রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক

 

 

 

 

 

 

 


 

শাস্তি

একমাস পরে মুম্বাই থেকে কোলকাতায় ফিরে এল অনুরাধা। একটু ক্লান্ত চেহারা, মনটা ভারাক্রান্ত, কিছু একটা ভাবছে। কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে একদিন আগেই ফিরে এসেছে। স্বামীকে জানায়নি। ভেবেছে সারপ্রাইজ দেবে। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে ঠিকানা দিয়ে মাথাটা ঠেকিয়ে চোখ বুজল। অনুরাধা ভারি মিষ্টি দেখতে। শ্যামলা রং, চোখদুটো গভীর, চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, আর হাসিটা ভারী মিষ্টি। মুম্বাইতে মানুষ। বাবার বড় ব্যবসা, পয়সার অভাব কোনোদিন ছিল না। কলেজ শেষ করে একটা বিদেশী কম্প্যুটার কোম্পানিতে কাজ শুরু করে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস এই করে জীবন চলে যাচ্ছিল। বিয়ের কথা অত ভাবত না তখন। কোনো ছেলেকেও তেমন বিয়ে করার মতো পছন্দ হয়নি। ওর বয়সী ছেলেদের ওর ইম্ম্যাচিওর মনে হত, কথা বলে ফাঁকা ফাঁকা লাগত, মন ভরত না। একবার পুজোর সময় মাসীর কাছে কোলকাতায় যাচ্ছিল। প্লেনে অনুরাধার পাশে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বসেছিলেন, লম্বা, চেহারা ভালো। ছাই রঙের প্যাণ্ট আর নীল শার্ট পরে দেখতে ভালোই লাগছিল। আস্তে আস্তে আলাপ জমে উঠল। ভদ্রলোকের নাম অজয়, বয়স পঁয়তল্লিশ। অনুরাধার বয়স তখন তিরিশ। সেই আলাপের ফল -- বিয়ে। অজয় কোলকাতার বাসিন্দা। বাবামার আপত্তি সত্বেও অনুরাধা বিয়ে করল অজয়কে। তারপর থেকে কোলকাতায়, আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। বিয়ের নতুনত্বটা কেটে যাবার পরে অনুরাধার মনে হয়েছিল যে এই বিয়েটা করা ঠিক হয়নি। অজয়ের চরিত্রের যে দিকটা বিয়ের আগে অনুরাধা ভালো করে দেখেনি, বিয়ের পরে সেটা আর গোপন রইলো না। অজয়ের পছন্দ বন্ধìবান্ধব ক্লাব মদ হুল্লোড়, এবং সেটাও এতো বেশী যে অনুরাধার পক্ষে তাল দিয়ে চলা সম্ভব নয়। সকলের মতের বিরুদ্ধে অনুরাধা নিজে জোর করে বিয়ে করেছে, কাউকে কিছু বলতেও পারে না, আর তাছাড়া কোনো পরিস্থিতি থেকে চট করে হটে আসার পাত্রীও অনুরাধা নয়। ইতিমধ্যে অনুরাধার বাবামা দুজনেই মারা গেলেন। বাবামার এক সন্তান অনুরাধা খুব একা হয়ে পড়লো। লোকদেখানো ভাবে বিয়েটা চলতে লাগলো।

ট্যাক্সিচালকের ডাকে সচেতন হল অনুরাধা। "মাইজি, এসে গেছি"। আলিপুরের দশতলায় বিরাট ফ্ল্যাটে ওরা থাকে। ছেলেমেয়ে এখনো হয়নি। স্বামীকে অবাক করে দেবে বলে আস্তে আস্তে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। কাউকে দেখতে পেলো না সামনে। বসবার ঘর পেরিয়ে পেছনে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল অনুরাধা খুব আস্তে আস্তে। হঠাত্ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মনে হল একজন মেয়ের গলা শুনতে পেল। তারপর স্বামীর গলা। ব্যাপারটা বুঝতে পারলো না প্রথমে। একটু থতমত হয়ে কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে রইল। বাইরের প্যাসেজের আলোটা নিবিয়ে আস্তে দরজাটা খুলল অনুরাধা। খাটের ওপর আলিঙ্গনাবদ্ধ তার স্বামী এবং একজন মেয়ে। প্রথমে মেয়েটিকে অন্ধকারে চিনতে পারল না অনুরাধা। মেয়েটি বলে উঠল, "অজয়, অজয়, এত ভালো লাগছে"। মেয়েটিকে এবার চিনতে পারল অনুরাধা। অজয়ের বন্ধì তপনের স্ত্রী নীলা। নীলা অনুরাধারও বন্ধì। কোলকাতায় এসে নীলার সাথে আস্তে আস্তে অনুরাধার বন্ধìত্ব গাঢ় হয়েছে। দরজাটা বন্ধ করে অনুরাধা বাইরে এল। সুটকেসটা হাতে নিযে সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। নীচে এসে ট্যাক্সি ডেকে তাজ হোটেলে গিয়ে একটা ঘর নিল। নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। কেন অজয় তার সঙ্গে এমন করে বিশ্বাসঘাতকতা করল? অনুরাধা ছটফট করে উঠল। কয়েকবার পায়চারি করে খাটে এসে শুল। তারপর শুরু হল চিন্তা। ভাবতে লাগল পুরনো কথা, নতুন কথা। কখন ঘুমিয়ে পড়ল, মনে নেই।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঘরে বসে সকালের খাবার খেয়ে ওর উকিলকে ফোন করল। উকিল জীবনবাবু অনুরাধার বাবার বন্ধু। অনুরাধাকে তিনি নিজের মেয়ের মত ভালোবাসেন। জীবনবাবুকে অনুরাধা এগারোটার সময় তাজ বেঙ্গলে আসতে বলল। কথা আছে। অনেক কথা আছে। বিকেলবেলা ট্যাক্সি ডেকে বাড়ি ফিরল অনুরাধা। আজকেই তার আসার কথা ছিল। অজয় বাড়িতেই ছিল।

ওকে দেখে হৈ হৈ করে উঠলো। "অনু, তোমাকে ভীষণ মিস্ করছিলাম। ভাবছিলাম মুম্বই চলে যাবো তোমাকে ধরে আনতে"।
অনুরাধা একটু হাসল, "আমিও তোমাকে মিস্ করছিলাম"।
অজয় বলল, "তারপর মুম্বাইয়ের কথা বল। বন্ধুদের কারো সঙ্গে দেখা হোলো"?
অনুরাধা বলল, "ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, একটু চান করে ফ্রেশ হয়ে আসি। তুমি হরিকে বল চা দিতে।" বরের গালে চুমু খেয়ে শোবার ঘরে ঢুকে গেল।


গোয়েন্দা অঙ্কুর সকালবেলা আটটা নাগাদ অজয়ের ফোন পেল। জরুরি দরকার, এখনি আসতে হবে। জামাকাপড় পরে অঙ্কুর দশটার মধ্যে অজয়ের বাড়ি পৌঁছে গেল। অঙ্কুর ঠিক বুঝতে পারছে না হঠাত্ অজয়ের মত ধনীলোকের গোয়েন্দার কী প্রয়োজন। দরজায় ঘণ্টি বাজার তিন সেকেণ্ডের মধ্যে দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে অজয়। ভেতরে গিয়ে বসবার ঘরে বসল দুজন।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল অজয়। তারপর বলল, "অঙ্কুর, আমার স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে পরশু রাত্তিরে চলে গেছে কিছু না বলে। ও কোথায় গেছে জানিনা, কেন গেছে জানিনা। ইউ হ্যাভ টু ফাইণ্ড হার"।
অঙ্কুর : আপনাদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল কি?
অজয় : না, সেরকম কিছুই হয়নি। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। অনুরাধা মাসখানেকের জন্য মুম্বাই গিয়েছিল। ফিরে আসার দুহপ্তার মধ্যে এই কাণ্ড। একটা ছোট চিঠি রেখে গেছে -- চলে যাচ্ছি, খোঁজ কোরো না।
অঙ্কুর : চিঠিটা দেখতে পারি কি একবার অজয়বাবু?
অজয় চিঠিটা এনে অঙ্কুরের হাতে দিল। সাদা কাগজে লেখা ছোট্ট চিঠি :

অজয় :
"'বাড়ি ছেড়ে বরাবরের মতো চলে যাচ্ছি। আমার খোঁজ কোরো না।
অনুরাধা'"

অঙ্কুর : কোথায় গেছে বলে আপনার মনে হয়?
অজয় : অনুরাধার এক মাসী আছেন কোলকাতায় , খোঁজ নিয়েছিলাম, সেখানে যায়নি। বন্ধুবান্ধব ওর বিশেষ নেই কোলকাতায়, ও মুম্বাইতে মানুষ হয়েছে। মাবাবা কেউ বেঁচে নেই।
অঙ্কুর : টাকাপয়সা কিছু নিয়ে গেছে কি?
অজয় : হ্যাঁ। চেকিং আর সেভিংস অ্যাকাউণ্ট, দুটোর থেকেই প্রায় সব টাকা তুলে নিয়েছে। অফিসের অ্যাকউণ্ট্যাণ্টকে বলেছি অন্য সব অ্যাকাউণ্ট, অর্থাত্ ফিক্সড ডিপজিট, স্টক ইত্যাদি সব খতিয়ে দেখতে। আজ দুপুরের দিকে জানতে পারব।
অঙ্কুর : ওর কি কোন বন্ধু নেই কোলকাতায়?
অজয় : মনে তো হয়না। তবে আমার বন্ধু তপনের স্ত্রী নীলার সাথে ওর ভাব আছে। আর একজনের কথা মনে পড়ছে। ওর 'মনের' ডাক্তার। সাইকোলজিস্ট। বছরখানেক ধরে ওর কাছে যেতে শুরু করেছে, ডিপ্রেশন হয়েছে বলে। ডাক্তারের বয়েস কম। আমার মনে হয় ডাক্তারের সঙ্গে ওর একটা সম্পর্ক হয়েছে।
অঙ্কুর : ডাক্তারের নাম?
অজয় : সমর বিশ্বাস।
অঙ্কুর : নীলা দেবী আর সমরবাবুর ঠিকানা আর ফোন নম্বর আমাকে দেবেন প্লিজ।
অজয় একটা কাগজে ওদের ফোন নম্বর আর ঠিকানা লিখে অঙ্কুরের হাতে দিল। অঙ্কুর চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, এখন চলি। আমি দুয়েকদিনের মধ্যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।
অজয়: টাকাকড়ি নিয়ে কোন চিন্তা করবেননা। আপনার যা প্রয়োজন আমার কাছ থেকে নিয়ে নেবেন।


বাড়ীতে এসে নিজের ঘরে বসে পুরো ব্যাপারটা ভাবতে লাগলো অঙ্কুর। ফ্রিজ থেকে একটা বিয়ার নিয়ে এসে গ্লাসে ঢালল। মদ না খেলে অঙ্কুরের মাথা ঠিক খোলেনা। অনুরাধা দেবী কেন চলে গেলেন, এতগুলো টাকাই বা নিলেন কেন?

ডাঃ সমর বিশ্বাসের অফিসে পৌঁছল ঠিক বিকেল পাঁচটার সময়। নিজের নামের কার্ড ডাক্তারের অফিসের মেয়েটির হাতে দিল। একটা চেয়ারে বসে 'আজকাল' কাগজটা পড়তে লাগল। ছটা নাগাদ ওর ডাক পড়ল ভেতরে। ডাঃ বিশ্বাসের বয়েস পঁয়ত্রিশের মধ্যে মনে হল। বেশ ভালো দেখতে। অফিসটাও খুব সুন্দর করে সাজান।

ডাঃ: আপনার কার্ড পড়ে দেখলাম আপনি গোয়েন্দা। আমার কাছে আপনার কী প্রয়োজন?
অঙ্কুর : অনুরাধার বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই।
ডাঃ : কী জানতে চান?
অঙ্কুর : ও কেন আপনার কাছে আসত?
ডাঃ : সেটা কনফিডেনশিয়াল -- ডাক্তার আর রোগীর মধ্যে। বলতে পারব না।
অঙ্কুর : অনুরাধা বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেন গেছে কেউ জানেনা। ওর স্বামী আমাকে নিযুক্ত করেছে তার বউকে খুঁজে বার করে দিতে। আপনি কিছু জানেন ও কোথায় গেছে?
ডাঃ : জানি, কিন্তু বলতে পারব না।
অঙ্কুর : কেন পারবেন না। আমি অনুরাধার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। ওর সঙ্গে কথা না বলে আমি কাউকে জানতে দেব না ও কোথায় আছে।
ডাঃ : আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে।

একটা ছোট কাগজে ঠিকানা লিখে ডাক্তার অঙ্কুরের হাতে দিল। দীঘার ঠিকানা। যেতে সময় লাগবে। আজ হবে না, কাল সকালে গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। ডাক্তারকে ধন্যবাদ দিযে অঙ্কুর বাড়ী ফিরে এলো। গাড়ী চালাতে চালাতে হঠাত্ মনে হল একটা সাদা গাড়ী তাকে ফলো করছে। দুয়েকবার রাস্তা বদল করে দেখল সাদা গাড়ী তার সঙ্গ ছাড়ছে না। বাড়ী ফিরে অঙ্কুর নীলাদেবীকে ফোন করল।

ভদ্রমহিলার গলাটা ভারী মিষ্টি। নিজের পরিচয় দিয়ে অঙ্কুর জানতে চাইল অনুরাধার কথা। বিশেষ কিছুই বলতে চাইল না নীলা, কোথায় গেছে জানেনা। ডাঃ বিশ্বাসের সঙ্গে অনুরাধার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছে বলে ওরও ধারণা। নীলাকে খুবই চিন্তিত মনে হল অঙ্কুরের।

পরদিন ভোরে উঠে সকালের খাবার খেয়ে অঙ্কুর ওর গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অনেকটা রাস্তা যেতে হবে একা একা, এই ভেবে কয়েকটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট নিয়ে নিল সঙ্গে। খানিকটা যাবার পর খেয়াল হল সাদা গাড়ীটা তার পেছনে। এরাস্তা ওরাস্তা করে সাদা গাড়ীটাকে হারিয়ে ফেলল। তারপর সোজা দীঘার রাস্তা ধরল। গান শুনতে শুনতে গাড়ী চালাতে খুব একটা খারাপ লাগছিল না। মাঝে একটা রেস্তোঁরায় গিয়ে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিল।

দীঘায় পৌঁছে একটা গাছের ছায়ায় গাড়ীটা রেখে খানিকটা ঘুমিয়ে নিল। সন্ধ্যেবেলায় সমুদ্রের ধারে এল। সমুদ্র আজ খুব শান্ত। ঢেউগুলো আস্তে আস্তে সমুদ্রের ধারে ভেঙে পড়ছে। এখন অফ্ সিজন বলে সমুদ্রধার বেশ নির্জন। তাই অনুরাধাকে চিনতে খুব একটা অসুবিধে হল না। অজয় ওকে অনুরাধার একটা ছবি দিয়েছিল। বালির ওপরে বসে বালি নিয়ে খেলাঘর তৈরি করছিল অনুরাধা। অঙ্কুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল।

"অনুরাধাদেবী আমার নাম অঙ্কুর। আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।"
অনুরাধা : আপনাকে তো আমি চিনিনা। আপনার সঙ্গে কথা বলার কোন প্রয়োজনও দেখি না। আপনি চলে যান।
অঙ্কুর : আপনার স্বামী আমাকে নিযুক্ত করেছেন আপনাকে খুঁজে বার করতে। উনি জানতে চান আপনি বাড়ী ছেড়ে কেন চলে এসেছেন।
অনুরাধা : আপনার সাথে আমি কোন ব্যাপারে আলোচনা করতে চাই না। আপনি চলে যান।
অঙ্কুর : আপনার কথা না জেনে আমি যাব না। আপনার স্বামী জানেন না যে আমি এখানে এসেছি। দয়া করে আমাকে বলুন আপনার কথা।
অনুরাধা : আপনি বসুন। কী জানতে চান?
অঙ্কুর : কেন বাড়ী ছেড়ে চলে এসেছেন?
অনুরাধা : ওর সঙ্গে আর থাকব না। একমাস পরে মুম্বাই থেকে বাড়ী এসে দেখি উনি নীলার সঙ্গে আমাদের বিছানায় শুয়ে সঙ্গম করছেন। এভাবে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে আমি তা ভাবতে পারিনি।
অঙ্কুর : আপনি তো সব টাকাপয়সা বার করে নিয়ে এসেছেন। এর জন্য আপনি গণ্ডগোলে পড়তে পারেন।
অনুরাধা : টাকা আমার। সব টাকা আমার। আমার বাবা মারা যাবার পর ওঁর ব্যবসা বিক্রি করে আমি প্রায় এককোটি টাকা পেয়েছি। অজয়ের ব্যবসা একদম চলেনা। ক্লাব আর মদ, এই করে সব টাকা ওড়াচ্ছে। তাও কোন রকমে সহ্য করা যাচ্ছিল, এবার দেখলাম তার সঙ্গে নারীঘটিত গোলমালও যোগ হয়েছে। সবাই ভাবে ও খুব বড়লোক। ওর নামে কিছু নেই, সব আমার। আমার উকিলকে দিযে আমার সব টাকা বার করে নিয়েছি। সমস্ত আমি চ্যারিটিতে দিয়ে যাচ্ছি। আমার কাছে কেবল পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো আছে। এইসব করতে একটু সময় নিয়েছিল, তাই দুসপ্তাহ কোনোরকমে বাড়ী ছিলাম, ও যাতে সন্দেহ করে গোলমাল না বাধায়। কাজ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমি বাড়ী ছাড়ি। বাড়ীটাও আমার নামে, তারও একটা ব্যবস্থা করেছি। ওর একটা ক্রেডিট কার্ড আর একটা গাড়ী ছাড়া ওর নামে আর কিছুই নেই। হঁzা, আর আছে একগাদা ধার, সর্বত্র ধার নিয়ে বসে আছে।
অঙ্কুর : একটা কথা না জিজ্ঞেস করে পারছি না। আপনাকে খুঁজে বার করতে আমার খুব একটা অসুবিধে হয়নি। ডাক্তার আমাকে আপনার ঠিকানা দিতে খুব একটা দ্বিধা করেননি। কেন বলতে পারেন অনুরাধা দেবী?
অনুরাধা : আমাকে অনুরাধা বলুন।
অঙ্কুর : আচ্ছা তাই বলব।
অনুরাধা : আপনি কি আমাকে খুন করতে এসেছেন?
অঙ্কুর : খুন করতে আসব কেন? আমি এখানে এসেছি আর কেউ জানেন। তবে একটা সাদা গাড়ী আমাকে ফলো করার চেষ্টা করেছিল। লোকটার গোঁফ আর দাড়ি আছে। চেনেন ওকে?
অনুরাধা : হ্যাঁ চিনি। ওর নাম নিরঞ্জন সাহা। গুণ্ডা লোক, অজয়ের সাকরেদ। আমি জীবনবাবুকে ফোন করে কাল এখানে আসতে বলব। লিখে আর সই করে যেতে হবে যে আমার কিছু হলে পুলিশ যেন সাহাকেও গ্রেপ্তার করে। অজয়ের নামও আছে। দীঘাতে আমি এবং আমার স্বামী বিয়ের পর কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এসেছিলাম। আমি এখানে মাঝে মাঝেই আসি। অজয় হয়ত ভুলে গেছে, মনে পড়লেই সাহাকে এখানে পাঠাবে আমাকে খুন করতে।
অঙ্কুর : আপনি নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন না কেন? পুলিশের সঙ্গে কেন যোগাযোগ করেননি?
অনুরাধা : কী লাভ? মুম্বাইতে আমি কেন গিয়েছিলাম জানেন। আমার ক্যান্সার হয়েছে। ওখানে মাঝে মাঝে গিয়ে আমি চিকিত্সা করাই। এবারে ডাক্তার আমাকে বলেছে আর কিছু করার নেই। আমি সব চিকিত্সার বাইরে। বছরখানেক আগে রোগটা ধরা পড়ে। তখন খুব ডিপ্রেশান হয়, তাই ডাঃ বিশ্বাসের কাছে যেতে শুরু করি।
অঙ্কুর : আপনার স্বামী কিন্তু ভাবে আপনার সঙ্গে ডাক্তারের একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
অনুরাধা : জানি। আমি এমনিতেই আর বেশীদিন বাঁচবো না। তার আগে আমি হয়ত খুন হয়ে যেতে পারি। পুলিশ আমার সই করা কাগজে জানতে পারবে অজয় এর জন্য দায়ী।
অঙ্কুর : এই জন্যই আপনার ঠিকানা পেতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। আপনি চান ওরা আপনাকে খুঁজে পাক। আমি কাউকে কিছু বলব না। কিন্তু অজয় হয়ত অন্য গোয়েন্দা নিয়োগ করবে, যে খুনীকে সোজা আপনার কাছে পৌঁছে দিতে পারবে।
অনুরাধা : জানি। আমি এখানেই থাকব, আর কোথাও যাবনা। শেষ কটা দিন এই দীঘাতে সমুদ্রের ধারে কাটাতে চাই। মৃত্যু যেভাবেই আসুক, আমি অপেক্ষায় থাকব। খুন হলে যারা দায়ী তারা তো ধরা পড়বে।
অঙ্কুর : অনুরাধা, আপনার সব কথা শুনে মনে হচ্ছে যে আপনি আপনার স্বামীকে খুনের দায়ে সেটআপ করতে চাইছেন।
অনুরাধা : হ্যাঁ, আমি জানি। শাস্তি অজয়কে পেতেই হবে।

দুজনেই চুপ করে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর একসময় অনুরাধা বলল, "আমাকে এবার হোটেলে ফিরে যেতে হবে, ওষুধ খাবার সময় হয়েছে। নইলে ব্যথায় বড় কষ্ট পাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। নমস্কার।"

অনুরাধা আস্তে আস্তে হেঁটে হোটেলের দিকে চলে গেল। অঙ্কুর স্তব্ধ হয়ে বসে রইল আরো কিছুক্ষণ। তারপর গাড়ীতে উঠে কোলকাতার দিকে রওনা হল। অজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করল না। অজয়ের কাছ থেকেও কোন ফোন এল না।

সপ্তাহখানেক পরে কাগজে অনুরাধার মৃত্যুর খবর বেরোল। সমুদ্রের ধারে কেউ এসে তাকে খুন করে রেখে গেছে।

অঙ্কুর সেদিন অনেকগুলো বিয়ার খেল। অনুরাধার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে ওর মনে। জীবনমৃত্যুর ব্যাপারটা অঙ্কুরের কাছে আরও জটিল হয়ে উঠল।


[বিদেশী গল্পের ভাব অনুসরণে]

বীথি রায়