজনের কান ঘেঁষে, আর একজনের নাকের তলা দিয়ে, তৃতীয় ব্যক্তির ঠিক চুলের উপর দিয়ে গিয়ে গুলিটি কাঠের পার্টিশন ফুঁড়ে একঘর লোক পার হয়ে টাইপিস্টের টেবিলের তলায় গিয়ে পড়ল - ভাবতে পারেন?”

চঞ্চল এতক্ষণ অবাক হয়ে শুনছিল, এইবার বলে উঠল, “ঐ গুলিতা তাহলে উপেন ধরই ছুঁড়ছিল? কেন? এর উদ্দেশ্য কী?”
ইন্স্পেক্টরবাবু সে কথার জবাব না দিয়ে বলতে লাগলেন, “সবই ঠিকঠাক মতো হয়েছিল, কিন্তু আপনাদের একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল মহিমবাবু, গুলিটা গরম ছিল না। এই ত্রুটি ছাড়া আপনাদের অভিনয় চমৎকার হয়েছিল - প্রশংসা করতে হয়। বিশেষ করে আপনার পার্ট! ওঃ, আপনার টেবিলের তলায় ঢোকাটি কী চমৎকারই হয়েছিল - ভুলতে পারছি না। রিয়ালি ম্যাগনিফিসেন্ট।”
বলে রণজিৎবাবু হাসতে লাগলেন।
চঞ্চল বললে, “কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে, কেন ছোঁড়া হয়েছিল? কার উদ্দেশ্য?”

রণজিৎবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “এইখানেই তো মজা। গুলিটা আসলে ছোঁড়াই হয় নি, ওটা আগে থেকেই পড়ে ছিল টাইপিস্টের টেবিলের তলায়। পিছন থেকে উপেনবাবু একটা ফাঁকা আওয়াজ করেছিলেন মাত্র।”
“পিছন থেকে। কোত্থেকে?”
“মহিমবাবুর কামরার পিছনেই তাঁর বাথরুম, সেখান থেকে।”
“তারপর তিনি পালালেন কেমন করে?”
“পালাবার দরকার হয় নি, বাথরুমেই বসে ছিলেন। তুমি হয়তো লক্ষ করোনি চঞ্চল, বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল, আর দরজায় একটা নোটিশ লাগানো ছিল - “নট টু বি ইউজড।”

চঞ্চল বললে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে। তাই তো। বাথরুমটা খুঁজে দেখবার কথা তো কারও মনে হয় নি।”
“আমার হয়েছিল, কিন্তু দরকার বোধ করিনি। ব্যাপারটা কী, আমি তার আগেই বুঝে ফেলেছিলাম। মহিমবাবু একটা ঘণ্টা টিপলেন, বেয়ারার হাতে একটা কাগজ দিয়ে বললেন, “টাইপ।” তারপরেই তো এই কাণ্ড। ঐ ঘণ্টা বাজিযে অসলে উপেন ধরকেই ইঙ্গিত করা হয়েছিল।”
“কিন্তু এর দরকার কী ছিল, তাই তো আমি বুঝতে পারছি না।”
“দরকার ছিল এইতে প্রমাণ করা যে, পরীক্ষিৎবাবুর শত্রুরা শুধু তাঁকে সরিয়েই তৃপ্ত হয়নি, তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু মহিম চাটুয্যেকেও খুন করবার চেষ্টায় আছে।”

এখানে পরীক্ষিৎবাবু বলে উঠলেন, “তোমার কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমার মাথা ঘুরছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। দয়া করে প্রথম থেকে বুঝিয়ে বলো, নয়তো একটু পরেই মনে হবে যে পাগল হয়ে গেছি।”
সামন্তমশাই বললেন, “বেশ, প্রথম থেকেই বলি। মহিমবাবুর এটা হল দেখা বিন্তির খেলা। প্রথম থেকেই দু হাতের খেলা খেলে যাচ্ছেন - সকলের সামনে এগিয়ে আছেন বরাবর, যাতে তাঁর উপর সন্দেহ পড়বার কথাই না ওঠে। আর তাঁর সহকর্মী হিসাবে নিলেন বেচারা উপেন ধরকে। উপেনবাবুকে সত্যি খুব দোষ দেওয়া যায় না। - তিনি মহিমবাবুর হাতের পুতুলমাত্র - তাঁর অবস্থা ভালো নয়, মোটা টাকার লোভে রাজি হয়েছিলেন।”
হঠাৎ উপেন ধর আবার খানিকটা ফোঁস ফোঁস করে কেঁদে উঠলেন।
ইন্সপেক্টরবাবু বলতে লাগলেন, “মহিমবাবুর মতলব ছিল, এই ব্যাপারে একঢিলে অনেকগুলো পাখি মারা। প্রথমত, ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ আর বৃন্দাবন গুপ্তকে জব্দ করা - এঁরা পরীক্ষিৎবাবুর পক্ষপাতী নন, তাঁদের উপর সন্দেহ ফেললে লোকে সহজেই বিশ্বাস করবে। বেচারা বৃন্দাবন গুপ্তকে তো রীতিমতো হাজতবাসই করিয়ে নিলেন। আহা - এতক্ষণে বোধহয় আধখানা হয়ে গেছে বেচারা। লালবাজারে গিয়ে প্রথমে ওঁকে ছেড়ে দিয়ে তারপর অন্য কাজ।”
পরীক্ষিৎবাবু বললেন, “সে কী! বৃন্দাবন গুপ্ত হাজতে!”
“হ্যাঁ, আপনার অন্তর্ধানের সঙ্গে বৃন্দাবন গুপ্তের যে কোনোরকম সংশ্রব আছেই, মহিমবাবু প্রথম থেকেই খুব জোর দিযে তো বলতে লাগলেন। আমি ভদ্রলোককে ধরেই আনলুম - পাছে মহিমবাবু বুঝতে না পারেন যে আসলে ব্যাপারটা কি, যা আমি আঁচ করেছি। এর মধ্যে উপেন ধরকে এমন কৌশলে মহিমবাবু জড়িয়েছিলেন যে, আমারও প্রথমটা খটকা লেগেছিল। উপেন ধরের উপর খানিকটা সন্দেহ তিনি এইজন্যেই ফেলেছিলেন, যাতে পুলিশের গোলমাল লাগে।

“এদিকে লালবিহারীবাবুকে পটিয়ে মহিমবাবু শ্রী ইন্সিওরেন্স কোম্পানি ফাঁদবার চেষ্টায় আছেন - অবশ্য নিজের নামে নয়, মাঝখানে উপেন ধর আছেন শিখণ্ডী। পরীক্ষিৎবাবুকে দিযে অনেকগুলো শেয়ার কিনিয়ে, তাঁকে ডিরেক্টর করে, জয়ন্তীর দিনে সব কাগজে তাঁর ছবি দিয়ে বড় বড় বিজ্ঞাপন বেরুতো - বেশ ভালোই হত; কিন্তু এর মধ্যে আর একটু প্যাঁচ না কষে মহিমবাবু তৃপ্ত হতে পারলেন না। তাই তিনি ভাবলেন - পরীক্ষিৎ একদিন গিয়ে মালাকার মশাইয়ের কাশীপুরের বাগানে থাকুক, এদিকে আমি ‘হরকরা’র হু হু করে কাটতি হবে, তারপর ঠিক জয়ন্তীর দিন ভোরবেলা ঔপন্যাসিকটিকে বের করে আনব - এবং তাঁকে উদ্ধারও করবে, পুলিশ নয়, অন্য কেউ নয়, ‘হরকরা’ই। মোটের উপর এ-ব্যাপারে ‘হরকরা’র প্রতিপত্তি এত বেড়ে যাবে যে ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’কে নীচে ঠেলে সে ধাঁ করে উপরে উঠে যেতে পারবে। আর পরীক্ষিৎ উদ্ধারের ব্যাপারের নয়ক তিনি স্থির করলেন এই চঞ্চলকে, যে তাঁর আপিসের মধ্যে সবচেয়ে ছেলেমানুষ, যে কিছুই বুঝবে না, যাকে ইচ্ছেমতো চালনো যাবে।

“এরপর নাটকটি বেশ যত্নে সাজানো হল। পরীক্ষিৎবাবু এমনিই ক্লান্ত ও লোকের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে ছিলেন - তাঁকে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে বিশ্রাম করতে সহজেই রাজি করানো গেল। স্থির হল, আগে কাউকে কিছু বলা হবে না, পরে বলা হবে শুধু বিজয়বাবুকে, তাও চুপে চুপে। আঠারো তারিখে সন্ধের পরে গঙ্গার ধারে মহিমবাবুর সঙ্গে পরীক্ষিৎবাবুর দেখা হল। পরীক্ষিৎবাবু গাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দিলেন - তাঁর ড্রাইভার যে লম্বা লোকটিকে দেখেছিল, সে মহিম চাটুয্যে ছাড়া আর কেউ নেয়।”
“অ্যাঁ!” চঞ্চলের গল দিযে একটা বিস্মিত আওয়াজ বেরুল।
“সেখানে আলো কম ছিল, ড্রাইভার দূর থেকে ভালো দেখতে পায় নি, লক্ষও করেনি। লম্বা লোকটি কে হতে পরে, তা নিয়ে কত গবেষণা; এ কথা অবশ্য কারুরই মনে হয়নি যে মহিমবাবুও লম্বা। এদিকে লম্বা লোকটিকে যাতে উপেন ধর বলেই সন্দেহ হয় সেজন্য চেটার ত্রুটি হয় নি। উপেন ধরকে ঐ প্রিন্সেপ ঘাটে রেখে পরীক্ষিৎবাবুকে নিয়ে মহিমবাবু চলে এলেন কাশীপুরে। আপনারা কি ট্যাক্সিতে এসেছিলেন, না মহিমবাবুর গাড়িতে?”
পরীক্ষিৎবাবু বললেন, “ট্যাক্সিতে। কিন্তু উপেনকে তো ওখানে আমি দেখিনি।”
“আপনার তো দেখবার দরকার নেই যাদের দরকার, তারা দেখেছিল। রাত্রে বিজয়বাবু যখন চঞ্চলকে নিযে প্রিন্সেপ ঘাটে গেলেন, উপেনবাবু তার আগেই ব্রিন্দাবন গুপ্তের একটি ভিজিটিং কার্ড ওখানে ফেলে রেখেছিলেন - যে কোনো লোকের একখানা কার্ড জোগাড় করা কিছুই শক্ত নয়। তারপর ইচ্ছে করে ওদের সামনে দিয়ে হুস্ করে পালিয়ে গেলেন - এ আর কিছুই নয়, ব্যাপাটাকে আরও জটিল আরও গোলমেলে করে তোলা। ময়দানের ভিতরে অন্ধকারে তিনি যেন একেবারে মিলিয়ে গেলেন - না চঞ্চল?”
“তাই তো মনে হয়েছিল।”
“ময়দানের মধ্যে একটু দূরেই একটি গাড়ি অন্ধকারে মিলিয়ে ছিল - লালবিহারীবাবুর একটি ছোট অস্টিন মহিমবাবু কয়েকদিনের জন্য ধার করে এনেছিলেন। এ-গাড়ি কোন কাজে লাগবে লালবিহারীবাবুর অবশ্য তা স্বপ্নেরও অগোচর। সেই গাড়ি নিয়ে একেবারে ছুট মহিমবাবুর বাড়িতে। তারপর থেকে উপেন ধরকে আর পাওয়া যায় না - কী করেই বা যাবে, তিনি যে মহিমবাবুর বাড়িতেই দিব্যি খাচ্ছেন দাচ্ছেন আর ঘুমোচ্ছেন।তোমরা যখন মহিমবাবুর বাড়ি গেলে চঞ্চল, উপেন ধর তখন তোমাদের পাশে ছোটো ঘরটিতেই আরামে নিদ্রা যাচ্ছেন।”
চঞ্চল চেঁচিয়ে বলে উঠল, “বলেন কী?”
“এই তো ব্যাপার। বিজয়কৃষ্ণকে কিছুই বলা হল না, গরম গরম ‘হরকরা’ বেরুল আশ্চর্য খবর নিয়ে, পুলিশকে টেলিফোন করলেন মহিমবাবুই, তারপর পুলিশের মহা বন্ধু ও উপদেষ্টা হয়ে বসলেন। ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপে’র প্রোপ্রাইটর শশাঙ্ক বক্সিকেও এর মধ্যে জড়াবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। সকালবেলাই উপেন ধরের জাল চিঠি ডাকে দেওয়া হল, তারপর দুপুরবেলা মহিমবাবু তকে লুকিয়ে আপিসে এনে বাথরুমে বন্ধ করে রাখলেন। আমি যেই বললুম, “আমরা সকলকে সন্দেহ করি যতক্ষণ উল্টোটা প্রমাণ না হয়” তার একটু পরেই ঘণ্টা বাজাল আর গুলির আওয়াজ হল। এতে এটা প্রমাণ হল যে আর যাই হোক, মহিম চাটুয্যেকে সন্দেহ করবার সাহস পুলিশেরও নেই, গ্রেপ্তার তো ছাড়। ‘হরকরা’র বিজ্ঞাপনের দিক থেকেও মস্ত লাভ, জাঁকালো স্পেশাল বেরুল বিকেলে। মহিম চাটুয্যেকে হত্যা করবার চেষ্টা - উঃ কী সাংঘাতিক! তোলপাড় পড়ে গেল শহরে।”
“তারপর ডায়মণ্ড হার্বারের খবর নিয়ে ঐ চিঠি। ওর উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, পুলিশকে নিযে একটু রগড় করা। তোমাকে নিয়েও চঞ্চল। উপেন ধরকে পাঠানো হল, কারণ তাকে অনুসরণ করে আমরা ঠিক জায়গায় এসে হাজির হব - আর তখন মহিমবাবু আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবেন - পরীক্ষিৎ উদ্ধারকার্য তাঁর দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে গেছে, আমাদের মিছিমিছি খাটালেন বলে দুঃখিত। কী করে উদ্ধারকার্য সম্পন্ন হল, সে বিষয়ে ছোটো একটি গল্পও ভেবে রেখেছিলেন - আমাদের আড়ালে ডেকে নিযে বলতেন, আর আমরা তাঁর ক্ষমতার স্তম্ভিত হয়ে কুর্ণিশ করে বিদায় নিতুম। কিন্তু সময় তাঁকে আর দেওয়া হল না।
“তুমি বোধ হয় জান না চঞ্চল, তোমার পিছন পিছন একই ট্রেনে উপেন ধরকে পাঠানো হয় ডায়মণ্ড হার্বারে আবার তার পিছনে আমার একজন চর ছিল। ডয়মণ্ড হার্বার স্টেশনে সেই গাড়িটি অপেক্ষা করছিল, তুমি স্টেশন থেকে বেরোবার আগেই উপেনবাবু সেই গাড়ি নিয়ে উধাও হলেন - ড্রাইভারকে বিদায় দিয়ে। সন্ধের কিছু পরে উপেনবাবু সেখানে এলেন গাড়ি নিয়ে, গাড়িটা কিছু দূরে রেখে ঢুকলেন বাড়িতে। তুমি তখন ভিতরের ঘরে বসে কাঁপছ, আর আমি পিছনদিকের উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে। উপেনবাবুর ঘুঁষিগুলো যখন তোমার উপর পড়ছিল, আমার কষ্ট হচ্ছিল তোমার জন্যে, হাসিও পাচ্ছিল, কিন্তু তোমাকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করি নি, কারণ তাহলে নাটকটা মাঝখানেই নষ্ট হয়ে যায়। ঘুঁষোঘুঁষির উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, কালকের ‘হরকরা’য় খুব ফলাও করে ছাপা। উপেন ধরই অপরাধী হিসেবে ধরা পড়বে পুলিশের হাতে, বানিয়ে যা খুশি একটা গল্প বলবে, তারপর প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দিতেই হবে - মহিমবাবু প্ল্যান ছিল এইরকম। এদিকে তোমাকেও একজন ছোটোখাটো হিরো সাজিযে ‘হরকরা’য় কোন না লম্বা চওড়া লেখা বেরোবে। তুমি ভেব না চঞ্চল, যে তুমি উপেন ধরের গাড়িতে লাফিয়ে উঠতে পেরে খুব একটা বীরত্ব করেছিলে, তোমাকে না নিয়ে উপেন ধর যেতেই না। তার পিছন পিছন আমি আসব, তাও উপেন ধর জানে। সহজে ধরা দিলে ভালো দেখায় না, সেইজন্যে এত দূর এসে ইচ্ছে করে একটা ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে গাড়িটাকে আস্তে ঠুকে দিলে। উপেনবাবু, আপনি যেমন চমৎকার অভিনেতা, তেমনি চমৎকার গাড়ি চালিয়ে। মহিমবাবুর প্ল্যান ছিল উপেন ধরকে ধরতে পারার জন্য আমাকে প্রচুর কংগ্রাচুলেট করবেন, আমাকে বলবেন তাকে এক্ষুণি হাতকড়া পরিয়ে লালবাজার নিয়ে যেতে, কিন্তু ব্যাপারটা হল একটু অন্যরকম। ... আচ্ছা, মহিমবাবু, আপনাকে তাহলে এখন কষ্ট করে একটু গা তুলতে হচ্ছে। উপেনবাবু, আপনিও আসুন, আপনার কিছু ভয় নেই সত্য কথা খুলে বলবেন, এই আর কি!”
উপেন ধরের গলা দিয়ে বিকৃত একটা শব্দ বেরুল, তার মানে বোঝা গেল না।

সব শুনে পরীক্ষিৎবাবু বললেন, “এখনও আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, মাথাটা ঝিমঝিম করছে।”
“বোঝবার আর কী আছে, বলুন? হ্যাঁ, একটা কথা। এত রাত্তির অবধি জেগে ছিলেন?”
পরীক্ষিৎবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “একটু জরুরি বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল।”
“উইলের বিষয় তো? মহিমবাবু আপনার কানে আপনার ভাইয়ের বিরুদ্ধে অনেক বিষ ঢালছিলেন, সেটা বুঝতেই পারছিলুম। আপনি না থাকলেই বিজয়বাবু খুশি হন, আপনার টাকার উপরেই ওঁর নজর... এই তো? নূতন উইলের ড্রাফটটা পকেটেই রয়েছে, ওতে মহিমবাবুর ছেলের হাতে কত দিচ্ছিলেন? ...আপনার অনুমতি পেলে ওটা ছিঁড়ে ফেলি।”

পরীক্ষিৎবাবু উত্তরের অপেক্ষা না করেই রণজিৎবাবু পকেট থেকে সেই কাগজটা বের করে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেললেন। একটা হাই তুলে বললেন। “ওঃ, এখন একটু না ঘুমুলে আর পারব না। মহিমবাবু চলুন, আপনাকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছিয়ে দিই ... কিছু ভাববেন না, আপনার বন্ধু উপেন ধরও সঙ্গে থাকবেন। উঃ, আপনার মতো টাকার লোভ সাধারণ দেখা যায় না। লালবিহারীবাবুকে দিয়ে একটা পুরস্কার পর্যন্ত ঘোষণা করেছিলেন, সেটাও ‘হরকরা’র নাম করে আত্মসাৎ করতেন। যাই হোক, আপাতত কযক বছরের জন্য আপনি নিশ্চিন্ত হলেন - আপনার সমস্ত খরচ গভর্মেন্টই বহন করবে।”

এরপর পরীক্ষিৎবাবুর দিকে তাকিযে রণজিৎবাবু বললেন, “আচ্ছা, এখন তাহলে বিদায় নিচ্ছি আমরা, আপনি বিশ্রাম করুন। আমরা পুলিশের লোক, নানারকম অপ্রিয় কাজ করতে হয়, আপনার মূল্যবান সময়ও অনেকখানি নষ্ট করে গেলুম, তবে এটুকু ভাবতে ভালো লগছে যে আমার আজকের দিনের খাটুনি একেবারে ব্যর্থ হয়নি - আপনার জীবনের উপর হতে মস্ত কালো একটা ছায়া আমি সরিয়ে নিতে পারলুম।”

পুলিশে ঘেরাও হয়ে গাড়িতে ওঠবার আগে মহিম চাটুয্যে চঞ্চলের দিকে তাকিযে বললেন, “চললুম, চঞ্চল। ফিরতে কিছু দিন দেরি হবে। যদি পার, ‘হরকরা’ চালিয়ে নিও।”

সমাপ্ত

বুদ্ধদেব বসু

খ্যাতনামা কবি ও প্রবন্ধকার বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) তঁর কবিতার জন্যে ১৯৬৭ সালে আকাদেমী ও ১৯৭৪ সালে মরণত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। গল্প ও উপন্যাসও উনি লিখেছেন বড়দের ও ছোটদের জন্যে। ওঁর রহস্য উপন্যাস ‘ছায়া কালো কালো’ দেবসাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত হয়।