রহস্য রোমাঞ্চের ঊর্ণস্থল
 

 

প্রথম পাতা


আলোচনা


গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনীর লেখক, বই, গোয়েন্দা ....


গল্প


উপন্যাস


আন্তর্জাতিক



 

বিহারিলালের আলোছায়া

(১)

আমার বন্ধু বাপ্পাদিত্য ইদানীং মাঝেমাঝেই আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পড়বার দিনগুলো নিয়ে কথা বলে। এসব ব্যপারে যা হয়- বেশীরভাগ বন্ধুদের সঙ্গেই যোগাযোগ কমে যায়। কেউ কেউ যোগাযোগ রাখে,কেউ রাখে না। এখন অবশ্য মোবাইল,ওয়াটসআপ আর বিভিন্ন সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটের কল্যাণে নতুন করে অনেকের সাথে আবার যোগাযোগ হচ্ছে। তবে সেসময় বাপ্পার সঙ্গে সিনিয়রদেরও যোগাযোগ ভালোই ছিল। সেটা অবশ্য পরে অনেক কমে যায়। তাদেরই একজনের সঙ্গে যে এতদিন পরে আবার দেখা হবে আর সেই সুবাদে তিনি যে ওর মক্কেল হয়ে যাবেন সে আর কে জানত!যারা জানেন না তাদের জন্য এখানে বলে রাখি আমি আর বাপ্পা বেলতলা রোডে থাকি। এটা বাপ্পার বাপ্পা অম্লানকাকুর ফ্ল্যাট। কাকু পুলিশের একজন বড় কর্তা। কয়েক বছর হলো এলাহাবাদে পোস্টেড। অনেকদিন আগে কলকাতায় ছিলেন। কলেজের গণ্ডী পার করে বাপ্পা কলকাতায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে ঠিক করে চলে এলো তখন থেকে সে এই বাড়িতেই থাকে। সঙ্গে কুক কাম আরো অনেক কিছুর দায়িত্বে থাকা অনন্ত। আমি থাকতাম হাজরা রোডের এক পিজিতে। এখানে একপ্রকার বাপ্পাই আমাকে এসে থাকার কথা বলে ডেকে আনে। একমাস থেকে ভালো না লাগলে চলে যাবো বলে এসেছিলাম। কিন্ত আর ফিরে যাইনি। দুই বন্ধুতে দিব্যি আছি। বাপ্পার গোয়েন্দাগিরি আর আমার লেখালিখি,টিউশন আর কাকুর পাঠানো আনুকুল্যে ভালোই চলে।
আজ রবিবার। এখন বিকেল ছটা বাজতে দশ। সাড়ে চারটে নাগাদ বাপ্পার মোবাইলে একটা ফোন আসে। ইনিই বাপ্পার ইউনিভার্সিটির সেই সিনিয়র,দীপ্তদা। পুরো নাম দীপ্তাংশু চৌধুরী। দীপ্তদাকে চিনি সেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় থেকে। ওনার তখন থার্ড ইয়ার চলছে।
কথা শেষ করে বাপ্পা জানালো বিশেষ সমস্যায় পরে উনি কথা বলতে চান আর সমস্যাটা কি সেটা এখানে এসেই বলবেন। আমরা যেহেতু বাড়ীতেই আছি তাই সাড়ে ছটা নাগাদ উনি আসবেন বলেছেন। দীপ্তদার সংগে আমাদের বছর খানেক আগে এক বিয়েবাড়ীতে দেখা হয়েছিল। তখন জেনেছিলাম উনি ফিল্ম জার্নালিস্ট হিসেবে চাকরি করেন। চিত্রভাস নামে একটি সিনেমা পত্রিকার সঙ্গে আজ কয়েক বছর উনি যুক্ত। অফিস রাসবিহারী অ্যাভেনিউতে। আর থাকেন পাটুলীতে।
ঠিক ছটা পঁয়ত্রিশে কলিং বেল বেজে উঠলো। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। উনিই এসেছেন। বাইরে একটা অল্টোগাড়ী দাঁড় করানো আছে। পরম সমাদরে ভেতরে এনে বসালাম। চা চলবে এটা জেনে নিয়ে ভেতরে গিয়ে অনন্তকে বলে ড্রয়িং রুমে গুছিয়ে এসে বসলাম। বাপ্পার বাঁদিকে রাখা বেতের চেয়ারে বসেছেন ভদ্রলোক। প্রথম দেখায় যেটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে গত একবছরে বেশ ভালো রোগা হয়েছেন। একটা ডার্ক জিন্স আর ক্রিম কালারের জ্যাকেট পরে আছেন। এখন জানুয়ারীর শেষ। এ বছর কলকাতা থেকে শীত এখনো বিদায় নেয়নি। কিন্ত লক্ষ করলাম ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখ মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে উনি বেশ টেনশনে আছেন। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করলেন, সিগারেটটা ছেড়েছিস?
বাপ্পা তার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,না না ধরো।
হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিতে নিতে বললেন,তাড়াতাড়িতে প্যাকেটটা বাড়ীতে ফেলে এসেছি।
বুঝলাম। তা ব্যাপার কি?ঝামেলায় আছো মনে হচ্ছে।
দুটো লম্বা টান দিয়ে বেশ খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,তা আছি রে। শোন আগেই বলে রাখি ব্যাপারটা কিন্ত খুব সিক্রেট। যা ফ্যাসাদে পরেছি-পাঁচ কান হলেই মুশকিল।
বেশ। গোপনীয়তা বজায় থাকবে। কেসটা বলো।
অনন্ত ইতিমধ্যে চা আর কিছু কুকিস দিয়ে গেছে।
সেসব সিগারেট রেখে সদব্যবহার করতে করতে উনি বলতে শুরু করলেন।
আমি এবছর বেস্ট ফিল্ম জার্নালিষ্টের পুরস্কারটা পেয়েছি। হয়ত দেখে থাকবি।
বাপ্পা বলল,হ্যা। দেখেছি। সে তো বেশ বড় একটা অনুষ্ঠান হলো কয়েকদিন আগে।
উনি একটু হাসলেন। তারপর বলে চললেন,হ্যাঁ। তাতে যা হয়,সুখ্যাতি,প্রশংসা এসব জুটেও গেলো। ভালোই চলছিল। এদিকে আবার ইন্ডিয়ান সিনেমার একশো বছর চলছে। তাই নিয়ে চিত্রভাস থেকে একটা স্পেশাল ইস্যু বেরোবে। তাতে আমার একটা বড় লেখা থাকবে। চিফ এডিটরের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। সে এক লংটার্ম প্ল্যান। এরই মধ্যে কিছুদিন আগে আমার এক জ্যাঠামশাই মানে উনি আমার বাবার পরিচিত,বাবা ওনাকে দাদা বলেন। এখন রিটায়ার্ড। আমায় ফোন করেছেন।
ওনার নাম?
অজিত ভট্ট। ইংরেজী পড়াতেন। তো জ্যেঠু আমাকে একটা অদ্ভুত খবর দিলেন।
বললেন,তুই তো সিনেমা নিয়ে নাড়াচাড়া করিস। বিহারীলাল ভট্টের নাম শুনেছিস?
বলতে হলো তেমন কিছু জানি না।
উনি জিজ্ঞেস করলেন,কি জানিস?কতটা জানিস?
আমি বললাম,সামান্যই। আপনাদের ফ্যামিলির লোক। লেখালেখি করতেন। বোধহয় গোটা দুয়েক বইও ছিল। এখন নিশ্চিতভাবেই সেগুলো আউট অফ প্রিন্ট হবে। আর উনি সারাজীবন বাইরে কাটিয়েছেন।
আর?
ব্যাস। এইটুকুই।
তবে তো আসল ব্যাপারটাই জানিস না।
কি ব্যাপার?
জানিস নিশ্চয় যে ১৯৩১-এ জামাইষষ্ঠী দিয়ে টকির শুরু?
সে জানি।
বেশ। তার বছর ছয়েকবাদে,মানে ১৯৩৭-এ বিহারীলাল একটি ছবি মানে ফিল্ম বানিয়েছিলেন। বিহারীলালের কেসটা ইউনিক দুটো কারণে। একঃ তিনি তখন কলকাতায় থাকতেন না। মানে অ্যাকচুয়ালি বাংলাতেই থাকতেন না। চাকরি নিয়ে চলে যান শিলচরে। সাহিত্য,নাটক এসবে তাঁর উৎসাহ বরাবরের। তো সেখানে চাকরি করেও যে সময় পেতেন তার অনেকটাই সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় ব্যয় করতেন। কিছু ধনী প্রবাসী বাঙালীর সাথেও তাঁর আলাপ হয়। তাদের অর্থানুকুল্যে উনি ঠিক করেন সিনেমা বানাবেন। বানালেনও। নিজেই গল্প লিখলেন। দুইঃ আমি যতদূর জানি এর আগে বাংলা ভাষায় কোনো সাসপেন্স থ্রিলার ফিল্মায়িত হয়নি। সেদিক থেকে উনি এ ব্যাপারে পাইওনিয়ার। ছবির নাম ‘আলোছায়া। ‘কিন্ত অতীব দুঃখের ব্যাপার হল ছবিটি মুক্তি পায়নি। তার পেছনে কি কারণ ছিল আমার জানা নেই। ছবিটি ক্যানবন্দীই থেকে যায়। দিন পনেরো আগে তাঁর ছেলে মুরারিলাল কলকাতায় এসেছিলেন। আমার সংগে যোগাযোগ করেছিলেন। দেখা করি। তখন তিনি আমাকে একটি ডিভিডি দিয়ে যান। আলোছায়ার ডিভিডি। আমি ন্যাচারেলি জানতে চাইলাম যে উনি এটা আমায় দিচ্ছেন কেন?এটাতো পারিবারিক সম্পত্তি। তাতে উনি বললেন যে ফিল্মটা নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। অনেক কষ্টে একটা কপি উনি বানাতে পেরেছেন। তাও সব জায়গা ঠিক নেই। একটু যেন কাটা কাটা। এর একটা ঐতিহাসিক মূল্য হয়ত কারু কাছে থাকতে পারে। কিন্তু উনি সেসবে উৎসাহী নন। মোরওভার উনি পাকাপাকিভাবে আমেরিকা চলে যাচ্ছেন। তেমন কখনো দরকার হলে ক্যানটাতো রইলই। উনি সেটাই প্রোকিওর করবেন ।
জ্যেঠু বললেন,আমি আর দ্বিতীয়বার এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করিনি। বুঝলি,তোর জানার কথা এসব জিনিষের মূল্য আমার কাছে কতটা। তাছাড়া এই হিস্ট্রিটা আমিও জানতাম না। মুরারিলালের থেকেই জানলাম। এবার যেজন্য তোকে ফোন করা। তুই কি একবার আমার এখানে আসতে পারিস?আমি ফিল্মটা দেখেছি। আমি বলি কি,তুইও একবার দেখ। তারপর না হয় ভেবেচিন্তে একটা কিছু ঠিক করা যাবে।
দীপ্তদা থেমেছেন। বাপ্পা এই ফাঁকে গোল্ড ফ্লেক ধরাতে ব্যস্ত হলো আর আমি জানতে চাইলাম,তুমি গেলে?
গেলাম। উনি ডেকেছেন। তায় এই কেস। না করি কি করে?
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বন্ধুটি বলল, কোথায় থাকেন উনি?
ওহো। এই দেখ,বলতে ভুলে গেছি। তোর তো মনে আছে যে আমাদের বাড়ী ছিল শ্যামনগরে।
হ্যাঁ,তুমি বলেছিলে একবার।
রাইট। খুব ছোটবেলায় অবশ্য কলকাতায় চলে আসি। কিন্ত ওখানকার অনেকের সাথেই যোগাযোগটা থেকে গেছে। জেঠু তার মধ্যে একজন। উনি শ্যামনগরেই থাকেন।
জায়গাটা কোথায়?
শিয়ালদা থেকে নৈহাটি লাইনে গেলে ব্যারাকপুরের দুটো স্টেশন পরে। সে যাইহোক,জেঠুর সঙ্গে বসে ফিল্মটা দেখলাম। এককথায় অনবদ্য। জাস্ট ভাবা যায় না। অত বছর আগে এত আধুনিক চিন্তাভাবনা-অসাধারণ লাগলো। এ জিনিষ এখন দুর্মূল্য। এতো হাতছাড়া করা যায় না। জেঠুকে বললাম,ব্যাপার যা দাঁড়াচ্ছে তাতে আলোছায়ার মালিক এখন আপনি। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে যাতে এ জিনিষ পাবলিক ফোরামে আসে সেটা আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। তাছাড়া হান্ড্রেড ইয়ারস অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা নিয়ে আমার একটা লেখার কাজ চলছে। আমার মনে হয় লেখাটা ইনকমপ্লিট থেকে যাবে যদি তাতে এই অংশটা না যায়। ছবিটার একটা স্পেশাল শো হওয়া উচিৎ। আলোছায়া ও বিহারীলাল ভট্টের একটা প্রপার রেকগনিশন না হলে-
জেঠু একটু ইমোশনাল হয়ে উঠলেন। তারপর আমার হাত ধরে বললেন,পারবি?
বললাম,পারব। না পারার কিছু নেই। মিডিয়াতে ঝড় উঠে যাবে জেঠু। পচাত্তর বছরেরও বেশি পুরনো সাসপেন্স থ্রিলার এবং সেটা এই কোয়ালিটির। মানুষের খারাপ লাগবে না। আপনি দেখে নেবেন।
জেঠু আর না করেননি। সেদিনই ডিভিডিটা নিয়ে এলাম। পরেরদিন চিফ এডিটরের সঙ্গে কথা হলো। তিনি তো শুনে চেয়ার থেকে প্রায় উলটে পরেন আর কি!আমাকে বললেন,কি বলছো তুমি?আরে এই স্টোরিটা চিত্রভাস কভার করলে-ভাবতে পারছো কলকাতায় কি ইমপ্যাক্ট হবে?
বললাম,পারছি। কিন্ত তাড়াহুড়ো করলে হবে না। আগে লেখাটা বেরোক। তারপর দেখুন তার কি রিঅ্যাকশন হয়। এরপর ফিল্ম শো –এর আয়োজন করুন। সবার শেষে রিভিউ বেরোবে। এভাবে প্রোসিড করাই ভালো।
এই বলে ওনাকে এই সিকোয়েন্সটায় কনভিন্স করালাম। এর মধ্যে আবার আমার পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটলো। কানে খবর এলো আমার নাকি প্রোমোশন হতে পারে। সব মিলিয়ে তখন সুখের চরম সীমায় আছি। ছবি দেখানোর দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। ডিভিডিটা বাড়ীতেই রেখেছি। এইরকম সময়ে আমার চার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলল,পার্টি দিতে হবে। উপলক্ষ আমার পুরস্কার প্রাপ্তি। এরা সবাই আমার সেই স্কুল জীবনের বন্ধু। একসময় সবাই কলকাতায় একই স্কুলে পড়তাম। মাস তিনেক আগে চিত্রভাস আমাকে একবার ইউরোপে পাঠিয়েছিল। চেক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কভার করতে। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। তো আমি আসার সময় দুটো ওয়াইন নিয়ে এসেছিলাম। ভেবে দেখলাম,মন্দ কি!সেলিব্রেট করা যাক। তো সেই ভেবে আমার পাটুলির ফ্ল্যাটে গতকাল ওদের ডেকেছিলাম। ওরা মানে হল,মানস,তীর্থংকর,রণজয় ও কল্লোল। পার্টি হলো। মানস রান্নার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে আগে এসেছিল। বাকিরা অবশ্য সন্ধ্যেবেলায় এলো। দারুণ আড্ডা হলো। কল্লোল আর মানস চলে গেলেও তীর্থ আর রণ ছিলো। ওরা আজ সকালে গেলো। তারপর দুপুর নাগাদ স্নান খাওয়া সেরে লেখাটা নিয়ে বসবো ভাবলাম। সামনের শুক্রবার সেটা শেষ করে জমা দেওয়ার তারিখ। ল্যাপটপটা খুলে লেখাটা ওপেন করতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। মাথাটা মনে হলো বাঁই বাঁই করে ঘুরছে।
আমি জানতে চাইলাম,কেন?কি হলো?
লেখা নেই। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
কেমন ফ্যাসফেসে গলায় বললেন দীপ্তদা।
বাপ্পা একটু যেন অবাক। সে বলল,মানে?সে আবার কি?
উনি বেশ উত্তেজিত স্বরে বললেন,ডেস্কটপে লেখাটা ছিল। আর এখন ভ্যানিস।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,ডিলিট হয়ে গেছে?রি-সাইকল বিন দেখেছ?
ডিলিট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সমস্ত ফাইল,ফোল্ডার পেন ড্রাইভ তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও নেই। রি-সাইকল বিন ফাঁকা। এখানেই শেষ নয়। যে টেবিলে বসে কাজ করি তার ডানদিকে তিনটে ড্রয়ার আছে। মাঝেরটায় ডিভিডিটা তালাবন্ধ অবস্থায় থাকে। কি খেয়াল হওয়াতে সেটা খুলে দেখি ডিভিডি গায়েব। বাকি দুটো ড্রয়ারের মধ্যে থাকার চান্স নেই। কোনো কারণে আলমারির লকারে যদি রেখে থাকি ভেবে সেটাও দেখলাম। জানতাম ওখানে থাকবে না। নেইও।
বাপ্পা জিজ্ঞেস করল,লেখাটা বা ডিভিডির কোনও ব্যাক আপ নিশ্চয় করেছিলে?
দীপ্তদা মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন না,সবচেয়ে বড় ভুল ওটাই।
তোমার কম্পিউটার কি পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড?
বাড়ীর মেশিন ভাই। আমি একা থাকি। কার জন্য পাসওয়ার্ড দেব?
আমি তো বটেই বাপ্পাও বোধহয় অবাক হয়েছে পুরো ব্যাপারটা শুনে। এমন কেস আগে এসেছে কি? মনে পড়ছে না। চেয়ার থেকে উঠে সে ঘরের পূবপ্রান্তে জানালাটার সামনে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আনমনে কিছু ভাবল। মিনিট খানেক বাদে আবার আমাদের বসার জায়গাটায় ফিরে এসে বসতে বসতে বলল,তোমার মতন লোক কি করে এত বড় ভূলটা করল,এটা ভেবেই খুব অবাক লাগছে।
তুমি কি অফিসের বা বাইরের কাউকে সাসপেক্ট করো?
বাপ্পার কাছ থেকে এবার আরেকটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে উনি বললেন,একেবারেই না। কেউ জানেই না। রইল বাকি আমার এই বন্ধুরা। আমি বলব না বলব না করেও কাল ওদের ব্যাপারটা বলেই দিলাম। ভেবে দেখলাম সবাই এত পুরনো ও এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাছাড়া ফিল্ম শো-এর দিন ওদেরকেও ডাকব। প্লাস এই সেলিব্রেশনটার একটা কারণ তো আলোছায়াও। কাজেই বলাই যায়।
ভালো করে ভেবে বলো লেখাটা লাস্ট কখন নিয়ে বসেছিলে?
দীপ্তদা একটু ভেবে বললেন,কাল সকালে সাড়ে দশটা নাগাদ একবার বসেছি। ঘন্টাখানেক কাজ করেছি। তারপর তো রান্নায় হাত লাগালাম।
তোমার রান্নার লোক নেই?
আছে। দিবাকর নামে একজন রান্না করে দেয়। কিন্ত আমি অকেশনালী কুকিংটা করেও থাকি। ভালো লাগে। গতকাল দিবাকর আমাকে দুটো আইটেম বানাতে হেল্প করেছে। মানস এর মধ্যে চলে আসে। ওর ও রান্নায় ন্যাক আছে। সে-ও কাল আমার সাথে হাত লাগায়।
ডিভিডিটা লাস্ট কখন দেখেছো?
ওই কাল সন্ধ্যাবেলায়।
তোমার বন্ধুদের দেখিয়েছিলে?
হ্যাঁ। ওরা এলো। আড্ডায় বসে ব্যাপারটা ওদের বললাম। সবাই বেশ উৎসাহী মনে হলো। ড্রয়ারটা খুলে কেস শুদ্ধ সেটা নিয়ে এলাম। ওরা উলটে পালটে দেখলো। তারপর শো-এর কথাটা উঠল। বন্ধুদের বললাম যে সেদিন মানে শো-এর দিন ওদেরকেও ইনভাইট করবো। দেখা হয়ে গেলে ওটা নিয়ে আবার ড্রয়ারে রেখে এলাম।
ড্রয়ার লক করেছিলে?
একটু ভেবে উনি বললেন,মনে করতে পারছি না। তখনকার মত বোধহয় খোলাই ছিল। আসলে মাথাতেই তো আসে নি যে এমন কিছু হতে পারে।
একটু বাদে বাপ্পা বলল,তোমার বন্ধুদের এবার একটা শর্ট প্রোফাইল দাও।
দীপ্তদা বলতে শুরু করলেন,প্রথমে বলি মানসের কথা। মানস বর্মন। ও বেসিক্যালি খুব ভালো ফটোগ্রাফার। নিজের স্টুডিও আছে। এসপ্ল্যানেডে নিজের ক্যামেরার দোকান আছে। অনেক সোশ্যাল ইভেন্টে ওর ছবি তোলার জন্য ডাক আসে। এককথায় ফটোই ওর জীবন। থাকে লেকটাউন থেকে নাগেরবাজার যেতে মাঝামাঝি একটা জায়গায়। সে জায়গারও নাম শ্যামনগর। এখানে বলে রাখি মানস আমার থেকে এক ব্যাচ জুনিয়র। ওরাও শ্যামনগরেই থাকত। মানে যেখানে জেঠু থাকেন। কিন্ত ওর বাবার চাকরির সুবিধার জন্য কিছুদিন বাদে ওরাও কলকাতায় চলে আসে। আর এসে ভর্তি হয় আমাদের সঙ্গে একই স্কুলে। তবে ওর ফ্যামিলির অনেকেই এখনো ঐ মানে নৈহাটি-ব্যারাকপুরের মাঝে যে শ্যামনগর সেখানেই থাকেন। ওর বাবা রিটায়ার করার পরে এখন সেখানেই থাকেন। ও অবশ্য না থাকলেও নিয়মিত যাতায়াত করে।
তারপর ধর রণ। রণজয় মল্লিক। বাড়ী যোধপুর পার্কে। রণজয় একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। অফিস সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ওর আরেকটা গুণ হলো ও একটু শখের সাহিত্যচর্চা করে আর কি। একটু-আধটু লেখে-টেখে। মানে কয়েকটা লেখা বেরিয়েছে ছোটখাটো পত্রপত্রিকায়। উঠতি সাহিত্যিক বলা যায়।
আর আছে তীর্থ। তীর্থংকর দেব। থাকে সল্টলেকে। কম্পিউটার হার্ডওয়ারের বিজনেস করে। যদিও তীর্থও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। চাঁদনি চকে ওর নিজের দোকান আছে।
সবশেষে কল্লোল। কল্লোল মুখার্জী। থাকে বালিগঞ্জ প্লেস-এ। পেশায় অভিনেতা। নাটক করে। একটা ফিল্ম রিলিজ করেছে। আরো গোটাদুয়েক পাইপলাইনে আছে। আর তিনটে সিরিয়ালে কাজ করছে। নিজে গল্প লেখে। তবে সে মূলতঃ সিরিয়ালের জন্য। আস্তে আস্তে ওর নামডাক হচ্ছে। ওর বাবার নাটকের দল আছে। সেখানেও ও কাজ করে।
বাপ্পা একটা প্যাড এগিয়ে দিয়ে বলে শোনো,এরা চারজন আর তোমার জেঠুর ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা এখানে লিখে দাও।
মিনিট পাঁচেক বাদে দীপ্তদা সেটা ফেরত দিলেন। বাপ্পা একবার প্যাডে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,আমি জানি এটা তোমার কাছে একটা টাচি ইস্যু। তবু জিজ্ঞেস করতেই হচ্ছে। তুমি কি মনে করো যে এই চারজনের মধ্যেই কেউ একাজ করেছে?কাউকে সামান্যতম সন্দেহও হয়? ভেবে বলো।
প্রায় আধমিনিট বাদে দীপ্তদা বললেন,তোর প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এখন আমার হ্যাঁ বলা ছাড়া রাস্তা নেই। দ্বিতীয়টার উত্তর না।
ঠিক আছে। আমি দেখি কি করতে পারি। তুমি এদের সবাইকে ফোন করে আমার একটা ইন্ট্রো দিয়ে রেখো। আর তোমার জেঠুকেও বোলো যে দরকার হলে আমি ওনার সাথেও যোগাযোগ করতে পারি।
এবারে দীপ্তদা বেশ কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন,ওনাকে ছেড়ে দে। উনি কিভাবে সাসপেক্টদের লিস্টে আসেন?তাছাড়া তুই জানিস না উনি এই বয়সেও কি রকম রাগী। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো উনি যদি সবটুকু শোনেন তাহলে আমার ওপর ওনার সমস্ত আস্থা,বিশ্বাস একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে।
বাপ্পা এবার একটু কঠিন গলায় বলল,ঠিক করে বলো তো কি চাও?তুমি কি সত্যিই চাইছ যে এই কেসটা নিয়ে আমি ডিল করি?
এবারে আরো সঙ্কুচিত স্বরে দীপ্তদা বললেন,আরে ভাই সে কারণেই তো তোর কাছে আসা।
তাহলে তোমাকে এসব খুচরো ভয়,সেন্টিমেন্ট ছাড়তে হবে। আমি যদি তদন্ত করি তবে জেনে রাখো তুমিও সন্দেহের বাইরে থাকবে না। বন্ধুত্ব অন্য ব্যাপার। সে তুমি আলাদা করে বুঝে নিও।
আমি যদি কাজ করি তবে সেটা আমায় স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে।


(২)


দীপ্তদা বেরোলেন আধঘন্টা হলো। এখন রাত প্রায় নটা বাজে। বাপ্পা এর মধ্যে একবার গুগলে ঢুকে বিহারীলাল ভট্ট দিয়ে সার্চ করে কিছু পায়নি আর সেটা স্বাভাবিকও বটে। কারণ পাবলিক ডোমেইনে বিহারীলাল সম্পর্কে কখনোই কিছু আসেনি বলেই মনে হলো। এখান থেকে বেরিয়েই দীপ্তদা সম্ভবতঃওনার বন্ধুদের ফোনগুলো করেছেন। এটা এই জন্য মনে হলো যে সাড়ে নটা নাগাদ বাপ্পার মোবাইলে একটা ওয়াটসআপ ঢুকলো। দীপ্তদা জানিয়েছেন জাস্ট রিচড,টকড টু অল অব দেম। পরের পনেরো মিনিটে বাপ্পা চারজনের সাথেই কথা বলে নিলো। রেফারেন্স দীপ্তদা। কথা শেষ করে পরেরদিনের প্ল্যানিংটাও ও সেরে নিলো। ও যা বলল তাতে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে কাল সকালে নটার মধ্যে আমরা সল্টলেকের সেক্টর থ্রিতে যাচ্ছি। সেখানে তীর্থংকর দেব থাকেন। ওনার সাথে কথা সেরে সেক্টর ফাইভ। রণজয় মল্লিক। সেখান থেকে সোজা এসপ্ল্যানেড। মানস বর্মন। কল্লোল মুখার্জী শ্যুটিং-এ ব্যস্ত। মংগলবারের আগে সময় নেই।
আমরা পরেরদিন সকালে সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরোলাম। বাপ্পা বলল,এখান থেকে মেট্রো করে সোজা শোভাবাজারে এসে সেখান থেকে ট্যাক্সি ধরে নেওয়াই সুবিধার হবে। সময় বাঁচবে। সেটা জরুরি কারণ তীর্থংকর সাড়ে নটায় বেরোবেন। বাপ্পাকে উনি নাকি চাঁদনিতে ওনার দোকানে আসার অফার দিয়েছিলেন। কিন্ত যেহেতু আমরা রনজয়ের সাথে কথা বলতে সল্ট লেকে যাবই তাই ওর মনে হয়েছে ওনার বাড়ীতে কথা সেরে নেওয়াটাই সুবিধার হবে। ঠিক নটা বাজতে দশে আমরা ওনার বাড়ী এসে কলিং বেলে হাত রাখলাম। এটা একটা পাঁচতলা বাড়ীর তিন তলা। লিফট নেই। বেল টিপতে দরজা খুলে জিজ্ঞাসু চোখে একজন ফর্সা রোগা লম্বা চেহারার ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকালেন। বাপ্পা আমাদের পরিচয় দিতে ভীষণ ফর্ম্যাল টোনে ভেতরে এসে বসতে বললেন। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত ঘরের ড্রয়িং রুমে আজকাল যা যা থাকে বা যেমন সব সাজানো গোছানো থাকে ঠিক তেমনি। আমাদের চা বা কফি কি চলবে জানতে চাওয়ায় আপাতত কোনোটাই না বলে বাপ্পা সরাসরি কাজের কথায় ঢুকে গেলো। তার কারণও আছে। ভদ্রলোক অফিস যাওয়ার ড্রেস পরে একেবারে রেডি হয়ে গেছেন। আর বাড়ীতে দ্বিতীয় কাউকে দেখা যাচ্ছে না। হয় কেউ থাকেন না। অথবা এখন কেউ নেই। নেহাতই পোশাকি ভদ্রতা করেছেন সেটা বোঝাই গেছে। অতএব যত তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ওনাকে ফ্রি করে দিয়ে বেরিয়ে পড়া যায় ততই ভালো।
বাপ্পাঃ আপনি কখন জানতে পারেন যে দীপ্তদার জিনিষ দুটো মিসিং?
তীর্থংকরঃগতকাল দুপুরে। এই ধরুন আড়াইটে নাগাদ। ও প্রথম আমাকেই জানায়।
বাপ্পাঃশনিবার রাতে তো শুনলাম আপনি ওখানে ছিলেন। কখন আপনাদের আড্ডা ভাঙলো?
তীর্থংকরঃঘড়ি দেখিনি। তবে অনেক রাত হবে।
বাপ্পাঃতবু?কোনো আন্দাজ?
তীর্থংকরঃদুটো আড়াইটে হবে।
বাপ্পাঃএত রাত হলো যে?
তীর্থংকরঃআসলে অনেক দিন বাদে সবাই একত্র হলাম। কল্লোল আর মানসের অবশ্য পরেরদিন সকালে কাজ থাকায় যেতে হলো। আমরা,বাকিরা চুটিয়ে গল্প করলাম।
বাপ্পাঃওনারা কখন গিয়েছিলেন মনে আছে?
তীর্থংকরঃমানস বোধহয় সাড়ে আটটা নাগাদ বেরোলো। ও বলছিল শ্যামনগর যাবে। আর কল্লোল বোধহয় আরো ঘন্টাখানেকবাদে। আন্দাজে বলছি। ঘড়ি দেখিনি।
বাপ্পাঃডিভিডিটা দেখেছিলেন?
তীর্থংকরঃদেখেছিলাম। জাস্ট একটা ইউজুয়াল প্যাকেট। আমি কোনো স্পেশালিটি পাইনি। যেমন হয় আর কি। তবে একটা ব্যাপার বলি। আমি এই ফিল্ম,হিস্টোরিক্যাল ভ্যালু এসবে খুব একটা ইন্টারেস্ট পাইনা। আমার বন্ধুর সাকসেস সেটা যাতেই হোক আমি আনন্দিত। এই অবধি ঠিক আছে। তার বাইরে আর কি বলব?
বাপ্পাঃআপনার ব্যবসাটা অ্যাকচুয়ালি কিসের?
তীর্থংকরঃকিছু মনে করবেন না। এই কেসের সঙ্গে কি সেটা কোনোভাবে রেলেভেন্ট?
বাপ্পাঃহতেও পারে। আপনি তো কেসটায় যুক্ত। কাজেই….
তীর্থংকরঃ(কিছুটা বিরক্তি চেপে)কম্পিউটারের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট আমরা সাপ্লাই করি। তার সাথে অ্যাসেম্বল্ড প্রডাক্টও বিক্রি করে থাকি।
বাপ্পাঃদোকান কি আপনারই?
তীর্থংকরঃআজ্ঞে হ্যাঁ।
বাপ্পাঃকাউকে সন্দেহ হচ্ছে?
তীর্থংকরঃবলা ডিফিকাল্ট। তবে আপনাকে যখন আপোয়েন্ট করা হয়েছে তখন ধরে নিতে হবে যে দীপ্ত আমাদেরই কাউকে সন্দেহ করছে।
বাপ্পাঃ আপনার দোকান বা ব্যবসা যাই বলুন কতদিন চলছে?
তীর্থংকরঃবছর চারেক হবে।
বাপ্পাঃএখানে আপনি কি একাই থাকেন?
তীর্থংকরঃহ্যাঁ। বাবা,মা,দাদা শোভাবাজারের বাড়ীতে। মাসে একবার যাই।
ভদ্রলোককে আর এখন কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিল না। “অনেক ধন্যবাদ” জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে বাপ্পা একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল,বেজায় বিরক্ত হয়েছে। সাতসকালে উৎপাত কারই বা ভালো লাগে। ইনি যদি ইঞ্জিনিয়ার হন তবে চাকরি না করে ব্যবসা কেন?
বললাম,পাননি হয়ত। আজকাল চাকরির যা অবস্থা। তুই তো সেসবের মধ্যে ঢুকলি না। বুঝবি কি?
বন্ধুটি একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,আওয়াজ দিচ্ছিস!চল এবার রণজয় মল্লিক।
আমরা ব্রডওয়েতে এসে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পরে একটা ফাঁকা ট্যাক্সি পেলাম। ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে রণজয়ের অফিসের ঠিকানা বলায় সে বলল চেনে। বাপ্পাও বলল খানিক আইডিয়া আছে। কাছাকাছি গিয়ে রণজয়কে ফোন করতে হবে। সে তাহলে অফিস থেকে বেরিয়ে এসে কথা বলতে পারবে। এসব আলোচনা তো আর অফিসে হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। সল্টলেকে রাস্তা চেনা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। বুঝতে পারছিলাম না কোথা দিয়ে যাচ্ছি। ট্যাক্সিটা যখন করুণাময়ী আইল্যান্ডে এসে ডানদিকে ঘুরে গেলো তখন বুঝলাম যে সেটা এবার সোজা গিয়ে উইপ্রো মোড় ছাড়িয়ে সেক্টর ফাইভে ঢুকবে। গন্তব্যের কাছাকাছি এসে বাপ্পা রণজয়কে ফোন করে আমরা কোথায় আছি বলাতে রনজয় জানালো সেখানেই অপেক্ষা করতে। তার অফিস কাছেই। সে দু মিনিটের মধ্যে এসে যাচ্ছে। আমরা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে একটা ঝুপড়ির সামনে দাঁড়ালাম। এটা খাস অফিস পাড়া। যারা এই এলাকায় চাকরি করেন তাদের খাওয়ার একটা বড় জায়গা হলো এই ঝুপড়িগুলো। ডিম-টোস্ট থেকে শুরু করে ভাত,ডাল,মাছ,মাংস,রুটি,তরকারি ইত্যাদি সব জাতীয় খাবার এখানে পাওয়া যাবে। প্রচুর বিক্রি হয়। সবসময় লোকের ভিড় লেগেই থাকে।
মিনিট তিন-চারের মধ্যেই প্রায় ছয় ফুট হাইটের একজন সুপুরুষ ভদ্রলোক স্মিত হাসিমুখে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন আপনাদের মধ্যে বাপ্পাদিত্য কোন জন?
বাপ্পা এগিয়ে এসে করমর্দন করে বলল,আমিই। আর এ আমার বন্ধু নীলাব্জ।
আমার সাথেও সে একই ভাবে করমর্দন করে বলল, নাইশ টু মিট ইউ।
তারপর বাপ্পার দিকে তাকিয়ে বলল,এই ডানদিকের রাস্তায় আসুন। একটা ভালো কফিশপ আছে। আসুন সেখানে গিয়ে বসে কথা বলি।
বাপ্পা বলল,চলুন। যাওয়া যাক।
আমরা তার কথামত কয়েক মিনিট হেঁটে কফিশপে গিয়ে ঢুকলাম। ভিতরে গিয়ে বসার পরে রণ তিনকাপ কফির অর্ডার দিয়ে এসে বসে বললেন,সত্যি বলতে কি আমার সারাজীবনে আমি এত আশ্চর্য খুব কমই হয়েছি। এমনও যে হতে পারে সেটা ভাবাই যায় না।
রণজয়ের সংগে কথাবার্তার বিষদ বিবরণে আর ঢুকছি না। কারণ সে রকম নতুন তথ্য নেই। সংক্ষেপে লিখলে যেটা দাঁড়ায় তা হলো তিনি গত শনিবার অফিসে এসেছিলেন। যদিও এমনিতে শনিবার ওনার ছুটিই থাকে। সেদিন দরকার ছিল। ওনার নিজের গাড়ীতে করে সেদিন অফিস থেকে সোজা পাটুলী চলে গিয়েছিলেন। পৌচেছেন ছটার আশেপাশে কোনো সময়। বাকি গল্প তীর্থংকরের মতই। শুধু তার লেখালেখির কথা ওঠায় তিনি লজ্জিত হয়ে জানান ওটা নেহাতই শখ। এখন একটা বড় গল্প লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। তার বাইরে গোটা কতক কবিতা আর একটা দুটো ছোট গল্প এখানে ওখানে বেরিয়েছে। কোনো বন্ধুকেই তিনি সন্দেহ করছেন না। উল্টে তার ধারণা হলো দীপ্তাংশু চৌধুরী ভুলো মনের মানুষ। নিজেই হয়ত রেখেছে ডিভিডিটা। সারা বাড়ী ভালো করে খুঁজলে পেয়ে যাবে। তবে লেখা হারানোর ব্যাপারটা তাকেও অবাক করেছে।
কথা শেষ করে আমরা এবার ধর্মতলার দিকে এগোলাম। আবার ট্যাক্সি। এবার সোজা শ্যামবাজার মেট্রো। সেখান থেকে এসপ্ল্যানেড নেমে বাপ্পা মানস বর্মণকে ফোন করল। প্রথমবারে নট রিচেবল। দ্বিতীয়বারে রিং হচ্ছে। উনি জানালেন মেট্রোতে আছেন। বাপ্পা দোকানের দিগনির্দেশ জেনে নিয়েছে। উনি বলেছেন মিনিট দশের মধ্যে আসছেন। ওনার কথামত বাপ্পা রাস্তার ডানদিক ধরে লেনিন সরণীর দিকে এগোলো। কিছুদুর যেতেই দুটি স্টুডিও চোখে পড়ল। পরেরটির নাম বর্মণ স্টুডিও। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। একটি বছর বাইশ তেইশের ছেলে এগিয়ে এসেছে। বাপ্পার দিকে তাকিয়ে বলল, কি চান?অল্পকথায় বাপ্পা তার সাথে মিস্টার বর্মণের যা কথা হয়েছে সেটা জানিয়ে দিল। ছেলেটি সেসব শুনে একটু ব্যস্ত হয়ে উঠে একটি অর্ধগোলাকৃতি টেবিলের উল্টোদিকে রাখা দুটি চেয়ার দেখিয়ে আমাদের বসতে অনুরোধ করল। উল্টোদিকের খালি চেয়ারটায় নিশ্চয় মানসবাবু বসেন। টেবিলের উপর বেশ কিছু ফটো অ্যালবাম। এক পাশে দুটো চ্যানেল ফাইল রাখা আছে। টেবিলের উপরটা পাতলা কাচ দিয়ে ঢাকা আর তার নিচে বেশ কয়েকটা বিভিন্ন সাইজের স্পেশিমেন ফটো দেখা যাচ্ছে। আমি ঘরের চারপাশ দেখছিলাম। দুদিকের দেওয়ালে কাচের তাক করা আর তাতে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় কয়েকজন পুরুষ ও মহিলার ছবি। তার মধ্যে গোটাকতক ছবি সিনেমা অভিনেতা অভিনেতৃদেরও আছে। বোঝাই যাচ্ছে মানসবাবুর যাতায়াত ঐ পাড়াতেও আছে আর সেটা ফটো তোলার সুবাদেই। ছেলেটি আমাদের অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে পর্দা ঠেলে ঢুকে গেলো। ওদিকে বোধহয় স্টুডিও। ডানদিকেও একটা দরজা আছে। সেখান দিয়েও কোথাও নিশ্চয় যাওয়া যায়। খানিকক্ষণের মধ্যেই হালকা সবুজ ফুলহাতা শার্ট ও ছাই রঙের হাতকাটা সোয়েটার পরা এক ভদ্রলোক মেইন দরজাটা ঠেলে ঢুকেছেন। সোজা দ্রুত ঢুকে আমাদের উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বসতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,আপনাদের মধ্যে কেউ ফোন করেছিলেন?
বাপ্পা হাত তুলে নমস্কার করে বলল,আমিই করেছিলাম। আপনি নিশ্চয় মানসবাবু?
হ্যাঁ,হ্যাঁ। নমস্কার।
ভদ্রলোক বোধহয় জোরে হেঁটে এসেছেন। একটু ঘামছেন।
বললেন,আমাকে দুমিনিট সময় দিন। মুখে চোখে একটু জল দিয়ে আসি। চা খাবেন তো?
বাপ্পা বলল,না থাক। এই খানিক আগে রণজয়বাবুর অফিসের কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলতে। সেখানে একপ্রস্থ কফি খেলাম।
ও আচ্ছা। রণর ওখানে গিয়েছিলেন?তা বেশ।
হ্যাঁ। সবার সাথেই একবার কথা বলতে হবে তো।
ওক্কে। একটু বসুন। আসছি।
হাতকাটা সোয়েটারটা খুলে চেয়ারের গায়ে আর শার্টের পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা আর বোধহয় রেলের টিকিট,কলম ইত্যাদি বের করে টেবিলের ওপর রেখে ভেতরে ঢুকলেন। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা পরেন। দাড়ি পরিস্কার করে কামানো। সরু গোঁফ আছে। টেবিলের একপাশে একটা বড় রুকস্যাক টাইপের ব্যাগ রাখা আছে। মনে হয় ওতে অনেক জিনিষ আছে। ক্যামেরা তার মধ্যে একটা নিশ্চিত বস্ত। বাপ্পা একটা অচেনা গানের সুর গুণগুণ করতে করতে আনমনে ওনার কলম,টিকিট,একটা স্লিপ প্যাড এইসব নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আসলে অপেক্ষা করছে। খানিকবাদেই ভদ্রলোক ফিরে এলেন। বেশ ঝরঝরে লাগছে ওনাকে। কথা শুরু হলো।
বাপ্পাঃ বাড়ী থেকে আসছেন?
মানসঃহ্যাঁ। সেদিন গিয়েছিলাম। আজ এখন দোকানে এলাম।
বাপ্পাঃ সেদিন ফিরলেন কেন?বাকিরা তো থেকে গিয়েছিলেন?
মানসঃআসলে গতকাল ব্যারাকপুরে একটা বিয়ে বাড়ী ছিল। সেই সকাল সাতটা থেকে ছবি তলার দায়িত্ব। তাই…..। ওখান থেকে কাছেও হয়।
বাপ্পাঃ বাড়ী মানে আপনার পৈতৃক বাড়ীর কথা বলছেন?আপনার ফ্ল্যাটও শ্যামনগরে। মানে ঐ দমদম এলাকায়।
মানসঃ হ্যাঁ। সে খবরও পেয়েছেন দেখছি। আসলে ওটা ভাড়ায় থাকি। এক কামরার একটা ঘর। সারা সপ্তাহ ওখান থেকে এখানে আসি,শনিবার বাড়ী যাই,সোমবার সোজা এখানে আসি। যেমন সেদিন গিয়েছিলাম।
বাপ্পাঃ সে রাতে ফিরলেন কিভাবে?
মানসঃআমার অসুবিধে হয়নি,জানেন। পাটুলী থেকে হেঁটে গেলাম নিউ গড়িয়া স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে শিয়ালদা। শিয়ালদা থেকে আবার ট্রেনে শ্যামনগর।
বাপ্পাঃ কখন বেরিয়েছিলেন সে রাতে?
মানসঃআমি একটু আগেই বেরিয়েছিলাম। এই ধরুন সাড়ে আটটা হবে। দু-চার মিনিট এদিক ওদিক হতে পারে।
বাপ্পাঃআচ্ছা ডিভিডিটা আপনি দেখেছিলেন?
মানসঃ দেখেছি। চালিয়ে নয় অবশ্য। সাধারণ একটা ডিভিডি বক্স। নাথিং স্পেশাল।
বাপ্পাঃআপনার খারাপ লাগছে না এটা ভেবে যে একদিন আগে যার বাড়ীতে এত আনন্দ করলেন সেই আজ সবাইকে সন্দেহ করছে?
মানসঃলাগছে। কিন্ত কি করা যাবে?আশ্চর্যতম ঘটনা!আমি ব্যাপারটা শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে দীপ্তর সমস্যাটাও তো বুঝতে হবে। ও অনেকটা কমিটেড।
বাপ্পাঃ আপনি এই ফটো তোলার কাজ,স্টুডিও এসব চালাচ্ছেন কতদিন হলো?
মানসঃ(একটু ভেবে) তা বছর পাঁচ হবে।
বাপ্পাঃ চাকরি কি পেলেন না নাকি এটাকেই প্রফেশন বেছে নিলেন?
মানসঃদেখুন ফটোগ্রাফিতে আমি অনেক বছর ধরে ইন্টারেস্টেড। শখ ছিলই। আর সত্যি বলতে কি,আমি বরাবরই বন্ধুদের মধ্যে পড়াশোনাতেও পিছিয়ে। সে রকম ভালো রেজাল্ট নেই আমার। ওরা সবাই খুব ভালো। আমার যা কেরিয়ার তাতে-
বাপ্পাঃ তাতে?
মানসঃএই বেশ ভালো আছি,বুঝলেন। তাছাড়া নিজের ওজনটাও তো বুঝতে হয়।
বাপ্পাঃ আপনার স্টুডিওটা একবার দেখা যায়?
মানসঃউইথ প্লেজার স্যার। দুঃখিত। আমারই আগে আপনাদের বলা উচিৎ ছিল। আসুন আসুন।
ওনার পিছু পিছু আমরা ভেতরে ঢুকলাম। আর পাঁচটা স্টুডিওর সাথে কোনো ফারাক নেই। বড় ঘর,এখানেও দেওয়ালে নানা সাইজের ছবি। দুটো চেয়ারে সাইডে রাখা। বসে ফটো তোলার জন্য একটা টু-সিটার গদি আঁটা বেঞ্চ। ঘরের মাঝে একটা বড় হ্যালোজেন লাইট বসানো আছে। তার পাশে স্ট্যান্ডের ওপরে একটা ক্যামেরা সেট করা। ব্যবস্থা ভালোই বলা যায়। বেরিয়ে এসে মানসবাবু বাঁপাশের আরেকটি দরজা ঠেলে ঢুকলেন।
আসুন আপনারা। এটা আমার দোকানের মূল অংশ।
ঢুকে দেখলাম দুজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক বসেছিলেন। আমাদের দেখে দাঁড়ালেন। সামনে কাচের শেড। বাইরে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশী বিদেশী কোম্পানির ক্যামেরা রাখা আছে। বুঝলাম এনারাই এই অংশটার দেখাশোনা করেন। আমাদের দেখে হাসিমুখে নমস্কার করলেন। বাপ্পা সব দেখে টেখে বলল,স্টক তো ভালোই। লাভ হয়?বিক্রি কেমন হচ্ছে?
মানস বললেন,এটা তো আর ব্র্যান্ডেড শো-রুম নয়। কাজেই বিক্রি খুব ভালো হয় না। সবসময় তাই লাভের মুখও দেখা যায় না।
আমার একটা কথা মনে হওয়াতে এই বেলা সেটা জিজ্ঞেস করে ফেললাম। আপনি যখন ছবি তুলতে বাইরে যান তখন স্টুডিওতে সে কাজটা কে করে?
ওই যে ছেলেটিকে দেখলেন,ও আমার অ্যাসিসটেন্ট। এই তো দিল্লী যাবো। এক্সিবিশনে। এরকম সময় দোকান দেখাশোনা ও ছবি তোলা দুটোই ও করে থাকে।


পরের অংশ

 অনীশ মুখোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতি - পেশায় অর্থনীতির অধ্যাপক।ন'হাটা কলেজে কর্মরত।লেখালেখি নিয়ে চিন্তাভাবনার শুরু ২০১০-এ।প্রথম উপন্যাস 'জগতরত্ন রক্তনীল' আনন্দমেলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ২০১৪-২০১৫ সালে।বিহারীলালের আলোছায়া দ্বিতীয় রচনা। ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখিতে আগ্রহী।ফেসবুকে এ ব্যাপারে নিজস্ব পেজ 'বাইশ গজের ডাইরি'তে নিয়মিত লিখে থাকেন।