রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক


 

 

 

 

 

 

 

 


 

বিহারিলালের আলোছায়া

(৬)


বাপ্পা দীপ্তদাকে ফোন করেছে।
শোনো,তুমি ছটা নাগাদ আমার ওখানে চলে এসো। আমার কাজ হয়ে গেছে।
আমরা বেলতলা রোডের আস্তানায় ফিরছি। মানস বর্মণের ব্যাগ থেকে আলোছায়ার ডিভিডি,একটি এক্সটারনাল হার্ড ডিস্ক ও একটা পেন ড্রাইভ পাওয়া গেছে। আমাদের পৌঁছতে সাড়ে পাঁচটা বাজলো। আর তার মিনিট পনেরোর মধ্যে এলেন দীপ্ত চৌধুরী। সবাই জমায়েত হয়েছে আমাদের ড্রয়িং-রুমে। আর সেখানে দুজন পুলিশের মাঝে মানস বর্মণকে দেখে দীপ্তদা বলে উঠলেন,তুই!!তুই—শেষ পর্যন্ত--!!পারলি?
বর্মণ মুখ কালো করে অধোবদনে বসে আছেন। আর দীপ্তদা যে জীবনে এমন বিস্মিত হননি সেটা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
বাপ্পা বলল,ইয়েস!!ইনিই। এখন মিস্টার বর্মণ বলবেন কি কেন আর কিভাবে এই জঘন্য কাজটি করলেন?
বর্মণ চুপ।
বেশ বলবেন না। তবে আমিই বলছি। ভুল হলে শুধরে দেবেন।
যেদিন আমি আপনার দোকানে গিয়েছিলাম সেদিন আপনি মুখহাত ধুতে যাওয়ার আগে টেবিলে কিছু খুচরো পয়সা, একটা কলম ও দুটো রেলের টিকিট শার্টের বুকপকেট থেকে বের করে রেখেছিলেন। আমি টিকিট দুটি দেখেছিলাম। তার একটি সেদিনকার। শ্যামনগর টু দমদম। আরেকটা গত শনিবার মানে যেদিন দীপ্তদার বাড়ীতে সবাই জমায়েত হন সেদিনকার। আশ্চর্যের ব্যাপার সেখানে তিনটি। এক,সেটি নিউ গড়িয়া টু বিধাননগর-টিকিট কাটা হয়েছে দশটা পাঁচে। দুই,বিধাননগর টু শ্যামনগর টিকিট নেই। তিন,আপনি বলছেন রাত সাড়ে আটটার আশেপাশে কোনো সময় বেরিয়েছিলেন। বেরিয়ে শ্যামনগর গিয়েছিলেন। প্রিসাইজলি সেজন্যই আপনাকে সে রাতে ফিরতে হলো। পরেরদিন ব্যারাকপুরে বিয়ে বাড়ীতে কাজ ছিলো। কিন্ত আমার মনে হয়েছে এখানে ব্যাপারটা ঠিক যেন মিলছে না। তবে কি আপনার শ্যামনগর থেকে বিধাননগর মান্থলি আছে?সেটাও নয়। সেক্ষেত্রে আপনি সোমবার টিকিট কাটবেন কেন?মনে রাখতে হবে,বিধাননগরে নেমে হাডকোর মোড়ে গেলে দমদম নাগের বাজার মুখী বাস পাওয়া যায়। সে বাস লেকটাউন ও শ্যামনগর হয়ে নাগেরবাজার এসে পৌঁছায়। আমার মনে হয়েছে আপনি পুরো সত্যি বলেননি। এখানে মাথায় রাখতে হবে রনজয়বাবুর নিজের গাড়ী ছিল। কল্লোল মুখার্জী ট্যাক্সিতে এসেওছিলেন এবং গিয়েওছিলেন। আর তীর্থংকর দেব মেট্রোতে এসেছিলেন। আপনি সেদিন ট্রেনে ফিরেছিলেন। কিন্ত পাটুলী অবধি পিয়েছিলেন কিভাবে?সবথেকে সোজা রাস্তাটা ছিল এসপ্ল্যানেড থেকে মেট্রো ধরে যাওয়া। কিন্ত তাই করেছিলেন কিনা আমার জানা নেই। যাইহোক এবার আমি গেলাম দীপ্তদার ফ্ল্যাটে। সেখানে আবিস্কার করলাম যে ঘরে আপনারা বসেছিলেন সে ঘরের টেবিল ঘড়িটা সাড়ে আটটা বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো তবে কি আপনি যখন বেরোচ্ছিলেন তখন এই ঘড়িটাই দেখে বেরিয়েছিলেন?তাই সাড়ে আটটা বলেছিলেন?এখানে তিনজনের বয়ান খুব গুরুত্বপূর্ণ। তীর্থংকরবাবুও বলেছেন যে আপনি সাড়ে আটটায় বেরিয়েছেন। তার আধঘন্টা বাদে কল্লোলবাবু। আবার কল্লোলবাবু বলছেন আপনি বেরোবার পরেই তিনিও চলে যান। ঘড়ি দেখেননি। আর তিন নম্বর ব্যক্তি হলো দীপ্তদার কুক, দিবাকর। আমি যেদিন দীপ্তদার বাড়ী গেলাম সেদিন চলে আসার আগে তার সঙ্গেও আমার কথা হয়। দিবাকর জানায় যে রাত নটা থেকে একটি আধঘন্টার সিরিয়াল তাঁর বাড়ীতেই সে রোজ দেখে। তারপর খাবার টেবিলে সাজিয়ে রেখে চলে যায়। সেদিন খাবার অনেক আগে থেকেই রেডি ছিল। তার বাবুর দুই বন্ধু আগেই খেয়ে বেরিয়ে যান। একজন সিরিয়াল শেষ হবার দশ-পনেরো মিনিট পরেই গেছেন। আরেকজন তারও পরে। তিনি আরো মিনিট পনেরো কুড়ি ছিলেন। তার মনে আছে ড্রয়িংরুমের ঘড়িতে যখন সোয়া দশটা বাজে তখন সে চলে যায়। তার বাবু বোধহয় তখন অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই দেখা বা কথা হয়নি। সে তখন বাকি দুই বন্ধুকে বলে দেয় বাবুকে বলে দিতে যে সে চলে যাচ্ছে। তারা বলেন বাবু টয়লেটে গেছেন। বেরোলে বলে দেবেন। এটা এখানে বলার একটাই কারণ। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে দিবাকর সত্যি বলে থাকলে আপনি সাড়ে আটটায় বেরোন নি। বেরোতে পারেন না। কল্লোলবাবু আমাকে আরো জানিয়েছেন যে সে রাতে দীপ্তদা একটা সময়ের পরে আউট অফ কন্ট্রোল স্টেটে চলে যান। কিন্ত সেটা কখন?এটা জানার পরে আমি আবার রনজয় মল্লিক আর তীর্থংকর দেবের সাথে কথা বলি। দুজনেই বলেছেন যে তাঁরা সঠিক সময় জানেন না। কিন্ত দিবাকর বেরোনোর সময় যখন বলতে আসে তখন তার মালিক যে টয়লেটে আছেন তারা বলেছিলেন সেটা দুজনেই কনফার্ম করেছেন। তার মানে দিবাকর কিছু ভুল বলেনি। আর তারা আসলে ওকে এমন উত্তর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন আরো এইজন্য যে দীপ্তদা তখন পুরোপুরি আউট। ওনাকে ওনার বেডরুমে তখন শুইয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর বন্ধুরা।
মানসবাবু আপনি তার খানিক আগেই বেরিয়েছেন। কিন্ত আপনার ভুলটা কোথায় হলো জানেন?আপনার বয়ান আর আপনার কাটা ট্রেনের টিকেট দু-রকম কথা বলায়। আপনি সেদিন শ্যামনগরে ফিরেছিলেন ঠিকই কিন্ত সেটা আপনার আসল বাড়ীতে নয়। আমার বিশ্বাস নাগেরবাজারের আগে যেখানে আপনার ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া আছে সেখানে আপনি ফেরেন। আমাকে যদিও আপনি উলটো কথা বলেছিলেন। কিন্ত এই একটা মিথ্যে ধরা পরে যাওয়াতে আমায় ভাবতে বসতে হলো যে আপনাকে মিথ্যে বলতে হচ্ছে কেন? এ থেকে কোনোভাবেই প্রমাণ হচ্ছে না যে ডিভিডিটা আপনিই নিয়েছিলেন। একটা কথা বলে এই প্রসঙ্গ শেষ করবো। ঘড়িটা যে বন্ধ হয়ে গেছে সেটা বোধহয় আপনি ছাড়া কেউ খেয়ালই করেননি। আপনি সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তাই ওই সময়টা মেনশন করেছিলেন। আমার ধারণা সাড়ে আটটার সময় আপনি মোটেও কাজটি করেন নি কারণ দীপ্তদা তখন পুরো স্টেডি ছিলেন। কিন্ত এটা আমার ধারণাই বলছি। কোনো প্রমাণ নেই। ভুল হলে আপনি আশা করি শুধরে দেবেন।
এবারে বাকিদের সন্দেহ না করে কেন আপনাকেই সন্দেহ করলাম সে কথায় আসি। একটা বিশেষ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঢুকে আপনাদের চার বন্ধুর প্রোফাইল স্টাডি করলাম। বাকিদের
প্রোফাইলে কোনো বিশেষত্ব নেই। শুধু আপনারটায় কিছু অভিনবত্ব খুঁজে পেলাম। আপনার প্রোফাইল পিকচারটি একটা মেক-আপ সমেত তোলা। আপনাকে দেখে চট করে চেনা যাবে না। কিন্ত একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে। ভাবতে বসলাম যে এখানে মেক-আপ কেন? তবে কি আপনিও অভিনেতা? যদি তাই হয় তবে কোথায় অভিনয় করেন?ফটো থেকে আর কিছু বোঝার উপায় নেই। উপায় পেলাম আপনার অ্যালবামে ঢুকে। সেখানে খুঁজতে খুঁজতে একটি গ্রুপ ফটো পেলাম যেখানে আপনি নেই। নিচে লেখা ‘ওরা কয়েকজন ও আমি’। ভাবলাম এটা কি তবে কোনও ফিল্মের নাম? নেটে খানিক খোঁজাখুঁজি করে যা বেরোলো তা হচ্ছে এটি একটি বাংলা টেলিসিরিয়ালের নাম যেটা কিনা বেশ কয়েকবছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো বন্ধ হয়ে গেছে কেন?ইনি এখানে কি করছেন? অর্থাৎ এই সিরিয়ালের সাথে কিভাবে যুক্ত? শুধুই কি ফটোগ্রাফার? ধরলাম এমন একজন পরিচিতকে যার স্টুডিও পাড়ায় যাতায়াত আছে। তিনি খবর নিয়ে জানালেন,আজ থেকে বছর দুয়েক আগে কোনো একটি চ্যানেলে এই সিরিয়ালটি হত। সেখানে ইনি ছিলেন ক্যামেরাম্যান। যিনি পরিচালক ছিলেন তিনি মাঝপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন এই ক্যামেরাম্যান লোকটি পরিচালনা শুরু করেন। কিন্ত প্রযোজক ব্যক্তিটির সাথে কিছুদিনের মধ্যেই টাকা-পয়সা নিয়ে এনার কিছু সমস্যা তৈরি হয়। ঘটনা হলো আগে যিনি পরিচালক ছিলেন তাঁর সাথেও এনার গন্ডগোল লাগাই ছিলো। ফলতঃ এই ক্যামেরাম্যান কাম পরিচালক-মানে এখানে আমাদের মিস্টার বর্মণ মাঝপথে কাজ ছেড়ে চলে যান। প্রযোজকের বাজেটও বেড়ে যাচ্ছিল। তাই তিনি কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
এবার আসি সেই মেক-আপ ওয়ালা ছবির কথায়। এনার প্রোফাইল পিকচারের একটি প্রিন্ট নিয়ে চিত্রভাস পত্রিকার অফিসে যাই। সেখানে কি হলো তা আগেই বলেছি। যেটা বলিনি তা হলো ‘বে-নকাব’নামে সেই ছবির অ্যান্টিহিরো হলেন আমাদের মানস বাবু। ফিল্মি নাম যার মানস কুমার। বেশ বোঝা গেলো,সিনেমার সাথে এনার অতীত সম্পর্ক। যদিও সেখানে তিনি ব্যর্থ হন। কিন্ত তাতে কি করে প্রমাণ হবে যে ডিভিডিটা ইনি নিয়েছিলেন,বাকিরা নন।
এবারে বাপ্পা দীপ্তদার দিকে ঘুরে বলল,তোমার বাকি তিন বন্ধু আসার আগে শুধু তুমি আর উনি অনেকক্ষণ ছিলে। অনুমান করতে পারি যে তুমি আনন্দের চোটে তুমি আগেভাগেই ব্যাপারটার কথা ওনাকে বলেছিলে?ঠিক কিনা?
হ্যাঁ। বলেছিলাম। কিন্ত তাতে কি হয়েছে?
তাতে কিছুই হয়নি। কিন্ত আমি আগেও বলেছি যে তুমি যথেষ্ট অগোছালো,ভুলোমনা ও খেয়ালী মানুষ। না হলে কিচেনে তোমার লেখার দুটো পাতা প্রিন্ট আমার হাতে আসবে কেন?
বাপ্পা তার প্যান্টের সাইড পকেট থেকে দুটো প্রিন্ট আউট বের করলো। এটাই সেই লেখা। তাই না?
যাঃ!আরে কি হয়েছে,সেদিন আমি লেখাটার একটা প্রিন্ট-তাও প্রথম দুটো পাতা পড়ব বলে নিয়েছি। ফার্স্ট ড্রাফট। এমন সময় দিবাকর ডেকেছে। বলল,রান্নাটা প্রায় হয়ে গেছে। উনি(মানসকে দেখিয়ে)আপনাকে একবার যেতে বলেছেন। বিরিয়ানীটা তখন হয়ে এসেছে। তা আমি গিয়েছি। খেয়াল নেই হাতে কাগজদুটো ছিলো। কিচেনে গিয়ে একধারে ওটা রেখে কাজে হাত দিয়েছি। বেশ করে জিনিষটা নেড়েচেড়ে টেস্ট করে যখন বেরোব তখন কলিং বেল বেজে উঠেছে। আমিই খুলে দিতে এগোলাম। দেখি রন এসে গেছে। তারপর বেমালুম ওটার কথা ভুলে গেছি। ছি,ছি!!কি ভুল করেছি রে ভাই!!
বেশ করেছো। তুমি চলে গেছো। তারপর মানসবাবু সেটি পড়েছেন। পড়ে মনে লোভ চাগাড় দিয়েছে। ডিভিডির কথা ততক্ষণে তার শোনা হয়ে গেছে। ব্যস!ছক কষা শুরু করে দিয়েছেন। কি বর্মণ মশাই!ঠিক বলছি তো?
বর্মণ একবার শুধু ঘাড় নাড়লেন।
বাপ্পা বলে চলল,দেখো বাকিরা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার মধ্যে দুজন একেবারেই এই লাইনে আগ্রহী নন। তীর্থংকর বাবু নিজের ব্যবসা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। রনজয় নিজেই জানেনা কখন অফিস শেষে বাড়ী ফিরবে। তারপরে তার নিজস্ব জগৎ আছে। কর্পোরেট জব করে তার যেটুকু সময় হাতে থাকে তার মধ্যে সে শখের সাহিত্য করে। তাছাড়া দুজনেই বেশ বড়লোক। এবারে কল্লোলবাবু। তিনি ইতিমধ্যে সুপরিচিত। লোকে চেনে। আরো এখন চিনছে। আমার ধারণা সেটা আরো বিস্তৃত হবে। একটু সময় পেলেই তিনি আরো বেশি করে নিজেকে চেনাবেন। তবু বলব,সুযোগ এই তিনজনেরই ছিলো। কিন্ত কারুর প্রয়োজন ছিলো না। তোমাকে এরা সত্যিই ভালোবাসেন। দুজন তাই তোমার ‘আউট’ হয়ে যাওয়ার খবর বেমালুম চেপে গেছেন। যিনি বলে ফেলেছেন তিনি তোমায় অত্যন্ত পছন্দ করেন বলেই বলেছেন। কিন্ত একজন আছেন যিনি সেভাবে প্রতিষ্ঠিত নন। তিনি মানসবাবু। তিনি দেখলেন এ জিনিষ হাতাতে পারলে আখেরে লাভ আছে। সেটাতে থোক ইনকাম হবে। কিভাবে?দিল্লী বা মুম্বাইতে যদি নিয়ে যাওয়া যায় তবে এমন অনেক লোক পাওয়া যাবে যারা এর জন্য প্রচুর দাম দিতে রাজী থাকবেন। আর লেখা?লেখা তিনি নিজের নামে লিখবেন না। হয় বেনামে বা ছদ্মনামে লিখবেন। কিংবা সেরকম লোককে সেটাও বেচে দেবেন। তাতে সে লোকটির নাম ছড়াবে। কিন্ত তিনিও লাভের ভাগীদার হবেন। তাই সে রাতেই শ্যামনগরে নিজের ভাড়া বাড়িতে গেলেন। এই শ্যামনগর মানে হলো নাগেরবাজারের কাছে। লেখা আর ডিভিডি-সবটাই নিজের পেন ড্রাইভ থেকে কপি করে রাখলেন এক্সটারনাল হার্ড ডিস্কের মধ্যে। এতে সুবিধা এই যে পার্মানেন্টলি নিজের কাছে একটা কপি থেকে যাবে। আসলটা তো বেচেই দিচ্ছেন। কিন্ত ঐ পার্মানেন্ট কপি থেকে আরো কপি বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় একাধিক লোকের কাছেও চাইলে সেটা বিক্রি করতে পারবেন। নিউ গড়িয়া থেকে যে সে রাতে উনি বিধাননগরের টিকেট কাটেন তার পেছনে এটাই একমাত্র কারণ।
আমি জানতে চাইলাম,কিন্ত তিনি কাজটা সারলেন কখন?
বাপ্পা বলল,আমি সঠিক সময় বলতে পারবো না। তবে আমার মনে হয় সেটা যখনই হোক খেতে বসার আগে নয়। কারণ সে সময় দিবাকরের সিরিয়াল চলছে। তাই ওই ঘর দিয়ে যেতে হলে তার চোখে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। খুব সম্ভব উনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় কাজটি সারেন। দু-তিন মিনিটের তো কাজ। পেন ড্রাইভ ইনসার্ট করো। ডকুমেন্ট কপি না করে কাট করো। কারণ তাতে ওটা আর কম্পিউটারে থাকবে না। এবার হার্ড ডিস্কে পেস্ট করে দাও। আর ডিভিডিটা তো ড্রয়ার টানলেই পাওয়া যাবে। কারোর বোঝার সুযোগ নেই। দীপ্তদার কম্পিউটার পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড নয়। সেটা হলে অবশ্য শুধু ডিভিডি নিয়েই সন্তষ্ট থাকতে হত। কিন্ত মানসবাবু, আমি ভাবছি আপনি আপনার বন্ধুর ওপর এতটা নির্দয় হয়ে উঠলেন কিভাবে?যেখানে এতদিনকার সম্পর্ক?
ঘরের সবাই চুপ।
কিছুক্ষণ বাদে দীপ্তদা বললেন আসলে আমারই ভুল। বছরখানেক আগে একদিন ও আমার অফিসে এলো। চিত্রভাসে ফটোগ্রাফার নেওয়া হবে। ও বলল,যদি আমি চেষ্টা করি তবে ওর একটা সুযোগ থাকতে পারে। আমি খোঁজ নিলাম। কিন্ত ও অনেক দেরি করে আমায় বলেছিল। ততদিনে লোক ঠিক হয়ে গেছে। ওকে তাই ‘না’বলতে হলো। কিন্ত আমার কেমন মনে হয়েছিল যে ও বোধহয় ধরে নিয়েছে যে আমি চেষ্টা না করেই বলছি। আমি পুশ করলে ওর হয়ত হয়ে যেত। আমার ধারণা ও এমন কিছুই ভেবেছিল। বাট,সেটা ঠিক নয়। সামহাউ আমি পারিনি। আর এখন মনে হচ্ছে সেখান থেকেই ওর মনে একটা ক্ষোভ জন্ম নেয় যেটা আজ এত বড় হয়ে দেখা দিলো।
বাপ্পা বলল,আচ্ছা আপনারা ওর এই সিরিয়াল করা বা মুম্বইওতে গিয়ে ফিল্ম করা-এসবের খবর রাখতেন না?অন্ততঃ আপনার তো দেখার কথা।
দীপ্তদা বললেন,যে সময় ও এসব করছে তখন আমি মাস ছয়েকের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। তারপরে দেশে এলেও মাসকতক ব্যাঙ্গালোরে একটা বিজ্ঞাপনের কোম্পানিতে কাজ করেছি। এরপর কলকাতায় চিত্রভাসে যোগদান। ওর সঙ্গে এই সময় আমার যোগাযোগটা কিছুটা কমে গিয়েছিল। আমাকে একবার বলেছিল কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসার জন্য চেষ্টা করছে। তবে অন্য রাজ্য থেকে। আমি তখন নিজেই নিজের কেরিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে অত ভাবার সময় ছিলো না। বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম। এখন মনে হয় এটা ওর মুম্বইতে থেকে ফিল্মে কাজ করার একটা ফলস ডিফেন্স।
আমি জানতে চাইলাম,কিন্ত বাপ্পা তোর এয়ারপোর্টের কথাটা মাথায় এলো কেন আর এলোই যখন সেটা কিভাবেই বা এলো?
বাপ্পা একটা গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে বলল,একটি পলিসড মিথ্যে শুনে। মানসবাবু নিজের বাড়িতে যা বলেছেন সেটাই সবাই বিশ্বাস করেছে। এমনকি আমিও করে যেতাম যদি উনি শুধু দুরন্ত এক্সপ্রেসের কথা বলে থেমে যেতেন। অথবা অন্ততঃ আমায় আরো ভাবতে হত। কিন্ত নির্দিষ্ট করে হাওড়া-দুরন্ত শুনেই আমার কেমন খটকা লাগলো। তোর মনে থাকার কথা কয়েকমাস আগে মুলচান্দানী মার্ডার কেসে আমি দুরন্ততেই দিল্লী গিয়েছিলাম। তুই যাসনি। আর সেবার অল্পদিনের নোটিশে জেট হাওড়া দুরন্তর টিকেট দিতে পারেনি। তাই একই দিনে সন্ধ্যাবেলা শিয়ালদা দুরন্ত ধরতে হয়। সেটা সোমবার ছিল। তোর মনে পড়ছে?
সত্যিই তাই। মাত্র মাস চারেক আগের কথা। আমি বললাম,খুব পড়ছে। আমায় তখন একটা উপন্যাসের ফাইন্যাল প্রুফ রিডিং-এ ব্যস্ত থাকতে হওয়ায় তোর সাথে যেতে পারিনি।
তবেই দেখ। একে তো সে ট্রেনের টাইম বেলা বারোটা পঞ্চাশ। আর কথা শুনে মনে হলো যত আগে বেরোনো দরকার তত আগে বেরোননি। তায় আজ বুধবার। আমি সিওর আজ দুরন্ত ছাড়বে কিন্ত সেটা শিয়ালদা থেকে। তবু একবার চেক করতেই হলো। নেট থেকে দেখে নিলাম। ট্রেনটা হাওড়া থেকে ছাড়ে সোম আর শুক্রবার। তারপর হঠাৎ মনে হলো তার ফ্ল্যাট থেকে তো এয়ারপোর্ট অনেক কাছে। সে যদি বাড়ী থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটে যায় তারপর ট্রেন ধরা যেতেই পারে। তবে ফ্লাইট ধরাটা অনেক সহজ। অর্থাৎ এই সম্ভাবনাটাও খোলা থাকে। তাই মিস্টার বক্সিকে বলে দিলাম আগে দিল্লীগামী আজকের সব ট্রেনের প্যাসেঞ্জারস লিস্ট দেখে নিতে। সেটা ‘না’ হয়ে যেতেই আর অন্য সম্ভাবনা মাথায় আসেনি। মিস্টার বক্সিকে ওয়াটসআপ করলাম। বললাম,ফ্লাইট সিডিউল থেকে একই তথ্য জানুন। যাতে কেউ মেইন গেট দিয়ে এয়ারপোর্টে চেক-ইন করতে গেলে তাকে হল্ট করানো হয়। বাকিটা তো দেখলিই।
যাওয়ার আগে দীপ্তদা আমাকে আর বাপ্পাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললেন,তোদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
তারপর বাপ্পাকে বললেন,তোর ফি-টা বলিস। আমি নিজে এসে দিয়ে যাবো। কিন্ত আমার ভাই একটা অনুরোধ আছে।
বলো। বাপ্পা স্মিতহাস্যে বলে ওঠে।
আমি—কিছুটা আবেগরুদ্ধ গলায় দীপ্তদা বাপ্পার হাত দুটো ধরে বলল, দেখ আমি ছোটবেলার বন্ধুকে এই সামান্য ভুলের জন্য পুলিশের হাতে দিতে পারবো না। মুহুর্তের ভুলে ও যা করে ফেলেছে আমি নিশ্চিত তার জন্য ও সারাজীবন পস্তাবে। বন্ধু হয়ে বন্ধুর হাতে হাতকড়া পরাতে পারবো না।
এবার আমার হতবাক হওয়ার পালা। বোধকরি বাপ্পারও।
সে বিস্মিত গলায় বলে ওঠে,কি বলছ তুমি!!এটা সামান্য ভুল?
ঠিকই বলছি রে!সবাই জানে ব্যক্তিগত জীবনে আমি চূড়ান্ত অগোছালো। হয়ত আমার বন্ধুরা কেউ কেউ বলেও থাকবে যে জিনিষদুটো আমার ঘরেই আছে। আমি চাই বাকি দুনিয়ার কাছে সেটাই আজীবন সত্যি হয়ে থাক। আমার বাকি বন্ধুদের আসল ঘটনা আমি কোনদিন জানাবো না। আর এটা তো ঠিক যে আজ আমার ভুলের জন্যই এমন কান্ডটা হলো। বাকিটা—ইটস জাস্ট নট পসিবল।
আমরা দুজনেই চুপ করে আছি। কিছু সময়বাদে বিস্ময়ের ঘোর সামলে বাপ্পা বলল,কিন্ত জেঠু তো জানেন। উনি অবশ্য আমায় বলেছেন যে এটা যেন মিডিয়ায় না ছড়ায়।
দীপ্তদা বললেন,সে আমি ওনার সাথে কথা বলে নেবো। ওটা তুই আমার ওপর ছাড়। বাকিটা দেখ।
তাই হলো শেষমেশ। দীপ্তদা কোনো কেস করবে না এটা লিখে দিলো। বাপ্পা বক্সি ও লাহিড়ীর সাথে কয়েকদফা কথা বললো। মানস বর্মণকে ছেড়ে দেওয়া হলো।


* * * *


শেষের পরেও শেষ থাকে। বাপ্পার অনুরোধে জেঠু আমাদের বেলতলা রোডের ফ্ল্যাটে একদিন এসেছিলেন। একেবারে নিছকই গল্প-আড্ডা-খাওয়া এসবের জন্য। দীপ্তদাও ছিলেন। জেঠুকে এ-কদিন বাদে দেখে মনে হলো একটা বিষন্নতা পেয়ে বসেছে। ভীষণ আস্তে আস্তে কথা বললেন।
চায়ের কাপ হাতে খুব ধীরে ধীরে আমাদের জানালেন,ব্রেনটা খারাপ ছিলো না ছেলেটার। ক্লাস সিক্স থেকে ব্রিজ খেলত। কিন্ত অন্য টিচারদের কাছে শুনেছি ও অঙ্ক মুখস্থ করত। কেমিস্ট্রির ইকোয়েশন ব্লাইন্ডলি আউড়ে যেত। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হোঁচট খেত। ওদিকে যদিও স্কুল ফাইন্যালে স্টার পেয়েছিল। কিন্ত হায়ার সেকেন্ডারীতে অর্ডিনারী ফার্স্ট ডিভিশন। তারপর গ্র্যাজুয়েশনে ডিজাস্টার হলো। আর পড়বে না ঠিক করলো। শেষে ওর বন্ধুরাই ওকে অনেক বুঝিয়ে জার্নালিজম ও মাস কমিউনিকেশনে ভর্তি করায়। লাভের লাভ কিছু হয়নি তাতে। কোনমতে পাশ করে। তারপর বেকার বসেছিল। টালিগঞ্জে কি করে গেলো জানি না। পরে বাড়ীতে হাফ ট্রুথ বলে মুম্বই। সেখানেও সুবিধা না করতে পেরে মাসছয়েকবাদে কলকাতায় ফিরে এসে দোকান দিলো। তার ক্যাপিটাল বোধহয় কিছুটা নিজের,কিছুটা বাড়ী থেকে নেওয়া। বাকিটা ধার। এসব ছেলের এই পরিণতিই হয়।
কিন্ত দীপ্ত চৌধুরী আমাদের আবারো অবাক করলেন। এটা মাস দুয়েক পরের কথা। একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের আস্তানায় এসে হাজির। হাতে চিত্রভাসের নতুন সংখ্যা। আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,দেখ।
কি আছে এতে?বাপ্পা জানতে চায়।
খুলেই দেখ না!
কি আছে সেটা দেখার জন্য আমি বাপ্পার পাশে গিয়ে বসলাম।
এখানে বলে রাখি এর মধ্যে আলোছায়ার শো হয়ে গেছে। তার আগে দীপ্তদার সেই লেখাটাও বেরিয়ে গেছে। সারা কলকাতা সে লেখা পরে উচ্ছ্বসিত। আর যারা ফিল্মটা দেখেছেন তাঁদের মতে আলোছায়ার একশো বছরের সিনেমার ইতিহাসের আলোচনায় আসাই উচিৎ। দীপ্তদার ব্যবস্থাপনায় জেঠুকে এমন উদ্যোগের জন্য শ্যামনগরের মানুষ এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
এ্টা তবে কি?
দীপ্তদা বললেন,একজন চিত্রভাস ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে। সে চিত্রসাংবাদিক ছিলো। এবারে আর দেরি করিনি। চিফ এডিটরকে বললাম যে এমন একজনকে রেফার করছি যে কাজটা জানে। আর লেখাপড়ার একটা বড় অংশ এই লাইনেই করেছে। লিখতেও বেশ ভালোই পারে। আসলে কি জানিস,সবাইকেই ভুল শোধরানোর একটা সুযোগ দেওয়া জরুরি। ভালো হওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে হয়। আর সবাই জীবনে কোনওনা কোনভাবে একটা স্বীকৃতি চায়। সেটা তার বাঁচার জন্য খুব দরকার। আমি স্রেফ চেষ্টা করেছি। বাকিটা ওকে করে নিতে হয়েছে।
বাপ্পা ম্যাগাজিনটা খুলে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে এক জায়গায় এসে থেমে গেছে। ওপরে ক্যাপশন রয়েছে সিনেমা রিভিউ। দু-পাতার লেখা।
লেখকের নাম মানস বর্মণ।
তার ওপরে লেখার টাইটেলটা জ্বলজ্বল করছে।
বিহারীলালের আলোছায়া।

   অনীশ মুখোপাধ্যায়

 

লেখক পরিচিতি - পেশায় অর্থনীতির অধ্যাপক।ন'হাটা কলেজে কর্মরত।লেখালেখি নিয়ে চিন্তাভাবনার শুরু ২০১০-এ।প্রথম উপন্যাস 'জগতরত্ন রক্তনীল' আনন্দমেলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ২০১৪-২০১৫ সালে।বিহারীলালের আলোছায়া দ্বিতীয় রচনা। ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখিতে আগ্রহী।ফেসবুকে এ ব্যাপারে নিজস্ব পেজ 'বাইশ গজের ডাইরি'তে নিয়মিত লিখে থাকেন।